(শেষ কথা)
কিন্তু মরা আর তার হল না।
জ্ঞান ফেরার পর সে দেখল, সে শুয়ে আছে সমুদ্রতীরে। তার শরীরের নীচে ঝকঝকে নীল বালুকারাশি। সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। লালচে কমলা আভাময় অন্ধকার নামছে আকাশজুড়ে, আর সেই আবছা হয়ে আসা আলোয় এখনও শ্বেতশুভ্র শঙ্খচিলের দল উড়ছে ঢেউয়ের ওপরে।
মা বসে আছে তার ঠিক পাশটিতে।
পাখিগুলোকে দেখতে দেখতে মা বলল, “তুই ঠিক ধরেছিলি, ইরা। ভালোবেসে আত্মত্যাগ করার যে শক্তি, তার সামনে সব অশুভ মায়া তুচ্ছ হয়ে যায়।”
জ্ঞান হারানোর আগে পর্যন্ত কী কী ঘটেছিল, ইরার সব মনে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে বসে নিজের বুকে হাত দিল সে, আর তার পরেই চূড়ান্ত অবিশ্বাস চোখে নিয়ে সে মায়ের দিকে তাকাল।
তরবারির সেই ক্ষতস্থান কীভাবে যেন উধাও হয়ে গেছে।
মা হেসে বলল, “বজ্রধাতুর মায়া। ও দিয়ে যে-কোনো বস্তুকে যেমন আঘাত করা যায়, তেমনি যে-কোনো আঘাতকে নিরাময় করাও যায়। তুই চেয়েছিলি নিজেকে আঘাত করতে, আর তারপরেই আমি চেয়েছিলাম তোকে নিরাময় করতে। যে মায়াধর ওকে ধারণ করেছে, ঐ বজ্রধাতুর তরবারি তার ইচ্ছা পূরণ করে।”
ইরা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শঙ্খচিলগুলো ঘনায়মান অন্ধকারে সমুদ্র পেরিয়ে তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে আসছে দ্বীপ অভিমুখে। ঘরে ফিরছে ওরা।
তাদের দেখতে দেখতে সে বলল, “তুমি আমার সঙ্গে যাবে, মা?”
“কোথায়?”
“বাড়িতে।”
মা বলল, “আমার বাড়ি তো এইখানেই।”
দূরে সমুদ্রের বুকে সুনীল অন্ধকারের মধ্যে তাদের জাহাজটা নোঙ্গর করা আছে, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। তার গায়ে পড়েছে শেষ বিকেলের কমলা আভা। কিন্তু ওখানে ফিরে যেতে আর ইচ্ছা করছে না ইরার।
“মা?”
“বল্।”
“আমি যদি চিরকালের মতো রয়ে যাই তোমার কাছে? যদি আর কখনও ফিরে না যাই?”
একটু হেসে ডান হাত বাড়িয়ে মা তার কাঁধ জড়িয়ে তাকে কাছে টেনে নিল। তারা বসে রইল বিকেলের কমলা আকাশের নীচে নীলাশা দ্বীপের নীল বালুতটে। সাগরপারের হাওয়া এসে লাগছে তার চোখেমুখে। মায়ের গায়ে মাথা এলিয়ে বসে থাকতে থাকতে ইরার মনে হল, বুকের মধ্যে এতখানি শান্তি সে আগে কখনও অনুভব করেনি।
***
