দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ১০
(১০)
লোকটার নাম রবার্ট। ভয়ংকর বদমেজাজি লোকটা। বিরাট একটা চাকরির দাপটে এর মাথা কাটে, ওকে শূলে চড়ায়। কিন্তু হারায় নিজের স্ত্রী-কে। অত খারাপ কথা সহ্য করে কেন মহিলা থাকবে? ওর স্ত্রী-ও থাকেনি। ডিভোর্স দিয়ে কেটে পড়েছে। আর সেই বিচ্ছেদের পরপরই লোকটার একটা বড় হার্ট অ্যাটাক হয়। খানিকটা ঘাবড়ে যায় লোকটা। টাকাপয়সা তো অনেকই কামিয়েছে তাই ডাক্তারের কথামতো চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে একটা আধাগ্রামে বড়ো বাড়ি কিনে রিটায়ার করে যায়। বাড়িটার সামনে বেশ অনেকটা জায়গা, ফার্মিং বা বাখান করার জন্য। আর সবচেয়ে যেটা সুন্দর তা হল ওই বাগানের পরই সরু একটা রাস্তা আর তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে চমৎকার একটা তিরতিরে নদী।
লোকটা একজনকে কাজে বহাল করে ওই বাগান ইত্যাদি দেখভাল করার জন্য। সেই বান্দার নাম অ্যান্ডি। অ্যান্ডিকে নিজের খাস চাকরই মনে করে রবার্ট। আর এটা দেখে ঘুমি হয় যে অ্যান্ডির তাতে কোনো অসুবিধাই নেই। মাঝে মাঝে একটু এক্সট্রা টাকা পেলেই যারপরনাই খুশি অ্যান্ডি, সব ম তামিল করতে প্রস্তুত।
দিন ভালোই কাটছিল রবার্টের। বাধ সাধল ওই ছোট্ট নদী। ওখানে মাছ ধরার ইচ্ছে হল ওর। কিন্তু ধরার আয়োজন করতে গিয়ে জানল যে নদীটা ওর প্রতিবেশি মার্ক-এর সম্পত্তির অংশ। একটু বিরক্ত হয়েই মার্কের কাছে অনুমতি চাইতে গেল লোকটা। জীবনের বেশিরভাগটাই যে হুকুম দিয়ে কাটিয়েছে শুনে নয়, তার পক্ষে কাজটা একটু কঠিনই কিন্তু রবার্ট ভেবেছিল মাসে পাঁচ হাজার ডলার অফার করলে মাঝ শুধু মাছ কেন, ওই ছোট্ট নদীতে তিমি মাছ যদি ভেসে আসে বাই চান্স, সেটাও ধরতে দেবে।
রবার্টকে যৎপরোনাস্তি অবাক করে মার্ক অনুমতি দিল না। টাকার অঙ্কটা পাঁচ থেকে দশ হাজার ডলার করেও রবার্ট অনুমতি পেল না। শুধু, রবার্ট যে ক-দিন বাঁচবে সেই ক-দিনই ওর মাছ ধরার অধিকার থাকবে নদীতে, ওর পরে ওর পরিবারের আর কেউ এই অধিকার দাবি করতে পারবে না, ইত্যাদি অনেক কথা বলেও রবার্ট মার্ককে রাজি করাতে পারল
না। মার্কের সাফ কথা, পারিবারিক সম্পত্তিতে তারা কাউকে অ্যালাও করে না। অতএব…
তেতো মুখে ফিরে এল রবার্ট। এবং হতাশাটা ভয়ংকর রাগে পরিণত হল, কয়েকঘণ্টার ভেতরেই। নিজেকে কী মনে করে ওই মার্ক নামের লোকটা? রবার্টকে চেনে ও? ওই নদীতে আজ নয় কাল মাছ ধরেই ছাড়বে রবার্ট। আর মার্ক কীভাবে আটকায় সেটাও দেখে নেবে।
কিন্তু রবার্ট মাছ ধরার আগেই ফ্রান্সের কলেজে পড়তে যাওয়া রবার্টের মেয়ে সিন্থিয়া একদিন তিনটে মাছ হাতে নিয়ে বাড়িতে ঢোকে।
একমাত্র মেয়ে, ওর ডিভোর্সের সময় যাকে প্যারিসে পাঠিয়ে দিয়েছিল রবার্ট, সে ক-দিনের ছুটি কাটাতে এলে কার না ভালো লাগে? রবার্টেরও লেগেছিল। মেয়ের সঙ্গে গল্পগুজব হচ্ছিল খুব। কিন্তু মেয়ের হাতে মাছ দেখে, মাথা খারাপ হয়ে যায় রবার্টের। ওর মনে হতে থাকে সিন্থিয়া বোধহয় কাউকে কিছু না জানিয়ে এই মাছগুলো ধরেছে, আর জানতে পারলে একটু পরেই মার্ক আসবে আইনি ঝামেলা করতে। সমস্ত ঝামেলা ফেস করার জন্য রবার্ট প্রস্তুত কিন্তু সিন্থিয়াকে ওতে জড়াতে দিতে চায় না রবার্ট, মেয়েটাকে প্যারিসে ফিরতে হবে তো।
সিন্থিয়া অবশ্য আর প্যারিসে ফেরে না। কারণ মার্কের ছেলে জো-র সঙ্গে মাখামাখি প্রেম আরম্ভ হয় তার। ব্যাপারটার সামান্য আঁচ অ্যান্ডি মারফৎ পেয়ে অগ্নিশর্মা হয়ে সিন্থিয়াকে তীব্র তিরস্কার করে রবার্ট। সিন্থিয়া চুপ করে শোনে। আর সাতদিনের ভেতরে জো-র সঙ্গে বস্টন পালিয়ে গিয়ে ফোন করে বাবাকে জানায় যে তারা দু-জন বিয়ে করেছে এবং রবার্ট যেন খুশি মনে মেনে নেয় ব্যাপারটা।
রবার্টের মাথা দপদপ করতে থাকে। ওর খালি মনে হয় যে ও পুরোপুরি হেরে গেছে। মার্কের নদী থেকে ও মাছ ধরতে পারেনি কিন্তু ওর জীবন থেকে মার্ক নিজের ছেলে জো-কে দিয়ে মাছের মতোই খলবলে সিন্থিয়াকে তুলে নিয়ে গেছে। প্রতিশোধ স্পৃহায় উন্মত্ত রবার্ট, অ্যান্ডিকে একটা কাজ দিয়ে সামনের শহরে পাঠায় আর মার্ককে কফি খেতে ডাকে নিজের বাড়িতে। যেহেতু ওরা এখন দুই বেয়াই তাই মার্ক সানন্দেই রবার্টের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে ওর বাড়িতে আসে এবং তারপরই রবার্ট নিজের বন্দুকের বাঁট ওর মাথায় বসিয়ে দেয় পেছন থেকে। একবার, দু-বার, তিনবার।
মরে যায় মার্ক। আর রবার্ট ওর মৃতদেহটা নদীতে ভাসিয়ে দেবে ভেবেও ভাসায় না। নিজের বাগানে যে কাকতাড়ুয়াটা দাঁড়িয়ে আছে তার শার্ট আর টুপি খুলে মৃত মার্ককে পরিয়ে দেয়। তারপর ওকেই দাঁড় করিয়ে দেয় কাকতাড়ুয়া হিসেবে। সত্যিকার কাকতাড়ুয়াটাকে সরিয়ে দিয়ে।
পুলিশ তন্নতন্ন করে খুঁজেও মার্কের হদিস পায় না। বাড়ির থেকে বেরিয়ে স্রেফ যেন উবে গেছে লোকটা। সিন্থিয়া আর জো গ্রামে ফিরে এসে রবার্টের সঙ্গে দেখা করলে রবার্ট ওদের দু-জনকেই সমবেদনা জানায় এবং আশা প্রকাশ করে যে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ওর মেয়ের শ্বশুর নিশ্চয়ই ফিরে আসবে একদিন। অ্যান্ডি একমাত্র আঁচ করতে পারে ব্যাপারটা কিন্তু ওর মুখ বন্ধ করানোর জন্য তো টাকাই যথেষ্ট।
রবার্ট একরকম বেঁচেই গিয়েছিল। কিন্তু হ্যালোইনের বিকেলে ভূত পেত্নি রাক্ষস খোক্কস সেজে বাচ্চাদের ঘুরতে বেরোনোর যে প্রথা, সেটাই কাল হল। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ওর বাগানে ঢুকে পড়া বাচ্চাগুলো কাকতাড়ুয়াটাকে ছুঁয়েই চিৎকার করে উঠল। আর ঘুমন্ত রবার্ট সেই চিৎকারে জানলার সামনে এসে বুঝল যে ওর খেলা শেষ। মুহূর্তের মধ্যে বাচ্চাগুলোর সৌজন্যে সারা গ্রামের লোক জানবে যে মার্কের মৃতদেহ ওর বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। আর গ্রামের লোক জানলে পুলিশ জানতে কতক্ষণ?
সেই পড়ন্ত বিকেলে নিজের রিভলভারটা নিজের মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার টেনে দেয় রবার্ট। কয়েকদিন পর ওর মেয়েজামাই আবার গ্রামে এলে মার্ককে কবর দেওয়া হয় এবং গ্রামের বাইরে কবর দেওয়া হয় রবার্টকেও। যদিও ওর জন্য মন্ত্রোচ্চারণ হয়নি কোনো।
“এটা আইওয়ারই ঘটনা। লোকমুখে অনেক কিছু জুড়েছে এবং বাদ পড়েছে কিন্তু মূল গল্প এটাই। আর এটা থেকে সিনেমাও হয়েছে জানো তো। যদিও সেটা ভালো চলেনি।” নাটকটা দেখে বেরিয়ে ওর গাইড হ্যারি টিফানথালার বললেন দীপ্রকে।
এই ক-দিনে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছে দীপ্র এখানে। আর নিজের কাজের প্রতি একনিষ্ঠ হলে, আমেরিকাতে মানিয়ে নেওয়া খুব কিছু কঠিনও নয়। কাজের বাইরে অন্য কিছু দেশটা বোঝে না তো। কাজ শুধু কাজ। তারপর পরিবার। ও কলকাতায় থাকেেত ভাবত আমেরিকায় লোকজন বোধহয় হেব্বি ফূর্তি করে দিনরাত। কিন্তু এখানে এসে দেখল, ব্যাপার ঠিক উলটো। সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজে ব্যস্ত লোকজন সন্ধে ছ-টার মধ্যে বাড়ি ফিরে গিয়ে বউয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাচ্চার দুধ গরম করে। কৃষ্ণাঙ্গ, এশিয়ান, লাতিনোরা সংখ্যায় অনেক বেড়ে যাচ্ছে সেই ভয়ে খাঁটি সাহেবরা এখন যত পারছে বাচ্চা নিচ্ছে। বিশেষ করে মিড ওয়েস্টে এই প্রবণতা খুবই বেশি। আর বাচ্চা বাড়লে স্বামী-স্ত্রী দু-জনের খাটনিই বাড়বে, এ আর বেশি কথা কী?
“দেশের দখল মাথা দিয়ে নিতে হয়, বাচ্চার সংখ্যা দিয়ে নয়। কিন্তু এই সরল সত্য তুমি বোঝাবে কাকে? আমেরিকার লোকজন বেশিরভাগই গাম্বাট তো। টিফানথালার কফি খেতে খেতে বললেন দীপ্রকে একদিন।
দীপ্র চুপ করে রইল। কারণ গাম্বাট হলেও লোকগুলোকে ভালোই লাগে ওর। অকারণে এরা কাঠি করে না কারও পেছনে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আরও যেটা ভালো সেটা হচ্ছে ইউনিভার্সিটির ডিনকে ইউনিভার্সিটির ট্যালেট পরিষ্কার করা লোকটা, বিকেল পাঁচটার পর ‘হাই বব’ বলে ডাকতে পারে। আর যাকে ডাকা হল সেও হাসিমুখেই, ‘হাই চার্লস’ বলে উত্তর দেবে। কেউ কারও চাকর বা মালিক নয়। একদিন টিভিতে একটা অনুষ্ঠানে দেখছিল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কোনো এক ভদ্রমহিলার কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন বলে তার বর এসে বলছে, কাঁধটা ছেড়ে কথা বলতে। কারণ বউটা প্রেসিডেন্টের নয়।
আচ্ছা, ডিময়েন এয়ারপোর্টে যে ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ হল, দীপ্র যদি তার সঙ্গে কথা বলে, তাহলে ভদ্রমহিলার হাজব্যান্ড কী রাগ করবেন? কিন্তু দীপ্র তো আর কাঁধে হাত রেখে কথা বলবে না।
নিজেই অবাক হল দীপ্র। ওর হঠাৎ করে কথা বলার ইচ্ছে জাগছে কেন ভেতরে? এমনটা তো ছিল না ও কখনও। তবে কী এই দশদিন যে ও ফোন ছাড়া আর কোথাও বাংলা বলেনি এবং শুনতেও পায়নি, সেটা একটা চাপ ফেলছে ওর ওপরে? মানুষের স্বভাব কী এতটাই পরিস্থিতির ওপরে নির্ভরশীল। নইলে দীপ্ররও কেন মনে হচ্ছে যে ওই ভদ্রমহিলাকে একবার ফোন করে, দেখা করে কথা বলে একটু।
ঘুমিয়ে গিয়ে দেখে আসা নাটকটাই আবার স্বপ্নে দেখল দীপ্র। দেখল যে দীপ্রই মার্ক হয়ে গেছে। মৃত মার্ক মানে সেই কাকতাড়ুয়া হয়ে গেছে। আর বাইরের কেউ কিছু বুঝতেই পারছে না। এমন সময় ওই ভদ্রমহিলা এগিয়ে এসে ছুঁচ্ছেন দীপ্রকে। আর ছুঁয়েই চিৎকার করে উঠছেন, “এ কী, আপনি মানুষ!”
দীপ্র অসহায়ের মতো বলছে, “কিন্তু আমাকে মেরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে জানেন তো। আপনি কী এমন কিছু করতে পারেন যাতে আমি আবার বেঁচে উঠি— হেঁটে চলে ঘুরে বেড়াই।”
ভদ্রমহিলা খিলখিল করে হেসে উঠছেন। যে হাসির সামনে মানুষ তো ছার, ভগবানেরও মাথা ঘুরতে বাধ্য।
ঘুমটা ভেঙে যেতে দীপ্র দেখল ঘামে ভিজে গেছে ওর গা। ওর মনে হল, ওর যে একটা মোবাইল হয়েছে সেই ভদ্রমহিলাকে একটা ফোন করে জানানো দরকার। পার্সের ভেতর থেকে কাগজের টুকরোটা বের করে ভবনি নিজের হাতে লিখে দেওয়া নামটা আবার পড়ল দীপ্র।
আচ্ছা কী বলে কথা শুরু করবে ও ওনার সঙ্গে? হ্যালো, বিশাখা বলছ? নাকি বিশাখা ম্যাডাম বলছেন?
(১১)
কলকাতার রাস্তায় দশটা লোককে দাঁড় করিয়ে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দেশ কোথায় ছিল, তাহলে ছয় থেকে সাতজন বলবে, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ফরিদপুর কিংবা বরিশাল। আমেরিকাতে যদি দশজনকে দাঁড় করিয়ে এই একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে বেশিরভাগ সময় দশজনের ভেতর দশজনই বলবে, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি কিংবা ভারত, চিন অথব আফ্রিকা মহাদেশ। আমেরিকার আদি বাসিন্দা মানে আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা একরকম মুছেই গেছে দেশটা থেকে; ইতিউতি অল্পস্বল্প টিকে আছে। ওকলাহোমা, কলোরাডো, নেব্রাস্কা, ডাকোটা, এই সব রাজ্যগুলোতেই ওই পুরোনো ইন্ডিয়ান ওরিজিন’এর লোকজনের খোঁজ মেলে বেশি। ওদের ভেতরে একটা কথা খুব প্রচলিত, ‘তুমি পৃথিবীর যত্ন নাও, পৃথিবীও তোমার যত্ন নেবে।’
শান্তনু দত্ত সেই কথাটাকেই একটু বদলে নিয়ে করেছে, ‘তুমি তোমার বউয়ের যত্ন নাও, তোমার বউও তাহলে তোমার যত্ন নেবে।’ কিন্তু মজাটা হল, বিশাখা এতটাই আত্মনির্ভর যে ওর যত্ন নেওয়ার জন্য তেমন কাউকে দরকার হয় না। ও নিজেই যথেষ্ট নিজের জন্য। আর পৃথিবীতে যে লোকগুলো নিজের সমস্যা নিজে সাল্টে নিতে পারে তাদের কাছেই অন্য অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নিজের নিজের সমস্যা মেটানোর জন্য।
শান্তনুর নিজের সমস্যাই কী মিটত বিশাখা ছাড়া? আর কীভাবে, কতটা রিস্ক নিয়ে বিশাখা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেটা জীবন থাকতে ভুলতে পারবে না শান্তনু।
“তুমি তো তার প্রতিদানও দিয়েছ। একটা প্যাঁচে পড়ে থাক মেয়েকে বিয়ে করে ইউএসএ নিয়ে এসেছ। নাও আনতে পারতে। সাতদিন আমার সঙ্গে মস্তি করে যদি কেটে পড়তে, আমি কী আটকাতে পারতাম বলো?” বিশাখা বলত।
“যে সাতদিনের জন্য তোমায় পেয়েছে তার পক্ষে কী আর সাতমিনিট তোমায় ছেড়ে থাকা সম্ভব?” উত্তর দিত শান্তনু।
“কেন সম্ভব নয়?”
“কারণ ছেড়ে দিলেই অন্য পাঁচজন ঝাঁপিয়ে পড়বে। তোমার যা রূপ তাতে…”
“ধ্যাত, রূপ আর ক-দিনের। আর আমি এমন কিছু রূপসীও নই।” বিশাখা খিলখিল করে হেসে উঠত।
সেই হাসির সামনে হাঁটু কাঁপত শান্তনুর প্রথম দিন যখন দেখেছিল তখন যেমন, আজও তেমন। একটা পাহাড়ি নদী যেমন নিজের চলার পথের সমস্ত পাথরকে গুঁড়িয়ে দেয় স্রোতের শক্তিতে, বিশাখাও তেমন পৃথিবীর সবপুরুষকে দিয়ে নিজের জুতো খোলাতে আবার পড়াতে পারে, শান্তনুর মনে হত।
“তোমায় দিয়ে কবে জুতো খুলিয়েছি?” বলতে বলতে শান্তনুর শার্টের বোতাম একটা একটা করে খুলত বিশাখা। শান্তনু উত্তেজনা আর আবেগে ফুটতে ফুটতে দেখত ওর সামনে একটা ময়াল বিরাট হাঁ করছে। জন্তুজানোয়ার কোন ছার, গোটা ব্রহ্মাও গিলে নেবে বলে।
*****
কিন্তু প্যাট্রিককে গিলতে পারল না বিশাখা। চেষ্টার কোনো ত্রুটি ও করেনি আর যথাসাধ্য যোগ্য সঙ্গত করে গেছে শান্তনু কিন্তু মঞ্চ তৈরি থাকলেও যেমন অনেক সময় গায়ক গান করে না, প্যাট্রিক সেভাবেই সাড়া দেয়নি ইশারায়। সাহেবগুলো এমনই রসকষহীন যে যৌনতার সাঙ্ঘাতিক আবেদনের কাছেও মেশিনের মতো বসে থাকে। কিংবা যে কাজের জন্য প্রোগ্রামড সেটাই করে। একটু গতের বাইরে গিয়ে ভাবতে পারে না। কিংবা এমনও হতে পারে যে এই হাজারও উদ্বাস্তুর স্বর্গরাজ্য আমেরিকা, ভগবান নিজেও সেটলার যেখানে, আইনের সুতোয় এমন শক্ত করে বাঁধা যে প্যাট্রিকের মতো লোকদের মেশিন হয়েই থাকতে হয়। পান থেকে চুন খসলেই এখানে আইন এসে গলা টিপে ধরে। রাস্তায় স্পিডলিমিট ভাঙলে আইন, বারে মদ খেতে খেতে চিৎকার করে উঠলেও আইন। শান্তনুর পরিচিত একটি ছেলের বাবা দেশ থেকে আসার পরপরই গ্রেফতার হয়ে গেলেন এই আইনের ঠেলায়। সুগারের পেশেন্ট সেই বয়স্ক ভদ্রলোক বেগ সামলাতে না পেরে ছেলেকে হাইওয়ের ধারে গাড়িটা একটু রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু জঙ্গল সমান ঘন গাছের সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে বিয়োগ করছেন যখন তখনই পুলিশের গাড়ি চলে আসে স্পটে এবং সত্তর পেরোনো ভদ্রলোককে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়।
“আচ্ছা ওরা কী ওই জঙ্গলে সেনসর বসিয়ে রেখেছিল নাকি? নইলে টের পেল কী করে?” ছেলেটি পরে জিজ্ঞেস করেছিল শান্তনুকে।
শান্তনু কোনো উত্তর না পারলেও অনুভব করেছিল যে এই দেশটার সর্বত্র সেনসর। আইনের বাইরে এক পা গেলেই ধরবে।
“সেক্ষেত্রে আইনটাকে ব্যবহার করেই এগোতে হবে। বে-আইনি কাজগুলো করার জন্য সেই সিঁড়ি দিয়েই উঠতে বা নামতে হবে, আইনি কাজগুলো করে যেগুলো দিয়ে ওঠা বা নামা যায়।” বিশাখা ওর দুর্ভাবনার কথা জেনে বলেছিল।
“আইন মাফিক আইনের ফাঁক গলে বেরোব? কীভাবে সম্ভব সেটা?” শান্তনু অবাক হয়েছিল।
“ভাবতে দাও। এত ইনস্ট্যান্টলি এসব কাজ করা যায় না।” কথাটা বলে সামনে থেকে সরে গিয়েছিল বিশাখা।
শান্তনু একটা নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ভাবুক, বিশাখাই ভাবুক। ওর মাথা অনেক বেশি শাপ। ও যে রাস্তা ঠিক করবে সেটা ধরে এগোলে নিশ্চয়ই এই বিপদ থেকে পরিত্রাণের একটা রাস্তা পাওয়া যাবে।
নিউইয়র্কে যে আশা নিয়ে গিয়েছিল সেই আশা একটুও না মেটায় ধ্বসে গিয়েছিল শান্তনু। ডিময়েনে ফিরেই বোতল নিয়ে বসেছিল।
বিশাখা ওর দিকে কর্ডলেসটা এগিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “চমকাবে কিন্তু ধমকাবে না।’
শান্তনু চুপচাপ ফোনটা ওর হাত থেকে নিয়ে নিল। বিশাখা যখন কাজটা করতে বলছে তখন নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।
“হ্যালো; হুজ স্পিকিং?” গলাটা ভারী করে জিজ্ঞেস করল শান্তনু।
(১২)
বিজ্ঞাপনের কপিটা একরকম তৈরিই করে ফেলে সুচন্দ্রা। ‘পড়বে মনে আজ/সাবেককালের ঝাঁঝ’ এই শব্দবন্ধটা লিখেও যখন ওর বসকে গিয়ে দেখায়, উনি বেশ খুশি হন। তারপর এটা ওটা বলতে বলতে বলেন, আরও কিছু অ্যাড করা যায় কী না, সেটা দেখতে। ওঁর চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে সুচন্দ্রা ভাবছিল যদি সত্যিই কিছু অ্যাড করতে পারত তাহলে লিখত যে, ভীষণ বিষাক্ত একটা সাপ নিজের নাম বদলে ফিরে আসছে, চেহারাও কিছুটা অন্যরকম হবে হয়তো, কিন্তু মূল ব্যাপারটা পালটাবে না তাতে। অতএব চারপাশের সবাই খুব সাবধান।
সত্যি করে এই কথাগুলো লিখতে বা বলতে পারলেই শাস্তি পেত সুচন্দ্রা, খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠত যদি চাকরিটায় লাগি মেরে বেরিয়ে আসতে পারত কিন্তু জীবনে মানুষ যা চায়, তার কতটুকুই বা করে উঠতে পারে। হাসপাতালে এর আত্মীয়রা যখন ওকে খোঁচাচ্ছিল, বাবার শরীর আগে থেকে কোনো অসুবিধার কথা জানান দিয়েছিল কী না, জানতে চেয়ে, ওর মনে হয়েছিল ওদের মুখের ওপর বলে দেয়, এত এত বছর যে মানুষটার শরীর কিংবা মন কিছুরই খোঁজ নেননি, আজ হঠাৎ করে তার বাঁচা-মরা নিয়ে এত চিন্তা না করলেও চলবে।
কিন্তু বলেনি, কারণ হাসপাতালে ওর বাবাকে যারা দেখতে এসেছে, সমাজের নিয়ম অনুসারে তারা সবাই ওর এবং মায়ের কৃতজ্ঞতার পাত্র। তারা নিজেদের ব্যস্ত শিডিউল থেকে সময় বের করে বাবাকে যে দেখতে এসেছে অন্তত তাতেই কৃতার্থ হয়ে যাওয়া উচিৎ ওদের। এসব ভেবেই চুপ করেছিল সুচন্দ্রা- নকল একটা হাসি মুখে ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর ভাবছিল, অফিস থেকে যতটা টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে, তার বাইরে আরও কতটা টাকা লাগবে, বাবার বুকে স্টেন্ট বসানোর জন্য।
বসেইছিল বাবা। বসে বসে ওর সঙ্গে গল্প করছিল রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর। মা রান্নাঘরে বাসনপত্র গুছিয়ে রাখছিল সিঙ্কে। হঠাৎ সুচন্দ্রা খেয়াল করে বাবা খুব ঘামছে। বৃষ্টি হয়েছে, তাপমাত্রা বেশ খানিকটা কম কিন্তু তাও বাবার কপালজোড়া ঘাম দেখে অবাক লাগে সুচন্দ্রার। প্রথমে কিছু না বললেও, একটু পরেই ও জিজ্ঞেস করে, “শরীর ঠিক আছে তো বাবা?”
“ঠিকই তো ছিল। কিন্তু এখন কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে।” কীরকম একটা জড়ানো গলায় উত্তর দেয় বাবা।
“বাবাকে সন্ধেবেলা প্রেশারের ওষুধটা দিয়েছিলে মা?” সুচন্দ্রা হাঁক পাড়ে।
“হ্যাঁ, দেব না কেন?” বলতে বলতে ঘরে ঢোকে মা।
ওইটুকু সময়ের মধ্যে বাবা বুকে একটা হাত দিয়ে শুয়ে পড়েছে বিছানায় আর কীরকম যেন ছটফট করছে।
সুচন্দ্রা হকচকিয়ে যায় প্রথমটা। তারপর নাইটি পরেই নীচে নেমে গিয়ে রাস্তাটা ক্রস করলেই যে ওষুধের দোকান সেখানে গিয়েছিল, ডাক্তারের খোঁজে। কিন্তু, না, ডাক্তার অতক্ষণ বসে থাকেন না দোকানে আর এখন ফোনেও তাকে পাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেয় দোকানি। তারপর লোকটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই সূচন্দ্রাকে বলে যে এখন কলকাতা শহরে রাতবিরেতে ডাক্তার পাওয়া যায় না। সেরকম অসুবিধে বুঝলে সুচন্দ্রা যেন কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে ফোন করে। তারাই অ্যামবুলেন্স পাঠিয়ে পেশেন্টকে নিয়ে যাবে।
“প্রাইভেট হাসপাতাল মানে তো অনেক টাকার ব্যাপার। পারবি?” ভয় আর কান্নার ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করেছিল মা।
“এখন ওসব ভাবার সময় নেই মা। সরকারী হাসপাতালে গিয়ে যদি বেড না পাই, কী হবে তখন?” সুচন্দ্রা দিয়েছিল।
তারপর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মানুষ যেভাবে কাজ শুর সেভাবেই বাবাকে নিয়ে এসে ভরতি করিয়েছিল এখানে। ফ্ল্যাটের কেয়ারটেকার, এক দু-জন প্রতিবেশি সাহায্য করেছিলেন অনেকটা। বাবা ততক্ষণে কাটা পাঁঠার মতো দাপাতে শু করেছে। অ্যাম্বুলান্সের ভেতর বাবার হাতটা ধরে বসেছিল সুচন্দ্রা। আর সারাক্ষণ চেষ্টা করছিল অনভ্যস্ত আঙুলগুলে দিয়ে বাবার পালস মাপার। ক্ষণে পাচ্ছিল, ক্ষণে হারাচ্ছিল। আর চোরাস্রোতের মতো একটা ভয় এসে শুকিয়ে দিচ্ছিল গলার ভেতরটা। মনে হচ্ছিল, শক্তপোক্ত কেউ যদি পাশে থাকত এই সময়টা।
বাবার হার্ট-অ্যাটাকই হয়েছিল। আর ষাট পেরোনো একটা মানুষের হার্ট-অ্যাটাক মানেই লাইফরিস্ক। তবু আয়ু থাকলে তো মানুষ মরে না, আর যে ডাক্তার বাবার চিকিৎসা করছিলেন, তিনিও অসম্ভব দক্ষ। সুচন্দ্রা আর ওর মায়ের সব আশঙ্কার নিরসন করে বললেন যে আপাতত দুটো স্টেন্ট বসালেই চলবে, বাইপাস ইত্যাদির কোনো দরকার নেই। কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এসেছিল সুচন্দ্রার। সেই কৃতজ্ঞতা ওর অফিসের প্রতিও জন্মাল যখন খুব দ্রুততার সঙ্গে ওর অ্যাপ্লিকেশনের উত্তরে ষাট হাজার টাকা মঞ্জুর করে দেওয়া হল। বিপদে পড়লে কৃতজ্ঞতার বোধটাই হয়তো বেশি জাগ্রত হয়ে ওঠে, যে আত্মীয়দের প্রথম দিন দেখে গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল তারা আবার পরদিন ভিজিটিং আওয়ারে এলে, কেন মনে হল, কোথাও না কোথাও ওরাও নিশ্চয়ই কিছু ফিল করে।
দীপ্রর মা খবরটা পেয়ে দেখতে এসেছিলেন হাসপাতালে বাবার সামনে একটাই টুল, সেটায় বসে বলছিলেন, “কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা তো আছি।”
বাবার গলা কেঁপে গিয়েছিল, “মেয়েটার দায়িত্ব….”
“আপনার মেয়ে যেরকম স্ট্রং তাতে ওর দায়িত্ব কারও নেবার দরকার নেই। আমার তো মনে হয় ওই একটা সংসারের দায়িত্ব নিতে পারবে হেসে খেলে।”
“সে তো আপনাদের ওপর নির্ভর করছে।” মা বলে উঠেছিল।
সূচন্দ্রার অস্বস্তি লাগছিল। হাসপাতালের ওই একটা ঘরে, আরও চারজন রুগীর সঙ্গে শুয়ে থাকা ওর বাবার সামনে দীর্ঘ আর ওর মা ছাড়াও, তখন সুচন্দ্রা নিজে এবং ওর এক মাসি। সুচন্দ্রা চাইছিল না মাসির সামনেই এইসব কথাবার্তা হোক এবং ছড়াক, কারণ যার সঙ্গে ওর বিয়ে হবার কথা সে তো নিজে থেকে একটা ফোনও করেনি সুচন্দ্রাকে। লজ্জার মাথা খেয়ে সুচন্দ্রা ফেসবুকে ঘটনাটার কথা মেসেজ করেছে দীপ্রকে। সেই মেসেজ দীপ্র যে দেখেছে, ফেসবুক তাও দেখাচ্ছে। কিন্তু তারপরও কোনো ফোন আসেনি তো সুচন্দ্রার কাছে।
“আপনার ছেলে জানে?”
“জানাব আমি, আজ বা কাল ও ফোন করলেই।” সুচন্দ্রার মায়ের কথার উত্তরে জবাব দিয়েছিলেন দীপ্রর মা।
সুচন্দ্রা তখন স্বাভাবিক সঙ্কোচেই বলতে পারেনি যে দীপ্রকে ও ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ভিজিটিং আওয়ার শেষ হওয়ার পর ওর সঙ্গে লিফটে নামতে নামতে দীপ্রর মা যখন ওকে বললেন যে কোনো সমস্যায় ওঁকে জানাতে দ্বিধা না করতে, সুচন্দ্রা চুপ করে থাকতে পারল না আর।
“ঠিক কোন্ অধিকারে জানাব বলুন তো?” ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল সুচন্দ্রা।
(১৩)
আইওয়াতো আমেরিকার শস্যভাণ্ডার বলে পরিচিত। কিন্তু এখানে উৎপাদিত অধিকাংশ গম আর ভুট্টাই আমেরিকার গরু আর শুয়োরদের খাওয়াতে চলে যায়।
“তাহলে আমেরিকানরা কোথাকার গম খায়?” দীপ্র জিজ্ঞেস করেছিল টিফানথালারকে।
“মেক্সিকো থেকে আসে, আরও অন্যান্য জায়গা থেকেও।” একটু অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দিল, টিফানথালার। তারপর বেশ উত্তেজিত হয়ে যোগ করল, “মাংস প্রোডিউস করার খরচ শুনলে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। কৃত্রিমভাবে গরু আর শুয়োরদের মোটা করতে গিয়ে কত শস্য যে খাওয়াতে হচ্ছে ওদের, তার ইয়ত্তা নেই। এই করতে গিয়ে প্রকৃতির ওপর সাঙ্ঘাতিক চাপ সৃষ্টি করছি আমরা। কিন্তু মাংস চাই, আরও মাংস চাই, এই হয়ে দাঁড়িয়েছে লক্ষ্য। এর ফল খুব খারাপ হবে, আমি বলে দিচ্ছি তোমায়।”
দীপ্রর বিরক্ত লাগছিল ওইসব কথা শুনতে। আমেরিকাতে এসেছে চুটিয়ে স্টেক আর রিব খাবে বলে, কিন্তু এখানেও এখন এইসব ‘ভেগান’-দের বাড়বাড়ন্ত শুরু হয়েছে। যেন সারাজীবন নিরামিষ খেয়ে শুকিয়ে থাকবে বলে মানুষ দুনিয়ায় এসেছে।
সেদিন রাতে জমিয়ে হ্যামবার্গার খেলে দীর্ঘ। কিন্তু তারপরই ফোন করে যা ঝাড় খেল তেমনটাও জীবনে কমই খেয়েছে। আশ্চর্য, ভদ্রমহিলা নিজেই তো ফোন করতে বলেছিলেন। এবং সেটাও একটা উইকএন্ডে। তাহলে শনিবার রাতে ফোন করে অন্যায়টা কী করল দী?
“কী ব্যাপার, কেন ফোন করেছেন?”
“আমি মানে, বিশাখাকে…” দীর্ঘ তুতলে গেল।
“বিশাখা কী আপনার ক্লাসমেট? এমনভাবে কথা বলেছেন মনে হচ্ছে বহু বছরের চেনা। কোথায় পরিচয় হয়েছিল, বলুন!”
“অ্যাকচুয়ালি এয়ারপোর্টে উনিই নাম্বারটা দিয়েছিলেন।”
“আপনি চেয়েছিলেন বলেই দিয়েছিলেন নিশ্চয়ই। যেচে তো আর দিতে যায়নি।”
“আমি বোঝাতে পারছি না ঠিক ……”
“কিচ্ছু বোঝাবার দরকার নেই। টেল মি ইয়োর নেম অ্যান্ড অ্যাড্রেস। বিশাখা আপনার নাম শুনে যদি জরুরি মনে করে, তাহলে রিংব্যাক করবে আপনাকে। আর ওর কথা শুনে যদি বুঝতে পারি যে আপনি ফালতু কলার, বিরক্ত করার জন্য ফোন করেছেন, তাহলে ফোনটা আমি করব। অ্যান্ড বি প্রিপেয়ার্ড ফর দ্যট অলসো।”
দীপ্র ফোনটা ছেড়ে ওম হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। আর নিজের ওপর ধিক্কারের সঙ্গেই গোটা পৃথিবীর যেখানে যত মেয়ে আছে, সবার প্রতি প্রচণ্ড রাগ জন্মাল ওর, ইচ্ছে করল রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, মেয়েদের নামে যা নয় তাই বলে। কেন তারা গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়, কেন আশা দিয়ে আশা ভাঙে, কেন পশ্চিমে যাবে বলে উত্তরে গিয়ে দাঁড়ায়, কেন তারা এমনভাবে হাসে যে হাসির ইশারায় নিশি পাওয়া মানুষের মতো রাস্তায় বেরিয়ে আসে পুরুষেরা আর তারপর টের পায়, রাস্তা নয় এ আসলে এক বিরাট সুড়ঙ্গ যার শেষে কোনো আলো চোখে পড়ছে না।
মায়ের ফোনটা তখনই আসে। দীপ্র প্রথমবার না ধরলেও আবার আসে। আর দীপ্রর মনে পড়ে যায় যে ওর মা, ওর বোনও মেয়ে। তবু রাগ কমে না ওর। গায়ে জলবিছুটি ঘসে দিলে যেমন জ্বলে তেমনই জ্বলে যেতে থাকে ওর অন্তরাত্মা। ইচ্ছে করে ওই বিশাখার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেন এতটা অপমান করলেন আমাকে? আমি কী ক্ষতি করেছি আপনার?”
মা দু-একটা অন্য কথার পর বলে, “জানিস তো সুচন্দ্রার বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। এখন ভালোই আছেন কিন্তু বেশ বাড়াবাড়িই হয়েছিল। মেয়েটা একা হাতে যেভাবে সব সামলেছে শুনলাম তাতে কিন্তু আমার ওকে খুব ভরসাযোগ্য মনে হয়েছে।”
“আমার এখন এসব শোনার মুড নেই মা।” ভীষণ ক্লান্ত আমি আজ।
“মুড নেই বললে, তো হবে না, কথা শুনতে হবে। এখানে কোথায় কী হচ্ছে সব জানতে হবে। আজ ওই মেয়েটার বাবার কী হয়েছে তা শুনতে চাইছ না, এরপর নিজের বাবা মা-র কিছু হয়েছে শুনলে কী করবে? ফোন কেটে দেবে?”
“বাজে বোকো না তো। আমি জানি ওর বাবার কী হয়েছে।”
“কী জানিস? কীভাবে জানিস?”
“ওই মেয়েটাই ফেসবুকে জানিয়েছে আমায়।”
“বাহ। খুব ভালো। তা জানিয়েছে মানে তোর একটা ফোন এক্সপেক্ট করছে মেয়েটা। করেছিলি সেই ফোন?”
“না করিনি।”
“তাহলে একটা ফোন কর বাবা।” মা অনুরোধের গলায় বলল।
“না ফোন করব না, আমি আর কোনো মেয়েকে কোনোদিন ফোন করব না। কেন ফোন করব? অপমানিত হতে?” দীপ্র চেঁচিয়ে উঠল।
***
আমেরিকায় আসার আগেই একটা সিনেমা দেখেছিল দীপ্র, সেখানে বেশ বড়োসড়ো একটা মোরগ লালমাটির পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে। সদ্য ভোর হয়েছে, ঘাসের শিশির ঝলমল করছে রোদে। হঠাৎ মোরগটা শুনতে পায় একটা মুরগি ডাকছে। মুরগির প্রেমের ডাক ওটা মোরগটা বুঝতে পারে। সে এদিক তাকায়, ওদিক তাকায়। তারপর ডাকটা কানে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। এক পা যায়, দুপা যায়, দশ পা যায়। আবার ডেকে ওঠে মুরগিটা। সেই ডাক শুনে মোরগটা যেন পাগল হয়ে ওঠে। দ্রুতপদে এগিয়ে যেতে থাকে। যেতে যেতে যেতে তিন চারটে গাছের ফাঁক গলে একটা খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আর দাঁড়াতেই দুম করে এয়ারগান থেকে গুলি ছুটে এসে লাগে ওর বুকে। ছিটকে পড়ে মোরগটা। সামনে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসতে থাকে শিকারি। তার হাতে একটা ছোট্ট টেপ রেকর্ডার যাতে মুরগির ডাকটা রেকর্ড করা।
পৃথিবীতে অনেক রকম শব্দ শুনে মানুষকে সতর্ক থাকতে হয়। কেউ পারে, কেউ পারে না। বিশাখা বউদির, নাকি বিশাখারই হাসির শব্দটা শুনে যদি প্রথম দিনই মনে হত ও মুরগিটার কথা, তাহলে এত কথা থোড়াই শুনতে হত? মায়ের ফোনটা রেখে দিয়ে ভাবছিল দীপ্র।
কিন্তু যা মনে হয়নি, তা কেন মনে হয়নি, ভেবে লাভ কী? তার চেয়ে যা হয়ে গেছে তাকে ভুলে সামনের দিকে তাকানোটাই কী শ্রেয় নয়? ভাবতে ভাবতে দীপ্র ফেসবুক খুলে ইনবক্সে গেল, “বাবা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন, আশা রাখছি লিখে মেসেজটা পাঠিয়ে দিল সুচন্দ্রাকে। তারপর ওর প্রোফাইলে গিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। বেশ একটা ‘শ্রী’ আছে মেয়েটার মুখে। বউ হলে খারাপ লাগবে না। আর তাছাড়া মায়ের যখন এত পছন্দ তখন দীপ্নই বা জেদ ধরে থেকে করবে কী? নিজের জন্য নিজে কাউকে জোটাতে না পারলে, অন্যের পছন্দেই আস্থা রাখতে হবে। আর সেই ‘অন্য’ যদি নিজের মা হয় তাহলে ভরসাটা সহজেই রাখা যায়। যাওয়া উচিৎ। ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করল দীপ্র। আর বন্ধ চোখের ওপাশে সেই হাসিটা বেজে উঠল আবার। সেই ঝরনা যেটা আবার অনেকটা নদীর মতোও বইতে শুরু করল যেন। বাঁ-দিকের গজদাঁতটা থেকে ঝলসে ওঠা আলো পৃথিবীর সব বন্ধ চোখ ভেদ করে হৃৎপিণ্ড অবধি পৌঁছে যেতে পারে দীপ্রর মনে হল। ওই এয়ারপোর্টের দেখাটাই কী প্রথম আর শেষ দেখা? আর একবার দেখাও হবে না, বিশাখার সঙ্গে?
(১৪)
মিড ওয়েস্টের ছোট্ট শহর অ্যামেস। এখানে চোখধাঁধানো কোনো স্থাপত্য নেই, নেই চমকে দেওয়া ডাউনটাউন। আধাঘুমন্ত এই শহরটা পড়াশোনার কারণেই বিখ্যাত আর সেই সূত্রে আমেরিকার ভেতরকার এবং বাইরের দেশের অনেক ছেলেমেয়ে আসে এখানে। আর যেহেতু আইওয়ার মাটি একদম সোনা সোনা, তাই কেবল ভুট্টা বা গম নয়, হরেকরকম সবজি বেশ কম দামেই পাওয়া যায় এখানে।
মোবাথা বলে দক্ষিণ আফ্রিকার একটি ছেলেও টিফানথালারের কাছেই রিসার্চ করছে। কয়েকদিনেই দীপ্রকে বেশ আপন করে নিয়েছে ছেলেটা। যদিও কথা একটু বেশি বলে তবু দীপ্রর বেশ ভালো লাগে যখন মোবাথা ওকে অ্যামেসের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রাপ্ত নিয়ে যায়। ওই মোবাথার হাত ধরেই ফার্মার্স মার্কেট চিনেছিল দীপ্র। কত কত চাষী সেখানে নিজের ক্ষেতের সদ্য উৎপাদিত ফসল নিয়ে আসেন এবং সরাসরি বিক্রি করেন খরিদ্দারকে। বিরাট বিরাট সব কুমড়ো, বড়ো বড়ো বেগুন, তেজি সব ঢ্যাঁড়স। ঢ্যাঁড়সকে এরা ‘ওকরা’ বলে, বেগুনকে ‘এগপ্ল্যান্ট’। কোথাও কোনো দালাল নেই, ফড়ে নেই, দরদামও তেমন একটা নেই, শুধু উৎপাদক আর ক্রেতা মুখোমুখি। ওই চাষীবাজারেই আবার আইওয়ার বিখ্যাত আপেল এবং তা থেকে তৈরি অ্যাপেল টার্ট, অ্যাপেল পাই নিয়ে বসে থাকে অনেকে। কী অপূর্ব সেসবের স্বাদ।
“আপেল ভালোবাসো তুমি? তাহলে তোমায় একটা জায়গায় নিয়ে যাব।” মোবাথা দীপ্রকে বলল একদিন।
আর তারপর একটা শনিবার সকালে সাইকেলে চেপে ওরা সুজন রওনা দিল শহর থেকে দূরে একটা আপেল বাগানের দিকে। কলকাতা হলে অতক্ষণ সাইকেল চালাতে পারত না দীপ্ত কিন্তু এমনই আবহাওয়ার গুণ এই মিডওয়েস্টের যে সহজে ক্লান্ত হয় না কেউ। সাইকেলকে এরা ‘বাইক’ বলে আর রাস্তাঘাটে গাড়ি নয় এই বাইকেরই ভিড়। দু-বার থেমে শেষমেষ যেখানে গিয়ে পৌঁছল সেই জায়গাটা বাইরে থেকে আলাদা কিছুই নয়, গেট পেরিয়ে ঢোকার পরও তেমন কিছু না, কিন্তু টিকিট কাটার পর আরও অনেক টুরিস্টের সঙ্গে একটা ট্যাক্টরের মতো গাড়িতে চেপে যেখানে গিয়ে পৌঁছোল, তেমন কিছু আগে সত্যিই দেখেনি দীপ্র। চারপাশের গাছে থোকা থোকা আপেল। কোনোটা লাল, কোনোটা খয়েরি, কোনোটা একটু মেরুন, কোনোটায় বা সবজেটে আভা।
“খাও না, যত ইচ্ছা খাও। ফ্রি তো।” মোবাথা বলল। “ফ্রি মানে? দাম নেই এই আপেলগুলোর?” দীপ্র অবাকই হল।
“হে হে। তুমি আইওয়ার আপেল বাগানের নিয়ম জানো না? বাগানে ঘুরতে ঘুরতে তুমি যত আপেল খাবে, তার একটার জন্যেও দাম দিতে হবে না তোমায়। কিন্তু ঝুড়িতে করে যে-কটা বাইরে নিয়ে যাবে, তার জন্য চার্জ করা হবে তোমায়।”
“ভালো নিয়ম তো।”
“ইয়েস স্যার। প্রথম যখন ইউএসএ-তে এসেছি, স্কলারশিপের টাকা পাচ্ছি না, তখন এই আপেল খেয়েই তো দিন কাটত। এক একদিন পনেরো কুড়িটা করেও আপেল খেয়েছি। বাগান ঘুরে ঘুরে।”
মোবাথার কথায় হেসে ফেলল দীপ্র। কুড়ি মাইলের ওপর সাইকেল চালিয়ে দিনের পর দিন একটা লোক আপেল খেতে যাচ্ছে, শুনলে মজাই লাগে।
আচ্ছা আপেলের বদলে যদি ভাত হত, তাহলে কী মজা লাগত? মোটেই না, কারণ অ্যানেসে আসা ইস্তক ভাত না খেয়ে দীপ্রর পাগল পাগল লাগছিল। এখানে ভারতীয় তেমন নেই বলে ইন্ডিয়ান হোটেলও নেই তেমন। যাও বা একটা পাঞ্জাবি হোটেল আছে, তারা রুটি পরোটা তন্দুরিই করে। সঙ্গে হরেক সবজি আর মাংস। কিন্তু ভাতের কোনো সুবিধা সেখানে দেখেনি দীপ্র।
“তুমি আমার সঙ্গে শিকাগো চলো, দেখবে কত রকমের কত চাল ওখানে। যেটা খুশি কিনবে। কথাটা বলেই মোবাথা প্যাটেল ব্রাদার্সের কথা তুলল। গুজরাতি দুই ভাই মিলে কীভাবে সারা আমেরিকা জুড়ে ভারতীয় ফুডচেইনের এক ঈর্ষণীয় সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে, মোবাথার মুখ থেকেই শুনছিল দীপ্র। মোবাথা অত গুজরাতি, বাঙালির তফাত বোঝে না, তাই শেষে বলে উঠল, “ইউ ইন্ডিয়ান্স আর ভেরি এন্টারপ্রাইজিং। ওয়ান পারসন স্টার্টিং সামথিং অ্যান্ড এমপ্লয়িং সো মেনি কান্ট্রিমেন….”
দীপ্র চুপ করে গেল। বাঙালি হলে আরও অনেক বাঙালিকে দেশ থেকে নিয়ে এসে চাকরি দেওয়ার বদলে এখানে আসতে চাওয়ার ইচ্ছা রাখা লোক দেখলে ডিসকারেজ করত। তবু যে বাঙালি সে কীভাবে নিজের ভেতরের বাঙালিত্বকে অস্বীকার করে? দীপ্র তাই স্থানীয় ওয়ালমার্টের থেকে চাল কিনে নিয়ে এল এক প্যাকেট। কিন্তু তা ফুটিয়ে যা ভাত হল তা মালয়েশিয়ার রাবারের থেকেও শক্ত। শুধু কচকচ করে দাঁতে। নরম আর হয় না।
বিশাখার গলায়, “আজ রাতটা একটু গরম ভাত আর পাঁঠার মাংস খেলে ভালো লাগত না?” শুনে তাই নিজেকে সামলাতে পারেনি ও। অবশ্য ওই ভদ্রমহিলা যদি উচ্ছেসেদ্ধ খাওয়ানোর জন্যও ডাকত দীপ্রকে, তবুও কী সেই ডাক উপেক্ষা করতে পারত দীপ্র?
অবশ্য তার আগে মান-অভিমানের সামান্য একটা ডকুফিচার ওই হোস্টেলের রিসেপশনেই হয়ে গেছে। আর সেখানে গম্ভীর দীপ্রর দুটো হাত ধরে ক্ষমা চেয়েছে বিশাখা।
“কিন্তু আপনি তো আমায় কিছু বলেননি।”
“জানি দীপ্র। দোষ বিশাখার নয় আমার। কিন্তু বিশাখাকে দু-একজন এত ডিস্টার্ব করে যে আমি মাথা ঠিক রাখতে পারি না অ্যাট টাইমস।” নিজেকে ‘শান্তনু দত্ত’ বলে পরিচয় দেওয়া লোকটা, বিশাখার পাশে দাঁড়িয়ে বলে উঠল।
“দু-একজন ডিস্টার্ব করে বলে তুমি দীপ্রকেও তাদের দলে ফেলে দিলে।” বলিহারি বুদ্ধি তোমার। বিশাখা বলে উঠল।
“তোমার আমাকে আগেভাগে সতর্ক করা উচিৎ ছিল। আমি কী করে জানব যে এরকম একটা স্কলারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তোমার?”
“ঠিক আছে, বউদি, আমার জন্য আপনাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লেগে যাক আমি চাই না।” শান্তনুকে তেড়ে ঝাড়তে যাওয়া বিশাখাকে থামিয়ে দিল দীর্ঘ।
“অ্যাই বউদি ফউদি আবার কী? জাস্ট নাম ধরে ডাকবে ওকে। আমাকেও।” শান্তনু দত্ত বলল।
“আমি ভাই অত মড হতে পারব না। আর তাছাড়া আমার ‘বউদি’ ডাকটা ভারী মিষ্টি লাগে। তুমি আমাকে ‘বিশাখা বউদি’ বলেই ডেকো গো।” দীপ্রর হাতটা ধর বলে উঠেছিল বিশাখা।
ওদের বাড়ির দিকে রওনা হবার পর, বাড়িতে পৌঁছেও সেই স্পর্শ জলতরঙ্গের মতো বাজছিল দীপ্রর তন্ত্রীতে।
***
প্রায় সত্তর মাইল পেরিয়ে যে বাড়িটায় এল দীপ্র, সেটাও আমেরিকার আর পাঁচটা বাড়ির মতোই, একটু সিমেন্ট কংক্রিট আর অনেকটা কাঠ দিয়ে তৈরি, আলাদা বলতে তার পেছনের লনে নাকি মাঝেমাঝে হরিণ এসে ঘাস খেয়ে যায়। দীপ্রর অবশ্য তখন হরিণ দেখার মতো মন নেই। বিশাখার ঘোরই ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তবু তারই মধ্যে শান্তনুদার দিলখোলা কথা বলার স্টাইল ভর ভালো লাগছিল।
“আমেরিকাতে পা দেওয়ার মুহূর্ত থেকে বুঝে গেছ তো যে আমেরিকা আসলে স্বপ্নের দেশ নয়, পাগলের মতো খাটিয়ে নেবার দেশ। এখানে বিপদে পড়লে ‘নাইন ওয়ানওয়ান’ কল করতে হবে। ওই ১১১-ই এই দেশের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর; আলাস্কা থেকে টেক্সাস সেখানে ফোন করলেই, একটা সিস্টেম ছুটে যাবে যে-কোনো বিপন্ন মানুষকে উদ্ধার করতে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কেউ হাত বাড়িয়ে দেবে তেমনটা ভেবো না।” শান্তনুদা বলল, সিঙ্গল মল্টে বরফ দিতে দিতে।
“ছেলেটা নতুন এসেছে, ওকে ভয় দেখিও না। আর এমন মদও বাইয়ো না যে ও ডিনারটা এনজয় করতে না পারে।” বিশাখা বউদি বলল।
“আমি কিন্তু একদনই খাই না।” দীপ্র বলল এতক্ষণে।
“খাওনি বলো। স্টেটসে এসেছ যখন, নতুন একটা দুটো জিনিস করতে হাবে তো!”
শান্তনু দত্তর কথার মধ্যে কেমন একটা ভাতের গন্ধ আর বাংলার আর্দ্রতা টের পাচ্ছিল দীপ্র। প্রথম আমেরিকায় এসে লোকটা নাকি লোক ডেকে ডেকে রাস্তা জিজ্ঞেস করত। তখন মোবাইল, গুগল ম্যাপ, গাড়ির ভেতরে বসে রাস্তা বাতলে দেওয়া নারীকণ্ঠ কিছুই আসেনি পৃথিবীতে।
শান্তনুদার কথার ভেতরেই বিশাখা এসে বলল ডিনার রেডি।
বহুদিন পর অত তৃপ্তি করে খেল শান্তনু। আমেরিকায় আসার পর থেকে প্রথমবার।
“ভাতের প্রতি তোমার খুব প্রেম মনে হচ্ছে?” পাওয়া শেষ হয়ে গেলে শান্তনুদা বলল।
“ভাতের প্রতি প্রেম কোন বাঙালির নেই বলুন তো? ত ভবিষ্যতে যদি সাইন্টিস্ট হিসেবে নাম করতে পারি তাহার আত্মজীবনীর দুটো পাতা আপনাদের জন্য ছেড়ে রাখতেই হবে— আমেরিকায় এসে যখন ‘ভাত, ভাত’ করে প্রাণন ওষ্ঠাগত হয়ে আছে, তখন আপনারাই প্রথম ভাত খাইয়েছিলেন, এই কথাটা লিখতে হবেই।”
“তাহলে তোমার আত্মজীবনী কেউ পড়বে না।” হেসে উঠল বিশাখা বউদি। আর ওর গজদাঁতটা লুকোনো টুনি বান্ধের মতো ঝলমল করে উঠল।
শান্তনুদা জিজ্ঞেস করল, “তাহলে কী লিখতে হবে?”
“লিখতে হবে যে তুমি ভাত খেতেই এসেছিলে আমাদের বাড়ি, কিন্তু তারপর শান্তনু অফিসের কাজে বাইরে গেছে আর আমি একটা শর্টস পরে ঘুরছি দেখে ভাতের বদলে আমাকেই সাপটে খেয়ে নিলে।”
বিশাখা বউদির কথা শেষ হতেই শান্তনুদা জোরে হেসে উঠল। সেই হাসিতে যোগ দিয়ে বউদি বলল, “ এইটা ফ লিখতে পারো তাহলে তোমার গল্প একদম সুপারহিট।”
দীপ্রর কান গরম হয়ে উঠল লজ্জায়। সেটা এতটাই যে পরদিন সন্ধ্যায় ওদের বাড়ি থেকে বেরোবার আগে মুখ তুলে তাকাতেই পারল না আর বাড়ির মালকিনের দিকে। আর আবারও প্রায় সত্তর মাইল ড্রাইভ করে দীপ্রকে হোস্টেলের সামনে নামিয়ে ফিরে যাওয়ার আগে যখন বরের পাশাপাশি বউও জড়িয়ে ধরল কিংবা বলা ভালো, ‘হাগ করল আমেরিকান কায়দায়, ওর ভেতরে যেন একটা বিদ্যুতের প্রবাহ বয়ে গেল। মনে হল, বিশাখা বউদি যা বলছিল, সেরকম পরিস্থিতি হলে তেমন কিছু কী ঘটেও যেতে পারত?
মানুষ যা ভাবে তা যেমন একেকসময় সত্যি হয় তেমনি মানুষ যা কল্পনা করেনি তাও ঘটে কখনও-সখনও। নইলে শান্তনুদা আর বিশাখা বউদি বিশেষ করে দ্বিতীয়জনের সঙ্গে ফোনে কথা বলা কেন একটা অভ্যাস হয়ে দাঁড়াবে দীপ্রর? কেন ও রিসার্চের প্রবল চাপের ভেতরেও প্রতি সপ্তাহে না হলেও দু-সপ্তাহ অন্তর ছুটে যাবে ডিময়েনে, ওদের বাড়ি? ফেসবুকে সুচন্দ্রার মেসেজ আসছে দেখলেও এড়িয়ে যাবে, ফোন করা তো দূর, উত্তর দেবার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত দেখাবে না অধিকাংশ সময়? সামনাসামনি একেবারে স্বাভাবিক আচরণ করে গেলেও ভেতরে ভেতরে প্রবল উত্তেজিত হবে, বিশাখা বউদির কথা ভেবে? ইউনিভার্সিটি, কফিশপ, রাস্তায় যে মেয়েই দেখুক, যত মেয়েই দেখুক, ঘুরেফিরে একজনের কথাই মনে পড়বে। আর সেই মনে পড়া একইসঙ্গে প্রবল বাসনা আর অনেকটা নির্ভরতার উদ্রেক করবে?
কিন্তু সেই শনিবার যখন শান্তনুদা বেরিয়েছে একটা কোনো জরুরি কাজে আর ভরপেট খেয়ে দীপ্র ঘুমিয়ে আছে তখন হঠাৎ করে একটা আওয়াজে ওর ঘুমটা ভেঙে যাবে কেন? কেন যে ঘরে ঘুমোচ্ছিল, সেই ঘরের দরজা ফাঁক করতেই ওর চোখে পড়বে বসার ঘরে বিশাখা বউদি আর একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে?
ভদ্রলোক স্বাভাবিক গলাতেই দু-চারটে কথা বলছিলেন আর আর বিশাখা বউদিও, কে জানে কেন, হেসে উঠছিল প্রতিটা কথার পরেই। একটু আগের ঘরোয়া পোষাক বদলে, বিশাখা বউদি একটা অফশোল্ডার গাউন পড়েছে, চমৎকার লাগছে ওকে দূর থেকেও। কিন্তু সেই গাউনটা যেন সবকিছু ঢেকে রাখতে পারছে না। যেভাবে ঘাসের ভেতর থেকে লাউডগা সাপ বেরিয়ে আসে সেভাবেই বউদির শরীরের একটা আধটা অংশ বেরিয়ে পড়ার আভাস দিচ্ছিল। আচমকা সেই সাহেব উঠে দাঁড়াল আর বিশাখা বউদিও উঠে দাঁড়াল সেই মুহূর্তেই। সাহেব দু-তিন পা এগিয়ে গিয়ে বউদিকে জড়িয়ে ধরে গালে-টালে নয় একদম ঠোঁটেই চুমু খেল। খেতেই থাকল।
এ কী হচ্ছে? শান্তনুদা বাড়ি নেই আর সেই সুযোগে বিশাখা বউদি কী করছে এসব? চোখটা সরিয়ে নিয়েও দীপ্র আবার ওদিকেই তাকাল। আর তখনই দীপ্রর অসাবধানতায় একটা আওয়াজ হল ওর ঘরের দরজায়। সাহেব খেয়াল না করলেও, বিশাখা বউদির চোখটাকে ঘুরে যেতে দেখল ও। আর তৎক্ষণাৎ ফাঁক করা দরজা থেকে সরে এসে আবার শুয়ে পড়ল বিছানায়।
মিনিট পনেরো পরেই ওর ঘরে ঢুকে দীপ্রর চুলে বিলি কেটে বিশাখা বউদি বলে উঠল, “আর ঘুমোনোর নাটক করতে হবে না। একটু আগেই তো আড়ি পাতছিলে।”
“না মানে…” দীপ্র লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিল।
“থাক, আর এক্সকিউজ দিতে হবে না। কিন্তু আড়ি পাতার কিছু ছিল না গো। তুমি সামনে এসে বসলেও লোকটা আমায় ওভাবেই চুমু খেত। এদেশের কালচারে ওগুলো আটকায় না, তাই না?”
“তাই বলে অন্যের স্ত্রী-কে এভাবে জড়িয়ে পরে…”
দীপ্রকে থামিয়ে দিয়ে বিশাখা বউদি কেমন একটা গলায় বলে উঠল, “আনার বউ-কে সাহেব জড়িয়ে ধরেছে বলে আপত্তি নাকি তুমি জড়িয়ে ধরতে পারছ না বলে মনখারাপ?”
“কী বলছেন, আমি কিছু…”
“সব বুঝতে পারছ। আমি যেমন তোমার চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম প্রথমদিন। এস, কেমন করে জড়িয়ে ধরতে হয় শিখিয়ে দিই।” বলেই বিশাখা বউদি দীার ঘাড়ে গলায় চুমু দিতে দিতে ওকে জড়িয়ে পরল।
পলকের একটা ঘোর মানুষকে অবশ করে দেয় কিন্তু তার ভেতরেই ভেতরের সংস্কারবশত নিজেকে ছাড়িয়ে নিল দীপ্র।
“সরে গেলে? ভালো লাগল না? মনের ইচ্ছা তো আঠারো আনা।” বলতে বলতেই দীপ্রর কাছে এসে ওর ঠোঁটে একটা আলতো চুমু দিল বউদি। দীপ্র ঠোঁট দুটো চেপে রেখেছিল বলে, বুঝেও বুঝল না।
“ঠোঁটদুটো ওরকম করে আছ কেন? তোমায় আমি বিষ খাওয়াচ্ছি নাকি?” বিরক্ত গলায় বলে উঠল বউদি।
শান্তনুদা নিজের এক বন্ধুর কথা বলছিল, ফ্লোরিডার পেনসাকোলায় যার বাড়িটা নাকি পুরোটাই জলের ওপর। দীপ্রর মনে হল, এই বাড়িটাও তাই। কিংবা জল নয়, বিশাখা নামের একটা ঢেউ-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। সেই ঢেউটার দিকেই নিজের দুটো হাত বাড়াল দীপ্র।
ডোরবেল বেজে উঠল ঠিক তখনই।
বিশাখা বউদি আর একবার দীপ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তারপর ঝট করে নিজেকে আলগা করে নিয়ে দরজা খুলতে চলে গেল। যেতে যেতে দীপ্রর দিকে তাকিয়ে যে হাসিটা দিল তার মানে হয়তো কোনো অভিধানে নেই তবু দীপ্র একটা মানে করল সেই হাসিটার। ‘স্টে কুল’। কিন্তু একটা মেঘ আকাশ থেকে নেমে এসে ছুঁয়ে দিলে, একটা ঢেউ নিজের দিকে টানলে কে আর পারে, ‘কুল’ থাকতে? দীপ্র তাই ঘামছিল আর ঘরে ঢুকে সেটাই খেয়াল করল শান্তনুদা।
“ব্যাপারটা কী, তুমি এই মিডওয়েস্টের ঠান্ডাতেও ঘামছ?” শান্তনুদা জিজ্ঞেস করল।
“মিডওয়েস্টে কী ঘামা বারণ?” দীপ্র কোনোরকমে বলল। “তা নয় কিন্তু এখানে শীত এত প্রবল যে চট করে ঘামে না কেউ। ভীষণ উত্তেজিত না হলে। তুমি কী উত্তেজিত?”
দীপ্রর মনে হচ্ছিল যে শান্তনুদা বোধহয় দৈবজ্ঞ। এতক্ষণ ওর অনুপস্থিতিতে এখানে কী হয়েছে বা হয়নি সবটাই জানে। আর তাই এমন সব প্রশ্ন করছে যার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
“আহা, লোকে বুঝি শুধু উত্তেজিত হলেই ঘামে। অসুস্থ হলে ঘামে না!” দীপ্রকে আড়াল করার জন্যই যেন বলল বিশাখা বউদি।
কিন্তু শান্তনুদা বলটা হাফভলিতে বাউন্ডারি পান করে বলল, “দিব্যি সুস্থ ছেলে বেরোবার সময় দেখে গেলাম। তুমি ওকে লাঞ্চে কী খাওয়ালে যে অসুস্থ হয়ে পড়ল?”
বিশাখা বউদি জোরে হেসে উঠল, “সেটা ওকেই জিজ্ঞেস করো।”
দীপ্র ধপ করে বসে পড়ল ডিভানে। তারপর অসহায়ের মতো তাকাল শান্তনুদার দিকে। পরের প্রশ্নবাণের জন্য।
শান্তনুদা অবশ্য ততক্ষণে হাসতে শুরু করে দিয়েছে।
