কালো হীরের জাল – ৫
উত্তরপ্রদেশের মিরাটের কাছে একটা ছোট্ট গঞ্জ এলাকা লাতাহোর। সেখানেই বাজারে রাজনাথ কুন্ডার মোবাইলের দোকান। ছোটো দোকান। তবে রাজনাথের হাত ভালো। তাই খদ্দের হয়। এলাকার অধিকাংশ লোকই মোবাইল খারাপ হলে রাজনাথের দোকানেই আসে। নতুন মোবাইলও রাখে রাজনাথ। তবে খুব বেশি দামের নয়। বেশি দামের মোবাইল কিনে দোকান সাজানোর পয়সা তার নেই। বাজার থেকে বেরিয়ে খানিকদূর গেলে রাজনাথের ছোটো দোতলা বাড়ি। বাবার একসময় ছোটো একটা কাপড়ের দোকান ছিল। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় দোকানে গিয়ে বসতে পারে না অনেকদিন। সেই দোকানেই এখন মোবাইলের ব্যাবসা খুলে বসেছে রাজনাথ। বাড়িতে মা আর বাবা থাকে একতলায়। দোতলার দুটো ঘর রাজনাথের। এখনও বিয়ে-শাদি করেনি। করার কোনো আগ্রহও দেখায় না। ব্যাবসাতেও তেমন মন নেই রাজনাথের। মাঝেমাঝেই এদিক-ওদিক ঘুরতে চলে যায়। কখনও পনেরোদিন কখনও একমাসও কাটিয়ে ফেরে। এমনিতেও সে খুব একটা মিশুকে লোক নয়। কারও সঙ্গে ঝুট-ঝামেলায় যায় না। নিজের কাজ নিয়েই থাকে।
সেদিনও নিজের দোকানে বসে মোবাইল সারাইয়ের কাজ করছিল রাজনাথ। এমন সময় দোকানের লাগোয়া যে ছোট ঘরটা আছে সেখান থেকে একটা মোবাইল বাজার শব্দ পাওয়া গেল। শব্দটা খুবই মৃদু। কিন্তু সেটা শুনেই রাজনাথের চোখের দৃষ্টি সতর্ক হয়ে উঠল। বেলা প্রায় বারোটা। বাজারের দোকানপাট একটু একটু করে বন্ধ হচ্ছে। দোকানদাররা সবাই স্থানীয় লোক। দুপুরের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার বিকেলে এসে দোকান খোলে। তাই এই সময়টায় খদ্দের আসে না সাধারণত। তাও রাজনাথ একবার ভালো করে চারপাশটা দেখে নিয়ে ভেতরে গিয়ে ফোনটা ধরে। ফোনের ওপারের লোকটি তার চেনা। রাজনাথের এই ফোন নম্বর হাতে গোনা যে কয়েকজনের কাছে আছে, তারমধ্যে এ একজন। লোকটার কথাগুলো রাজনাথ একটা ছোটো ডায়েরিতে নোট করে নেয়। তারপর ফোনটা ছেড়ে দেয়।
রাতে দোকান বন্ধ করে ফিরে এসে মা-বাবার সঙ্গেই খেতে বসে রাজনাথ। মুলির পরাঠা করেছে মা। শুকনো লংকা আর হিং ফোড়নের সুন্দর গন্ধ। সঙ্গে আচার। অড়হড়ের ডাল। বেশ তৃপ্তি করেই খায় ছেলে। তারপর বলে, “এবার একটু বেরোব ক-দিনের জন্য। অনেকদিন ঘরে বসে আছি, ভালো লাগছে না।”
“এবার আবার কোথায় যাবি?”
মায়ের কথায় একটু হাসে রাজনাথ।
“দেখি কোথায় যাওয়া যায়, পাহাড় না সমুদ্র নাকি কোনো রাজা-রাজড়ার শহর… এখনও ঠিক করিনি কিছু। বেরিয়ে পড়ে তারপর ঠিক করব।”
গজগজ করে মা। রাজনাথের বাবাকে বলে, “এইজন্য বলছি ছেলের এবার শাদি দাও। ঘরসংসারে মন নেই। ঘরে বহু থাকালে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রাজনাথ একটু হেসে বলে, “ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আমি তো বলেছি তোমাকে, যখন শাদির মন হবে আমি নিজেই তোমর বলব। এখন ঝামেলা কোরো না। আমি টাকা বাবার অ্যাকটিন্টে ট্রান্সফার করে রেখে যাব। দরকার হলে তুলে নিও।”
বাবা চুপ করে থাকে। ছেলে বড়ো হয়েছে। নিজের মর্জি না হলে বিয়ে করবে কেন? নিজের পছন্দের কোনো লাড়কি আছে কী না তাই বা কে জানে। তবে ছেলে মা-বাবার অযত্ন করে না। যখনই বাইরে যায় টাকা দিয়ে যায় অ্যাকাউন্টে। বেশ মোটা টাকা। টাকার অঙ্কটা দেখে মনোহর কুন্ডার মাঝে মাঝে একটু অবাকই লাগে। এরকম ছোটো একটা দোকান চালিয়ে এত টাকা রোজগার করে রাজনাথ। তারমানে ওর হাতের কাজ খুবই ভালো। শুধু এই লাতাহোর নয়, অন্য জায়গা থেকেও লোকে ওর দোকানে মোবাইল সারাতে আসে। রাজনাথ মাঝখানে বেশ কয়েকবছর মুম্বাইয়ে ছিল। সেইসময়ই কাজটা শিখে এসেছে। ছেলের জন্য একটু গর্বও হয় মনোহর কুন্ডার।
খাওয়া সেরে দোতলায় চলে আসে রাজনাথ। নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে ডায়েরিটা বার করে। দুপুরে ভাই ফোন করেছিল মুম্বই থেকে। মুম্বইয়ের অন্ধকার জগতের লোকজন ভাইকে বিনোদ ভাই নামে চেনে। আসল নাম যে কী কেউ জানে না। গরিব ঘরের ছেলে রাজনাথ। দারিদ্রকে সে আজীবন ঘৃণা করে। বাবার কাপড়ের ব্যবসা ভালো চলত না। কোনো শখ-আহ্লাদের ব্যাপার নেই। কোনোরকমে দিন গুজরান। রাজনাথ পড়াশোনায় ভালো ছিল। তার ধারণা ছিল পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে, ভালো চাকরি পেয়ে নিজের হাল ফেরাবে। গ্র্যাজুয়েশনের রেজাল্ট ভালো হয়েছিল। কিন্তু চাকরি জুটল না। একসময় বিরক্ত হয়ে সে ঠিক করল ভাগ্য ফেরাতে মুম্বই যাবে। ভালো রাস্তায় যদি পয়সা রোজগার না হয় তাহলে খারাপ পথেই হাঁটবে। কিন্তু বড়োলোক তাকে হতেই হবে। মুম্বাই গিয়েই নানারকম কাজের সূত্রে শেষ পর্যন্ত বিনোদ ভাইয়ের দলে ঢুকে পড়ে সে। ছোটোবেলা থেকেই রাজনাথের নিশানা খুব ভালো ছিল। টিপ করে ঢিল মেরে গাছের ফল পাড়ত। মেলায় গিয়ে বন্দুক ফাটানোর খেলায় একটাও মিস্ হত না। ভাইয়ের দলে ঢুকে তার এই গুণটা খুব কাজে লাগল। খুব তাড়াতাড়ি ভাইয়ের নজরে পড়ে গেল সে। দলের মধ্যে শার্প শুটার হিসাবে তার কদর হল। মুম্বাইয়ের অন্য যে-সব মাফিয়া আছে তারাও তার নাম জানত, তবে ভাইয়ের লোক বলে ঘাঁটাত না কখনও। বিনোদ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করে রোজগারও ভালোই হত। বাড়িতে টাকা পাঠাতে অসুবিধা হত না। বাবা জানত সে মুম্বইয়ে কাজ পেয়েছে। বছর দুয়েক এরকমভাবে চলার পর একটা রেইডে আচমকা ধরা পড়ে যায় রাজনাথ। তিনবছরের জেল হয়ে যায় তার। বিনোদ ভাইয়ের দলে যোগ দেওয়ার পর ভাই তার নাম দিয়েছিল কুন্দন মাহার। ভাইয়ের অনেক ক্ষমতা। তার নামে আধার কার্ড আর পরিচয়পত্রও করিয়ে দিয়েছিল। তাই জেলের খাতায় রাজনাথের নাম ছিল কুন্দন মাহার। জেলে থাকার সময় আরও বেশ কয়েকজন ক্রিমিনালের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজনের কাছে সে বোমা বানানো আর রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে সেই বোমা অপারেট করার টেকনিক শিখে নেয়। সায়েন্সের ভালো ছাত্র ছিল রাজনাথ। তাই শিখতে তার অসুবিধা হয়নি। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর রাজনাথ বিনোদ ভাইকে বলে যে সে আর দলে কাজ করবে না। তার বাবা-মা-র বয়স হয়েছে। তাদের দেখার কেউ নেই। তাই তাকে দেশে চলে যেতে হবে। কিন্তু সে টাকা রোজগার করতে চায়। বাবার কাপড়ের দোকান চালিয়ে তার জীবন চলবে না। তখন বিনোদ ভাই তাকে একটা প্রস্তাব দেয়। সে বলে রাজনাথের মতো শার্প শ্যুটার সহজে পাওয়া যায় না। তাই সে ঘরে বসেও অনেক টাকা রোজগার করতে পারবে। দলে না থাকলে তাকে পুলিশ সহজে ধরতেও পারবে না। ঠিক হয়, বিনোদ ভাই রাজনাথকে কাজ দেবে। সুপারি নিয়ে খুন করার কাজ। তার জন্য একটা পার্সেন্টেজ বিনোদ ভাইকে দিতে হবে। বাকিটা রাজনাথের নিজের। তবে রাজনাথকে কথা দিতে হবে যে ভাইয়ের দলের লোকের ওপর সে গুলি চালাবে না। বিনোদ ভাইয়ের কথায় রাজি হয়ে যায় রাজনাথ। তারপরেও সে ছয়মাস মুম্বইরে থেকে খুব ভালো করে মোবাইল সারানোর কাজ শেখে আর নিজের জন্য অনেকগুলো বিভিন্ন নামের পরিচয়পত্র বানায়। বিনোদ ভাইয়ের সাহায্যে খুব দামি আর আধুনিক দুটো আগ্নেয়াস্ত্রও কেনে। তারপর লাতাহোরে ফিরে এসে বাবার কাপড়ের ব্যাবসা বন্ধ করে দিয়ে মোবাইলের দোকান খুলে বসে।
এরপর প্রায় চারবছর কেটে গেছে। এরমধ্যে বেশ অনেকগুলো কাজ করেছে সে। টাকাও রোজগার করেছে ভালোই। নামে-বেনামে ব্যাঙ্কে টাকা জমা করে রাখে সব। তার ইচ্ছে এভাবে আরও কয়েকবছর চালিয়ে যখন বেশ কয়েক কোটি টাকা তার জমে যাবে, তখন মা-বাবাকে নিয়ে দেশের বাইরে কোথাও চলে যাবে। কোনো ছোটো দেশে, যেখানে যাওয়ার খুব একটা সমস্যা নেই। কোন দেশে কীভাবে যাওয়া যায় সেই সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবরও রাখে রাজনাথ।
রাজনাথ এখনও পর্যন্ত যতগুলো খুন করেছে সব নিয়েই পুলিশ মহলে যথেষ্ট তোলপাড় হয়েছে। কিন্তু সে কখনও ধরা পড়েনি। রাজনাথ জানে যে তাকে ধরা খুব কঠিন। আজকাল বিনোদ ভাই ছাড়াও আরও কয়েকজন মাফিয়ার হয় সে কাজ করে। এদের সবার সঙ্গেই তার জেলে থাকার সময় পরিচয় হয়েছিল। কিন্তু এরা সবাই তাকে কুন্দন মাহার নামেই চেনে। কেউ তার আসল পরিচয় জানে না। কোথায় থাকে তা জানে না। কেউ সুপারি দিলে রাজনাথ শুধু তার কাছ থেকে যাকে মারতে হবে তার নাম আর ঠিকানা জেনে নেয়। বাকি পুরো প্ল্যান তার নিজের। যে-কোনো একটা অ্যাকশন করার পর সে ফোনের সিম বদলে ফেলে। নিজের ফোন কোনো এই ধরনের কাজে ব্যবহার করে না। কুন্দন মাহারের নামে তার একটা আলাদা সিম আছে। সেই নম্বরটাও জানে হাতে গোনা কয়েকজন যাদের কাছ থেকে সে কাজ পায়। প্রত্যেক অ্যাকশনের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র নেয়। এক পরিচয়ে পরপর দু-জায়গায় কখনও কাজ করে না। কখনও তাড়াহুড়োও করে না। বলে দেয় যে তাকে সময় দিতে হবে। সে নিজে গিয়ে খুব ভালো করে জায়গাটা রেকি করে। যাকে মারতে হবে তাকে লুকিয়ে বেশ কিছুদিন ফলো করে অভ্যাসগুলো জেনে নেয়। তারপর অ্যাকশন প্ল্যান ঠিক করে। সাধারণত সে একের বেশি অ্যাকশন প্ল্যান আগে থেকে ভেবে রাখে। যাতে একটা কোনো কারণে ফেইল করলে আর একটা কাজে লাগানো যায়। সে শার্প শ্যুটার। তাই গুলি করে খুন করতেই পছন্দ করে। কিন্তু দরকার হলে রিমোট কন্ট্রোল বোমাও ব্যবহার করে।
আজ দুপুরে মুম্বাই থেকে ভাই ফোন করে তাকে একটা কাজ দিয়েছে। একটা লোককে খুন করতে হবে। ডায়েরিটা বার করে রাজনাথ। লোকটার নাম রামশরণ পাহাড়ি। ওয়েস্টবেঙ্গলের দুর্গাপুর নামে একটা জায়গায় থাকে। লোকটা মন্ত্রী। ভাইয়ের কোনো এক দোস্তের সঙ্গে হারামিপনা করছে তাই খুন করতে হবে। কী করেছে জানার দরকার নেই রাজনাথের। কাজটা করার জন্য যে টাকা সে নেয়, সেটা পাবে। ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। গুগুল খুলে লোকটার নাম টাইপ করল রাজনাথ। মন্ত্রী যখন, তখন ইনফরমেশন থাকবে। পাওয়া গেল। ইমেজ থেকে ছবি বার করে দেখল ভালো করে। চেহারা দেখে সাধারণ লোকই মনে হচ্ছে। তবে মন্ত্রী যখন প্রোটেকশন থাকবে। ভালো করে বুঝে-শুনে এগোতে হবে। অনলাইনে দুর্গাপুর যাওয়ার ট্রেনের টিকিট বুক করল রাজনাথ। তারপর একটা ছোটো স্যুটকেসে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। মার্ডার ওয়েপন আর দরকার হলে বোমা বানিয়ে নেওয়ার জন্য মালমশলা ওর সঙ্গেই থাকে। সেইজন্যই ও কখনও ফ্লাইটে কোথাও যাতায়াত করে না। একটু সময় নিয়ে ট্রেনে কিংবা বাসে যায়। ইন্টারনেটে দেখাচ্ছে দুর্গাপুর জায়গাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকার। ঝাড়খণ্ড বর্ডার থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তারমানে কাজটা করে কোনোরকমে বর্ডার পেরিয়ে ঝাড়খণ্ডে ঢুকে যেতে পারলেই নিশ্চিন্ত। দুই রাজ্যের পুলিশের আন্ডারস্ট্যান্ডিং যতক্ষণে হবে ততক্ষণে সে লাতাহোরে ফিরে দোকান খুলে বসবে। আধারকার্ডগুলো বার করে তার মধ্যে থেকে একটা বেছে নেয় রাজনাথ। অনুরাগ মাহাতো। আগামী মাসখানেক এই নামেই তার পরিচয় হবে।
দিন চারেক পরে দুর্গাপুরের বেনাচিতির কাছে গলিতে একটা এককামরার ঘর ভাড়া নেয় অনুরাগ মাহাতো নামে একটা লোক। মোটরসাইকেলের শো-রুমে কাজ করে। আগে ধানবাদে পোস্টিং ছিল। দুর্গাপুরে বদলি করে দিয়েছে কোম্পানি। কুন্দন মাহার লোকটাকে কিছুতেই ট্রেস করতে পারছেন না সুনীল। পশ্চিমবঙ্গ এবং আশপাশের রাজ্যে গত কয়েকবছরে যতগুলো সুপারি কিলিং হয়েছে সবকটার কেস হিস্ট্রি খুব ভালো করে দেখা হয়ে গেছে। অনেকগুলো ক্ষেত্রে ক্রিমিনাল ধরা পড়েছে। যে কয়েকজন ধরা পড়েনি, তাদেরও নাম পুলিশ জানে। তাদের না ধরা পড়ার পেছনে অনেকরকম কারণ আছে। কিন্তু এই লোকগুলোর কারও নামই কুন্দন মাহার নয়। এখানে কিছু বুঝতে না পেরে সুনীল অন্য রাজ্যের সুপারি কিলিংগুলো সম্বন্ধে খোঁজ নিতে শুরু করেন। সব জায়গা থেকে তথ্য পাওয়ার পর সেগুলো একটা এক্সেল শিটে ফেলে সাজানোর পর সুনীলের কাছে একটা ছবি পরিষ্কার হয়। গত বছর চারেকে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যেসব সুপারি কিলিং হয়েছে, তারমধ্যে যেগুলো শার্প শ্যুটার দিয়ে খুন সেরকম পাঁচটা কেসে খুনি ধরা পড়েনি। তার কোনো নামও জানা যায়নি। কিন্তু এই পাঁচটা কেসেই পেছনে মুম্বাইয়ের মাফিয়া বিনোদ ভাই ছিল বলে পুলিশের কাছে খবর। আইপিএস-দের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ-বন্ধুত্ব থাকে। সেই কানেকশন ব্যবহার করে সুনীল তার ব্যাচের মুম্বাই পুলিশের অফিসার অভিনব দেশমুখকে ফোন করে বলেন যে বিনোদ ভাইয়ের দলে কুন্দন মাহার নামে কোনো লোক আছে কী না গোঁজ নিতে। তিনদিন পরে অভিনব জানায় যে কুন্দন মাহাতো বিনোদ ভাইয়ের দলে ছিল। ধরা পড়ে তার তিনবছর জেল হয়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে আর বিনোদের দলে ফেরেনি। কোথায় গেছে কেউ জানে না। তবে বিনোদ ভাইয়ের দলের একটা লোক যে পুলিশকে নানারকম খবর দেয় সে অভিনবকে বলেছে যে লাতাহোরে কুন্দনের কোনো একটা আস্তানা আছে। কারণ কুন্দনকে লাতাহোরের একটা ঠিকানায় টাকা পাঠাতে সে দেখেছে। সে এটাও বলেছে যে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কুন্দন বিনোদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারপর সে কিছুদিন মুম্বাইয়ে থেকে মোবাইল সারানোর কাজও শিখেছিল। কিন্তু মাস ছয়েক পরে সে যে কোথায় গেল কেউ জানে না। তার সঙ্গে দলের আর কারও কোনো যোগাযোগ হয়নি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, শার্প শ্যুটার বলে বিনোদ ভাই কিন্তু কুন্দনকে বেশ পছন্দ করত। অথচ ছেলেটা যে এরকম লা-পাত্তা হয়ে গেল, ভাই কিন্তু ওর কোনো খোঁজ করেনি, ওকে নিয়ে কোনো কথাবার্তাও বলেনি। এর থেকে লোকটার অনুমান যে ভাই জানে কুন্দন কোথায় আছে কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে সেটা কাউকে বলে না।
মীরাটের কাছে লাতাহোর ছোটো জায়গা। গ্রাম ঠিক নয়, গঞ্জই বলা চলে। কিন্তু সেখানকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে কুন্দন মাহারের কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। যদিও সুনীলের মন বলছিল যে লাতাহোরেই কুন্দনের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। কারণ ও যদি আর মাফিয়ার দলে কাজ না করে তাহলে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আশা করা যায় নিজের বাড়িতেই ফিরবে। বসের সঙ্গে কথা বলে সুনীল ঠিক করলেন যে নিজেই দু-দিনের জন্য লাতাহোর যাবেন। দীপক ছেত্রী আপত্তি করলেন না।
লাতাহোর পৌঁছে সেখানকার থানার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে সুনীল এটা নিশ্চিত হলেন যে কুন্দন মাহার বলে কেউ অন্তত এই অঞ্চলে থাকে না। কিন্তু অভিনবের কাছ থেকে সুনীল জেনেছিলেন যে কুন্দন মুম্বাই ছাড়ার আগে মোবাইল সারানোর কাজ শিখেছিল। তাই এবার তিনি ওই এলাকায় কারা মোবাইল সারানোর কাজ করে তাদের খোঁজ নিতে শুরু করলেন। ছোটো জায়গা। তিনজনের নাম পাওয়া গেল। তারমধ্যে একজনের বয়স প্রায় পঞ্চাশ। তাই প্রথমেই তাকে বাদ দেওয়া হল। বাকি দু-জনের মধ্যে একজন লাতাহোরের বাসিন্দা। গত কুড়ি বছরে সে গ্রাম ছেড়ে তেমন কোথাও যায়নি। কিন্তু অন্যজন, যার নাম রাজনাথ সে নাকি বেশ কয়েকবছর মুম্বাইয়ে চাকরি করেছে। তারপর টাকা জমিয়ে এখানে এসে দোকান খুলে বসেছে। এখনও মাঝে মাঝে এদিক-সেদিক হাওয়া হয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেল রাজনাথ লাতাহোরে নেই। দিন পনেরো আগে সে কয়েকদিনের জন্য বাইরে গেছে। সুনীল তখন প্রায় নিশ্চিত যে এই রাজনাথই হচ্ছে কুন্দন মাহার। তাই খুব গোপনে পুলিশের সাহায্য নিয়ে রাতের অন্ধকারে তল্লাশি চালানো হল রাজনাথের দোকানে। সেখানে একটা পুরোনো ডায়েরি পাওয়া গেল। সেটা সম্ভবত মুম্বাইয়ে থাকার সময় রাজনাথ ব্যবহার করত। সেখানে নাম লেখা আছে কুন্দন মাহার। ডায়েরিতে এমন কিছু তথ্য আছে যেগুলো দেখে সুনীলের সন্দেহ হল যে সেগুলো সম্ভবত বোমা বানানোর সাংকেতিক ফর্মুলা। কিন্তু রাজনাথের কোনো ছবি কিংবা কোনো আগ্নেয়াস্ত্র কিছুই নেই। ফলে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে যে রাজনাথের বাড়িতে তল্লাশি চালাবে তারও উপায় নেই। তাই ডায়েরিটা বাজেয়াপ্ত করার পর সুনীল রেলের বুকিং সেকশনে যোগাযোগ করে জানতে চাইলেন, রাজনাথ কুণ্ডার নামে সম্প্রতি মীরাট স্টেশন থেকে কোনো ট্রেনের রিজার্ভেশন করা হয়েছে কী না। একদিন পরেই বুকিং সেকশন থেকে উত্তর এল, অমৃতসর কলকাতা মেইলে রাজনাথ কুন্ডা নাম সংরক্ষিত তালিকায় রয়েছে। দুর্গাপুর যাওয়ার টিকিট কেটেছিল রাজনাথ কুন্ডা। সুনীল আর এক মুহূর্ত দেরি না করে পরের ফ্লাইটে দুর্গাপুর ফিরে এলেন এবং খুব দ্রুত পুলিশকে বললেন খোঁজ নিতে রামশরণ পাহাড়ি যে এলাকায় থাকেন সেখানে সম্প্রতি রাজনাথ কুন্ডা নামে কেউ বাড়ি ভাড়া নিয়েছে কী না।
***
