(ষষ্ঠ অধ্যায়) বলিদান
প্রায়ান্ধকার গুহার অসমান পাথুরে মেঝের ওপর পা পিছলে ইরা আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল।
সাদা চুলের মহিলা তার পাশে এসে বসলেন— তার ডান হাতটি নিয়ে ধরে রাখলেন নিজের হাতে, “কী সুন্দর হয়ে উঠেছিস তুই, মা!”
তাঁর চোখ দেখে তাকিয়ে ইরার মনে হল, যেন বর্ষায় সময়ে কূল ছাপিয়ে ওঠা দুটি নীল হ্রদের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
সে বলল, “রাজা বলেছিলেন, তুমি নাকি মারা গেছ, মা।”
মহিলা হাসলেন, “তাই নাকি?”
“তুমিই কি এই নীলাশা দ্বীপের ডাইনি?”
“তা বলতে পারিস।”
“তুমি কল্মষেশের পূজা করো?”
তাঁর মুখের কোমলভাব এক নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চাপা গর্জন করে তিনি বললেন, “এই কথাটিও তোকে রাজাই বলেছেন নাকি?”
তাঁর ক্রুদ্ধ দুই চোখে যেন নীল আগুন জ্বলে উঠল। ইরা মৃদুস্বরে বলল, “হ্যাঁ।”
ডাইনির কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল গুহার অন্ধকার প্রস্তরগাত্রে, “এ-কথা বলার জন্য ওর যেন নরকেও ঠাঁই না হয়। অমরত্ব পাওয়ার লোভে ঐ অপদেবতাকে নিজের প্রিয়জনের রক্ত দেব, এতটা অধঃপতন আমার হয়নি এখনও। আমি তোর বাবার মতো নই, ইরা। আমি কল্মষেশের উপাসনা করি। আমার যারা কাছের মানুষ, তাদের আমি ভালোবাসি। তাদের ক্ষতি করার চিন্তা আমার স্বপ্নেও আসে না।”
ইরার মনে হল, বিপুল মিথ্যার এক পর্বত যেন তার মাথার ওপরেই ভেঙে পড়ছে, আর তার চাপে সে পিষে শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ডাইনি বলল, “জীবনে আমিও কম ভুল করিনি রে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ভুলটা বোধহয় ছিল তোর বাবাকে ভালোবাসা। লোকটা এত চতুর যে কোটা তার মুখ, আর কোনটা মুখোশ, কোনোদিন বুঝে উঠতেই পারলাম না।”
সবকিছুরই দুটো দিক থাকে। মনে পড়ে গেল ইরার।
“তাঁর কাছে দূত পাঠিয়ে আমি তাঁকে তাঁর প্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। রাজা কথা দিয়েছিলেন, তোর কুড়ি বছর বয়স হলে তোকে তিনি পাঠিয়ে দেবেন আমার কাছে। সেই দূত আজও ফেরেনি। এখন আমি অনুমান করছি, তোর বাবা তাকে মেরে ফেলেছেন। আমার অনুগত একদল সমুদ্র-জীবকে আমি পাঠিয়েছিলাম তোদের স্বাগত জানিয়ে এই দ্বীপে নিয়ে আসতে। একটু আগে জানতে পারলাম, তুই-সহ জাহাজের সব সৈনিককে ভুল বুঝিয়ে তাদেরকেও মেরে ফেলেছেন তিনি।
রাজার কক্ষের মধ্যে সেই মাছের ফুলকোওয়ালা অদ্ভুতদর্শন মরা প্রাণিটা। ওটাকে দেখিয়েই তিনি আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে নীলাশা দ্বীপের ডাইনি তাঁকে মারতে চায়। আর আজ সকালে জাহাজের ওপর ঐ যুদ্ধটা। রজনীশরূপে তিনিই তো সবাইকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলেন যে ঐ প্রাণীগুলো আমাদের শত্রু।”
লজ্জায় মুখ নীচু করল ইরা, “মা, আমি… আমি বুঝতে পারিনি।”
“তুই লজ্জা পাস না। আমি তো এতদিন ধরে এত সব কঠিন মায়াবিদ্যার চর্চা করছি। দেব-দানবের অসাধ্য সব মায়া আয়ত্ত করেছি। তবু ঐ লোকটার মিষ্টি মিষ্টি কথার ফাঁদে কী আমি নিজেই পড়িনি? একবারের জন্যও বুঝতে পারিনি, ও আমাকে ব্যবহার করতে চাইছে। তুই যদি ওকে বিশ্বাস করে থাকিস, সে-জন্য তোকে আমি একটুও দোষ দেব না।”
“তোমাকে বাবা ব্যবহার করেছে? কীভাবে?”
ক্লান্তভাবে তার দিকে তাকাল নীলাশা দ্বীপের ডাইনি, “তুই বোধহয় নিজের মধ্যে খুব একটা মায়াশক্তি ধারণ করিস না, তাই না?”
ইরা স্বীকার করল, “না, মা।”
“নইলে তুই নিজেই বুঝতে পারতিস। এই দ্বীপ হল কল্মষেশের মতো অপদেবতার উপাসনা করার আদর্শ জায়গা। এই দুর্লভ নীল বালি, নদীর স্বচ্ছ জল, আর সমুদ্রের নোনা জল, এই তিনটে জিনিস একসঙ্গে লাগে ঐ অশুভ শক্তির পুজোয়। তোর বাবা যখন প্রথম এই দ্বীপে এল, তখন একবার দেখেই সে বুঝে ফেলেছিল, এই পরিবেশ তার খুব কাজে লাগবে। কিন্তু কল্মষেশের উপাসনার প্রথম নিয়ম হল, উপাসকের নিজের জমি ছাড়া অন্য কোথাও তার পুজো করা যায় না। তাই আমার প্রেমে পড়ে যাওয়ার অভিনয় শুরু করল লোকটা। ও খুব ভালো করেই জানত, আমার বিরুদ্ধে মায়াশক্তির লড়াইতে নামলে ও পারবে না। আমার নিজের মায়াবী রক্ত যার শরীরে বইছে না, এমন কেউ আমাকে কোনোদিন মারতে পারবে না। আমিও কত বড়ো বোকা ছিলাম, ভাব একবার। ঐ লোকটার সুন্দর মুখ দেখে আর মিষ্টি কথা শুনে আমিও তার প্রেমে পড়ে গেলাম।”
“তারপর?”
“তারপর তুই এলি আমার কোলে। ও বলেছিল, তোর বয়স কুড়ি হওয়া পর্যন্ত ও তোকে নিজের কাছে রাখতে চায়। আমিও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কেন জানিস? তুই যখন জন্মালি, তখন একটা ভবিষ্যদ্বাণী হয়েছিল।”
“রাজজ্যোতিষী করেছিলেন?”
তার মা হাসলেন, “না রে, বোকা মেয়ে। সে এক বিরাট ব্যাপার হয়েছিল। নীলাশা দ্বীপের আকাশ কেঁপে উঠেছিল দৈববাণীর কণ্ঠস্বরে। সে বলেছিল, বড়ো হলে লোকে তোকে ‘লৌহহৃদয়’ নামে জানবে। কোনো এক মায়াযুদ্ধের ক্ষেত্রে অসাধারণ বীরত্বের পরিচিয় দিবি তুই। আর তোর একুশতম জন্মদিনে তোরই কোনো এক সিদ্ধান্তে এক অমর ব্যক্তির ভাগ্যনির্ধারণ হবে।”
ইরা থমকে গেল। একুশতম জন্মদিন!
তার মায়ের মুখে একটু দুঃখের হাসি ফুটে উঠল, “মনে আছে রে আমার। মা-রা কী মেয়ের জন্মদিন ভুলতে পারে কখনও?”
“বাবারাও কী পারে?”
রাজা বেরিয়ে এলেন অন্য এক সুড়ঙ্গপথের মুখ থেকে। তাঁর হাতের স্বর্ণাভদণ্ড তাক করা আছে দুই মহিলার দিকে।
নীলাশা ডাইনি মুখোমুখি দাঁড়াল তাঁর, “এখানে এসেছ কেন তুমি? আমার এই দ্বীপে তোমার ঐ অশুভ দেবতার পুজো কোনোমতেই করতে দেব না, মনে রেখ সে-কথা।”
রাজা তাঁর স্বর্ণদণ্ড ইরার উদ্দেশে একবার আন্দোলিত করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে পারল, তার হাতগুলো হঠাৎ অসাড় হয়ে গেছে। রাজার দিকে তরবারি নিয়ে ছুটে যেতে চাইছিল সে, কিন্তু তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর তার মস্তিষ্কের কথা শুনছে না। মনে হচ্ছে যেন কোনো অদৃশ্য বন্ধনে তার সারা শরীর বাঁধা পড়ে গেছে। মায়ের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, রাজার মায়ায় তারও একই দশা হয়েছে।
পায়ে পায়ে তার দিকে এগিয়ে এলেন রাজা, “জন্মদিনের শুভেচ্ছা তোমাকে, কন্যা।”
ঘৃণাভরা চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল ইরা। তিনি বললেন, “ইরা, আমি চেয়েছিলাম তোমাকে এখানে নিয়ে আসতে। তাই জাহাজে যখন ঐ লোকটা তোমায় ‘ডাইনি’ ভেবে বিষ খাওয়াতে চেয়েছিল, তাকে আমিই ধরে ফেলেছিলাম। এখানে আমার এমন একটা কাজ করে দিতে হবে তোমায়, যে কাজ অন্য কারও দ্বারা হবে না।”
ইরা দেখল, তার জিভ এখনও নাড়াতে পারছে সে। সে বলল, “কী কাজ?”
“এই দ্বীপটা আমার চাই। আর এর অধিকারী হতে গেলে এই ডাইনিকে মেরে এর মায়াবী রক্ত একটা জন্তু আর এক মায়াহীন সাধারণ মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশিয়ে আমার উপাস্য কল্মযেশকে উৎসর্গ করতে হবে। তাহলে আমার প্রভু কল্মষেশ আমাকে এখানেই অমরত্ব প্রদান করবেন, আর আমিও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এখানে তাঁর একটি মন্দির নির্মান করব। সমস্যা হল, আমি নিজে ওকে মারতে পারব না। ওরই রক্ত শিরায় বইছে, এমন কেউ ছাড়া কেউ ওকে মারতে পারবে না। সেই জন্যই তো এতদিন লালন পালন করে, এত যুদ্ধবিদ্যা শিখিয়ে বড়ো করে তুললাম তোমাকে।”
ইরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
রাজা আবার বললেন, “বুঝতে পারছ না এখনও? নয়তো এই ডাইনির সঙ্গে প্রেমে পড়ার কী-ই প্রয়োজন ছিল আমার?”
নীলাশা ডাইনি স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে, “ভালোবাসা নয়- শুধুই প্রয়োজন, না?”
তার কথার উত্তর না দিয়ে ইরার দিকে তাকিয়ে রাজা বলে চললেন, “আমার দরকার ছিল ওর গর্ভে আমার একটি সন্তান, মানে, তোমাকে। এই দ্বীপ আমার হবে যদি ও তোমার হাতে মরে। সেই জন্যই গতবার দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার আগে বজ্রধাতুর এই তরবারি ওর কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। যাও, এবার পিতার প্রতি তোমার কর্তব্য পালন করো, কন্যা। এই ডাইনির বুকে বসিয়ে দাও তোমার তরবারি, আর ওর হৃৎপিণ্ড ফাটিয়ে বেরিয়ে আসা রক্ত পড়ুক এই স্বর্ণপাত্রে।”
নীলাশা দ্বীপের ডাইনি দাঁড়িয়ে আছে পাথরের অনড় মূর্তির মতো। তার পায়ের কাছে একটা বড়ো স্বর্ণনির্মিত গোলাকার পাত্র নামিয়ে রাখলেন রাজা।
ডাইনি বলে উঠল, “তুমি জানো, আমার শরীরে কোনো অস্ত্রের আঘাত লাগে না।”
রাজা মিষ্টি হাসি হাসলেন, “জানি, শুধু দুর্লভ বজ্রধাতুর অস্ত্র ছাড়া। তোমার মেয়েও তোমার এই গুণটি পেয়েছে। কিন্তু চিন্তা কোরো না – আমাদের মেয়ে যখন তোমার ঐ মায়াবী তরবারি ধারণ করে, তখন পৃথিবীকে হেন কোনো জিনিস নেই যাকে ও দ্বিখণ্ডিত করতে পারে না। এগিয়ে যাও, লৌহহৃদয় কন্যা। তোমার কর্তব্য সমাধা করো।”
ইরা বলল, “আপনি চাইলেই আমি এ কাজ করব, আপনি ভাবলেন কী করে? আপনি কী আমাকে বাধ্য করতে পারবেন!”
রাজা যেন একটু ভাবলেন, “ঠিকই বলেছ। আমি তোমাকে বাধ্য করতে পারি না। তুমি স্বেচ্ছায় এ-কাজ না করলে আমার কোনো লাভ নেই। ভবিষ্যদ্বাণীতে তো বলাই হয়েছিল, তোমার সিদ্ধান্তেই এক অমর ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ হবে। আমি তাই তোমাকে এ-কাজে শুধু একটু উৎসাহ দিতে পারি, তার বেশি কিছু নয়।”
হাতের মায়াবী দণ্ডটি তিনি তুলে ধরলেন ডাইনির দিকে। অমনি সে যন্ত্রণাকাতর চিৎকার করে উঠল, “না, না, না।”
ইরা দেখতে পাচ্ছিল, তার মায়ের শরীর একটুও নড়ছে না বটে, কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ভেতরে ভেতরে অসহ্য কষ্ট হচ্ছে তার। মুখ বেঁকে যাচ্ছে; গলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে গোঙানির মতো একটা শব্দ। রাজা বললেন, “ইরা, তোমার মায়ের দেহে বাইরে থেকে কোনো অস্ত্রের আঘাত করা যায় না বটে, কিন্তু মায়াশক্তি দ্বারা শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলোকে যন্ত্রণা দিতে আমার খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। এই মুহূর্তে ওর দেহে কী হচ্ছে জানো? সারা শরীরে এখন জ্বলে পুড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণার একটা ঢেউ বইছে এর। আস্তে আস্তে ভেতরের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ-সহ প্রত্যেকটি অঙ্গকে এক এক করে পোড়াতে থাকবে ঐ তাপ, তবু ও মরবে না কিছুতেই।”
ইরার চোখের সামনে তার মায়ের শরীর থেকে অজস্র সরু, কালচে ধোঁয়ার রেখা বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
“আপনি একটা রাক্ষস!” চিৎকার করে উঠল ইরা। এই প্রথমবার তার তরবারি ধরা হাতটা নড়ে উঠল বহুক্ষণ পরে। রাজা হাসালেন, “এবার একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে তোমাকে, কন্যা। এই নরকযন্ত্রণা থেকে তোমার মা-কে তুমিই মুক্তি দিতে চারো। শুধু ঐ বজ্রধাতুর তরবারি ঢুকিয়ে দাও ওর বুকে। ওর হৃৎপিণ্ডের মারা-পরিপূর্ণ রক্ত এক ফোঁটা পেলেই এই দ্বীপ আমার হয়ে যাবে। কাজটা করো, তাহলে কল্মবেশ আমার সঙ্গে সঙ্গে তোমার ওপরেও প্রসন্ন হবেন। পিতাকে অমর করার জন্য এক মেয়ে তার মা-কে বলি দিচ্ছে, এমন উপহার আমার প্রভু কমবেশ খুবই পছন্দ করেন।”
ইরা তার মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার চোখ দুটিও যেন এই ভয়াবহ যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি চাইছে।
রাজা আবার বললেন, “আজ যদি কল্মবেশ ওর রক্ত না পান, তিনি ক্রুদ্ধ হবেন। আমি তাঁর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি, আমার কন্যার একুশতম জন্মদিনে তারই মা-র মায়াবী রক্ত আমি তাঁকে উৎসর্গ করব, আর মা-কে হত্যা করে সেই রক্ত আনবে আমার কন্যা নিজেই। এই প্রতিপালন করবেন তিনি। এবার কাজটা শেষ করে ফেলো, ইরা। আর দেরি নয়।”
ইরার ইচ্ছা করছিল, রাজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এখনই তাঁকে হত্যা করে, কিন্তু সে কাজ করার ক্ষমতা তার নেই। চতুর রাজা নিজের চারপাশে মায়াবী সুরক্ষার আবরণ তৈরি করে রেখেছেন তাঁর ধারেকাছে যাওয়ার সামর্থ্য কোনো মানুষের নেই। হঠাৎ ইরার মনে পড়ে গেল তার উদ্দেশে তরবারির গায়ে লেখা মায়ের চিঠির একটা বাক্য।
‘মনে রাখিস, অশুভ মায়াকে কোনো অস্ত্র দিয়ে আটকানো যায় না, তাই অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী কিছুর কথা ভেবে বার করতে হবে তোকে।’
অস্ত্রের চেয়ে শক্তিশালী আর কী হতে পারে?
তার মনে পড়ল, মা তাকে এত স্নেহ করত, তবু সে তাকে একদিন এই রাজার সঙ্গেই চলে যেতে দিয়েছিল। কেন? সে ভেবেছিল, এতে তার মেয়ে অনেক ভালোভাবে মানুষ হবে, অনেক বড়ো যোদ্ধা হবে, অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দে থাকবে। মা চেয়েছিল, সে যেন ভালো থাকে।
ভালো না বাসলে কী কেউ আত্মত্যাগ করতে পারে? মা পেরেছিল, কারণ….
একটা সিদ্ধান্ত! একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাকে। এখুনি। কেন? কেন মা করেছিল এ কাজ? কী জন্য? কারণ… কারণ মা ভালোবাসত তাকে!
তবে তাই হোক।
ইরা দেখল, তার মুখ দেখেই মা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরে গেছে মেয়ের মাথায় কী চিন্তা চলছে, কিন্তু মেয়েকে বারণ করার সাধ্য আর তার নেই। রাজা তাকে থামানোর আগেই ইরা ছুটে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার মায়ের সামনে আর বজ্রধাতুর তরবারি সে বিদ্ধ করল নিজের বুকে। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল রক্ত; সেই রক্তের বেশ কিছুটা ছিটকে পড়ল সোনার পাত্রের মধ্যে।
ইরার শিথিল দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
রাজার আতঙ্কিত “না, না!” চিৎকারটা যেন সঙ্গীতের মতো মিষ্টি লাগল তার কানে।
জগৎ-সংসার আবছা হয়ে আসছে তার দৃষ্টির সামনে। চারপাশে কী কী ঘটছে, সব যেন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তার বুক থেকে উদীর্ণ যন্ত্রণার প্রাবল্যে। তবুও একটা অদ্ভুত চিন্তা কোথা থেকে জুড়ে বসল মাথায়।
সত্যিই ‘লৌহহৃদয়’ আমি! এক টুকরো বহুধাতু বুকের মধ্যে নিয়েই মরতে হচ্ছে আজ!
ঘোরের মধ্যে সে শুনতে পাচ্ছিল বিকট, অলৌকিক সব চিৎকার। কোথা থেকে যেন বাজ পড়ল এই গুহার মধ্যে। তার শরীরের নীচে মাটি কাঁপতে লাগল। সে শুনতে পেল রাজা যেন কাতর আবেদনের সুরে কাকে বলছেন, “হে প্রভু, ক্ষমা করুন। আমার সজ্ঞানে আপনার কাছে কোনো অপরাধ করিনি।” তারপরেই তার কানে এক অপার্থিব, হিংস্র গর্জন ভেসে এল। সে নিশ্চিত জানে, পৃথিবীর কোনো জীবের কণ্ঠ থেকে এমন স্বর বেরোতে পারে না। আর সেই গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠল রাজার মরণান্তিক আর্তনাদ।
ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে তার চেতনা। ইরার মনে হচ্ছিল, রাজার বিকট আর্তনাদের সঙ্গে যেন মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন, ঝড়ের হাহাকার, আর বজ্রের নিনাদ। তারপর সেই চিৎকার ক্ষীণ হতে হতে একেবারে মিলিয়ে যাওয়ার পর তার মনে হল, দুটো শক্ত হাত যেন তার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরেছে। কে যেন তাকে বারবার নাড়াচ্ছে, আর তার নাম ধরে ডাকছে। কিন্তু আর চোখ মেলে তাকানোর ক্ষমতা তার নেই।
তারপর সব অন্ধকার হয়ে এল।
চেতনাদীপ নিভে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ইরার মনে হল, “যাক, অবশেষে শান্তিতে মরতে পারছি।”
