দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ২০
(২০)
‘মেয়েটাকে ঘরে ডেকে নিয়ে এসে ওর চোখের দিকে তাকাতেই কী একটা যেন ঘটে গেল। আকাশের সবটুকু ঢেকে দিল মেঘ আর আমি নরম দুটো পায়রাকে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আদরে আদরে….। মেয়েটাও একটা জলপ্রপাতের মতো আছড়ে পড়তে লাগল আমার সর্বাঙ্গে। এমন একটা স্নানে ও আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল যার প্রতিটি ফোঁটায় ধুয়ে যায় সমস্ত না-পাওয়া। নিশিডাকের মতো দুটো শরীর পরস্পরকে ডাকতে থাকল আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে উঠল দুটো শরীরই। ভাব আর আড়ি, জল আর নৌকা একে অন্যের মধ্যে মিশে যেতে থাকল।’
বইটা ছুড়ে মেঝেতে ফেলে দিল সুচন্দ্রা। অসহ্য, অসভ্য। এইসব এখনকার লেখা? এই উপন্যাস? এই গল্প? মন নেই, প্রেম নেই, শুধু শরীর আর শরীর। সুচন্দ্রার পাগল পাগল লাগছিল। তবে তার পেছনে বড়ো কারণ অবশ্য এই বইটা নয়। সেখানে কে কী লিখেছে বয়েই গেছে। পাগল পাগল লাগার কারণ দীপ্রর ফোনে সাহেবি অ্যাকসেন্টে এক মহিলার বলে ওঠা, “ব্রিজার্ভ ইস অন ইটস ওয়ে। প্লিজ ডু নট ডিস্টার্ব আস।”
কীসের ব্লিজার্ড? কেন ব্লিজার্ড? ডিকশনারি খুলে তিনবার ‘ব্লিজার্ড’ শব্দের মানে দেখল সুচন্দ্রা। দীপ্র কী কোনো ঝড়ে আটকে পড়েছে? আমেরিকার কোথায় এমন কোন ঝড়ে গিয়ে পড়ল যেখান থেকে ও ফোন ধরতে পারছে না? সেই ঝড়ে ওর কোনো বিপদ হয়েছে? তা নাহলে ওর ফোন কোনো মেমসাহেব কেন ধরলেন? নাকি ওই মেমসাহেবের গলাটা কোন রেকর্ডেড ভয়েস যারা যান্ত্রিক খবর দেয় শুধু? কীরকম একটা অশান্তি হচ্ছিল সুচন্দ্রার। ওর বারবার মনে হচ্ছিল দীপ্রর বাড়িতে ফোন করে ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু আবার ভাবছিল ওর মা-কে টেনশনটা দেওয়া উচিত হবে কী হবে না? নিজের মনের মধ্যে যে টানাপোড়েন চলছিল, কিছুতেই তার থেকে বেরোতে পারছিল না সুচন্দ্রা। ডিভিডিতে একটা নতুন সিনেমা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বাসে রইল কিন্তু মন লাগাতে পারল না একটুও। মা খেতে ডাকল যখন তখন হ্যাঁ বলে গেল ক্রমাগত।
মা একটু সময় পর বলল, “কথাটথা হয় তো দীপ্রর সঙ্গে তোর? এইমাত্র দীপ্রর সঙ্গে কথা বলছিলি?”
“হ্যাঁ হয়। কিন্তু এখন হচ্ছে না।”
বলে সুচন্দ্রা টেবিল থেকে উঠে গেল।
মা একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সুচন্দ্রার ভেতরে বে ব্লিজার্ড চলছে তা জানা তো মায়ের পক্ষে সম্ভব নয়? ঘরে ফিরে এসে নিজের ফোনটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা ফোন নম্বরে চোখ আটকে গেল সুচন্দ্রার। এই তো সেই ফোন নম্বর। যেটা থেকে দীপ্র একদিন ওকে ফোন করেছিল ওর নিজের ফোনটার চার্জ চলে গিয়েছিল বলে। এখানে ফোন করলে ও নিশ্চয়ই জানতে পারবে, দীপ্র এখন কেমন আছে, কোন শহরে আছে? ওর কোনো বিপদ হয়েছে কী না?
ছেলেটার সঙ্গে যখন পরিচয় ছিল না তখন একরকম। কিন্তু বিগত ছ-মাস নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে কোথায় একটা সংযোগ তৈরি হয়ে গেছে। এই সময়ের আর পাঁচটা ছেলের থেকে একটু আলাদা দীপ্র। ওর বন্ধুদের কাছ থেকে ও শুনেছে যে তাদের বয়ফ্রেন্ডরা পরিচয়ের মাসখানেকের মধ্যেই স্কাইপে কিংবা মোবাইলে নানারকম ছবির আবদার করেছে। যে ছবিতে শুধু শরীর থাকে কোনো জামাকাপড় থাকে না। কিন্তু এতদিন ধরে কথা বলেও দীপ্র কোনোদিন সীমা লঙ্ঘন করেনি। দু-এক সময় সুচন্দ্রারই মনে হয়েছে ও আর একটু বেশি বলতে পারে। আরও এক দু-ধাপ এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু না; ঠিক কোথায় থামতে হবে সেটা যেন আগের থেকে দীপ্রর ভেতরে প্রোগ্রাম করা আছে। এত ভদ্র এত সংযত, দীপ্রর মধ্যে কোনোদিন ব্যালেন্সের অভাব দেখেনি সে। সেই একবার শুধু লেকের ধারে নিজের একটা ছবি দিয়েছিল। যেটাতে ওর আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিকিনি পরা কয়েকটা মেয়ে। সেই ছবি নিয়ে সুচন্দ্রা নিজেকেই পরে বুঝিয়েছে ‘যস্মিন দেশে যদাচার’। অ্যামেরিকাতে গিয়ে তো আর শাড়ি পরা মেয়েদের মাঝে ঘুরতে পারে না দীপ্র।
সে সব যাক; এখন দীপ্র ভালো আছে কী না, সেটাই জানা দরকার। সুচন্দ্রা সাধারণত ফোন করে না নিজের থেকে। দীপ্রই করে। কিন্তু কীরকম একটা মন ডাকল… আচ্ছা মন কী খারাপ কিছু হলেই ডাকে? কে জানে!
আমেরিকায় কটা বাজল সেটা ঠিক হিসেব করে উঠতে পারল না সুচন্দ্রা। ভাবনাটা বাতিল করে ভাবল, য-টাই বাজুক, এখনই এই নম্বরে ফোন করে দীপ্রর খোঁজ নেওয়া দরকার। খোঁজ ওকে নিতেই হবে। ঝড় আসুক। ঝড়ের চলে যাওয়ার খবরটাও তো জানা দরকার।
(২১)
আইওয়া সিটি নেহাতই ছোটো। হাজার ষাট সত্তর লোক থাকে। গ্লোরিফাইড গঞ্জ বললেও ভুল হয় না। কিন্তু আধুনিক জীবনের সমস্ত সুবিধে আর ছিমছাম রাস্তা আমেরিকার সব ছোটো শহরের মতো এখানেও আছে। আইওয়া বলে অ্যামেরিকার মিডিওয়েস্টের যে রাজ্য তারই রাজধানী ছিল শহরটা। ১৮৩৯ থেকে ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত। ওই বছরে আইওয়ার রাজধানী ডিময়েনে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এখনও সেখানেই আছে।
একটা কোন হলিউডি সিনেমায় নায়ক জিজ্ঞেস করে “ইজ দিস হেভেন?”
উত্তরে শোনে, “নো ইটস আইওয়া।”
সেই ডায়ালগ নিয়ে আইওয়ার অনেকেরই প্রচ্ছন্ন গর্ব থাকলেও, আইওয়ার দীর্ঘদিনের খ্যাতি অ্যামেরিকার ‘কর্ন ক্যাপিটাল’ হিসেবে। আদর করে এই রাজ্যটিকে ‘মেসোপটেমিয়া’ বলা হয়। কারণ, দু-দিক থেকে অ্যামেরিকার প্রধান দুই নদী একে আগলে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রমাণ হয়ে গেছে আইওয়ার চাইতে ফসলবিলাসী মাটি গোটা আমেরিকায় আর নেই। খুবই স্বাভাবিক যে কর্ন উৎপাদনে আইওয়াই এক নম্বরে। স্তালিনের পর সিংহাসনে বসেই নিকিতা ক্রুশ্চেভ আইওয়াতে উড়ে গিয়েছিলেন ঐ বিপুল খাদ্য ভাণ্ডারের হাল হকিকত জানবেন বলে।
নিজের তৈরি করা নোটে এই বিষয়গুলো লিখে টং হং একটু দেখছিল। বেশি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে কী? হোক। মানুষকে তো জানাতেও হবে।
আইওয়া শহরের গাইড হিসাবে ও ছুটির দিনগুলোয় কাজ করে। আর আইওয়ার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে নিজের জেলবন্দি বাবার কথা খুব মনে পড়ে ওর। ইশ! ঝকঝকে এই রোদের মধ্যে বাবাকে যদি এই শহরটা ও দেখাতে পারত? এই রং বদলাতে থাকা গাছগুলোর মধ্যে, রাস্তার মধ্যে আমেরিকার নয়নাভিরাম ‘ফল’-এর মধ্যে বাবার সঙ্গে ও যদি ঘুরে বেড়াতে পারত? মন খারাপ হয়ে গেল টংহং-এর।
কিন্তু কাজটা কাজই। আইওয়া শহর যে ট্যুরিস্টদের ও ঘুরিয়ে দেখাবে তাদের যাতে কোথাও কোনোরকম কোনো আপশোস না থাকে সেটা দেখে নেওয়া ওর কর্তব্য।
আজকের গ্রুপটার সঙ্গে টং হং যখন বেরিয়েছে তখন কিছুটা মেঘ এসে আকাশে জমেছে। টং হং সেই মেঘের দিকে একবার তাকিয়ে ভাবছিল কোথা থেকে উড়ে আসে এই মেঘ? সেই সুদূর এশিয়া থেকে? চিনের সেই শহরটা থেকে, যেখানে ওর বাবা চার দেওয়ালের ভেতর বন্দি আছে? যারা মনে মনে অনেক কিছু ভাবে হয়তো কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে না। টং হং গ্রুপটার সামনে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে সংযত করে নিল। তারপর বলল, “আপনারা সবাই আজ এই শহরটা ঘুরে দেখবেন প্রথমবার। এর চড়াই উৎরাই রাস্তা আর গাছগাছালি, ক্যাপিটাল বিল্ডিং, ওল্ড ক্যাপিটাল মল, শার্টল বাস সার্ভিস, ব্লু রুট আর রেড রুট দুটোই কীভাবে গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে ক্লক ওয়াইস চক্কর কাটছে, সব। তার সঙ্গে আপনার চিনবেন এখানকার দুর্দান্ত সব রেস্তোরাঁ আর পাব; পিটাপিট, ওয়েসিসফালাফাল, ব্যান্ডিচোস, ব্রিকস ওয়াইন এণ্ড চীজ, মামাসডেইলি, ইণ্ডিয়া কাফে… টু নেম আ ফিউ। দারুণ কফির জন্য স্টারবাকস, জাভা হাউস – সস্তায় অনেক বাজারের জন্য ওয়ালমার্ট আর টার্গেটের জন্য সুপারস্টোর্স— যারা বই পত্র ভালোবাসে তাদের জন্য প্রেইরি লাইটস। যারা সেকেন্ড হ্যাও বই-এর জন্য ছটফট করেন তাঁদের জন্য হন্টেড বুক শপ। গান শুনতে না পেলে যারা ছটফট করে তাদের জন্য পাবলিক স্পেস বা স্যাংচুয়ারির মতো লাইভ মিউজিক ভেন্যুস। ফিল্মের জন্য সাইকোমোড বা কোরালরিজ। আর হ্যাঁ প্রসারির জন্য ব্রেড গার্ডেন মার্ক আর ডার্টি জনস প্রসারি। যারা ক্লাসিক জামাকাপড় খুঁজছ তারা ওয়ালমার্টে পাবে না তাই রিভাইভাল এ যেতে হবে তার জন্য। কোনো চিন্তা নেই মোটামুটি ঘণ্টাখানেকের এই ট্যুরটাতে আইওয়া সিটির ফার্স্টহ্যাও ফিল পেয়ে যাবেন আপনারা। আর তারপর অল ইস ইওরস।” কথাগুলো শেষ হলে হাততালি দিয়ে উঠল ওর সামনে দাঁড়ানো ট্যুরিস্টের দল। অ্যামেরিকায় মানুষের একটা বড়ো গুণ হলো এখানে লোকে খুব অ্যাপ্রিসিয়েট করতে পারে। যে কোনো কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারলে এখানে যা শোনা যায় তা হল, ‘আই এপ্রিশিয়েট’।
টং হং-এর ভালো লাগে শব্দটা। ও তো অ্যাপ্রিসিয়েট করে মানুষ যেখানে মানুষকে মানুষের সম্মান দিচ্ছে, মতের বিরুদ্ধে গেলেই মানুষকে চাবুক মারছে না কিংবা খাঁচার ভেতরে ভরে রাখছে না, সেই দেশ সেই সংস্কৃতিকে ও সম্মান করে। পরের কথাটা বলার আগেই টং হং নিজের ফোনটাকে বাজতে দেখে উঠল। একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসছে। সাধারণত কাজের মধ্যে ফোন ধরতে ও পছন্দ করে না। কিন্তু নম্বরটা মনে হচ্ছে কোনো দূর দেশের। এশিয়ার কোনো দেশের। কে ফোন করছে টং হং-কে? ওর কাছে সে কী জানতে চায়? চিনের কেউ কী? কে? বাবা সুস্থ আছে তো? এই নম্বর তো চিনেরও নয়। তাহলে কোথাকার? একটু অবাক হয়ে গিয়ে ফোনটা ধরল।
ওপাশে একটা গলা প্রথমে কী বলল, খেয়াল হল না। তারপর বুঝতে পারল যে দীপ্রর খোঁজে কেউ ওকে ফোন করেছে।
দীপ্র ওর প্রেমিকের বন্ধু। কিন্তু সে ওরও তো বন্ধু হয়ে গেছে এতদিনে। কী হয়েছে দীপ্রর?
টং হং জিজ্ঞেস করল।
ওপাশের গলাটা যে ইংরাজিতে কথা বলছিল, তা পুরোটা ও বুঝতে পারছিল না। কোনো একটা রিজার্ডের কথা বলছিল। দীপ্রর খবর ও পায়নি। ওই আশেপাশে কোনো ঝড়ের কথা কী ও শুনেছে? ঝড় এসেছে কোথাও কোনো খবর নেই তো। তবে কোথায় কখন ঝড় আসে কেই বা তার খবর রাখে? অ্যামেসে গেলে সপ্তাহের শেষে দীপ্রর সঙ্গে দেখা হবে। কিন্তু আজকে এ-মুহূর্তে দীপ্রর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ তো নেই। একটু কিছুক্ষণ ভেবে, মেয়েটাকে তিন চারঘণ্টা পরে ফোন করতে বলে। কিন্তু মেয়েটা এতটা উতলা হয়েছিল যে টং হং ওকে পাঁচ মিনিট বাদে ফোন করতে বলল। ও তার মধ্যে দীপ্রর খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পাঁচ মিনিটে দীপ্রর ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করল টং হং। কিন্তু ফোনটা বন্ধ। ও লি ইউ শান-কে ফোন করল। দীপ্রর র জানতে চাইল। লি ইউ শান প্রথমে বলতে পারল না। তারপর বলল, খবর নিয়ে জানাচ্ছে। মিনিট সাতেকের মধ্যে ফোন করল টং হং-এর মোবাইলে। দীপ্র তো ওই মুহূর্তে অ্যামেসে নেই। ও মোবাথার গাড়িটা নিয়ে ডিময়েনে গেছে ওর গার্লফ্রেণ্ডের কাছে। আচ্ছা ইন্ডিয়া থেকে যে মেয়েটা ফোন করেছে তাকে কী এটা বলা ঠিক হবে যে দীপ্র তার এখানকার গার্লফ্রেন্ডের কাছে গেছে? নাকি মেয়েটা যখন আবারও উতলা হয়ে ফোন করবে তখন, দীপ্র ঠিক আছে, ভালো আছে, এইটুকু বলাই যথেষ্ট হবে? যেটা সত্যি সেইটে, নাকি যেটা বললে মেয়েটা আঘাত পাবে না সেইটে? কোল্টা বলা উচিত হবে? টং হং নিজের ভেতর নিজে থমকে গেল, এক মুহূর্ত।
(২২)
স্বপ্নে কী মানুষ একদম ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা আবার দেখতে পারে? কে জানে। কিন্তু দীপ্র তো তাই দেখল। শুধু যার সঙ্গে ঘটনাটা ঘটেছিল, তার বদলে নিজেকে দেখতে পেল। অনেক পরে ঘুমটা ভাঙতে ঝিম ধরে কিছুক্ষণ বসে রইলও। তারপর স্বপ্নটাকেই রিওয়াইন্ড করে দেখার চেষ্টা করল জাগ্রত অবস্থায়।
আমেরিকায় এসে প্রথম যে হোস্টেলে ছিল সেখানে নিজের ঘরটা পছন্দ হয়নি দীপ্রর। কিন্তু তাই নিয়ে কাউকে নালিশ করার মতো সাহস বা স্পর্ধাও ছিল না। যা পেয়েছে তাই ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছিল। খুব একটা অসুবিধে হয়নি কারণ মেনে নেওয়ার অভ্যেস তো আর নতুন করে তৈরি করতে হয়নি ওকে। ছোটো থেকে হোস্টেলে ছিল বলে ওটা গায়ের চামড়ার মতোই হয়ে গিয়েছিল। ফারাক একটাই, দেশে, নিজের কী চাই তাই নিয়ে মানুষভাবেই না খুব একটা, আমেরিকায় সেটাই জীবনের চালিকা শক্তি। দীপ্ররও তাই মনে হচ্ছিল যে একটু ভালো একটা ঘর, (যার জানলা দিয়ে তাকালে পরে মস্ত দেওয়াল আর মেশিন নয়, খোলামাঠ আর রাস্তা চোখে পড়ে পেলে পড়ে মন্দ হত না।
মাথায় ওই ইচ্ছেটা ঘুরত বলেই, দুশো চোদ্দো নম্বর ঘরটায় ঢুকলে মন ভালো হয়ে যেত ওর। কলম্বিয়া থেকে আসা এনরিকো সেরানো থাকত ওই ঘরটায়। রিসার্চ করার জন্যই আমেরিকায় এসেছিল সেরানো কিন্তু ওর হাবভাব দেখলে মনে হত ও যেন অনন্ত এক ভ্রমণে এসেছে এই দেশটায়। একদিন ব্রেকফাস্টের পর সেরানোর ঘরে ঢুকে দীপ্র দেখল, লোকটা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের একটা কার্ড নাচিয়ে অনর্গল কথা বলে চলেছে। প্রায় মিনিট দুয়েক ওই একই কসরৎ করে গেল লোকটা ঘরে ঢুকে আসা দীপ্রর উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে।
দীপ্র সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে ভাবছিল যে এভাবে ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ওর ঢুকে আসা উচিৎ হয়নি, সেরানো হয়তো বিরক্ত হচ্ছে…
ঠিক তখনই ওই কার্ড নাচানো বন্ধ করে টেবিল থেকে তুলে দীপ্রর দিকে একটা মাফিন এগিয়ে দিয়ে সেরানো বলল, “প্লিজ টেস্ট দিস ওয়াইল্ড ব্লু বেরি মাফিন। ইট ইজ ভেরি টেস্টি।”
নামটা যেন জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠল দীপ্রর মাথায়। হাতে নিয়ে এক কামড় দিতেই ভালো লাগাটা জিভ পেরিয়ে গলায় নামতে শুরু করল। কিন্তু দ্বিতীয় কামড় দেওয়ার আগে দীপ্র জিজ্ঞেস না করে পারল না জানলার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি কী করছিলে বলো তো?
“ভারী সুন্দর একটা পাখি এসে বসেছিল গাছের ওপরে। আমার মেয়েকে দেখাচ্ছিলাম পাখিটা।” সেরানো একগাল হেসে বলল।
দীপ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
“মেয়ে? কোথায় তোমার মেয়ে?”
সেরানো ওর গলা থেকে ঝুলতে থাকা ফিতের ডগায় ল্যামিনেট করা ছবিটা দীপ্রর মুখের কাছে তুলে ধরে বলল, “হিয়ার ইজ মাই ডটার। সি ইজ জাস্ট নাইন মান্থস ওল্ড।”
দীপ্র আর একটাও কথা না বলে চুপচাপ মাফিনটা খেতে খেতে ভাবল, পৃথিবীকে যখন সারাক্ষণ হিংসা আর দ্বেষই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে, তখন সেরানো কী চমৎকার একটা পৃথিবী গড়ে নিয়েছে নিজের জন্য। আগের দিনই আমেরিকার কোন একটা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে কোন এক সাইকোপ্যাথ গুলি করে আট দশটা তাজা ছেলেমেয়েকে মেরে ফেলেছে। ফোনে মা-কে খবরটা দেবার সময়ও গলা কাঁপছিল দীপ্রর কারণ একদিন ওর ইউনিভার্সিটিতেও ঘটনাটা ঘটতে পারে। কিন্তু আজ সেরানোকে দেখে ওর মনে হল যে আর যেখানেই হোক, অ্যামেসে ঘটনাটা ঘটবে না কারণ এখানে সেরানো আছে। আছে ওর মেয়ে যে কলম্বিয়ায় ঘুমিয়ে থেকেও মিডওয়েস্টের একটা পাখির বন্ধু হয়ে গেছে। বাবার সৌজন্যে।
ওরা দু-জন ওদের রিসার্চের কথা, অ্যামসে শহরটার কথা আলোচনা করছিল। তারপর কিন্তু মিনিট পাঁচেকের মাথায় সেরানো বলে উঠল, “এসো, জানালার কাছে এসো। আবার সেই পাখিটা এসেছে।” বলতে বলতে ঝট করে আবার সেই জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সেরানো।
দীপ্র ওর কাছে গিয়ে দেখল, সকালের রোদে একতাল সোনার রং ধারণ করা একটা পাখি, সেরানোর ঘরের জানলা থেকে যে ছোট্ট মাঠটা দেখা যায়, তার ঠিক মাঝখানে এসে বসেছে।
“আমার মেয়ে তো আমার চোখ দিয়েই দেখছে। তুমি নিজের চোখ দিয়ে দ্যাখো।” কথাটা বলেই সেরানো ফিতেটা গলায় পরে নিল আবার আর মেয়েটার ছবিটাকে উঁচু করে ধরল জানলার দিকে।
দীপ্র ওই দৃশ্যটা দেখে মনে মনে একটা নাম দিয়েছিল সেরানোর সেদিন, “ওয়াইল্ড ব্লু বেরি মাফিন।”
সেই দৃশ্যটাই একটু আগে ঘুমের মধ্যে ফিরে এল দীপ্রর কাছে। স্বপ্নের চেহারা ধরে। শুধু সেরানোর জায়গায় ও নিজেকে দেখল, জানলার সামনে ফিতে গলায় দাঁড়িয়ে থাকতে। আর ফিতের থেকে ঝোলা কার্ডটায় কোনো বাচ্চার নয়, কলকাতার একটা মেয়ের ছবি দেখল। আর স্বপ্ন ভেঙে যেতেই ওই মুখটা মনে করে শিউরে উঠল।
জীবন যখন বাঁকের মুখে এনে দাঁড় করায় তখন কী করে মানুষ? রাস্তা তো একটা নিতেই হয় তাকে। কলকাতার মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেকটা জড়িয়ে গিয়েছিল এই কয়েক মাসে। তিন চারদিন ফোন না করলে মেমসাহেবদের প্রসঙ্গ তুলে ফেসবুকে খোঁচা দিত মেয়েটা। সত্যি বলতে সেই খোঁচা মন্দ লাগত না দীপ্রর। আর কয়েকদিনের ব্যবধানে মেয়েটাকে ফোন করত দীপ্র। গলা শুনলে ভালো লাগত আরও। কিন্তু কাল যা হল, বিশাখাকে ছাড়ার কথা ভাবা যার কী আর? বিশাখা তো আর এখন বউদি নয়, অন্য কারও বিবাহিত স্ত্রী-ও নয়। বিশাখা এখন দীপ্রর ওপর নির্ভর করে অন্ধকার থেকে উঠে আসতে চাওয়া একটা ছায়ার নাম। ছায়াকে রোদের থেকে আলাদা করে কী করে দীপ্র?
মা কিংবা বাবা কেউ নিশ্চয়ই প্রথমে মেনে নেবে না ওর আর বিশাখার সম্পর্কের রসায়নটা। প্রথমে চিৎকার করবে, তারপর কাকুতিমিনতি। তবে দীপ্রর বিশ্বাস, শেষ অবধি বোঝাতে পারবে ওদের। যেটা করেছে সেটা হয়তো ভুল কিন্তু বিশাখা আর ওর সম্পর্কটা যে চেহারা নিয়েছে কাল তারপর তাকে অস্বীকার করাটা অন্যায় হবে।
রসায়নে হামেশাই এরকম হয়। দুটো বস্তুকে মিশিয়ে দিলে যা পাওয়া যাবে ভাবা হয়েছিল, মিশিয়ে দেওয়ার পর পাওয়া গেল তার থেকে একদম অন্যরকম কিছু। ওর আর বিশাখার মিশ্রণ ঠিক সেভাবেই হয়েছে যদি ধরে নেওয়া যায়? ফল যা আসছে তাকে ওর পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজন মানতে পারবে না কিন্তু দীপ্র না মেনে যাবে কোথায়? বিশাখাকে কীভাবে খাদের মুখে ফেলে চলে যাবে ও? নাহ, সেই আগুন একসঙ্গেই পার হতে হবে।
চোখ কচলে বিছানা থেকে উঠে বিশাখাকে ডাকল দীপ্র। একবার, দু-বার। কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। ঘরের দরজাটা খুলে ড্রয়িংরুমে এল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল, কোনো পাখি নয়, বিশাখা একটা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। গাড়িটা দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া অবধি হাত নাড়ল বিশাখা। তারপর ঘাসজমি পেরিয়ে বাড়ির দিকে আসতে লাগল।
এত ভোরে কে এসেছিল? কাকে বিদায় জানাতে বিশাখা নাইটড্রেসে বাড়ির বাইরে চলে গেল?
(২৩)
সুচন্দ্রার কান মাথা ঝাঁঝাঁ করছিল। ব্লক করে দিল দীপ্র ওকে? কেন? কী অপরাধ করেছে ও? কথা বলতে বলতে ভালোবেসে ফেলেছে। সামনের দিনগুলো ওর সঙ্গে থাকবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। কিন্তু তার দায় তো সুচন্দ্রার একার নয়। দীপ্রর মা প্রক্রিয়াটা শুরু না করলে ও তো জীবনে চিনতই না ওদের। যখন চিনল তখনও ও নিজের থেকে কখনোই ততটা এগোয়নি। ওর ভয় ছিল, দ্বিধা ছিল। দীপ্রর মা-কে যা নয় তাই কথাও শুনিয়ে দিয়েছিল। তারপরও যে সম্পর্কটা এগিয়েছে তার কারণ দীপ্র নিজের থেকেই ফোন করতে শুরু করে ওকে। আর ছেলেটার গলার মধ্যে একটা সততা আছে বলে মনে হয়েছিল সুচন্দ্রার।
ভুল মনে হয়েছিল। জীবনের অনান্য অনেক ভুলের মতো এটাও ভুল। বড়ো মাপের ভুল। কিন্তু যে ওকে দিয়ে এই ভুলটা করাল, মরুদ্যানের স্বপ্ন দেখিয়ে পুরো ব্যাপারটাকেই মরীচিকায় বদলে দিল, তাকে ছাড়বে না সুচন্দ্রা। ওদের বাড়িতে গিয়ে যা বলার তা তো বলবেই, একদম ধুইয়ে কাপড় পরিয়ে দেবে দীপ্রর মা আর বাবাকে, কিন্তু সেখানেই থামবে না। আইওয়ার যে নম্বরটায় ফোন করেছিল দীপ্রর খবর জানতে চেয়ে সেখানে ফোন করেই জানাবে, ছেলেটা আসলে কীরকম। একটা মেয়ের সঙ্গে ছ-মাস, সাতমাস কথা বলে, ভবিষ্যতে আমেরিকায় ওরা কীরকম বাড়ি কিনবে সেই আলোচনা করে, হঠাৎ করে একদিন ব্লক করে দেয় মেয়েটাকে।
হ্যাঁ, ব্লকই করেছে। নইলে ওর কলিগ সাধনার ফোন থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে দীপ্রকে আর ওর ফোন থেকে যাচ্ছে না, এটা কীভাবে সম্ভব? আচ্ছা হলটা কী? দীপ্র অন্য কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়েছে? সুচন্দ্রা জানে না কেন, কিন্তু, ‘পাল্লা’ বা ‘খপ্পর’-এর মতো শব্দগুলোই আসছিল ওর মাথায়। ও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না, যে ছেলেটা তিনদিন আগেও ফোনে ওকে জিজ্ঞেস করেছে যে ও বড়িপোস্ত রাঁধতে পারে কী না, সে দুম করে কোনো আমেরিকান মেয়ের সঙ্গে শুয়ে পড়বে!
“তুমি কেন ভাবছ যে আমেরিকান কারও পাল্লাতেই পড়েছে?” সোমবার দিন সাধনা ওকে বলল।
সাধনা শ্রীবাস্তব অবাঙালি বলেই ওর ফোন থেকে বারংবার দীপ্রর ফেসবুক চেক করছিল সুচন্দ্রা। বাঙালি হলেই গসিপ শুরু করত আর গসিপে ওর অরুচি। কিন্তু রোববার ও সাধনাকে পাবে কোথায়? সে তো সেই খড়দায় থাকে। নিজের আর একটা অ্যাকাউন্ট বানিয়ে সেখান থেকে দীপ্রকে ট্র্যাক করবে ভাবছিল কিন্তু কীরকম যেন জোর পেল না। বারপুয়েক সাধনাকে ফোন করল শুধু।
সাধনা তখন তত কিছু না বলালেও সোমবার জিজ্ঞেস করল কথাটা। আর কেন জিজ্ঞেস করছে জানতে চাইলে সুচন্দ্রার দিকে এগিয়ে দিল নিজের মোবাইলটা। সুচন্দ্রা মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল ফেসবুকে দীপ্রর প্রোফাইল পিকচার বদলে গেছে। পুলোভার পড়ে অ্যামেসের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ছবিটার বদলে একটা অন্য মেয়ের কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি সেখানে। না, মেয়েটা কোনো খেতাঙ্গিনী নয়। বাঙালিই। হাসছে। দীপ্রর পাশে দাঁড়িয়ে।
ছবিটার নীচে কমেন্টগুলো পড়ার মতো ধৈর্য সুচন্দ্রার হল না। ওর মাথার মধ্যে দাবানল আর সুনামি একসঙ্গে খেলা করছিল। মনে হচ্ছিল চোখ ফেটে যাবে রাগে, অপমানে। কিন্তু অফিসে তো আর সেসব দেখানো যায় না। নিজেকে যতটা সম্ভব সংযত করে সুচন্দ্রা তাই আবারও একবার দীপ্রর নতুন প্রোফাইল পিকচারটার দিকে তাকাল।
মেয়েটার হাসিটা এত চেনা লাগছে কেন? কোথায় দেখেছে সুচন্দ্রা এই হাসি? নাকি এটা নেহাতই ভ্ৰম? স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল যার জন্য, তাকে চেনা বলে মনে হওয়ার ভ্রম?
(২৪)
“তুই কী রামমোহন না বিদ্যাসাগর? বিধবাদের উদ্ধার করছিস?” মা চিৎকার করে উঠল ফোনের ওপাশে।
“উদ্ধারের কোনো প্রশ্ন উঠছে না কারণ সে ক্ষমতাই আমার নেই। বরং সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বিশাখাই আমাকে উদ্ধার করেছে। ও গ্রিন কার্ড হোল্ডার। দু-দিন পর সিটিজেন হয়ে যাবে।”
“তুই তাহলে আমেরিকান সিটিজেন হওয়ার জন্য বিয়ে করছিস? তোর রিসার্চ কমপ্লিট হল না, চাকরি পেলি না, তুই বিয়ে করে নিচ্ছিস কোন্ আক্কেলে?”
“করব তো ভাবিনি। পাকেচক্রে ….
“ট্র্যাপে পড়েছিস তুই, বেরিয়ে আয়। নিজের জীবন আর পরিবারের সুনাম একসঙ্গে দুটোই নষ্ট করিস না।”
“আমার জীবন এতে নষ্ট হচ্ছে না, বরং সুবিধেই হবে। আর পরিবারের সুনাম নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আজকাল সুনাম ধুয়ে জল খায় না কেউ।”
“তার মানে তুই আমাদের কেউ হোস না? ভালো। তোর পরিচয়ও আমরা কেউ দেব না বাইরে। আমি কিংবা তোর বাবা মরলে মুখাগ্নি করার জন্যেও শ্মশানে আসিস না তুই। এটাই আমার শেষ কথা।” মা কেঁদে ফেলল।
“মা তুমি এভাবে কেন রিয়্যাক্ট করছ? আমি যদি কারও সঙ্গে সুখে থাকি তাহলে তোমারও তো তাতে সুখী হবার কথা, তাই না?”
“তুই আমার আর তোর বাবার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিবি আর আমরা খুব সুখে থাকব? তোকে আমি আবারও বলছি ওই বদ মেয়েছেলেটা তোকে ফাঁদে ফেলেছে। ছিবড়ে করে রাস্তায় ফেলে দেবে। তার চেয়ে যে মেয়েটাকে তোর জন্য দেখেছি, যার সঙ্গে এতদিন ধরে কথা বললি…”
“কথা বললেই, বিয়ে করব, সেই দাসখত লিখে দিইনি কাউকে।”
“তা দেবে কেন? তোমাকে তো এখন ওই ডাইনি গিলে ফেলেছে!”
“মা তুমি এই ভাষায় বিশাখার সম্বন্ধে কথা বলবে না। ও আমার স্ত্রী এখন…”
“ছ-মাস আগে শান্তনুদার বউ বলতে অজ্ঞান ছিলি। আজ হঠাৎ নিজের বউ বলতে লজ্জা করছে না?’
“শান্তনুদা মারা গেছে মা।”
“মারা গেছে কী না তুই জানলি কী করে? কাঁধে করে ডেডবডি নিয়ে ‘বলো হরি/ হরিবোল’ ধ্বনি দিতে দিতে হেঁটেছিস রাস্তা দিয়ে? ওর হাজব্যান্ড যে মারা গেছে, কী গ্যারান্টি তার? দেখ গিয়ে তোকে ফাঁসানোর জন্য ওই হারামজাদী নাটক ফেঁদেছে।”
“ছিঃ! ছিঃ! তুমি এইসব কী ভাবছ মা? আমায় নিয়ে তোমার এক্সপেরিমেন্ট সফল হয়নি বলে, এখন যা নয় তাই বলতে হবে?”
“এক্সপেরিমেন্ট? আমি যা চাইছিলাম তোর জন্য সেটা এক্সপেরিমেন্ট? আর তুই নিজে যেটা করছিস সেটা কী?”
“আমি পরে তোমায় ডিটেলে বুঝিয়ে বলব। তুমি একবার বিশাখার সঙ্গেও কথা বলে দ্যাখো, দরকার হলে স্কাইপে দ্যাখো ওকে, তোমার ভুল ধারণা বদলাবেই আমি নিশ্চিত।”
“না। খবরদার আমার সঙ্গে কথা বলাতে আসবি না। আমার যা বোঝার বোঝা হয়ে গেছে। কী করেছিস তুই মেয়েটার সঙ্গে? প্রেগন্যান্ট করে দিয়েছিস নাকি? নাকি অন্যের বাচ্চা তোর বলে চালাচ্ছে?”
“আমার ভাবতে লজ্জা করছে যে আমার মা একজন মহিলা সম্বন্ধে এরকম ভাষায় কথা বলছে!”
“আমারও ভাবতে ঘেন্না করছে যে তোর মতো কাউকে আমি দশমাস দশদিন পেটে ধরেছিলাম। তুই আর কোনোদিন ফোন করবি না আমাকে বা তোর বাবাকে। তোর বোনকেও নয়। আমরা তোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না।”
মা ফোনটা কেটে দিল।
দীপ্র স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মা রেগে যাবে আন্দাজ করেছিল কিন্তু তাই বলে এতটা রিয়্যাক্ট করবে তা ভাবতে পারেনি। প্রত্যেকেই কী তবে অন্যের ওপর নিজেকে চাপিয়ে দিতে চায়?
*****
সপ্তাহে পাঁচদিন অ্যামেসে থাকত আর শুক্রবার বিকেল হলেই ডিময়েনের উদ্দেশে রওনা দিত দীপ্র। গাড়ি চালানো শিখে নিয়েছিল। না শিখে উপায় ছিল না, বিশাখা নিজেই গাড়িটা কিনে দেওয়ার পর।
“এটা তোমার ওয়েডিং গিফট।” বিশাখা বলেছিল। যে মেয়েটা ওর থেকে নেয়নি কিছু, চায়ওনি, শুধু দিয়ে গেছে, তাকে কীভাবে খারাপ ভাববে দীপ্র? হ্যাঁ, দীপ্রর ভালোবাসায় নতুন করে বাঁচতে চেয়েছে বিশাখা কিন্তু বাঁচতে চাওয়াটা কী অপরাধ? দীপ্র হয়তো সুচন্দ্রাকে দুম করে ব্লক করে অন্যায় করেছে, কিন্তু ও তো পুরো ব্যাপারটা সাধ্যমতো এক্সপ্লেইন করেছে পরে মেসেজ লিখে। কই, তার কোনো উত্তর তো দেয়নি ওর মায়ের ক্যান্ডিডেট।
“তুমি একটা ভুল করছ দীপ্র, দু-জন মানুষ নিজেদের মতো করে সুখী হলে তৃতীয় কেউ ততক্ষণ খুশি হয় না যতক্ষণ না ওই দু-জন তার ওপর কিছুটা হলেও ডিপেন্ড করছে।”
“কিন্তু আমেরিকা থেকে ইন্ডিয়ায় তো…”
“তোমার মা চাইছিলেন যে তুমি সারাজীবন ওনার ওপর নির্ভরশীল থাকো। ওনার দেখিয়ে দেওয়া রাস্তায়, ওনার এগিয়ে দেওয়া লাঠিটা হাতে নিয়ে হাঁটো। কিন্তু তুমি তো আর তা পার না, তাই না? তোমার বিশাখাকে ছেড়ে?”
“না। পারি না।” বিশাখার আলিঙ্গনের ভেতর থেকে বলে উঠল দীপ্র।
“পারতে চাও?”
“না।”
“তাহলে চলো আমরা হানিমুনে যাই। নতুন বিয়ের পর হানিমুনে যাব না?” বিশাখা একটা চুমু খেল দীপ্রর গালে।
হানিমুনে কোথায় গেলে ভালো তাই নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দীপ্র আলটপকা বলে ফেলল, “মা মনে করে শান্তনুদা মারা যায়নি, বেঁচে আছে।”
বিশাখা কীরকম একটা অদ্ভুত চোখে দীপ্রর দিকে তাকাল কথাটা শুনে। তারপর বলল, “তুমিও তাই মনে করো নাকি?”
কথাটার জবাব না দিয়ে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিল।
*****
ক্লান্ত ছিল বলে সেদিন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গিয়েছিল দীপ্র। ঘুমটা ভাঙতেই দেখল ওর গায়ের ওপরে একটা অফ হোয়াইট শার্ট। পাতায় রক্তের দাগ শুকনো হয়ে লেগে আছে।
শার্টটা হাতে নিয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল দীপ্র, বিশাখা!
আওয়াজটা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল ওর কাছেই।
দীপ্র ঘামতে শুরু করল।
