দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ১৫
(১৫)
“আমার মনে হয় যে আপনার ছেলের আমাকে পছন্দ হয়নি। যদি হত তাহলে কথাবার্তা বলত।” হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া বাবাকে দেখতে ওদের বাড়িতে আসা দীপ্রর মা-কে কথাগুলো বলে স্বস্তিবোধ করল সুচন্দ্রা।
দীপ্রর মা একটু থমকে গিয়ে বললেন, “না মানে, ও আসলে খুব লাজুক… মেয়েদের সঙ্গে খুব একটা…”
সুচন্দ্রা ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “লাজুক হলেও মেসেজ দেখে একটা উত্তর দেওয়া যায় তো। ফোন করার অসুবিধে থাকলেও। কিন্তু আপনার ছেলে সেটুকুও করেনি।”
“থাক না এসব কথা এখন। উনি তোর বাবাকে দেখতে এসেছেন…” সুচন্দ্রার মা ওকে থামানোর একটা চেষ্টা করলেন।
“উনি তো আর এমনি আমাদের বাড়িতে আসবেন না বা আমিও যাব না। তাই যখন দেখা হবে তখনই কথাগুলো বলতে হবে।”
“তুমি বলতে পারো। আমি নিজেই এই ইনিশিয়েটিভটা নিয়েছি যখন, তোমার কোনো কথাই তখন এড়িয়ে যেতে পারি না।” দীপ্রর মা থমথমে মুখে বললেন।
সুচন্দ্রার খারাপ লাগল, “দেখুন একবারও ভাববেন না যে আমি অ্যাকিউজ করছি আপনাকে। কিন্তু আমার সত্যি মনে হয় যে আপনি একটা অনিচ্ছুক ঘোড়াকে টানতে টানতে জলের ধার অবধি নিয়ে যাচ্ছেন- এবার ঘোড়াটা না চাইলে জলটা খাওয়াবেন কী করে?”
“আমার ছেলেকে আসলে আমি ঘোড়া বলে ভাবি না। আর ও যে অনিচ্ছুকই তুমি নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?”
“মেয়েদের যে সিক্সথ সেন্স থাকে তা দিয়েই হচ্ছি। প্রথম দিন থেকে আপনার ছেলে কী এমন একটা কাজ করেছে যার ভিত্তিতে বলতে পারি যে তার এই সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র উৎসাহ আছে? দেখতে আসেনি কথা বলেনি, মেসেজের উত্তরও দেয়নি। এর মানে কী? হি ইজ জাস্ট নট ইন্টারেস্টেড। আর যে আগ্রহী নয় তার পথ চেয়ে আমরাই বা বসে থাকব কেন?”
“তুই এবার চুপ করবি।” সুচন্দ্রার মা ধমকে উঠলেন।
“না, ও বলুক। ও তো ঠিকই বলছে। তবে আপনার মে যে এত স্পষ্ট কথা বলতে পারে, জানতাম না।” দাঁড়ালেন।
“ছিঃ ছিঃ! এমন কথা শোনালি যে ভদ্রমহিলা মুখ কাল করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তোর বাবাকে দেখে এসেছিল, এতটা অভদ্রতা করা কী ঠিক হল?” দীপ্রর মা চলে যেতে সুচন্দ্রার মা বলে উঠলেন।
“ভদ্রতা তো সারাজীবন সবার সঙ্গে করে এলাম না। লাভ কী হল? আর তাছাড়া কোনো অভদ্রতা আমি করিনি। বর ওনাকে একটা জ্বালা থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছি।”
“কীসের জ্বালা?”
“যা হবার নয়, তাকে হওয়ানোর চেষ্টা করার জ্বালা।”
“তুই অনেক বদলে গেছিস।”
“তার দায় পরিস্থিতির মা। বাবার এরকম অবস্থা, কত টাকা ধার বাজারে, আরও কত টাকা ধার করতে হবে, তার নেই ঠিক। এখন যাবতীয় ভাবের কথা শুনলেই গা-পিত্তি চটে যায়।”
“কিন্তু তুই আজ যা বললি তারপর তো এই সম্বন্ধ অর এগোবে বলে মনে হয় না। ওরা পিছিয়ে যাবে একদম।”
“যাক না। আগুপিছু না করে একেবারে পিছিয়ে যাক। তাতে ওদেরও শাস্তি, আমাদেরও।”
“কিন্তু তারপর?”
“তারপর আবার কী? রোববারের কাগজে কিংবা কোনে ম্যাট্রিমনিতে বিজ্ঞাপন দেব। যারা সত্যিই সিরিয়াস তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। আর আমাদের এই বিপদের সময়, যে ছেলেটার শক্ত কাঁধে মাথা রেখে ভরসা করতে পারব, তাবেই ভালোবাসব।”
মা সামনে থেকে সরে যাওয়ার পর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সুচন্দ্রা। নিজেকে দেখল অনেকক্ষণ ধরে। সত্যিই কী অনেকটা বদলে গেছে ও? নাকি জীবনের ঝঞ্ঝায় টালমাটাল একটা মানুষ যেভাবে রিয়্যাক্ট করে তাই করেছে শুধু?
যা করেছে ঠিকই করেছে। ফেসবুকে কাল দীপুর যে ছবিগুলো ও দেখেছে তারপর ওর মা-র সঙ্গে অনর্থক কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বলেই মনে হচ্ছিল সুচন্দ্রার। আমেরিকায় অনেকেই যায় তাই বলে জলের ধারে বালিতে মেয়েদের পাশে নিয়ে ওইরকম ছবি সব? সেগুলো আবার নিজের টাইমলাইনে শেয়ার করেছে? একেবারে উচ্ছন্নে গেল নাকি ছেলেটা? নাকি গিয়েই ছিল? সুচন্দ্রা জানত না?
কিন্তু জানার পরও অন্য যাকে পাশে পাবে, তাকেই ভালোবাসতে পারবে, এই কথাটা কী ঠিক বলেছে সুচন্দ্রা? ফেসবুকের ওই ছবিগুলোর কথা ভেবে তাহলে আবার ওর চোখ ফেটে জল আসছে কেন? কোন মায়ায় জড়িয়েছে ও যে একবারও না-দেখা একটা লোককে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মন?
ছটফটানির ভেতরেই মোবাইলের ডেটা কানেকশন অন করে ফেসবুকে ঢুকল সুচন্দ্রা। দীপ্রর প্রোফাইলে গিয়ে চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। কিন্তু ছবিগুলো গেল কোথায়? একটাও দেখা যাচ্ছে না কেন? উড়িয়ে দিয়েছে?
(১৬)
“আমি না থাকলে পরে তুমি খেলিয়ে ডাঙায় তুলতে পারবে তো?” শান্তনু বিশাখার মাথাটা নিজের ঘামে ভেজা বুকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
এতক্ষণের প্রেমযুদ্ধের শেষে কথা বলতে ভালো লাগছিল না বিশাখার। তবু অস্ফুটে বলল, “হ্যাঁ।”
“খুব চালাক কী?”
“সাদা চামড়ার লোকদের অত চট করে ধরা যায় না। আপাতভাবে যাকে স্বতস্ফূর্ত মনে হয় ভেতরে ভেতরে সেই হয়তো প্যাঁচ আটছে।”
“ওরা প্যাঁচ আটে না। কীভাবে যেন, আমাদের প্যাঁচগুলো বুঝতে পেরে যায়।” শান্তনু বলল। “আসলে বিদ্যা বুদ্ধি বিচক্ষণতায় আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে তো ওরা।”
“কেন এগিয়ে বলো তো? ওরা সমস্ত কিছুতেই সাইন্সের ওপর নির্ভর করে বলে একটা প্রিসিশন আসে ওদের কাজে। আর আমরা সমস্ত কাজেই আন্দাজে এগোই বলে ল্যাজেগোবরে হই।”
“তুমিও আন্দাজে এগোও? তোমার সঙ্গে বাস করে আমার কিন্তু তা মনে হয় না।” শান্তনু হেসে উঠল।
“কী মনে হয়, তবে?” বিশাখা মুখ ঘষতে শুরু করল, শান্তনুর বুকে।
“আগে বলো, প্যাট্রিককে পটালে কী করে?”
“যার যেটা দুর্বলতা তার খোঁজ পেয়ে গেলেই তাকে ফাঁসানোটা সহজ হয়ে যায়। আগের সপ্তাহে মার্কের বাড়িতে আমি প্যাট্রিকের সেই দুর্বলতার খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম। আগে জানা থাকলে পরে আমি আগেরবারই বশ করে ফেলতাম প্যাট্রিককে।
“দুর্বলতাটা কী সেটা বলবে তো? রাফ সেক্স?” শান্তনু অধৈর্য হয়ে গেল।
বিশাখা হেসে ফেলল, “আজ্ঞে না। প্যাট্রিকের দুর্বলতা হচ্ছে বিশেষ ধরনের কালো বুদ্ধমূর্তি। এই মূর্তি সাধারণত তাইওয়ানেই বেশি পাওয়া যায়। আর তা চিনেমাটির তৈরি হলেও, লাখ লাখ ডলারে বিক্রি হয়, ওই স্পেশ্যালিটির জন্য। ও যখন মার্ককে দেখাচ্ছিল মোবাইল খুলে আমি আড়চোখে দেখছিলাম সেই বুদ্ধের চেহারা আর আকৃতি। দেখতে দেখতে মনে হল যে এইরকম বুদ্ধমূর্তি তো আমার কাছেই রয়েছে একটা। বম্বের একটা বৌদ্ধমন্দিরে এক লামা আমায় দিয়েছিলেন। কিন্তু তার রং তো কালো নয়।”
“কী করলে তবে?”
“কী আর করব? কাগজ পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে সেই রং আস্তে আস্তে ঘষলাম বুদ্ধদেবের গায়ে। অ্যান্ড হি টান্ড ব্ল্যাক। প্যাট্রিক তো দেখে উচ্ছ্বসিত। তখনই একলাখ ডলার অফার করছিল আমায়। কিন্তু আমার এক কথা, টাকা নিয়ে আমি এই মূর্তি বিক্রি করব না। দিতে হলে এমনি গিফট করব।”
“কী বলল প্যাট্রিক, শুনে?”
“ওই যে বললাম, সাইন্সের দ্বারা চালিত হয় বেশিরভাগ সময়। সেটা একটা অসুবিধাও। জীবনের সূক্ষ টানাপোড়েনগুলো বুঝতে পারে না। ঠাহর করতে পারছিল না, টাকা ছাড়া এই লেনদেন কীভাবে সম্ভব। আমি উঠে দাঁড়িয়ে কিস করলাম যখন, তখন ধাতস্থ হল, একটু।”
“শুধু কিস করলে, নাকি আরও কিছু?” শান্তনু মজার টোনেই বলে উঠল।
“যাকে সামনে রেখে দশ লাখ ডলারের প্ল্যান করছি, তাকে আরও অনেক কিছুই দেওয়া যায় তো। কিন্তু ঢ্যাঁড়শকুমার দরজা ফাঁক করে দেখছিল তো! দেখতে গিয়ে হোঁচট-ফোচট খেয়ে আওয়াজ করে একসা। প্যাট্রিক বুঝতে পারেনি অবশ্য। কালো বুদ্ধমূর্তি পাওয়ার আনন্দে মশগুল ছিল এমনই।”
“ব্বাবা! আড়িপাতার স্বভাবও আছে? কথা বললে তো মনে হয়, ভাজা মাছটি উলটে খেতে পারে না।”
“আড়ি পাতবে বলেই পাতছিল না। যতটুকু মনে হল, উঁকি না মেরে থাকতে পারেনি।”
“আসলে তোমার প্রতি ছেলেটার একটা দুর্নিবার টান, আমি খেয়াল করেছি ডে ওয়ান থেকেই। ও হয়তো এমনিই কথা বলছে কিন্তু সামনে তুমি এসে দাঁড়ালে অস্থির হয়ে যায় একেবারে। কী বলছে, কী করছে, খেয়াল রাখতে পারে না।”
“কিন্তু আবার স্ট্যাচুও হয়ে যায়, আমি একটু এগোলে। ভয় আর ভক্তির মিশেল আর কী।”
“না, শুধু ওই দুটোই নয়। সেদিন বার্ন লেকের ধারে কী করল ও? যে জায়গাটা চোরাবালি আছে বলে এড়িয়ে চলে লোক, সেখানে ছুটে গেল পাগলের মতো।”
“আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একটু, তাই খেয়াল করিনি।”
“তোমার টপটা হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল ওদিকে। আমি একবার বললাম যে এখানে অ্যাসিসট্যান্টরা আছে, ওরাই কুড়িয়ে এনে দেবে, কিন্তু বাবু তো অপেক্ষা করতে প্রস্তুতই ছিলেন না। টপটা কুড়িয়ে নিয়ে এসে বিজয়গর্বে কপালের ঘাম মুছছিল। উফ, ওর সেই চেহারা যদি দেখতে।”
“বিকিনি পরা আমার দিকে কীরকম ভূতগ্রস্তের মতো তাকিয়ে ছিল, সেটা দেখেছি।”
“একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে গো।”
“সেটাই আমার মাথায় ঘুরছে। আর ঘুরছে বলেই জিজ্ঞাসা করছি, একটা ঝরনা যদি পাহাড়ে জন্ম নিয়ে তীব্র বেগে ছুটে আসতে চায় সমতলের দিকে তাহলে সেই ঝরনাকে আটকানো উচিৎ কী?”
“একেবারেই নয়, বরং সে যাতে নদী হতে পারে তার ব্যবস্থা করা উচিৎ। জাস্ট পরিচয়টা বদলে দেওয়া দরকার। আর সেটা কীভাবে হয়, তুমি তো জানোই।” হেসে উঠল শান্তনু।
হাসিটা একেবারেই স্বাভাবিক হয়তো তবু খারাপ লাগল বিশাখার। একটা পরিচয় থেকে অন্য একটা পরিচয়ে পরিচিত হতে মানুষকে কী যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, কীরকম আঘাত সামলাতে হয়, সবচেয়ে বড়ো কথা নিজের মুখোমুখি হলেই স্মৃতির ভেতর থেকে কতখানি অপমান এসে ধাক্কা মারে, তার কোনো ধারণা অন্য কেউ করতে পারে কী?
“কী হল, চুপ করে গেলে?”
“না ভাবছি। আচ্ছা শান্তনু তোমার চাকরি যদি চলে না যেত, ব্যবসা করতে গিয়ে যদি ফেল না করতে তাহলে এসবের ভেতর দিয়ে যাওয়ার আর কোনো দরকার পড়ত কী?”
“এসব ভেবে নিজের মনকে দুর্বল করার কোনো মানেই হয় না এখন। যখন একটা কাজে নেমে পড়েছি, টার্গেট ঠিক করেছি, তখন পিছিয়ে আসার কথা ভাবাই অন্যায়। আর ঝড়ের ভেতর দিয়ে তুমি একাই যাবে না, আমাকে তার দ্বিগুণ ঝড় সামলাতে হবে, তোমার থেকে দূরে থাকতে হবে, অ্যান্ড ইউ নো, আমার জন্য সেটা কতটা ডিফিকাল্ট।”
“জানি। কিন্তু বারবার এই ডিফিকাল্টিসগুলো পেরোনোর চেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে পড়ছি।”
“বারবার ন্যয় সোনা। জাস্ট একবার। এই একবারের পর আর কোনোদিন টাবলের মুখোমুখি হবার দরকারই পড়বে না আমাদের। তুমি দেখে নিও।”
“না একবার নয়।” বিশাখা উঠে বসল।
“মানে?”
“বলছি, একঢিলে দুই পাখি মারার মতো, এই একটা সময়কে আমরা দু-দিক দিয়ে কাজে লাগাব। যে এসে দাঁড়িয়ে সে তো বটেই, যে আসার জন্য ছটফট করছে তাকেও কাছে টানতে হবে।”
“আমি মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছি না, তোমার কথার। “ শাস্ত হতাশ গলায় বলে উঠল।
“তুমি কবেই বা কিছু বুঝেছ, প্রথমবারেই? দরকার নেই বোঝার, যখন যেমন প্রয়োজন হবে, আমি বুঝিয়ে দেব। কিন্তু ফার্স্ট অফ অল তুমি কাল সকালেই একটা ফোন করবে দীপ্রকে। না ছাড়ো, আমিই করব।”
“কী বলবে, ফোন করে?”
“সেটা যখন ফোন করব, তখনই দেখবে।”
“একটু বলোই না ডার্লিং।”
“ঝরনাটাকে নদী বানাতে হবে গো। নইলে আমাদের আর সমুদ্র হওয়া হয়ে উঠবে না।” হেসে উঠল বিশাখা।
শান্তনু ওকে আবারও কাছে টানতে গিয়ে, থমকে গেল।
(১৭)
দীপ্রর মাথা দপদপ করছিল। কী ঝগড়াটি মেয়ে রে বাবা! আর মা বলছিল, সাত চড়ে নাকি রা কাড়ে না। হ্যাঁ, বেশ করেছে দীপ্র বিকিনি পরা মহিলাদের মধ্যে ওর নিজের ছবি দিয়েছে। আমেরিকায় মেম হোক কিংবা বাঙালি আধহাত ঘোমটা দিয়ে তো ঘুরবে না। সানবাথ নিতে গেলে, বিকিনি পরেই ঘুরবে। তাতে কারও কোনো অসুবিধে হলে, সে দেখবে না সেই ছবি। খামোখা ফেসবুকে এসে, “হাফ নেকেডদের ভিড়ে, আপনি ফুল নেকেড হয়ে ঘুরলেই বেশি মানাত মনে হয়” কমেন্ট করে যাওয়ার মানে কী? তখনই সুচন্দ্রাকে ব্লক করে দেবে ভেবেছিল দীপ্র। কিন্তু রাগ যখন মাথায় ওঠে তখন কোথাও তার একটা বেরিয়ে যাবারও পথ চাই। দীপ্র তাই সুচন্দ্রার নম্বর খুঁজে বের করে একটা ফোনই করে বসল। আর যত তীব্র গলায় এক্সপ্ল্যানেশন চাইল ওই কমেন্টটার, ততোধিক তীব্র গলায় মেয়েটা দায়ী করে গেল ওকে।
এই মেয়ের সঙ্গে মা ওর বিয়ে ঠিক করেছিল? এ তো জীবনে এলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিত দীপ্রকে। মা-কে ফোন করে এক্ষুনি পুরো ব্যাপারটা জানাতে হবে ভেবেও চুপ করে গেল। ওই বিকিনি পরা মেমদের মাঝে দীপ্রর ছবি মা ঠিকভাবে নেবে কী? যদি বা নেয়, ওই দঙ্গলের মধ্যে বিশাখা বউদিকে দেখলে দুশ্চিন্তা হবে না মা-র? জানতে চাইবে না, কে ওই বাঙালি মেয়েটা যে মেমদের মতোই সাহসিনী? কী জবাব দেবে তখন দীপ্র? কেমন করে বোঝাবে ওর আর বিশাখা বউদির সম্পর্কটা ঠিক কী?
তার চেয়ে এই ছবিটায় দেয়ালিকেও কাসটম করে দেওয়া ভালো। মা অবধি পৌঁছতেই পারবে না ছবিটা। জীবনে কয়েকটা জিনিস নিজের কাছেই রাখতে হয় নয়তো অনর্থক জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু সুচন্দ্রা কী এই ছবির কথা মাকে জানাবে? মনে হয় না, তবু রিস্ক নিয়ে লাভ কী? ভেবে, পোস্টটাই ডিলিট করে দিল দীপ্র। এই প্রচণ্ড কাজের প্রেশারে ও কতক্ষণ আর ফেসবুকে থাকতে পারে? যেটুকু সময় আসে, অশান্তির দরকার নেই আর। তাছাড়া বিশাখা বউদি একজন বিবাহিত মহিলা। দীপ্র যতই চাক, দীপ্রর কাছে নিজেকে নিশ্চয়ই বিলিয়ে দেবেন না উনি! আর দিলেও কী সংশয়রহিত হয়ে গ্রহণ করতে পারবে দীপ্র?
চোখটা লেগে গিয়েছিল। ছোট্ট একটা স্বপ্নে দীপ্র দেখল যে বিশাখা বউদি জিজ্ঞেস করছে, পিকনিকে এসে কেমন লেগেছে দীপুর। আর দীপ্র কোনো জবাব দেবার আগেই সরে যাচ্ছে সামনে থেকে। টপটা হাতে নিয়ে বিশাখা বউদির পেছনে দৌড়চ্ছে দীপ্র কিন্তু কিছুতেই ছুঁতে পারছে না ভদ্রমহিলাকে। উনি এগিয়ে যাছেন ক্রমাগতই।
ফোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙে যেতেই দীপ্র দেখল দুটো মিসড কল বিশাখা বউদির। দীপ্র রিংব্যাক করল।
“কী গো পিকনিকে নিয়ে গিয়েছিলাম বলে, নাকি বাড়িতে সেদিন আপ্যায়নের ত্রুটি হয়েছে বলে রেগে আছ?” বিশাখা বউদি বলল।
“তেমন কিছুই নয়। কাজের চাপ চলছে প্রচণ্ড।” দীপ্র উত্তর দিল।
“ওসব তোমার অজুহাত। আর ওই অজুহাতে যেই ভুলুক, আমি ভুলছি না।”
“আমি সত্যিই বলছি।”
“আহা আমি যেন মিথ্যে বলছি।” বিশাখা বউদি হেসে উঠল ফোনের ওপারে।
সেই হাসি যখন ফার্নেসে পড়া লোহার খাঁড়ার মতো গলিয়ে দিচ্ছে দীপ্রকে তখনই বিশাখা বউদি তিরটা চালাল।
“আমি যদি চাই তাহলে তুমি আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে গো?”
“কী রিকোয়েস্ট বলবে তো।” দীপ্র বলল।
“হ্যাঁ বলার আগে কী চাইছি সেটা জেনে নিতে হবে? না গো, এত হিসেবি হয়েছ জানলে ফোন করতাম না তোমাকে।”
“সরি বউদি। আমি এত কিছু মিন করে বলিনি। তুমি বলো না, কী বলছ।”
“বলছি তোমার দাদা মাসখানেকের জন্য আমেরিকার বাইরে যাচ্ছে, কাজে। ইন্ডিয়াতেও ঘুরে আসবে হয়তো।”
“হঠাৎ?”
“জরুরি কাজ পড়ে গেছে। কী করবে?”
“ও, আচ্ছা। তা তুমি যাচ্ছ সঙ্গে?”
“না গো আমি যেতে পারছি না। কিন্তু তোমায় যদি বলি তবে, তুমি যাবে তোমার দাদার সঙ্গে?”
“না বউদি, আমার এখন যা প্রেশার তাতে আমার পক্ষে একমাস কেন এক সপ্তাহের জন্যও বাইরে যাওয়াও মুশকিল। “ একদিনের জন্য যে বলোনি, তাতেই আমি কৃতার্থ।” বিশাখবউদি হেসে উঠল ফোনের ওপারে।
“তুমি কেন বুঝছ না আমি জানি না, এই দেশটার হালহকিকত তোমাদের তো অজানা নয়। ইন্ডিয়াতে একটা পেপার সাবমিট করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হত। তিনবার গাইডকে খুঁচিয়ে তবে একটা দায়সারা জবাব মিলত। আর এখানে রাতে মেইল করে ভোর সাতটার মধ্যে উত্তর পেয়ে যাচ্ছি। কলকাতায় কেউ বেশি কাজ করলে অন্যরা তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে যেত আর এখানে সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সবাই এতটাই খাটছে যে ওদের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে আমাকেও গয়ংগচ্ছ মনোভাব ছেড়ে দিয়ে…”
“একেবারে মেশিন হয়ে উঠতে হবে। তাই না?” বিশাখা বউদি বলে উঠল।
“তুমি এভাবে ভাবলে আমার কিছু করার নেই কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়।”
“ব্যাপারটা কী, তা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার আছে দীপ্র। কিন্তু সত্যিটা হল তুমি আমার থেকে পালাতে চাইছ।”
‘এসব কী বলছ? তুমি আর শান্তনুদা কত ভালোবেসেছ আমায়, কত আতিথ্য পেয়েছি তোমাদের বাড়ি গেলেই, আমার তো তেমন কেউ পরিচিতই নেই আমেরিকার বাঙালিদের মধ্যে। তোমরাই বন্ধু, তোমরাই আত্মীয়।”
“বাজে কথা রাখো। আমি ‘আমাদের’ কথা বলছি না। বলছি যে তুমি আমাকে এড়াতে চাইছ। অস্বীকার করতে পারো?”
“কেন এড়াতে চাইব তোমায় আমি?”
“কারণ তুমি আমাকে ডিজায়ার করো। আর ডিজায়ার করেও যাকে পায় না, তার থেকে পালাতে চায় মানুষ।”
“ছিঃ! ছিঃ। এভাবে আমি ভাবিনি কখনও।”
“তুমি ভুলে যেও না দীপ্র, মেয়েদের একটা সিক্সথ সেন্স থাকে। যেদিন বার্ন লেক ঘুরতে গিয়েছিলাম আমরা, সেদিন আমার টপটা কুড়িয়ে আনতে তুমি চোরাবালিতে ছুটে যাওনি?”
“সে তো আমি ততটা জানতাম না…”
“শান্তনু বারণ করলেও তুমি ছুটে গিয়েছিলে। আর সেদিনের কথা যদি বাদও দিই, আমার বাড়িতে যতবার এসেছ, আমি তোমার চোখে একটা প্রবল ইচ্ছা দেখেছি আমায় পাওয়ার।”
“আই অ্যাম সরি বউদি, আমি…”
“সরি কেন দীপ্র? দরজা ফাঁক করে আমাকে আর ওই সাহেবকে চুমু খেতে দেখছিলে বলে? আরে বাবা ওতে কিছু অন্যায় হয়নি। অন্যায় কীসে হয়েছে জানো? যখন আমি চান্স দেওয়ার পরও তুমি আমাকে চুমু খেতে পারলে না। কেন পারলে না? তুমি জানো না, একজন সুপুরুষ আমায় কামনা করছে এর থেকে বড়ো ‘ফিল গুড’ ফ্যাক্টর একটা মেয়ের জীবনে আর হতেই পারে না? সেই পুরুষ তাকে যতটা চায়, মেয়েটা তার তিনগুণ চাইতে থাকে লোকটাকে। মুখে বলে না জাস্ট। এইটা না বোঝার মতো আনাড়ি তো তুমি নও…’
“বউদি আমাকে একবার ল্যাবে যেতেই হবে এখন। আমি পরে তোমার সঙ্গে…
“ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে চাইছ?” হেসে উঠল বিশাখা বউদি।
“ভয় পাওয়ার মতো কী করেছি?” দীপ্র প্রতিবাদ করার একটা চেষ্টা করল।
“আমি তো চাই তুমি করো। এমন কিছু করো যেটা দুঃসাহসিক। যা করতে সাধারণ লোক ভয় পাবে। কিন্তু তুমি পাবে না। তবেই তো তুমি আমার হিরো, আমার সুপারম্যান হবে, তাই না?”
“আমি অনেক কষ্টে আমেরিকায় এসেছি। আমাকে এখানে রিসার্চ কমপ্লিট করতে হবে, একটা চাকরি যোগাড় করতে হবে।”
“তারপর দেশ থেকে একটা লালটুকটুকে মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসে, তার সঙ্গে জমিয়ে সংসার করতে হবে, তাই তো?”
“অতদূর এখনও ভেবে উঠতে পারিনি।”
“কিন্তু আমি যখন বিকিনি পরে শুয়েছিলাম বিচে তখন আমার দিকে যে মুগ্ধতায় তাকিয়েছিলে অন্য কাউকে সেট একই মুগ্ধতায় দেখতে পারবে?”
“কখন তাকালাম?”
“একদম ন্যাকামো করবে না, সারাক্ষণ আড় তাকিয়েছিলে। আর আমি ঘুরে তাকালেই চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলে। কিন্তু তাতে আমি রাগ করিনি, খুশিই হয়েছি। তোমার দাদার সঙ্গে তুমি আমেরিকার বাইরে যেতে চাও न শুনে যেমন খুশি হলাম।”
“মানে? তুমিই তো একটু আগে রিকোয়েস্ট করলে আমার যেতে?”
“সে তো তোমায় একটু বাজিয়ে দেখার জন্য। আসলে তো আমি চাই, শান্তনু যে-সময়টা ইউএসএ-তে থাকবে না, সেই সময়টা তুমি আমার কাছে থাকো।”
“হোয়াট?”
“চমকাবার কিছু হয়নি দীপ্র। তোমার যেমন আমাকে দেখলে গোপনে লাল গড়িয়ে পড়ে মুখ দিয়ে, অ্যান্ড ডোন্ট ডিনাই দ্যাট, আমারও তো ভালো লাগে তোমায়। কিন্তু আমাদের দু-জনের মধ্যে একটা বেসিক তফাত আছে।”
“কী তফাত বউদি?
“তুমি চাইলেও মুখ ফুটে বলতে পারো না। আর আমি আমার মনের ইচ্ছেটা খোলাখুলি এক্সপ্রেস করতে পারি। তাই শান্তনু যে সময়টা থাকবে না তখন তোমায় আমার কাছে থাকতে বললাম। এখন প্লিজ আবার কাজের কথা তুলো না। তোমার ডাকে সাড়া যে দিচ্ছে তাকে অনার করাটাও তোমার একটা কাজ। নয় কী?”
“আমার সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে বউদি… আমাকে স্নান করেই ছুটতে হবে ল্যাবে।”
“তুমি আমার কাছে এলে যদি আমি তোমায় স্নান করিয়ে দিই একদিন, তোমার রিসার্চের ক্ষতি হয়ে যাবে? যেদিনগুলো তুমি আমার কাছে থাকবে, সেই দিনগুলো নয় কিন্তু যেদিন তুমি ডিময়েন থেকে অ্যামেসে ফিরে যাবে আবার, তখন? তাহলে সাবানের সঙ্গে আমার গন্ধটাও তোমার কাছে থেকে যাবে যতদিন না তুমি আবার আমার কাছে ফিরে আসছ!”
“আমি রাখছি।”
“রেখো না, প্লিজ! কী অসুবিধে হচ্ছে তোমার? বুক ধড়ফড় করছে? মাথা ঘুরছে? সব প্রবলেম আমি সারিয়ে দেব, তুমি এস আমার কাছে। আমি যে এই নির্বান্ধব দেশে তোমার মতো কারও পথ চেয়েই বসে ছিলাম দীপ্র।”
“শান্তনুদা কী শুধু ইন্ডিয়াতেই যাবে? না, অন্য দেশও আছে এবারের ট্র্যাভেল লিস্টে?”
“সেই খোঁজে তোমার কী দরকার? যে চুলোয় ইচ্ছে সেখানে যাক। আর শান্তনু ফিরে আসার অনেক আগে আমি তোমায় সতর্ক করে দেব, নিশ্চিন্ত থাকো। অবশ্য সতর্ক হওয়ারই বা কী দরকার তোমার? শান্তনু ফিরে আসলেই কী আমি তোমায় ভাগিয়ে দেব নাকি?”
“বাট হি ইজ ইয়োর হাজব্যান্ড।”
“তাতে কী দীপ্র? একটা মেয়ে কী শুধু তার বরের সম্পত্তি? তার মন কী একটা ব্রোঞ্জের স্ট্যাচু যে একবার ঢালাই হয়ে গেলে আর অন্য কোনো চেহারা নিতে পারবে না?”
“আমি কিছু ভাবতে পারছি না বউদি…”
“ভাবার কাজটা আমার ওপরই ছেড়ে দাও দীপ্র। ওটা আমি অনেকের থেকে ভালো পারি। তুমি শুধু বলো, আমি যা বলছি, বলে যাচ্ছি, তা তোমার চাওয়ার সঙ্গে মিলছে কী না।”
“কিন্তু এতে পাপ হবে না?”
“তুমি যখন মাঝরাতে আমায় ভেবে ছটফট করো তখন পাপ হয় না? মনে সারাক্ষণ ভাবছি তাতে পাপ নেই আর বাস্তবে একবার ঘটলেই পাপ? কে তৈরি করেছে এইসব সংজ্ঞা? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেসব মানেই বা কে? তাছাড়া শুধু আজকে বলে নয়, দ্রৌপদী যখন এক স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য স্বামীর ঘরে গিয়ে ঢুকত, কুত্তী যখন এক দেবতার পর অন্য দেবতাকে ডাকত, পাপ হত তখন?”
“জানি না। সত্যিই জানি না।”
“জানার দরকার নেই তোমার। শুধু ওই বস্তাপচা ভাবনা সব সরাও মাথা থেকে। আর আমার কথাগুলোকে একদম মাথায় গেঁথে নাও, মিশিয়ে নাও শ্বাসেপ্রশ্বাসে। তবেই তো যখন তুমি কাছে আসবে তখন আমরাও একে অন্যের মধ্যে মিশে যেতে পারব সহজে। হাওয়ায় আর্দ্রতা যেভাবে মেশে। দারুণ হবে না দীপ্র?”
দীপ্র ফোনটা ধরে বোবার মতো চুপ করে রইল। কোনো উত্তর যোগাল না ওর মুখে।
“কী হল বলো?” ওপাশ থেকে বিশাখা বউদি বলে উঠল।
(১৮)
লি ইউ শানের সঙ্গে দীপ্রর আলাপ মোবাথার সূত্রে। খুব হাসিখুশি ছেলে, হেল্পফুলও। ছেলেটার গার্লফ্রেন্ডের নাম টং হং। মেয়েটা আইওয়া সিটিতে থাকে। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ে। সেখান থেকে প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করবে বলে উইকএন্ডে অ্যামেসে চালে আসে। মাঝেমাঝে পি-ও যায় ওর কাছে। আর ওরা দু-জন একসঙ্গে হলেই হাসিঠাট্টা গানে গল্পে মেতে ওঠে। প্রেমিক প্রেমিকা কম বন্ধুই বেশি বলে, টং হং অ্যামোস এলেই মোবাথা, দীপ্র আর আরও কাউকে কাউকে কাছে ডেকে নেয় ওরা।
কলকাতায় একটা ধারণা আছে, বাঙালিরাই একমাত্র আড্ডা দিতে পারে। বাইরে এলে বোঝা যায় সেটা কতটা ভুল। বরং বেশি কথা বলতে পারত না বলে যে দীপ্র কলকাতায় ওইসব আড্ডা এড়িয়েই চলত, সে-ও অ্যানেসে এসে আড্ডার জন্য মুখিয়ে থাকে।
তার একটা অন্য কারণও আছে অবশ্য। কলকাতার অধিকাংশ আড্ডাই একটা সময়ের পরে পরনিন্দা পরচর্চার আসরে পর্যবসিত হয়। একসঙ্গে বসে থাকা চারটে লোকের মধ্যে একজন উঠে গেলেই বাকি তিনজন তার নিন্দা শুরু করে। আর সেই আসরে যে চুপ করে বসে থাকে তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে বাকিরা। অথচ এখানে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটা আড্ডাই এখানে নতুন কিছু শিখবার, জানবার ব্যবস্থা করে দেয়। একটা নতুন জানলা খুলে দিয়ে রোদে ভাসিয়ে দেয়।
লি শান ইউ আর ওর প্রেমিকা টং হঙ-ই যেমন গল্পে গল্পে চিনে ভাষাটা তুলে ধরেছিল দীপ্র আর মোবাথার সামনে। দীপ্র আশ্চর্য হয়ে শুনেছিল যে ভাষাটায় প্রত্যেকটা অক্ষরই আসলে একটা ছবি। ‘ভালোবাসা’ একটা ছবি, ‘আমি’ একটা ছবি, ‘তুমি’ অন্য একটা ছবি। এবার, ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’ বলতেই পারে কেউ। কিন্তু ‘আমি তোমায় ভালোবাসব’ কিংবা ‘আমি তোমায় ভালোবাসতাম’ বলবে কী করে? বলতে গেলে সামনে, ‘গতকাল’ কিংবা ‘আগামীকাল’ জুড়তে হবে। অদ্ভুত ভাষা একটি, ‘টেন্স’-এর ব্যবহার যেখানে খুবই সীমিত। তাই কী যুগের পর যুগ, সময় নিরপেক্ষভাবে চিনেরা এতটা পরিশ্রমী, এমনই একমুখী?
“বাইরে থেকে ওরকম মনে হয়। ওরাও মনে মনে কষ্টে গুমরে মরে।” মোবাথা বলল একদিন।
“চিন এখন বিশ্বের এক নম্বর ইকোনমি। আমেরিকাতেও যেখানে যা দেখছি, সবই, ‘মেড ইন চায়না’। ওদের দুঃখ কীসের?” দীপ্র অবাকই হল একটু।
“মানুষের মনেও যদি এরকম একটা ‘মেডইন…’ স্ট্যাম্প লাগিয়ে দেওয়া যেত তাহলে তো কোনো ঝামেলাই থাকত না। কিন্তু মানুষের মন তো রকেটের চেয়ে দ্রুত ছোটে তাই না? টং হং তাই ওর জেলবন্দি বাবার কাছে পৌঁছে যায় প্রতিটা সন্ধ্যায়।”
“ওর বাবা জেলে কেন?”
‘সরকারের বিরুদ্ধে লেখার অপরাধে। জাস্ট কয়েকটা আর্টিকল লিখেছিলেন কিন্তু সেটুকু সমালোচনা সহ্য করার মতো উদারতাও চিনা সরকারের নেই। নামেই সুপারপাওয়ার আসলে ইঁদুরের চেয়েও ভিতু।”
ইঁদুর কী সত্যিই ভিতু? দীপ্র নিজেকে জিজ্ঞেস করল একবার। উত্তর পেল না। কিন্তু টং হং-এর মুখোমুখি যেদিন হল আবার, ওর গল্প শুনে প্রশ্ন করার সাহস উবে গেল ভেতর থেকে।
“তিয়েন আন মেনে যাদের গুলি করে মারা হয়েছিল তাদের অনেকের ওয়াইফ বা লাভারকে ধরে নিয়ে গিয়ে টয়লেট না-থাকা ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, কাউকে কাউকে গারবেজে মুখ দিতেও বাধ্য করা হয়েছে। তবু ওরা কেউ মাথা নোয়ায়নি, প্রচণ্ড চাপের মুখে দাঁড়িয়েও নিজেদের বয়ফ্রেন্ড বা বরদের অপরাধী বলে মেনে নেয়নি।
“কোনো বিরোধী গলাই অ্যালাওড নয় তোমাদের দেশে?” মোবাথা জিজ্ঞেস করল।
“না নয়। তাইতো ওটা আর আমার দেশ নয়। আমি যেখানে চলে আসতে পেরেছি, যে আমেরিকা আমায় আশ্রয় দিয়েছে সেই আমেরিকাই আমার দেশ। কিন্তু…”
টং হঙের গলা আবেগে রুদ্ধ হয়ে যেতে লি বলে উঠল, টং ওর বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু চাইনিজ ড্রাগনগুলো লোকটাকে আটকে রেখেছে অকারণে। ভদ্রলোকের ক্যান্সার হয়েছে, ওঁর জীবনের আর অল্প ক-দিনই বাকি…..
“শেষদিন অবধি ওরা বাবাকে ছাড়বে না। একমাত্র মৃত্যু হলে তবেই বাবা জেলের বাইরে আসতে পারবে।”
“কোনো প্রতিকার নেই? কারও কাছে প্রতিবাদ করা যাবে না?” মোবাথা বলল।
“প্রতিবাদ, প্রতিকার গণতন্ত্রে হয়; যেখানে সরকারও আছে, বিরোধীরাও আছে। যেখানে পার্টিই সরকার আবার সরকারই পার্টি, সেখানে প্রতিবাদের জায়গাটা কোথায়?” লি বলল।
দীপ্রর মনে হল, ভারতের এত যে সমালোচনা, ভারতে তো সরকারি ভর্তুকিতে পঞ্চাশটাকা মাইনে দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়েও রাষ্ট্রের বাপোদ্ধার করা যায়। যারা করে তাদের যদি কয়েকদিনের জন্য চিনে পাঠিয়ে দেওয়া যায় তাহলে কেমন হয়?
“গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত যে দেশটা মানে না, সে আবার বিশ্বের কোথায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হল তাই নিয়ে বড়ো বড়ো লেকচার দেয়।” টং হও বলল।
দীপ্রর ভালো লাগছিল না এইসব যন্ত্রণার ইতিকথা।। তবু একদম চুপ করে থাকলে খারাপ দেখায় বলে জিজ্ঞেস করল, “তিয়েন আন মেনে যাদের গুলি করে মারা হয়েছে তার বউ কিংবা গার্লফ্রেন্ডরা এখন নিশ্চয়ই মুক্তি পেয়ে গেছে?”
“অনেকে পেয়েছে, অনেকে পায়গুনি। কিন্তু মুক্তি পেলেই বা কী? ওদের জীবনটাই তো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।” টং হও বলল।
“ওরা কী আর অন্য কোনো রিলেশনশিপে যায়নি?” মোবাথা জানতে চাইল।
লি জবাব দিল, “বেশিরভাগই না। আসলে ওরা পোড়া কয়লার মতো হয়ে গেছে। ওদের ভেতরের স্পিরিটটাকেই নৃশংস অত্যাচারে মেরে ফেলা হয়েছে।”
“নট ওনলি দাট। ওরা ওদের ভালোবাসার সঙ্গে আছে। ওদের মধ্যে অনেককেই পুলিশ কিংবা পার্টির লোকেরাও বিয়ে করতে চেয়েছিল। কেন চেয়েছিল? আউট অফ লাস্ট। কিন্তু কামনা কী কখনও ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে?” টং হঙ এই প্রথম লি-র সঙ্গে মেলে না এমন কথা বলল।
“কিন্তু প্রেমিকই তো বেঁচে নেই। তাহলে ভালোবাসা কীভাবে?” দীপ্র বলে বসল।
টং হঙ হেসে উঠল, “কী বোকার মতো কথা বলছে দ্যাখো! ভালোবাসা কী একটা শরীর নাকি শুধু? একটা অবয়ব মাত্র? ভালোবাসা তো একটা অনুভূতি। সারাজীবন দেখা না হলেও সেটা যেমনকার তেমনই থাকবে। আমার বাবাকে তো আমি শেষ আটবছর দেখিনি। বাবার প্রতি আমার ভালোবাসা একটুও কমেছে নাকি?”
“টং হঙ একদম ঠিক বলছে। না দেখতে পেলে ‘লাস্ট’ কমে যেতে পারে কিন্তু ‘লাভ’ উইল ওনলি গ্রো।” মোবাথা বলল।
“আর সেটা কেন জানো? পৃথিবীতে যাই বেড়ে ওঠে তাই ম্যালিগন্যান্ট হয়ে যায়। ভেতরের টিউমারই হোক কিংবা বাইরের ক্ষমতা। একমাত্র ভালোবাসাই যত বাড়ুক ম্যালিগন্যান্ট হয় না কখনও। সেই ‘আনম্যালিগন্যান্সি অফ লাভ’ তুমি কখনও ফিল করনি দীপ্র?” টং হঙ জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটা মাথায় নিয়েই ঘরে ফিরল বলে প্রশ্নটা রয়েই গেল। আর সেটা পালটা একটা প্রশ্নের জন্ম দিল দীপ্রর ভেতরে। বিশাখা বউদি কেন কাছে ডাকছে ওকে? ওই বা যাবার জন্য এত উৎসাহিত কেন? কোথাও কোনো ভালোবাসা নেই তো তার মধ্যে। পুরোটাই তো শরীরী কামনা। আগুনে যা কাঠই দিতে পারে, জল দেয় না কখনও। তাহলে কেন তার পেছনে ছুটবে দীপ্র? ভাবতে ভাবতে ব্লেডের চাইতেও ধারালো বিশাখা বউদির পাশে হঠাৎ করেই ওই চোখ ছোটো, নাক বোঁচা টিং হঙকে অনেক বেশি প্রেমিকাসুলভ লাগল দীপ্র। তিয়েন আন মেনে নিজের পুরুষকে হারিয়ে যারা সারাজীবন হৃদয়ে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে বেঁচে আছে, সেই মেয়েগুলোকে প্রণমা মনে হল। আচ্ছা ওই যে ‘আনম্যালিগন্যান্সি অফ লাভ’ এর কথা বলছিল টং হঙ, দীপ্র কী কোথাও কারও কাছে তার সন্ধান পাবে?
পাক আর না-পাক বিশাখা বউদির কাছে তার খোঁজে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। ওখানে ভালোবাসা নেই শুধু… নিজেকে প্রাণপণ চেষ্টায় ওই ‘শুধু’র বাইরে আনবে বলে বিশাখা বউদি আর শান্তনুদার নাম্বার দুটো ব্লক করে দিল নিজের মোবাইলে। তারপর ওই ঝগড়াটি মেয়েটাকেই ‘সরি’ বলে একটা মেসেজ লিখল। ওই বিকিনি পরা সুন্দরীদের ভিড়ে দীপ্রর ছবি দেখে চটে গেছে মেয়েটা। কিন্তু কেন গেছে? মনের ভেতরে কিছু আছে দীপ্রর জন্য?
(১৯)
কার মনের ভেতরে কী আছে না আছে তা হয়তো কখনওসখনও জানা যায়। কিন্তু সময়ের ভেতরে কী আছে তা জানার সত্যিই কোনো উপায় নেই। তা নইলে সুচন্দ্রার সঙ্গে ওর যে এখন মাঝেমধ্যেই দিব্যি কথা হয় এবং আস্তে আস্তে ওরা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠছে সেই খবর ফোনে দেয়ালিকে জানাতে জানাতে হোস্টেলে ঢুকে ও এরকম ভূত দেখার মতো চমকে উঠবে কেন? সাত মাস আগে শেষ দেখা তবু এই চেহারা আর ওই মুখ তো ইহজীবনে ভোলার নয়। কিন্তু বার্ন লেকের সামনে বিকিনি পরা মহিলা এখন এরকম সাদা শাড়ি আর সাদা ব্লাউজ পরেছে কেন? বড়োপিসি এরকম পরত ও ছোটোবেলায় দেখেছে; কিন্তু সে তো বহুযুগ আগের ঘটনা। আর তাও হুগলির একটা আধা শহরে। আমেরিকায় নয়।
“আমাকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছ, দীপ্র?” বিশাখা বউদি ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
“না, মানে এরকম ড্রেস…”
“এখন তো সামার। অসুবিধে নেই। কিন্তু উইন্টার হলেও এই পোশাকেই আসতাম তোমার কাছে। তুমি ফোনে ব্লক করে দিয়েছ, সব যোগাযোগ ছিন্ন করে দিয়েছ, তবু খবরটা যে তোমাকে দিতেই হত দীর্ঘ।”
“কী খবর বউদি?”
বিশাখা সউদি তাত বাড়িয়ে দীঘর হাতটা ধরে বলল, “কী খবর তুমি বুঝতে পারছ না?”
“আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না বউদি।”
“আর আমাকে বউদি বোলো না দীর্ঘ। তোমার তো আর।”
“মানে? কী বলছ?”
“যা তুমি শুনছ। মেয়েরা কখন এই পোশাক পরে তা তো তোমার অজানা নয় मী।”
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কিছুতেই না।”
“বিশ্বাস না করে কী করবে বলো? যা ঘটেছে তা তো বিশ্বাস করতেই হবে।”
“কিন্তু, কোথায়? কীভাবে? কবে?”
বিশাখা বউদি হেসে উঠল, “আমি এভাবে তোমার সামনে এসে না দাঁড়ালে তোমার মনে কী এই প্রশ্নগুলো আসত? তুমি তো আমাকে ভুলেই গিয়েছিলে বা ভুলে যেতে চাইছিলে।”
“না, বউদি ব্যাপারটা সেরকম নয়। আসলে আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক করছি না ভুল। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ নিয়ে পরেও আলোচনা করা যাবে। তুমি বলো, শান্তনুদার কী হয়েছিল?”
“গোয়ায় একটা নৌকা করে সমুদ্রে ভেসে পড়েছিল। ও আর ওখানকার স্থানীয় দু-তিনজন। প্রচণ্ড ঝড় উঠেছিল সেদিন রাতে। নৌকাটা উলটে যায় সমুদ্রে।”
“কিন্তু শান্তনুদা তো সাঁতার জানত।”
“উথালপাথাল সমুদ্রে সাঁতার জেনেও কিছু লাভ হয় না। আর তাছাড়া এমন হতেই পারে যে নৌকায় অন্য যারা ছিল তাদেরই কেউ শান্তনুকে ঠেলে দিয়েছিল জলে।”
“কিন্তু কেন? তাতে ওদের কী লাভ?”
“কলকাতায় বাড়িতে ঢুকে একা থাকা মানুষকে যারা খুন করে যায়, তাদের কী লাভ হয় দীপ্র?”
“সে তো টাকার জন্য…
“এখানেও তাই। ওরা হয়তো এনআরআই শান্তনুকে অনেক টাকার মালিক ভেবেছিল। সেই টাকাটা হাতিয়ে নেবার জন্যই…”
“মাই গুডনেস! পুলিশ কী বলছে?”
“ইন্ডিয়ায় পুলিশ টাকা খেলে তারপর তদন্তে ছোটে। আর পুলিশকে টাকা দেবে কে? শান্তনু তো টাকা নিয়ে দেশে যায়নি, টাকার খোঁজেই গিয়েছিল ইনফ্যাক্ট
“বুঝলাম না!”
“তুমি কী এই রিসেপশনে দাঁড়িয়েই সবটা বুঝে ফেলবে? আমার যে পা ব্যথা করছে।”
দীপ্র অস্বস্তিতে পড়লেও, বিশাখা বউদিকে ঘরে নিয়ে গেল না নিজের। রিসেপশন লাগোয়া কফিশপটায় বসল।
“তোমার সঙ্গে যখন আলাপ সেইসময় থেকেই শান্তনুর চাকরি ছিল না। তুমি বুঝতে পারনি কারণ আমি বুঝতে দিইনি। কিন্তু শেষদিকে আমিও আর পারছিলাম না।”
“শান্তনুদা তো বড়ো চাকরি করত?”
“তোমার বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, স্টেটসে। তুমি জানো না যে আমেরিকায় বড়ো চাকরি, ছোটো চাকরি বলে কিছু হয় না? এখানে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী চাকরি তৈরি হয় আবার চলেও যায়। শান্তনু তো পেট্রোলিয়াম কোম্পানিতে চাকরি করত আর তাদের অস্তিত্বই এখন সঙ্কটের মুখে।”
“পেট্রোলিয়াম কোম্পানিতে ট্রাবল? যা ছাড়া একঘণ্টা চলবে না, এক মিনিটও হয়তো নয়, সেই কোম্পানিতে সমস্যা?”
“প্রশ্নটা ঠিকই করেছ কিন্তু উত্তরটা হচ্ছে, পেট্রোলিয়াম ছাড়া ‘চলবে না’ কথাটা ভুল, ‘চলত না’ কথাটা বরং ঠিক। যতদিন যাচ্ছে, আমেরিকায় ব্যাটারিচালিত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। আর দশ বছর পরে পেট্রোলের ব্যবহার খুবই সীমিত হয়ে যাবে। পেট্রোলের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তখন এই কোম্পানিগুলো টিকবে কী করে?”
“কিন্তু সে তো পরের কথা…”
“পরের কথা আগে থেকে ভাবতে শুরু করে বলেই দেশটা আমেরিকা। আর এখানে থাকতে গেলে আমাদেরও তাই করতে হবে। আমি তা করিনি বলেই আজ এত প্যাঁচে পড়েছি। নিজের গাড়ির পেট্রোল কাল ভরাতে পারব কী না জানি না। শান্তনু আমাকে ওর সঙ্গে যেতে বলেছিল। যদি যেতাম তো সত্যিই ভালো হত। ওর সঙ্গে আমিও স্বর্গের পথে হাঁটা লাগাতাম।” গলা ধরে এল বিশাখা বউদির।
“না বউদি এরকম বলবে না। শান্তনুদা চলে গেছে সেটা মেনে নিতে পারছি না এখনও। কিন্তু তুমি যে বেঁচে আছ সেটার আনন্দ কম হয় না তাতে।”
“আমি বেঁচে আছি তাতে কার আনন্দ বলো তো? কার? শান্তনুর মা বলছে যে আমি ডাইনি, ওনার ছেলেটাকে খেয়েছি। ওর আত্মীয়স্বজনরাও তাই বলছে। আমি ইন্ডিয়ায় যখন গিয়েছিলাম তখন কী দুর্ব্যবহার ওরা আমার সঙ্গে করেছে তুমি কল্পনা করতে পারবে না দীপ্র। কিন্তু আমাকে তো যেতেই হত, তাই না? শান্তনুর মৃতদেহ নিজের চোখে না দেখে আমি ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।”
“দেখতে পেয়েছিলে?”
“যা দেখেছিলাম তাকে আর শান্তনু বলে চেনা যায় না। তবু পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, জামাপ্যান্ট ইত্যাদি সব মিলিয়ে সেটাই শান্তনু।”
“কিন্তু না-ও তো হতে পারে? কে জানে, হয়তো শাস্তনুদা এখনও…
“না দীপ্র, শান্তনুর হাঁটুর কাছে একটা জন্মজভুল ছিল। ইনফ্যাক্ট সেটা দেখেই আমি চিহ্নিত করি ওকে। আর করলেই তো হল না। শান্তনু যে সত্যিই মারা গেছে সেই প্রমাণ তো আমাকে ইনশিওরান্সের কাছে দাখিল করতে হবে। নয়তো ওরাই বা টাকা দেবে কেন?”
“দিয়েছে টাকা?”
‘এত সহজ তো নয় দীপ্র। আবার আমেরিকা বলেই এতটা কঠিনও নয়। ইনশিওরান্সের যে অফিসার শান্তনুর কেসটা হ্যান্ডল করছেন তিনি খুবই কনসিডারেট। যদিও ইন্ডিয়া থেকে শান্তনুর দু-একজন আত্মীয় কাঠি করার চেষ্টা করছে তবু উনি যেরকম দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন তাতে আগামী এক দু-মাসের মধ্যেই আমার ক্লেইম সেটল হয়ে যাবে, আশা করি।”
“যাক। একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।”
“তুমি পুরোটাই নিশ্চিন্ত। আমি না খেয়ে মরলেও তোমার কাছে টাকা চাইব না। আজও যে এসেছি সেটা অন্য একটা চাওয়া নিয়ে।”
“আমাকে এতটা ভুল ভাবো বউদি?”
“ভাবতে তুমিই বাধ্য করেছ দীপ্র। যাদের আমেরিকায় নিজের একমাত্র আত্মীয় বলে মনে করতে তাদের থেকে নিজেকে একেবারে ছিন্ন করে নিয়ে, কোন্ মেসেজ দিচ্ছিলে তুমি আমাকে?”
“আমি নিজেকে ডিফেন্ড করতে পারব না। আর সেই চেষ্টাও করছি না। বাট আমি আলোয়েজ চেয়েছি যে…”
“তোমার চাওয়ার কথা পরে শুনব। আগে শোনো, আমি কী চাইতে এসেছি। প্লিজ মুখের ওপর, ‘না’ বলে দিও না।”
“বলব না। তুমি বলো।”
“তুমি তো দেখেছ, শান্তনু আর আমার কী অসম্ভব ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল। আমি যা খুশি তাই বলতে পারতাম ওর সামনে। যাকে খুশি জড়িয়ে ধরতে পারতাম। ওরও একই স্বাধীনতা ছিল। আসলে আমরা জানতাম একে অপরকে কতটা ভালোবাসি। তাই কিছু দেখানোর দরকার ছিল না। মাটির তলার নদীর মতো সেই ভালোবাসা প্রবাহিত হত আমাদের ভেতরে।”
দীপ্র ভাবছিল মাটির তলা দিয়ে নদী বয়ে গেলেও কী মাটির ওপরে একটা নদী লাগে? তা নইলে পর শান্তনুদা যখন বাইরে থাকবে তখন ওকে নিজের কাছে চাইছিল কেন বিশাখা বউদি? কিন্তু জিন্স আর টপ পরা মহিলাকে যে প্রশ্নগুলো করা যায়, সাদা শাড়ির বিধবাকে সেই প্রশ্নগুলো করা খুব অশালীন।
কফিতে শেষ চুমুটা দিয়ে বিশাখা বউদি বলল, “সামনের সপ্তাহে শনিবার শান্তনুর জন্মদিন। প্রতিবার এই দিনটা আমি আর শান্তনু একসঙ্গে সেলিব্রেট করতাম। এবার ও নেই বলেই দিনটাকে ভুলে যাব, তা তো হয় না দীপ্র। আমি চাই, খুব করে চাই তুমি আসছে শুক্রবার রাতে, ডিময়েনে চলে এস। ভয় নেই, আমি তোমায় এমন কিচ্ছু বলব না যাতে তুমি বিব্ৰত বোধ করো। সেই সময়, সেই মন কোনোটাই নেই। কিন্তু স্মৃতি তো আছে দীপ্র। সেই স্মৃতির সম্মানে তুমি আর একটিবার আমাদের বাড়িতে আসবে না? আমি আরও দু-একজনকে বলেছি। কিন্তু তুমি না এলে তোমার শান্তনুদার আত্মা শান্তি পাবে না। তোমায় কতটা ভালোবাসত তা তো আমি জানি।
দীপ্রর একবার মনে হল জিজ্ঞেস করে যে শান্তনুদা কী জানত যে দীপ্রর কতটা দুর্বলতা ছিল ওর বউয়ের ওপর। সেটা জানলেও এটা নিশ্চয়ই জানত না যে ওর বউও প্রশ্রয় দিয়েছিল সেই দুর্বলতাকে। কিন্তু আবারও চুপ করেই গেল কিছু না বলে। ইচ্ছেটা যখন বাস্তবে রূপ নেয়নি তখন সেই প্রসঙ্গ তুলে একজন বিধবাকে অপমান করার কোনো অর্থ হয় না। প্রজাপতিকে শুঁয়োপোকা বলে ডাকার মতোই বিশাখা বউদিকে আগের প্রসঙ্গ টেনে এনে কিছু বলাটা উচিৎ নয় এখন।
শুক্রবার রাতে নয় শনিবার দুপুরেই ডিময়েনে গেল দীপ, মোবাথার গাড়িটা ধার নিয়ে। এতদিনে ও গাড়ি চালাতে শিখে গেছে কিন্তু গাড়ি কেনার মতো পয়সা তো আর নেই তাই অন্যের গাড়িই সম্বল। মোবাথা বা লি অবশ্য এসব ব্যপারে ভীষণই দরাজ, এমন কখনোই হয়নি যে দীপ্র গাড়ি চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অবশ্য দীপ্র খুব কমই চেয়েছে, সেটাও বলতে হবে পেলেই যে নিতে নেই সেই বোধটা ভেতরে জাগরুক থাকার অনেক সুবিধে। এটা ও ছেলেবেলায় না হলেও কৈশোরে শিখেছিল। আর সাধ্যমতো মেনে চলার চেষ্টা জারি রেখেছে।
ফুল নিয়ে গিয়ে শান্তনুদার ছবির সামনে গিয়ে দেখল, গোটা ঘরে ও আর বিশাখা বউদি ছাড়া আর দু-জন মাত্র লোক। একজন বৃদ্ধা মেম এবং আর একজন ততোধিক বৃদ্ধ বাঙালি ভদ্রলোক। দ্বিতীয়জন যখন কাঁপা কাঁপা গলায়, থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার…’ আবৃত্তি করছেন, দীপ্রর মুহূর্তের জন্য সুকন্যার কথা মনে পড়ে গেল। ইউনিভার্সিটির সেই অন্ধকারে এই কবিতাটাই আবৃত্তি হচ্ছিল না? সেদিন কে যেন কার কোলে মাথা দিয়ে শুয়েছিল? মাথা থেকে ভাবনাটা দূর করার জন্য আজ সকালে ড্রাইভ করার সময় সুচন্দ্রার ফোনটার কথা ভাবতে চাইছিল দীপ্র। কেন, সুচন্দ্রার হোয়াটসঅ্যাপ কলে কথা বলতে বলতে ও জানাতে পারল না, এগজ্যাক্টলি কোথায় যাচ্ছে? কেন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল, একটা শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে বলতে হল? আসলে সত্যিগুলো একেকসময় এত ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয় যে মিথ্যা না-বললেও সেগুলো চেপে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
“এত কম লোক কেন সেই প্রশ্ন নিশ্চয়ই জাগছে তোমার মাথায়?” বিশাখা বউদি বলল।
“তুমি নিশ্চয়ই বেশি লোক চাইছিলে না বলে নেমন্তন্ন করোনি।”
“সেটা একরকম ঠিক আবার নেমন্তন্ন করলেই যে আসত তাও তো নয়। বাঙালিরা বাঙালিদের দেখতে পারে না জানো তো। তাই এখানে যদি বেশি বাঙালি থাকত তাহলে তুমি কে, কোত্থেকে এসেছ, তাই নিয়ে রিসার্চ শুরু করত। আর মনোমতো উত্তর না পেলে বাইরে গিয়ে কুৎসা করত। এই ডিময়েনে যে বাঙালি প্রায় নেইই, সেটা একরকম বাঁচোয়া দীপ্র। থাকলে আমি তোমায় রাতে থেকে যেতে বলতে পারতাম না, হোটেলে গিয়ে থাকতে হত তোমায়।” বিশাখা বউদি ম্লান হাসল।
“আমি তো সন্ধেবেলা ফিরে যাব ঠিক করে এসেছি।”
“তুমি ওয়েদার আপডেট দ্যাখোনি? গোটা আইওয়া জুড়ে একটা ভয়ংকর রিজার্ড আসছে তার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাই তো প্রোগ্রামটা এগিয়ে দিলাম। কিন্তু এখন এর মধ্যে তোমায় কীভাবে ছাড়ি আমি বলো তো?”
“কিচ্ছু প্রবলেম হবে না বউদি। আমি আরামসে পৌঁছে যাব।”
বিশাখা বউদি ডুকরে কেঁদে উঠল, “শান্তনুও বলেছিল যে ও আরামসে ফিরে আসবে। কিন্তু ফিরল না তো কই?”
দীপ্র স্বাভাবিক সৌজন্যেই এগিয়ে গিয়ে বিশাখা বউদির মাথায় একটা হাত রাখল।
বিশাখা বউদির কান্না বেড়ে গেল, “আমি শান্তনুকে যেতে দিয়ে নিজের সর্বনাশ করেছি দীপ্র, তোমাকে আজ যেতে দিতে পারব না তাই কিছুতেই। আমার সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে অসুবিধে হলে তুমি বলো আমি ওই যে ক্যাথলিন এসেছিল তার বাড়িতে চলে যাচ্ছি, বাট ইউ মাস্ট স্টে হিয়ার।”
“তুমি থাকলেও আমার এই বাড়িতেই থাকতে কোনো অসুবিধে নেই। আগেও তো থেকেছি।” দীপ্র বলল। বিশাখা বউদির রান্না করা চমৎকার স্যামন মাছ খেতে খেতে।
“তুমি ভালোবাসো বলে স্যামন আনলাম। শান্তনুও খুব ভালোবাসত এই প্রিপারেশনটা। কিন্তু এখন আর রান্না করে খাওয়ানোর কেউ নেই বলে রান্না করি না। নিজেও না খেয়েই থাকি অর্ধেক দিন। ভাল্লাগে না জাস্ট। কী করব?”
“না বউদি। তোমাকে খেতে হবে, বাঁচতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে, তুমি পাগল হয়ে যাবে।”
বিশাখা বউদি একটা গ্লাসে করে ওয়াইন এগিয়ে দিল দীপ্রর দিকে।
ওয়াইন খেতে দীপ্র ভালোই বাসে কিন্তু ওয়াইনটা ভেতরে যাওয়ার পরপরই কেমন একটা তোলপাড় শুরু হল ভেতরে।
“দাঁড়াও একটু রুমফ্রেশনার দিয়ে দিই, কীরকম যেন স্টাফি লাগছে ঘরটা।” বলেই বিশাখা বউদি একটা কী যেন স্প্রে করল দীপ্রর চারধারের বাতাসে। বাতাসটা কেমন মোহময় হয়ে উঠল।
“আমি পাগল হয়ে যেতে চাই না দীপ্র, আমি বাঁচতে চাই, কাজ করতে চাই। জীবনটাকে নষ্ট করতে চাই না।” বলতে বলতে বিশাখা বউদি আবার ভরতি করে দিল দীপ্রর গ্লাস।
দীপ্রর মনে হচ্ছিল, ওই ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে জীবনের কষ্টগুলোকে, আঘাতগুলোকে, মৃত্যুগুলোকে, পেরিয়ে আসতে পারে মানুষ। বিশাখা বউদিও পারবে। ঘরে চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গলায় বাজছিল, রবীন্দ্রসঙ্গীত, ‘মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে একটা দ্বিধার দু-দিকে ওরা দুজন বসে ছিল যেন। আর একটা মদের ঝর্ণা আস্তে আস্তে দ্বিধাটাকে ভেঙে দিচ্ছিল। দীপ্রর পায়ের নীচের কার্পেটটা মাটির মতো জ্যান্ত হয়ে উঠছিল। চারপাশের হাওয়াটা কী ফায়ারপ্লেসের তাপে গরম হয়ে উঠছিল?
বিশাখা বউদি গল্প বলছিল। শান্তনুদার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের গল্প, ওদের হানিমুনে যাওয়ার গল্প আরও কত গল্প। বলতে বলতে কানের হিরেটা দেখিয়ে, “এটা আগেরবার বিবাহ বার্ষিকীতে শান্তনু দিয়েছিল” বলতে বলতে বিশাখা বউদি কেঁদে উঠল। আর প্রাণপণ চেষ্টায় কান্নাটা চেপে জিজ্ঞেস করল, “আমার জীবনটা কী একদম শেষ হয়ে গেল দীপ? আমার জীবনে আর কোনোদিন হাসি আসবে না, গান আসবে না, প্রেম আসবে না, হানিমুন আসবে না, সন্তান আসবে না, আমাকে আরও যতদিন বাঁচব একটা যক্ষীবুড়ির মতো, একা একা কাটাতে হবে?”
“না তুমি যক্ষী নও। তুমি পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরী একটা মেয়ে। সুন্দর একটা মানুষ।” দীপ্র বলে উঠল। ওর মনে হল আচমকা ঘরের তাপমাত্রাটা অনেকখানি বেড়ে গেছে।
“তুমি কীভাবে এই কথাটা বলছ দীপ্র? তোমার তো এই কথাটা বলার মতো সাহস নেই… থাকলে পরে সাতমাস…
“পুরোনো কথা বাদ দাও বউদি। যা হয়ে গেছে তা গেছে।” দীপ্র থামিয়ে দিল ওকে।
“আমি তো বাদ দিতেই চাই। কিন্তু তোমার কী নতুন কথা শুরু করার সাহস আছে? যাকে প্রাণ দিয়ে চাও তার প্রাণ বাঁচাবার ক্ষমতা আছে? বলো দীপ্র বলো।”
“কী বলব?”
“তুমি পুরুষ না কাপুরুষ সেইটুকু বলবে। বলো।”
“আমি কাপুরুষ নই।”
বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। বাজের শব্দ হল। বৃষ্টিও নামল সম্ভবত। কিন্তু ঘরের গরমটা এতটা বেড়ে গেল কেন? কীভাবে?
বিশাখা বউদি দীপ্রকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে গাল ঘষতে ঘষতে বলল, “কেন সাহস পাচ্ছো না? আমাকে ভালোবাসো না? আমায় মিস করো না? তোমার চোখে যে আমি অন্য কিছু দেখি। মুখে সেই কথাটা বলো না কেন?”
দীপ্র নেশার ঘোরেই হয়তো জীবনে প্রথমবার কবিতার তিনটে শব্দ উচ্চারণ করল, “থাকে শুধু অন্ধকার….”
বিশাখা বউদি গাল ছেড়ে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট নিয়ে এসে বলল, “কোনো অন্ধকার থাকবে না যখন আমর মুখোমুখি বসব। বলো না দীপ্র, থাকবে আমার সঙ্গে? বিয়ে করবে আমাকে?”
“জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমার রিসার্চ ইনকমপ্লিট।”
“আমার তো গ্রিনকার্ড আছে। সিটিজেনশিপ হয়ে যাবে এর বছরের মধ্যেই। আমার বর হিসেবে তুমি আপসে ইউএস সিটিজেন হয়ে যাবে। তোমার সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে।”
“তাই? কিন্তু ঘরটা এত গরম হয়ে উঠল কেন?”
“ভালোবাসায় গরম হয়ে উঠছে ঘর। তুমি বুঝছ না দীপু? ঘরটাও চাইছে তোমার আমার একটা নতুন জীবন শুরু হোক। নেবে? আমাকে তোমার স্ত্রী করে নেবে? দেবে একটা নতুন পরিচয় আমাকে?”
“তাহলেই ব্লিজার্ড থেমে যাবে?” দীপ্র নিজেকে সোফ থেকে খাটে আবিষ্কার করল।
ফোনটা কেঁপে উঠল। দীপ্র হাত বাড়াল। কিন্তু ওর হাত ফোনটা ছোঁবার আগেই ও দেখল বিশাখা বউদি ইংরেজিতে কাকে কী বলছে। কথাগুলো কেমন আমেরিকানদের মতো করে বলছিল বিশাখা বউদি। কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না দীপ্র ঘাম হচ্ছিল ওর। আর কেমন একটা পাহাড় ভেতর ঠেলে বাইরে আসতে চাইছিল। দীপ্র ঠেকাতে পারছিল না।
“কার ফোন ছিল বউদি?”
‘একদম বউদি বলবে না আর এই মুহূর্ত থেকে। আমি বিশাখা, শুধুই বিশাখা, তোমার বিশাখা। তুমি চাইলে অবশ্য ‘সোনা’ বলতে পারো আমাকে। বলবে সোনা?”
বিশাখাকে নিজের বুকের ওপর দেখে দুটো হাত বাড়াল দীপ্র ওকে জড়িয়ে ধরতে। আর তখনও জিজ্ঞেস করল, “কে ফোন করেছিল?”
“একটা ব্লিজার্ড ফোন করেছিল। আমি ওকে বলে দিয়েছি এই ঘরের বাইরে থাকতে এখন। ভেতরে ঢুকে আমাদের ডিস্টার্ব না করতে।” খিলখিলিয়ে হেসে উঠল বিশাখা।
সেই হাসির সামনে বাস্তিল দুর্গ পড়ে যাবে, দীপ্র কোন্ ছাড়! তবু তলিয়ে যাওয়ারা আগের মুহূর্তে দীপ্র ভাবল, ব্লিজার্ডটা কে? কেন ফোন করেছিল?
