দুপুরে মৃত্যুর স্পর্শ – ২৫
(২৫)
দীপ্রর ল্যাবে হাঙ্গেরির একটা ছেলে কাজ করছিল ‘জ্বালা’ নিয়ে। দু-ধরনের অ্যান্টিসেপটিক সবাই চেনে মোটামুটি। প্রথমটা গায়ের সঙ্গে লাগলে জ্বালা হয় আর দ্বিতীয়টা লাগলে পরে জ্বালা হয় না। ক্ষত দুটোতেই সেরে যায়, কিন্তু ঠিক কী ফারাক হয়, জ্বালা ধরানো কম্পোজিশন অ্যান্টিসেপটিকের মধ্যে থাকলে বা না-থাকলে তাই নিয়েই গবেষণা করত ছেলেটা।
মাঝে মাঝে ওই ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়াত দীপু। আর তখনই ওর মনে হতো যে মানুষও আসলে দু-ধরনের। একদলের সংস্পর্শে এলে গায়ে জ্বালা হয়। আর একদলের সংস্পর্শে এলে হয় না।
রাডাভান সেট্রেসকু বলে ওই ছেলেটা আদতে রোমানিয়ার কিন্তু অল্পবয়সে হাঙ্গেরিতে চলে এসেছিল। ও যখন গল্প করতে তখন ওর দৃশ্যপট বর্ণনার মধ্যে রোমানিয়া আর হাঙ্গেরি কীভাবে যেন মিশে যেত। হাঙ্গেরির নদীর কথা বলতে বলতে ও একসময় একটা ঘোরের মধ্যে থেকে উঠে এসে বলত যে নন্দীটা আসলে হাঙ্গেরির নয়, রোমানিয়ার।
বিশাখার সঙ্গে সংসারে জড়িয়ে যাওয়ার পর, শান্তনুদার বাড়িটাকেই নিজের বলে ভাবতে শুরু করেও মাঝে মাঝে একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যেত দীপ্র। ওর মনে হত সত্যিই কী ও এই বাড়ির কর্তা নাকি নেহাতই এক আশ্রিত যে পাকেচক্রে মালিক হতে চাইছে?
একদিন সন্ধেবেলা ল্যাব থেকে বেরিয়ে বাচ্চাদের একটা মিছিল দেখে থমকে গেল দীপ্র। মিছিল যে আমেরিকায় একদম হয় না তা নয়, তবে এভাবে বারো চোদ্দো বছরের বাচ্চাদের প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় দেখেনি ও। সেই মিছিলে অ্যাফ্রো-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গরা যেমন আছে, তেমনই আছে মেক্সিকান কিংবা চিনেরাও। ব্যাপারটা কী সেটা বোঝার জন্য একটু দাঁড়িয়ে গেল দীর্ঘ। প্রায় পঞ্চাশটা বাচ্চা হাঁটিতে এটিতে স্লোগান নিচ্ছে, “উই উইল নট গো ব্যাক।” ব্যাপারটা কী? কোথায় ফিরতে চাইছে না? কোত্থেকে ফিরতে চাইছে না?
মোবাথা কখন এসে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি দীর্ঘ। হঠাৎ ওর হাতটা কাঁধে এসে পড়তে চমকে তাকাল।
“এই বাচ্চাগুলোকে আমেরিকা তাড়িয়ে দিতে চাইছে কিন্তু ওরা জানে না কোথায় যাবে।” মোবাধা বলল।
“মানে? কী দোষ করেছে ওরা?”
“ওরা আমেরিকায় এসে পড়েছে এটাই তো সবচেয়ে বড়ো দোষ। জঙ্গল টপকে, সমুদ্র সাঁতরে ওরা এই দেশটার ভেতর ঢুকে পড়েছে। ঢুকে পড়ুক কেউ তা চায়নি কিন্তু ঢুকে পড়ার পর এদের মেনে নেওয়া হতো। আগের সরকার তো এদের একটা নামও দিয়েছিল, ‘ড্রিমার্স”।”
প্ল্যাকার্ডে প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘দ্য ড্রিমার্স আর হিয়ার টু স্টে ‘হ্যান্ডস অফ ডাকা’। দীপ্র একটু অন্যমনস্কভাবেই জিজ্ঞেস করল, “নতুন সরকার কী বলছে?”
“তুমি কাগজ পড়ো না? টিভি দ্যাখো না?” হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল মোবাথা।
*****
দু-দিন পরের এক রাতে বিশাখাও অবশ্য হাসল না দীপ্রর কথা শুনে। গম্ভীর গলায় বলল, “ডাকা হচ্ছে, ‘ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস’। এই আইনটা যতদিন ছিল ততদিন কাগজপত্র ছাড়া এদেশে ঢুকে আসা বাচ্চারা পড়াশোনা আর কাজ করার সুযোগ পেত দু-বছর করে।
“আর দু-বছর পর?”
“দু-বছর পরপর পারমিটটা রিনিউ করা যেত।”
“চমৎকার। তাহলে এটা নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে কেন?”
বিশাখা একটু ঘন হয়ে বসল, “না করেই বা কী করবে? গণ্ডায় গণ্ডায় বাবা-মা বাচ্চাদের সমুদ্রের জলে ফেলে দিচ্ছে যাতে তারা সাঁতার কেটে আমেরিকায় পৌঁছে যেতে পারে। এই বাচ্চাগুলো এখানে হোটেলে ওয়েটারের কাজ করবে, টয়লেট সাফ করবে বাড়িতে বাড়িতে, আর ওরা আঠেরো হলে, ওদের ওপর নির্ভরশীল দেখিয়ে পুরো গুটি চলে আসবে ইউএসএ-তে। সাদা চামড়ারা ক-দিন মেনে নেবে বলো তো?”
“কিন্তু এই সাদারাও তো আর আমেরিকার নেটিভ নয়। তারাও তো কোথাও না কোথাও থেকে এসেই সেটল করেছে এখানে।”
“সে বহু শতাব্দী আগের কথা। আমরা আজকের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছি।” বিশাখা দীপ্রর গালে নিজের গালটা ঘসে দিয়ে বলল।
“কিন্তু আজকের পরিস্থিতি কী কাল বাদ দিয়ে হয়?”
“তুমি এখনও আমায় শান্তনুর বউ বলেই ভাবো তাই না?” হঠাৎ রেগে উঠল বিশাখা।
“তা কেন ভাবব?”
“ভাবো। প্রতি মুহূর্তে সেটা বুঝতে পারি বলেই ক্ষতবিক্ষত হই। মনে হয়, আমি একরকম জোর করে তোমায় আমার জীবনে টেনে এনেছি। আসতে চাওনি তাও এনেছি।”
“প্লিজ তুমি এভাবে ভেব না। আমি কিন্তু কিছু মিন করে…”
“তুমি আমায় স্তোক দিও না তো। সেই যখন চমকে উঠেছিলে শান্তনুর ওই শার্টটা দেখে তারপর অন্তত তোমার মাথা থেকে সব সংশয়, সব সন্দেহ বেরিয়ে যাবে, আমি আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি…”
“না বিশাখা, ভুল দেখছ। আমি জাস্ট একটা কথার কথা বলেছিলাম তোমায়। তাও মা কথাটা বলেছিল বলে…”
“তোমার মা, তোমার বাড়ি, এর ভেতরে আমি কোথায় বলো তো? আদৌ কী কোথাও আছি? আমার কী মনে হয় জানো দীপ্র, ওই রক্তমাখা শার্টটা তুমি তোমার মাথার ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছ।”
“কী আবোলতাবোল বকছ?”
“একদম ঠিক বলছি। শান্তনু মরে গেছে সেটা বোঝাতেই ওই শার্টটা তোমার বিছানায় ফেলে এসেছিলাম কিন্তু তুমি যে ওটা ক্যারি ফরোওয়ার্ড করে চলবে, আমার ধারণা ছিল না।”
“ইউ আর গেটিং মি রং ডার্লিং।” দীপ্র জড়িয়ে ধরল বিশাখাকে।
বিশাখা নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা না করেই বলল, “আই অ্যাম নেভার রং। আমাদের অফিশিয়াল বিয়ের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ তো দেখি না তোমার।”
“তুমি যখন বলবে। আমি তো তোমার ওপর সব ছেড়ে ওই যে একটা রক্তমাখা শার্ট, ওর আর বিশাখার মধ্যে, ওটা দিয়ে বসে আছি।”
“উফফ দীপ্র, মেয়েরা সবকিছু নিজের হাতে নিতে ভালোবাসে না। তোমাকে প্রোঅ্যাকটিভ হতে হবে। এরপর তুমি বলবে, কোথায় হানিমুনে যাব, সেটাও আমি ঠিক করব।”
“তুমিই তো করবে। আমার থেকে এইসব ব্যাপার অনেক ভালো বোঝো তুমি। আর তাছাড়া বিশাখা…”
“তাছাড়া কী?”
“আমি একটা ব্যাপারে কুণ্ঠিত থাকি, সেটা তুমি নিশ্চ বোঝো। টাকাপয়সার দিক দিয়ে আমি প্রায় কিছুই কনট্রিবিষ্টা করতে পারি না সংসারে।”
“তাতে কী? আমি চেয়েছি তোমার থেকে?”
“চাওনি। কিন্তু আমার ভেতর তো ব্যাপারটা খচখচ করে, তাই না?”
“করবেই তো। যতদিন আমায় আপন ভাবতে পারবে না ততদিন করবে। যেদিন বিশ্বাস করতে পারবে যে আমার আছে তার সবটাই তোমার, সেদিন আর খচখচানিটা থাকবে না দ্যাখো।”
“কিন্তু তুমি টাকা পাবে কোত্থেকে?”
“সে চিন্তা তোমায় করতে হবে না। তুমি মন দিয়ে নিজের রিসার্চ শেষ করো। আরে বাবা আমি তো শান্তনুর ডে বেনিফিট পেয়েছি। আর সেই টাকাটা খুব একটা কম নয়। তাছাড়া আমি আবার আমার ফ্লোরিস্টের চাকরিটায় জয়েন করেছি। আমি ফুলের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারি সেটা ক-দিনের। তাই ওরাও কদর করে আমার।
“তুমি এত ফুল চেন আমায় আগে বলোনি!”
“চিনি বলেই তো বাগানের সবচেয়ে তাজা ফুলটাকে নিজের জন্য বেছেছি। এবার বলো তো সোনা, কোথায় যাব আমরা হানিমুনে?”
বিশাখা এমনভাবে প্রশ্নটা করল যেন কোন্ বাজারে মাছ কিনতে যাবে, জিজ্ঞেস করছে।
“হংকং না জাপান? বলো তোমার কোনটা পছন্দ?” দীপুর মুখটা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরল বিশাখা।
দীপ্রর খুব ভালো লাগতে পারত মুহূর্তটা কিন্তু বিশাখার হাতের ছোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়া ঘরটায় ওর মাথার মধ্যে ভেসে উঠল ওই প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় হাঁটতে থাকা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর মুখ। ওরা যেমন, ‘ড্রিমার্স’, দীপ্র নিজেও কী তাই নয়? এই দেশটায় বাঁচবে, বড়ো হবে, পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাবে, সেই স্বপ্ন তো ওরও চালিকাশক্তি। বিশাখা নিশ্চয়ই সেই স্বপ্নপূরণের পথে ওর সহায় হতে পারে কিন্তু সরে গিয়েও সরে যায় না কেন?
(২৬)
সূচন্দ্রা নিজেই নিজের ফর্ম ফিলআপ করল ছোট্ট ঘরটায় বসে। নাম, পেশা, কীরকম চাহিদা সবকিছু লিখল। লিখতে লিখতে ওর চোখ ভরে যাচ্ছিল জলে, বারবার মনে পড়ছিল, দীপ্রর সঙ্গে টুকরো টুকরো কথাবার্তার স্মৃতি। নতুন কোনো জায়গায় গেলে, নতুন কিছু দেখলে, ওকে ফোনে জানাত দীর্ঘ। সেই ফোনগুলো একঘণ্টা দেড়ঘণ্টা চলত আর ফোন রেখে দেওয়ার পরও সুচন্দ্রার মাথার মধ্যে বাজত কথাগুলো কখনও কখনও সারারাত। এমনকী পরদিনও। সেই যেবার বুলফাইটিং দেখতে গিয়েছিল দীপ্র, আইওয়ারই কোন গ্রামে আর সেখান থেকে ফিরে সারাক্ষণ গল্প করছিল, কেমন করে ক্ষ্যাপা ষাঁড়গুলো দৌড়ে আসছিল আর লাফ দিয়ে তার ওপরে চেপে বসছিল, এক একটা লোক।
“যদি কেউ লাফ দিয়ে উঠে বসতে না পারে?” সুচন্দ্রা জিজ্ঞেস করেছিল।
“বাপরে! সেই লোকটা ষাঁড়ের পায়ের তলায় পিষে যাবে।” দীপ্র জবাব দিয়েছিল।
এই ম্যাট্রিমনি সেন্টারের অফিসে বসে সুচন্দ্রার মনে হচ্ছিল যে ওই খ্যাপা ষাঁড়ের মতোই দীপ্র ওর জীবনে এসেছিল, আর ও লাফ দিয়ে পিঠে উঠে কবজা করতে পারেনি বলে ওকে পায়ে পিষে দিয়ে চলে গেছে।
“আপনি কী কলকাতার ভেতরেই সেটল করতে চাইছেন?” ম্যাট্রিমনি সেন্টারের মেয়েটা জিজ্ঞেস করল।
“সেরকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।” কীরকম একটা আছে?” ঘড়ঘড়ে গলায় জবাব দিল সুচন্দ্রা।
“এখন তো সবাই নিজেরটা নিজেই দেখে নেয়। প্রোফাইল খোলে, ইন্টারেস্ট পাঠায়, তারপর চ্যাট করে। তারপর ছাদনাতলায় গিয়ে দাঁড়ায়। সুচন্দ্রাকে অনেকেই বলেছে। কিন্তু সুচন্দ্রা আর পারবে না সেটা। একজনের সঙ্গে যেভাবে মিশেছে, যতটা উন্মুক্ত করে দিয়েছে মনের সমস্ত আবেগ, আবার নতুন করে কারও সঙ্গে তা করা সম্ভব নয়। আচ্ছা, যাকে কোনোদিন চোখেই দেখেনি তার প্রতি এতটা ভালোবাসা জন্মানো সম্ভব? নিজের মনে আসা এই প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে পেয়েছে সুচন্দ্রা। সম্ভব যদি না হতো তাহলে পরে তো অন্ধরা কেউ কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতেই পারত না। ওই অন্ধের মতোই দীপ্রকে অনুভব করেছে সুচন্দ্রা, ওর কণ্ঠস্বরের মধ্যে। ফোনের ওপাশ থেকে দীপ্রর বলে যাওয়া শব্দের রঙেই ওর পান্না সবুজ হয়ে উঠেছে, চুনী হয়ে উঠেছে রাঙা। কীভাবে যে ওই শব্দগুলোকে নিজের শ্রুতি আর স্বত্বা থেকে সরায় সূচন্দ্রা।
“একজন পাত্রের কথা আপনাকে বলতে পারি, এস্ট্যাবলিশড। বয়স হয়তো আপনার তুলনায় সামান্য বেশি কিন্তু দেখে মনে হয় না। তাছাড়া কথা বলে যেটুকু বুঝেছি খুবই জেন্টলম্যান।”
কথা বলে মানুষকে বোঝা যায় বুঝি? মনে মনেই হাসল সুচন্দ্রা। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কী করেন এই ভদ্রলোক?”
“ইঞ্জিনিয়ার। খুব উঁচুদরের। সেদিক থেকে অসুবিধে নেই। অসুবিধে একটাই। ওনার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে স্ত্রী মারা যান। স্যাড কেস।”
“জীবনে এমনিই স্যাডনেসের কোনো অভাব নেই, তার ওপরে স্যাড কেসের সঙ্গে নিজেকে জড়ানোর আর কোনো মানে হয় না।” সুচন্দ্রা ভাবল।
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে সেন্টারের ভদ্রমহিলা বললেন, “ভাববেন না আপনাকে প্রেশারাইজ করার জন্য কথাগুলো বলছি। তবে আপনি চাইলে একবার এমনিই কথা বলে দেখতে পারেন ভদ্রলোকের সঙ্গে। উনি কয়েকদিনের জন্য কলকাতার এসেছেন। হয়তো আরও একসপ্তাহ থাকবেন।”
সুচন্দ্রা অর্ধেক শুনেছে আর বাকি অর্ধেক শোনেনি এমনভাবে জিজ্ঞেস করল, “কলকাতায় এসেছেন, মানে? কোথায় থাকেন?”
“নিউ জার্সিতে।” ভদ্রমহিলা বললেন।
“কোথায়?”
“আমেরিকায়। আপনার ওই দেশে সেটল করতে আপত্তি আছে?”
*****
বাড়ি ফেরার পথে, ফিরে এসে সারাক্ষণ সুচন্দ্রা ভাবছিল ভদ্রমহিলার ওই প্রশ্নটার কথা। আমেরিকায় সেটল করতে আপত্তি থাকলে দীপ্রর সঙ্গে অত কথা বলত কেন? আবার এটাও ঠিক যে দীপ্র যদি ওকে উগান্ডা কিংবা তানজানিয়ায় নিয়ে যেত, সেখানেও খুশি মনেই চলে যেত সুচন্দ্রা। দীপ্রর সঙ্গে থাকছে, তার চাইতে বড়ো আনন্দের আর কীই বা হতে পারত?
কিন্তু তা যখন হয়নি তখন কেন সেই দেশেই ও থাকবে না, দীপ্র নিজেও যেখানে আছে?
“তুই কী ওকে দেখাতে চাইছিস যে তুইও আমেরিকায় যেতে পারিস? নইলে একটা লোক, যার আগে একবার বিয়ে হয়ে বউ মারা গেছে তার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে চাইছিস কেন?” কিছুটা বিরক্ত হয়েই মা জিজ্ঞেস করল সুচন্দ্রাকে।
“বউ মারা গেলে কী লোকে আবার বিয়ে করে না?” সুচন্দ্রা কিছুটা মিনমিন করেই বলল।
“সে করতেই পারে। কিন্তু তোকে কেন?”
“দেখা করলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না,” ইত্যাদি কথা বলে মায়ের সামনে থেকে সরে এল সুচন্দ্রা। কিন্তু বালিশে মুখ দিয়ে ওর মনে হল, মা যা বলছে তা কী ভুল? ও তো সত্যিই দীপ্রকে দেখিয়ে দিতে চাইছে। কিংবা কে জানে হয়তো দেখতে চাইছে আর একবার। আমেরিকা থেকে ওই বিদেশি মেয়েটা ওকে একবার ফোন করে বলেছিল, “ডোন্ট ওয়ারি, দীপ্র উইল গেট ব্যাক।” মেয়েটা যে ওকে স্বান্তনা দিচ্ছে তা বুঝতে পেরেও ওই কথাগুলো ভালো লেগেছিল সুচন্দ্রার। মনে হয়েছিল সাত সমুদ্র দূর থেকে কেউ একটা তার কষ্ট বুঝছে। আর কষ্ট যে বোঝে সে তো আর অচেনা থাকে না। আচ্ছা আমেরিকায় গিয়ে ও যদি দীপ্রর মুখোমুখি দাঁড়ায় দীপ চিনতে পারবে ওকে? যদি নিজের পরিচয় দেয় সুচন্দ্রা তাহলেও না চেনার ভান করে সরে যাবে নাকি দাঁড়িয়ে কথা বলবে দু-দণ্ড?
যে ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা, তার ছবি কিংবা পরিচয় কিছু নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সুচন্দ্রা ওর মোবাইলে নেট অন করে দেখতে চেষ্টা করল, নিউ জার্সি থেকে অ্যামেস কতটা দূরে, ঠিক ক-হাজার কিলোমিটার? পৌঁছোতে কতক্ষণ সময় লাগে? আর সেটা করতে গিয়ে ফেসবুকে নিজের প্রোফাইল থেকেই দীপ্রর প্রোফাইলে গেল একবার।
ব্লক তুলে দিয়ে ওকে লম্বা একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল দীপ্র। এই বিয়েটা কেন ওকে করতে হয়েছে, কী পরিস্থিতিতে, সেসব জানিয়ে। খানিকটা পড়ার পর আর পড়তেও ইচ্ছে হয়নি সুচন্দ্রার। আজও হল না। বরং দীপ্রর ছবিগুলোই দেখল আর একবার। না নতুন ছবি তেমন একটা নেই, যা আছে তার সবই পুরোনো। কিন্তু একটা ছবি যোগ হয়েছে প্রোফাইলে। দীপ্রর নয়, ওর সঙ্গিনীর। সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল সুচন্দ্রার। বহুবছর আগের কথা তবু… সেই নাক, সেই চোখ, সেই হাসি।
কী যেন নাম ছিল মেয়েটার?
*****
(২৭)
শুধু আকর্ষণের ওপর তো কোনো সম্পর্ক টেকে না। তার জন্য চাই অনেকখানি নির্ভরতা। সেই নির্ভরতা দীপ্র বিশাখার মধ্যে খুঁজত কিন্তু বিশাখাও কী খুঁজত দীপ্রর মধ্যে? দীপ্র ঠিক বুঝতে পারত না। কখনও ওর মনে হতো যে বিশাখা এতটাই সাহসী আর স্বনির্ভর যে কারও ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ে না ওর। আবার দীপ্র অ্যামেসে ফিরে গেলে বিশাখা যখন পাগলের মতো ফোন করে জানতে চাইত করে আবার ডিময়েনে ফিরবে ও, তখন মনে হতো বিশাখা একটা শূন্যতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে আর সেই শূন্যতা থেকে বাঁচবার জন্য ওর দীপ্রকে চাই-ই চাই। সেই চাওয়ার কাছে খানিকটা অসহায় হয়ে এক-একবার রিসার্চের দফারফা করে বৃহষ্পতিবার রাতেও ডিময়েনে চলে এসেছে ও। কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য জবাবদিহি করতে হবে কী না সেই চিন্তা হাওয়ায় উড়িয়ে বিশাখার চুল, বিশাখার মুখ, বিশাখার নিশ্বাসের গন্ধে নিজেকে ডুবিয়ে দেবে বলে, উদগ্রীব হয়ে থেকেছে দীপ্র। কিন্তু সেদিনই অনেক রাত করে কাজ থেকে ফিরেছে বিশাখা। হাই তুলতে তুলতে জানিয়েছে, ফ্লোরিস্টের কাজ কত কঠিন, কীভাবে খরিদ্দার বুঝে ফুল দিতে হয়। যে কিনতে চাইছে তার পছন্দের সঙ্গে যে বিক্রি করছে তার সুবিধা মিশিয়ে দিতে হয়। বিশাখার কথা শুনে গেছে দীপ্র কিন্তু কথাগুলো ওর মন অবধি পৌঁছোয়নি। ওর কেবলই মনে হয়েছে ঘরে ফুলের গন্ধ নয় কাঁটার খোঁচা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই কাঁটা উদাসীনতার, অবহেলার।
কিন্তু সেই বিশাখাই যখন আবার মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে আদর করতে শুরু করত দীপ্রকে তখন অভিমানের দেওয়াল কীভাবে যেন গুঁড়িয়ে যেত; জাগ্রত সুনামি এসে একটা ঘুমন্ত শহরের দখল নিয়ে নিত। সুড়ঙ্গের শেষে আলোটা এত তীব্র আর এত চোখ ঝলসানো যে অন্ধকার মিলিয়ে যেত নিমেষে। “সারা সপ্তাহ আমি তোমার জন্য কীরকম ছটফট করি, সেটা তোমাকে একটু বোঝাতে ইচ্ছে করে।”
“সে কারণেই দেরি করে ফিরলে?” দীপ্র জিজ্ঞেস করেছিল।
“না গো, সত্যিই কাজ ছিল। কিন্তু কাজের ভেতর প্রতিটা মুহূর্তে তোমার কথা ভেবেছি, শুধু তোমার কথাই।”
“তুমি অ্যামেসে চলে আসতে পারো তো। ওখানে তো অনেকেই একসঙ্গে থাকে। কিছু না-কিছু কাজ ওখানেও জুটে যাবে নিশ্চয়ই।”
“আমি এখন বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলের একটা ঘরে থাকতে যাব? তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল?”
“তুমিই তো বললে যে মিস করছ…”
“হ্যাঁ করছি। করি। কিন্তু তাই বলে আমি তো আবার স্কুলবালিকার জীবনে ফিরে যেতে পারি না। বাঘের থাকার জন্য একটা জঙ্গল চাই দীপ্র, তাকে এক কামরার ঘরে রাখা যায় না।” বিশাখা হেসে উঠেছিল।
দীপ্রর বলতে ইচ্ছে হয়েছিল যে বাঘ তো খাঁচাতেও থাকে কিন্তু ওই এক কামরার ঘরের উল্লেখে ও এতটাই আঘাত পেয়েছিল যে আর কথার পিঠে কথা বাড়াতে ইচ্ছে হয়নি।
অ্যামেসে ফিরে এসে লি আর টং হং-কে দেখে ভাবছিল, ওরা কী সুন্দর একটাই ঘরের মধ্যে থাকে, ওদের কই জায়গার অভাব হয় না। তাহলে কী যে ভালোবাসা সমস্ত খামতি মিটিয়ে দেয়, বিশাখার তা নেই ওর প্রতি? ও কেবলই একটা শূন্যস্থান পূরণের যন্ত্রমাত্র?
টং হং ওকে একদিন বলেছিল যে মোমবাতির আলোয় যে স্নিগ্ধতা তা হ্যালোজেনে পাওয়া যাওয়া না। কথাটা তখনই কিছু রেজিস্টার করেনি মাথায় কিন্তু পরে ভেবেছে দীপ্র কথাটা নিয়ে। টং হং-এর ফোন থেকে একবার সুচন্দ্রাকে ফোন করেছিল ও, নিজের ফোনের চার্জ ছিল না বলে। ফোনটা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় টং হং ওর দিকে তাকিয়ে একটু বেশিক্ষণ ধরেই হেসেছিল।
“হাসছ কেন ওভাবে?” দীপ্র জানতে চেয়েছিল।
“যখন কথা বলছিলে তখন তোমার মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি আর আনন্দ একসঙ্গে খেলা করছিল।” টং হং বলেছিল।
সেদিন রাতে লি আর ওর সঙ্গেই ডিনারে গিয়েছিল দীপ্র। নিজের বাড়ির কথা, বড়ো হয়ে ওঠার কথা বলেছিল ওদের। সুচন্দ্রার কথাও কী বলেছিল কিছু, জড়তা কাটিয়ে?
দীপ্রর ঠিক খেয়াল পড়ে না। কিন্তু টং হং আগের মতো করে আর কথা বলে না কেন ওর সঙ্গে সেটাও ভালো বুঝতে পারে না। দীপ্রর মুখে শান্তি আর আনন্দ খুঁজে পায় না বলে?
কোথায় পাওয়া যায় শান্তি আর আনন্দ?
*****
হানিমুনে জাপানই এল ওরা। বিশাখা আসার আগে একটু হংকং যেতে চাইছিল কিন্তু দীপ্র এই একটা ব্যাপারে একটু জেদ ধরে রইল। না চাইতেও অন্ধকার জমে উঠেছিল জীবনে। প্রথম সূর্যের দেশের আলোয় তাকে দূর করে দিতে চাইছিল ও, যতটা সম্ভব।
জাপানে পৌঁছে খানিকটা অবাকই হয়ে গেল। কী শান্তির একটা দেশ অথচ একইসঙ্গে কী তীব্র তার গতি। পাশ্চাত্যের সবটুকু বিজ্ঞানকে নিজের পরম্পরার মধ্যে স্থাপন করেছে জাপান। পেশাদারিত্ব আর সেবা হাতে হাত মিলিয়ে চলতে পারছে তাই। প্রতিটি ক্ষেত্রে।
টোকিওতে দীপ্রদের হোটেলের লবিতে সকালেই চলে এলেন এক ভদ্রলোক। তিনি ওদের টোকিও শহর ঘুরিয়ে দেখাবেন। না, তার বিনিময়ে কোনো পয়সা নেবেন না। অধ্যাপক ভদ্রলোক এই কাজ করেন কারণ তিনি গর্ব অনুভব করেন নিজের শহরের দর্শনীয় জায়গাগুলো টুরিস্টদের ঘুরিয়ে দেখাতে। কথা প্রসঙ্গে নাকামুসি নামের সেই অধ্যাপক জানালেন যে তার মতো আরও অজস্র মানুষ জাপানে ছড়িয়ে আছে যারা টুরিস্টদের পাশে থাকেন। এরা সবাই টোকিও ফ্রি গাইড সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত।
বিশাখা নাকামুসিকে এড়িয়ে যেতে চাইছিল কিন্তু দীপ্রর ইচ্ছেতেই ভদ্রলোক ওদের সঙ্গী হলেন। টোকিওর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত হাতের তালুর মতো চেনা যাঁর, তেমন একটা লোক পাশে থাকলে সুবিধেই হবে, এই ছিল দীপ্রর বক্তব্য।
নাকামুসি ওদের আসাকুসা বলে একটা সব পেয়েছি-র দেশে নিয়ে গেলেন যেটা টোকিওর ব্যস্ততম স্ট্রিট মার্কেট কিন্তু বাজারের হই হট্টগোল কিচ্ছু যেখানে নেই। একটা বিকিকিনির জায়গায় যে এতটা শান্তি থাকতে পারে সেটা ওখানে না গেলে জানা হতো না। সেখান থেকে বেরিয়ে নাকামুসির সঙ্গে টোকিওর পথে পথে ঘুরে শেষমেশ একটা বিরাট মন্দিরের সামনে এসে থামল ওরা। চলার পথে দারুণ অভিজ্ঞতা হল শিবুয়ার মোড়ে এসে। সেখানে অজস্র লোক একসঙ্গে রাস্তা পার করার চেষ্টা করছে কিন্তু প্রচণ্ড শৃঙ্খলার সঙ্গে। তারপর নাকামুসি ওদের নিয়ে গেলেন আখিবারা বলে একটা শপিংমলে যেখানে পৃথিবীর সমস্ত ইলেকট্রনিক গ্যাজেট সস্তায় মেলে। কিন্তু ইলেকট্রনিক জিনিস মন টানছিল না ওদের। বরং শিংকাসেন বলে জাপানের বুলেট ট্রেনে চেপে একটা অনন্য অভিজ্ঞতা হল। ঘণ্টায় তিনশো কুড়ি কিলোমিটার গতিতে চলে এই ট্রেন। কী প্রবল তার গতি আর কী অসম্ভব পরিষ্কার তার ভেতরটা।
দিন তিনেক টোকিওতে থেকে কিওটো গেল ওরা। কিওটো খুব শান্ত একটা শহর যেখানে অনেকগুলো বুদ্ধমন্দির। তারই একটায় সোনায় মোড়া একটি বুদ্ধমূর্তির সামনে বিশাখাকে পাশে নিয়ে বসে রইল দীপ্র। ওর মনে হচ্ছিল, জীবন থেকে সব নেগেটিভিটি সমস্ত তিক্ততা মুছে যাচ্ছে, বুদ্ধের সামনে বসে চোখের সামনে থেকে কুয়াশা মুছে যাচ্ছে।
টোকিওয় ফিরে দীপ্র টের পাচ্ছিল কোথাও একটা রূপান্তির ঘটছে ওর। আর সেই রূপান্তর ওদের সম্পর্কটাকেও গড়ে নেবে নতুন ছাঁচে। সমস্ত দ্বিধা, সব সন্দেহ আর সংশয় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে বইতে শুরু করবে একটা নদী। সেই নদীর জলের সঙ্গে যখন আকাশের বিদ্যুতের সংযোগ ঘটে তখন নদীর ভেতরে কী ঘটে? সে কী ফুলে ওঠে? কামপ্রবণ হয়ে যায় আরও? কিয়োটো থেকে টোকিয়োতে ফিরে আসার পর বিশাখাকে দেখে তেমনই লাগছিল। বাসনা নয় কেবল, বিস্তারে ধরতে চাইছিল ও দীপ্রকে। আঁচড়কামড়, লালাবীর্যের গতানুগতিকতা পার করে, শরীরী ব্যায়াম থেকে শরীরী স্ফুলিঙ্গে উত্তীর্ণ হতে হতে নদীর ভেতর থেকে বিদ্যুৎ তুলে নেওয়ার মতো করে বিশাখার ভেতর থেকে সবটুকু অতীত তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিল দীপ্র। সেই প্রক্রিয়া কোথাও একটা জার্নি বলে মনে হচ্ছিল ওর যে জার্নির শেষে দুটো ঝরনা মিশে যায় পরস্পরে, দুটো চোখ থেকে একই কান্না বেরিয়ে আসে হয়তো-বা।
আবেশ আর ক্লান্তির মধ্যে আধাআধি ভাগ হয়ে গিয়ে দীপ্র বিশাখার শরীর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল আর চোখদুটো লেগে এল তখনই। চটকাটা ভাঙতেই দেখল বিশাখা প্রায় নগ্ন হয়েই বসে আছে ওর পাশে।
“তুমি ঘুমোবে না?”
“আমার ঘুমোতে ভালো লাগে না।” বিশাখা বলল।
“তাহলে কী করবে এখন?”
“যা করছিলাম একটু আগে।” বলেই বিশাখা একটা কাগজ দীপ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এইগুলোতে সই করো এক্ষুনি। তারপর আবার…”
ওর দিকে চোখ মারা বিশাখাকে অবাক হয়ে দেখতে দেখতে দীপ্র জানতে চাইল, “কীসের কাগজ এগুলো? কেন সই করতে হবে?”
(২৮)
বিশাখার দেওয়া কাগজপত্র সই করার সময় দীপ্র ততকিছু ভাবেনি। কিন্তু আমেরিকায় ফিরে এসে ওর মনে হতে থাকল, কী এমন তাড়া যে বিশাখাকে জাপানে হানিমুনে গিয়ে অতবড়ো ইনশিওরেন্সের কাগজে সই করাতে হল দীপ্রকে? করবে না, করবে না করে একদিন প্রশ্নটা করেও ফেলল বিশাখাকে।
“আমি জানতাম তুমি এই কথাটা জিজ্ঞেস করবে। কারণ সংসার তো তোমায় চালাতে হয় না। বিশাখা একটা বাঁকা হাসি হেসে বলল।
“সংসার কী ইনশিওরান্সের টাকায় চলবে?”
“তাই তো চলছে। শান্তনুর মৃত্যুর পর ইনশিণ্ডারাগা থেকে ওর ডেথ বেনিফিট না পেলে পর এই ফুটানি প কী করে? জাপান ঘুরে এলাম, তাতে কত ডলার খরচ হ ভেবে দেখেছ একবারও?”
“তুমিই হানিমুনে যেতে চেয়েছিলে।”
“নতুন বিয়ের পর যে-কোনো স্ত্রী-ই চাইবে। যেকার বরেরও চাওয়ার কথা। তুমি চাওনি?”
“আমি তা বলিনি। কিন্তু আমি রিসার্চ স্কলার, আম টাকাপয়সা ততকিছু নেই, এসব তো তোমার জানা কথ তারপরও তুমি এই জাতীয় কথা কেন বলো, আমি জানি না।”
“বলতাম না। তুমি হঠাৎ করে জেরা করতে শুরু কর তাই…”
“জেরা? আমি একটা সাধারণ প্রশ্ন করেছি তোমার তোমার সেটা জেরা মনে হল?”
“কেন করবে? কেন অন্ধের মতো ভরসা করতে পারে ন আমার ওপর? বলতে বলতে বিশাখা এগিয়ে এল দিকে।” ওকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে প্রায় ছেড়ে দিল দীপ্রত গায়ে।
কিন্তু দীপ্র একটুও জাগ্রত হল না। ওর মাথার মধ্যে ত বিশাখার পয়সায় জাপান যাওয়ার গ্লানি দপদপ করছে।
বিশাখা ওর গালে গলায় অজস্র চুমু খাচ্ছিল। কিন্তু দীপ্র চোখ বন্ধ করে বসেছিল। নিথর, নিস্পন্দ হয়ে। ওর বন্ধ চোখের ভেতর জাপানের সেই সোনায় মোড়া বুদ্ধমূর্তি দাউদাউ করে জ্বলছে। অপমানে।
*****
সময় সময়ের মতো চলতেই থাকে আর চলতে চলে কয়েকটা জিনিসকে সে ঠিক করে দেয়। আবার কয়েকটাকে পারেও না। মা যেমন দীপ্রর সঙ্গে কথা বলবে না সেই জি ধরেই থাকল কিন্তু মা-ই আবার দেয়ালিকে বাধা দিল না দীরে সঙ্গে কথা বলতে। দেয়ালির মাধ্যমেই দীপ্রর খবর পেত মা আর নিজেদের খবরও দিত যখন যেমন চাইত। আমেরিকা থেকে মায়ের জন্য ক্যালশিয়ামের ওষুধ পাঠাল দীপ্র। দেয়ালি জানাল যে সেই ওষুধের বাক্সটা হাতে নিয়ে কাঁদছিল মা।
“খায়নি?” দীপ্র টানাপোড়েনে ছিঁড়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল।
“খাবে। নিশ্চয়ই খাবে। কিন্তু আরও সময় লাগবে।”
দেয়ালির কথা শুনতে শুনতে দীপ্র ভাবছিল, এমন কোনে ওষুধ পাওয়া যায় না, যা পলকে পৃথিবীর সব ভুল বোঝাবুঝির অসুখকে সারিয়ে দিতে পারে?
*****
টিফানথালারের নির্দেশ অনুযায়ী বার্কলের সেমিনারটায় যেতেই হল দীপ্রকে। এমন না যে ওর খুব কিছু আপত্তি ছিল। কিন্তু একটা উইকএন্ড বিশাখার কাছে যেতে পারবে না বলে ভাবছিল। মাসখানেক আগে এরকমই একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল যখন তখন বিশাখাকে ফোন করে হাউমাউ করেছিল চী। বিশাখা খুব সহজ গলায় বলেছিল যে কাজ থাকলে পড়ে তো যেতেই হবে। কথাটা ভালো লাগেনি দীপ্রর। এবারে তাই সানফ্রানসিসকো যাওয়ার কথা ও জানালই না বিশাখাকে। কী লাভ জানিয়ে? বিশাখা তো সেই একই উত্তর দেবে।
“মানুষ কেমন জানেন তো? সোনার মোহর হাতে পেয়ে খেলে পর তার মনে হয় মোহরটা বোধহয় সোনার নয় তামার।” সুচন্দ্রা ওকে একদিন ফোনে বলেছিল।
সেদিন কথাটার মানে বুঝতে পারেনি দীপ্র। আজ মনে হচ্ছিল, বিশাখা ওকে তামা দিয়ে তৈরি ভাবতে শুরু করে দেয়নি তো? কিন্তু দীপ্র কী আদৌ সোনা ছিল কখনও?
*****
সৌন্দর্য নিজেই যদি একটা শহর হয়ে ওঠে তাহলে তার নাম হবে সানফ্রানসিসকো। সেখানে একইসঙ্গে পাহাড় আর সমুদ্র আর মায়াবী সমস্ত রাস্তা। গাড়ি এক দিক দিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে যায়, অন্যদিক দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসে নীচে। রাস্তায় রাস্তায় গান হয়। গিটার বাজিয়ে কত মানুষ যে গায়। ইতিউতি উড়ে যায় অজস্র পায়রা। ‘ফিশারম্যানস ডাভ’ বলে একটা জায়গা প্রশান্ত মহাসাগর লাগোয়া। সেখানে নানান রকমের মাছ বিক্রি হয়। মূলত চিনে রাঁধুনিরাই সেই মাছগুলো রেঁধে বা ভেজে দেয় আর সারা পৃথিবীর ট্যুরিস্টরা খায়। দীপ্র দেখছিল আর ভাবছিল ওই সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে, পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে, সানফ্রানসিসকো কীরকম প্রকৃতির সঙ্গে বেঁধে ফেলছে মানুষকে।
দীপ্রর ভীষণ ভালো লাগছিল। জাপানে শাস্তি পেয়েছিল আর এখানে যেন রূপে পাগল হয়ে উঠছিল। সকালে রাতে যখনই সময় পেত সানফ্রানসিসকোর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত আর নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে শহরটার রূপ টেনে নিত ভেতরে।
সানফ্রানসিসকো থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে নাপা বলে একটা ছোটো শহর আছে। ওয়াইনারির জন্য বিখ্যাত জায়গাটা। দীপ্রর সঙ্গেই সেমিনারে আসা রিচার্ড খুব করে ধরল একসঙ্গে একটু নাপা বেড়াতে যাবে বলে। এক ঘন্টার ড্রাইভ খুব বেশি হলে। দীপ্রর রাজি না হবার কোনো কারণ ছিল না। নাপায় ছোটো ছোটো কুটিরের মতো অনেক বাড়ি, বাড়িগুলোর পেছনেই মদ তৈরি হয়। রাত্রি আটটায় রওনা দিয়ে ন-টা নাগাদ নাপায় পৌঁছে গেল দীর্ঘরা। ওখানে হোটেলগুলো সব ওপেন এয়ার, লনে বসে মদ খাচ্ছে লোকেরা নানান সুখাদ্যের সঙ্গে। দুটো লন পেরিয়ে তিন নম্বর লনে ঢুকল দীপ্ররা। রিচার্ডের কথামতো একটা মদ অর্ডার করে দীপ্র ভাবছিল, সারাদিনে বিশাখা একবারও ফোন করল না কেন, গতকাল ও ডিনয়েনে না-যাওয়া সত্ত্বেও। আর তখনই সামনের টেবিলে বিশাখাকে দেখতে পেল দীপ্র।
বিশাখাই তো? নাকি মদে চুমুক না দিয়েই ভুল দেখছে? দীপ্রর মনে হল, একটা রাসায়নিক বিস্ফোরণ হচ্ছে সামনের টেবিলটায়। ও আরও পরিষ্কারভাবে দেখবে বলে উঠে দাঁড়াল।
*****
কী আশ্চর্য, এই লোকটাকেই তো শান্তনুদার অনুপস্থিতিতে ওর বাড়িতে দেখেছিল দীপ্র। বিশাখাকে চুমু খাচ্ছিল লোকটা। নাকি বিশাখাই খাচ্ছিল ওকে? আর এখন নিজের ল্যাপটপে পাশে বসা দুই বন্ধুকে বিশাখার নাচ দেখাচ্ছে। সেই লেকের ধারে বিকিনি পরা বিশাখাকে দেখে মুগ্ধই হয়েছিল দীপ। কিন্তু এই নাচের ভিডিওতে মিনিস্কার্ট পরা বিশাখাকে দেখেই মাথায় রক্ত চড়ে গেল ওর। কেনই বা যাবে না? প্রথম ঘটনাটার সময় বিশাখা তো ওর স্ত্রী ছিল না।
“হাউ ডেয়ার ইউ প্লে দিজ থিংস পাবলিকলি? ইউ সোয়াইন।” প্রায় একটা লাফ মেরে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল দীপ্র।
“হু দা হেল আর ইউ টু কনফ্রন্ট মি!” লোকটা সজোরে থাপ্পড় মারল দীপ্রর গালে, দীপ্র ল্যাপটপটার দিকে হাত বাড়াতেই।
থাপ্পড়টা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল দীপ্র। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “স্টপ প্লেয়িং দিস ডাটি ভিডিও। অদারওয়াইজ আই উইল কল নাইনওয়ানওয়ান।”
“কিন্তু কেন থামাব? তুমি কে আমাদের অর্ডার করার?” লোকটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বলে উঠল।
“কারণ এটায় আমার বউকে দেখা যাচ্ছে। আর আমার বউয়ের সম্মানহানি করার জন্য আমি তোমাদের অ্যারেস্ট করাব পুলিশ দিয়ে।”
কথাটা শেষ হবার আগেই দুটো লোক মিলে মারতে শুরু করল দীপ্র-কে। দীপ্রর ব্যায়াম করা চেহারা কিন্তু তাই বলে দুটো সাহেবের বেধড়ক মার সহ্য করার শক্তি ওর ছিল না। রিচার্ড এসে ওকে ওদের হাত থেকে না ছাড়ালে হয়তো মরেই যেত ও মার খেয়ে।
আশ্চর্যের বিষয় যে ওই হোটেল কাম বারের মালিক অথবা অন্য কেউ এসে হাত লাগাল না রিচার্ডের সঙ্গে দীপ্রকে অমন নির্দয়ভাবে মার খেতে দেখেও।
“এখানকার লোকেরা অমনই। আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্টের লোক এমনিতেই ঝামেলাতে জড়াতে চায় না তার ওপর আবার তুমি নিজেই গিয়ে ওদের ওপর চড়াও হয়েছিলে, সেটা ওখানে বসে মদ খাওয়া অনেকেই খেয়াল করেছে।” ঘণ্টাদুয়েক পরে রিচার্ড ওর বিছানার পাশে বসে ওকে বলল।
দীপ্র কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ছেলেটার দিকে। আজ যদি ও না থাকত তাহলে ওই বিভূঁইতেই মরে পড়ে থাকত হয়তো দীপ্র। কিন্তু ওকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও বেশ কয়েক যা খেয়েছে রিচার্ড, অথচ দীপ্রকে ও খুব অল্পদিনই চেনে।
ডানদিকের একটা দাঁত খুলে পড়ে গিয়েছিল দীপ্রর। তুলো চেপে সেখানকার রক্ত আটকানোর চেষ্টা করতে করতে ও বলল, “চড়াও না হয়ে কী করতাম? ওরা তো আমার বউকে নিয়ে নোংরা ভিডিও চালাচ্ছিল।”
রিচার্ড একটা পেইনকিলার দীপ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, *বাচ্চাদের মতো কথা বলছ তুমি। তোমার বউয়ের নাচের ভিডিও ওদের কাছে এল কী করে?”
“আমি জানি না। আমাকে ওকে জিজ্ঞেস করতে হবে।” দীপ্র কিছুতেই রিচার্ডকে বলতে পারল না যে এই লোকটাকে ও ডিময়েনে কী অবস্থায় দেখেছে বিশাখার সঙ্গে।
“সেটা আগে জিজ্ঞেস করে নিয়ে তারপর তোমার ওদের দিকে তেড়ে যাওয়া উচিৎ ছিল। মোবাইল ফোন তো কাছেই ছিল তোমার। তুমি কেন কল করলে না তোমার ওয়াইফকে?”
“মাথায় আসেনি, বিশ্বাস করো আমার মাথায় আসেনি।” বলতে বলতে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল দীপ্র।
রিচার্ড সেটাকে শুধু শরীরের ভেবে আবারও আইসব্যাগ চেপে ধরল দীপ্রর ঘাড়ে, গলায়। বুঝতে পারল না যে সেই যন্ত্রণা ছাপিয়ে দীপ্রর মন চিৎকার করে উঠছে নীরবে, এইরকম একটা ভিডিও এগসিস্ট করে সেটা বিশাখা কেন বলল না ওকে? কেন?
(২৯)
রিচার্ড ফিরে যাবার পরেও সানফ্রানসিসকোতে থেকে গেল দীপ্র কারণ বিশাখা আসছে। টিফানথালারের কাছ থেকে দিনতিনেক ছুটি নিয়ে চেয়ে নিল পারিবারিক কাজের অজুহাত দিয়ে। টিফানথালার এর সেমিনারে পেপার প্রেজেন্টেশন ভালো হয়েছে সেই খবর পেয়ে খুশিই ছিল বলে আপত্তি করল না।
থাকবে যে এমনটা ও ভাবেনি প্রথমটা কিন্তু বিশাখাকে ফোন করতেই বিশাখা একটা দুটো কথার পর বার্স্ট করে উঠল, “তুমি আমাকে সন্দেহ করো, প্রতিটা মুহূর্তে সন্দেহ করো।”
“এখানে সন্দেহের প্রশ্ন উঠছে কোথায়? আমি তো পরিষ্কার দেখলাম তুমি নাচছ, আর লোকটা সেই ভিডিও দেখাচ্ছে।”
“ভুল দেখেছ তুমি। ম্যাকাবেথ যেমন ডানকানের ভূত দেখত সর্বত্র সেইরকম ভূত দেখেছ আমার। আর কেন দেখো জানো? তুমি মনে মনে খারাপ কথা ভাব আমার সম্পর্কে, তাই দেখেছ।”
“দ্যাখো, আমি অত সাহিত্য পড়িনি তাই সাহিত্যের রেফারেন্সে কিছু ভাবিও না। অত ভারী কথা আমার শোনাও কেন? আমি স্পষ্ট দেখলাম যে…”
“কী দেখলে? আমি নাচছি? বেশ, কারও সঙ্গে শুয়ে আছি সেটা তো দ্যাখোনি? তাহলে অত রিয়্যাক্ট করার কী ছিল?”
“কিন্তু ওই লোকটা যাকে আমি শান্তনুদা থাকাকালীন তোমার সঙ্গে তোমার বাড়িতে দেখেছিলাম, তাকেই আবর দেখলাম…”
“ভুল বলছ। প্যাট্রিক এখন ফ্রাঙ্কফুর্টে। ওকে তুমি সানফ্রানসিসকোয় দেখতেই পারো না।”
“ঠিক সানফ্রানসিসকো নয়, তার থেকে সামান্য দূরে ন বলে একটা জায়গায়।”
“ওসব নাপা ফাপার নাম জানি না। জীবনে কখনও শুনিনি চার পাঁচবছর আগে একবার এসএফও-তে গিয়েছিলাম আমর তখন গোল্ডেন গেট দেখে ফিরে এসেছিলাম।”
“কিন্তু এখন তো নাপা মোটামুটি একটা ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশন, বাড়িতে বাড়িতে ওয়াইনারি। কত লোক যায় সেখানে।”
“আর সেখানেই তুমি প্যাট্রিককে দেখতে পেয়ে গেলে? সে আবার এসে মারল তোমাকে?”
“লোকটার নাম মুখস্থ করে রাখিনি বিশাখা। আর ও তোমার নাচের ভিডিও…..”
“স্টপ দিস ননসেন্স। আমি জেনিফার লোপেজ কিংবা ম্যাডোনা নই যে লোকে আমার নাচের ভিডিও তুলে দেখবে হ্যালুসিনেশন হচ্ছে তোমার।”
“না, আমার কোনো হ্যালুসিনেশন হয়নি। আমার একটা দাঁত পড়ে গেছে ওই গুন্ডাটার মার খেয়ে।”
“দ্যাখো বাবা, ফোকলা হয়ে যাওনি তো। ফোকলা বর নিয়ে জীবন কাটানো খুব মুশকিল কিন্তু।” বিশাখা হো হো করে হেসে উঠল ফোনের ওপাশে।
দীপ্রর ভেতরটা পুড়ে যেতে থাকল ওই হাসির আওয়াজে।
বিশাখা হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, “রিসার্চ স্কলাররা স্কুলের বাচ্চা নয়। তুমি ফোনে বা মেইলে জানিয়ে দাও যে তুমি কয়েকদিন এসএফও-তে থেকে যাবে। আমি কাল বা পরশুই আসছি।”
“কিন্তু কেন?” দীপ্র খানিকটা অবাকই হল।
“দু-জন মিলে প্যাট্রিককে খুঁজব সানফ্রানসিসকোর রাস্তায় রাস্তায়। পেলে পরে তো মেরেই ফেলব ওকে, যদিও আমি নিশ্চিত যে ওকে ওখানে পাওয়া যাবে না, কারণ ও ওখানে নেই।”
“তাহলে আসবে কেন? কষ্ট করে?”
“আসব কারণ তোমার মাথার মধ্যে যে অসুখটা দানা বেঁধেছে সেটাকে তো খুঁজে পাওয়া যাবে। আর সেই অসুখটাকে মেরে ফেলাটাও কম জরুরি নয়।”
“আমার কোনো অসুখ করেনি বিশাখা। আর আমি কোনো ভৌতিক দৃশ্যও দেখিনি।”
“সেটা তো তুমি বলছ। তোমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেলে হয়তো…”
“কেন নিয়ে যাবে আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে? আমি কী পাগল?”
“পাগল কেন হবে? কিন্তু তোমার মনে আমাকে নিয়ে…”
“না, সন্দেহ নেই। কিন্তু সন্দেহ না থাকলেই যা দেখেছি তা তো অস্বীকার করতে পারি না। এই লোকটাকে তুমি আদর করছিলে একদিন ডিময়েনে সেটা তো আমি নিজের চোখে দেখেছি। এবার বলো যে সেটাও হ্যালুসিনেশন?”
“হ্যালুসিনেশন নয় কিন্তু আদরও নয়। আমেরিকায় ওটা খুব জেনারেল কার্টেসি। তুমি নতুন তখনও দেশটায় তাই বুঝতে পারোনি। অবশ্য এখনও পারো কী না বুঝতে, আমার ডাউট আছে।”
দীপ্র চিৎকার করে উঠতে গেল, ‘বুঝতে চাইও না’ বলে। কিন্তু নিজেকে নিজে সামলে নিয়ে বলল, “আর ওই নাচের ভিডিওটাও কী সৌজন্যমূলক?”
“ওরকম কোনো ভিডিওর অস্তিত্বই নেই। তুমি ভুল দেখেছ। আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট শিওর।”
“না, আমি ঠিকই দেখেছি।”
“ঠিক আছে, আমি সানফ্রানসিসকোয় যাই। গেলেই প্রমাণ হয়ে যাবে কোনটা ঠিক আর ভুল কোনটা।” বিশাখা ফোনটা কেটে দিল।
