(পঞ্চম অধ্যায়) ডাইনি
রাজা বললেন, “রূপ-বদলানোর ক্ষমতাকে অনেকে ‘অশুভ শক্তি’ মনে করে, কিন্তু আমি দেখেছি, এটার ব্যবহার শিখে নিলে কারও সন্দেহ উদ্রেক না করে অনেক কাজের কাজ করা যায়।”
নীলাশা দ্বীপের নীল বালির ওপর দিয়ে হাঁটছিল তারা। সকালের রোদে ঝলমল করছে সমুদ্রতট। নীল বালিয়াড়িগুলোর পেছনে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঘন নীল সমুদ্র। এই তটের বালি খুব একটা ঝুরঝুরে নয়, তাই হাঁটতে অসুবিধা হয় না। চড়া রোদের মধ্যেও সমুদ্রের দিক থেকে যে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসছে, তাতে ইরার মুখে বেশ আরাম লাগছিল।
রাজা আবার বললেন, “ইরা, আমি সত্যিই দুঃখিত। তোমার মা-কে সেদিন আমি বাঁচাতে পারিনি।”
ইরা বলল, “উপায় থাকলে আপনি যে তাকে বাঁচাতেন, সেই ভরসা আপনার ওপর আছে আমার। তাই এ-নিয়ে আপনি আর মনে কষ্ট রাখবেন না।”
রাজা বললেন, “তোমাকেও আমার সত্যিকারের পরিচয় না দিয়ে ‘রজনীশ’ সেজে থাকতে হয়েছে আমাকে। ঐভাবেই কড়া নজর রেখে গেছি, যাতে তোমার কোনো ক্ষতি না হয়। আসলে আমি চাইনি যে নাবিকেরা জানুক, তারা তাদের রাজার সঙ্গে সমুদ্রযাত্রায় চলেছে।”
কিছু না বলে ইরা চুপ করে রইল। একটু ক্ষুব্ধ সে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে আর এ নিয়ে কথা বাড়ানোর ইচ্ছা তার নেই।
প্রথমবার এই মানুষটাকে ‘বাবা’ বলে জানার ঠিক পরেই তাঁর সঙ্গে বাগবিতণ্ডা করার ইচ্ছা তার নেই।
রাজাকে নীরবে অনুসরণ করে চলল সে। তিনি বললেন, “ইরা, তুমি জানো না, আমার কাছে কতখানি প্রিয় তুমি। সেই শিশুকাল থেকে বেড়ে উঠতে দেখলাম তোমাকে। মায়ের মতোই সাহসিনী হয়েছ তুমি। তার মতোই অসামান্য বীরত্বের কাজ তুমি করে যাবে, এ আমি নিশ্চিত জানি।”
রাজাকে পিতৃপরিচয়ে জানার পর ইরা প্রথম প্রশ্ন করল, “মা মারা গিয়েছিল ঠিক কোন্ জায়গায়?”
রাজা বললেন, “কল্মষেশ-এর গুহায়। সেখানেই যাচ্ছি আমরা। ঐ ডাইনিটা বজ্রধাতুর তরবারি গেঁথে দিয়েছিল তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ডে। আজ সেই ঋণ মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগ তোমার সামনে।”
নিজের অজান্তেই কোমরে ঝোলানো উজ্জ্বল তরবারির মুষ্টিতে স্পর্শ করা হয়ে গেল তার। সে প্রশ্ন করল, “মহারাজ, ‘কল্মষেশ’-কে সবাই এত ভয় পায় কেন?”
‘পিতা’ সম্বোধনটা চেষ্টা করেও তার অনভ্যস্ত জিহ্বায় এল না।
দ্বীপের মাঝখান দিয়ে স্বচ্ছ জলের এক সরু নদী বয়ে যাচ্ছে। তার তীরে উপস্থিত হয়েছিল ওরা। বহু গাছের ছায়ায় ঢেকে আছে নদীর দুই তট। রাজা তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, “এই নদীকে অনুসরণ করে গেলেই আমরা ডাইনির গুহায় পৌঁছে যাব।”
নদীর তীর বরাবর ওরা যত এগিয়ে চলল, ততই অরণ্য ঘন হয়ে উঠতে লাগল। ইরা দেখছিল, এখানকার প্রায় কোনো গাছ বা লতাগুল্মই তার পরিচিত নয়। সেগুলোর গা থেকে কেমন যেন একটা অদ্ভুত মেছো গন্ধ আসছে তার নাকে। হাঁটতে হাঁটতে রাজা বললেন, “কল্মষেশকে লোকে কেন এত ভয় পায়, জানো? যেসব কাজ কখনও করা উচিত নয়, সেইসব কাজই তিনি মানুষকে করতে বাধ্য করেন।”
“কী ধরনের কাজ?”
রাজা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমাদের রাজবংশের অত্যন্ত লজ্জার, গোপন অতীত আর ঘাঁটতে চাইছিলাম না; কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে এতদূর এসেছ, তাই তোমাকে না বললেও নয়। আমি যখন ছোটো ছিলাম, একদিন আমার পিতা বেদীতে বেঁধে আমাকে কল্মষেশের কাছে বলি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। আমার মাথার ওপর তরবারিও উদ্যত করেছিলেন তিনি আমার শিরশ্ছেদ করার জন্য। সৌভাগ্যবশত সেই মুহূর্তে আমার মা এসে পড়েছিলেন। পেছন থেকে ছুরি মেরে বাবাকে হত্যা করেন তিনি।”
হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল ইরা। রাজা একটু দুঃখের হাসি হাসলেন, “ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়, শুনেছ হয়তো কথাটা। যারা ঐ অপদেবতা কল্মষেশের উপাসনা করে, তাদের সঙ্গে এমনই হয়। যারা তাঁর পূজা করে, তাদের তিনি অলৌকিক ক্ষমতা, অপরিসীম মায়াশক্তি দেন, কিন্তু তার বদলে উপাসকদের কাছ থেকে তিনি চান ঘৃণ্য সব বলি। বীভৎস অপরাধ করতে বাধ্য করেন তিনি তাদের। তাদের অন্তরাত্মাকে পাপে কলুষিত করে তৃপ্ত হন এই বিকট অপদেবতা।”
শুনতে শুনতে ইরার অন্তর ক্রোধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল। ক্ষমতার লোভে মানুষ এতখানি হৃদয়হীন হয়ে উঠতে পারে যে নিজের সন্তানকেও বলি দেওয়ার চেষ্টা করা যায়?
রাজা আবার বললেন, “কল্মষেশ নাকি তাঁর ভক্তদের দেবতা- সমান ক্ষমতা দেন, আর সেই ক্ষমতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় মানুষ তার মনুষ্যত্বটুকুও বিসর্জন দিয়ে ফেলে। জাহাজের সেই লোকটা ঠিকই বলেছিল, ইরা। কৰ্ম্মষেশকে তুষ্ট করতে হলে তিন রকম রক্তের মিশ্রণই দরকার হয়, একটা জন্তু, এক সাধারণ মানুষ, আর এক শক্তিশালী মায়াধরের রক্ত।”
হাঁটতে হাঁটতে সুবিশাল পাহাড়ের নীচে এসে পড়েছিল ওরা। পাহাড়টা এত বড়ো যে নীচে দাঁড়িয়ে তার চূড়া ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। ইরা দেখল, পাহাড়েরই এক গুহার অন্ধকার মুখের মধ্যে বেঁকে ঢুকে গেছে স্বচ্ছতোয়া নদী। গুহাটা এতটাই সরু যে তার মধ্যে ঢুকতে গেলে নদীতে নামতে হবে। জল অবশ্য খুব একটা গভীর নয় এখানে।
রাজা জলে নামলেন।
“অস্ত্র তৈরি রাখো।” ফিশফিশ করে বলে উঠলেন তিনি, “আমরা কল্মষেশের গুহায় ঢুকছি। আমার পিছুপিছু এস।”
জলে পা দেওয়ামাত্র ইরা বুঝতে পারল, জলটা বেশ গরম। হয়তো দ্বীপের মধ্যে কোথাও উষ্ণ প্রস্রবণ আছে; সেখান থেকেই একটা ধারা এসে মিশছে নদীতে।
গুহামুখে বহু গাছের পল্লবিত শাখা নুয়ে পড়েছে; তাদের ছায়ায় মৃদু অন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা। যথাসম্ভব কম শব্দ করে সাবধানে এগিয়ে চলল ওরা। ঈষদুষ্ণ জল বয়ে যাচ্ছে তার পা বেষ্টন করে, ইরার বেশ আরাম লাগছিল।
হাতে দীর্ঘ, ঋজু তরবারি নিয়ে জল ঠেলে গুহার মধ্যে এগিয়ে চলল সে। তার সামনে হাঁটছেন রাজা; তাঁর হাতের লাঠি বদলে গেছে স্বর্ণময় রাজদণ্ডে।
হঠাৎ জলের মধ্যে ইরার পায়ে কী যেন একটা জড়িয়ে গেল।
রাজাকে চেঁচিয়ে ডাকতে গিয়েও সে থেমে গেল। কল্মষেশের উপাসনাস্থলের এত কাছে এসে নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করা যে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, সে জানে। কিন্তু পেছনে কী ঘটছে বুঝতে না পেরে রাজা সামনের দিকে এগিয়ে চলে গেলেন।
দড়ির মতো আরও কী একটা জিনিস এসে তার পায়ে জড়িয়ে যেতে লাগল।
গুহার ভেতরটা বেশ অন্ধকার। নিজের হাত দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু জলের তলায় কী আছে, তা দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। বজ্রধাতুর তরবারির দিকে তাকিয়ে আলোকপ্রার্থনা করল সে। সঙ্গে সঙ্গে মসৃণ ফলকের শরীর থেকে হালকা একটা আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সেই আলোয় সে দেখতে পেল তার পায়ে জড়িয়ে যাওয়া লতার মতো জিনিসগুলো আসলে কী।
সাপ!
চেঁচিয়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে দমন করল সে। আমরা যে এখানে আছি, ঐ ডাইনিটাকে জানতে দেওয়া চলবে না। সাপগুলো পেঁচিয়ে ধরেছে তার পা। তাদের সবল আকর্ষণ তাকে টানছে অন্য দিকে। দু-তিনটে সাপকে তরবারির আঘাতে সে হত্যা করল বটে, কিন্তু আরও অনেকগুলো এসে ক্রমশ জড়িয়ে ধরছে তার পা-দুটোকে; প্রবল শক্তিতে ওরা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে অন্য দিকে। মুখ তুলে তাকিয়ে সে দেখল, রাজা অনেকটা এগিয়ে গেছেন; তাঁকে আর দেখা যাচ্ছে না।
তার সামনে তখন অন্ধকার গুহাপথ অনেকগুলো পৃথক সুড়ঙ্গে ভাগ হয়ে গেছে। নদীটাও একাধিক শাখায় ভাগ হয়ে গিয়ে প্রতিটি গুহার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। ইরা ঠিক করল, আপাতত সাপগুলোর সঙ্গেই যাওয়া যাক।
তার মন বলছিল, এরা এসেছে ঐ ডাইনির কাছে তাকে নিয়ে যেতে।
জলের তলায় সাপগুলো তার পায়ে জড়িয়ে একটা বিশেষ সুড়ঙ্গের দিকে টেনে নিয়ে চলল তাকে। অল্প কিছু দূর যাওয়ার পরেই ইরা বুঝতে পারল, তার অনুমান একদম সঠিক ছিল।
সে দেখতে পেল, নীলাশা দ্বীপের ডাইনি বসে আছে গুহার শেষ প্রান্তে।
ভয়ংকর ডাইনিটাকে প্রথম দেখায় কিন্তু খুব একটা ‘ভয়ংকর’ বলে মনে হল না তার। চ্যাপ্টা পাথরের ওপর ঘন নীল রঙের একটা আলখাল্লা জাতীয় পোশাক পরে নদীর দিকে পেছন ফিরে বসে আছে সে। তার মাথায় পিঠ-ছাপানো সাদা চুল। মাথা ঝুঁকিয়ে স্থিরভাবে বসে থাকার এই ভঙ্গি দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন সে ঘুমোচ্ছে।
ইরা ভাবল, ওকে শেষ করে দেওয়ার এমন সুযোগ আর আসবে না।
সাপগুলো তার পায়ের বাঁধন খুলে সরে গেল। হাতের বজ্রধাতুর তরবারির সাদা আলোয় সে দেখতে পেল, গরম জলের মধ্যে কিলবিল করতে করতে তারা ভেসে চলে যাচ্ছে স্রোতের বিপরীতে।
‘এইখানেই আনতে চেয়েছিল ওরা আমাকে। তার মানে, ডাইনিটা চেয়েছিল, আমি যেন এই জায়গাটায় আসি!’
তার দিকে পেছন ফিরে গুহার দেওয়ালের দিকে মুখ করে অনড়ভাবে বসে আছে সাদাচুলো নীলাশা দ্বীপের ডাইনি। ইরা দেখল, তার হাতের মায়াবী বজ্রধাতুর তরবারির গায়ে লেখা অক্ষরগুলো অঙ্গারের মতো কমলা আভায় জ্বলছে।
নিঃশব্দে ডাইনিটার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে তরবারি তুলল সে।
এত সহজে মিটে যাবে সব কিছু? তার যেন বিশ্বাস হতে চাইছিল না।
পরক্ষণেই তার মনে হল, “যত খারাপই হোক, কোনো ঘুমন্ত মানুষকে মারার মতো জঘন্য কাজ আমি করতে পারব না।” তরবারি নামিয়ে নিল সে। এইবার ডাইনির শরীরটা নড়ে উঠল।
নীল আলখাল্লায় যেন ঢেউ খেলে গেল। উঠে দাঁড়াল সে, “এই তো বীরের উপযুক্ত কর্ম, ইরা!”
আবার ইরা তরবারি তুলতে যাচ্ছিল। সুন্দরী মেয়েটি ফিরে দাঁড়াল তার দিকে। অশ্রু টলটল করছে তার দুই সমুদ্রনীল চোখে।
চোখ মুছে নিল ডাইনিটা— তারপর বলল, “ঐ বজ্রধাতুর তরবারি হাতে তোকে কেমন লাগছে জানিস, সোনা? সত্যিকারের বীর যেমন হয়, ঠিক তেমন। আমি বরাবর তোর বাবাকে বলে এসেছি, একদিন ঐ মায়াঅস্ত্রের যোগ্য হয়ে উঠবি তুই।”
ইরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। ডাইনি আবার বলল, “ঐ তরবারির গায়ে তোর জন্য একটা ছোট্ট চিঠি রেখে এসেছিলাম। তুই পড়েছিস তো?”
