কালো হীরের জাল – ৬
রামশরণ পাহাড়ি লোকটাকে গত পনেরোদিন ধরে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে রাজনাথ। লোকটা সারাদিন কী করে, কোথায় যায়, ওকে যারা পাহারা দেয় তারা কখন একটু হাত-পা ছড়ায়, এসবই তার এখন মোটামুটি মুখস্থ। প্রথম অ্যাটেম্পটা সে আজ রাতেই নেবে ঠিক করেছে। লোকটা সাধারণত সন্ধের পরে বাড়ি ফেরে। তারপর রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে ছাদে খানিকক্ষণ পায়চারি করে। দোতলা বাড়ির ছাদ, বাড়ির বাইরে পাহারা থাকে। কিন্তু ছাদে কেউ থাকে না। পুরো এলাকাটা ঘুরে রাজনাদ দেখেছে রামশরণের বাড়ি থেকে একটু দূরেই একটা নতুন ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। তার তিনতলার একটা ঘরের জানলা ঠিক রামশরণের ছাদের সোজাসুজি। ওই আন্ডার কনস্ট্রাকশন ফ্ল্যাটের যে পাহারাদার সে রাত আটটা নাগাদ দেশোয়ালী ভাইদের একটা আড্ডায় গাঁজা খেতে যায়। এগারোটার আগে কোনোদিনই ফেরে না। রামশরণ ছাদে ওঠেন রাত দশটা নাগাদ, রাজনাথ তাই সন্ধের একটু পরে একটা ল্মবা ব্যাগে তার স্নাইপার রাইফেল ভরে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোয়। ফ্ল্যাট বাড়িটার সামনে একটু ঘোরাঘুরি করার পর দারোয়ানটা বেরিয়ে গেলেই সে চুপচাপ তিনতলার ঘরে উঠে অপেক্ষা করে। রামশরণ পাহাড়ি খাওয়া সেরে অভ্যাসমতো ছাদে উঠে পায়চারি করছেন। স্নাইপার রাইফেল নিয়ে অপেক্ষা করছে রাজনাথ। অত্যন্ত শক্তিশালী রাইফেল, প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত দূরের লক্ষ্যবস্তুও টার্গেট করা যায়। রামশরণ পাহাড়ির ছাদের দূরত্ব সাতশো মিটারের বেশি হবে না। পায়চারি করতে করতে রামশরণ যেই জায়গামতো এসেছেন অমনি ট্রিগার টেপে রাজনাথ। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ঠিক সেই সময় ছাদের আলসেতে রাখা একটা টব তুলে অন্য জায়গায় বসাতে যাচ্ছিলেন রামশরণ। গুলিটা এসে সরাসরি লাগে সেই টবে। বিকট শব্দ করে টবটা ফেটে যায়। মুহূর্তের মধ্যে একটা হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। রাজনাথ আর এক সেকেন্ড দেরি না করে দ্রুত বাড়িটা থেকে বেরিয়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে নিজের ডেরায় ফিরে আসে।
টবের ভেতরে স্নাইপার রাইফেলের গুলি দেখে কুন্দন মাহার যে তার কাজ শুরু করে দিয়েছে বুঝতে অসুবিধা হয় না সুনীলের। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে গোটা দুর্গাপুর শহর খুঁজেও কুন্দন মাহার কিংবা রাজনাথ কুণ্ডা নামে বাড়ি ভাড়া নিয়েছে এরকম কারও সন্ধান পাওয়া যায়নি। এলাকার সব হোটেলেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্গাপুর শিল্পশহর। বহুলোক সেখানে এসে হোটেলে থাকে, দু-চারদিন পরে আবার চলে যায়। হোটেলও অনেক। ফলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়েও থাকা যায়। প্রতিটি জায়গায় তো আর তল্লাশি করা সম্ভব নয়। তাছাড়া লোকটার আর কোনো জালি পরিচয়পত্র আছে কী না তাও বোঝা যাচ্ছে না।
তাই সুনীল বেশ চিন্তায় পড়েছেন। রামশরণের পাহারা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর আশঙ্কা একসপ্তাহ পরে মন্ত্রীর একটা বড়ো জনসভা আছে। সেখানে অ্যাটাক হতে পারে। যদিও জনসভায় পাহারা খুব কড়া থাকবে। পরিচয়পত্র পরীক্ষা না করে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। স্টেজে হাতে গোনা কয়েকজন থাকবেন। সেখানে কোনো অ্যাটাকের চেষ্টা হলে পালানো খুব কঠিন, তাও সুনীল সেদিনের পাহারায় যাতে আরও কড়াকড়ি হয় সেদিকে নজর রাখতে নির্দেশ দেন। নিজে সবকিছু তদারকি করতে থাকেন।
ফার্স্ট অ্যাটেম্পটটা ফস্কে যাওয়ায় মনে মনে একটু বিরক্ত হয় রাজনাথ। কারণ এর পরে পুলিশ আরও সতর্ক হয়ে যাবে। একটাই ভরসা তাকে কেউ চেনে না, তার সম্বন্ধে জানেও না। তাই পুলিশের পক্ষে তাকে ট্রেস করা মুশকিল। একটাই চিন্তা, অ্যাকশনে থাকার সময় সে কখনও বাড়িতে ফোন করে না। কিন্তু এবার যেদিন বাড়ি থেকে বেরোল, সেদিন বাবার শরীর ভালো ছিল না। তাই খবর নেওয়ার জন্য একটা ফোন বুথ থেকে একবার ফোন করেছিল। বাবা ভালো আছে। কিন্তু মা বলল, হরিলাল নাকি বাড়িতে এসে গপসপ করেছে, তার সম্বন্ধেও খোঁজখবর নিয়েছে। মায়ের ধারণা হরিলালের মেয়ে আছে। তাই হয়তো রাজনাথের সঙ্গে শাদির কথা ভাবছে। কিন্তু রাজনাথ কথাটা অত সহজভাবে নিতে পারেনি। সে জানে হরিলাল পুলিশের খোচর। তাছাড়া তার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে আছে অন্য ছেলের সঙ্গে। হরিলাল কেন তাদের বাড়ি এল, এটা একটু চিন্তায় রেখেছে রাজনাথকে। তাই এই কাজটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিটিয়ে সে লাতাহোর ফিরতে চাইছে। এক সপ্তাহ পরে মন্ত্রীর একটা মিটিং আছে। সেদিন একটা অ্যাটেম্পট নেবে ঠিক করেছে। তবে সেজন্য প্ল্যান বদলাতে হবে। রিভলভার কিংবা রাইফেল দিয়ে কাজ হবে না। পরদিন সকালে তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা শপিং মলের বাথরুমে ঢুকে পোশাক বদলে নিল রাজনাথ। আগেই খোঁজ নিয়ে রেখেছিল কোন ডেকরেটার্স সভার স্টেজ তৈরি, প্যান্ডেল বাধা এইসব কাজ করছে। তার অফিসে গিয়ে ডেইলি লেবারদের সঙ্গে কাজের দরবার করে এক নেতাকে ধরল। মজুরি থেকে কমিশন দেবে বলাতে কাজও মিলে গেল। পরদিন থেকেই জনসভার মঞ্চ বাঁধার কাজে অন্যদের সঙ্গে লেগে পড়ল রাজনাথও। বেশ বড়ো একটা মাঠের মধ্যে প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে।
ডেকরেটার্সের লোকদের সঙ্গে বাশ বাঁধা, দুটি পোতা, কাপড় টাঙানো, চেয়ার আনা এইসব নানারকম কাজে চা লাগাচ্ছে রাজনাথও। লাতাহোরে ফিরে আসার পর সে ইউটিউব দেখে ভারতের বেশ অনেকগুলো প্রদেশের ভাষা শিখে নিয়েছে। তাই বাংলা কিংবা ভোজপুরি হিন্দি দুটোই সে দিব্যি বলতে পারে। ডেকরেটার্সের কাজ যারা করছে, তাদের অনেকেই বিহারের বাসিন্দা। তাই তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি রাজনাথের। প্রথমদিন কাজ করার সময়ই ভালো করে জায়গাটা দেখে নিয়ে নিজের প্ল্যান ঠিক করে নিল রাজনাথ। রাইফেল কিংবা রিভলভার সে ব্যবহার করবে না। কাজ সারবে রিমোট কন্ট্রোল বোমা দিয়ে। জেলে থাকার সময় একজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। তার মাধ্যমেই কয়েকটা এই ধরনের বোমা সে কিনেছে। একেবারে মডার্ন টেকনিকে তৈরি বোমা। সাইজে একটা বড়ো বোতামের মতো। কিন্তু তার ভেতর পোরা থাকে আরডিএক্স। রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যেই এই বোমা ফাটানো যায়। কিন্তু এই রিমোট কন্ট্রোলের সার্কিটটা থাকে মোবাইলের ভেতরে। ব্লু টুথ অন করার পর, মোবাইলের বোতাম টিপলেই বিস্ফোরণ হয়। সাধারণভাবে এই মোবাইল দেখলে কিছু বোঝা যায় না। মেটাল ডিটেক্টরেও কিছু ধরা পড়ে না।
সেদিন সন্ধেবেলায় কাজ থেকে ফেরার পথে দোকান থেকে একটা নতুন স্মার্ট ফোন কিনে নিয়ে এল রাজনাথ। একটু বেশি পয়সাই লাগল কারণ সব ফোনে এই সার্কিট বসানোর কাজটা করা যায় না। তারপর তার ভেতরে সার্কিটটা ঢুকিয়ে রেখে দিল। এবার ওই বোতামের মতো বোমাটাকে মন্ত্রী যেখানে বসবেন তার কাছাকাছি কোথাও রাখতে হবে। মুশকিল হচ্ছে মন্ত্রী আসার আগেই পুরো স্টেজ, তার আশপাশ, এমনকি প্যান্ডেলের ভেতরটাও বন্ধ স্কোয়াড এসে পরীক্ষা করে দেখবে। ওদের সঙ্গে কুকুরও নিশ্চয় থাকবে। তার আগে বোমাটা ওখানে রাখলে ধরা পড়ে যাবেই। তাছাড়া সেদিন ওই চত্বরে ঢোকা কিংবা বেরোনোর সময় সবাইকে তল্লাশি করবে পুলিশ। রাজনাথ তাই পরের দিন কাজে যাওয়ার সময় একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের বক্সে বোমাটা ভরে পকেটে করে নিয়ে গেল, তারপর সুযোগ বুঝে স্টেজ থেকে বেশি খানিকটা দূরে মাঠের পেছনদিকের কোণায় মাটিতে পুঁতে রেখে দিল।
মিটিং-এর দিনও ডেকরেটার্সের লোকেরা সবাই এসেছে। মালিক বলেছে কাজ হয়ে গেলে খাবারের প্যাকেট দেওয়া হবে। সেই লোভে সবাই বসে বক্তৃতা শুনবে। রাজনাথও সবার সঙ্গে বসে আছে। বম্ব স্কোয়াডের লোকেরা চারিদিক পরীক্ষা করে চলে গেল। এবার বোমাটা রাখতে হবে টেবিলের কাছাকাছি কোথাও। স্টেজের ঠিক বাইরে একটা টেবিলের ওপর মন্ত্রীকে দেওয়ার জন্য বড়ো বড়ো ফুলের বুকে রাখা আছে। সেগুলোর একটার ভেতরে বোমাটা ঢুকিয়ে দিতে পারলে ভালো হত। কিন্তু তাতে দুটো সমস্যা আছে। এর আগে মন্ত্রীর গোটা দুয়েক সভায় উপস্থিত থেকে খুঁটিয়ে দেখেছ রাজনাথ। মন্ত্রীর সিকিউরিটি অনেকসময় বুকেটা আগে একবার দেখে নেয় আর তাছাড়া ফুলটা মন্ত্রীর হাতে দেওয়ার পর তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেটা পাশের সিকিউরিটির হাতে তুলে দেন। তার মানে সময়ের এতটুকু এদিক-ওদিক হলেই মন্ত্রী বেঁচে যাতে পারেন। সেই ঝুঁকি নেওয়া রাজনাথের পক্ষে সম্ভব নয়। এই ধরনের কাজে এক শতাংশ ঝুঁকিও নেওয়া যায় না। তবে রাজনাথ একটা জিনিস খেয়াল করেছে, সব সভাতেই মন্ত্রীকে নানারকম উপহার দেওয়া হয়। সেইসব উপহারও সিকিউরিটি তখনই তুলে নিয়ে চলে যায়। শুধু ছোটোরা কোনো উপহার দিলে মন্ত্রী সেটা টেবিলে রেখে দেন। আজও সেরকম কিছু আছে কিনা দেখার জন্য স্টেজের পাশের জায়গাটা রাজনাথ দেখছিল ভালো করে। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা বাচ্চা মেয়ে একটা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাগের গায়ে মন্ত্রীর মুখের ছবি আঁকা। ব্যাপারটা বুঝতে অসুবিধা হল না রাজনাথের। তার মানে মেয়েটা মন্ত্রীকে ব্যাগটা উপহার দেবে। সুযোগটা কাজে লাগাতেই হবে। রাজনাথ নিজের জায়গা থেকে উঠে মাঠের কোণায় গিয়ে শৌচকর্ম করার ভান করে মাটি খুঁড়ে প্লাস্টিকের কৌটোটা বার করে আনল। স্টেজের পেছন দিকটায় তখন পার্টির বেশ কিছু লোকজন রয়েছে। মঞ্চে যাঁরা ইতিমধ্যেই বসে পড়েছেন তাঁদের জল দেওয়া হচ্ছে। জায়গাটা পাহারা দিচ্ছে দু-জন মহিলা সিকিউরিটি। রাজনাথ লোকজনের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে একপাশে রাখা চেয়ারগুলো গোছানোর ভান করে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার একদম কাছে চলে গেল। বাচ্চা মেয়ে। সঙ্গে আর কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একটু ঝুঁকি নিতেই হবে।
“এই ব্যাগটা তুমি বানিয়েছ?”
খুশি হয়ে মাথা নাড়ল মেয়েটা। মহিলা সিকিউরিটি রাজনাথকে দেখেছে। কিন্তু সম্ভবত বাচ্চার সঙ্গে কথা বলছে বলে কিছু বলল না। টেবিলের ওপর রাখা ব্যাগটার ওপর একবার হাত বোলাল রাজনাথ আর সেই সুযোগে অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় বোতামটা ঢুকিয়ে দিল ব্যাগের ভেতর। সিকিউরিটি মহিলা কিছুই বুঝতে পারেনি। এখন শুধু অপেক্ষা ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখার। তাহলে মোবাইলের বোতাম টিপবে রাজনাথ। তবে তার আগ গেটের কাছাকাছি চলে যেতে হবে। যাতে গণ্ডগোল শুরু হলেই চট্ করে বেরিয়ে যাওয়া যায়। আপাতত মন্ত্রী এসে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছু করার নেই। তাই আবার লেবারদের দলের সঙ্গে মিশে বসে পড়ল রাজনাথ। নিজের মোবাইলটা বার করে গেম খেলতে শুরু করেছে এক সময় ওর পাশে এসে বসল রাজু। ছোকরা ছেলে। রাজুকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে প্রচণ্ড বিরক্ত। এই কদিনে রাজুর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেছে রাজনাথের। তাই জিজ্ঞাসা করল, “কেয়া হুয়া রে, কুছ গড়বড়?”
“আরে ইয়ার, মেরা মোবাইল নেহি চল্ রহা হ্যায়…কেয়া গড়বড় হুয়া… দো দিন পহলে সারাই কিয়া থা, দোশে রপায়া লিয়া হারামি কা বাচ্চা… ফিন বন্ধ হো গল্প”
“দে মুঝে দে, ময় দেখতা হুঁ…”
“তু মোবাইলকা কাম জানতা হ্যায় কেয়া?”
“হাঁ থোড়া-বহুত…”
রাজুর হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে পেছনের ঢাকাটা খুলে ফেলে রাজনাথ। রাজনাথের মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখছে রাজু।
“তেরা মোবাইল তো বড়িয়া হ্যা রে, কিমতি চি “ওইসি কুছ নেহি… সেকেন্ডহ্যান্ড মিলা তো খরিদ লিয়া…”
একমনে রাজুর মোবাইলটায় কাজ করে যাচ্ছে রাজনাথ। খেয়াল করেনি একটু দূর থেকে একজোড়া চোখ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করছে।
সাদা পোশাকে সকাল থেকেই সুনীল ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন পুরো মাঠে। গেটের ভেতর দিয়ে ঢোকার সময় প্রত্যেককে যাতে ঠিকঠাক তল্লাশি করা হয় সেজন্য নির্দেশ দেওয়া আছে। এছাড়া গেটে মেটাল ডিটেক্টর তো রয়েইছে। কিন্তু তবু তিনি নিজে চেষ্টা করছিলেন প্রতিটি মানুষকে সার্চলাইট ফেলার মতো একবার দেখে নিতে। লোক এসেছে অনেক। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। তাদের মাটিতে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। পুলিশের ফাঁক গলে রিভলভার কিংবা রাইফেল নিয়ে কারও পক্ষে ঢোকা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে অন্য কীভাবে অ্যাটাক হতে পারে সেটাই ভাবছিলেন সুনীল। হঠাৎ লোকটার দিকে নজর পড়ল ওঁর। মাঠের কোণের দিকে যাচ্ছে। সম্ভবত শৌচকর্ম সারতে। বিহারি শ্রমিক বলেই মনে হচ্ছে। কোণায় গিয়ে মাটিতে বসল। খেয়াল রাখছেন সুনীল। একটু যেন বেশি সময় লাগল মনে হচ্ছে। লোকটা উঠে চলে এল। স্টেজের পেছন দিকে আড়াল হতেই সুনীল দ্রুত পায়ে জায়গাটায় গেলেন। শীতের দিন। শুকনো মাটিতে জলের কোনো দাগ নেই। কিন্তু খানিকটা মাটি খোঁড়া হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। অল্প একটু জায়গা। হাত দিয়ে চেপেও দেওয়া হয়েছে। মাটি সরিয়ে দেখলেন সুনীল। কিছু নেই। তবে মাটিটা আলগা। খোঁড়া হয়েছে নিশ্চিত। দ্রুত পায়ে স্টেজের দিকে চলে আসেন সুনীল। লোকটাকে চোখ ছাড়া করা চলবে না। এদিক-ওদিক একটু তাকাতেই নজর পড়ে স্টেজের পেছনের ঢাকা জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছে দুটো চেয়ার হাতে নিয়ে। চেয়ারগুলো পাশে রেখে একপাশে বসে থাকা ডেকরেটার্সের লোকজনদের মধ্যে গিয়ে বসল লোকটা। খুব মন দিয়ে দেখছিলেন সুনীল। অন্য লেবারদের সঙ্গে জামা-কাপড়, চুলের ভঙ্গি কোনোকিছুতেই কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু তাও সূক্ষ্ম একটা ফারাক আছে। লোকটা নিজের মোবাইলে গেম খেলছে। অসচেতন আছে। অসেচতনে সেই ফারাক ফুটে উঠছে। শিক্ষার ছাপ লুকোনো খুব কঠিন। মোবাইলটা দামি। একটা ছেলে এসে পাশে বসল। সুনীল অনেকটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন এখন। ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছেন। ছেলেটার মোবাইলটা নিয়ে পেছনটা খুলল লোকটা। নিপুণহাতে সারাচ্ছে। সামান্য কিছু গণ্ডগোল মনে হয়। চালু করে ফেরত দিল ছেলেটাকে। সুনীল খুব দ্রুত নিজের মোবাইল থেকে একটা মেসেজ করলেন। হুটারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মন্ত্রীর গাড়ি আসছে। লোকটা উঠে পড়ছে। মানুষের ভিড়ে শিকারি চিতার মতো দৃষ্টি স্থির রেখেছেন সুনীল। রামশরণ পাহাড়ি স্টেজে গিয়ে বসলেন। ফুল উপহার দেওয়া হচ্ছে। লোকটা গেটের দিকে এগোচ্ছে। এক হাতের মধ্যে সুনীল। গেটের খানিকটা আগে লোকটা স্টেজের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু দেখল। এবার বাঁ-হাত পকেটে ঢুকিয়ে একটা মোবাইল বার করেছে। নীল রঙের। গেম খেলছিল যে মোবাইলটায় এটা সেটা নয়। লোকটার দুটো মোবাইল! সেকেন্ডের মধ্যে হঠাৎ মাথাটা পরিষ্কার হয়ে যায় সুনীলের।
রাজনাথ…
রিফ্লেক্সে ঘুরে তাকিয়েই সাদা হয়ে গেল রাজনাথ। ততক্ষণে বজ্রমুষ্ঠিতে তার হাত মুচড়ে মোবাইল কেড়ে নিয়েছেন সুনীল। ঘাড়ের কাছে ইস্পাতের নলের শীতল স্পর্শ। মুহূর্তে আরও চারজন ঘিরে ধরেছে তাকে। পালানোর কোনো পথ নেই। সুনীলের মেসেজ পেয়ে তৈরিই ছিল সবাই।
“লক্ষ্মণ, এই মোবাইলটা খুব সাবধানে একপাশে রাখো। অত্যন্ত বিপজ্জনক। আর এখনই বম্ব স্কোয়াডকে খবর দাও। স্টেজের আশপাশে নিশ্চয় বোমা আছে। তবে খুব সাবধানে লোকজন যেন কিছু বুঝতে না পারে…”
মোবাইলটা লক্ষ্মণের হাতে দিয়ে রাজনাথের দিকে ফিরলেন সুনীল, “রাজনাথ কুণ্ডা ওরফে কুন্দন মাহার… শাপ শ্যুটার… এবার তোমার খেল খতম।”
***
