দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ৫
(৫)
নেওয়ার্ক, লাগার্ডিয়া আর জেএফকে। নিউইয়র্কে এই তিনখানা এয়ারপোর্ট। তার ভেতরে লাগার্ডিয়ায় মূলত ডোমেস্টিক ফ্লাইটগুলো চলাচল করে আর যাবতীয় ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট হয় নেওয়ার্ক নয়তো জেএফকে-কে বিমানবন্দরে এসে নামে।
“তোর ফ্লাইট নেওয়ার্কে নামবে, সেই ব্যবস্থা করে দিলুম বুঝলি।” দীপ্রর ট্র্যাভেল এজেন্ট পিনাকীদা সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলেছিল।
“জেএফকে হলেই বা কী অসুবিধে হত?” দীপু জানতে চেয়েছিল।
“জেএফকে-তে সাঙ্ঘাতিক চেকিং। একেবারে প্যান্টজামা খুলিয়েও চেক করে। আর ততটা যদি নাও করে, এত প্রশ্ন করবে যে তোর মাথা খারাপ হয়ে যাবে।
“নেওয়ার্কে প্রশ্ন করবে না?”
“প্রশ্ন না করে তোকে অ্যামেরিকায় ঢুকিয়ে নেবে? তুই পড়াশোনা করতে যাচ্ছিস নাকি টুইন টাওয়ার ধ্বংস করতে, সেটা বুঝে নেবে না?”
“ভিসার সময় একদফা বুঝে নিয়েছিল তো। আবার কী?”
“বারবার পরীক্ষা দিতে হবে বাবা। দেশটা অ্যামেরিকা। তবে মজার ব্যাপার জানিস, লাদেন ওই হাজার দশেক লোককে মারার আগে, অ্যামেরিকার এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক প্রায় ছিলই না। লোকে হাঁটতে হাঁটতে রানওয়ে পর্যন্ত চলে যেত। প্লেনের সামনে দাঁড়িয়ে এ ওকে কিস করছে এরকম কত ছবি দেখেছি।”
দীপ্র হেসে উঠেছিল পিনাকীদার কথা শুনে। ট্র্যাভেল এজেন্সিতে চাকরি করলে অন্যদের ঘোরা বেড়ানোর গল্পগুলো কখন যেন নিজের হয়ে যায়। ফিনল্যান্ড থেকে ফ্লোরিডা সবই পরিচিত মনে হয়।
“মেমরা যদি ডানগালে চুমু খায় তাহলে তুই ওদের বাঁ গালে চুমু খাবি আর বাঁ গালে খেলে ডান গালে। এটাই ওদের দেশের রীতি। ভুলে যাবি না।” পিনাকীদা ওকে পাখি পড়ানোর ঢঙে বলেছিল।
দীপ্র তখন মজা পেলেও পরে ভেবেছে, কী দরকার ছিল, পিনাকীদার ওর জন্য এত ভাবার? ইউনিভার্সিটির উলটো ফুটে চা খেতে এসে যার সঙ্গে পরিচয় তার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে এত চিন্তার কী দরকার? হয়তো এটাই ওর দেশ, ওর শহরের ঐতিহ্য। আর সেই জায়গা ছেড়ে ও যেখানে যাচ্ছে, সেখানে প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা একটা ইউনিট। কারও সময় নেই, অন্য কারও কথা ভাবার।
“তুই যদি অ্যামেরিকার কোথাও হোঁচট খেয়ে পড়ে যাস, তাহলে কোনো অ্যামেরিকান তোকে টেনে তুলবে না। সেটা এইজন্য নয় যে ওরা নিষ্ঠুর।” ওদের ইউনিভার্সিটির সিনিয়র অমিতাভদা বলেছিল।
“তাহলে?” দীপ্র একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেছিল।
“তুলবে না কারণ অ্যামেরিকানরা ভীষণ স্বাধীনচেতা। ওরা পড়ে গেলে তুই যদি ওদের তুলতে যাস তাহলে ওরা অপমানিত বোধ করবে। আর ওরা ভেবে নেবে যে তোর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একইরকম। অতএব, সাধু সাবধান।” অমিতাভদা জিভ দিয়ে একটা আওয়াজ করেছিল।
দীপ্রর অবশ্য তত কিছু মনে হয়নি কথাটা শুনে। ও তো ছোটোবেলা থেকেই একা। আর ইন্ট্রোভার্ট বলে বদনাম থাকায়, তেমন কোনো বন্ধুও জোটাতে পারেনি।
সুকন্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়াটাও একেবারেই অ্যাক্সিডেন্টালি। ওদের এক স্যার নিজের বাড়ির পুজোয় সব ছাত্রছাত্রীকে নেমন্তন্ন করতেন আর কেউ একদিনও না এলে রাগ করতেন খুব। শুধু যে কেমিস্ট্রির ছেলেমেয়েরাই আসত স্যারের বাড়িতে তা নয়। সুকন্যাই তো ইতিহাসের ছাত্রী ছিল। আসলে অঞ্জনবাবু নিঃসস্তান, বিপত্নীক লোক ছিলেন বলে অনেকের সঙ্গে গল্পগুজবে পুজোর কয়েকটা দিন কাটাতে চাইতেন। খাওয়াদাওয়াও খুব ভালো হত সেই সুবাদে।
সেখানেই কায়দা মেরে ধুনুচি নাচ দেখাতে গিয়ে সুকন্যার শাড়িতে আগুন লেগে যায়। আর আগুন লাগতেই অন্যরা যখন চিৎকার জুড়েছে তখন দীপ্র কোনো কথা না বলে একটা টান দিয়ে খুলে দিয়েছিল সুকন্যার শাড়িটা। সেই শাড়ি খুলতে গিয়ে দীপ্রর হাত পুড়ে যায় অল্প একটু। কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি ছ্যাঁকা লাগে সুকন্যার মনে। বাদবাকি সবাই যখন আতঙ্কিত হয়ে হইচই করছে তখন একটা লোক নিঃশব্দে ওকে বাঁচানোর কাজটা করল, এটা এমনই একটা অভিঘাত তৈরি করেছিল সুকন্যার ভেতরে যে ও নিজে থেকেই দীপ্রকে ফোন করে দেখা করতে চলে এসেছিল। দীপ্র যে খুব বেশি কথা বলতে পেরেছিল বা সুকন্যার ইমোশনের সঙ্গে তাল মেলাতে পেরেছিল, তা নয় কিন্তু সুকন্যা তো তখন ইম্প্রেসড হয়েই আছে। ওদের তৃতীয় বা চতুর্থ দেখা হওয়ার দিন, সুকন্যা ট্যাক্সির ভেতর দীপ্রকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ও কী চায়।
সেই চাওয়াটা আর কিছুই নয়, ওই অষ্টমীর দিন যেভাবে ওর শাড়ি খুলে নিয়ে ওকে বাঁচিয়েছিল, সেখারে প্রতিটা রাতে ওর শাড়ি খুলে নিয়ে ওকে বাঁচাবে, মাঝর বাঁচাবে।
কথাটা শুনেও দীপ্র শুধু বলেছিল, “ও আচ্ছা।”
সুকন্যা ওর শার্ট খামচে ধরে বলেছিল, “আচ্ছা মানে তোমার এক্সাইটেড লাগছে না? একটা সুন্দরী মেয়ে তোমার নিজের থেকে এরকম বলছে, অন্য কোনো ছেলে হ এতক্ষণে…”
ওই সেদিন থেকেই হয়তো অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে নীরে তুলনা করতে শুরু করেছিল সুকন্যা। কিন্তু দীপ্র তো কেবলানার দীপই ছিল। এক্সাইটেড লাগলেও যে হাঁইমাই করতে পার না। আর তাতেই একসময় ক্লান্ত হয়ে গেল সুকন্যা। এর মানে হতে লাগল যে দীপ্র বোধহয় ইচ্ছে করে ওকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এরকমটা করছে। দীপ্রর ভেতরের কোন জায়গাটা কী আঘাতে বন্ধ হয়ে গেছে সেই ফোঁড় যাওয়ার কোনো তাগিদ অনুভব করল না ও। দীপ্র নিজেও যে বলতে পেরেছিল তা নয়। সেই শৈশবের গল্প তুলে এনে সুকন্যাকে বোঝানো, কী হয়েছে, কেন হয়েছে, উফ বিরক্তিকর! ও তাই চেয়েছিল বে সুকন্যা ওকে বুঝবে। কিন্তু বুঝল কই? আর না বুঝে সরে গিয়ে আরও বড়ো একটা ক্ষত তৈরি করে দিয়ে গেল। সেটা এতটাই যে মায়ের জোরাজুরি সত্ত্বেও অ্যামেরিকা চলে আসার আগে ওই মেয়েটাকে দেখতে যেতে পারেনি ও। মেয়েটার ছবি দেখে ভালোই লেগেছিল, মায়ের মুখে ওর কথা শুনেও ছিল। কিন্তু মেয়েটার নাম ‘সুচন্দ্রা’ শুনেই ও শক খেয়েছিল। নামের এত মিল, স্বভাবেও যদি সুকন্যার মতোই হয় মেয়েটা?
ওর একসময়ের রুমমেট সুস্মিত বলত যে ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে মেয়েদের সঙ্গে শোবার জন্য আর মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে শোয় যাতে কথা বলে বলে মাথা খেতে পারে। খুব হেসেছিল দীপ্র কথাটা শুনে। কিন্তু হাসির বদলে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা ওর গলায় দলা পাকিয়ে উঠেছিল যখন ডায়মন্ড হারবারের সেই রিসর্টে সুকন্যা নিজের নাভির ওপর থেকে দীপ্রর মুখটা সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আগে আমাকে বলো এই ট্যাটুটা দেখে তোমার কী মনে হচ্ছে।
“কী মনে হবে? ফুলের ভেতরে ফুল, তার ভেতরে ফুল, তার ভেতরেও ফুল।”
“সে তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু ওই ফুলের ভেতরে ফুল, তার ভেতরেও ফুল দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার? দু-তিনলাইনে বলো।”
একটা শব্দও বলতে পারেনি দীপ্র। আর সেই না বলতে পারা সুকন্যার মুড এমন বিগড়ে দিয়েছিল যে অত নির্জনতা, অত সুযোগ সত্ত্বেও ওরা একে অন্যের হয়ে যেতে পারেনি। পুরোপুরি। জলের ভেতর বরফ না গলে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে যেমনটা হয়, তেমন একটা অস্বস্তি নিয়ে, ফেরার রাস্তা ধরেছিল। গোটা পথটা একটাও কথা বলেনি সুকন্যা। শুধু ওর বাড়ির সামনের মোড়ে গাড়িটাকে যখন ও থামতে বলেছে দীর্ঘ তখন অস্ফুটে বলেছিল, “ফালতু ফালতু তোমার অনেকগুলো টাকা খরচ হয়ে গেল আজ। কী করব, ওভাবে আমি পারি না।”
তার দিন দশেকের ভেতরেই ইউনিভার্সিটির মাঠের ওই ঘটনা। আর সেদিনের পর থেকে সুকন্যার সঙ্গে কোনো কথাই বলেনি দীপ্র। এমনকী রণজয় যখন এসে ওকে বলল যে সুকন্যা কেউ প্রশ্ন করলেই উত্তরে বলছে, “দীপ্র প্রেম করার সময়ই কিছু বলতে পারেনি, ব্রেকআপ-এর পর আর কী বলবে?” তখনও চুপ করেই ছিল।
চুপ করে থাকলেও ভেতরে মেঘ জমে জমে বিস্ফোরণ হয়। মা যখন ওই সুচন্দ্রা বলে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে দীপ্রর হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিতে গিয়েছিল তখন সরে এসেছিল দীপ্র। কিন্তু পরে মায়ের থেকে ফোনটা নিয়ে নম্বরটা ডায়াল করেছিল ও। আর ওপাশে একটা মেয়ের গলা শুনেই বলে উঠেছিল, “আমি কিন্তু এক্সপ্রেসিভ নই। আপনার শরীরের কোথাও কোনো ট্যাটু থাকলে সেখানে চুমু খেয়ে কোনো কবিতা বলতে পারব না। তারপরও বিয়ে করবেন আমাকে?” ওপাশ থেকে মেয়েটা হো হো করে হেসে উঠেছিল। আর দীপ্র রং নাম্বার বুঝতে পেরে ফোনটা কেটে দিতে দিতে একটা নিশ্বাস ফেলেছিল।
তাড়াহুড়োয় ‘সাত’ ডায়াল করতে গিয়ে ‘নয়’ ডায়াল করে ফেলেছিল। কিন্তু কী হত, যদি সত্যি করে সুচন্দ্রাই ফোনটা ধরত?
(৬)
“হোয়াট সর্ট অফ ফেভার আর ইউ আসকিং ফর?” দীপ্র জিজ্ঞেস করল ওর পাশের লোকটাকে।
“কিচ্ছু না। তুমি শুধু এই চারটে চকোলেট তোমার সঙ্গে আই মিন তোমার হ্যান্ডব্যাগে ক্যারি করবে। ব্রাসেলসে সিকিওরিটি চেকিং-এর পর আমি আবার তোমার থেকে চকোলেটগুলো নিয়ে নেব।”
“না, আমি এইসব করতে পারব না।”
“তুমি বুঝতে পারছ না, একসঙ্গে এতগুলো চকোলেট নিতে দেয় না সিকিওরিটির লোকেরা। তাই আমি ভাবছিলাম, যদি তুমি আমায় একটু হেল্প করো তাহলে আমি চকোলেটগুলো বাইরে নিয়ে যেতে পারি। দে আর ভেরি প্রেশাস ইউ নো।”
“সরি, আই কান্ট।” বলেই দীপ্র মুখ ঘুরিয়ে নিল লোকটার থেকে।
“আই থিঙ্ক উই বোথ আর গোইং টু অ্যামেরিকা। সো, এইটুকু হেল্প তুমি আমায় করতেই পারতে।” লোকটা বলল।
দীপ্র ওর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।
চোখ বন্ধ করতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল কলকাতা শহরের সেই ল্যাবরেটরি, দিনের পর দিন যেখানে বারোঘণ্টা-চোদ্দোঘণ্টা পরিশ্রম করেছে ও। জার আর বিকারে আধাআধি ঢেলে দিয়েছিল নিজের গোটা জীবনটাই আর তার পরিণামেই হয়তো আজ এই অ্যামেরিকায় যাওয়ার সুযোগ এসেছে ওর সামনে।
রিসার্চ কী ও ভারতে থেকেও করতে পারত না? দেশের লোকের ট্যাক্সের টাকায় মাস্টার্স করে, কোন চিতোর উদ্ধারের জন্য ও অ্যামেরিকায় যাচ্ছে? আসলে তো যাচ্ছে নিজের কেরিয়ার গুছিয়ে নিতে। কিংবা হয়তো বা যাচ্ছে এই কথা দিয়ে সব কিছু বোঝানোর দেশের থেকে বেরিয়ে কাজের মধ্যে দিয়ে যেখানে সব বোঝানো যায়, সেই দেশটার একটা অংশ হতে। পিএইচডি তো দীপ্র ভারতেই করছিল। বছর দেড়েক হয়ে গেল ও জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপ পেয়েছে। কিন্তু অ্যামেরিকার সুযোগটা আসামাত্র ওর আর পেছনে ফিরে তাকাবার মন হয়নি। জলে যাক, দেড়বছর, আবার নতুন করে শুরু করবে আটলান্টিকের পাড়ে গিয়ে, এমনটাই মনে হয়েছিল।
“সুকন্যার সঙ্গে ব্রেকআপ হল বলেই কী তড়িঘড়ি দেশ ছাড়তে চাইছিস?” অমিতাভদা জিজ্ঞেস করেছিল।
“জানি না। তবে আমার মনে হচ্ছে যে এই দেশটার সঙ্গেই আমার একটা ব্রেক আপ হয়ে গেছে। আর তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দেশটা থেকে বেরিয়ে যেতে পারি, ততই মঙ্গল।” দীপ্র উত্তরে বলেছিল।
“মঙ্গলটা কার? তোর নিজের না দেশের?” অমিতাভদা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করেছিল।
“জানি না। হয়তো দু-জনেরই।”
“পিএইচডি এখানেই শেষ করে পোস্টডক করার জন্য অ্যামেরিকায় গেলে তুই আরও অনেক বেটার ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেতিস। চাই কী বার্কুলে বা প্রিন্সটন থেকে কাজ করতে পারতিস। কিন্তু এখন যেখানে যাচ্ছিস, সেটা তো একটা ধ্যান্ধেড়ে গোবিন্দপুর। অ্যামেরিকার গোবিন্দপুর, আই অ্যাডমিট, কিন্তু তাতে কী?”
দীপ্র মনে মনে বলেছিল, “তাতেই সবকিছু। অ্যামেরিকায় জাহাজ ভেড়ানোর আগে কলম্বাস কী ভেবেছিল ও ফুরফুরে মোলায়েম একটা দেশে পা দিচ্ছে নাকি তীব্র ঠান্ডা হাওয়ার ভেতরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রুক্ষ মহাদেশে জাহাজ ভেড়াচ্ছে?” অজানাকে ভয় করলে আর যাই করা যাক জীবনের ঝুঁকি নেওয়া যায় না। আর দীপ্র ঝুঁকিই নিতে চাইছিল। চাইছিল এমন একটা ব্রেক যা পুরোনো সবকিছুকে জল-ন্যাতা দিয়ে মুছে দেবে স্লেট থেকে। লিখবে নতুন অক্ষর, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।
ভিসার জন্য যেদিন ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল, সেদিন কনসুলেটের লোকটা দীপ্রকে জিজ্ঞেস করেছিল যে ও তো ব্যাচেলর। একবার অ্যামেরিকায় যাওয়ার পর আর যদি ফিরে আসতে মন না করে তাহলে?
“জীবন আমার আল্টিমেটলি কোথায় সেটল করাবে, আমি জানি না। কিন্তু আমি পিএইচডি শেষ করে ইন্ডিয়ায় ফিরতে চাই কারণ কিছু লোককে দেখাতে চাই, কী করতে পারি, কতটা করতে পারি।” দীপ্র জবাবে বলেছিল।
উত্তরটা একদম ‘সৎ’ বলে বুঝতে পেরেছিল বলেই, দীপ্রকে আর একটুও ব্যতিব্যস্ত করেনি ওরা। ভিসা দিয়ে দিয়েছিল। তারপরই বাড়িতে খবরটা জানিয়েছিল দীপ্র। অবাক হয়ে গিয়েছিল সবাই। সবচেয়ে বেশি করে ওর বোন দেয়ালি। মা-ও জানতে চাইছিল যে দীপ্র আগে কেন বলেনি যে ও অ্যামেরিকায় যাওয়ার চেষ্টাচরিত্র চালাচ্ছে।
আগে থেকে জানিয়ে লাভ আছে কিছু? শেষমেশ তো সেই যেদিন যাওয়ার সেদিনই যেতে হবে। দীপ্র বলবে বলে ভাবল। তারপর কিছুই না বলে, হাসল অল্প একটু।
মা ডুকরে উঠল, “তোকে সেই যে ছোটোবেলায় হোস্টেলে রেখেছিলাম, তার প্রতিশোধ নিবি বলেই তুই সারাজীবন আমাদের থেকে দূরে থাকার প্ল্যান করেছিস।”
“এরকম কোনো প্রতিশোধ হয় না মা। তোমরা যেমন আমাকে ভালোবাসো, আমিও বাসি। কিন্তু আমার যা সাবজেক্ট তাতে উন্নতি করতে গেলে, বিদেশে যেতেই হয়।”
“গেলে বা, কিন্তু আমি বিয়ে দিয়ে দেব, যাওয়ার আগে।” মা কীরকম ফাইনাল ডিসিশন শোনানোর ঢঙে বলল।
“পঁচিশ হয়নি তো এখনও। এখনই বিয়ে?” বাবা হো হো করে হেসে উঠল।
“হাসির আছেটা কী? পঁচিশে বিয়ে হত না লোকের আগে? এখনও হয় না?”
দেয়ালি চেঁচিয়ে উঠল, “খুব হয়। আমাদেরই পুরে সিনিয়র সতীশ জয়সোয়াল বিয়ে করছে তো। হি ইজ ভ নাইনটিন।”
“আমি বিয়ে করে নিলে তোর রাস্তা ক্লিয়ার হয় নাকি? হতে এখনই বল! ছেলেটাকে দেখে রাখি।”
দীপ্রর কথায় লজ্জা পেয়ে দেয়ালি সরে গিয়েছিল। আর মায়ের হাত থেকে সুচন্দ্রার ফটো হাতে নিয়ে লজ্জা পেয়েি দীপুও। মেয়েটাকে ওর ভালোই লেগেছিল যে। ছবিতে আ ভালোলাগার চাইতে বেশি করে জেগে উঠেছিল একটি প্রতিশোধস্পৃহা। যদি অ্যামেরিকার ঠিকঠাক কাজ করে উন্নি মুখ দেখতে পায়, একটা বাড়ি, একটা গাড়ি কিনতে পারে ঝটপট, তাহলে একটা বউকে নিজের জীবনে নিয়ে আসা খুব কিছু সমস্যার হবে না। আর সেদিনই আসল জবাবটা দেওয় যাবে সুকন্যাকে। মেয়েদের কোলে মাথা রেখে শুরে বর কবিতা আবৃত্তি করে, তারাই যে পৃথিবীর সবচেয়ে সকল লেবে নয়, এই বোধোদয় হবে তো সেদিন সুকন্যার?
হোক, না-হোক, দীপ্র ওর স্মৃতি রোমন্থন করার জন্য বলে থাকবে না আর। নিজের জীবনটাকে ও যে তীব্র গতির রাস্তা গড়িয়ে দিয়েছে, সেটা ধরেই এগিয়ে যেতে হবে।
“আপনি কী, কতটা আপনার ক্ষমতা, আপনাকে কিন্তু তাড়াতাড়ি প্রমাণ করতে হবে।” একটা আবছা মুখ শেষরাতের স্বপ্নে দীপ্রকে বলে গেল একদিন।
দীপ্র ঘুম ভেঙে উঠে বসে কথাটা কে বলল, ভাবছিল। কিন্তু আবছা মুখটা স্পষ্ট হচ্ছিল না কিছুতেই।
অ্যামেরিকায় আসার আগের দিন পর্যন্ত মুখটা স্পষ্ট হয়নি। তবু অস্পষ্টতাও তো একটা আভাস দিয়ে যায়। সেই আভাস থেকেই এয়ারপোর্ট থেকে সুচন্দ্রার নাম্বারে একটা মেসেজ করল। মেসেজ করে জানাল যে ফেসবুকে সুচন্দ্রাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে দীপ। সুচন্দ্রা একসেপ্ট করলে কথা হবে।
চোখটা লেগে গিয়েছিল দীপ্রর। খুলে গেল বিমানসেবিকাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে। আর সুচন্দ্রা ওর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার আগেই ব্রাসেলসের মাটি একসেপ্ট করে নিল ওদের বিমানটাকে।
*****
ব্রাসেলসের সিকিওরিটি চেক-এর সামনে দাঁড়িয়ে মা-কে ফোন করার সময় দীপ্রর ইচ্ছে হল সুচন্দ্রাকেও ফোন করে একটা। কিন্তু অচেনা অজানা মেয়ে, কী কথা বলবে তার সঙ্গে? তার চাইতে আগে ফেসবুকে বন্ধু হয়ে আসুক। আট হাজার মাইল, দশ হাজার মাইল দূর থেকে দানা বাঁধুক রিলেশনটা। ভাবতে ভাবতে ব্রাসেলসের কড়া নিরাপত্তার বেড়া টপকে নেওয়ার্কের বিমানে উঠে বসল দীপ্র। বসার আগে অবশ্য গোটা একটা ব্যাগেল চিজের সাহায্যে উদরস্থ করল। খুব নরম এই ব্যাগেলগুলো। কতটা নরম সেটা একমাত্র জিভে দিলেই বোঝা যায়। সেই স্বাদটাই মুখে ছিল কিন্তু আটলান্টিক পার হবার সময় এয়ারহোস্টেসের দেওয়া বিয়ার খেয়ে ভেতরটা জ্বালা করে উঠল। এই জ্বালা সম্বল করেই তো এতদিন কাটিয়ে এল দীপ্র। এবার নিশ্চয়ই একটা নতুন পৃথিবী তার আলো দিয়ে ধুইয়ে দেবে সব?
নেওয়ার্কের ইমিগ্রেশন কাউন্টারটা পার হবার সময় দীপ্রর হঠাৎ চোখ পড়ল, ডানদিকের একটা ছোট্ট হাফ ঘেরা জায়গায় একটা লোক নিজের শার্ট খুলে রাখার পর, প্যান্টও খুলছে। ইনফ্যাক্ট ওর সামনে দাঁড়িয়ে খোলাচ্ছে ওকে, একটা ব্রুকটি চুলের অফিসার। সুটকেস নিতে এগিয়ে যাওয়ার সময় ভালো করে তাকাল দীপ্র লোকটার দিকে। হ্যাঁ এই লোকটাই তো ওকে দিয়ে চকোলেট পাচার করাতে চাইছিল।
ভাগ্যিস দীপ্র নেয়নি। নিশ্চয়ই দুনম্বরী কিছু ছিল ওই চকোলেটের মধ্যে। নইলে দীপ্রকে সসম্মানে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশাধিকার দিল যে অ্যামেরিকা সেই আবার ওই লোকটাকে উলঙ্গ করে কী বুঝে নিতে চাইছে?
একটু দাঁড়িয়ে গিয়ে আবার এগোনোর সময়ই পেছন থেকে চিৎকার কানে এল। দীপ্র ঘাড় ঘোরাতেই লোকটার সঙ্গে চোখাচুখি হয়ে গেল। লোকটা ওর দিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠল, “আস্ক হিম। হি অলসো এট মাই চকোলেটস।”
দীপ্র পা চালিয়ে সরে আসছিল। কিন্তু একটা আওয়াজ যেন ওর দিকেই ধেয়ে এল, “হে ইউ”।
মরেছে! কে ডাকছে ওকে? কেন ডাকছে?
(৭)
অফিস থেকে বাড়ি ফিরে গুম হয়ে বসেছিল সুচন্দ্রা। মা দু-বার জিজ্ঞেস করে গেল, রাতে কী খাবে কিন্তু কোনো জবাব পেল না ওর থেকে। আসলে কোনো কিছু নিয়েই কথা বলতে ভালো লাগছিল না ওর। ইচ্ছে করছিল আলোটা নিবিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকতে নিজের ওই ছোট্ট ঘরটায়। কিন্তু শুলেও বিশ্রাম হবে বলে বিশ্বাস হচ্ছিল না। কারণ মাথাটা দপদপ করছিল।
ওদের পুরোনো বাড়িতে এক একটা ঘর ছিল যেন এক একটা হাওদাখানা। লম্বা-চওড়ায় বিশাল বিশাল সব। কড়িকাঠ থেকে মেঝে পর্যন্ত তিন মানুষ সমান উচ্চতা। আর মেঝেগুলো থেকে আসবাবপত্র সরিয়ে দিলে বাচ্চারা ফুটবল খেলতেও পারত। তুলনায় এই ফ্ল্যাটের দুটো বেডরুমই পায়রার খোপ। এর ঘরটাতো একটু বেশি ছোটো। একটা পড়ার টেবিল, বইয়ের র্যাক আর খাট ভেতরে নিয়ে সামান্য ফাঁকা জায়গাও নেই। হাঁটতে গেলে একটা কিছু গায়ে লেগে যায়।
“বিয়ের পর তুই আর তোর বর এলে আমাদের ঘরে থাকবি। আমি আর তোর বাবা এই ঘরটায় চলে আসব।” মা একদিন বলেছিল।
লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল সুচন্দ্রা। সামান্য চুপ করে থেকে বলেছিল, “আমি যাকে বিয়ে করব সে এই ঘরেই থাকতে পারবে। যখন শ্বশুরবাড়ি আসবে। আর যদি না পারে তাহলে তার আমাকে বিয়ে করারই দরকার নেই।”
মা হেসে ফেলেছিল। কিন্তু সুচন্দ্রা সেই হাসির ভেতর অনেকটা কষ্টের ঝলক দেখতে পেয়েছিল। নিজের পৈতৃক ভিটে ছেড়ে চলে আসার যন্ত্রণা বাবা যে ভুলতে পারেনি তা ও জানত। যে বাড়িতে জন্ম, শৈশব কৈশোর যেখানে কেটেছে সেই বাড়ি ছেড়ে চলে আসার সময় যন্ত্রণা হবে না? কিন্তু শুধু বাবার নয়, মায়েরও যে পাঁজর ভাঙছিল টের পেয়েছিল সুচন্দ্রা। খারাপ কী ওর নিজেরও লাগেনি? ওই বাড়ি যে ওরও হামাগুড়ি দিয়ে জীবনের জার্নি শুরু করার সাক্ষী। কিন্তু খারাপের পাশাপাশি ওর ভালো লেগেছিল, একটা মুক্তির কথা ভেবে। যে মুক্তি এই দুকামরার ফ্ল্যাটে আছে। আর সেই মুক্তি কেবলমাত্র আত্মীয়দের নিষ্ঠুরতা থেকেই নয়, স্মৃতির বেড়াজাল থেকেও।
ওই বাড়িরই একটা ঘরে সুচন্দ্রার দাদা সুতনু মারা গিয়েছিল, টাইফয়েডে। চিকিৎসার গাফিলতি হয়েছিল কিংবা হতে পারে তখনও চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না বলে আর কিছু করার ছিল না, কিন্তু ওর বাবা মা-কে সে কথা কে বোঝাবে? কত রাত ঘুমোবার ভান করে পড়ে থেকে সুচন্দ্রা ওর বাবা মা-কে কাঁদতে শুনেছে। সেই কান্নার ভেতরে শুধু নিজেদের বারো বছরের ছেলেকে হারানোর যন্ত্রণাই ছিল না তাকে আরও বড়ো ডাক্তার কিংবা হাসপাতালে না নিয়ে যেতে পারার অপরাধবোধও ফিরে ফিরে আসত।
“সেদিন যদি তুমি ধর্মতলার ওই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চুন্টুকে তাহলে ভালো হত। তখন তো আর তোমার কোম্পানি বন্ধ হয়নি।”
“টাকার কথা ভেবে আমি পিছিয়ে আসিনি সীমা। আসলে ডাক্তার দত্তকে ভরসা করেছিলাম। ভেবেছিলাম ওনার কথামতো চললেই চুপ্টু ঠিক সেরে যাবে।”
“কেন বিশ্বাস করলে, ওরকম অন্ধের মতো? কেন আর একটা কারও কাছে নিয়ে গেলে না?”
“বিশ্বাস কী আমি একাই করেছিলাম? তুমি করনি? তখন সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেবার কথা তুমিও তো বলতে পারতে। বলেছিলে কী?”
“না, বলিনি। সব দোষ আমারই ছিল। মেনে নিচ্ছি।”
“ দোষ নয় সীমা। বিশ্বাস জিনিসটাই এমন যে করলে অন্ধের মতোই করতে হয়। আমার ভাইদেরও কী সেভাবেই করিনি?” তারপর কথা থেমে যেত। শুধু একটা ফোঁপানোর আওয়াজ আসত
কখনও একটা, কখনও বা দুটো গলা থেকেই। ওই কান্না আর পারস্পরিক অভিযোগ থেকে বাবা-মা নিস্তার পাবে জেনে এই ফ্ল্যাটে আসার সময় খুশিই হয়েছিল সুচন্দ্রা। দাদার জন্য কষ্ট কী ওরও হত না? সেই যে প্রথমবার ইলেকট্রিক নাগরদোলায় উঠে ও চিৎকার করছিল আর দাদা ওকে জড়িয়ে ধরে বলছিল, “কিচ্ছু হবে না বনু, আমিতো আছি,” অথবা সেই সপ্তমীর দিন প্যান্টের ইলাস্টিক খুলে যাওয়া দাদা যেভাবে একহাতে প্যান্ট সামলে অন্য হাতে বোনের হাত ধরে ঘুরেছিল চার-পাঁচটা প্যান্ডেল, সুচন্দ্রা কী কোনোদিন তা ভুলতে পারবে?
পারবে না। তবে না পারলেও সেই কুরে খাওয়া কষ্টটাকে মনের অনেক গভীরে চাপা দিয়েই পথ চলতে হবে, সেটা ও জেনে গেছে। লোকের কাছে কষ্ট প্রকাশ করা মানে লোকের হাসির খোরাক হওয়া। কিন্তু এই কথাটা মনে মনে জানলেও ও তো বাবা-মা, বিশেষ করে মা-কে মুখের ওপর বলে কষ্ট দিতে পারে না। একতলার কিংবা তিনতলার ফ্ল্যাটের কেউ ওদের ঘরে এলে মা যখন দশটা কথার পর তাকে নিজের ছেলের কথা বলতে শুরু করে কিংবা ছেলের ছবির সামনে নিয়ে যায় তখন সুচন্দ্রা মনেমনে বাধা দিতে চায় মা-কে। পরক্ষণেই বোঝে যে ঘটনা যেখানে ঘটেছিল সেখান থেকে দুরে চলে এলেই ঘটনা থেকে দূরে চলে আসা যায় না। শোক হয়তো কালের নিয়মে কিছুটা কমে কিন্তু স্মৃতি থাকে। থেকেই যায়।
অফিসের বস রমিত পাত্র যখন ওকে ডেকে ইউনিক সর্ষের তেলের বিজ্ঞাপনের কপি লিখতে বললেন, ও সে কারণেই চমকে গিয়েছিল।
“ইউনিক। মানে সেই তেলটা যেটা খেয়ে কুড়িজনের ওপরে মারা গিয়েছিল, অন্ধ হয়েছিল পঞ্চাশের ওপরে লোক আরও না জানি কতজন পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল?”
“হ্যাঁ, কিন্তু তাতে আমাদের কী?” রমিত পাত্র বললেন।
“ওরা তো একেবারেই ব্ল্যাকলিস্টেড একটা সংস্থা। রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার সবাই ওদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে শুনেছি।”
“দ্যাখো সুচন্দ্রা, তোমাকে তো এখানে ‘ইউনিক’ সম্বন্ধে থিসিস লেখার জন্য ডাকা হয়নি আর তুমি তদন্ত রিপোর্ট লেখা পুলিশ অফিসার কিংবা জার্নালিস্টও নও।”
“কিন্তু স্যার এরকম একটা খুনি কোম্পানির সঙ্গে জড়ালে, আমাদের অর্গানাইজেশনের বদনাম হবে না? মানুষের মধ্যেও তো ওদের সম্পর্কে ধারণা খুব খারাপ।”
“ভুল করছ। ওদের সম্পর্কে নয়, ধারণা খারাপ, ‘ইউনিক’ নামটার বিষয়ে। এবার বম্বেতে মাফিয়ারা যখন জেল খেটে বেরোয় তখন কী করে জানো তো? সদাশিব যার নাম সে হয়ে যায় বিক্রম। ইউসুফ হয়ে যায় মকবুল। কিংবা অনেকসময় শাহনওয়াজ হয়ে যায় রবার্ট বা কৈলাশ। এবার এই নাম পালটানোর সঙ্গে সঙ্গেই লোকটার গা থেকে সেভেনটি পারসেন্ট ব্যাগেজ খসে পড়ে। অন্য নাম মানেই অন্য পরিচয়। কে আর খুঁচিয়ে বের করার ধৈর্য রাখে, ও আগে কী ছিল, কী করেছিল।”
“ইউনিক কী নাম পালটে মার্কেটে আসতে চাইছে?”
“এগজ্যাক্টলি। মালিক এক থাকবে, সেট আপ মোর অর লেস একই থাকবে, প্রোডাক্ট একই থাকবে, চাই কী প্রোডাক্টের ভেতরের ভেজালটাও একই থাকবে। বদলে যাবে শুধু অফিস অ্যাড্রেস আর তেলটার নাম।” রমিত জোরে হেসে উঠলেন।
সেই হাসির শব্দটা বুলেটের মতো সুচন্দ্রাকে এসে বিধতে থাকল। কতগুলো খুনি যারা সর্ষের তেলে নিকৃষ্ট কিছু মিশিয়ে এত লোককে মেরেছে তাদের ইতিহাসটা মুছে দেওয়ার কাজ নিয়েছে ওর সংস্থা। যেন নতুন জামা পরিয়ে দিলেই পুরোনো সমস্ত অপরাধ ধুয়ে যাবে।
“প্রাথমিক একটা খসড়া খুব তাড়াতাড়ি তৈরি করে ওদের কাছে পাঠাতে হবে, বুঝলে? তুমি দেরি না করে কাজে লেগে পড়ো। এখন ওরা চাপে আছে এটাই সময় ওদের যতটা পারা যায় এক্সপ্লয়েট করার।” রমিত বললেন।
সভ্যতার প্রাথমিক শর্তটাই কী শোষণ? যে যাকে পারবে, যতটা পারবে, শোষণ করবে? সুচন্দ্রার ইচ্ছে হল তৎক্ষণাৎ চাকরিটা ছেড়ে দেয় কিন্তু এই পৃথিবীতে একজন সাধারণ মানুষ কতবারই বা নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী চলতে পারে?
তাই অসম্ভব একটা মনখারাপ নিয়ে প্রথমে নিজের কিউবিকলে আর তারপর বাড়িতে ফিরল। একা ঘরে শুয়ে ফেসবুকে দীপ্রর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে ওর মন চনমনে হয়ে উঠল অবশ্য। তখনই অ্যাকসেপ্ট না করে ও ওই ‘কনফার্ম’ শব্দটার দিকে তাকিয়ে রইল মোবাইলে। ভাবতে থাকল, দীপ্র করে কনফার্ম করবে, ওদের সম্পর্ক? আদৌ কী করবে? মা মাঝেমাঝে কীসব যেন বিড়বিড় করে। সুচন্দ্রা একদিন কান পেতে শুনে দেখেছে, মায়ের মনের ইচ্ছা হল যে ছেলেকে হারিয়েছে সেই ছেলেকে আবার জামাইয়ের ভেতর দিয়ে ফিরে পাবে। সেরকম কোনো ছেলে কী আসবে সুচন্দ্রার জীবনে? সেটা কী দীপই হবে?
ফেসবুকে দীপ্রর ছবিগুলো দেখতে দেখতে সুচন্দ্রার মনে পড়ছিল ওর বসের সেই কথা যে পরিচয় পালটে নিলেই ইতিহাসটা পালটে যায়। সুচন্দ্রা যদি পারত তাহলে এক্ষুনি ওর পরিচয় পালটে ‘সিঙ্গল’ থেকে ‘ম্যারিড’ হয়ে যেত। ভারতের নাগরিক থেকে এনআরআই হয়ে যেত, ওই অ্যাড এজেন্সির কর্মী থেকে দীপ্রর বউ হয়ে যেত। কিন্তু কিছুতেই খুনিদের ক্লিনচিট দিয়ে নতুন বিজ্ঞাপনের কপি লিখত না। কিছুতেই না।
সুজির পোলাও বানিয়ে মা ঘরে ঢুকল। ফেসবুক থেকে লগআউট হতে হতে সুচন্দ্রার হঠাৎ মনে হল, মুছে ফেলতে হবে এমন অতীত কী পৃথিবীতে সবার থাকে? দীপ্ররও আছে?
(৮)
আমেরিকা কী শুধু নিউইয়র্ক কিংবা লস অ্যাঞ্জেলসে? হতে পারে সেখানে হইহল্লা অনেক বেশি, পৃথিবীর বেশিরভাগ লোক ওসব জায়গাকেই আমেরিকা বলে ভাবে, টাইমস স্কোয়্যার কিংবা বেভারলি হিলস-এর নাম যতবার দেশবিদেশের খবরকাগজে বেরোয় তার কুড়িভাগের একভাগও অন্যান্য জায়গার কপালে জোটে না কিন্তু তাই বলে আমেরিকা মানেই ওরা নয়। আসল আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগর বা আটলান্টিকের পাড়ে নয়, আসল আমেরিকাকে খুঁজে পেতে হলে দেশটার ভেতরে ঢুকতে হবে, গভীরে যেতে হবে।
“ইস্ট কোস্ট বা ওয়েস্ট কোস্ট নয়, আমেরিকাকে অনুভব করতে হলে তোমাকে মিড ওয়েস্টে থাকতেই হবে। শীতগ্রীষ্মের তীক্ষ্ণতা, নদী জঙ্গল পাহাড়, সব পাবে তুমি ওখানে। আর পাবে মাইলের পর মাইল ভুট্টাক্ষেত। আমেরিকা যে কৃষির দৌলতেই জগতে প্রথম শক্তির জায়গাটা কবজা করেছিল, এটা আমরা ভুলে যাই আজকাল। কিন্তু তুমি যেখানে যাচ্ছ সেখানে দেখবে কত বিরাট বিরাট ফার্মহাউজ, চাষবাসের কী ঘটা। জানো, আমেরিকার চাষীরাও আমাদের মতোই পাঁজিপুথি মেনে বীজবপন করে, ফসল তোলে। তাদের অ্যালমানাক আর আমাদের পঞ্জিকা হরেদরে প্রায় একই জিনিস, আমি ওই মিড ওয়েস্টে গিয়েই টের পেয়েছিলাম।”
অঞ্জনবাবু মনের আনন্দে বলে যাচ্ছিলেন কিন্তু শুনতে শুনতে দীপ্র ভাবছিল, স্যার তো ছিলেন বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে, ক্যালিফোর্নিয়ায়। মাঝে মাঝে ছুটিছাটায় গেছেন হয়তো ওখানে আর আমাকে যে ওই আকাঁড়া আমেরিকায় গিয়ে থাকতে হবে; মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।
“একদমই বাঙালি নেই বোধহয় ওদিকটায়?” দীপ্র জিজ্ঞেস করল একসময়।
“আমি যখন গিয়েছি, তখন তো একেবারেই ছিল না। এখন হয়তো কয়েকঘর পেতেও পারো। তবে সাধারণত ইলিনয় পেরোলেই আর বাঙালির দেখা মেলে না। কিন্তু সে তো একপ্রকার ভালোই। বাঙালি থাকলেই তার সঙ্গে দলাদলি, বাজে তর্ক, পরনিন্দা পরচর্চা চলে আসবে। উলটোদিকে তুমি যে পরিবেশ পাবে তাতে দিনরাত গবেষণায় ডুবে থাকতে পারবে। ডিস্টার্ব করার মতো কিচ্ছু পাবে না কোথাও।”
দীপ্র ভাবছিল বলবে যে বাঙালি যদি এতই খারাপ তাহলে আপনি বাড়িতে পুজোর আয়োজন করে গুচ্ছের বাঙালি ছাত্রছাত্রী ডেকে আনেন কেন, সপ্তমী অষ্টমী নবমীতে? বলল না কারণ, স্যারকে হার্ট করার কোনো ইচ্ছে ওর ছিল না, আর দ্বিতীয়ত ও বুঝতে পারছিল যে স্যার যা বলছেন তার সবটাই ওকে মনের জোর দেওয়ার জন্য। নইলে বাঙালি কেন, বিশ্বের কারও ওপরেই এই আত্মভোলা মানুষটার তত কিছু রাগ নেই।
অঞ্জনবাবু উঠে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে দীপ্রর দিকে একটা মিষ্টির প্লেট এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার হেল্পিং হ্যান্ড দিন দুয়েকের জন্য দেশের বাড়ি গেছে …”
দীপ্র রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, “তাই বলে স্যার আপনি নিজে উঠে…”
“তাতে কী? দ্যাখো, আমেরিকায় তো সব কাজ নিজের হাতেই করতে হয় সবাইকে, কিন্তু ভারতে ফিরেই আমরা আবার কেমন বাবু হয়ে যাই। এই অভ্যাসটা ঠিক নয়।”
দীপ্র একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল শুনতে শুনতে, আচ্ছা স্যার কী জানেন ওঁর বাড়িতেই সুকন্যার সঙ্গে যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল, তা আজ আর নেই? ব্রেক আপ হয়ে গেছে স্যার? পিতৃপ্রতিম অঞ্জনবাবু কী ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত জীবনের খবর রাখেন?
তখনই দীপ্রকে খানিকটা চমকে দিয়েই অঞ্জনবাবু বলে উঠলেন, “মানুষ শেষ অবধি একাই এটা ভুলে যেও না। আর একা মানুষই বিশ্বজয় করতে পারে। তুমি এখানে যাচ্ছ শুনে, আমি আরও খুশি হয়েছিলাম কেন জানো? আজ নিউ জার্সির প্রতিটা অঞ্চলে শ’য়ে শ’য়ে বাঙালি থাকতে পারে কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে বাঙালির বিশ্বজয় এই মিড ওয়েস্টেই।”
“বুঝলাম না স্যার?”
“স্বামী বিবেকানন্দের কথা বলছি দীপ্র শুধু আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করে সেই নিঃসম্বল সন্ন্যাসী কোথায় গিয়েছিলেন? মিড ওয়েস্টের সবচেয়ে বড়ো শহর শিকাগোতেই তো। সেখান থেকেই সারা বিশ্ব বাঙালির কথা জানল প্রথম। তুমি যেখানে থাকবে সেখান থেকে শিকাগো বাসে তিন-চার ঘণ্টা, উইকেন্ডগুলোয় শিকাগো যাবে। ওই প্রবল ঠান্ডার ভেতরে গরম জামাকাপড় নেই, খাবার নেই, সিমলে পাড়ার নরেন্দ্রনাথ কীভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন তাও নিজের দেশ, নিজের ধর্ম, নিজের সংস্কৃতিকে? এ-কেবল আধ্যাত্মিকতার গল্প নয়, মানুষের অন্তঃস্থলে লুকিয়ে থাকা সাহস আর সম্ভাবনার গল্প। সেই গল্পটাকে তোমাকেও সত্যি করে তুলতে হবে। আর আমি জানি তুমি পারবে।”
*****
আমেরিকার ডোমেস্টিক ফ্লাইটগুলো খুবই ছোটো। মানুষের নড়াচড়া করাই দায়। পিনাকীদা ওকে বলেছিল একবার কথাটা, কিন্তু তখন দীপ্রর ওসব বোঝার মতো অবস্থা নাকি? আর তাছাড়া অচেনা জঙ্গলকে মানুষ ভয়ও পায় না। কিন্তু এখন যখন দীপ্র আমেরিকার মেইনল্যান্ডে ঢুকে পড়েছে, এখন যখন দীর্ঘ সেই রাজ্যে যাচ্ছে যার পূর্ব সীমান্তে মস্ত মিসিসিপি আর পশ্চিমে মিসৌরি নদী, যার ফসলক্ষেতের উর্বরতা সারা পৃথিবীর কৌতূহলের বিষয়, তখন সেখান থেকে কোথাও আসা যাওয়ার প্লেনগুলো কীরকম তাও ওর ভাবনাতে আসবেই।
স্যারের কথাগুলো থেকে ও জোর পেয়েছিল অনেকটা। আজ নেওয়ার্কে নামার পর যখন ওই পুলিশ অফিসার ওকে পিছু ডেকে জিজ্ঞেস করছিল ওর ওই প্রাক্তন সহযাত্রীর সম্পর্কে তখন দীপ্র পলকের জন্য একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চোখ বন্ধ করে স্বামীজির পাগড়ি পরা ছবিটার কথা কল্পনা করতেই দীপ্র কেমন একটা সাহস পেল মনে। খুব শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় জানিয়ে দিল যে ওই লোকটাকে ও চেনেও না।
“আমি প্লেনে তোমায় চকোলেট অফার করিনি?” ওই খালি গা, আন্ডারওয়্যার পরা লোকটা চেঁচিয়ে উঠল।
“এয়ারহোস্টেসরা আমায় যা খেতে দিয়েছিল, আমি শুধু তাই খেয়েছি।”
দীপ্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটার কাঁধে হাত রাখা অফিসার ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “সরি ফর দ্য ইনকনভিনিয়েন্স। ইউ মে গো নাও। অ্যান্ড বেস্ট অফ লাক।”
তিনঘণ্টা এয়ারপোর্টে বসে যখন ডিময়েন-এর প্লেনে উঠে বসেছে দীপ্র তখন একবার ওর অস্বস্তি হল, ঘটনাটার কথা ভেবে। পরক্ষণে একটা স্বস্তিও পেল এটা মনে করে যে আমেরিকায় অযথা হ্যারাস করা হয় না কাউকে। নইলে ওই অফিসার ওকে দু-মিনিটের মধ্যেই এগিয়ে যেতে বলতেন না।
ডিময়েন থেকে অ্যামেস চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার অবশ্য এখানে তো সব হিসেবই মাইলে। তা ওই তিরিশ যাবার জন্য কোনো না কোনো যানবাহন নিশ্চয়ই থাকবে এয়ারপোর্টে। এখানে জনসংখ্যা কম, অল্প লোক চড়ে বলে অন্তর্দেশীয় প্লেনগুলো ছোটো হতে পারে কিন্তু রাস্তাগুলো তো চওড়া। কতক্ষণই বা লাগবে ওর ইউনিভার্সিটির শহরে পৌঁছোতে?
মিসিসিপি আর ডিময়েন নদীর সংযোগস্থলে ফোর্ট ডিনারন তৈরি হয়েছিল ১৮৩৪ খৃস্টাব্দে। সেই দুর্গ এখন অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো শহর। অ্যামেসের লোকেরা ভালে বড়োসড়ো সওদা করার থাকলেও ডিমরেনে চলে আসে। দীপ্রকে ই-মেলে লিখেছিলেন ওর রিসার্চ গাইড। কিন্তু দীপ্র তে এখানে সওদা করতে আসেনি, তাই ডিময়েনে বেশি আসার দরকার পড়বে না ওর।
লাগেজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে শাটল ট্যাক্সির কৃপন কাটিছে হঠাৎ সামান্য শ্যামলা এবং চূড়ান্ত অ্যাট্রাকটিভ এক মহিলাকে মোবাইলে বাংলায় কথা বলতে বলতে এগিয়ে যেতে দেখল দীপ। বাঙালি? ডিময়েনে, বাঙালি? নিজের ভেতরকার সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে দীপ্র ডেকে উঠল, “শুনছেন?”
(৯)
ছোটো থেকেই বৃষ্টি ভীষণ ভালোবাসত মধুরা। কিন্তু ভালোবাসলে হবে কী, ওদের ওই এঁদোগলি আর ভাঙা চোরাপাড়ায় বৃষ্টি ছিল একটা অভিশাপ। একঘণ্টা দেড়ঘণ্টা বৃষ্টি হল কী হল না, হাঁটু জল জমে গেল। আর সেই জলে মহেঞ্জোদড়োর যুগ থেকে বৃটিশ আমলের নোংরা পর্যন্ত ভেসে বেড়াত। মরা কুকুর বেড়াল থেকে জ্যান্ত বেজি, সবাইকে ও ভাসতে দেখেছে ওই জলে। তার ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরলে তিনবার স্নান করেও তৃপ্তি হবে না মানুষের, কিন্তু সেই অন্ধকার কলঘরের চৌবাচ্চায় একবার স্নান করার মতো জলই কী থাকত সবসময়?
এলাকার কাউন্সিলরের কাছে, জল নামছে না কেন তাই নিয়ে ডেপুটেশন দিতে মধুরাও গেছে কয়েকবার। গিয়ে মুখ খেয়েছে। ভদ্রলোক পান চিবোতে চিবোতে বলতেন যে নাগরিকদের দোষেই গোটা অঞ্চল জল মগ্ন হয়ে থাকে; তারা কেন প্লাস্টিক ফেলে যত্রতত্র? সেই প্লাস্টিক গিয়ে নালার মুখ বুজিয়ে দেয় বলেই জল নামে না দু-দিন তিন দিন আর গোটা অঞ্চলটা একটা নরকের চেহারা নেয়।
“আমার সামনে এসে কাজ হবে না, আয়নার সামনে দাঁড়ান — তাহলেই বুঝতে পারবেন কার দোষে এই অবস্থা!” ঝাঁঝিয়ে উঠতেন কাউন্সিলর।
আশ্চর্য যে তারপরও উনি ভোটে জিততেন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কারণ অঙ্কের মাস্টারমশাই হিসেবে বিরাট পসার ছিল ভদ্রলোকের। ভোটের সময় এলে ওঁর বাঁধা বুলিই ছিল, “আমি না জিতলে আর কেউ লেটার পাবে না অঙ্কে, এইটুকু মনে রাখবেন।” কী আশ্চর্য ওই একটা হুমকিতেই কাজ হত; ঘরে ঘরে এইট নাইন টেন-এর ছেলেমেয়ে, দু-বছর তিন বছর কিংবা সামনের বছরই মাধ্যমিক, কেউ তাই চটাতে চাইত না স্থানীয় রাজমোহন হাইস্কুলের আকাশছোঁয়া খ্যাতিসম্পন্ন অঙ্কের স্যার বিনয় পালকে।
ওঁর কাছে প্রাইভেটে পড়তে গেলেই উনি আগে খোঁজ নিতেন, ছেলেটি বা মেয়েটির পরিবার ভোট দিয়েছে কাদের। যদি দেখা যেত যে তারা ওঁকে ভোট দেয়নি তাহলে তাদের রাত্রি ন-টা কিংবা দশটার ব্যাচে জায়গা হত কিংবা হতও না অনেকসময়। সে-কারণেই সকাল সাতটা থেকে বেলা দশটা, আবার বিকেল ছ-টা থেকে রাত্রি দশটা পর্যন্ত, একঘণ্টা দেড়ঘণ্টার ব্যাচে শ’য়ে শ’য়ে স্টুডেন্ট পড়ানো বিনয়বাবুকে কেউ চটাতে চাইত না সহজে।
ওই পড়ানোর মধ্যে মধ্যেই মানুষের কথাবার্তা, অভাব অভিযোগের কথাও শুনতেন বিনয়বাবু, ওদেরই যেমন শুনেছিলেন। কিন্তু ওঁর জনসংযোগ ছিল টিউশানি। সেই টিউশানির রমরমাতেই ওঁর দুটো বাড়ি, অ্যামবাসাডর গাড়ি কিন্তু বিনয়বাবু এমন একটা পর্দা ঝুলিয়ে রাখতেন সামনে যাতে কম বেশি অনেকেই বিশ্বাস করত, পয়সা নিলেও, উনি মূলত জনসেবার জন্যই টিউশানিটা করেন।
ওঁর কাছ থেকেই মধুরা শিখেছিল যে নিজের প্রয়োজনটা এমনভাবে সামনে আনতে হয় যাতে মনে হয়, নিজের ছাড়া পৃথিবীর সকলের প্রয়োজন ওটা। সেই শেখাটাকে কাজে লাগিয়ে মধুরা একবার একটা ছেলের ঘাড় ভেঙে সিনেমা দেখেছিল, হোটেলে খেয়েছিল, ভিক্টোরিয়াতেও গিয়েছিল। আর সেই যাওয়া এবং খাওয়ার মধ্যে ছেলেটাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছিল যে ছেলেটার মনে কষ্ট দিতে চাইছে না বলেই ও নিজের কাজ মুলতুবি রেখে এইসব যায়গায় যাচ্ছে।
খানিকটা বোকা ছিল বলে, আর খানিকটা মধুরার প্রেমে পড়েছিল বলেই হয়তো, সুদীপ নামের সেই ছেলেটা, মেনে নিয়েছিল মধুরার কথা। আর ভিক্টোরিয়ার সামনে তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মধুরা জেনেছিল, মেয়েদের জন্ম আসলে পরী হওয়ার জন্যই, কেবলমাত্র ভাগ্যের দোষে কাউকে কাউকে ঘুঁটেকুড়ুনি হয়ে থেকে যেতে হয়। না, ঘুঁটেকুড়ুনি হয়ে বাঁচবে বলে জন্মায়নি মধুরা। তাই নামের পাশাপাশি নিজের ভাগ্যও পালটে নিয়েছে। কিন্তু ভাগ্য এমন একটা জিনিস যে পালটাতেই থাকে ক্রমাগত, খারাপ থেকে ভালো নয়তো ভালো থেকে খারাপের দিকে। আর ভালো অবস্থা এলেই যারা ঢিল দেয় তাদের ভাগ্যে দ্রুতগতিতে আছড়ে পড়ে খারাপটা। মধুরা তো ঢিল দেওয়ার মেয়ে নয়। একবার একটা সিনেমায় ও দেখেছিল, সম্রাট নেপোলিয়ন যুদ্ধ চলাকালীন ঘোড়ার পিঠেই ঘুমোতেন। খুব ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল, জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ আর যুদ্ধের সঙ্গে জীবনকে এভাবেই মিলিয়ে নিতে হয়। নইলে হেরে যেতে হয়।
কিন্তু হেরে কী নেপোলিয়নও যাননি? নিজের সাম্রাজ্য ছেড়ে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে যেতে হয়নি তাঁকে? কী মনে হচ্ছিল তখন তাঁর? ভাগ্যং ফলতি সর্বত্রং?
না, মধুরা ভাগ্যকে জিততে দেবে না। যে ঝঞ্ঝাটা এসেছে, সেটা কয়েকদিনের। প্লাস্টিক নালার মুখে আটকে গেলে যেমন জল জমে যায় আর চারদিক থইথই করে, তেমনই একটা কিছু চলছে এখন। কিন্তু নালার মুখ আর প্লাস্টিক এই দুটো খুঁজে পেয়ে একটার থেকে আর একটাকে সরিয়ে দিতে পারলেই, জল জমে থাকবে না আর। নেমে যাবে। আর সেই খোঁজটা মধুরাকেই করতে হবে। শান্তনু নিশ্চয়ই সাহায্য করবে ওকে, লড়াইটা তো শান্তনুরও। কিন্তু মধুরা দেখেছে ও একটা রাস্তা বাতলে দিলে শান্তনু যত সহজে সেটা ধরে ছুটতে পারে, নিজে রাস্তা খুঁজে বের করতে পারে না তত সহজে। দরকার নেই। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় নাকি?
*****
ইয়ারফোনে বাজতে থাকা ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই’-এর সুরে শিস দিতে দিতে মধুরা বৃষ্টি দেখছিল। আমেরিকার বৃষ্টি আমেরিকার মতোই। হবে, থামবে, হবে। ওই সারাদিন ধরে টিপটিপ কিংবা মুষলধারে দু-তিন ঘণ্টা, এমন বৃষ্টি আমেরিকায় পায়নি ও। হতে পারে মিড ওয়েস্ট বলে ব্যাপারটা এরকম, ইস্ট বা ওয়েস্ট কোস্টে বৃষ্টির চরিত্র অন্যরকম। তবু যেটুকু যা শুনেছে বা ওদিকে গেছে যখন দেখেছে তাতে মনে হয়েছে আমেরিকার আর সবকিছুর মতো বৃষ্টিও প্রফেশনাল। তার আবেগতাড়িত হওয়ার কোনো স্কোপ নেই। সে আধঘন্টা তীব্রতার সঙ্গে ঝরবে তারপর থেমে যাবে। তারপর আবার …
আজ সকাল থেকেও দু-বার বৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যেই শান্তনুকে গ্লেনে তুলে দিতে এসেছিল মধুরা। দেখা যাক, নিউ ইয়র্কে যে কাজে যাচ্ছে তাতে ওদের অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয় নাকি। শান্তনু সিকিওরিটি চেক-এর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর ফিরতি পথে লোকটাকে চোখে পড়ল মধুরার। লোক নয় ছেলেই। তত কিছু গুরুত্ব না দিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইয়ারফোনটা কান থেকে খুলতেই হঠাৎ করে দূর থেকেই হাল্কা ভেসে এল সেই গানটার সুর। সেই গান। আট দশ বছর আগে যেটা শুনলেই মন আনচান করে উঠত ওর। “ও দয়াল বিচার করো, ও দয়াল বিচার করো, দাও না তারে ফাঁসি…” গুনগুন করছিল ছেলেটা।
আশ্চর্য! ডিময়েনে কাকে ফাঁসি দিতে এসেছে ও? নাকি নিজেই গলায় পরতে চাইছে, ফাঁস। তাহলে তো ওর সঙ্গে আলাপ করা দরকার মধুরার। কিন্তু যেচে আলাপ করলে কীভাবে নেবে ভেবে মধুরা এমনিই ফোনটা তুলে কথা বলতে শুরু করল, হাওয়ার সঙ্গে। বাংলায়।
গুজরাতি বা তামিল হলে চালটা না খাটতেও পারত। কিন্তু বাঙালি তো। নির্বান্ধব জায়গায় ‘বাংলা’ শুনলে সে একবার বাংলা বলে উঠবেই। ছেলেটাও পেছন থেকে ডেকে উঠল ওকে। মধুরা প্রথমে কিছু শুনতে পায়নি এমনভাবে এগিয়ে গেল। কিন্তু ছেলেটা নির্ঘাত আমেরিকায় নতুন। নইলে জানত যে সাড়া না পেলে এখানে কেউ দ্বিতীয়বার ডাকে না।
বেরোনোর গেটের ঠিক আগে পেছন ফিরল মধুরা। ওর সেই মানুষ বধ করা হাসিটা হেসে একটু গলা তুলে বাংলায় বলল, “আমাকে ডাকছেন, আপনি?”
ছেলেটা দ্রুত এগিয়ে আসতে থাকল ওর দিকে। মধুরার একবার মনে হল, সৌভাগ্য এগিয়ে আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে নিজেই ধমক দিল ও। অতটা কেন ভাবছে? ম্যাক্সিমাম ভাবতে পারে, আটকে থাকা প্লাস্টিকটা দেখতে পেয়েছে। এবার সেটাকে ওদিক থেকে এদিক সরাতে পারলেই জল নেমে যাবে আবার। আর বৃষ্টি কোনো ভয় নিয়ে আসবে না।
ছেলেটা যখন প্রায় সামনে তখন একবার দরজার দিকে তাকাল মধুরা। বাইরে মনে হয় বৃষ্টি নেমেছে, আবার।
