হেল হাউন্ড – পবিত্র ঘোষ
সমাধিস্থলটা ঠিক পাহাড়ের ওপরে। সময় রাত বারোটা দশ। কুয়াশার স্তর যেন মৃতদেহের ওপর চাদরের মতো বিছিয়ে আছে। শুভ্র সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে গাছের প্যাঁচানো শাখাগুলি ঘন হয়ে ওপরে উঠে ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে একটু-আধটু নীচে পৌঁছাচ্ছিল। সব মিলিয়ে বহুবছরের প্রাচীন এবং পরিত্যক্ত জায়গাটাকে ঘিরে ছিল একটা অস্বাভাবিক আভা। জনবসতি থেকে প্রায় মাইল দুয়েক দূরের এই সমাধিস্থল ঘিরে ছড়িয়ে আছে নানা গুজব এবং অলৌকিক গল্প।
একটু দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে কবরফলকগুলো, খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওরা। মৃত মানুষগুলোর মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ওদেরও মৃত্যু ঘটেছে। ফাটলের দাগগুলো এই চাঁদের আলোতেও স্পষ্ট দেখা যায়।
লোহার গেটটা মরচে পড়া, অর্ধেক খোলা, একটু বাতাসেই যেন কর্কশ শব্দে কেঁপে উঠবে। এটা সেই জায়গা, যেটা শহরের সবাই এড়িয়ে চলে, যেখানে শোনা যায় এক অন্ধকারের ফিশফিশানি— শোনা যায় এক পিশাচের কথা, যে নাকি থাকে কোনো একটা কবরের নীচে। খায় গলাপচা মৃতদেহ এবং অপহরণ করে শিশু এবং কিশোরদের রেখে দেয় নিজের কাছে… মাঝেমধ্যে খুব অস্ফুটে শোনা যায় সেই সব অপহৃত হতভাগাদের কান্না এবং গোঙানির শব্দ।
“সব ভুলভাল গল্প শুনে এখানে আসা উচিত হয়নি!” পার্থ বলে উঠল।
“ভুলভাল গল্প যদি হবে তাহলে ভয় পাচ্ছিস কেন?”
কথাটা বলে বিবেক বেশ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে সমাধিস্থলের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। তার টর্চলাইটটা অন্ধকারের বুক চিরে সামনে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে। আর্থিক স্বচ্ছলতা তার পোশাক এবং ভাবভঙ্গিতে স্পষ্ট ফুটে উঠছিল। চটপটে বছর একুশের ছেলেটার চোখে ছিল এক অদ্ভুত দুষ্টুমির ঝলক।
এদিকে পার্থ, বিবেকের থেকে কিছুটা পেছনে দাঁড়িয়ে, এক হাতে তার টর্চলাইটটা শক্ত করে ধরে ছিল। তার ভীতু চোখ চারদিকে সাবধানে ঘোরাঘুরি করছিল, প্রতিটি ছায়ার মধ্যে যেন বিপদ খুঁজে পাচ্ছিল।
“কয়েকদিন আগেই, পাশের গ্রামের ক্লাস নাইনের একটা ছেলে নিরুদ্দেশ হয়েছে…!” পার্থ বলল।
“হ্যাঁ তা হয়েছে, লাস্ট এক বছরে প্রায় আটজন ছেলে গায়েব হয়েছে!” বিবেক বলল।
“হ্যাঁ… ওই জন্যই তো বলছি! উচিত হয়নি!”
“তুই তো ভূতপ্রেত বিশ্বাস করিস না…!” খোঁচা দেয় বিবেক।
“আরে বাচ্চাগুলোকে কোনো গুণ্ডাদের দল অপহরণ করছে হয়তো… যদি আমরা ওদের হাতে পড়ে যাই?” পার্থ ভয়ে ভয়ে বলল।
“এতই যদি তোর ভয় তাহলে তুই এখান থেকেই বাড়ি ফিরে যা… আমি একা দেখে নিচ্ছি। শালা ভীতু কাপুরুষ!”
বিবেকের কথায় পার্থকে যেন ঠান্ডাটা চেপে ধরল। পাতলা জ্যাকেটটা তাকে ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারছিল না, ঠান্ডায় আর আতঙ্কে কাঁপ দিতে শুরু করল। বিবেকের দেওয়া টাকার লোভে সে এখানে আসতে রাজি হয়েছিল — ওই টাকা তার বাড়ি ভাড়া দিতে আর বই কিনতে লাগবে। সব খরচের পরেও হাতে বেশ কিছু টাকা থাকবে। কাজটা না করে ফিরে গেলে টাকাটা বিবেককে ফেরত দিতে হতে পারে।
“কী পার্থ, বল কী করবি?” বিবেক পেছনে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “তুই গেলে যেতে পারিস, কিন্তু কলেজে কিছু একটা রটে গেলে পরে আমাকে দোষ দিবি না। শর্মিষ্ঠা যদি শোনে পার্থ ভীতু…?”
পার্থ এক রকম জোর করে হাসল, “ভীতু কেন হতে যাব?”
“ভয় করছে না তোর?” রহস্য করে বিবেক প্রশ্ন করে।
“একদম না… শুধু, বুঝলি তো, জায়গাটা একটু অদ্ভুত। আর তাছাড়া সাপখোপ…”
“আরে চুপ কর,” বিবেক চোখ ঘুরিয়ে বলল, “সাপ কী করবে? হাতে টর্চ আছে তো… সাপ আলোর আভাস পেলে আর কাছে ঘেঁষবে না। তবে অপার্থিব একটা কিছু থাকলেও থাকতে পারে…।”
পার্থ দাঁত চেপে একটা কৃত্রিম সাহস নিয়ে এগিয়ে গেল, “আচ্ছা তুই শিওর এখানে অলৌকিক কিছু আছে?”
“হ্যাঁ… আমি শিওর… এই কবরস্থানের পিশাচটাই স্থানীয় বাচ্চাদের অপহরণ করে, আর আমি এই ব্যাপারেও নিশ্চিত যে আজ রাতেই তার দেখা আমরা পাব!”
“মানে?”
“মানে এই কবরখানায় আমরা ক্যামেরা ফিট করে, দূর থেকে লক্ষ রাখব, পিশাচটা একবার নিজের ডেরা থেকে বের হলেই ব্যাস… ক্যামেরায় বন্দি হবে তার সমস্ত গতিবিধি, এরপর ভাব…., আমরা যখন ভিডিওটা আপলোড করব, কেমন হিট হবে! শালা ভিউজ কত হবে ভাবতে পারছিস?”
পার্থ তার চারপাশের অন্ধকারে একবার তাকিয়ে হালকা শ্বাস ফেলল, “ঠিক আছে। ভাই, কিন্তু সে পিশাচ যদি আমাদের দেখতে পায়?”
“আরে বললাম তো, দূর থেকে লক্ষ্য রাখব! আর নেহাত যদি সে আমাদের দেখতেই পায়, জয় মা বলে ছুট লাগাব…. মিলিয়ন ভিউ চাই, আর এটুকু রিস্ক না নিলে হয়?”
পার্থ আর কিছু বলতে পারল না।
বিবেক গেটটা ঠেলে খুলতেই মরচে ধরা গেটটা কেঁপে উঠে কর্কশ শব্দ তুলল। পার্থ চমকে উঠল, কিন্তু বিবেক হাসতে লাগল।
“শুনলি? কী দরাজ গলায় আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে।”
গাছগাছালিতে ঢাকা ছায়াময় পথ ধরে এগোতে লাগল ওরা দু-জন। পথটা কবরফলক আর মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসা শিকড়ের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে। কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছে, তাই জায়গাটার গন্ধ ছিল ভেজা মাটির, সেই সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা শব্দ। পার্থ চেষ্টা করছিল কবরগুলোর দিকে না তাকানোর। ফলকগুলোর মধ্যে কিছু ছিল ভাঙা, কিছু এমনভাবে হেলে পড়া যে মনে হচ্ছিল ক-দিন পরেই মাটিতে গড়িয়ে পড়বে, আর কয়েকটা তো সম্পূর্ণ গাছপালার নীচে ঢাকা।
“একটু তাড়াতাড়ি পা চালা,” ট্যুর গাইডের মতো এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল বিবেক, “ওই বড়ো গাছটার নীচে ক্যামেরা বসাব। ওখান থেকে জায়গাটা বেশ অদভুতুড়ে দেখাবে তাই না? ভিউটাও ভালো আসবে!”
পার্থ অনিচ্ছাসত্ত্বেও হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। প্রাচীন একটা গাছ। গুঁড়িটার সঙ্গে অজগরের মতো প্যাঁচানো তার ঝুরি, ডালগুলো এমনভাবে ছড়ানো যেন অশরীরী কোনো দানব তার লম্বা হাত প্রসারিত করেছে শিকার ধরার জন্য।
“জায়গাটার কথা ছাড়… এই গাছটা একাই ভয় ধরানোর জন্য কাফি!” পার্থ নীচু স্বরে বলল।
“তা যা বলেছিস…” এই বলে বিবেক ব্যাগ থেকে দুটো ক্যামেরা বের করল। একটা সে দিল পার্থর হাত।
“নে শুরু কর..!”
পার্থ রেকর্ডিং শুরু করার পরে বিবেক নীচু হয়ে একটা ছোটো কবরফলকের পাশে অন্য ক্যামেরাটা বসিয়ে দিল। ক্যামেরার এঙ্গেল ঠিক করতে করতে বলল, “ক্যামেরা চালু করে দিলাম। মোটামুটি সামনে যাকে পাবে তাকেই তুলে নেবে।”
“ডাইরেক্ট ভিডিও করতে শুরু করলি? ইন্ট্রো দিবি না?” জিজ্ঞেস করল পার্থ।
“হ্যাঁ সে তো করবই… আগে ক্যামেরাটা জায়গা মতো বসিয়ে নিলাম! এবার… ভালো করে ক্যামেরাটা ধর…!” পার্থ ক্যামেরা নিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। বিবেক মাথার চুলে হাত চালিয়ে, গায়ের জ্যাকেটটা ঠিক করে নিল।
“রেডি?” জিজ্ঞেস করল পার্থ।
কয়েকমুহূর্ত অপেক্ষা করে বিবেক বলে উঠল, “নমস্কার বন্ধুরা, ঠান্ডা অভ্যর্থনা সহকারে শুরু করছি আজকের এই পর্ব! আপনারা অনেকদিন ধরেই চাইছিলেন ইয়ুকসি কবরস্থানের নাইট ভুগ দেখতে, আর তাই আজ আমরা এসেছি… সত্যিই কী এই কবরস্থানে রয়েছে কোনো পিশাচ, সত্যিই কী অল্প বয়েসি ছেলেদের কেউ অপহরণ করে এনে লুকিয়ে রেখেছে এই…”
কথা বলতে বলতে বিবেক থেমে গেল। পার্থ ভুরু কুঁচকে কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলল, কিন্তু হঠাৎই দুর থেকে একটা শব্দ শুনে চুপ করে গেল! এককথায় দু-জনেই পাথর হয়ে গেল। বিবেকের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছিল। গভীর, ঘড়ঘড়ে পাশবিক একটা ডাক যেন কুয়াশার ভেতর দিয়ে এসে তাদের চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরল।
পার্থের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, “ভাই, কীসে আওয়াজ করল?”
বিবেক এবার একটু জোর করেই হেসে বলল, “বোধহয় কুকুর কিংবা শেয়াল। কিংবা… হাওয়া।” অনেক চেষ্টা করেও গলার কাঁপুনিটা চাপতে পারল না।
পার্থ আতঙ্কে ঢোক গিলল, চারপাশে তাকিয়ে দেখল, “বলতে পারি না, তবে ডাকটা ঠিক কুকুরের মতো শোনাল না!”
শব্দহীনতা ঘনিয়ে এল, যেন পৃথিবী নিজের কক্ষপথে স্থানুবৎ হয়ে পড়েছে। পার্থ তো ভয় পেয়েছিলই, বিবেকও একটু অস্বস্তি অনুভব করছিল।
“চল তো গেটের কাছটা গিয়ে দেখি।” বিবেক বলল, যদিও তার গলার স্বরে আগের সেই উচ্ছ্বাস আর ছিল না।
বিবেক এবং পার্থ ছায়াময় জায়গাটা থেকে বেরিয়ে আবারও কবরস্থানের বিরাট ফটকের কাছে পৌঁছোল। শিরশিরে বাতাস বইতে শুরু করেছে। ঠান্ডা রাতের বাতাস যেন তাদের বুকের ওপর চেপে বসে পড়ছিল। দ্রুত এবং ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে লাগল দু-জনেরই।
গাছের আড়াল থেকে বেরিয়েও দৃষ্টি খুব একটা স্বচ্ছ হল না। কুয়াশা ঘন হয়ে নীচের মাটির ওপর জমাট বেঁধেছিল, যার ফলে সামনের সবকিছুই ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তে অপার্থিব এক প্রেতনদীর মতো দেখাচ্ছিল।
কী করা উচিত সেটাই পার্থ ভাবছে এমন সময় কুয়াশার মধ্যেই যেন একটি ছায়াময় অবয়ব আবির্ভূত হল। পার্থ আঁতকে উঠেই আবার লক্ষ্য করল ছায়ামূর্তিটি আসলে একজন বয়স্ক ব্যক্তি, যার সুঠাম অবয়ব দূরের রাস্তার বাতির ম্লান আলোর বিরুদ্ধে অস্পষ্টভাবে চোখে পড়ছিল।
বিবেক দেখল, লোকটির পাশে তিনটি কুকুর দাঁড়িয়ে, যদিও তাদের কী জাত সেটা বোঝা গেল না। তাদের দেহগুলো আংশিক স্পষ্ট ছিল, কুয়াশার মধ্যে থেকে তাদের লম্বা কানগুলো উঠে ছিল, আর মাঝে মধ্যে জ্বল জ্বল করে উঠছিল তাদের চোখগুলো। এই কুকুরগুলোই নীচু স্বরে গর্জন করছিল, এমন এক শব্দ তাদের গলা থেকে বের হচ্ছিল যা পার্থর স্নায়ুকে অবশ করে তুলছিল।
“লোকটা কে?” পার্থ ফিশফিশ করে বলল, বিবেকের হাত তখন সে নিজের অজান্তেই চেপে ধরেছে।
বিবেক হেসে হাতটা ছাড়িয়ে নিল, “আরেহ, এতেও ভয় পাচ্ছিস। কে এক বুড়ো লোক তার পোষা কুকুর নিয়ে বের হয়েছে। রাতে হাঁটার বাতিক আছে হয়তো। চল গিয়ে কথা বলি।”
তারা কাছে যেতেই লোকটি রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোতে পা রাখল। উচ্চতা বেশ লম্বা, সেই সঙ্গে চওড়া কাঁধ, মুখের কাঠিন্য দেখে মনে হয় বুঝি খোদাই করা। লম্বা কোট আর তার মাথার টুপি মিলিয়ে লোকটাকে বেশ রহস্যময় বলে মনে হচ্ছিল। পার্থরা একটু কাছে যেতেই ভদ্রলোক মাথা থেকে টুপি খুললেন।
ছোটো কিন্তু তীক্ষ্ণ দুটো চোখ যেন পার্থর অন্তরাত্মা ভেদ করে গেল। কুকুরগুলো শান্ত হয়ে থাকলেও, ভদ্রলোক শক্ত হাতে শিকল ধরে আছেন সেটাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। গলার ভেতর গরগর শব্দ করে যেন নীরবে হুমকি দিচ্ছিল। কুকুরগুলোর জন্যই বোধহয় বিবেক থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, এবং বলাই বাহুল্য পার্থও দাঁড়িয়ে পড়ল।
“ব্যপার কী?” লোকটি কণ্ঠস্বর ঝাঁঝালো আর কর্কশ করে বললেন, “এত রাতে জগাই মাধাই এখানে কী করছে?”
বিবেক হাসল, বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে, “এই কবরস্থানটা একটু দেখতে এসেছি, মিস্টার সেন” সে লোকটিকে শনাক্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “আপনি তো শশাঙ্ক সেন… বিখ্যাত উকিল!”
পার্থরও এবার মনে পড়ল। শশাঙ্ক সেনের কথা সে-ও শুনেছে। এখানকার এক ডাইসাইটে ব্যক্তি। বড়ো বড়ো মন্ত্রী আমলার কেস লড়েছেন এক সময়। বিয়ে করেননি, বিশাল প্রাসাদে একাই থাকেন। এরকম একজন লোকের মাঝ রাতে কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোনোর ব্যাপারটা লোকটার ব্যক্তিত্বে অতিরিক্ত রহস্যের রং এনেছে।
শশাঙ্ক সেন তাঁর চোখ ছোটো করলেন, মুখে একটা একপেশে হাসি টেনে, “তোমাকেও আমি চিনেছি, তুমি ভটচাযদের বাড়ির ছেলে… সমীরণ তোমার বাবা তাই তো?”
“ঠিক ধরেছেন স্যার। আমার দাদু আপনার কথা খুব বলেন…।”
“একে তো চিনলাম না।” শশাঙ্ক পার্থর দিকে তাকালেন,
“তুমি এইভাবে চারপাশে তাকিয়ে কী দেখছ? যেন অন্ধকার থেকে কিছু বেরিয়ে আসবে… ভয় পেয়েছ নাকি?”
“ও আমার কলেজের বন্ধু, নাম পার্থপ্রতিম নিয়োগি। কলকাতায় বাড়ি, এখানে রেন্টে থেকে পড়াশোনা করে। খুব মেধাবী, কিন্তু একটু ভীতু!”
“ভীতুই যদি হবে তো এত রাতে কবরখানায় কী করতে এসেছে?”
“আসলে আমার একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে। বিভিন্ন হন্টেড জায়গায় রাত্রিবেলা গিয়ে আমি সেখানকার ভিডিও করি। এখানেও এসেছি সেই উদ্দেশ্য নিয়েই… পার্থ আমাকে অ্যাসিস্ট করছে। আজই প্রথম এসেছে…।” কথাগুলো বিবেক খুব সহজ ভঙ্গিতে বলল, “এই কবরস্থানটা নিয়ে অনেক গল্পকথা শুনেছি, বাড়ির এত কাছে হওয়া সত্বেও কখনও আসা হয়নি… ফাইনালি আজ এলাম। দেখি… হয়তো কিছু দেখতে পাব।”
শশাঙ্ক সেন কর্কশ হাসি হেসে মাথা নাড়ল। তার কুকুরগুলো এখনও মৃদু গর্জন করছিল। পার্থর একবার যেন মনে হল, কুকুর বোধহয় একটাই… মাথা তিনটে…
“কতদিন হল চ্যানেল খুলেছ?” জিজ্ঞেস করলেন শশাঙ্ক।
“বেশি না, ছ-মাস মতো, কিন্তু ওই… প্যারানরমাল হান্টার হিসেবে বেশ নাম হয়ে গেছিল…!” বিনয়ের সুরে বলল বিবেক।
“যত সব আজগুবি গাঁজাখুরি ভিডিও বানিয়ে লোককে দেখাও তাই তো?” কঠিন গলায় প্রশ্নটা করলেন।
পার্থর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, নিরুপায় দৃষ্টি মেলে সে তাকাল বন্ধুর দিকে।
“মানুষ এসব আজগুবি জিনিসই খায় বেশি। সত্যি বলছি এই কমাসে ভূত প্রেত কিছুই দেখিনি, তবে ভিডিওতে একটু কারসাজি করে… ম্যানেজ করে নিয়েছি! দেখুন সমাজ যদি চোখে কালো পট্টি পরে বসে থাকে, সেখানে আমার কী করার আছে। ইচ্ছা হলে তারা আমার ভিডিও দেখবে, নাহলে দেখবে না…।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শশাঙ্ক বললেন, “তোমরা হয় সাহসী, নয়ত নিছক নির্বোধ।”
পার্থ এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল, ভয়টা কাটানোর জন্যেই হয়তো বলে উঠল, “হয়তো দুটোই?”
শশাঙ্ক আবারও হাসলেন, যদিও সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না, “সাহস আর নির্বুদ্ধিতা— একই মুদ্রার দুই পিঠ… বিশেষ করে তোমাদের মতো ছেলে ছোকরা বয়সে সেটাই হয়ে থাকে।”
পার্থ আর বিবেক একে ওপরের দিকে তাকাল। শশাঙ্ক বললেন, “ভূত পিশাচ বলে কিছু না-ই থাকতে পারে, কিন্তু পৈশাচিকতা… সেটা কিন্তু দিনের আলোর মতোই বাস্তব! একটা কথা মনে রেখ… ধোঁয়া যখন উঠছে তার মানে আগুন অবশ্যই লেগেছে… তাই সব কিছুকে…. ওই কী যেন বলো তোমরা? খিল্লি… সব কিছু নিয়ে খিল্লি করা উচিত নয়!”
পার্থ আর বিবেক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এসব কথার ঠিক কী জবাব দিতে হয় ওরা জানে না।
“এতদিন তোমরা অলৌকিক কিছু প্রত্যক্ষ করোনি, তার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাও। আমি এই এলাকার অনেক পুরোনো বাসিন্দা, তাই তোমাদের বলছি, এখান থেকে ফিরে যাও।”
পার্থর মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল, এবং সে-ও যেন একটু উসখুস করতে লাগল, কিন্তু বিবেক কাঁধ ঝাঁকাল, তার মুখ নির্বিকার, “সতর্কবার্তার জন্য ধন্যবাদ, স্যার… কিন্তু আমরা নিজেদের প্রটেক্ট করতে জানি। তাই আমাদের নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে!”
শশাঙ্ক কিছুক্ষণ স্থির চোখে বিবেকের দিকে দেখে নিলেন, তারপর চোখ সরু করে পার্থকে দেখে নিয়ে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন, “তোমার হাইট কত?”
“পা…পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি!”
কম উচ্চতার জন্য ওকে বরাবরই ঠাট্টার পাত্র হতে হয়েছে। স্কুলে, কলেজে, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে।
তাই উচ্চতার ব্যপারে কথা উঠলেই পার্থ অস্বস্তি বোধ করে।
“ঠিক আছে। তোমরা যখন এতই কনফিডেন্ট তখন…!” কথাটা পুরোপুরি শেষ না করেই তীক্ষ্ণ একটা শিস দিলেন, কুকুর তিনটে যেন অনিচ্ছুকভাবে তাঁর দিকে ফিরে গেল। ভদ্রলোক বেশ দ্রুততার সঙ্গেই প্রস্থান করতে লাগলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দূরে ছায়ার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন, পার্থর মনে হল কুকুরগুলোর চোখ যেন অন্ধকার থেকে এখনও তাদের দিকে ঝলমল করছে।
শশাঙ্ক সেন চলে যেতেই পার্থ হাঁফ ছাড়ল।
“ক্রিপি লোক মাইরি। কুকুরগুলোও ভয়ানক… । আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন… যেন একবার ছাড়া পেলেই ছিঁড়ে ফেলবে।”
বিবেক পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল নুঙ্গ, তারপর একটা সিগারেটের বাক্স বের করে বলল, “এক বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিই। তুইও একটা নে…’
সিগারেট শেষ করে বিবেক বলল, “চ, আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে ইনট্রোটা সেরে ফেলি, তারপর, একটা সুবিধামতো জায়গায় গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে।”
“লুকিয়ে থাকতেই হবে? ক্যামেরা রেখে দিয়ে চলে যাই? তুই তো এমনিতেই ভিডিওতে এডিটিং করবি।” পার্থ ভয়ে ভয়ে বলল।
“আমি ভিডিওতে এডিটিং করি তোকে কে বলল?” বিবেক প্রশ্ন করল।
“তুই তো এই কিছুক্ষণ আগে বললি শশাঙ্ক সেনকে।” বিবেক এবার হো হো করে হেসে উঠল। তারপর পার্থর দিকে সকৌতুকে তাকিয়ে বলল, “ওরে বোকা, ওই বুড়োকে আমি একটা ভুজুংভাজুং দিয়েছি, নাহলে আনাড়ি তর্ক করত, ওই দেখলি না কত জ্ঞান দিচ্ছিল!”
“মানে… তোর যে ভিডিওগুলো… ওগুলো সব সত্যি?”
“সব… নাহলে কী আর এমনি এমনি এত ভিউ আসে?” বিবেক নাকের নীচে তর্জনি ঘষে নিয়ে বলল।
“তারমানে, সেই একটা পুরোনো বাড়িতে একটা ফ্যাকাসে মুখের মহিলা তিনতলা থেকে তোর দিকে তাকিয়ে ছিল!”
“সত্যি…!”
“আরে সেই একটা রাস্তার পাশে গর্তের ভেতর থেকে একটা বাচ্চা মেয়ের খিলখিল হাসির শব্দ, ওটাও এডিট করা নয় বলছিস?”
“যদি বিশ্বাস না হয়, তোকে কালই সেই জায়গায় নিয়ে যেতে পারি!”
“ওরে বাবা!”
‘কলকাতার কাছে সেই একটা মর্গ আছে না? যেটার সামনে দিয়ে রাত্রিবেলা বাইক চালিয়ে গেলে পেছনের সিট হঠাৎই ভারী হয়ে যায়, লুকিং গ্লাসের দিকে তাকালে ব্যাকে সিটে একজনের ফ্যাকাসে একটা মুখ দেখা যায়।
“ওরে বাবা রে, তুই থাম তুই থাম।” পার্থ বলল, “ভাই এখান থেকে বের হতে হবে জলদি। কতক্ষণ থাকতে হবে?”
“থাকতে তো…” কথাটা বলতে গিয়ে চুপ করে গেল বিবেক। তার চোখ একটু ছোটো হল তারপর ধীরে ধীরে বড়ো হতে লাগল।
“কী হল রে? কী দেখছিস?” পার্থ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে উঠল।
বিবেক কোনো কথা না বলে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। পার্থ বুঝতে পারল বিবেকের চোখ তার ঠিক পেছনে, দূরে… কিছু বা কেউ একটা…
কথাটা মনে হতেই পার্থ ফিরে তাকাল…. কিন্তু না… কেউ নেই। একটু দূরেই কবরস্থানের মর্চে ধরা লোহার গেট, আর তার কিছুটা দূরে দু-পাশে ল্যাম্পপোস্ট প্রহরীদের মধ্যে দিয়ে রাস্তা মিলিয়ে গেছে অন্ধকারের ভেতর।
“কী রে, কী দেখলি তুই?” রাস্তার শেষে অন্ধকারটাকে দেখে নিয়ে পার্থ বলে উঠেই ফিরে তাকালো বিবেকের দিকে, আর সেদিকে ফিরতেই চমকে উঠল সে…
সামনেটা যেরকম ফাঁকা দেখল, এখন পেছনটা সেরকমই ফাঁকা! নেই… কেউ নেই… বিবেক উধাও…
“বি… বি… বিবেক….!” অস্ফুটে ডেকে উঠল পার্থ। আর ঠিক তখনই…. গেল কোথায় ছেলেটা? এই তো ছিল…
“বিবেক…. এই বিবেক…. কো… কোথায় গেলি?” পার্থ এবার একটু জোরে বলে উঠল, “ভাই… ভাই এটা কিন্তু খিল্লি করার সময় না।”
চারিদিকে দেখতে দেখতে বিবেক বলে উঠল, “বিবেক… গেল সে কিছু একটা রেকর্ড করছে। আরে এই বিবেক….
তার ডাকের রেশটা কাটেওনি, এমন সময় তার শরীরের রক্ত জল করা একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল পার্থ, একটা গম্ভীর এবং ঘড়ঘড়ে গলায়, ঠিক তাকেই যেন নকল করে ডেকে উঠল, “বিবেক… এএএএএএই বিবেক….!”
পার্থ ভয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের বাঁ-পাশটা চিনচিন করে ব্যথা শুরু হয়ে গেল।
তাহলে কী আজই সেই দিন… আজই কী সে দেখা পাবে এমন কিছুর যা দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ কুসংস্কার, গুজব এসব বলে উড়িয়ে দেয়… তবে কী?
নিজের মনে এসবই ভাবছিল পার্থ, এমন সময় ঠিক কয়েক হাত দুরেই একটা অবয়ব একটা চওড়া কবরফলকের পাশ থেকে বেরিয়ে এল।
একটা বুক ফাটা আর্তনাদ করে পার্থ উলটো দিকে ফিরে উর্ধশ্বাসে পালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে একহাত দূরে ছিটকে পড়ে গেল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হ্যাচড় প্যাঁচড় করে আবারও ফিরে তাকাল।
দৈতাকৃতি অবয়বটা ছুটে আসছে ওর দিকে, তার সারা শরীর সাদা, মুখটাও সাদা, কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। মাথা থেকে লম্বা চুল নেমে এসেছে ওর মুখে, আর চাঁদের আলোয় ওগুলো কী দেখা যাচ্ছে, ওগুলো কী নখ? এত লম্বা আর ধারালো… এগুলো যদি একবার…
কথাটা ভাবতে ভাবতেই শয়তানটা ছুটে এল ওর দিকে….
“বাঁচাও! বাঁচাও আমায়… মরে গেলাম! বাঁচাও!” অন্ধকার রাত বিদীর্ণ করে চিৎকার করে উঠল পার্থ।
শয়তানটা বুঝি এখনই এসে ওর বুকের ওপর বসে পড়বে! দু-চোখ বন্ধ করে পার্থ নিজেকে দুর্ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়েছিল, চারদিকটা হঠাৎই যেন শান্ত হয়ে পড়ল….
একটা বিচ্ছিরি হাসির শব্দে চোখ খুলে পার্থ অবাক…. বিরাট সেই শয়তান চুপচাপ বুকের কাছে হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে ওর পায়ের কাছে, আর একটু দূরে বিচ্ছিরি গলায় হাসছে বিবেক! আর ওর হাতে ক্যামেরা দেখে বোঝাই
“ওহ… ভাই রে ভাই! কী দারুণ রেকর্ডিং হল। জাস্ট ফাটাফাটি।” বলতে বলতে এগিয়ে এল বিবেক।
পার্থ বোকার মতো একবার বিবেকের দিকে আর একবার লম্বা সেই অবয়বটার দিকে দেখতে থাকল।
“আরে দেখছিস কী বোকা? ওঠ ওঠ! আরে… এই লোকটাকে দেখে ভয় পাচ্ছিস? এ তো আমাদের বাড়ির দারোয়ান রিঙ্কু।”
পার্থ দেখল ওর পায়ের কাছে দাঁড়ানো অবয়বটা মাথা থেকে পরচুলোটা খুলে এখন ওর দিকেই তাকিয়ে হাসছে। হ্যা, রিঙ্কুই তো। রিঙ্কু শেরপা। বয়সে প্রায় ওদেরই মতো কিন্তু বেশ লম্বা চওড়া, তার হাসিটা অবশ্য একটু ম্লান, যেন পার্থর অবস্থা দেখে তার একটু যেন খারাপ লাগছে।
“আরে ভাই, ভূত প্রেত বলে সত্যিই কিছু হয় না, আর আমি সত্যিই আমার চ্যনেলের সব ভিডিওগুলোতে কারচুপি করি, নাহলে তুই নিজেই বল না? ভূতের দেখা পাব, তার ভিডিও করে নিয়ে চলে যাব, আর সে আমায় ছেড়ে দেবে?”
কথাগুলো বলে আবারও হাসল বিবেক। পার্থ আর কী করে? কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে জামা-প্যান্ট ঝাড়তে লাগল।
“ভাই, ওহ তুই যে ভাবে পালালি, আর রিঙ্কু যেভাবে তোকে তাড়া করল সেটা এত সুন্দর এসেছে না!”
“আমি এবার বাড়ি যাব, আর ভালো লাগছে না!” পার্থ শাস্ত মুখে বলে উঠল।
কয়েকটা কবরফলকের আশেপাশে দু-চারটে বড়ো পাথর পড়ে আছে, ওর ইচ্ছা করছিল একটা তুলে নিয়ে বিবেকের মাথাটা গুঁড়ো করে দিতে, হয়তো সে কাজটা করেও ফেলত, কিন্তু রিঙ্কু আছে। সে থাকতে বিবেকের কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
“ভাই রাগ করিস না, সরি ভাই!” ক্যামেরাটা ব্যাগে রাখতে রাখতে বিবেক বলল, “আরে, বুঝিসই তো, একটু করতে হয়!”
বিবেকের কথার মধ্যেই রিঙ্কু নিজের মুখের ওপর থেকে সাদা রংটা রুমাল দিয়ে ঘষে তুলে নিল এবং গায়ে একটা জামা পরে নিল। পার্থ আর বেশি কিছু বলল না।
“কাল সকালে আমি তোকে তোর টাকাটা ফেরত দিয়ে দেব!” পার্থ কথাগুলো বলে গেটের দিকে ফিরে হাঁটা শুরু করে দিল।
“পার্থ… ভাই পার্থ!” বিবেক ডেকে উঠল, “রাগ করিস না প্লিজ! টাকা ফেরত চাই না ভাই, আচ্ছা কাল তোকে খাইয়ে দেব, যা চাইবি!”
পার্থ নির্বিকার মুখে গেটের দিকে এগিয়ে চলল, রাগে তার সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছিল, সে গরীব হতে পারে, বেঁটেখাটো চেহারার হতে পারে, তাই বলে তার সঙ্গেই এরকম ব্যবহার করবে?
“পার্থ দাদা… ও পার্থ দাদা।” এবার রিঙ্কু ডেকে উঠল, কিন্তু তার ডাকেও সাড়া দিল না পার্থ।
চোখের কোণে জল এসে গেছিল ওর। চিরটা কাল ওকে অপমান আর অবহেলা পেতে হয়েছে। আজ এত বছর পর বিবেককে পেয়ে ভেবেছিল সে একটা ভালো বন্ধু পেয়েছে। কিন্তু…
“পার্থ! এই পার্থ দাঁড়া… আমরাও ফিরব।” বিবেক তখনও ডেকে যাচ্ছে।
বন্ধুর ডাকে কান না দিয়ে চুপচাপ গেটটাকে হাতের ঠ্যালায় সরিয়ে কবরস্থানের বাইরে এসে দাঁড়ালো পার্থ, আর ঠিক তখনই, আবারও সেই গরগর শব্দটা শুনতে পেল সে। না এটা ওই শয়তান সেজে থাকা রিঙ্কুর গলা নয়, এই শব্দটা সে শুনেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে… শশাঙ্কবাবুর কুকুরদের গলা থেকে।
যে ছায়ার ভেতর মানুষটা হারিয়ে গেছিল প্রায় মিনিট চল্লিশ আগে, এখন আবার সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন শশাঙ্ক, এবং তাঁর হাতের শিকল বদ্ধ সেই বিরাট তিন কুকুর, তারা গরগর করছে, আগের চেয়ে অনেকটা জোরে ছটফট করছে ওরা। প্রভুর হাত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে ওরা, ঝাঁপিয়ে পড়তে যাইছে ওরা পার্থর ওপর।
“খুব রাগ হচ্ছে তাই না? অপমানিত বোধ হচ্ছে?” কৌতুকের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন শশাঙ্ক। মানুষটার গলায় একটা অদ্ভুত একটা আন্তরিকতা। পার্থ বুঝতে পারল লোকটা এতক্ষণ ধরে অন্ধকারে, নিজেকে আড়াল করে সমস্তটাই দেখে গেছেন। কুকুরগুলোও হয়তো তখন থেকে একভাবে দাঁড়িয়ে আছে, চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছে, আর তাই ওরা বিরক্ত হয়ে উঠেছে।
“চিন্তা করো না পার্থ! তোমাকে আমার খুউউউউউউউব পছন্দ হয়েছে, তোমার অপমানের প্রতিশোধ আমি নেব!”
শশাঙ্ক এই শেষের কথাগুলো অদ্ভুত একটা সুরে বলে উঠলেন। আগের সেই আন্তরিকতা আর নেই, কেমন যেন একটা পাগল পাগল সুর! লোকটার চোখদুটো যেন বড়ো বড়ো হয়ে গেছে… তাঁর মুখ দেখে একটাই কথা মাথায় এল পার্থর …
“পিশাচ!”
আর কিছু ভাবতে পারল না পার্থ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শশাঙ্কবাবুর হাত শিথিল হয়ে গেল এবং সেই তিন বিরাট কুকুর তীর বেগে ছুটে গেল বিবেক আর রিঙ্কুর দিকে….
ব্যাপারটা এতই আকস্মিক যে পার্থ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শশাঙ্কর হাত থেক ছাড়া পেয়েই প্রাণী তিনটে সোজা গিয়ে পড়ল বিবেক আর রিঙ্কুর ওপর। রিঙ্কু বোধহয় কিছুটা বুঝতে পেরে বিবেককে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু দুটো প্রাণীই ঝাঁপিয়ে পড়েছে রিঙ্কুর ওপর, এবং শেষের জন লাফিয়ে উঠে কামড়ে ধরেছে বিবেকের গলা।
বিবেক আর রিঙ্কুর মরণ চিৎকারে কানে তালা পড়ে গেল পার্থর। কালচে তরলে ভিজে গেছে কবরস্থানের ঘাস, এইভাবে দু-জন মানুষের ওপর আক্রমণ পার্থ আগে কখনও দেখেনি বটে, চোখের সামনে নারকীয় হত্যালীলা হচ্ছে বটে, কিন্তু…
‘ওরা কারা? ওরা তো কুকুর নয়, ওরা কারা?”
শশাঙ্কর দিকে ফিরে চিৎকার করে উঠল পার্থ। সমস্তটাই সে পরিষ্কার দেখেছে।
একটু আগেই যখন শশাঙ্ক তার পোষ্যদের মুক্ত করলেন তখন তাদের গলার শিকলগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুখ থেকে সরে গিয়েছিল সারমেয় আকৃতির মুখোশগুলোও, পার্থ ঠান্ডা রক্ত নিয়ে দেখেছিল তিন তিনটে উলঙ্গ কিশোর জ্বলন্ত চোখে, দাঁত নখ বের করে ছুটে যাচ্ছে বিবেক আর রিঙ্কুর দিকে। আর এখন ওরাই ছিঁড়ে খাচ্ছে তার বন্ধু আর বন্ধুর বাড়ির দারোয়ানটাকে।
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল পার্থর। শশাঙ্কর হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, “এবার বুঝেছি! সব বুঝেছি! এই কবরখানায় পিশাচ নেই, কিন্তু আপনি! আপনি আছেন… যে সব ছেলেরা কিডন্যাপ হয়েছে, আপনিই তাদের কিডন্যাপ করেছেন, কিডনাপ করেছেন আপনি। হ্যাঁ আপনি আপনি… আর আপনিই ছেলেগুলোকে এরকম বানিয়ে রেখেছেন… আপনি… আপনি একটা শয়তান… আপনি পাগল … আপনি সাইকো!… আপনি….!”
পার্থ কথাগুলো শেষ করার আগেই শশাঙ্কর একটা পোষ্য এসে পেছন থেকে কামড়ে ধরল পার্থর গলা।
“আরে পার্থ! তোমাকে দেখে যতটা বোকা মনে হয় তুমি ততটা বোকা নও!” কথাটা বলেই শশাঙ্ক এগিয়ে আসেন,”এই… সর… সরে যা!”
প্রভুর ধমক খেয়ে পোষ্যটা সরে গিয়ে আবার আক্রমণ করল বিবেকদের… এখন শুধু পোষ্যদের চিৎকার আর বিবেকদের গোঙানি শোনা যাচ্ছে।
“আমায়… আমায় বাঁচান! আমায় বাঁচান!” যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল পার্থ। ওর গলা থেকে নামছে গরম চটেচটে তরল।
“আমি নিশ্চয়ই তোমাকে বাঁচাব পার্থ! আমার তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে, তোমার উচ্চতা মাত্র পাঁচ ফুট দুই! একদম পার্ফেক্ট সাইজ তোমার! অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম আর একটা পোষ্য হলে ভালো হয়। আজই একটা নতুন খাঁচা এসেছে, তুমি চিন্তা করো না। আমার কাছে খুব যত্নে থাকবে তুমি!”
পার্থর মনে হতে লাগল সে হয়তো দুঃস্বপ্ন দেখছে। অনেক চেষ্টা করল ছিটকে উঠে দাঁড়ানোর, কিন্তু ওর শরীরটা ধীরে ধীরে অবশ হয়ে এল… চোখের সামনে নেমে এল অন্ধকার…
