কালো হীরের জাল – ১
সারাদিনই ঝিপঝিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। নীরজ বর্মা বিকেলের পর দোকানে এসেছিলেন। রোজই একবার আসেন। নিজে হিসেবপত্র না দেখলে যতই পুরোনো লোক হোক টাকা-পয়সা মারে। এদিকে পার্টির কাজে ব্যস্ততা ইদানীং এমন বেড়েছে যে ব্যবসায় সময় দেওয়া মুশকিল। তাই লোক দিয়েই চালাতে হয়। নেতা বলে দিয়েছেন এবারও ক্যান্ডিডেট হতে হবে তাঁকে। নীরজ বর্মা নিজেও হতে চান। এবার জিতলে পাক্কা মন্ত্রী হবেন। জিতবেন নিশ্চয়। ভোপালের লোকজন তাঁকে পছন্দ করে। দোকানের কাজকর্ম সেরে আজও একবার পার্টি অফিস ঘুরে যেতে হবে। অন্ধকার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কম্পিউটারটা শাটডাউন করে উঠে পড়লেন নীরজ। মনসুরকে বললেন দোকান বন্ধ করে চাবি বাড়িতে দিয়ে দিতে। শীতল বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাইকের পেছনে উঠে বসলেন। খানিকটা এগিয়ে বাঁদিকে বাঁক নিল বাইক। এই রাস্তাটা একটু ফাঁকা, অন্ধকার মতো। দু-পাশে পাঁচিল। তবে শর্টকাট হয় বেশ খানিকটা। একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। সুঁ ই ই করে একটা আওয়াজ। নীরজ বর্মা উলটে পড়লেন বাইকের পেছন থেকে। শীতল কিছু বোঝার আগেই আর একটা গুলি এসে তার মাথায় লাগল। বাইকটা উলটে গিয়ে বিকট শব্দ করে ধাক্কা মেরেছে দেওয়ালে। গলির মুখ থেকে লোকজনের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। অন্ধকারে গা ঢেকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
***
ঘড়িতে রাত প্রায় আটটা। কালো রঙের গাড়িটা পার্বতী ভিলার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। দারোয়ানকে বলাই ছিল। তাড়াতাড়ি লোহার বিশাল গেট খুলে দিয়ে সেলাম ঠুকল সে। হাঁসের মতো মস্ত লম্বা গাড়িটা নিঃশব্দে ভেতরে ঢুকে গেল। পোর্টিকোর সামনে গাড়ি থেকে নামলেন প্রতাপ মিশ্র। সাফারি স্যুট পরা। বেশি লম্বা নয়। কিন্তু অতিরিক্ত চওড়া কাঁধের জন্য খানিকটা বুনো মোষের মতো চেহারা। শক্ত চোয়াল। চোখ দৃষ্টি ঠান্ডা, সাপের মতো। পোর্টিকোতে বড় আলো জ্বলছে। তার ঠিক নীচেই দাঁড়িয়ে আছে রাহুল তরফদার। অসম্ভব স্মার্ট আর চালাক-চতুর ধরনের। ভালো ইংরাজি বলতে আর লিখতে পারে বলে সূরযদেও সিং ইদানীং ওর ওপর বেশ খানিকটা নির্ভর করেন। রাহুল এগিয়ে এসে হাতজোড় করে বলল, “নমস্তে স্যার। মালিক আপনার জন্য দোতলার অপেক্ষা করছেন… রাস্তায় কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”
সামান্য একটু সৌজন্যমূলক ঘাড় নেড়ে এগিয়ে যান প্রতাপ মিশ্র। সিঁড়ির মাথায় একটা ছোকরা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সেই পথ দেখিয়ে নিয়ে যায় প্রতাপ মিশ্রকে। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই বিশাল হলঘর। তার দেওয়ালে বড়ো বড়ো অয়েল পেইন্টিং টাঙানো। ঘরের ভেতর দিয়েই সিঁড়ি উঠেছে দোতলায় পেইন্টিং টাঙানো। ঘরের ভেতর দিয়েই সিঁড়ি উঠেছে দোতলায় যাওয়ার। প্রতাপ মিশ্র সেই সিঁড়ির বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেঙ্গে রাহুল আর যে একটা ছোকরা ছেলে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল তাকে বলেন, “চট্ করে একবার কিচেনে গিয়ে খাবার সব ঠিক আছে কিনা দেখে আয়। প্রতাপ মিশ্র আর মণীশ আগরওয়াল নিরামিষ খাবেন। ওদের খাবারটা যেন আলাদা থাকে। আর ফ্রিজে বরফের ট্রে, জল সব ঠিক আছে কী না দেখে নিবি। হুইস্কির বোতল আমি বার করে রেখে এসেছি। গণপতকে বলে দিস মালিক ডাকলেই যেন ট্রলিতে সব সাজিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দেয়…”
ছেলেটা রান্নাঘরের দিকে দৌড়োল। আজকের জন্য এই ছেলেদুটোকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। অনেকবার ওপর নীচ করতে হবে। গণপতের বয়স হয়েছে। এখন আর পেরে ওঠে না। আবার একটা গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। রাহুল তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির সামনে দাঁড়াল আপ্যায়নের জন্য।
সুরযদেও সিং-এর পার্বতী ভিলায় আজ বিশেষ আয়োজন। বাছা বাছা কয়েকজন মেহমান আসবে। মহারাজপুরের এই পার্বতী ভিলা এমনিতে খালিই থাকে। এই এলাকাটা আসলে সুরযদেওদের জমিদারি ছিল। জমিদার তো এখন আর কেউ নেই। তবে জমি এখনও অনেক আছে। চাষ-আবাদ হয়। সাহেবগঞ্জে সূরযদেওয়ের পৈতৃক বাড়ি। সেখানে নিজের মা-বাবা আর চাচেরা ভাই-ভাতিজা সব থাকে। সূরযদেও নিজে থাকেন ধানবাদে কিংবা দুর্গাপুরে। এই দুটো জায়গাতেই আসলে ওঁর ব্যবসার কাজ চলে। ধানবাদের বাড়িতে বউ-ছেলে থাকে। রাজেন্দ্র মার্কেটের কাছে দু-খানা হোটেল আছে ওঁদের। ছেলে সেগুলো দেখাশোনা করে। দুর্গাপুরে বিশাল গাড়ির শো-রুম, কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কের জন্য এসএস প্রোমোটিং এসবই হল সূরযদেও-এর ব্যবসা। তবে এর আড়ালেও অনেক কিছু আছে। কয়লা থেকে মেয়ে পাচার অনেক কিছুর সঙ্গেই সুরযদেও জড়িত। ওই এলাকায় ওকে মাফিয়া সূরযদেও বলেই চেনে লোকে। পুলিশ পর্যন্ত ঘাঁটাতে সাহস পায় না।
মহারাজপুর জায়গাটা ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায়। তবে পশ্চিমবাংলার সীমানার খুব কাছেই। বীরভূমের রামপুরহাট শহর থেকে এখানে আসতে একঘণ্টাও লাগে না। এখন রাস্তাঘাট অনেক ভালো হয়ে গেছে, তাই দুর্গাপুর থেকেও গাড়ি নিয়ে ঘণ্টা পাঁচেকে পৌঁছে যাওয়া যায়। মহারাজপুর এমনিতে ছোটো গঞ্জ। প্রাকৃতিক দৃশ্য বেশ সুন্দর। চারিদিকে ছোটো ছোটো টিলা আর জঙ্গল। মোতিয়া নামের একটা সুন্দর ঝরণাও আছে। এরকমই একটা টিলার ওপরে পার্বতী ভিলা। প্রায় প্রাসাদের মতো দোতলা বাড়ি, উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। মার্বেল পাথরের মেঝে। দামি আসবাব আর ঝাড়বাতি দিয়ে সাজানো। বাড়ির সঙ্গে বাগানও আছে অনেকখানি। সেখানে নানারকম ফল-ফুলের গাছ। দু-জন মালি আর দু-জন কাজের লোক আছে এই বাড়ি দেখাশোনার জন্য। তারা বাড়ির লাগোয়া আউটহাউসে পরিবার নিয়ে থাকে। গেটে দারোয়ান ও আছে দু-জন। সুরযদেও সিং কিন্তু খুব বেশি এখানে আসেন না। দিওয়ালির সময় সাহেবগঞ্জের বাড়িতে এলে একবার ঘুরে যান। বরং বেশি আসে তাঁর ছেলে লগনদেও সিং। তার বন্ধু-বান্ধব বিশেষ করে মেয়েছেলে নিয়ে ফূর্তি করার জন্য এই নির্জন পার্বতী ভিলা বিশেষ পছন্দ।
কিন্তু এবার সূরযদেও নিজে হঠাৎ এখানে আসবেন বলায় রাহুল একটু অবাকই হয়েছিল। গত চার বছর ধরে সে এই কোম্পানিতে কাজ করছে। ব্যবসার প্রয়োজনে মিটিং সূরষদেওকে প্রায়ই করতে হয়। সাধারণত সেগুলো হয় ধানবাদে তাঁদের নিজস্ব হোটেলে। অনেকসময় দুর্গাপুরের বাড়িতেও বাইরে থেকে লোকজন আসে। সেইরকম ব্যবস্থাও বাড়িতে করা আছে। হুকুম হলে রাহুলের দায়িত্ব থাকে সবকিছু যাতে ঠিকঠাক চলে সেটা দেখা। কিন্তু এবার সবটাই যেন একটু অন্যরকম। পার্বতী ভিলায় যে মিটিংটা হবে সেটা সুরযদেও রাহুলকে বলেছেন মাত্র দু-দিন আগে। তাঁর হুকুম মাফিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে সেদিন বিকেলেই গাড়ি নিয়ে দুর্গাপুর থেকে এখানে চলে এসেছে রাহুল। সাধারণত এই ধরনের ব্যবস্থাপনায় রাহুলের সঙ্গে অফিসের আরও দু-তিনজন থাকে। কিন্তু এবার সুরযদেও রাহুলকে নিজের ঘরে ডেকে বলে দিয়েছিলেন, মিটিং-এর ব্যাপারে কাউকে একটি কথাও বলা চলবে না। যা করার তাকে একাই করতে হবে। কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। তাই এখানে এসে সবকিছু একলাই সামলেছে রাহুল। যদিও অসুবিধা খুব একটা হয়নি, কারণ অতিথি মাত্র ছয়জন। প্রতাপ মিশ্র ছাড়া আছেন সুরেশ ভট্ট, প্রদীপ ঠাকুর, মণীশ আগরওয়াল, বানওয়ারিলাল চৌবে আর মহেশ মহাস্তি। এঁদের সবাইকেই চেনে রাহল। সকলেই আসানসোল-দুর্গাপুর অঞ্চলের ব্যাবসাদার। ব্যবসার পাশাপাশি স্মাগলিং থেকে শুরু করে আরও নানারকম দু-নম্বরি কাজকর্মের সঙ্গেও যুক্ত। এসবই রাহুল জানে, তবে খুব একটা মাথা ঘামায় না। কারণ চাকরিটা তার দরকার। সুরযদেও সিং মাইনে খারাপ দেন না। আর নিজে যাই-ই করুন না কেন, এখনও পর্যন্ত রাজ্যকে কোনো বেআইনি কাজ করতে বলেননি।
সুরেশ ভট্ট আর মণীশ আগরওয়াল পরপর এলেন। তারপর প্রদীপ ঠাকুর। একই গাড়িতে বনওয়ারিলাল চৌবে আর মহেশ মহান্তি এলেন একটু দেরিতে। এদের মধ্যে বনওয়ারিই একটু হাসিখুশি মানুষ। রাঙ্গকে দেখে বললেন “হামাদের একটু লেট হয়ে গেল… রাস্তায় গাড়িটা পাংচার হয়ে গেছিল।”
“না না… বাকিরা সবাই এসে গেছেন, তার পেট হয়নি…. দোতলায় বসার ব্যবস্থা হয়েছে।”
রাহুলের কথায় ঘাড় নেড়ে মহান্তিকে বলেন চৌবে, “চলিয়ে মহান্তি সাহাব। আজ ও শরণকো শরণাগত বানানে কা প্ল্যান ফাইনাল হোনাহি চাহিয়ে…”
অতিথিরা সবাই চলে এলে দারোয়ানকে গেট বন্ধ করে দিতে বলে প্রথমেই কিচেনে যায় রাহুল। খোঁজ নেয় খাবার সব ঠিকঠাক তৈরি হয়েছে কী না এবং মালিকের হুকুমমতো প্লেট তাঁর ঘরে পৌঁছে গেছে কী না। একতলার মস্ত ডাইনিং রুমে অতিথিদের জন্য ডিনারের ব্যবস্থাও আছে। যদিও স্ন্যাকসও প্রচুর। তাই ডিনার শেষপর্যন্ত কেউ খাবেন কী না জানা নেই। কিন্তু শীতকাল। এমনিতেই এই এলাকায় বেশ ভালো ঠান্ডা পড়ে। তাই খাবার যাতে গরম থাকে সেই ব্যবস্থাও করা হয়েছে। গণপত কাজের লোক। সব গুছিয়ে রেখেছে। সুরযদেও বলে দিয়েছিলেন অতিথিরা সবাই এসে গেলে রাহুল নিজের ঘরে চলে যেতে পারে। পরে দরকার হলে তিনি ডেকে নেবেন। রাতে কেউ থাকবেন না, তাই আলাদা কোনো ব্যবস্থার দরকার নেই। কিন্তু রাহুল জানে প্রতিটি গাড়িতেই চালক আছে। তাদের খাওয়া এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করা দরকার। নাহলে ভোররাতে অতিথিদের ফিরতে অসুবিধা হবে। তাই সেসব ঠিকঠাক হয়েছে কী না দেখে নিয়ে সাড়ে দশটা নাগাদ সে নিজের ঘরে চলে যায়। মহারাজপুরে সাড়ে দশটা মানে প্রায় মধ্যরাত। রাস্তাঘাট শুনশান হয়ে গেছে অনেক আগেই। একটু পরে জঙ্গলের দিক থেকে শেয়ালের ডাকও শোনা যাবে। একতলারই একপাশে গেস্টরুম। সেখানে রাহুলের থাকার ব্যবস্থা। জামা-কাপড় বদলে, ফ্রেশ হয়ে নিজের মোবাইল থেকে একটা মেসেজ করে রাহুল। তারপর কম্বলের তলায় ঢুকে পড়ে।
***
