কালো হীরের জাল – ৩
ঘুম থেকে উঠে খানিকক্ষণ ফ্রি হ্যান্ড করা রামশরণ পাহাড়ির অনেকদিনের অভ্যাস। এখনও সেটা বজায় রেখেছেন। শুধু তাই নয় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে ফিট রাখতে খানিকটা যোগব্যায়ামও করেন আজকাল। এসব সেরে, স্নান করে একটা বেশ ভরপেট জলখাবার খেয়ে কাজে নেমে পড়া। ততক্ষণে বাড়ির নীচে দলের ছেলে-পুলেরা এসে যায়। নকুড়কে বলা আছে। আটটার মধ্যে অফিসঘরটা ঝাঁটপাট দিয়ে খুলে দেয়। মন্ত্রীর কাছে নানারকম আবেদন নিয়ে যাঁরা আসেন, তাঁদের সেখানে বসার ব্যবস্থা আছে। দুর্গাপুরে থাকলে রামশরণ সকালের দিকটা নিজের অফিসে বসেই লোকজনের সঙ্গে কথা যেতে হয়। দুপুরের পর থেকেই ব্যস্ততা বাড়ে। সারাদিনে আর বিশেষ শরীরের যত্ন নেওয়ার সময় পাওয়া যায় না। আগে রাতে শোয়ার সময় মোবাইল ফোনটা অফ্ করে ঘুমোতেন। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও কিছুদিন অভ্যাসটা বজায় রেখেছিলেন। রাতে মোবাইল থাকত তাঁর সচিবের কাছে। রথীন এ-বাড়িতেই থাকে। তাই তেমন জরুরি ফোন এলে তাঁকে ডেকে দিতে অসুবিধা নেই। কিন্তু দু-একটা ছোটোখাটো ঘটনার পর বুঝছেন এসব ক্ষেত্রে বাঁশের থেকে কঞ্চি দড় কথাটা হাড়ে হাড়ে সত্যি। তাই আজকাল রাতেও মোবাইল নিজের কাছেই রাখেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার মেসেজগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিয়ে তারপর বিছানা থেকে নামেন। আজও তাই করছিলেন। কিন্তু মোবাইলটা দেখতে গিয়ে একটা মেসেজে চোখ আটকে গেল। নম্বরটা চেনা নয়। সেভও করা নেই। মেসেজে লেখা আছে, “স্যার একটু সাবধানে থাকবেন। আপনার বিরুদ্ধে কোনো একটা ষড়যন্ত্র চলছে। যারা এর মধ্যে আছে, তারা সবাই যথেষ্ট ক্ষমতাশালী। লুকিয়ে মেসেজ করছি। ধরা পড়লে আমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি হবে। তাই দয়া করে এ-বিষয়ে কাউকে কিছু বলবেন না।”
মেসেজটা পড়ে রামশরণ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। বিপদের আশঙ্কা যে তাঁর আছে তিনি জানেন। অনেকদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিক। একসময় ছাত্র আন্দোলন করেছেন। তারপর শ্রমিকদের মধ্যেও কাজ করেছেন। সৎ মানুষ বলে যেমন অনেকে শ্রদ্ধা করে তেমনি শত্রুও তাঁর নেহাৎ কম নয়। কিন্তু গত বছর দুয়েক যাবৎ মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে শত্রুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। এই দুর্গাপুর-আসানসোল এলাকায় কয়লা মাফিয়াদের দাপট অত্যন্ত বেশি। স্পঞ্জ আয়রনের কারখানা থেকে শুরু করে নানা ধরনের ব্যাবসা তাদের আছে। এই ব্যাবসার আড়ালে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি চলে। যে-কোনো ধরনের সরকারি কাজের কন্ট্রাক্ট এরা নানারকম জালি-জোচ্চুরি করে দখল করে নেয়। কিন্তু কাজের মান যথাযথ হয় না বলে সরকারের মুখ পোড়ে। এছাড়া মেয়ে পাচার, গুণ্ডামি, বোমাবাজি থেকে শুরু করে সময় সময় দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়ার পেছনেও এদের হাত থাকে। এই অঞ্চলে দীর্ঘসময় কাজ করার কারণে এসবই রামশরণ জানতেন। দু-একবার প্রতিবাদ করার চেষ্টাও করেছেন কিন্তু লাভ হয়নি। বুঝতে পেরেছিলেন এদের হাত যথেষ্ট লম্বা। এবার তাই মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পরে নিজেই মনে মনে ঠিক করেছিলেন এই এলাকায় এদের আধিপত্য বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কাজটা তো সহজ নয় মোটেই। ল্যাজে পা পড়লে কেউ ছেড়ে দেয় না। বিশেষ করে রামশরণ যখন তাদের রোজগারের জায়গায় হাত দিতে শুরু করছেন। নিয়মিত বিভিন্ন জায়গায় রেইড, রাস্তায় পুলিশ পেট্রলিং, সন্দেহজনক গাড়ি দেখলে চেকিং, প্রতিটি সরকারি কাজের টেন্ডার নিয়ে নিজে খোঁজখবর নেওয়া এসবের একটা প্রতিক্রিয়া হবেই। তাই মেসেজটা পড়ে রামশরণ যে খুব বিস্মিত হয়েছেন তা নয়। কিন্তু জানা দরকার মেসেজটা তাঁকে করল কে। স্যার বলে সম্বোধন করেছে, তার মানে তাঁরই কোনো ছাত্র। কিন্তু এমন কেউ নয়, যার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তাহলে তার নম্বর নিশ্চিত সেভ করা থাকত।
ব্যায়াম শুরু করার আগে রামশরণ ফোনে ধরলেন সুনীল মিত্রকে। সুনীল দুর্গাপুরেরই ছেলে। রামশরণবাবুর প্রাক্তন ছাত্র। এখন সে আইপিএস অফিসার হিসাবে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হিসাবে কাজ করছে। সুনীলকে বাড়িতে আসতে বলে সকালের অন্যান্য কাজকর্ম সেরে নিলেন রামশরণবাবু। যাঁরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল তাঁদের সঙ্গে কথাও বললেন। তারপর নিজের শোবার ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে সুনীলকে মেসেজটা দেখালেন।
“কে মেসেজটা করেছে আপনি কোনোরকম আন্দাজ করতে পারছেন না স্যার?”
মাথা নাড়লেন রামশরণ, “একদমই না। সেজন্যই তো তোমাকে তাড়াহুড়ো করে ডাকলাম। এই নম্বরে ফোন করে ছেলেটি কে সেটা তো আর জিজ্ঞাসা করা যাবে না। কারণ সেক্ষেত্রে ও যে বিপদে পড়ে যেতে পারে বোঝাই যাচ্ছে। এটা বার করার দায়িত্ব তোমার। তবে আমার মনে হয় তুমি সরাসরি ওর সঙ্গে যোগাযোগ কোরো না। অন্য কোনোভাবে যদি খোঁজখবর নেওয়া যায়, তাহলে সেটাই দ্যাখো।”
“ঠিক আছে স্যার আমি আমার দিক থেকে যা ব্যবস্থা নেওয়ার করছি। তবে আপনিও একটু সাবধানে থাকবেন। সিকিউরিটি ছাড়া বাড়ি থেকে বেরোবেন না। আমি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলে বাড়ির আশপাশে দু-একজন সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা যায় কী না সেটাও দেখছি। আর একটা কাজ করতে হবে স্যার, যাঁদের আপনার মনে হয় আপনার সঙ্গে শত্রুতা করতে পারে, তাদের নাম আমাকে একটু বলে রাখবেন। ওপাশেও একটা নজর রাখার ব্যবস্থা করব তাহলে।”
“একজনের নামই তোমায় এখন বলতে পারি, আমার দীর্ঘদিনের শত্রু, বেশ কয়েকবার নানা কারণে টক্কর হয়েছে, সে হল কয়লা মাফিয়া সুরযদেও সিং …”
“ও বাবা! সে তো সাংঘাতিক লোক। ঠিক আছে স্যার আমি দেখছি।”
***
