অবিনাশের ট্রান্সফার – রোহন রায়
(১)
পানওয়ালার পথনির্দেশিকা মেনে অবিনাশ জরাজীর্ণ একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ৩১/২। হ্যাঁ, এইটাই।
রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল অবিনাশ। মনটা বড়ো উচাটন হয়ে আছে। এই শেষ চেষ্টা। এরপর আর নয়। সোজা পথ, ঘুরপথ সবই তো বাজিয়ে দেখা হল। বদলির আবেদনের জন্য সরকারের তরফ থেকে ‘ঐক্যশ্রী’ নামে যে পোর্টাল খোলা হয়েছে, তাতে তো সেই কবে থেকেই আবেদন ঠুকে রেখেছে। একে-তাকে ধরেওছে বিস্তর। যত্রতত্র তেলের জ্যারিকেন খালি করতেও কসুর করেনি। এই করতে করতেই চারটে বছর ফুড়ুৎ হয়ে গেল। লাভের মধ্যে শুধু জুতোর সুকতলা ক্ষয়েছে আর পাতলা হয়েছে মাথার চুল। আর কাঁহাতক ভাল্লাগে।
অবিনাশের বাড়ি কলকাতার ভবানীপুর, আর যেখানে সে শিক্ষকতা করে সেই বিশ্বনাথ মুর্মু (গভ: স্পনসর্ড) উচ্চ বিদ্যালয়টি সুদূর পশ্চিম মেদিনীপুরে নয়াগ্রাম নামে একটা জায়গায়। ওড়িশা সীমান্তের কাছাকাছি। হাওড়া থেকে ট্রেন, তারপর বাস, সবশেষে টোটো— সব মিলিয়ে সেখানে পৌঁছতেই প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক সময় লাগে। বেচারি অবিনাশ নতুন চাকরির আনন্দ একটা সপ্তাহের জন্যও উপভোগ করতে পারেনি। বলতে গেলে প্রথম দিন থেকেই মিউচুয়াল ট্রান্সফারের চেষ্টা শুরু করেছে। কিন্তু লাভ হয়নি। ওই যমের দক্ষিণ দুয়ারে কে-ই বা পোস্টিং নিতে রাজি হবে। রোজ-রোজ যাতায়াতের প্রশ্নই আসে না। তাই স্কুলের কাছে একটা বাসা ভাড়া করতে হয়েছে। কলকাতা-নিবাসী আরও জনাতিনেক মাস্টারমশাই এই স্কুলে পড়ান। তাঁরাও এখানেই বাড়ি ভাড়া করে রয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁরা বউ-বাচ্চাওয়ালা সংসারী, ফলে একসঙ্গে মেস করে থাকা যায়নি। তাহলে খরচটা একটু কমত। সত্যি বলতে কী, আলাদা একটা এসটাব্লিশমেন্টের খরচও তো কম না। ঘর ভাড়া, খাওয়াদাওয়া, টুকিটাকি মিলিয়ে প্রতি মাসে একটা মোটা টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। খরচের চেয়েও বড়ো কথা হচ্ছে, অবিনাশ বড্ড হোমসিক। ভয়ানক ঘরকুণো। নিজের আদ্যিকালের নোনা ধরা বাড়ি, পলেস্তারা খসা ঘর, প্রপিতামহের আমলের লড়ঝড়ে খাট আর ঘটর ঘটর করে কলুর বলদের মতো ঘোরা বৃদ্ধ সিলিংপাখা ছাড়া তার ভাত হজম হবে না, এ অবিনাশ বুঝে নিয়েছে। কলকাতা ছাড়াও চলবে না তার। ধোঁয়া আর যানজটে নাভিশ্বাস উঠে যাওয়া এই শহরটাকে সে চোখে হারায়। ফলে বাড়ির যথাসম্ভব কাছাকাছি কোথাও একটা পোস্টিং পাবার জন্য চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। নানাবিধ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চেষ্টার পাশাপাশি একদা নাস্তিক অবিনাশ মাদুলি, কবচ-তাবিজও ধারণ করে ফেলেছে। কিন্তু কোনো দেবতাই সাড়াশব্দ করেন শেষতম ভরসা এই মেঘলাবাবা। হ্যাঁ, এই শেষ। ট্রান্সফারের জন্য আর কোথাও যাবে না অবিনাশ। কারও হাতে-পায়ে ধরবে না। কোথাও তেল ঢালবে না।
আজ হাওড়ার ওলাবিবিতলায় সেই মেঘলাবাবার কাছেই আসা। ইনি নাকি লোকনাথবাবার সাক্ষাৎ অনুচরের সাক্ষাৎ অনুচর। একটু ইয়ে-ইয়েই লাগছে। বিজ্ঞানের মাস্টার হয়ে শেষে কী না বাবা-টাবার কাছে যেতে হচ্ছে। অবশ্য তাবিজ-কবচ হয়ে গেছে যখন, বাবাই বা বাদ থাকেন কেন! মাঝসমুদ্রে ঝড়ের মুখে পড়লে কে-ই বা নাস্তিক থাকতে পারে!
মেঘলাবাবার খোঁজ দিয়েছিলেন স্কুলের টাইপিস্ট শিবনাথ মাইতি। এরকম নাম কেন, জিগ্যেস করায় কপালে হাত ঠেকিয়ে শিবনাথবাবু বলেছিলেন, “আকাশে মেঘ করলে বাবার অলৌকিক শক্তি আসে। আষাঢ় মাস তো পড়েই গেল। গিয়ে পায়ে পড়ে যান। মনস্কামনা পূর্ণ হবেই।” শুনেই অবিনাশের মনে পড়ে গেছিল ঋত্বিক রোশন-অভিনীত জনপ্রিয় বলিউড ছবির সেই মিষ্টি গোবেচারা ভিনগ্রহীটির কথা। প্রাণীটা রোদ্দুর থেকে শক্তি সংগ্রহ করত, আর মাঝে মাঝে খুশিলাল গয়লার পেল্লায় মোষটার মতো মন্দ্র গলায় ‘ধূপ’ (মানে হিন্দিতে রোদ্দুর) বলে উঠত। শিবনাথবাবুকে অবশ্য সে কথা বলা যায় না। ভক্ত মানুষ। মজাটা নিতে পারবেন না।
এগারোটা বাজতে এখনও মিনিট পঁচিশ বাকি। তবু গিয়ে অপেক্ষা করাই ভালো। লাইন-টাইন পড়ে গেলে আবার মুশকিল। শিবনাথবাবু বলেছিলেন, বাবার খুব ডিমান্ড। ‘দুগগা’ বলে ঢুকেই পড়ল অবিনাশ। প্রায়ান্ধকার চাতালে পেরিয়েই সিঁড়ি। তার একপাশে ডাঁই করা ভাঙাচোরা জিনিসপত্র, অন্যপাশে চেয়ার-টেবিলে বসে মোবাইলে খুটখুট করছে স্যান্ডো গেঞ্জি পরা তেলচুকচুকে চেহারার একটা লোক। বয়েস চল্লিশের বেশি হবে না। চুলটা সামনে চড়াই হয়ে মোরগঝুটির আকার নিয়েছে। অবিনাশকে দেখে মন্তব্য করল, “তাড়াতাড়ি চলে এসছেন। একটু বসতে হবে। বাবা চার্জ হচ্ছেন।”
শুনে অবিনাশের একগাল মাছি, “চার্জ হচ্ছেন? মানে?”
“পঞ্চভূতে চার্জ হচ্ছেন। মেঘ করেছে দেখছেন না? ওই বেঞ্চিটায় বসুন।” চাতালের কোণে একটা বেঞ্চের দিকে নির্দেশ করল মোরগঝুঁটি।
অবিনাশ কিছুই বুঝল না। এখনকার সাধুবাবারা সব একেকজন শোম্যান। ভেল্কি না-দেখালে ভক্ত জুটবে না। বেঞ্চে গিয়ে বসে অবিনাশ পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুকে রিল দেখতে শুরু করল। দিব্যি সময় কেটে যায়।
দেখতে দেখতে আরও জনাকয়েক সাক্ষাৎপ্রার্থী এসে জুটল। নানা কিছু নিয়ে আলোচনা শুরু হল। বেশিরভাগই মেঘলাবাবার অলৌকিক কেরামতির কথা। বাবার প্রসাদি বিরিয়ানি খেয়ে কার লিভার সিরোসিস পুরো সেরে গেছিল, কার সেজোকাকা একবার দীঘার সমুদ্রে ভেসে গিয়ে বাবার কৃপায় পাড়ার পুকুর থেকে জ্যান্ত উঠে এসেছিলেন-ইত্যাদি ইত্যাদি, চোখ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে থাকলেও অবিনাশের কান এদিকেই ছিল। শুনতে শুনতে বেদম হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু হাসলে সেটা এখন নিজের ওপরেও হাসা হবে। অবিনাশ নিজেও এখন এই একই ঝাঁকের কই। ভাবলেই মনটা কেমন চটচট করে উঠছে।
মিনিটখানেক পর মোরগঝুঁটি গলাখাকরানি দিল, “প্রথম কে আছেন চলে আসুন।”
অবিনাশই প্রথম। দুরুদুরু বুকে উঠে দাঁড়াল সে।
মোরগঝুঁটি বলল, “সিঁড়ি দিয়ে ওপরে গিয়ে ডানদিকের প্রথম ঘর।”
ইট খিঁচিয়ে থাকা সিঁড়ি দিয়ে উঠে অবিনাশ দেখল, দোতলাটা একতলার তুলনায় কিঞ্চিৎ ভদ্রস্থ। দু-দিকে পরপর তিনটে করে ঘর। মোরগঝুঁটির নির্দেশমতো অবিনাশ ডানদিকের প্রথম ঘরের দিকে পা বাড়াল।
জানলা বন্ধ করে পরদা টেনে ঘরটাকে যথাসম্ভব অন্ধকার করে রাখা হয়েছে। নিভু নিভু সবুজ আলো জ্বলছে। ধূপের ধোঁয়া কুণ্ডলি পাকিয়ে একটা দিব্য পরিবেশ তৈরি করেছে। ঘরে কোনো আসবাব নেই। মেঝেয় আসন বিছিয়ে বসে আছে দুটি মূর্তি। দু-জনেরই পরনে ফতুয়া আর ধুতি। বিরাট দাড়িওয়ালা মাঝবয়েসী ভদ্রলোকই নিশ্চয়ই মেঘলাবাবা। দাড়িটুকু বাদ দিলে ভদ্রলোকের চেহারার বাকি সবই গড়পড়তা। আড়েদিঘে মাঝারিরও নীচে মনে হল। অন্যজনের বেশ মুশকো চেহারা। গোঁফদাড়ি কামানো। থুতনিতে এক দাগ ছাগলদাড়ি। সারা ঘর কীসের একটা গন্ধে ম-ম করছে। ধুপের গন্ধ এরকম প্রাণঘাতী? অবিনাশ দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ছাগলদাড়ি ডাকল, “আসুন।”
অবিনাশ মেঘলাবাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ছাগলদাড়ি বলল, “বসুন। কপালটা বাবাকে দেখান।”
সামনে থেকে বাবাকে ভালো করে দেখল অবিনাশ। ঢুলু ঢুলু চোখ। ভুরুর ওপর একটা মস্ত কাটা দাগ। শিবনাথ মাইতির কথায়, ইনি লোকনাথবাবার সাক্ষাৎ অনুচরের সাক্ষাৎ অনুচর। কিন্তু দেখে আলাদা করে ভক্তি হবার মতো কিছু নেই। ঠোঁটের পাশে শুকিয়ে আছে লাল কষ। গুটখা। ভদ্রলোক খর নজরে অবিনাশকে মাপছেন। অবিনাশ একটু সাবধান হল। এদের অবজারভেশন সাংঘাতিক। ভেতরের অবিশ্বাস কোথাও মুখের রেখায় তাচ্ছিল্যের বেশে প্রকট হয়ে নেই তো? বোকাটে হাসার চেষ্টা করল অবিনাশ।
মেঘলাবাবা বললেন, “কপালটা আর একটু কাছে আনুন।”
ভারী চমৎকার গমগমে গলা। চেহারার সঙ্গে কণ্ঠস্বরটি বেমামান। অবিনাশ উবু হয়ে কপাল এগিয়ে দিল।
দেখে ভুরু কুঁচকে গেল মেঘলাবাবার। আক্ষেপের সুরে বললেন, “আপনার শনি দেখছি বক্রি। যা-ই হোক, সমস্যাটা কী?”
সেই একই টেমপ্লেট-মার্কা কথাবার্তা। ছকে ফেলা চালিয়াতি। কথার খেলায় লোকের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার ধান্দা। অবিনাশ বিরক্তি চেপে গলায় ভক্তিরস ঢালার চেষ্টা করল, “অনেক দূরে পোস্টিং, বাবা। বাড়ির কাছে ট্রান্সফার নেবার চেষ্টা করছি। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।” মেঘলাবাবা অবিনাশকে লক্ষ করছিলেন, “নাম কী?”
“অবিনাশ সরখেল।”
“বাড়ি কোথায়?”
“ভবানীপুর।”
“কে কে আছে বাড়িতে?
“কেউ নেই বাবা। আমি একা।”
“তাহলে তো ঝাড়া হাত-পা। দুরে চাকরি করতে অসুবিধা কীসে? কত লোক তো পিছুটান থাকা সত্ত্বেও কত দূরে দূরে চাকরি করতে যাচ্ছে।”
অবিনাশ হাত জোড় করে আকুল স্বরে বলল, “আমি দূরে যেতে চাই না বাবা। বাইরে থাকতে ভালো লাগে না। এতটা যাতায়াতও করতে পারছি না। শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিছু একটা উপায় করুন।”
“চাকরির জায়গাটা কতদূর?”
“পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়াগ্রাম। বাড়ি থেকে দুশো কিলোমিটার দূরে বাবা। যেতে পাঁচ ঘণ্টা লাগে।”
গম্ভীর গলায় ‘হুমম’ বলে মেঘলাবাবা চোখ বুজলেন। ডান হাত সোজা করে কর গুনলেন কয়েক ঘর। তারপর কয়েক সেকেন্ড পর যখন চোখ খুললেন তখন তাঁর ঠোঁটে মৃদু হাসি, “হয়েছে।”
“কী হয়েছে?”
“উপায় পেয়েছি একটা।”
অবিনাশের অবিশ্বাসী মনে ধুক করে একটা ছোট্ট আশার প্রদীপ জ্বলে উঠল, “ট্রান্সফার হবে বাবা?”
“শান্ত হ, শান্ত হ বেটা,” মিটিমিটি হাসলেন মেঘলাবাবা, লোকনাথবাবার ইচ্ছে হলে সব হবে। বাড়িতে লোকনাথবাবার ছবি আছে?”
অবিনাশ একটু থতমত খেয়ে বলল, “লোকনাথবাবার ছবি! না তো!”
“লাগিয়ে নে। বড়ো ছবি লাগাবি।”
“কত বড়ো ছবি বাবা?”
“অন্তত দশ বাই বারো,” মেঘলাবাবার হাসি চওড়া হল, “লোকনাথবাবাই পথ দেখাবেন। নিশ্চিত্তে বাড়ি চলে যা। তোর সব দুশ্চিন্তা বাবার পায়ে সঁপে দে।”
বলাই বাহুল্য, অবিনাশ বিশেষ নিশ্চিন্ত হতে পারল না। মনের খচখচানিটা বরং বহুগুণ বেড়ে গেল। একটা তাবিজ পেলেও হয়তো সামান্য আশা জাগত। এতদূর উজিয়ে এসে খানিক ভুংভাং ডায়লগবাজি শোনা ছাড়া আর কিছু লাভের লাভ হল না। মাঝখান থেকে বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়ে জাত খোয়ানোর মতোই একটা কাজ হল। পইপই করে বারণ করা সত্ত্বেও শিবনাথ মাইতি কী কথাটা চেপে রাখতে পারবেন? তাছাড়া জানাজানি হওয়া তো পরের কথা, নিজেরই কেমন একটা লজ্জা লজ্জা করছে। এইসব বুজরুকির মধ্যে সে-ও শেষমেশ মাথা গলাল, ভাবতে খুব একটা ভালো লাগছে না। আবার কথাটা উড়িয়ে দিতেও মন চাইছে না। যাক গে, প্যাকেট ভালো করে মুড়ে একটা ছবি নিয়ে গেলে কী আর এমন ক্ষতিবৃদ্ধি হবে। একটা চেষ্টা শুরু হয়েছে যখন, শেষ করেই দেখা যাক না। এটাই তো শেষ চেষ্টা। শিবনাথ বলেছিল, মেঘলাবাবার সাকসেস রেট হান্ড্রেড পারসেন্ট। দেখাই যাক।
ঘর থেকে বেরোতেই ট্রাফিক পুলিশের মতো হাত তুলল সেই মোরগঝুঁটি ভক্ত, “দাদা, প্রণামিটা দিয়ে যান।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ,” পকেটে হাত গুঁজল অবিনাশ, “কত?”
ভক্ত দুটো হাত তুলে দশ আঙুল দেখাল।
অবিনাশের বুকে একটা ইল মাছ ঘাই মেরে গেল। হাজার! পকেট থেকে ছিটকে বুকের কাছে উঠে এল হাত। প্রায় কঁকিয়ে উঠে অবিনাশ বলল, “হাজার?”
মোরগঝুঁটি টেরিয়ে তাকাল, “জীবন বদলে যাচ্ছে, তার জন্য হাজার টাকা বেশি লাগছে আপনার?”
অবিনাশের মেজাজটা চটকে গেল। মাসের শেষে হিসেবের বাইরে বেমক্কা খরচা সামলানোর অওকাদ তার নেই। রোববারের খাসিটা বাদ দিতে হবে। একটা ইংরিজি থ্রিলার নভেল কেনার কথা ভাবছিল, সেটাও এ-মাসে হবে না। তেতো গলায় অবিনাশ বলল, “কিন্তু এত টাকা হলে সাধারণ গরীব-দুঃখী মানুষ বাবার কাছে আসবেন কী করে? সেটাও তো ভাবতে হবে।”
দেখা গেল, ভক্ত হলেও লোকটা একেবারে অবিবেচক নয়। কথাটা শুনে চটল না, বা ঝগড়াও করল না। অনুভবী গলায় বলল, “কী করব বলুন, বাবা তো আর সারাবছর কল্পতরু হন না। শুধু এই বর্ষাকালটা। খরচাপাতি তো কিছু তুলতে হবে। বাকি বছরটা নইলে চলবে কী করে বলুন।”
খুবই সঙ্গত যুক্তি। মুনিঋষি হলেও পুঁজির শাসনের বাইরে তো যেতে পারবেন না। তে হি নো দিবসা গতাঃ। তবে হাজার টাকার শোকে বুকটা বেজায় টনটন করছে। অবিনাশ ম্রিয়মান গলায় বলল, “একটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করছে, কিছু যদি মনে না করেন। বর্ষাকাল বাদে বাকি সময়টা বাবা কী করেন?”
“হিমালয়ে চলে যান,” মোরগঝুটি জবাব দিল, “বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ধ্যান করেন।”
হিমালয়ে না গিয়ে চেরাপুঞ্জি বা মৌসিনরামে গেলে ভালো করতেন না? ওখানে তো সারাক্ষণই মেঘ-টেঘ করে থাকে। মাথায় এলেও প্রশ্নটা করে উঠতে পারল না অবিনাশ। ভক্তদের সঙ্গে এইসব রসিকতা করা নিরাপদ নয়। এদের ভাবাবেগ আহত হবার জন্য সবসময় সেজেগুজে রেডি হয়ে বসে থাকে। ওয়ান পিসে ফেরাই কঠিন হবে হয়তো। দরকার কী। অবিনাশ ব্যাজার মুখে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজল।
ভক্ত কিউআর কোডওয়ালা একটা স্ট্যান্ড এগিয়ে দিল, “ইউপিআই-ও চলবে।”
*****
(২)
লোকনাথবাবা এলেন। কলাটা মুলোটা গ্রহণ করলেন। মাস ঘুরে গেল। কিন্তু সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ তাঁর দেখা গেল না। তিনি কেবলই ছবি। অবিনাশ আশা ছেড়ে দিয়েছে। হাজারটা টাকা জলেই গেল। ও নিয়ে ভেবে আর কাজ নেই। অবিনাশ মন শক্ত করে ফেলেছে। বাকি জীবনটা এই নয়াগ্রামেই পচতে হবে। যাক গে, কত মানুষই তো কত কষ্ট করে দুরদুরান্তে চাকরিবাকরি করছে। কত যোগ্য লোক এই স্কুলটিচারির চাকরির জন্য হেদিয়ে মরছে, পাচ্ছে না। বহু মানুষের বহু আকাঙ্ক্ষিত মহার্ঘ্য্য এই বস্তুটি অবিনাশ পেয়েছে। সে যত দূরেই পোস্টিং হোক। এই চাকরিটুকুই তো বাংলার বহু যুবক-যুবতীর স্বপ্ন। এইসব ভেবেটেবে অবিনাশ নিজেকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে। তবু যেদিন ভবানীপুরের বাড়িতে থাকে, সকালে ঘুম থেকে উঠে লোকনাথবাবার ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অভ্যেসবশে একটু বিড়বিড় করে। আজও দাঁড়াল। বড্ড ধুলো জমেছে ছবিটায়। আনার পর ঝাড়পোঁছ হয়নি একদিনও। একটু মোছা দরকার।
একটা ন্যাকড়া নিয়ে এসে ছবিটা টেনে সরাতেই ভয়ানক চমকে উঠল অবিনাশ। ছবির পেছনে একটা বিশাল ফোকর। এ আবার কী! বাড়ির মধ্যে এত বড়ো ফোকর। ছবি নামিয়ে রেখে ভালো করে উকিঝুঁকি মারল অবিনাশ। না। এ তো বেশ গভীর ফাটল মনে হচ্ছে। পুরোনো বাড়ি। এখনকার ফ্ল্যাটবাড়ির মতো লিকলিকে জিরো ফিগার দেওয়াল না। বেশ মোটা। তাতে এমন বিরাট গর্ত হল কী করে? অবিনাশ মোবাইলের টর্চ অন করে ভেতরে আলো ফেলল। ফোনেই একগাল মাছি।
ফোকর না, এ তো মনে হচ্ছে পুরোদস্তুর একটা সুরঙ্গ! নীচু ছাদ, মেঝেয় বিছিয়ে আছে শুকনো খড়। সামনেটা অন্ধকার ঘুরঘুটি।
অবিনাশ খানিকক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাড়িতে এত বড়ো একটা সুরঙ্গ আছে সেটা তো কেউ বলেনি। ওদিকে তো বাথরুম। মাঝখানে এতটা স্কোয়ার ফিটের হিসেব যাচ্ছে কোথায়? এ তো অবাক কাণ্ড! অবিনাশ চটপট শোবার ঘরে গিয়ে তিন ব্যাটারির বড়ো টর্চটা নিয়ে এল। তারপর ফোকরের ভেতরে আলো ফেলে ভালো করে দেখল। নীচু ছাদের একটা সুরঙ্গ। ডানদিকে ঘুরে বাথরুমের সমান্তরালে এগিয়েছে মনে হচ্ছে। অবিনাশ একটু ভাবল। গর্তটা যে মাপের, তাতে প্রমাণ সাইজের একজন মানুষের পক্ষে ঢুকে পড়া কঠিন হবে না। ঢুকেই দেখা যাক না। এক ছুটে অবিনাশ পুরী থেকে কেনা লম্বা লাঠিটা নিয়ে এল। তারপর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে ঢুকে পড়ল গর্তের ভেতর। ছাদটা বেশ নীচু। মাথা নীচু করে চলতে হবে। অবিনাশ গুঁড়ি মেরে পা টিপে টিপে এগোল। গলিটা একটু পরে আরও একবার ডানদিকে ঘুরে খানিকটা এগিয়ে আরও সরু হয়ে এল। ছাদ এখানে আরও নীচু। অবশ্য তাতেও একটা মানুষের পক্ষে অনায়াসে যাওয়া সম্ভব। অবিনাশ টর্চ তাক করল সামনের দিকে। ত্রিভুজাকার আলো কিছুদূর গিয়ে অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। আর এগোনো কী ঠিক হবে? ঢোঁক গিলল অবিনাশ। বুক দুরদুর করছে। না-এগোনোই হয়তো বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু নিজেকে আটকেও রাখা যাচ্ছে না। টর্চের আলোর ওইপাশের অন্ধকারটা নিশির মতো ডাকছে। হাত-পা কীরকম খলবলাচ্ছে। প্রচণ্ড একটা মহাজাগতিক টান যেন সমস্ত ইন্দ্রিয় ধরে হ্যাঁচকা টান মারছে। ছোটোবেলায় পড়া একটা গল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘পাগলা সাহেবের কবর’। সেখানে ‘কুসুমকুঞ্জ’ নামে একটা বাড়িতে একটা ছবির পেছনে এরকমই একটা সুড়ঙ্গপথ ছিল। সুড়ঙ্গটা কুসুমকুঞ্জকে যুক্ত করেছিল পাশের ‘গ্রিন ভ্যালি’ নামে আর একটা বাড়ির সঙ্গে। আর এই দুই অট্টালিকার মাঝামাঝি কোথাও-অনির্দেশ্য রহস্যময় এক জায়গায় ছিল বহুকাল আগে মরে যাওয়া এক সাহেবের কবর। মনে পড়তেই গা শিরশিরিয়ে উঠল অবিনাশের। পাশে গোবিন্দবাবুর বাড়িতে গিয়ে পড়লে ক্ষতি নেই, কিন্তু কবর বা সমাধি হলে তো কেলো। ভূতফুতে অবিনাশ সেভাবে বিশ্বাস করে না বটে, কিন্তু খুব জোর দিয়ে অবিশ্বাসও করে উঠতে পারে না ঠিক। বিশেষত, দেওয়ালের ছবির পেছন থেকে হঠাৎ আবিষ্কার হওয়া এইরকম অন্ধকার, অচেনা একটা সুরঙ্গে দাঁড়িয়ে ভূতে অবিশ্বাস করা যে-কারও পক্ষেই বোধহয় অসম্ভব। কিন্তু এহেন রহস্যের খাসমহলের দরজা থেকে কী ফেরত যাওয়া চলে? উত্তেজনা যে গলা অবধি উঠে আসছে। তাছাড়া সুড়ঙ্গ যখন, গুপ্তধন-টনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিংবা, সব ছেড়ে দিলেও, স্রেফ সুড়ঙ্গটা কোথায় পৌঁছচ্ছে সেটা জানার ইচ্ছেটাই অদম্য হয়ে উঠছে। কৌতূহলই জিতে গেল শেষমেশ। খুব সতর্ক হয়ে, লাঠিটা দিয়ে দেওয়ালে ঠকঠক করতে করতে এগোল অবিনাশ। আর কিছু না হোক, সাপখোপের মতো লৌকিক বিপদ থাকা তো খুবই স্বাভাবিক। শুঁড়িপথটা কখনও সরু হচ্ছে, কখনও চওড়া। তবে ছাদটা শুরুর দিকে যতটা নীচু ছিল, এখন আর ততটা নয়। মাথা নীচু করে চলতে হচ্ছে না আর। দেওয়াল, আশ্চর্য ব্যাপার, মাঝে মাঝে এবড়োখেবড়ো হলেও বেশিরভাগ জায়গাতেই মসৃণ। জমি কয়েক পা গিয়ে খানিক নীচের দিকে ঢালু হচ্ছে, আবার সমতল হয়ে আসছে। অবিনাশ খুব সাবধানে, দেখেশুনে পা ফেলছিল। সোঁদা গন্ধটা বেড়ে উঠছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে শোঁ শোঁ করে একটা মৃদু শব্দ। খুব জোরে হাওয়া দিলে যেমন হয়। কিন্তু হাওয়ার তো হ-ও নেই এখানে। তাহলে আওয়াজটা কীসের? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। গুহা দৈর্ঘ্যের দিকে প্রসারিত হচ্ছে ক্রমশ। এখন আর ছাদ দেখা যাচ্ছে না। পথটা অনেকক্ষণ সোজা চলার পর এবার ডানদিকে বেঁকল। খানিকটা গিয়ে আবার ডানদিকে বাঁক। এই বাঁকটা নেবার পড়েই ঘটনাটা ঘটল। টর্চ তাক করে ছাদ আর দু-দিকের দেওয়াল দেখতে দেখতে পায়ের দিকে তাকানো হয়নি কিছুক্ষণ। আচমকাই পায়ের তলার মাটি ফুরিয়ে গেল। রাস্তাটা হঠাৎ ঝাঁপ মেরেছে নীচের দিকে। শরীরটা সে নীচের দিকে পড়ছে সেটা আবিষ্কার করতেই অবিনাশের কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। হাত-পা ছুড়ে হাওয়ায় কিছু একটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল সে। তারপরেই ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম হল এবং তার গলা চিরে একটা প্রচণ্ড আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এল। পতনটা শীঘ্রপতন না হয়ে যদি বেশ দীর্ঘপতন হয়, আতঙ্কিত হবার অবকাশ মেলে। কিন্তু ঘটনার আকস্মিকতায় অবিনাশ এতটাই হতবুদ্ধি হয়ে গেছিল, যতটা আতঙ্কিত হওয়া উচিত ছিল ততটা হতে পারল না। হাতের টর্চটা খসে গেছে আগেই। অবিনাশ দেখল, অনেকটা নীচে আলো ছড়াতে ছড়াতে সে-ব্যাটা হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের গর্ভে। তবে অবাক কাণ্ড, এই মুহূর্তে চারপাশে আলোর অভাব নেই। সুড়ঙ্গের দেওয়ালে নাকি শূন্যেরই গায়ে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, টুনি বালবের মতো কীসব জ্বলছে-নিভছে। ধূমকেতুর মতো কী যেন একটা হুশ করে নীচ থেকে ওপরের দিকে চলে গেল। তখনই বিমূঢ় ভাবটা এক ঝটকায় ছিঁড়ে আতঙ্ক গলা টিপতে শুরু করছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই অবিনাশ ঝুপুস করে ল্যান্ড করল।
আশ্চর্য! তেমন লাগল না তো! অবিনাশ শুয়ে শুয়ে ভগ্নহৃদয়ে ভাবল, পড়তে পড়তেই নিশ্চয়ই সে মরে গেছে। মরে গেলে ব্যথা-বেদনার অনুভূতি আসবে কোত্থেকে? সূক্ষ্ম শরীর বলেই নিশ্চয়ই এত ওপর থেকে পড়েও একটুও লাগল না। পরনের গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে ন্যাতা হয়ে গেছে, সে-ও নিশ্চয়ই মনের ভুল। মরে গেলে নিজে থেকে কিছু করার নেই, এই ভেবে অবিনাশ উঠল না। শুয়েই রইল। এমনিতে খুব যে ঝেপে দুঃখ আসছে তা নয়। মরলে দুঃখ করার মতো তো সাতকুলে কেউ নেই তার। শুধু আরসালানের বিরিয়ানির জন্য মনটা হালকা চিনচিন করতে লাগল। আলো জ্বলা টর্চটা পাশেই এসে পড়েছিল। তার আলোয় কিছুটা দূর দেখা যাচ্ছে। অবিনাশ তেমন গা করল না। কিছুই ভালো লাগছে না। এইভাবে বিজনে, গোপনে মরে যাওয়ার কোনো মানে হয়। কেউ তো লাশটাও খুঁজে পাবে না। হয়তো পুলিশ কেস হবে, দু-দিন একটু খোঁজাখুঁজি হবে। তারপর অচিরেই অবিনাশ সরখেল ‘নিখোঁজ’ বলে চিহ্নিত হবে। ব্যাস। কেস ক্লোজড। ভেবে নিজের জন্য একটু খারাপই লাগছিল। অবশ্য এটা সত্যিকারের খারাপ লাগা কী না কে জানে। মরার পর কী এইসব মন খারাপ টারাপ লাগতে পারে? নাহ। এ-ও মনের ভুল ছাড়া কী? আত্মাটা বোধহয় শরীর ছেড়ে বেশি দূর যেতে পারেনি। সেইজন্যেই এইসব গোলমাল।
কতক্ষণ এভাবে শুয়ে ছিল কে জানে, হঠাৎ ঘাড়ের কাছে একটা সুড়সুড়ি খেয়ে অবিনাশ চমকে উঠল। আরে। সূক্ষ শরীরে সুড়সুড়ি কে দেয়? ধড়মড়িয়ে উঠে বসল সে। টর্চের আলোয় যতদূর দেখা যাচ্ছে, শুধু খড় আর খড়। টর্চ তুলে নিয়ে চারপাশে আলো ফেলে অবিনাশ দেখল, সে বিরাট একটা খড়ের গাদার ওপর বসে আছে।
তার মানে কী সে বেঁচে আছে?
হাতে কষে একটা চিমটি কাটল অবিনাশ। উঃ। জ্বলে গেল। তার মানে… তার মানে তো সে মরেনি।
প্রথমেই প্রচণ্ড আনন্দ হল। নিজেকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল। এ তো মিরাকল। কোত্থেকে কী হল, এখনও কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কিন্তু অবিনাশ বেঁচে আছে। কোনো সন্দেহ নেই তাতে। বেঁচে থাকার চেয়ে বড়ো কথা কিছু হয় না। হতে পারে না। কার প্রতি অবিনাশ বলতে পারবে না, কিন্তু অপরিসীম কৃতজ্ঞতায় চোখে জল চলে এল তার। বেঁচে থাকা এত আনন্দের বুঝি? এত ভয়ানক সুখের?
আনন্দটা একটু সয়ে এলে অবিনাশের অনুসন্ধিৎসা জেগে উঠল আবার। কোথায় এসে পড়ল সেটা দেখতে হবে তো! জায়গাটা অনেকটা বড়ো কোনো গুহার মতো। দেওয়াল চোখে পড়ছে না। যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু খড় আর খড়। ওপরদিকে আলো তাক করলে ছাদও দেখা যাচ্ছে না। অবিনাশ টর্চ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। খড়ের গাদার ওপর হাঁটা একটু মুশকিল। পা দেবে যায়। টলমল পায়ে ব্যালেন্স করতে করতে অবিনাশ এগোল। তার মনে এখন উদ্দীপনা টগবগ করছে। কী ঘটছে কেন ঘটছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু এত অলৌকিক ঘটনাপ্রবাহের পরেও যখন কোনো বিপদ হয়নি, তার মানে আশা করা যায় বাকিটাও ভালোই হবে।
কয়েক পা এগিয়ে অবিনাশ দেখল, একটা জায়গায় বাইরে থেকে খুব সামান্য আলোর আভাস যেন। আলোটা ফুটে আছে ভারি অদ্ভুতভাবে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের গায়ে ছোটো চৌকোণা একটা ফ্রেম। তার মানে কি ওইখান দিয়ে পৌঁছোনো যাবে কোথাও? দ্রুত পায়ে এগোল অবিনাশ।
আরে। এটাও একটা ছবি নাকি? হ্যাঁ। তাই তো মনে হচ্ছে। কাঠের পাটাটা ডানপাশে ঠেলতেই সরে গেল সেটা। মুখ বাড়িয়ে অবিনাশের এক গাল মাছি। দিনের বেলা হলেও ঘরটার জানলা দরজা সব বন্ধ আর পর্দা টানা বলে বেশ অন্ধকার হয়ে আছে। কিন্তু তাতে কী এ জায়গা তার চিনতে ভুল হবে? এ যে রঘুনাথ মুর্মু স্কুলের স্টাফরুম!
রবিবার, তাই স্টাফরুম ফাঁকা। আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর থেকে জায়গাটা গমগম করতে শুরু করবে।
ছবির পেছন থেকে মুখ বাড়ানো অবস্থায় ওভাবেই মিনিটখানেক বসে রইল অবিনাশ। এই মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটাই বোধহয় সবচেয়ে সমীচীন। কিন্তু মাথাটা এত ঘেঁটে গেছে যে মিনিটখানেক চেষ্টা করেও ঠিকঠাক অজ্ঞান হতে পারল না অবিনাশ। চুলে হাত ডুবিয়ে খামচে ধরে খানিকক্ষণ বসে রইল সেখানেই। ভবানীপুর থেকে নয়াগ্রাম, পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা পাঁচ মিনিটে! এ কী অশৈলী কাণ্ড রে বাবা!
একটু ধাতস্থ হয়ে ছবিটা আর একটু সরিয়ে কোনোমতে লাফ দিয়ে নীচে নামল অবিনাশ। এই ফোকরটা বাড়ির-টার তুলনায় একটু ছোটো। গলতে একটু কষ্টই হল। নেমে এসে অবিনাশ ছবিটার দিকে তাকাল। জওহরলাল নেহরু। স্কুলের স্টাফরুমের দক্ষিণ দেওয়ালে পরপর পনেরোজন মহান ব্যক্তিত্বের ছবি। নেহরুর ছবির পেছনে এত বড়ো ফোকর। বোঝো কাণ্ড! বাড়িতে লোকনাথবাবা, এখানে নেহরু। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে অবিনাশ ঘটনার তল পাবার চেষ্টা করছিল, এমন সময় দরজার বাইরে থেকে বাজখাঁই গলায় কে যেন বলে উঠল, “কে রে! ভেতরে কে?” হাঁকটা শুনেই বুক কেঁপে উঠল অবিনাশের। এ যে সিকিউরিটি মোহান্তির গলা। দুপদাপ শব্দ হচ্ছে। দৌড়ে আসছে মোহান্তি। দেখতে পেলে চিত্তির। প্রথমেই হতবুদ্ধি হয়ে বাথরুমের দিকে দৌড় মারছিল অবিনাশ। তারপর মনে হল, আরে! নেহরুর পেছনে ঢুকে পড়লেই তো হয়। তাই করল অবিনাশ। চেয়ার টেনে এনে নেহরুজীকে ডান পাশে সরিয়ে টুক করে ফোকরে ঢুকল, তারপর ছবি টেনে গর্ত ঢেকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ওপাশে ক্যাঁচকোঁচ শব্দে দরজার অ্যালড্রপ খোলার শব্দ। তারপরেই মোহান্তি আর অশিক্ষক কর্মী নরেনের গলা শোনা গেল।
“বন্ধ ঘরে কে ঢুকবে?”
“আরে স্পষ্ট শুনলাম চপ্পলের আওয়াজ!”
“দাঁড়া বাথরুমটা দেখে নিই।”
বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হল।
“ধুর, কোথায় কী! কান দ্যাখা!”
কথা বলতে বলতে মোহান্তি আর নরেন বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করার শব্দ পেয়ে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল অবিনাশের। বুকে এতক্ষণ দমাদ্দম হাতুড়ি পিটছিল। ওরা দেখে ফেললে কী কাণ্ডটাই না হত! উফফ!
ফোকর থেকে নেমে এসে একটা চেয়ার টেনে বসল অবিনাশ। এতলতেল ভাবল খানিকক্ষণ। কী যে হচ্ছে কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে অবশ্য তার চেয়েও বড়ো চিন্তা, বাড়ি ফিরবে কী করে? এখানকার ভাড়া বাড়িটা মাত্র পাঁচ মিনিট দূরত্বে। কিন্তু বেরিয়ে যে টুক করে সেঁধিয়ে যাবে, তারও তো উপায় নেই। স্টাফরুমের দরজায় তালা। বের হতে গেলে মোহান্তিকে ডাকতেই হবে। কিন্তু বারমুডা আর টি-শার্ট পরে কী ওদের মুখোমুখি হওয়া যায়? নাহ। বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হবে। কোনো সদুত্তরও দেওয়া সম্ভব না। তবে কী কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই? কিন্তু তা-ও বা কী করে সম্ভব?
হঠাৎ একটা কথা মাথায় আসতেই চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল অবিনাশ। আরে! তাই তো! যেভাবে এসেছে সেভাবেই কী ফেরত যাবার চেষ্টা করা যায় না? অবিনাশ নেহরুর ছবির দিকে তাকাল।
নেহরু মিটিমিটি হাসছেন।
*****
(৩)
ঠিক তিন মিনিট পর, ভবানীপুরে নিজের খাটে বড়ি ফেলে নিশ্চিন্তির শ্বাস ছাড়ল অবিনাশ। মাথার মধে এখনও একইরকম ট্রাফিকজ্যাম। বুক দুরদুরটাও কমেনি। তবে একটা সিদ্ধান্তে যেন আসা যাচ্ছে এইবার। বিজ্ঞানে পরিভাষায় এই অসম্ভব ঘটনার একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে। ওয়ার্মহোল। ফিজিক্স বলছে, মহাজগতে অনেক দূরবর্তী কোনো বিন্দুতে যদি কোনো শর্টকাট মারফৎ কম সময়ে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হয়, তাহলে এই শর্টকাটটিকে বলতে হবে ওয়ার্মহোল। কিন্তু কী কী শতে একটা ওয়ার্মহোল তৈরি হয়, ফিজিক্সে এখনও এর স্পষ্ট উত্তর নেই। কারণ ওয়ার্মহোল এখনও পর্যন্ত একটা থিওরি মাত্র। ফিজিক্স বলছে, ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব সম্ভব। অথচ বাস্তবে এখনও কোনো ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ঘনাদার একটা গল্পে এরকম একটা আশ্চর্য ওয়ার্মহোলের কথা ছিল, যেটা দিয়ে ঘনাদার ঘর থেকে সোজা মঙ্গল গ্রহে ল্যান্ড করা যেত। কিন্তু সে তো গল্প। আর অবিনাশের সঙ্গে এইমাত্র যে ঘটনাটা ঘটল, সেটা? উফ! ভাবলেই মাথা ভোঁ ভোঁ করছে।
গোটা দুটো দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে অবিনাশ শুধু ভাবল। ভেবেই গেল। কুলকিনারা পেল না। ভাবতে ভাবতে পেট ফেঁপে গ্যাস হল। জ্বর এসে গেল। বছরের মাঝামাঝি দু-দুটো মহামূল্য ক্যাজুয়াল লিভ খরচ হয়ে গেল। তিনদিনের দিন কাকভোরে চোখ লাল, চুল উস্কোখুস্কো আর মন শক্ত করে উঠে দাঁড়াল অবিনাশ। না। আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। রঘুনাথ মুর্ম স্কুলের স্টাফরুম আর অবিনাশের ঘর কোনোভাবে একটা ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে জুড়ে গেছে। হয়তো কাকতালীয়। অথবা হয়তো মেঘলাবাবারই চমৎকারিত্ব। সে যে-কারণই হোক, ব্যাপারটা ঘটেছে। অবিনাশ বড়ো করে একটা শ্বাস নিল। এটা নিয়ে আর সে ভাববেই না। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল থেকে লকনেসের দানো, ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জ থেকে ভয়নীচের পাণ্ডুলিপি-কত ঘটনারই তো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। মানুষের জীবন কী তাতে থেমে থাকে? আর তাছাড়া গাছ নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ করে কী লাভ! আম তো দিব্যি হাতে হাতেই পাওয়া যাচ্ছে। পাশের ঘরে গিয়ে লোকনাথবাবার ছবিটা একটু সরিয়ে উঁকি মেরে নিল অবিনাশ। সব ঠিকঠাক। জয় মেঘলাবাবা জয় বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী।
আরও দিন পনেরো এইভাবে চলল। প্রতিদিন সকাল ন-টায় লোকনাথবাবার পেছন দিয়ে ঢুকে নেহরুর পেছন দিয়ে বেরোনো, আবার সন্ধে ছটায় ভাইসি ভার্সা। কোনো গোলমাল হল না। ভারী আরামের জার্নি। একটু আগে আগেই যেতে হয়। অন্য কেউ এসে পৌঁছোনোর নিরাপদরকম আগেই। আর বেরোতেও হয় সবার বেরিয়ে যাবার বেশ খানিকটা পর। সহকর্মীরা একটু অবাক হয়। আজকাল অবিনাশ আর কারও সঙ্গে ফিরতে চায় না। আসা-যাওয়ার পথে কোনোদিনই কারও সঙ্গে দেখা হয় না তার। সবাইকে সে বলে রেখেছে দাঁতনের কাছে পিসির বাড়ি থেকে যাতায়াত করছে। নয়াগ্রাম থেকে দাঁতন বাসপথে মিনিট পঁয়তাল্লিশের রাস্তা। ফলে একটু দেরিতে বেরোলে সেটা অস্বাভাবিক দেখায় না। সহকর্মীদের কেউ সেদিকটা থাকেও না। সবার সঙ্গে কথাবার্তাও অবিনাশ খানিক কমিয়ে দিয়েছে। কথা বাড়ালেই বিপদ। কোন ফাঁক দিয়ে কোন ম্যাও বেরিয়ে পড়ে তার ঠিক আছে? সহকর্মীরা সঙ্গত কারণেই ক্ষুণ্ণ হয়। বলাবলি করে, অবিনাশটা কেমন একলঘেঁড়ে হয়ে গেছে।
না। একটু সতর্ক থাকা দরকার। অবিনাশ ভাবছে, এবার থেকে সপ্তাহে একটা-দুটো দিন যাতায়াতের যে-কোনো একটা পিঠ ট্রেনে-বাসেই সারবে। নাহলে ব্যাপারটা খুব রিস্কি হয়ে যাচ্ছে। একটা লোক স্কুলে যাচ্ছে আসছে অথচ কেউ কোনোদিন তাকে ঢুকতে-বেরোতে দেখছে না, এ কী ভালো কথা? রোজই ভাবছে অবিনাশ, কিন্তু শরীরটা আর দিচ্ছে না। আসলে পাঁচ মিনিটে যেখানে পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে, সেখানে পাঁচ ঘণ্টা ওরকম অমানুষিক পরিশ্রম করতে কার ভাল্লাগে?
এরপর একদিন অবিনাশের ‘অন ডিউটি লিভ’ ছিল। মানে স্কুলের অফিশিয়াল কাজ নিয়ে অন্যত্র যাওয়া। অন্যত্র বলতে বিকাশ ভবন, আর কাজ বলতে স্কুলের একটা ফান্ডের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া, সঙ্গে নিজের অ্যাসেট ডিক্লারেশনের কাগজপত্র জমা দেওয়া। গোলমালটা পাকল বিকাশ ভবনের সাত তলায় রিসিভিং সেকশনে গিয়ে। অ্যাসেট ডিক্লারেশনের কাগজপত্র জমা নিচ্ছিলেন যে ভদ্রলোক, তাঁকে দেখে অবিনাশের মাথায় চিরিক করে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ভারী চেনা চেনা লাগছে! ঢুলু ঢুলু চোখ। ভুরুর ওপর কাটা দাগ। কোথায় যেন দেখেছে লোকটাকে। আরে! ইনি তো তিনি! পিলে চমকে চাটনি হয়ে গেল অবিনাশের। দাড়ি আর জটাটুকু জুড়লে তো অবিকল সেই লোক। অবিনাশ প্রায় লাফ মেরে ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। উত্তেজিত গলায় বলল, “আপনি মেঘলাবাবা না?”
চার-পাঁচ জোড়া বিস্মিত চোখ অবিনাশের ওপর এসে আটকে গেল। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা, তিনি ভুরু কুঁচকে তাকালেন, “আমায় বলছেন?”
“হ্যাঁ। আপনি মেঘলাবাবা তো?”
ভদ্রলোক সৌম্য হেসে বললেন, “আপনি ভুল করছেন। আমার নাম চঞ্চল ঘোষ।”
সেই গমগমে ব্যারিটোন। না! কোনো ভুল নেই। তিড়িং করে ফের লাফিয়ে উঠল অবিনাশ, “আপনিই আপনিই সেই লোক। সেই গলা। সেই চোখ। চোখের ওপর কাটা দাগটাও মিলে যাচ্ছে।”
“কী মুশকিল!” গলায় সামান্য বিপন্নতা ফুটল ভদ্রলোকের, “আমি চঞ্চল ঘোষ। বাইশ বছর হয়ে গেল এখানে চাকরি করছি। আপনি এঁদের যে-কাউকে জিজ্ঞেস করুন আমি কে।”
ভদ্রলোকের প্রত্যয়ী জবাবে অবিনাশ সামান্য দমে গেল। ঘরের বাকি কর্মীরা কাজ থামিয়ে তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাদের চোখমুখ দেখে অবিনাশের মনে হল, অবিনাশকেই পাগল ঠাওরাচ্ছে তারা। সে তবু আমতা-আমতা করে বলল, “কিন্তু… কিন্তু… তা কী করে সম্ভব! আপনার ওই চোখ, ওই গলা…।”
অবাক হলেও চঞ্চল ঘোষ বিরক্ত হননি। মাথা নেড়ে বললেন, “আপনি অন্য কারও সঙ্গে আমায় গুলিয়ে ফেলছেন।”
ঠিক সেই সময় খুব অবিন্যস্ত, ব্যস্তসমস্ত একজন লোক এসে ঢুকল হাতে ধুলোমাখা কয়েকটা ফাইলের স্তূপ নিয়ে। তাকে দেখে অবিনাশের হৃদপিণ্ড আবার একটা ডিগবাজি খেয়ে গেল। এ যে সেই ব্রয়লার মোরগ! মেঘলাবাবার সেই ভক্ত। ঘরের বাইরে বসে মুড়ি খাচ্ছিল। মাথায় এখন মোরগঝুঁটিটা নেই, কিন্তু নির্জলা সেই লোক। কোনো সন্দেহ নেই। সেই কুতকুতে চোখ, টোপলা গাল। প্রচণ্ড উত্তেজনায় অবিনাশের জিভ টাকরায় আটকে গেল। “আ-আ-আ-র বেশি কিছু বেরোল না গলা দিয়ে।
মুখের প্রসন্ন হাসিটি কিন্তু চঞ্চল ঘোষ ধরে রেখেছেন। লঘু স্বরে বললেন, “কী মুশকিল। এটা কী গান গাওয়ার জায়গা?”
“এসে থেকে উলটোপালটা বকছে,” রিসিভিং সেকশনের আর একজন কর্মী রাগত গলায় বললেন, “এখন আবার সরগম করছে। পাগল নাকি লোকটা?”
অবিনাশ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ফাইলবাহীকে বলল, “আ-আপনি? আপনিও তো ছিলেন সেদিন।”
লোকটা কুতকুতে চোখে অবিনাশকে ভালোমতো মাপল। যেন আগে কোনোদিন তাকে দেখেইনি। বলল, “কোথায় ছিলাম?”
“মেঘলাবাবার ওখানে। আপনিই তো ছিলেন। টাকা তো আপনিই নিলেন।”
“কীসের টাকা? আর মেঘলাবাবাটাই বা কে?”
“কেন? উনি।” বলে চঞ্চল ঘোষের দিকে আঙুল দেখাল অবিনাশ।
চঞ্চল ঘোষের স্থৈর্য এতক্ষণে সামান্য এলোমেলো হয়েছে, “তখন থেকে কী যা-তা বলছেন বলুন তো? আমি তো বলছি আমার নাম চঞ্চল ঘোষ।”
অবিনাশ বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সব ঘেঁটে যাচ্ছে। হয় এরা বিরাট উঁচুদরের অভিনেতা, না হয় সত্যিই কোথাও একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। গণ্ডগোল যদি হয় সেটা কী আদৌ অবিনাশের দিক থেকে হচ্ছে? গত কয়েক দিনে নানারকম অশৈলী ঘটনা না ঘটলে অবিনাশ নিশ্চিত করে বলতে পারত, গণ্ডগোল তার নয়। কিন্তু যা-সব ঘটে চলেছে, তারপর কোনো কিছুই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। আসলে এই ট্রান্সফারের চক্করেই মনে হয় তার মাথাটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। না। মাথা ঠান্ডা করা দরকার। চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস নিল অবিনাশ। ব্রহ্মতালুতে জোরে থাবড়ে নিল তিন-চারবার।
চঞ্চল ঘোষ ফাইলবাহী লোকটিকে বললেন, “অজিতবাবু, আমার মনে হয় ভদ্রলোক অসুস্থ বোধ করছেন। হি নিডস হেল্প। ওঁকে বাইরে নিয়ে যান প্লিজ। বসিয়ে একটু জল-টল খাওয়ান।”
ফাইলবাহী, মানে যাকে চঞ্চল ঘোষ ‘অজিতবাবু’ বলে ডাকলেন, অবিনাশের কনুই চেপে ধরে বাইরে নিয়ে এসে বেঞ্চে বসাল। বলল, “জল খাবেন?”
অবিনাশ দু-দিকে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “দেখুন, আপনাদের দু-জনকেই আমি চিনতে পেরেছি। কোথায় দেখেছি সেইটাও স্পষ্ট মনে আছে। কিন্তু আপনারা মানতে চাইছেন না। আমার এত বড়ো ভুল হবার কথা না।”
লোকটা দু-হাত নেড়ে অবিনাশকে থামাল। চাপা গলায় বলল, “আপনি ঠিকই ধরেছেন। কিন্তু চেপে যান মশাই। বাবা এখন আন্ডার কভার আছেন।”
“আন্ডার কভার! মানে?”
“খাপে আছেন,” লোকটা চোখ নাচাল, “আপনি সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন না, বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময় বাবা কী করেন?”
অবিনাশ হাঁ করে চেয়ে রইল।
লোকটা আশ্বাসের সুরে বলল, “আপনি বিচলিত হচ্ছেন কেন? আপনার কাজ তো হয়ে গেছে। হয়নি?”
“ইয়ে… হয়েছে, মানে … ঠিক যেটা চাইছিলাম সেটা হয়নি…”
“হয়নি মানে? হয়নি বললেই হল। কী ভাবেন? আমরা ফলো আপ করি না? ক্লায়েন্টের খবরাখবর রাখি না?”
অবিনাশ ঘাবড়ে গেল, “খবর রাখেন?”
“এদিকে লোকনাথবাবা, ওদিকে নেহরু!” ভক্ত কান এঁটো করে হাসল, “ম্যাগির চেয়েও কম সময়ে বাড়ি থেকে ইস্কুল। কী ভাবছেন, কিচ্ছু খবর রাখি না?”
*****
(৪)
পাড়ার গৌতম বিকাশ ভবনে গ্রুপ ডি স্টাফ। অবিনাশ সন্ধেবেলা ধরল তাকে। গৌতম ভারী উৎফুল্ল স্বরে একেবারে দরাজ সার্টিফিকেট দিল, “চঞ্চল ঘোষ? সে তো দারুণ লোক। যেমন অনেস্ট, তেমন দিলখোলা। সবার সঙ্গে দারুণ রিলেশন। কেন বলো তো? এনি প্রবলেম?”
“না না। আজই আলাপ হল কিনা। আচ্ছা, উনি কী ধর্মকর্ম করেন? একটু ধার্মিক গোছের? জানিস কিছু?”
“ধার্মিক?” খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল গৌতম, “তোমার তাই মনে হল?”
“কেন? তাই নয়?”
“তোমার মুণ্ডু! ঠিক উলটো। চঞ্চলদা চূড়ান্ত নাস্তিক। কেউ সামান্য তাগা-তাবিজ বা বিপত্তারিণীর সুতো পরেছে দেখলেও খচে যান। দু-চার কথা না শুনিয়ে ছাড়েন না। আসলে বিজ্ঞান মঞ্চের লোক তো!”
অবিনাশ আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ বাড়ি ফিরে এল। মাথার মধ্যে ঘ্যাঁট পাকিয়ে গেছে। খাওয়াদাওয়া কিচ্ছু হল না সেদিন। রাত কাবার হয়ে গেল স্রেফ ভাবতে ভাবতে। ভোরের আলো চোখে এসে পড়তেই “ধুত্তোর!” বলে অবিনাশ উঠে পড়ল। অনেক হয়েছে। যা নিয়ে ভেবে কূলকিনারা করা যায় না, তা নিয়ে ভেবে কী লাভ! চটপট স্নান করে খেয়েদেয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তৈরি হয়ে অবিনাশ লোকনাথবাবার ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। থিওরি বলছে, ওয়ার্মহোল খুবই ক্ষণস্থায়ী। এই আছে তো এই নেই। কী হবে যদি হঠাৎ একদিন দেখা যায়, ছবির পেছনে কিছুই নেই! মনটা ছ্যাঁত করে উঠল। না না। খামোখা অশুভ কথা ভেবে কাজ নেই। ছবিতে মস্ত একটা প্রণাম ঠুকে অবিনাশ বলল, “জয় লোকনাথ ব্রহ্মচারী। দরজাটা চিরকাল খোলা রেখ বাবা!”
তারপর দু-মাস কেটে গেছে। দরজা খোলাই আছে। এদিকে লোকনাথবাবা ওদিকে নেহরু। এদিকে সকাল ন-টা ওদিকে সন্ধে ছটা। অবিনাশের দিব্যি অভ্যেস হয়ে গেছে ব্যাপারটা। যাবার সময় কোনোদিন দেরি হয়ে গেলে পথেই টুক করে ব্রেকফাস্টটাও সেরে নিচ্ছে। এই সেদিনই, ডিমসেদ্ধ আর কলাটা তো ওপর থেকে পড়তে পড়তে, মানে নামতে নামতেই খেল। এর মধ্যে একবার বিকাশ ভবন যেতে হয়েছে। রিসিভিং সেকশনে শ্রী চঞ্চল ঘোষের দেখাও মিলেছে। হাসিমুখে মাথা নেড়েছেন ভদ্রলোক। অবিনাশও পালটা হেসেছে। তারপর চটপট সরে এসেছে বিনা বাক্যব্যয়ে। গুরুজনেরা বলেন, যে-মেশিন চলছে তাকে অযথা খোঁটাখুঁটি করার দরকার নেই। সত্যিই, সুখে থাকতে যেচে ভূতের কিল খেতে যাবার তো মানে হয় না। এর চেয়ে সুখে কবে থেকেছে অবিনাশ? শরীরটা বাঁচছে। নয়াগ্রামের ভাড়াবাড়িটা ছেড়ে দেবার ফলে বেশ কিছু টাকাও বেঁচে যাচ্ছে। সেটা মিউচুয়াল ফান্ডে ইনভেস্ট করা গেছে। প্রতি রোববার খাসি বা বিরিয়ানি এখন বাঁধা। সঙ্গে মাঝেমাঝে আরসালান বা আমিনিয়া তো আছেই।
আর ট্রান্সফার? হেঁ হেঁ। ট্রান্সফার নিয়ে অবিনাশ আর ভাবছেই না।
