দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ১
(১)
ছোটোবেলার একটা ঘটনা এখনও দগদগে দীপ্রর মনে। তখন ওর কতই বা বয়স, আর্ট কিংবা নয়। কিন্তু সেই বয়সেই ও বুঝে গিয়েছিল, ‘আমেরিকা’ শব্দটার মধ্যে রহস্য আছে। ওদের বাড়ি যে অঞ্চলে সেটা তখনও আধাশহর, আধাগ্রাম। এদিকের রাস্তায় টেলিফোন বুথ তো ওদিকেই বেগুনক্ষেত। আর একটু এগিয়ে গেলে খোলা মাঠের মধ্যে গরু চরে বেড়ায়। সেই মাঠেরই এককোণে ছাতিমগাছের নীচে একটা শীতের সন্ধ্যায় ও রবিনদাকে শিপ্রাদির গলা টিপে ধরতে দেখেছিল। দৃশ্যটার সামনে পড়ে এতটাই চমকে গিয়েছিল দীপ্র যে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয়নি ওর। যদিও শীত ‘তবু সোয়েটারের ভেতরে থাকা শরীরটা ঘামে ভিজে যাচ্ছিল দরদর করে। কিন্তু জায়গাটা ছেড়ে যেতেও পারছিল না দুর্নিবার কৌতূহলে। মনে হচ্ছিল, ওর পা দুটো যেন কেউ গেঁথে দিয়েছে মাটির সঙ্গে।
“আমাকে ফাঁকি দিয়ে আমেরিকা পালানোর প্ল্যান করেছিস?” রবিনদা প্রায় চিৎকার করে বলল।
উত্তরে শিপ্রাদি কী বলল, শুনতে পায়নি দীপ্র। হয়তো বা রবিনদা গলা টিপে ধরে রেখেছিল বলে, শিপ্রাদির গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না।
কিন্তু শিপ্রাদি কিছু একটা বলেছিল নিশ্চয়ই। নইলে রবিনদা আবারও কেন চেঁচিয়ে উঠবে, “সম্বন্ধ? আমার সঙ্গে সাড়ে তিন বছর শুয়ে তারপর তুই সম্বন্ধ দেখাচ্ছিস?”
দীপ্রর একটু অবাক লেগেছিল কথাগুলো। শিপ্রাদি নিজের বাবা, মা-র সঙ্গে শোয় না? রবিনদার সঙ্গে শোয়?
মাসখানেক বাদে শিপ্রাদির বিয়ের কার্ড বাবাকে পড়ে শোনানোর সময় মা কথায় কথায়, যেই না, ‘আমেরিকা’ শব্দটা উচ্চারণ করেছে, দীপ্রর কান্না আর বাঁধ মানল না।
“শিপ্রার বিয়ে হবে, আমরা সবাই আনন্দ করব, তুই কাঁদছিস কেন?” বাবা ওকে কোলে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“কিন্তু শিপ্রাদি বিয়ে হয়ে আমেরিকা চলে গেলে রবিনদার সঙ্গে শোবে কে? একা একা শুতে রবিনদার কষ্ট হবে, তাই না? তখন যদি রবিনদা আবার গলা টিপে ধরে শিপ্রাদির?”
বাবা দীপ্রকে কোল থেকে ফেলে দিচ্ছিল প্রায়, কথাটা শুনে। কোনোমতে সামলে নিয়ে মাটিতে নামিয়েই মায়ের সঙ্গে মিলে ম্যারাথন জেরা শুরু করল ওকে। কেন ওরকম একটা কথা বলল দীপ্র? কীভাবে বলল?
ঘন কুয়াশার জন্য রবিন দীপ্রকে দেখতে না পেলেও দীপ্র যে দেখতে পাচ্ছিল রবিন আর শিপ্রাকে, বিশ্বাস করতে চাইছিল না বাবা। কিন্তু ঘটেছিল ঠিক এটাই। হয়তো কুয়াশার একদিক থেকে দেখা যায়, অন্যদিক থেকে যায় না। কিংবা হয়তো অন্য কিছু। দীপ্র জানে না।
বিয়ের ঠিক সাতদিন আগে শিপ্রাদির লাশ যখন পাওয়া গেল ওই মাঠেরই একধারে তখনও কিছুই জানত না দীপু। কিন্তু শিপ্রাদির গলার নলি কেউ কেটে দিয়েছে শুনে, স্কুলেই বলে বসেছিল যে রবিনদার কাছে একটা দুর্দান্ত ছুরি আছে। মার্কেটে রবিনদার মুরগির দোকান, দেশি চিকেন কিংবা ব্রয়লার, বঁটিতে ধরে ঝটাঝট কেটে দিতে ওস্তাদ ছিল লোকটা। তার কাছে যে চাকু থাকবে তা আর আশ্চর্যের কী? কিন্তু দীপ্রর বলা ওই কথাটা ক্লাসেরই এক বা অনেকের সৌজন্যে ছড়িয়ে যায়। ফলে, স্থানীয় থানার মেজবাবু, ওর সহপাঠী সৈকতের বাবা, একদিন সন্ধ্যায় ওদের বাড়িতে চা খেতে চলে আসেন। চা খাওয়াটা উপলক্ষ্য, আসল উদ্দেশ্য ছিল দীপ্রকে জেরা, সেটা বোঝা যায় একটু পরেই।
ক্লাসে এখন কোন গ্রামার বই ফলো করছে জেনে নিতে নিতে তিনি দুম করে জিজ্ঞেস করে বসেন, “রবিনের কাছে ছুরি আছে সেটা তুমি জানলে কী করে?”
“আমি যে রবিনদার হাতে দেখলাম।” দীপ্র একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেও উত্তর দিল।
“কী দেখলে?” সৈকতের বাবা জিজ্ঞেস করলেন। “একটা কালো খাপে ঢাকা জিনিস বের করে হাতের চাপ দিল আর তখনই বড়ো ছুরিটা বেরিয়ে এল।”
“সেই ছুরিটা দিয়ে কিছু করল রবিন? মনে করে বলো।”
“না। শুধু হাওয়ায় উঁচু করে ধরে শিপ্রাদিকে শাসাল। বলল যে শিপ্রাদি যেন খুব তাড়াতাড়ি আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন ভুলে যায়। নইলে….”
“নইলে?”
“নইলে রবিনদার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।”
তারপরই বাবা একরকম জোর করেই সৈকতের বাবাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। আর সেখান থেকে ঘণ্টাখানেক পরে কাকু যখন বেরোচ্ছে তখন মানুষটাকে একটু অন্যরকম লেগেছিল দীপ্রর। সামনে এসে যখন দীপ্রর গাল টিপে আদর করলেন তখন কেমন একটা গন্ধ বেরোচ্ছিল মুখ দিয়ে। আর চোখগুলোও একটু লাল লাল। রাতে বাবা যখন দীপ্রকে ধরে পেটাচ্ছে আর মা কাঁদছে তখন বাবার মুখেও একই গন্ধটা পেয়েছিল দীপ্র।
“ওরা পুলিশের লোক ওদের অভ্যাস আছে। তুমি খেতে খেলে কেন?” দীপ্রকে পেটানো বন্ধ করে বেসিনে ওয়াক তুলতে থাকা বাবার দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিল মা।
“উনি পকেট থেকে বোতলটা বের করে অফার করলেন, তখন মুখের ওপর রিফিউজ করলে লোকটাকে অপমান করা হত।”
“ছাড়ো তো তোমার অপমান। বাড়ি বয়ে ঘুষ চাইতে এসেছে, তার আবার মান আছে নাকি?”
“ঘুষ না চেয়ে তোমার ছেলেকে যদি জেলে ভরে দিত, ভালো হত খুব? তার চেয়ে আমি বলব…”
“ন-বছরের বাচ্চার জেল হয় না।” মা ফোঁস করে উঠল।
“আরে বাবা হ্যারাসমেন্ট তো হয়। আর হ্যারাসমেন্ট শুধু ওরই হত না, ওর সূত্রে আমার, তোমার। হারামজাদাকে মেরেই ফেলব আজ। ওকে কে বলেছিল অন্ধকারে ওই ঘুরঘুট্টি মাঠে যেতে? আর গিয়েছিল তো গিয়েছিল, ওইসব কথা গাবানোর কী দরকার?” বাবা আবার দীপ্রর চুলের মুঠি খামচে ধরল।
“আমি বলি কী ওকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দাও।” মা বলল।
“গতবার তো তুমিই বাধা দিয়েছিলে। আমি ফর্ম এনেও জমা করলাম না।”
“ছেলেকে ছেড়ে থাকতে কোন মা রাজি হয়? কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ওকে বাড়িতে রাখার সাহস আমি দেখাতে পারব না।” মায়ের গলাটা কেমন ভেঙে গেল শেষ দিকটায়।
“এখন তো চাইলেই পাঠাতে পারব না। ওই দারোগার পারমিশন নিতে হবে। শালারা ঘুষও খাবে, আবার মাতব্বরিও করবে।”
“আমাদের ছেলেকে আমরা কোথায় পাঠাব, তার জন্য অন্য কারও পারমিশন নিতে হবে কেন?”
“তোমার ছেলে যে মার্ডার কেসের সাক্ষী হয়ে বসে আছে।” বাবা চিৎকার করে উঠল।
*****
অনেকবছর পর হোস্টেলে রাত জেগে পড়াশোনা করতে করতে দীপ্রর মনে হয় যে সেদিন সন্ধ্যায় রবিনদা আর শিপ্রাদিকে একসঙ্গে না-দেখলে ওকে বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে চলে আসতে হত না। কিন্তু রুমমেট পলাশকে গল্পটা করতেই পলাশ ওকে বলে যে ভুলটা দেখায় হয়নি, হয়েছিল দেখার পর ঘটনাটার কথা বলে ফেলায়। সামান্য কিছুক্ষণ তর্ক করে পলাশের কথা মেনে নিয়েছিল। সত্যিই তো, যদি বাবা-মাকে না বলত ঘটনাটা? যদি মুখ না খুলত স্কুলে?
ফেরার রবিন দেড়মাসের মাথায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। আর বেশ কয়েকবছর বাদে, কে জানে কেন, গলায় নিজের লুঙ্গিটা পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে জেলের ভেতরেই। খবরটা কেউ দীপ্রকে জানায়নি, খবরের কাগজের সাত নম্বর পাতায় ও একদিন তিন লাইনের খবরটা দ্যাখে। তখন দীপ্রর ক্লাস টেন বা ইলেভেন। খবরটা বারকয়েক পড়ে ওর একটা অদ্ভুত কথা মনে হয়। শিপ্রাদিকে গলা কেটে খুন করা হয়। আর রবিনও নিজের গলায় ফাঁস দেয়। তাহলে যে কণ্ঠে শব্দের বাস সেই কণ্ঠই সব নষ্টের মূল?
“তুই এত চুপচাপ হয়ে গেছিস কেন? হোস্টেলে কথা বলিস না বন্ধুদের সঙ্গে?” মা জিজ্ঞেস করেছিল একবার বাড়িতে ছুটি কাটাতে এলে।
উত্তর না দিয়ে সামনে থেকে উঠে গিয়েছিল দীপ্র। কথা বলার পরিণাম কী হয়, সে তো ও নিজের শৈশব-কৈশোর দিয়ে জানে।
“বিশেষ করে বিপদের কথা তো কাউকেই বলবি না। কারণ যাকেই বলবি সেই, অন্য পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে, বিপদ কমানোর বদলে বাড়িয়ে দেবে।” পলাশ বলেছিল।
কথাগুলো গেঁথে গিয়েছিল দীপ্রর মনে। তাই যতটুকু প্রয়োজন তার থেকে একটু কমই কথা বলত ও। আর কোনো প্রবলেমে পড়লে চুপ করে যেত একদম।
দিল্লি থেকে ব্রাসেলস-এর পথে এরোপ্লেনটা যখন এয়ার টার্বুলেন্সে পড়ে কাঁপতে শুরু করল হঠাৎ, একবার একটু ওপরে উঠে, নীচে নেমে গেল দুম করে, অধিকাংশ যাত্রীই চিৎকার করে উঠল। কাঁদতে শুরু করল অনেকে। কিন্তু প্রবলেমে পড়লে কাউকে কিছু বলতে হয় না এই বিশ্বাসে দীপ্র চুপ করে রইল একদম।
একবার শুধু আমেরিকা আর বিপদের ভেতরকার কানেকশন মনে করে হাসি পেয়ে গেল ওর।
আচ্ছা শিপ্রাদিকে তো রবিনদা আটকাতে চাইছিল, কিন্তু ও অ্যামেরিকা গেলে কার কী?
প্রশ্নটার কোনো উত্তর মনে আসার আগেই প্লেনটা দুলে উঠল ভয়ংকরভাবে। আর বাঁ-পাশের লোকটার মাথা দীপ্রর ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল।
(২)
সব বিপদই এক সময় না এক সময় ফুরিয়ে যায়। তবে কোনো কোনো বিপদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগে অনেককে শেষ করে দেয়। সুনামি হওয়ার কয়েকদিন পর চেন্নাইতে থাকা ওদের এক আত্মীয় কলকাতায় এসেছিল। গরমের ছুটি চলছিল বলে দীপ্র তখন বাড়িতেই। তো, ওর সেই কাকুর ক্যামেরায় বন্দি ছবিগুলো দেখতে দেখতে দীপ্র চমকে উঠেছিল। একদিন আগে আর পরে এমন আমূল পরিবর্তন হতে পারে একটা জায়গার? যা ছিল সুজলা সুফলা, তা এরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে? মাত্র কয়েকঘণ্টার তাণ্ডবে?
যদি প্লেনটা ভেঙে পড়ত তাহলে কয়েকমিনিটের ভেতরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হত নাকি? কিন্তু হল যে না, প্লেনের ভেতরে থাকা যাত্রীরা সবাই যে বেঁচে গেল, তার জন্য কাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ? প্লেনের ইঞ্জিনকে? প্রকৃতিকে? ভাগ্যকে? ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ? প্লেনের ইঞ্জিনকে? প্রকৃতিকে? ভাগ্যকে সবচেয়ে বেশি করে হয়তো বা ভাগ্যকেই। সে যতদিন যাকে বাঁচিয়ে রাখে ততদিন তার মরবার জো নেই।
দীপ্রর ঘাড়ে নিজের মাথা দিয়ে সজোরে গুঁতিয়ে দেওয়া লোকটার মুখ থেকে খানিকটা লালা দীপ্রর শার্টের হাতায় এসে লেগেছিল, ছিটকে। সেই সাঙ্ঘাতিক তোলপাড়ের ভেতর ব্যাপারটা খেয়াল না করলেও প্লেন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে বিষয়টা খেয়াল করে গা গুলিয়ে উঠল দীপ্রর। ও টয়লেটে যাবে বলে সিটবেল্ট খুলে উঠে দাঁড়াল।
চলন্ত একটা বিমানের টয়লেটে শার্টে লিকুইড সাবান ঘষতে ঘষতে কেমন একটা হাসি পেয়ে গেল দীপ্রর। একটুক্ষণ আগেই যেখানে বাঁচবে না মরবে ঠিক ছিল না, সেখানে একটা লোকের থুতু শার্টে লেগেছে বলে….
নিজের সিটের সামনে ফিরে দীপ্র দেখল, জানলার ধারের লোকটা গুম হয়ে বসে আছে কিন্তু মাঝখানের লোকটা নেই। বসলে আবার উঠতে হবে ভেবে, ‘আইল’ সিটের ধারে দাঁড়িয়েই এদিক ওদিক তাকাল দীপ্র। আর তাকাতেই দুটো সিট আগে, ডানদিকে, লোকটাকে গভীর চুম্বনে আবদ্ধ দেখল। ওর পার্টনার একটা নীল চোখের ফরাসি বা জার্মান সুন্দরী। দিল্লি থেকে প্লেনে ওঠার সময় মেয়েটাকে দেখেছে দীপ্র। বোর্ডিং পাস নেওয়ার লাইনে ওর জাস্ট পেছনেই ছিল। মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিল দীপ্রর অচেনা একটা ভাষায়। প্লেনে উঠে হারিয়ে গিয়েছিল, যেমন যায়। দীপ্র নিজের লাগেজ ওপরে তুলে ধারের সিটে বসে একটা ম্যাগাজিনে চোখ রেখেছিল। আর একটু পরে উঠে দাঁড়িয়েছিল মাঝখানের সিটে বসা লোকটাকে জায়গা করে দিতে। কিন্তু কোথাও তো এই লোকটার সঙ্গে ওই মেয়েটার পরিচয়ের কোনো চিহ্ন দেখেনি, যাত্রাপথে। তাহলে হঠাৎ ওর এই বাথরুমে যাওয়ার সুযোগে কী এমন ঘটল যে দু-জন দু-জনের মুখে মুখ ডুবিয়ে একেবারে অন্য একটা পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে?
হারিয়ে যাক, তলিয়ে যাক, দীপ্রর কী? বাড়ির থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, মায়ের হাতের অমৃত ভুলে বছরের পর বছর হোস্টেলের ট্যালটেলে ডাল আর কাঁটাওয়ালা মাছ খেয়ে দীপ্র একটাই জিনিস অ্যাচিভ করেছে শুধু, কয়েকটা পরীক্ষায়, ভালো কিছু নম্বর। আর সেই রেজাল্টের জোরে ও আজ পিএইচডি করতে আসতে পারছে, আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
“সারাটা জীবন তোর থেকে দূরে থাকাই আমার নিয়তি। সেই কোন ছোটোবেলায় হোস্টেলে চলে গিয়েছিলি তারপরে আর ছুটিছাটা ছাড়া বাড়িতে ফিরলিই না। আর এখন তো ফিরবি, কে জানে বেঁচে থাকব কী না।” মা কেঁদে ফেলেছিল সাতসমুদ্র পেরিয়ে চলে যাচ্ছিস, পিএইচডি কমপ্লিট করে যখন ফিরবি, কে জানে বেঁচে থাকব কী না।” মা কেঁদে ফেলেছিল দীপ্রর জন্মদিনের দিন।
দীপ্রর ইচ্ছে হয়েছিল বলে, ‘আমি তো দূরে যেতে চাইনি। তোমরাই আমায় পাঠিয়ে দিয়েছিলে হোস্টেলে। সেটা না করে যদি আমায় নিয়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে, এই বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে, তাহলে হয়তো আমার শৈশব কৈশোর বাবা মা-কে ছাড়া কাটাতে হত না।’
ইচ্ছে হলেও কথাগুলো বলেনি দীপ্র। ওর জন্মদিন বলে হাই প্রেশার নিয়েও নিজের হাতে পায়েস রেঁধে যে মা সামনে বসে খাইয়ে দিচ্ছে তাকে কোন সন্তানই বা মুখ ফুটে কথাগুলো বলতে পারে?
বাবা হাসতে হাসতে বলছিল, “আমেরিকা গেলে তো চট করে কেউ ফেরে না, ওখানেই সেটল করে যায়। তোমার ছেলেও ফিরবে কী না দ্যাখো। কে বলতে পারে, হয়তো ওখানেই কোনো মেমসাহেবকে মনে ধরে গেল আর তারপর তাকেই বিয়ে থা করে নিল।”
মা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল, “আমি আমার ছেলেকে চিনি। মা-কে না দেখিয়ে নিজের বিয়ের পাত্রী পছন্দ করবেই না ও। কী রে বাবু, তাই তো?”
দীপ্র কোনো উত্তর না দিয়ে পায়েস খাওয়ায় মন দিয়েছিল। মা যদি জানত যে এমএসসি পড়ার সময় ও কেন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাড়িতে ফিরে আসেনি, কেন হোস্টেলে থেকে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর ইউনিভার্সিটি জীবনটা ও হোস্টেলেই কাটিয়েছিল, তাহলে হয়তো ওকে সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে দু-বার ভাবত। কিন্তু দীপ্র যে ততদিনে বোবা হয়ে গেছে। নিজের কোনো দেখা বা অনুভব ও যে আর ভাগ করে নিতে পারে না, কারও সঙ্গেই। তাই সুকন্যার সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথাটা ও বাড়ির কাউকেই বলতে পারেনি। বাবা-মা তো দূর, ওর থেকে আট বছরের ছোটো বোনটাকেও নয়, যার দু-বছর বয়সে ও হোস্টেলে চলে যায়।
সেই বোন দেয়ালি, দীপ্র আর সুকন্যাকে একদিন দেখে ফেলেছিল প্রায়। একটা মাল্টিপ্লেক্সে ওরা দু-জন সিনেমা দেখতে গেছে আর সেখানেই দেয়ালিও গেছে নিজের স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে। দীপ্র খুব কম কথা বলত বলে সুকন্যা একটু বেশিই বকবক করত। আর ওর সেই কথার তোড়ের মধ্যেই দীপ্র হঠাৎ খেয়াল করে যে উলটোদিক থেকে বোন আর বোনের বন্ধুরা এগিয়ে আসছে। পলকে সরে যায় দীপ্র। কথা বলতে থাকা সুকন্যা খেয়ালও করতে পারে না প্রথমটা, দীপ্রর সেই অনুপস্থিতি। একটা বড়ো থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে দীপ্র দেখে, দেয়ালিরা কোন সিনেমার টিকিট কাটছে। পনেরো ষোলো-র মেয়েদের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসের ফলেই সিনেমার নামটা দীপ্রর কান অবধি পৌঁছে যায়। দু-মিনিট পরে বেরিয়ে এসে অন্য একটা সিনেমার টিকিট কাটে দীপ্র এবং সুকন্যাকে নিয়ে সেটায় ঢোকে।
“তুমি কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলে?” সুকন্যা অবাক হয়ে জানতে চায়।
“অসহ্য বাথরুম পেয়েছিল।” দীপ্র জবাব দেয়।
“আমাকে বলে গেলে পারতে।” সুকন্যা একটু অভিমানের গলায় বলে।
দীপ্র চুপ করে যায়। ওই বলতে পারে না বলেই তো না-বলে সরে গিয়েছিল। নইলে দেয়ালি তো ওর ছোটো বোন, অফিসের বস তো নয়। কী অসুবিধে হত তার মুখোমুখি হলে? কিন্তু ওই যে বলতে হবে, কে সুকন্যা, কী সম্পর্ক ওদের দু-জনের, কতদিন ধরে চলছে এইসব, তারপর আবার দেয়ালিকে অনুরোধ করতে হবে, মা-কে এক্ষুনি কিছু না বলার জন্য, এতগুলো কথা খরচ করার ভয়েই সরে গিয়েছিল দীপ্র। হলের অন্ধকারে সুকন্যার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে, সুকন্যার ব্রা-র ভেতর হাত ঢুকিয়ে নিজের সেই অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ দিতে চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু শরীর আনন্দের হলেও, একটা সময়ের পর ক্লান্তিকর। মানুষ তো নিজের ভালোবাসার মানুষের কথাও শুনতে চায়। একতরফা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে সুকন্যা তাই একদিন সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে গেল। আর বেরিয়ে গেল, দীপ্রকে কিছু না বলে। ইউনিভার্সিটির উলটো ফুটে চা খেতে গিয়েছিল দীপ্র। ওকে ডেকে একটা আধো অচেনা ছেলে আচমকা বলল যে সুকন্যা নাকি ঝিলের ধারের মাঠটায় সজীবের মাথা কোলে নিয়ে শুয়ে আছে। আর ওর ব্লাউজের বোতামগুলো স খোলা। কথাটা বলেই নিজের নাম না জানিয়ে ধাঁ হয়ে গেল ছেলেটা।
সুকন্যাকে সেদিন সকালে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখেছিল বলেই দোকানিকে একটা কুড়ি টাকার নোট দিয়ে, চেঞ্জ না নিয়ে, তিন লাফে রাস্তা পেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে ছুটতে ছুটতে ঝিলের ধারের মাঠটায় এসে পৌঁছল দীপ্র। আর ওই অন্ধকারেও মুহূর্তের মধ্যে দু-চোখ দিয়ে স্ক্যান করে নেয় পুরোটা। হ্যাঁ, ওই তো দুটো ছায়ামূর্তি। ওরাই নিশ্চয়ই। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওদের কাছে পৌঁছে দীপ্র শোনে, সজীব বলছে, “… ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন / থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার, বনলতা সেন।”
ওর বলা শেষ হতেই সুকন্যা ঠোঁট নামিয়ে সজিবের ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে বলে, “আর একবার বলো।” আর তখনই দীপ্রর দিকে চোখ যায় ওর।
“এগুলো কী হচ্ছে?” দীপ্র বলে।
“যা হবার ছিল, তাই। আমি একটা কথা বলতে না পারা রোবটের সঙ্গে কোনো রিলেশনে থাকতে চাই না। ইউ নো দীপ্র, তোমার জাস্ট একটা শরীর হলেই চলবে; কিন্তু আমি একটা মেয়ে তো, তাই আমার নিজের জন্য একটা ছেলে চাই, একটা মানুষ চাই।”
দীপ্র চিৎকার করে বলতে চেয়েছিল, “আমিও মানুষ। বিশ্বাস করো মানুষ আমিও।” কিন্তু সেই ছোটোবেলার অন্ধকারটা এসে ওর গলা টিপে ধরেছিল আবার।
লোকটা যখন ফিরে এল, দীপ্র নিজের সিটে বসে পড়েছে। একটা কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে দীপ্রকে পাশ কাটিয়ে নিজের সিটে বসে লোকটা হঠাৎ করে একটা চকোলেট বার দীপ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, বেলজিয়ান চকোলেট। দ্য বেস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।
দীপ্র ওর কথার উত্তরে কিছু না বলে ঘাড় নাড়ে। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের ঝকঝকে আকাশের দিকে তাকায়।
লোকটা সেই অভিব্যক্তিকে পাত্তা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, ক্যান ইউ ডু মি আ লিটল ফেভার?
(৩)
রাস্তায় বেরিয়ে একটু অবাক হল সুচন্দ্রা। যখন অফিসে ঢুকেছিল তখন চড়চড় করছে রোদ আর এখন কীরকম মেঘে মেঘে ঢেকে গেছে গোটা আকাশটা। এ-বছর খুব হচ্ছে এরকম। দুপুর বারোটায় রোদে ভেসে যাচ্ছে তো একটার সময় মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। আবার দুটোয় আকাশ পরিষ্কার। চারটের সময় ফের ঝেপে বৃষ্টি। আবহাওয়াও কী মানুষকে দেখে শিখছে? ক্ষণে ক্ষণে কীভাবে রং পালটাতে হয়, যা করবে, যা করতে যাচ্ছে, আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তার উলটো কথা বলে যেতে হয়, মানুষ না শেখালে কে শেখাল ওকে? অবশ্য হতে পারে, মানুষের বাধ্য ছাত্র হবে না আবহাওয়া। পরের বছরই আবার নিজের ধর্ম, নিজের বিশ্বাসে ফিরে যাবে, শুধু এ-বছরটা মানুষের মতো হয়ে মানুষকে বিপদে ফেলে, মজা দেখতে চাইছে।
ছাতা না নিয়ে বেরোবার জন্য নিজের ওপর রাগ হল সুচন্দ্রার। ওকে বিপদে ফেলে মজা দেখার সুযোগ ও নিজেই করে দিচ্ছে ভেবে। এই মজাটা মানুষ ওর থেকে পেয়েছে তাই আবহাওয়াকে এটা পেতে দিতে চাইছিল না সুচন্দ্রা। কিন্তু মজাটা পাবে বলেই হয়তো বৃষ্টি নামল আর আবার অফিসে ফিরে যাবে কী যাবে না ভাবতে ভাবতে সুচন্দ্রা একটা স্টেশনারি দোকানের শেডের নীচে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দেখল সামনে, ওই গাড়িবারান্দাটাকে। যেখানে এই ক-দিন আগে অবধি বৃষ্টি নামলে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু বাড়ি ভাঙা পড়ল, গাড়িবারান্দাও ঘুচে গেল তার সঙ্গে। মস্ত বড়ো মাল্টিস্টোরিড উঠছে ওখানে এখন। কত কত ফ্ল্যাট হবে সেখানে, কত মানুষ থাকতে আসবে। মানুষের থাকার প্রয়োজন এমন ভয়ংকর হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যে রাস্তাঘাটে বিপদে পড়লে মানুষেরই দাঁড়াবার মতো একটু জায়গা নেই। ওই গাড়িবারান্দায় কত লোক একটু ঘুমিয়ে নিত দুপুরে, কতজন ছাতু মেখে খেত, কত কুকুর বিড়াল বাচ্চা দিত ভেতরের এক কোণে। গেল। সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। একটা গোটা যৌথ পরিবার গন উইথ দ্য উইন্ড হয়ে গেল, ওদেরটা যেমন গিয়েছিল।
তবে ওদের বাড়ির ক্ষেত্রে কোনো প্রোমোটার ছিল না। একসঙ্গে বাস করেও মনে মনে আলাদা হয়ে থাকা সব মানুষ ছিল। সময় সুযোগ বুঝে সম্পূর্ণ বদলে গেল তারা, অকল্পনীয় আচরণ করতে লাগল। ওর বাবা যে ভাইদের বড়ো করেছেন বাবার কারখানায় লকআউট ঘোষণা হতেই তারা এমনভাবে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়াল যেন ওরা তিনশো মাইল দূর থেকে ভিক্ষে চাইতে এসেছে। যে বোনদের বিয়েতে বাবা প্রভিডেন্ট ফান্ডের শেষ কপর্দকটুকু খরচ করে ফেলেছেন, তাদের বাড়িতে গিয়ে দু-ঘণ্টার বেশি তিনঘন্টা থাকলেই তাদের চোখে ফুটে উঠতে থাকল প্রশ্ন, ‘চলে যাবে তো, নাকি থেকে যাবে বলে এসেছে?’
না, মুখে বিশেষ কিছু বলেনি কেউই। কিন্তু চড়াই পাখি থেকে মানুষ মুখে কেউ কিছু না বললেও বুঝতে পারে কে তাকে চাইছে আর কে চাইছে না। একটা কুকুরও তার কাছে গিয়েই লেজ নাড়ে যে শুধু বিস্কুট দেবে না, দেওয়ার সময় গায়ে হাত বুলিয়ে দেবে একটু। তাহলে একজন মানুষ কতবার সেখানে যেতে পারে যেখানে সে অবাঞ্ছিত? আবার একমাত্র মানুষই বোধহয় আবার ফিরে যায় সেসব জায়গায় যেখানে তাকে চায় না কেউ। কেন যায়? সুচন্দ্রা নিজে কেন গিয়েছিল, ছোটোকাকিমার মেয়ে ঝিমলি মাধ্যমিকে দারুণ রেজাল্ট করায় যে পার্টি দেওয়া হয়েছিল, তাতে? এই ঝিমলিই যখন অনেক ছোটো তখন কী একটা দরকারে ওদের ঘরে ঢুকতে গিয়ে দরজা বন্ধ দেখে সুচন্দ্রা জোরে ধাক্কা দিয়েছিল। ঝিমলি দরজা খুললে, রেগেমেগে জিজ্ঞেস করেছিল যে কেন, ভর দুপুরে দরজায় ছিটকিনি আটকে রেখেছে।
সুচন্দ্রাকে পাথর করে দিয়ে ঝিমলি জবাব দিয়েছিল, “মা বলে গেছে, ডিম খাবার সময় দরজা বন্ধ করে খেতে। নইলে তোমরা এসে চাইবে।”
সুচন্দ্রা বেশ কিছুক্ষণ থম ধরে থেকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আমরা চাইব কেন?
ক্লাস থ্রি কিম্বা ফোরে পড়া ঝিমলি জবাব দিয়েছিল, “ তোমরা এখন খেতে পাও না তো, তাই।”
ওই মুহূর্তে, ‘একান্নবর্তী’ শব্দটাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল সুচন্দ্রা। ‘একান্নবর্তী’ মানে পরিবারের সবাই মিলে একই ভাতডালতরকারি ভাগ করে নেওয়া নয়, বরং পরিবারের একটা অংশ বিপদে পড়লে তাদের ফাঁকি দিয়ে ভালোমন্দ খাওয়া। আর আজ যারা দরজা বন্ধ করে খাচ্ছে, কাল তারাই দরজা খুলে দেখিয়ে দেখিয়ে খাবে। সেই অপমানের হাত থেকে বাঁচতে গেলে এক্ষুনি পালিয়ে যেতে হবে বুঝেই ঝিমলির সামনে থেকে সরে এসেছিল সুচন্দ্রা। পরে, মেয়ের মুখ থেকে শুনেই হয়তো ছোটোকাকিমা ‘বাচ্চা মেয়ে কী বলতে কী বলেছে’, বলে ঢং করতে এসেছিল।
সুচন্দ্রার মা জবাব দিয়েছিল, “আমার মেয়েটাও বাচ্চা ছিল একদিন। কই তখন তো বেকার দেওরদের ভাগ না দেওয়ার জন্য দরজা বন্ধ করে ডিম খেতে হয়নি। মা বাবা যা শেখায় না, বাচ্চারা তা শিখবে কেমন করে?”
তারপর থেকে ছোটোকাকিমার সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সুচন্দ্রা পরে বুঝেছে, শুধু ঝিমলির মা নয়, ঝিমলির বাবাও তাই চাইছিল কারণ ছোটোকাকুরা ভয় পেয়েছিল, যদি ওদের খাওয়াপরার দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু বুঝতে পারেনি ওদের পুরোনো বাড়ি বিক্রিবাটা হয়ে যাওয়ার পর, ভাই-ভাই, ঠাঁই-ঠাঁই হয়ে যাওয়ার পর থেকে যাদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্কই ছিল না প্রায়, তারা নেমন্তন্ন করা মাত্রই সেই নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যেতে হবে কেন।
“না গেলে ভাববে, হিংসে থেকে যাচ্ছিস না।” মা বলেছিল।
“একটা হাঁটুর বয়সী মেয়েকে হিংসে করতে যাব কোন দুঃখে? সে ভালো রেজাল্ট করল না ফেল করল, কী এসে যায় তাতে?” সুচন্দ্রা অবাক হয়েছিল মায়ের কথা শুনে।
“এসে যায়। সম্পর্ক নেই বললেই তো সম্পর্ক চলে যায় না। লোকজনের চোখে থাকে, সমাজের চোখে থাকে।” মা জবাব দিয়েছিল।
সেই সমাজ, সেইসব লোকজনকে অস্বীকার করতে না পেরেই সুচন্দ্রা গিয়েছিল ছোটোকাকিমার নতুন ফ্ল্যাটে। আর যাওয়ার পর অনেক নকল ভালো ব্যবহার, মিথ্যে মিষ্টি কথা শুনতে শুনতে ও আবিষ্কার করেছিল ভেতরের সেই খারাপ লাগাকে, ছোটোকাকুর বৈভবের পাশাপাশি নিজের স্ট্রাগল দেখে যা জন্ম নিল। ছোটোকাকিমারা তো ওর ম্যাপের বাইরে চলে গিয়েছিল, শুধুশুধু ওদের বাড়িতে গিয়ে সুচন্দ্রা নতুন করে টের পেল যে ওর জীবন ওকে সেই বন্ধ দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে যার ওদিকে কেউ ডিম খাচ্ছে। ভাগ চাওয়ার মতো ভিখিরি ও নয়, কোনোদিন ছিল না। কিন্তু অন্যেরা পাচ্ছে আর আমি বঞ্চিত হচ্ছি জানলে কার না খারাপ লাগে? সুচন্দ্রারও লেগেছিল। ও তো আর সন্ন্যাসিনী নয়।
দোকানের শেডের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে একটু ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গায়ে গা ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। একবার ঠেকালও। সুচন্দ্রা মুখ ঘোরাতেই চোখ নামিয়ে সরে দাঁড়াল একটু। সুচন্দ্রা বিরক্ত হলেও, রেগে গেল না। ওর কেমন ওই লোকটাকেও বঞ্চিত বলে মনে হল। নারীশরীরের প্রতি পুরুষের যে আদিম টান সেই টান মেটাবার মতো সাধ্য হয়তো লোকটার নেই। বাড়িতে বউ নেই আবার বাজারে গিয়ে মেয়ে কেনার টাকা বা সাহস নেই। কিংবা হতেই পারে দুটোই আছে তবু…
এই দৃষ্টিভঙ্গিই সর্বনাশ করে ওর। সুচন্দ্রা জানে। তবু যেখানে খিস্তি করে ধুইয়ে দেওয়া উচিত সেখানেও বিশেষ কিছু বলে উঠতে পারে না ও। তাই হয়তো ওর যতটা পাওয়ার তার থেকে অনেক কম পায়। ঠকে যায় প্রতি মুহূর্তে। তবু রক্তের মধ্যে এমনভাবে মিশে গেছে এই ব্যাপারটা যে চাইলেও খুব বেশি জঙ্গি হতে পারে না। ঠাকুমা খন ছিল, বলত, “ঘটি ঠুকলে আওয়াজ হবে, আমার এই নাতনিটাকে ঠুকলে আওয়াজ হবে না।”
ঠাকুমা চলে গেছে আজ অনেকদিন। সর্বত্রই প্রতিবাদের আওয়াজ এখন অনেক বেশি। তবু সূচঞ্জার মনে হল, এমন কেউ আছে নিশ্চয়ই, যে ওর এই মুখ বুজে চলার অভ্যেসটাকে দুর্বলতা নয় আভিজাত্য হিসাবে দেখবে। আচ্ছা, ও যে ভদ্রমহিলা সেদিন ঝুমাদির বিয়েতে যেচে আলাপ করলেন। মোবাইল থেকে একটা ছেলের ছবি দেখিয়ে বললেন, “ওর নাম দীর্ঘ। আমার ছেলে। আগামী সপ্তাহে আমেরিকা চলে যাচ্ছে রিসার্চ করতে। ওর জন্য তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”
তিনি কী ইয়ার্কি মারছিলেন না সত্যিই ছেলের বউ করতে চান সুচন্দ্রাকে। চাইলে ছেলে অ্যামেরিকা যাওয়ার আগে, ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে একবার এলেন না কেন ওদের বাড়িতে? সুচন্দ্রার যে ওনার ছেলেকে পছন্দ হয়েছে তা মুখে বলতে না পারলেও সুচন্দ্রা ফেসবুকে দীপ্রকে ফ্রেণ্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে।
(৪)
ছোটো থেকে খুব স্মার্ট আর অ্যাট্রাকটিভ বলে মধুরার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে দুর্দান্ত কোনো পাত্র এসে ওকে পক্ষীরাজে চড়িয়ে বের করে নিয়ে যাবে রামকালীতলার ওই গলি থেকে। কিন্তু ওর কপালে ঝঞ্ঝাট লেখা ছিল। নইলে বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় যখন ওর হাত-দুটো নিজের একটা হাত দিয়ে পিছমোড়া করে রেখে এলাকাবিখ্যাত মন্টু মাস্তান সিঁদুর দিয়ে দিল ওর সিঁথিতে তখন পাড়ার একটা লোকও কিছু বলল না কেন? মন্টু ডেঞ্জারাস ছিল সত্যি কিন্তু ও তো আর রিভলভার নিয়ে আসেনি, মধুরাকে সিঁদুর দিতে। পরে ঘটনাটার কথা ভাবলে মধুরার মনে হয়েছে যে পাড়ার লোকরা খুশিই হয়েছিল ওর ওই হেনস্থা দেখে। দেখতে সুন্দর, মুখে মুখে কথা বলতে পারে, পড়াশোনাতেও ভালো, এমন একটা মেয়ের জায়গা ছিল না। ওদের ওই এঁদো গলিতে। যে মেয়েরা রাস্তার কলে জলের লাইনে দাঁড়ানো আর হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করতে না করতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসাটাকেই ভবিতব্য বলে জানত তাদের ভিড়ে নেহাতই বেমানান ছিল ও। তাই সমবয়সীদের এবং তাদের বাবা মা-দের হিংসার পাত্রী ছিল মধুরা। সেই হিংসার পাত্রী জনসমক্ষে অপদস্থ হচ্ছে দেখলে, কে না খুশি হবে?
বাড়ি ফিরে ব্যাপারটাকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিল মধুরা। শ্যাম্পু করে মাথা থেকে সিঁদুর ধুয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সেই রাতে বুঝতে পারেনি যে ঘটনা ঘটা যতটা সহজ, মুছে ফেলা ততটা নয়। বুঝতে শুরু করেছিল, পরদিন থেকেই। ওকে দেখলেই কানাকানি, ফিশফাশ কিংবা ‘অ্যাই মন্টুর বউ’ ডাক, শুরু হয়ে গেল যখন।
স্কুল খোলার পর ব্যাপারটা বাড়ল। ওর নামে, দিদিমণিকে নালিশ করতে গিয়ে একটা মেয়ে বলল, “মন্টুর বউ না আমায় মেরেছে, আমি ওকে, “সিঁদুর খেয়েছে ইঁদুর’ বলেছিলাম বলে”, আর দিদিমণি মেয়েটাকে বকার বদলে হেসে উঠলেন, জোরে। সঙ্গে হেসে উঠল গোটা ক্লাস— মধুরা ছাড়া। তবু দাঁতে দাঁত চেপে ছিল মধুরা, কিন্তু কানাইদার দোকানে যেদিন ওই ছবিটা লাগল, সেদিন আর পারল না।
“এটা কী হল, কানাইদা?” চিৎকার করে উঠেছিল স্কুল ফেরতা পথে।
“কী আবার হবে, দেখতেই তো পাচ্ছিস একটা ছবি লাগিয়েছি।” কানাই নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল।
“কিন্তু, কিন্তু…” গলা বুজে গিয়েছিল মধুরার। আর ঝাপসা হয়ে আসা চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছিল সেই ছবিটা যেখানে মন্টু মধুরাকে প্রায় জাপটে ধরে ওর মাথায় সিঁদুর ঘষে দিচ্ছে। দশমীর সিঁদুরখেলার ছবি তুলতে প্রতিবারই ক্যামেরা নিয়ে আসত ফটোগ্রাফার কানাই আর সেবার সিঁদুরখেলার পাশাপাশি ‘সিঁদুরদান’-এর ছবিও তুলে ফেলেছিল। শুধু তুলেই ক্ষান্ত হয়নি, নিজের দোকানের বাইরে লাগিয়েও দিয়েছিল ছবিটা আর লাগাবার কারণ হিসেবে বলেছিল যে লোকে খুব খাচ্ছে।
মধুরার মনে হয়েছিল, ওকেই খাচ্ছে প্রত্যেকটা লোক। কামড়ে, ছিঁড়ে, চিবিয়ে। আর এমন একটা লোক কোথাও নেই যে ওকে বাঁচাবে। ওর বাবা কানপুরে চাকরি করে আর ন-মাসে, ছ-মাসে বাড়ি আসে একবার। এলেও কোনো ঝামেলায় বিশেষ একটা জড়াতে চায় না শুধু কয়েকদিন ‘রেস্ট’ নিয়ে আবার কানপুরে ফিরে যায়। আসলে ওই চাকরি বাবার মজ্জা অবদি শুষে নিয়েছে বলে লোকটার অবশিষ্ট কিছু নেই। প্রেম, ভালোবাসা কিংবা সাহস কিছুই না। আর মা ওদের দুই বোনের পর ছেলের আশায় আবারও কনসিভ করে কীসব কমপ্লিকেশনে মরতে বসেছিল। শেষমেশ বাড়ি ফিরে এল কিন্তু ছেলে হয়ে মরে যাওয়ার মানসিক যন্ত্রণা মায়ের শরীরটাকে আর সারতেই দিল না। মাথা ধরা, পেটে ব্যথা, গা গোলানি একটা না একটা কিছু লেগেই থাকত। মধুরার সঙ্গে কে কী করেছে, সেই খবরটা কানে যেতেই মা বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে পড়ে খেল তিনবার, দু-বার বুকে হাত চেপে ধরে বোঝাতে চাইল ভীষণ ব্যাথা হচ্ছে। সেই সময়, মধুরার দিদি মন্দিরার ভূমিকা ছিল আরও চমৎকার। যে বোনের সঙ্গে রূপে-গুণে কোনোদি এট উঠতে পারেনি, তার ওপর পৃথিবীর সব প্রতিশোধ একবারে নেওয়ার ওটাই সঠিক সময় বলে মনে হল ওর। মন্দিরা তাই ঘুরে ফিরে দুটোই কথা বলতে থাকল মধুরাকে, “আমালে বংশের কোনো মেয়ে এমন একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসবে, ভাবাও যায়নি,” আর “মায়ের যদি কিছু হয়ে যায় তার জন্য কিন্তু শুধু তুই দায়ী থাকবি….।”
একবার একটা উইকএন্ড পার্টিতে কেউ কাউকে ‘সুইসাইড’ করার কথা বলছে শুনে মধুরা হেসে ফেলেছিল। সুইসাইড করার কথা মানুষ কখন ভাবে ওরা সত্যি জানে? মধুরা জানে। কারণ ও ভাবত। স্কুল থেকে ফেরার পথটা যখন কানাইয়ের ফটো তোলার দোকানের সামনে থমকে দাঁড়াত, তখন প্রতিদিন ভাবত। আর সেদিনই করে ফেলবে এমন একটা জেদ নিয়ে বাড়ির কড়া নাড়ত। মা দরজা খুলে দিতে দিতে, ‘মুখপুড়ি’, ‘বংশের মুখে কালি দিয়ে এসেছে’ ইত্যাদি কত কথা শোনাত ওকে, কিন্তু মধুরার খুব কিছু আসত যেত না। কারণ ও তো ঠিকই করে রেখেছে যে মরবে। ওই মরবার সঙ্কল্প নিয়েই ও একটা ব্লেড লুকিয়ে নিয়ে কলঘরে যেত কিন্তু শেষ অবধি কিছুতেই হাতের শিরা কেটে উঠতে পারত না। আর না পেরে মাথা নীচু করে যখন বেরোত কলঘর থেকে তখনই শুরু হত ভয়। কীভাবে কাটবে সন্ধ্যা থেকে রাত্রির এই ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ড? ঘুম আসুক, না আসুক বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত কীভাবে ফেস করবে ও নিজের মা, নিজের দিদি, ওকে নিজের মনে করে জ্ঞান দিতে চলে আসা পাড়াতুতো কাকিমা জেঠিমাদের? মধুরা প্রথম প্রথম কথার পিঠে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করত যে ওর কোনো দোষ নেই ব্যাপারটায়, কিন্তু তাড়াতাড়িই বুঝে গিয়েছিল যে ওতে ঝামেলা আরও বাড়ে। বিপদে পড়া মেয়ের মুখে যুক্তির কথা শুনতে চায় না লোক, চায় মেয়েটা কাঁদুক। তবে না সিমপ্যাথির জোয়ার আসবে। সেই সিমপ্যাথি আদায়কে ঘেন্না করত মধুরা, ঘেন্না করত অন্য মেয়েদের মতো হুটহাট কেঁদে ফেলাটাকে কারণ যারা কাঁদে তাদের থেকে সাহস যে বরাবরই একটু বেশি ওর। সেই সাহসে ভর করে ও একদিন সেই ক্লাবে চলে গিয়েছিল যেখানে মন্টু ক্যারাম খেলে। শীতের বিকেল, সন্ধে নেমে এসেছে আগেই, মধুরা স্ট্রেট মন্টুর সামনে গিয়ে বলেছিল, “ তুমি কী হিজড়ে নাকি পুরুষমানুষ?”
চমকে গিয়েছিল মন্টু। প্রায় পনেরো সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারেনি। তারপর জিজ্ঞেস করেছিল, “কী বলতে চাইছ?”
“যদি পুরুষ হতে সত্যি করে তাহলে যে মেয়েটার মাথায় সিঁদুর দিয়ে এসেছ সবার সামনে, তাকে সারা দুনিয়ার লোক টিটকিরি দিচ্ছে দেখলে কিছু করতে, ভেড়ুয়ার মতো ক্যারাম পিটতে না।” বলেই ক্লাব থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল মধুরা, পেছন ফিরে তাকায়নি আর।
পরদিনই কানাইদা দোকান থেকে ওই ছবিটা নামিয়ে ফেলেছিল আর সপ্তাহখানেকের মধ্যে পাড়ার লোকের টিটকিরিটা একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্কুলের ব্যাপারটা আরও মজার। যে দিদিমণি মধুরাকে, ‘সিঁদুরওয়ালি’ বলে ডাকতে শুরু করেছিলেন, রাস্তায় বাইক দাঁড় করিয়ে দুটো ছেলে, তাকে ‘মিষ্টি’ করে কিছু বলে যাওয়ার পর, তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়েছিলেন যাতে স্কুলে আর কেউ কিছু না বলে মধুরাকে। মধুরাদের বাড়িতেও এসেছিল মন্টু। আর মন্দিরাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মধুরার সঙ্গে থাকতে ওর কোনো অসুবিধে আছে কী না। মন্দিরা সেদিন সন্ধে থেকেই, ‘বোন, আমার বোন’ বলে ঢলে পড়তে শুরু করে মধুরার গায়ে। মা অবশ্য মাঝেমাঝেই ‘মুখপুড়ি’ কিম্বা অন্য কিছু বলে গাল পাড়ত মধুরাকে কিন্তু মা-কে মন্টু ঘাঁটাক, মধুরা চায়নি।
আসলে ও শুধু চেয়েছিল আগের মতো নিশ্চিন্তে দম নেবার পরিসর আর সেটা ফিরে পেতে গিয়ে মধুরা আবিষ্কার করেছিল যে ন্যায়-অন্যায় কোনো ফ্যাক্টর নয়, আসল জিনিস হল পাওয়ার। আর সেই পাওয়ারের গুডবুকে থাকার জন্য নিজেকে ‘লয়াল’ প্রমাণ করতে হয়। মন্টু বিশ্বাস করত যে মধুরা ওর প্রতি হান্ড্রেড পারসেন্ট লয়াল। আর সেই বিশ্বাস থেকেই ছেলে দেখে মন্দিরার বিয়ে দেওয়া থেকে মা মারা যাবার পর শ্রাদ্ধশান্তির পুরো দায়িত্ব নেওয়া মায় হাফ দামে হাওড়ার ওই ফ্ল্যাট কিনিয়ে দেওয়া অবধি অনেক কিছু করেছে ওর জন্য মন্টু। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই আরও অনেক কিছুই করত। কিন্তু কেউ যদি মাতাল অবস্থায় চলন্ত ট্রেন থেকে নীচে পড়ে যায় তাহলে আর কী করার? মন্টুর ছবিতে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে মীরাবাঈ হয়ে সামনে বসে ভজন গাইবে বলে তো পৃথিবীতে আসেনি মধুরা।
ওয়ালমার্টে অনেক খুঁজেও পোস্ত কিংবা বড়ি দুটোর কোনোটাই পেল না মধুরা। শিকাগো, নিউজার্সি কিংবা হিউস্টন হলে এত ভোগান্তি হত না। কিন্তু এই পাণ্ডববর্জিত এলাকায় কেবল সাদা চামড়া। ক্বচিৎ কখনও দু-চারজন কৃষ্ণাঙ্গ। ভারতীয়ই চোখে পড়ে না, বাঙালি তো দূরস্থান। বাজার সেরে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিতে দিতে মধুরার মনে হল, এত ছেলে আসে এখানে রিসার্চ করতে, একটা বাঙালি ছেলে আসতে পারে না?
(৫)
নেওয়ার্ক, লাগার্ডিয়া আর জেএফকে। নিউইয়র্কে এই তিনখানা এয়ারপোর্ট। তার ভেতরে লাগার্ডিয়ায় মূলত ডোমেস্টিক ফ্লাইটগুলো চলাচল করে আর যাবতীয় ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট হয় নেওয়ার্ক নয়তো জেএফকে-কে বিমানবন্দরে এসে নামে।
“তোর ফ্লাইট নেওয়ার্কে নামবে, সেই ব্যবস্থা করে দিলুম বুঝলি।” দীপ্রর ট্র্যাভেল এজেন্ট পিনাকীদা সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলেছিল।
“জেএফকে হলেই বা কী অসুবিধে হত?” দীপু জানতে চেয়েছিল।
“জেএফকে-তে সাঙ্ঘাতিক চেকিং। একেবারে প্যান্টজামা খুলিয়েও চেক করে। আর ততটা যদি নাও করে, এত প্রশ্ন করবে যে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
“নেওয়ার্কে প্রশ্ন করবে না?”
“প্রশ্ন না করে তোকে অ্যামেরিকায় ঢুকিয়ে নেবে? তুই পড়াশোনা করতে যাচ্ছিস নাকি টুইন টাওয়ার ধ্বংস করতে, সেটা বুঝে নেবে না?”
“ভিসার সময় একদফা বুঝে নিয়েছিল তো। আবার কী?”
“বারবার পরীক্ষা দিতে হবে বাবা। দেশটা অ্যামেরিকা। তবে মজার ব্যাপার জানিস, লাদেন ওই হাজার দশেক লোককে মারার আগে, অ্যামেরিকার এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক প্রায় ছিলই না। লোকে হাঁটতে হাঁটতে রানওয়ে পর্যন্ত চলে যেত। প্লেনের সামনে দাঁড়িয়ে এ ওকে কিস করছে এরকম কত ছবি দেখেছি।”
দীপ্র হেসে উঠেছিল পিনাকীদার কথা শুনে। ট্র্যাভেল এজেন্সিতে চাকরি করলে অন্যদের ঘোরা বেড়ানোর গল্পগুলো কখন যেন নিজের হয়ে যায়। ফিনল্যান্ড থেকে ফ্লোরিডা সবই পরিচিত মনে হয়।
“মেমরা যদি ডানগালে চুমু খায় তাহলে তুই ওদের বাঁ গালে চুমু খাবি আর বাঁ গালে খেলে ডান গালে। এটাই ওদের দেশের রীতি। ভুলে যাবি না।” পিনাকীদা ওকে পাখি পড়ানোর ঢঙে বলেছিল।
দীপ্র তখন মজা পেলেও পরে ভেবেছে, কী দরকার ছিল, পিনাকীদার ওর জন্য এত ভাবার? ইউনিভার্সিটির উলটো ফুটে চা খেতে এসে যার সঙ্গে পরিচয় তার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে এত চিন্তার কী দরকার? হয়তো এটাই ওর দেশ, ওর শহরের ঐতিহ্য। আর সেই জায়গা ছেড়ে ও যেখানে যাচ্ছে, সেখানে প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা একটা ইউনিট। কারও সময় নেই, অন্য কারও কথা ভাবার।
“তুই যদি অ্যামেরিকার কোথাও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাস, তাহলে কোনো অ্যামেরিকান তোকে টেনে তুলবে না। সেটা এইজন্য নয় যে ওরা নিষ্ঠুর।” ওদের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র অমিতাভদা বলেছিল।
“তাহলে?” দীপ্র একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেছিল।
“তুলবে না কারণ অ্যামেরিকানরা ভীষণ স্বাধীনচেতা। ওরা পড়ে গেলে তুই যদি ওদের তুলতে যাস তাহলে ওরা অপমানিত বোধ করবে। আর ওরা ভেবে নেবে যে তোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একইরকম। অতএব, সাধু সাবধান।” অমিতাভদা জিভ দিয়ে একটা আওয়াজ করেছিল।
দীপ্রর অবশ্য তত কিছু মনে হয়নি কথাটা শুনে। ও তো ছোটোবেলা থেকেই একা। আর ইন্ট্রোভার্ট বলে বদনাম থাকায়, তেমন কোনো বন্ধুও জোটাতে পারেনি।
সুকন্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়াটাও একেবারেই অ্যাক্সিডেন্টালি। ওদের এক স্যার নিজের বাড়ির পুজোয় সব ছাত্রছাত্রীকে নেমন্তন্ন করতেন আর কেউ একদিনও না এলে রাগ করতেন খুব। শুধু যে কেমিস্ট্রির ছেলেমেয়েরাই আসত স্যারের বাড়িতে তা নয়। সুকন্যাই তো ইতিহাসের ছাত্রী ছিল। আসলে অঞ্জনবাবু নিঃসস্তান, বিপত্নীক লোক ছিলেন বলে অনেকের সঙ্গে গল্পগুজবে পুজোর কয়েকটা দিন কাটাতে চাইতেন। খাওয়াদাওয়াও খুব ভালো হত সেই সুবাদে।
সেখানেই কায়দা মেরে ধুনুচি নাচ দেখাতে গিয়ে সুকন্যার শাড়িতে আগুন লেগে যায়। আর আগুন লাগতেই অন্যরা যখন চিৎকার জুড়েছে তখন দীপ্র কোনো কথা না বলে একটা টান দিয়ে খুলে দিয়েছিল সুকন্যার শাড়িটা। সেই শাড়ি খুলতে গিয়ে দীপ্রর হাত পুড়ে যায় অল্প একটু। কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি ছ্যাঁকা লাগে সুকন্যার মনে। বাদবাকি সবাই যখন আতঙ্কিত হয়ে হইচই করছে তখন একটা লোক নিঃশব্দে ওকে বাঁচানোর কাজটা করল, এটা এমনই একটা অভিঘাত তৈরি করেছিল সুকন্যার ভেতরে যে ও নিজে থেকেই দীপ্রকে ফোন করে দেখা করতে চলে এসেছিল। দীপ্র যে খুব বেশি কথা বলতে পেরেছিল বা সুকন্যার ইমোশনের সঙ্গে তাল মেলাতে পেরেছিল, তা নয় কিন্তু সুকন্যা তো তখন ইম্প্রেসড হয়েই আছে। ওদের তৃতীয় বা চতুর্থ দেখা হওয়ার দিন, সুকন্যা ট্যাক্সির ভেতর দীপ্রকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ও কী চায়।
সেই চাওয়াটা আর কিছুই নয়, ওই অষ্টমীর দিন যেভাবে ওর শাড়ি খুলে নিয়ে ওকে বাঁচিয়েছিল, সেখারে প্রতিটা রাতে ওর শাড়ি খুলে নিয়ে ওকে বাঁচাবে, মাঝর বাঁচাবে।
কথাটা শুনেও দীপ্র শুধু বলেছিল, “ও আচ্ছা।”
সুকন্যা ওর শার্ট খামচে ধরে বলেছিল, “আচ্ছা মানে তোমার এক্সাইটেড লাগছে না? একটা সুন্দরী মেয়ে তোমার নিজের থেকে এরকম বলছে, অন্য কোনো ছেলে হ এতক্ষণে…”
ওই সেদিন থেকেই হয়তো অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে নীরে তুলনা করতে শুরু করেছিল সুকন্যা। কিন্তু দীপ্র তো কেবলানার দীপই ছিল। এক্সাইটেড লাগলেও যে হাঁইমাই করতে পার না। আর তাতেই একসময় ক্লান্ত হয়ে গেল সুকন্যা। এর মানে হতে লাগল যে দীপ্র বোধহয় ইচ্ছে করে ওকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এরকমটা করছে। দীপ্রর ভেতরের কোন জায়গাটা কী আঘাতে বন্ধ হয়ে গেছে সেই ফোঁড় যাওয়ার কোনো তাগিদ অনুভব করল না ও। দীপ্র নিজেও যে বলতে পেরেছিল তা নয়। সেই শৈশবের গল্প তুলে এনে সুকন্যাকে বোঝানো, কী হয়েছে, কেন হয়েছে, উফ বিরক্তিকর! ও তাই চেয়েছিল বে সুকন্যা ওকে বুঝবে। কিন্তু বুঝল কই? আর না বুঝে সরে গিয়ে আরও বড়ো একটা ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেল। সেটা এতটাই যে মায়ের জোরাজুরি সত্ত্বেও অ্যামেরিকা চলে আসার আগে ওই মেয়েটাকে দেখতে যেতে পারেনি ও। মেয়েটার ছবি দেখে ভালোই লেগেছিল, মায়ের মুখে ওর কথা শুনেও ছিল। কিন্তু মেয়েটার নাম ‘সুচন্দ্রা’ শুনেই ও শক খেয়েছিল। নামের এত মিল, স্বভাবেও যদি সুকন্যার মতোই হয় মেয়েটা?
ওর একসময়ের রুমমেট সুস্মিত বলত যে ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে মেয়েদের সঙ্গে শোবার জন্য আর মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে শোয় যাতে কথা বলে বলে মাথা খেতে পারে। খুব হেসেছিল দীপ্র কথাটা শুনে। কিন্তু হাসির বদলে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ওর গলায় দলা পাকিয়ে উঠেছিল যখন ডায়মন্ড হারবারের সেই রিসর্টে সুকন্যা নিজের নাভির ওপর থেকে দীপ্রর মুখটা সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আগে আমাকে বলো এই ট্যাটুটা দেখে তোমার কী মনে হচ্ছে।
“কী মনে হবে? ফুলের ভেতরে ফুল, তার ভেতরে ফুল, তার ভেতরেও ফুল।”
“সে তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু ওই ফুলের ভেতরে ফুল, তার ভেতরেও ফুল দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার? দু-তিনলাইনে বলো।”
একটা শব্দও বলতে পারেনি দীপ্র। আর সেই না বলতে পারা সুকন্যার মুড এমন বিগড়ে দিয়েছিল যে অত নির্জনতা, অত সুযোগ সত্ত্বেও ওরা একে অন্যের হয়ে যেতে পারেনি। পুরোপুরি। জলের ভেতর বরফ না গলে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে যেমনটা হয়, তেমন একটা অস্বস্তি নিয়ে, ফেরার রাস্তা ধরেছিল। গোটা পথটা একটাও কথা বলেনি সুকন্যা। শুধু ওর বাড়ির সামনের মোড়ে গাড়িটাকে যখন ও থামতে বলেছে দীর্ঘ তখন অস্ফুটে বলেছিল, “ফালতু ফালতু তোমার অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল আজ। কী করব, ওভাবে আমি পারি না।”
তার দিন দশেকের ভেতরেই ইউনিভার্সিটির মাঠের ওই ঘটনা। আর সেদিনের পর থেকে সুকন্যার সঙ্গে কোনো কথাই বলেনি দীপ্র। এমনকী রণজয় যখন এসে ওকে বলল যে সুকন্যা কেউ প্রশ্ন করলেই উত্তরে বলছে, “দীপ্র প্রেম করার সময়ই কিছু বলতে পারেনি, ব্রেকআপ-এর পর আর কী বলবে?” তখনও চুপ করেই ছিল।
চুপ করে থাকলেও ভেতরে মেঘ জমে জমে বিস্ফোরণ হয়। মা যখন ওই সুচন্দ্রা বলে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দীপ্রর হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিতে গিয়েছিল তখন সরে এসেছিল দীপ্র। কিন্তু পরে মায়ের থেকে ফোনটা নিয়ে নম্বরটা ডায়াল করেছিল ও। আর ওপাশে একটা মেয়ের গলা শুনেই বলে উঠেছিল, “আমি কিন্তু এক্সপ্রেসিভ নই। আপনার শরীরের কোথাও কোনো ট্যাটু থাকলে সেখানে চুমু খেয়ে কোনো কবিতা বলতে পারব না। তারপরও বিয়ে করবেন আমাকে?” ওপাশ থেকে মেয়েটা হো হো করে হেসে উঠেছিল। আর দীপ্র রং নাম্বার বুঝতে পেরে ফোনটা কেটে দিতে দিতে একটা নিশ্বাস ফেলেছিল।
তাড়াহুড়োয় ‘সাত’ ডায়াল করতে গিয়ে ‘নয়’ ডায়াল করে ফেলেছিল। কিন্তু কী হত, যদি সত্যি করে সুচন্দ্রাই ফোনটা ধরত?
