ইতিহাসের আলোকে বাংলার রঘু ডাকাত – রাধামাধব মণ্ডল
তন্ত্রাচারের কালীপুজোর উপাচার হিসেবেই রঘু ডাকাত নরবলি দিতেন। সে বড়ো ভয়ঙ্কর ঘটনা। এমনভাবেই একদিন রাস্তা দিয়ে কালীভক্ত রামপ্রসাদ সেন যাচ্ছিলেন। তাঁকেও কালীর সামনে বলি দেবে বলে ধরে আনে রঘু ডাকাতের দল। সেদিন যখন অগত্যা বলি দেবেই ডাকাত রঘু, তখন বলি দেওয়ার আগে দেবীর সামনে একটি গান গাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন স্বয়ং রামপ্রসাদ। শোনা যায় বহু অনুনয় বিনয়ের পর রঘু গান গাওয়ার অনুমতি দিলে, ‘তিলেক দাঁড়া ওরে শমন বদন ভরে মাকে ডাকি’ গানটি গেয়ে শোনান রামপ্রসাদ। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এমন গান। আশ্চর্যকথা! কথিত আছে যে, এই সময় বলিকাষ্ঠে রামপ্রসাদের জায়গায় কয়েকবার দেবীকে দেখতে পান রঘু ডাকাত! সেই খটকা লাগে! আশ্চর্য রঘু স্তম্ভিত হয়ে যান অবশেষে। শোনা যায় তারপর থেকেই নরবলি বন্ধ করে দেন ডাকাত রঘু।
আমাদের এই গঙ্গাপাড়ের বাংলায় রঘু ডাকাতের মতো এমন ‘বিখ্যাত’ ডাকাত বোধকরি আর তেমন আসেনি! ছোটোবেলার ভয়ের জগৎ জুড়ে আজও ঘুরে বেড়ায় রঘুর নানান ছবি। সে সব গল্পের ছবি। পেল্লায় বড়ো দেহ, মস্ত বড়ো গোঁফ আর মাথায় একটা প্রকাণ্ড ইয়া বড়ো পাগড়ি। সে সব রক্তলাল কাপড়ের! তবে ‘মানুষ’ রঘু ডাকাতের জীবনের গল্পগুলো এখনও এত বেশি জায়গা দখল করে আছে আমাদের মনে যে, চরিত্রটি বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছে যেন একেবারেই প্রায় বাঙালির অন্দরমহলে।
আজও রঘু ডাকাত সম্পর্কিত তাঁর জীবনের গল্প এত বেশি জনপ্রিয় যে, সেখান থেকে আসল গল্পের খোঁজ পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্যই। অনেক গল্পকথার ভিড়ে হারিয়ে রয়েছে রঘু। কী এক রহস্যের জীবন রঘুডাকাত! তবু সেই রহস্যের সন্ধানে দীর্ঘদিন ধরে ঘুরেছি, পড়াশোনা করেছি, তাঁর জীবনের সত্যের সন্ধানে। খোঁজ করেছি তাঁর পরিবার, পরিজন এবং বংশধরদের। তাঁকে নিয়ে গবেষণা হয়েছে বিস্তর। অনেক গবেষকই চেষ্টা করেছেন কল্পকথার ফাঁদ ছেড়ে রঘু ডাকাতের আসল কাহিনি খুঁজে বের করতে। তবে তা খুঁজে বের করা বেশ শক্ত কাজ। রক্তমাংসের রঘু ঠিক কেমন ছিল, তা জানতে আজও চর্চা চলছে। সেসব নিরিখেই রঘু ডাকাতের জীবনকথা জানার চেষ্টা, অনুসন্ধান। অধিকাংশ গবেষকের মতে, রঘু জন্মেছিলেন প্রায় ২০০-২৫০ বছর আগের কোনো একসময়ে! যে সময়ে বড়ো লোক, জমিদারদের ছেলের বয়স দেখিয়ে গরীবের বয়স মাপা হত। সে সময়ে! অষ্টাদশ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে রঘুর জন্ম। তাঁর ভালো নাম ছিল, রঘু ঘোষ। তবে এই নিয়েও মতোবিরোধ রয়েছে। একাধিক রঘুকে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলেছে।
সেই সময় বাংলার পাশাপাশি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে চলছিল কোম্পানির শাসন। অত্যাচার তখন মানুষের নিত্যসঙ্গী। বাংলার মাঠেঘাটে, খেতখামারে ধান ফলনের দো-ফসলি জমিতে তখন ইংরেজরা জোরপূর্বক নীল চাষের জুলুম চালাচ্ছে। বাধ্য করছে নীলচাষ করতে। একটানা সে নিয়ে অত্যাচার চালাচ্ছে গরিবগুর্বোঁ কৃষকদের ওপর। প্রথমে পাঁচ কাঠা, তারপর দশ কাঠা ক্রমে ক্রমে এভাবেই ফাঁদে ফেলে বাংলার অসহায় কৃষকদের উপরে নীল চাষের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার ফন্দি করেছিল নীলকর দস্যুরা। সে এক মস্ত বড়ো বিরাট চক্রান্ত!
যে সমস্ত কৃষক, কোম্পানির ঠিক করে দেওয়া জমিতে নীল চাষ করতে আপত্তি তুলে গলা ওঠাতো, তাদের পেয়াদা দিয়ে নীলকুঠিতে তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করত। অনেককে সে সময় হত্যাও করা হত। বেদম প্রহার শুধু নয় দুর্বল জায়গায় আঘাত, গৃহ থেকে শিশুদের তুলে নিয়ে গিয়ে মারধোর, নির্মমভাবে অত্যাচার করে পুনরায় বাধ্য করত নীল চাষ করতে। এই নীলকর সাহেব আর তাদের পেয়াদাদের অত্যাচারে একসময় নাভিশ্বাস ওঠে বাংলার সাধারণ বাঙালি কৃষকদের পরিবারগুলোতে। এভাবেই বাংলার চারদিকে ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করে অসন্তোষের আগুন। বিদ্রোহের জন্ম হয়। সে সময় রঘু ঘোষের বাবা ছিলেন এমনই একজন সাধারণ কৃষক। তিনিও নীল চাষ করতে অবাধ্য হলে নীলকরের পেয়াদারা এক রাতে তাঁকে বাড়ি থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিল নীলকুঠিতে। আর পেয়াদার নির্মম প্রহারে অসহায়ভাবে সেই রাতেই মারা যান তার বাবা! অনেকে অবশ্য বলেন, নীলকর সাহেবরা তাঁকে হত্যা করে। নিষ্ঠুর পিতৃহত্যার এই প্রতিশোধ নিতেই তিনি ডাকাতিতে নাম লেখান। বাহুবলের লড়াইয়ে নিজেকে উম্মাদ করে তোলেন।
সেদিন থেকেই পিতার মৃত্যুর বদলা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন রঘু ঘোষ। ক্রমে ক্রমে গ্রামের লাঠিয়ালদের থেকে লাঠিখেলা শিখে অর্জন করেন বাহুবলের বিরাট ক্ষমতা। একসময় লাঠিখেলায় তাঁর অসামান্য দক্ষতা দেখে চমকে উঠতেন সবাই। সেই খেলার লাঠিই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার এক অস্ত্র। শুধু অস্ত্র তুলে নেওয়াই নয়, সেইসঙ্গে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতেও শুরু করেন তিনি। সে সময়কার বিদ্রোহের প্রত্যেক সভা, আলোচনায় উঠে আসে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা।
সেইমতো নিজের হাতেই অস্ত্র তুলে নিয়ে নিজেই এগিয়ে আসেন লড়াই করবেন বলে। তাঁর ডাকে সেদিন অনেক অত্যাচারিত মানুষও সঙ্গী হয়।
দিনে দিনে আরও বহু মানুষকে তিনি সংগঠিত করতে শুরু করেন। এভাবেই একদিন ভিড় বাড়তে শুরু করে রঘুর দলে। ধীরে ধীরে একদিন তিনি গড়ে তোলেন এক মস্ত লাঠিয়াল বাহিনি। রঘুর সেই লাঠিয়াল বাহিনি নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে। সেই শুরু আক্রোশের মুখে পরা। রঘু ঘোষের এই বাহিনির ক্ষমতা আর লোকবল দিন দিন বাড়তে শুরু করে। সেই সুযোগে দলবল নিয়ে নীলকুঠিগুলোতে লুঠপাট চালানো শুরু করে রঘু ঘোষ। তারপর থেকেই জ্বালিয়ে দেন নীলকরদের আস্তানাগুলো। এভাবেই একদিন হঠাৎ করেই রঘু এলাকার অত্যাচারী জমিদার আর সামস্তদের বাড়িঘর লুঠ করতে শুরু করে দেন। দলবল নিয়ে তাঁদের উপর চড়াও হয়ে মারধোরও করেন। সেই ঘটনায় হইহই পরে যায় চারদিকে! সেই সময় যাঁরাই সাধারণ মানুষের সম্পদকে কুক্ষিগত করে রেখেছিল তাঁদের বাড়িতেই হানা দেয় রঘু ঘোষের দল। লুঠপাটের পর সেই সমস্ত বাড়ি থেকে লুঠের জিনিসপত্র নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ভাগ করে দিতেন বাংলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে মধ্যেই।
এভাবেই ধীরে ধীরে রঘু সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন একদিন। তার বহুকাল পরে সে কালের সমাজে রঘু ঘোষ হয়ে উঠেছিলেন একইসঙ্গে প্রতিবাদ আর ন্যায়বিচারের মূর্ত প্রতীক। অন্যদিকে জমিদার আর নীলকরদের কাছে তিনি ছিলেন লুটতরাজকারী এক ভয়ংকর ডাকাত। ঘন ঘন ছদ্মবেশ ধরতে পারতেন তিনি। দক্ষতায় পারতেন বার বার নিজের রূপ বদলাতে। শুধু তাই নয়, আঘাতের জন্য তাঁর নানারকমের বাহিনি ছিল। সেকালের সমাজে মহিলা ও পুরুষের আলাদা আলাদা বাহিনি নিয়ে তিনি ডাকাতি সাম্রাজ্য চালাতেন। নীলকর সাহেবদের আক্রমণে তার পিতাকে খুন হতে হয়েছিল। নির্মম মৃত্যুর সেই ঘটনা একজন সাধারণ মানুষ থেকে রঘু ঘোষকে করে তুলেছিল ইতিহাসের বিখ্যাত ‘রঘু ডাকাত’।
বাল্যকালে কোলের ছেলেদের ভয় দেখানো থেকে শুরু করে, মারদাঙ্গা, হত্যার মতো ঘটনায় কোনো মানুষের উদাহরণের পরিচয়ে ‘রঘু ডাকাত’ নামটা বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সেই কবেকার কাল থেকে। আজও রঘু ডাকাতকে নিয়ে নানা গল্পের খোঁজ পাওয়া যায়। কখনও তিনি গরিবের বন্ধু, আবার কখনও নরবলির বিভীষিকাময় গল্পের এক খলনায়ক যেন-বা তিনি।
এক সময় ব্রিটিশদের তোষণকারী ধনী লোকদের ধরে ধরে তাদের সম্পদ লুঠ করেছেন এই রঘু। আর এই সব লুঠের মাল তিনি বিলিয়ে দিতেন গরিব-দুঃখী কৃষকদের মাঝে, তাদের গ্রামে গ্রামে গিয়ে। এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলার রবীন হুড, গরিবের একমাত্র ত্রাতা।
সে সময় গোটা বাংলার বিভিন্ন জেলায় ডাকাতদের ভয়াবহ উপদ্রব ছিল। ডাকাতদলের সেই ধারাবাহিক অত্যাচারের ফলে বহু গ্রাম উঠে গিয়েছিল সেদিন। ভয়ংকর হত্যাকারী সেইসব ডাকাতের দলকে দূর করতেই সেই সময় ইংরেজ শাসক প্রত্যেক থানা এলাকায় ডাকাত ধরার আলাদা আলাদা দপ্তর তৈরি করেছিল। ডাকাতরায় যেন চোর, ডাকাত ধরার যন্ত্র। শাসক ইংরেজদের এই কৌশলও কাজে আসেনি শেষপর্যন্ত।
এলাকায় পুলিশের প্রভাব বাড়তে শুরু করলে ডাকাত রঘু আর তার ভাই বিধুভূষণ ঘোষ দেবীপুরের পাশে এক গভীর জঙ্গলের গোপন ডেরায় আশ্রয় নেয়। পুলিশের অত্যাচারে শেষপর্যন্ত জঙ্গলের ভেতরেই গ্রাম তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় রঘু ডাকাত। ডাকাতদের প্রতিষ্ঠিত গ্রাম। রঘুর নির্দেশে রাতের অন্ধকারেই গ্রামে নিয়ে আসা হয় পাঁচ ব্রাহ্মণ পরিবারকে। রঘুর তৈরি সেই গ্রামের নাম ছিল নিশিনগর। পরে অবশ্য সেই গ্রামের নাম পালটে যায়। গ্রামের নতুন নাম হয় নিশিরাগড়।
তবে বাংলার এই পরাক্রমশালী ডাকাত রঘুর সঙ্গে দেবী কালীর নাম জুড়ে আছে প্রায় সব গল্পেই। শোনা যায়, ডাকাত রঘু স্বপ্নে দেখেন দেবী কালীকে। রঘু ডাকাতের প্রায় সব গল্পেই মা কালীর এক বিশেষ অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। রঘু ডাকাত নিজেই ছিলেন কালীর একনিষ্ঠ ভক্ত, সাধক। একদিন তিনি পুকুরঘাটের পথ ধরে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন দু’টি পাথরের মূর্তি। একটি ছিল মহাদেবের, অপর পাথরটিকে তিনি চিনতে পারেননি তেমনভাবে। তবে নিশ্চিতভাবে সেটা ছিল কোনো দেবীমূর্তি, তা অনুমান করেন। সেই রাতেই রঘু ডাকাত স্বপ্নে দেখেন, কালীর দেবীমূর্তি তাঁকে আদেশ করছে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার জন্য। কালবিলম্ব না করেই সেই মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন রঘু ঘোষ। কালীপুজোর ভোগ হিসেবে দেবীকে সেদিন উৎসর্গ করা হত রঘুর প্রিয় ল্যাটামাছ পোড়া। শুধু তাই নয়, আরও জানা যায়, তার নিত্যসঙ্গী অমিয় কালীর পুজো করতেন নিয়মিত। সেই মহাভোগ খেয়েই ডাকাতির পথে বেরতেন রঘু ডাকাত।
সেই মাতৃভক্ত ডাকাত রঘুর আদর্শে পশ্চিমবঙ্গের অনেক স্থানেই আজও কালীপুজোর ভোগ হিসেবে ল্যাটামাছ পোড়া খাওয়ানো হয় দেবীকে। কালীর বরেই ক্রমশ পরিচিতি লাভ করেন রঘু। বাংলার বাইরেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে একসময়। রঘু ডাকাত একসময় ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে জমিদারদের কাছে চিঠি পাঠাতেন। আস্ফালনের চিঠি। সেই চিঠি দিয়ে সতর্ক করে ডাকাতি! এমনই ছিল রঘু ডাকাতের সাহস। তবে তার আগে ছদ্মবেশে কেউ সেখানে গিয়ে রেকি করে আসত। বাংলার ডাকাতিতে এই ছদ্মবেশ, রেকি-র জনক ডাকাত রঘুই। তিনিই প্রথম ব্রিটিশদের থানায় কালী পুজো শুরু করেছিলেন। ডাকাতিতে এসব প্রথা রঘুর হাতেই তৈরি। রঘুর বিশ্বাস ছিল দেবী কালীর পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে গেলে কখনও ধরা পড়বেন না তিনি। সেই বিশ্বাসেই কখনও ধরা পড়েননি তিনি! মা-কে জল না খাইয়ে, তিনি কখনও খেতেন না। তাঁর ডাকাতি আদর্শের শিষ্যরাও এই নিয়মই মেনে চলতেন।
বাংলা ও বাংলার বাইরে এই অসীম সাহসী ডাকাতকে নিয়ে নানান গল্পগাথা ছড়িয়ে রয়েছে। পুলিশ নিয়েও এক মজার কাহিনি শোনা যায়। তাঁকে ঘিরে উপদ্রব তখন তুঙ্গে। নৈহাটি থানার বড়োবাবু সেসময় দুর্গাচরণ চক্রবর্তী। দুর্গাচরণের সঙ্গে সুখসাগরের জমিদারের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। ফলে জমিদারের কথায় রঘু ডাকাতকে ধরার একটা মস্ত বড়ো চাপ ছিল তার মাথার ওপর। এদিকে রঘুর তখন কোনো পাত্তা নেই। কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না তাকে। হঠাৎ একদিন বড়োবাবু একটি চিঠি পেলেন। মুক্তাক্ষরে লেখা সে চিঠি। তাতে লেখা, ‘দারোগাবাবু, আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছি। ইতি ডাকাত রঘু ঘোষ’।
দারোগার তো চক্ষু চড়কগাছ। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। সদরে খবর দিয়ে থানার সেপাই বাড়ালেন তিনি। আঁটসাঁট করে ফেললেন সবকিছু। ভয় পেয়ে গেছেন দারোগাবাবু, এবার যে করেই হোক রঘুকে ধরতেই হবে! এসবের মাঝেই একদিন এক জেলে এল দুটো বড়ো রুইমাছ হাতে ঝুলিয়ে। সিপাই গিয়ে দারোগাবাবুকে জানালেন, জমিদারবাবু পাঠিয়েছেন তাকে। সেই সঙ্গে একটা চিঠি। চিঠির ভাষ্য ছিল এই যে, ‘দারোগাবাবু, পৌত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষ্যে আমার পুষ্করিনীতে মাছ ধরেছিলাম। আপনি আসতে পারবেন না জানিয়েছিলেন। তাই দুটি মাছ আপনার জন্য লোক মারফৎ পাঠালাম। লোকটি আমার বিশ্বস্ত প্রজা।’ এমন চিঠি পেয়ে দারোগাবাবু খুশি হয়ে জেলেকে দু-টাকা বকশিস দিয়ে বিদায় করলেন। কিছুদিন পর দারোগার কাছে আরেকটি চিঠি এল। লাল কালিতে লেখা সে চিঠি।
তাতে লেখা, ‘দারোগা বাবু, আপনাকে কথা দিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে আসব। সেদিন দেখা করে এসেছি। মাছ কেমন খেলেন? ইতি সেবক রঘু ডাকাত’!
এভাবেই বার বার পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে, ভাগ্যের অসীম সহযোগিতায় চলতে থাকে রঘুর ডাকাতির সাম্রাজ্য। নিজের নীতিতে অবিচল ছিল রঘু। নারী, শিশুদের পাশাপাশি অসহায় মানুষদের কোনোভাবেই আক্রমণ করত না রঘুর দল। রঘু ডাকাতি করত শুধুমাত্র অত্যাচারী মানুষদের ঘরে। তবে তার নীতি ছিল, ডাকাতি করতে গিয়ে ঘরের মেয়েদের সে রাখত একেবারে নিরাপদে। ডাকাতির শেষে লুঠের মালপত্র ভাগ করে দিত অসহায় মানুষের মাঝে। তাই সেকালের বাংলার অসহায় মানুষের এক তীব্র আবেগ ছিল রঘু ডাকাতের প্রতি। সেই আবেগই ঢাল হয়ে রক্ষা করত রঘু ডাকাতকে।
এতসব ভালোর মাঝেও একটা খারাপ ব্যাপার ছিল রং ডাকাতের। কালীর পুজোর অংশ হিসেবে নরবলি দিতেন তিনি। গভীর রাতে ঢাক, ঢোল বাজিয়ে মানুষ ধরে এনে বলি দিতেন কালীর কাছে। কার্তিকের অমাবস্যার তিথিতে পুজো দেবার জন্য রাস্তা দিয়ে যে-ই যেত তাকেই ধরে এনে বেঁধে রাখা হত মন্দিরের চাতালে। তন্ত্রাচারের কালীপুজোর উপাচার হিসেবেই রঘু ডাকাত নরবলি দিতেন বলে জানা যায়।
লোক-ইতিহাসের পাতায় রঘু ডাকাতের নামডাকে এখনও ভাটা পড়েনি। তাঁকে নিয়ে লেখা হয় গল্প, তাঁর নামে এখনও রাতে ছেলে ঘুমায়, দাপুটে লোকেরা নিজেদের পরিচয় দেয় রঘু ডাকাতের বংশধর হিসেবে। বাংলার এই ভয়ংকর জনপ্রিয় রঘু ডাকাতের বাড়ি ঠিক কোথায় ছিল? এই প্রশ্নের জবাবে ঐতিহাসিকদের একটু বিব্রত হতে হয়। প্রকৃতপক্ষে, যে-সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে-সময় হুগলি, বর্ধমান, নদিয়া, বারাসাত, চব্বিশ পরগণা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ, এমনকি খোদ কলকাতাতেও অসংখ্য ডাকাতের উপদ্রব ছিল। সে সময় বাংলার অন্ধকারময় শাসক ডাকাতদের হাতেই ছিল অর্ধেক বাংলার শাসন। সাধারণ মানুষ তো বটেই, জমিদাররাও এই সব ভয়ঙ্কর ডাকাতদের ভয়ে তটস্থ থাকত।
লোককাহিনি থেকে ছায়াছবিতে রঘু ডাকাত ঘোরে আজও। অন্যদিকে শাসকদের ভয়ে ডাকাত দলেরও স্থায়ী নিবাস নির্ধারণ করা ছিল দুষ্কর সে-সময়। সেই কারণেই রঘু ডাকাতের নিবাস নির্ধারণ করা কঠিন। বহুরূপ ধরা রঘু পালিয়ে বেড়াত সর্বক্ষণ। এক স্থান থেকে আরেক স্থান। আর এভাবেই গোটা বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে রঘু ডাকাতের শক্তি আর জনপ্রিয়তা। প্রকৃতপক্ষে, রঘু ডাকাতকে ঘিরে বাংলায় কল্পকথা এত বেশি ডানা গজিয়েছে যে, তার কিংবদন্তি তাকেই ছাড়িয়ে গেছে। সেই কারণে যেটা তার নয় সেটাও ঘাড়ে এসে পড়েছে কিছুক্ষেত্রে। কলকাতার পূর্ণদাস রোডের কালীমন্দিরের কথাই ধরা যাক। এই মন্দিরে এক ফুট উচ্চতার ছোট্ট একটি কালীমূর্তির পুজো করতেন মনোহর ডাকাত। তবে মনোহর ডাকাতের নামে নয়, এখনও লোক সেটাকে চেনে রঘু ডাকাতের কালীবাড়ি বলে। এরকম অসংখ্য কালীমন্দির রয়েছে বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম আর হুগলি জেলায়। প্রতিষ্ঠাতা অন্য কেউ হলেও লোকে এই মন্দিরগুলোকে চেনে রঘু ডাকাতের কালীমন্দির নামেই। এর মধ্যে কিছু কিছু মন্দির আবার ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। তাই সময়ের হিসেবে সেসব রঘুর হবার যুক্তি মেলে না। কিন্তু এমন হতেই পারে যে, পুলিশের তাড়া খেয়ে সেই সব মন্দিরে হয়তো-বা কখনও রঘু এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
রঘু ডাকাত ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে রবিনহুড। সাধারণ নিরন্ন বাঙালিদের রবিনহুড ছিলেন তিনি। যে গেছেন তাঁর কাছে তাঁকে তিনি ফিরিয়ে দেননি। ধনীর ধনসম্পদ ডাকাতির একটা অংশ বিলিবণ্টন করতেন গরিব মানুষের মধ্যে।
একটা সময়ে এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা, তার মধ্যে ছিল এই মন্দির। ডাকাত দল ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নাকি এখানে পুজো দিয়ে যেত। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই কালীপুজোকে কেন্দ্র করে হাড় হিম করা রহস্যে ঘেরা একাধিক কাহিনি লুকিয়ে রয়েছে।
লোক মুখে শোনা যায়, এক সময়ে ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ডাকাতরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এই দক্ষিণা কালীর মন্দিরের সামনে এসে নরবলি দিত। কেউ কেউ বলেন, এক সময়কার প্রবল প্রতাপশালী রঘু ডাকাত এই কালীমন্দিরে এসে সাধনা করে গিয়েছেন।
হুগলি জেলার পাণ্ডুয়ার সিমলাগড় দক্ষিণা কালীমন্দির ঘিরে এলাকায় নানা জনশ্রুতি রয়েছে। এলাকার প্রবীণরা জানিয়েছেন, লক্ষণ ভট্টাচার্যের পরিবারের আদি পুরুষের আমল থেকেই এই কালীর মন্দিরে পুজো শুরু হয়েছিল। এই মন্দিরে দেবী কালিকা পূজিতা হন দক্ষিণা কালী রূপে। আগে এই এলাকার নাম ছিল হরিহরপুর। পরে সিমলাগড় কালীর নামে এলাকার নাম হয়েছে সিমলাগড়। এখানকার কালীমাতা শ্মশানের কালী, ডাকাত কালী নামেও পরিচিত।
একটা সময় এই গোটা এলাকা গভীর জঙ্গলে ভরা ছিল। ডাকাত দল দাপিয়ে বেড়াত গোটা এলাকায়। এখানকার স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, শেরশাহ জিটি রোড তৈরির আগে থেকে এখানকার কালীপুজো শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ গৃহস্থের পুজো শুরু হয়নি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সেনাবাহিনীর চলাচলের জন্য এই রাস্তার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। সেই সময় থেকে স্থানীয় মানুষজনও নিজেদের ভয় কাটিয়ে মন্দিরে পুজো দেওয়া শুরু করেন। দক্ষিণা কালীর মন্দিরের ওপর মানুষের বিশ্বাস প্রবলভাবে বাড়তে শুরু করে।
এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, ভট্টাচার্য পরিবারেরই সদস্য নটবর ভট্টাচার্য মা কালীর পুজো করতে গিয়ে মন্দিরের সামনে নর-মুণ্ড পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। পুজো না দিয়েই তিনি সেদিন ফিরে গিয়েছিলেন। এর পরে দিন চারেক পুজো বন্ধ ছিল। কথিত রয়েছে, মা কালী স্বয়ং এই নটবরের স্বপ্নে এসেছিলেন। নটবর কালী মায়ের কাছে মন্দিরের এই নরবলি বন্ধের আর্তি জানিয়েছিলেন। এলাকাবাসীদের বিশ্বাস, এর পর থেকে স্বয়ং দেবীর ইচ্ছাতেই এই মন্দিরে নরবলি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন এই মন্দিরে ছাগ বলির প্রথা চালু রয়েছে। কালীপুজোর দিনগুলিতে সিমলাগড়ের এই দক্ষিণা কালীর মন্দিরে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে ভিড় জমান রঘুর নামেই।
বিচিত্র জীবনধর্মে বিশ্বাসী রঘু বরাবরই মানুষের মাঝে থাকতেন মিশে। ফলে তাঁর ছদ্মবেশের ডাকাত রূপ ছাড়া, সাধারণ রঘুকে কেউ তেমন চিনতেন না। তবে একটা সময়ের পর ডাকাতির অন্ধকার সাম্রাজ্যে রঘু বিখ্যাত হয়ে উঠলে নিজের দেহরক্ষীর দল রাখেন। সে কালের ডাকাত দলের মধ্যে গুপ্তচরের দ্বারা হামলা প্রায়শই হত। সে জন্য নিজেকে অনেকটা নিরাপদে রাখতে রঘু তাঁর সিকিউরিটি বাহিনিতে মহিলাদের একটা দল তৈরি করেন। তাঁর হাতেই সে যুগের মহিলাদের এনে ডাকাতিদলের সেনাবাহিনীতে ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল। এবং তাদের আত্মমর্যাদা, সম্মান দেখাশোনার দায়িত্ব সামলাতেন স্বয়ং রঘুই। ডাকাতিয়াদের সাজপোশাক, ছদ্মবেশের সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকতা, নারীবাহিনী, গুপ্তচর, গুপ্তঘাতক, রেকি গোয়েন্দা টিম, আত্মরক্ষার বাহিনী, প্রমাণ লোপাটের ছক এসবই বুদ্ধির খেলায় বাংলার ডাকাতি সাম্রাজ্যে এনে ছিলেন রঘু ডাকাত!
