Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    থ্রিলার পত্রিকা এক পাতা গল্প678 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    স্বদেশ – ঐষিক মজুমদার

    “আঙ্কল, তোমার হেলমেটটা…”

    “আমার হেলমেট?”

    “হ্যাঁ। ওটা… ওটা আমাকে একটু দেবে? খেলা হয়ে গেলেই ফেরত দিয়ে দেব!”

    সর্বনাশ! আর একটু হলেই চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলাম। আমার হেলমেট নিয়ে খেলতে চায়? এ কী খেলার বস্তু?

    কোনোক্রমে বাঁ হাতে সামনের টেবিল ধরে সামলে নিলাম। সেইসঙ্গে, টেবিলে রাখা হেলমেটের ওপর ডান হাতটা রাখলাম। এ-জিনিস হাতছাড়া হলে ঝিলম আর আমাকে হয়তো না খেয়ে থাকতে হবে।

    এবার সামনে দাঁড়ানো চোদ্দো-পনেরো বছরের ছেলেটার দিকে ভালো করে তাকালাম। রোগাটে গড়ন। গায়ের রং হয়তো একসময় শ্যামলা ছিল, এখন রোদে পুড়ে কালো। আমাদের পাশের টেন্টে মাস দুয়েক হল একটা নতুন পরিবার এসেছে। বিশেষ আলাপ না থাকলেও, পদবী শুনেছি রেড্ডি। অর্থাৎ, সাবেক অন্ধ্রপ্রদেশের মানুষ। এ তাদেরই ছেলে। ভাষার পার্থক্য নেই, কারণ ভারতবর্ষের শতকরা পঁচানব্বই ভাগ মানুষই এখন মূল ভাষায় কথা বলে। এটা দু-হাজার সত্তর খ্রিস্টাব্দ। আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে সরকার একাধিক প্রতিবেশি দেশের সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধের আবহে দেশবাসীর একতার প্রয়োজন অনুভব করে। সেই সময় বিভিন্ন উত্তর ভারতীয় ও দক্ষিণ ভারতীয় ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি, কিছুটা আদি সংস্কৃত-ঘেঁষা এই মূল ভাষা চালু হয়। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যে এই ভাষা সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে অবশ্য থেকে যায় ইংরেজিও।

    আর আজ থেকে তিন বছর আগে শুরু হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। আণবিক অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে দ্রুত বদলে যেতে থাকে দেশের ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে মানুষ এসে এরকম উদ্বাস্তু শিবিরে একত্র হওয়ার পরে মূল ভাষার উপযোগিতা পুরোমাত্রায় বোঝা যায়।

    “না বাপু!” ছেলেটাকে মুখের ওপর বলে দিলাম, “হেলমেট দেওয়া যাবে না।”

    সে নিরাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিল, কৌতূহলের বশে পিছু ডাকলাম।

    “অ্যাই, শোনো! হেলমেট কোন্ খেলায় লাগবে, শুনি?”

    “ক্রিকেট।” মুখ ফিরিয়ে সে জানাল।

    “ক্রিকেট?”

    শুনে আমি হতভম্ব। আজ থেকে তিন বছর আগে, আণবিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অবধি, ক্রিকেট ছিল ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বাণিজ্যসফল খেলা। প্রায় এক শতক ধরে দেশের অলিতে-গলিতে এই খেলা চলেছিল। কিন্তু আজ এই উদ্বাস্তু শিবিরে ক্রিকেট? কীভাবে?

    আমাকে অবাক হতে দেখে ছেলেটা বলল, “আমার সঙ্গে এসো, দেখাচ্ছি।”

    আমার কাজের টেবিলটা দরজার সামনাসামনি। গরমের কারণে দিনের বেলা দরজার কাপড়টা তুলে রাখতে হয়। সেজন্যই হয়তো আমার হেলমেট ছেলেটার চোখে পড়েছিল। সে দরজার বাইরে থেকে কথা বলছিল। হেলমেট হাতে ঝুলিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। তার পেছন পেছন যাওয়ার সময় ঘাড় ঘুরিয়ে এক ঝলক তাঁবুর ভেতরটা দেখে নিলাম। ঝিলম একটু আগে স্কুল থেকে ফিরেছে। এখন ক্লান্ত হয়ে এক কোণে ইনফ্লেটোম্যাটের ওপর ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক।

    এই ক্যাম্পটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ভারতবর্ষের একটা প্রধান ক্যাম্প। আগে যেখানে ছোটোনাগপুর মালভূমি ছিল, সেখানে প্রায় একশো বর্গকিলোমিটার জুড়ে এই শিবির রয়েছে। তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহর না থাকায়, এই অঞ্চল শত্রুর আণবিক বোমার লক্ষ্য ছিল না। তাই এখানে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা কম। বিশেষ ধরনের তেজস্ক্রিয়তা প্রতিরোধী ফোর্সফিল্ড বা শক্তিক্ষেত্র দিয়ে ঘিরে অঞ্চলটাকে বসবাসের উপযোগী করে তোলা গেছে। সেই গণ্ডীর ভেতরে থাকলে রেডিয়েশন স্যুট পরতে হয় না।

    এখনও এই ক্যাম্পে উদ্বাস্তু আসা অব্যাহত। আসলে, আমাদের কলকাতা-সহ অনেক মহানগর বছর তিনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সে সময় বেশ কিছু ছোটো শহর, গ্রাম বেঁচে গেছিল। কিন্তু তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বাড়তে থাকায় সেগুলোও ক্রমশ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। তা ছাড়াও, ছোটোখাটো সংঘর্ষ অব্যাহত। তাই পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের জীবিত মানুষ শরণার্থী হয়ে এখানে চলে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এরকম ক্যাম্প আরও গোটা দশেক আছে। সবগুলো শিবিরই সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে।

    আমাদের তাঁবু ক্যাম্পের একেবারে একটা ধারে। ছেলেটার সঙ্গে যেতে যেতে একবার দূরের দিকে তাকালাম। স্বচ্ছ শক্তিক্ষেত্রের ওপাশে তেজস্ক্রিয় এলাকা। অনেক গাছপালা রেডিয়েশনে পুড়েছে, কিছু গাছ মিউটেশনের ফলে অষ্টাবক্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁকা জমির কিছুটা অংশে চাষের কাজ চলছে। দৈত্যাকৃতি সব যন্ত্র; তাদের পাশে মানুষ চাষীদের পুতুলের মতো ছোটো দেখাচ্ছে। ফসলের মধ্যে ধান কম, গম আর মিলেট-ই বেশি। কিছু জমি এখনও চাষযোগ্য নয়। সেখানে কয়েকজন লোক রোবটের সাহায্যে বোরন যৌগ মাটিতে মেশাচ্ছে। তেজস্ক্রিয়তা বাগে আনার চেষ্টা। আনতে পারলে, বিশেষ পদ্ধতিতে ফসল ফলানো হবে। চাষী আর মজুর, দু-দলেরই পরণে রেডিয়েশন স্যুট।

    ফোর্সফিল্ডের ধার ঘেঁষা একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে রীতিমতো অবাক হলাম। এই সঙ্গীন পরিস্থিতিতেও এই ছেলের বয়েসী কয়েকটা ছেলে মিলে সেখানে সত্যিই ক্রিকেট খেলার আয়োজন করেছে। ফেলে দেওয়া ধাতুর পাত থেকে ব্যাট-প্যাড-উইকেট তৈরি হয়েছে। বল হিসেবে আছে ফোর্সফিল্ডের টাওয়ার থেকে আসা বাতিল গ্রাফাইটের গোলা। সেই গোলা মোক্ষম শক্ত। সেই কারণেই ছেলেটা আমার হেলমেটের দিকে নজর দিয়েছে।

    মানুষ পারেও বটে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে এলাম।

    টেন্টে ফিরে এসে কাজের তোড়জোড় শুরু করলাম। সকালে বিশেষ কাজকর্ম জোটেনি। সন্ধ্যায় কপালে কী আছে দেখা যাক।

    টেবিলে বসে সবে মাথায় হেলমেট চাপাতে যাব, ঝিলমের ঘুম ভাঙল। প্রকাণ্ড একটা হাই তুলে সে উঠে বসল।

    “খিদে পেয়েছে, পাপা।”

    “খেয়ে নাও, মা। ওই কোণায় খাবার ঢাকা দেওয়া আছে।”

    খাবার বলতে মিলেটের আটার শুকনো ব্রেড। মেয়ের জন্য সামান্য জ্যাম অতি কষ্টে জোগাড় করেছি। আসলে, সেনাবাহিনীর নজরদারিতে যেটুকু খাবার আর পানীয় জল রেশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তার বাইরে কিছু জোটানো খুব কঠিন। অবশ্য, বাহিনীর নজরদারি আছে বলেই ক্যাম্পে বিশৃঙ্খলা বা অপরাধ শূন্যের কোঠায়। হাতে গোনা মানুষ-সৈনিকের পাশাপাশি, রাস্তাঘাটে ক্যাম্পের হেডকোয়ার্টার থেকে পাঠানো এ-আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট চব্বিশ ঘণ্টা টহল দিচ্ছে। খাবার আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের গুদাম তারাই পাহারা দেয়। পুরোনো সিনেমার অনুকরণে কোনোকালে কেউ এদের নাম রেখেছিল রোবোকপ এখনও সেই নামই চালু আছে। এ ছাড়া, ড্রোন ক্যামেরাও রয়েছে। সৈন্যবাহিনী না থাকলে এখানে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে টিকে থাকতে পারত।

    “মাম্মাম থাকলে এই সময় লুচি ভেজে দিত।” রুটি চিবোতে চিবোতে ঝিলম হঠাৎ করেই বলে বসল।

    আমি হেলমেট পরে সবেমাত্র টেবিলে রাখা টাচপ্যাডে হাত দিয়েছিলাম। মেয়ের কথা শুনে চমকে উঠে আড়চোখে তার দিকে তাকালাম।

    নাঃ, অনুযোগ নয়। নিছক বিবৃতি। খাওয়া শেষ করে ঝিলম জলের বোতলের দিকে হাত বাড়িয়েছে। মেয়ের আমার মোটে বারো বছর বয়েস। কিন্তু শেষের এই তিন বছরে সে যেন আচমকা অনেকটাই বড়ো হয়ে গেছে। জানে, অনুযোগ করে কোনো লাভ নেই। মাম্মান আর ফিরবে না।

    আসলে আজ থেকে তিন বছর আগে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের আণবিক ক্ষেপণাস্ত্রে যখন কলকাতা ধ্বংস হয়ে যায়, সেই সময় আমি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অনির্বাণ রায়, বউ-মেয়েকে নিয়ে অনেক দূরে আমাদের উত্তর শহরতলির ফ্ল্যাটে ছিলাম। বিস্ফোরণের তাপপ্রবাহ বা তেজস্ক্রিয়তা তৎক্ষণাৎ অতটা দূরে না পৌঁছলেও, তীব্র ভূকম্পে সেখানকার বাড়িঘর ধ্বসে পড়ে। আমি আর মেয়ে বরাতজোরে বেঁচে যাই। তবে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আমার স্ত্রী তৃষার মৃত্যু হয়। তারপর বিভিন্ন ঘাটের জল খেয়ে বাপ-মেয়ে এই ক্যাম্পে এসে থিতু হয়েছি। আত্মীয়স্বজন, যতদূর জানি, কেউ জীবিত নেই।

    ঝিলম একটা বই টেনে নিয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমিও কাজে মন দিলাম। আমি ইঞ্জিনিয়ার ছিলাম। তাই পেশাগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আমাকে দূরনিয়ন্ত্রিত কাজে বহাল করা হয়েছে, চাষী বা মজুরের মতো শারীরিক পরিশ্রমের কাজে নয়। কাজ পিছু পারিশ্রমিক আমার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে যথাসময়ে জমা পড়ে।

    টাচ প্যাড অন করার কিছুক্ষণের মধ্যেই লাগোয়া স্ক্রিনে অর্পিতা দাসের মুখ ভেসে উঠল। এ আমাদের ক্যাম্পের রিমোট জব কো-অর্ডিনেটর বা দূরনিয়ন্ত্রিত কর্ম সঞ্চালক। মহিলার বয়েস আমার মতই, অর্থাৎ চল্লিশের কাছাকাছি। দারুণ সুন্দরী না হলেও, চেহারার একটা আলগা চটক আছে। আমাকে দেখেই সে চোখ নাচিয়ে হাসল।

    আদুরে ঘনিষ্ঠতার সুরে জিজ্ঞেস করল, “কী খবর, অনির্বাণ?”

    এই এক মুশকিল। এই মহিলা একটু পুরুষ-ঘেঁষা। আমি বিপত্নীক জানার পর থেকে আমার প্রতি একটু বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। গায়ে পড়েই জানিয়েছে, তার কোনো ছেলেমেয়ে নেই। স্বামী অবাঙালি, নাম ই ভি প্রসন্ন। কাজের সূত্রে বিভিন্ন ক্যাম্পে যাতায়াত করতে হয় বলে লোকটা প্রায়ই বাইরে থাকে। সেই সুযোগে অর্পিতা কয়েকবার আমাকে তার টেন্টে কফি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমি ‘অনেক দূর’ বা ‘যাব একদিন’ বলে কৌশলে এড়িয়ে গেছি।

    “আমার আর খবর কোথায়?” আপাতত বিরক্তি গোপন করে বললাম, “কাজের খবর তো সব তোমার কাছেই!”

    “খালি কাজ আর কাজ!” অর্পিতা ফের সুর করে বলল, “কাজ ছাড়া কী কথা নেই?”

    “থাকতে পারে, কিন্তু এখন কাজই চাইছি।” কাঠ-কাঠ গলায় বললাম, “মেয়েটার জন্য কিছু টাকা জমাতে হবে তো!”

    সম্ভবত আমার চোখমুখ দেখেই, অর্পিতা আমাকে আর ঘাঁটাল না। ঘাড় ঘুরিয়ে সে পাশের বিরাট মনিটরে চোখ রাখল।

    “সুনামির ঢেউয়ে পুরীর উপকূলের ক্ষতি হয়েছে। বোল্ডার ফেলতে হবে। করবে? কিংবা, মেটিয়াপাল্লম রিফিউজি ক্যাম্প থেকে বান্ধবগড় রিফিউজি ক্যাম্প অবধি রাস্তা তৈরির কাজ?”

    আসলে, উন্মুক্ত অঞ্চলে এই মুহূর্তে তাপমাত্রা আর তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ এত বেশি যে, সেখানে প্রতিরোধী স্যুট পরেও কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে একটানা দেড়-দু-ঘণ্টার বেশি কাজ করা সম্ভব নয়। এদিকে, পুনর্গঠনের কাজ সর্বক্ষণ চালিয়ে যাওয়াটাও জরুরি। অতএব, সেই কাজগুলো যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড়োজোর একটা নির্দিষ্ট স্তর অবধি কাজ চালাতে পারে। তাই যন্ত্রগুলোর ওপর মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হয়। সেজন্যই এই দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। আমার মতো প্রযুক্তিবিদদেরই সাধারণত এমন কাজে লাগানো হয়।

    কিন্তু এই দুটো কাজের কথা শুনে আমি ঘাড় নাড়লাম।

    “উঁহু। দু-টোই মোটাদাগের কাজ, পয়সাও কম। ভালো কিছু হাতে নেই? একটু সুক্ষ্ম ধরনের কোনো কাজ?”

    “হুঁ-উ-উ, তোমার জন্য ভালো কাজ তো খুজতেই হবে।” বলে অর্পিতা আবার মনিটরের দিকে তাকাল, “উমম… কোণারক মন্দির পুনর্নিমান… ওই যাঃ, একটাই ভ্যাকান্সি ছিল, ভাবনগর ক্যাম্প নিয়ে নিল। তাহলে…. তাহলে… আচ্ছা, এইটা কেমন? মেকানোবোট চালিয়ে ভাইজাগের সমুদ্রে অয়েল রিগ মেরামতির কাজ?”

    “একটু হয়তো পদের। কিন্তু অর্পিতা….” এবারে একটু উষ্মা প্রকাশ করে ফেললাম, “কাজের মতো কাজ সত্যিই কী নেই? না কী আছে, কিন্তু আমাকে দিতে চাইছ না?”

    “একটা বেশি মাইনের কাজ আছে।” অর্পিতা স্বীকার করতে বাধ্য হল, “এই জবটার জন্য আর্মি সিভিলিয়ান চাইছে। ওদের এক্সপার্টরা সবাই কাজে নেমে পড়েছে, তারপরেও প্রচুর চাহিদা। লে-সহ সমস্ত ক্যাম্প থেকে যত বেশি সম্ভব অভিজ্ঞ লোক চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু এ কাজ তোমাকে দেব কী করে?”

    “কোন কাজ?”

    “চাইনিজ মিসাইলের আঘাতে প্যাংগং লেকের আকাশে ভাসমান সৌরশক্তি উৎপাদন ও যোগাযোগ কেন্দ্রের বড়ো ক্ষতি হয়েছে। অনেক লোক আটকা পড়েছে। অন্তত শ-পাঁচেক রেসকিউ ড্রোন পাঠিয়ে জোরকদমে উদ্ধারের কাজ চলছে, আরও বেশ কিছু পাঠাতে হবে।”

    আমি নড়েচড়ে বসলাম।

    “চমৎকার! এ কাজটা আমাকে দিতে অসুবিধা কোথায়?”

    “তুমি ডাঙায় আর জলে নানারকম যন্ত্র চালিয়েছ, অনির্বাণ। কিন্তু তোমার ড্রোন ওড়ানোর অভিজ্ঞতা কতটুকু?”

    “উড়িয়েছি তো!” মরিয়া হয়ে বললাম, “একবার নর্থ-ইস্টের তাওয়াং ক্যাম্পে ধ্বস নামার পর ড্রোন নিয়ে ত্রাণ সরবরাহ করেছিলাম, মনে নেই?”

    “মনে আছে, অনির্বাণ। কিন্তু সেই একবারই।” অর্পিতার গলা কিছুটা ক্লান্ত শোনাল, “আর ড্রোন রেসকিউ একটা স্পেশালাইজড মিশন। উড়ন্ত ড্রোন থেকে রিলিফ মেটেরিয়াল ফেলা এক জিনিস, আর জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা আর এক জিনিস—এটা তো মানবে? এক্সপেরিয়েন্স না থাকলে মিলিটারি অপারেশনে তোমাকে পাঠাই কী করে, বলো?”

    “সে কথা অবশ্য ঠিক।” আমি একটু মুষড়ে পড়লাম।

    “কী জব দেব, ঝটপট বলে ফেলো!” অর্পিতা তাড়া লাগাল।

    “ভাইজাগের অয়েল রিগ-এর কাজটাই দাও তাহলে।” হেলমেটের ভাইজর চোখের ওপর নামাতে নামাতে আমি বললাম।

    এর পরে মিনিট দশেক কেটে গেছে। আমি সমুদ্রের ঢেউয়ে দোল খাচ্ছি।

    আমি বলতে অবশ্য আমার যান্ত্রিক অবতার, মোনোবোট। রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে আমাকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর সেন্সরের সাহায্যে আমি দেখতে পাচ্ছি, চারপাশের পরিবেশও অনুভব করতে পারছি। আমার মনই এই যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

    আর সমুদ্রের ঢেউয়ে ‘দোল খাচ্ছি’, এ কথা বলাও বোধহয় ঠিক নয়। পরিবেশের পরিবর্তন হওয়ায় ইদানীং ঘন-ঘন সাইক্লোন আর হারিকেন হচ্ছে; সাধারণ অবস্থাতেও হাওয়ার বেগ যথেষ্ট বেশি। উপকূল থেকে খুব একটা দুরে না হলেও, সমুদ্র এখানে রীতিমতো উত্তাল। এক একবারে প্রায় পনেরো ফিট ওপরে উঠে যাচ্ছি, আবার ঠিক ততটাই পড়ছি। তার ওপর জলের ঝাপটায় সেন্সর ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, বারবার ওয়াইপার চালাতে হচ্ছে। আমাদের মেকানোবোট টিমের চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে কথা হয়েছে। ভদ্রলোকের নাম লালরেমসাঙ্গা, বোধহয় উত্তর-পূর্বের মানুষ। তিনি আমাকে রিগের নীচের বড়ো একটা পিলার মেরামত করার দায়িত্ব দিয়েছেন। ক্রমাগত ঝড়-ঝঞ্ঝায় এইসব পিলারের জয়েন্টগুলো ঢিলে হয়ে গেছে। এখন আমি বোটের সামনের দুটো রোবো আর্মের সাহায্যে সেরকম একটা জয়েন্টে নতুন স্ক্রু পরিয়ে টাইট করার চেষ্টা করছি। কিন্তু বোটের এই লাগাতার ওঠাপড়ায় সেই কাজে যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছে।

    এবারে একটা ফন্দি বার করলাম। ঢেউয়ের মাথায় উঠে জয়েন্ট অবধি পৌঁছোনোমাত্র একটা রোবো আর্ম দিয়ে পিলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলাম। এবার জল উঠুক আর নামুক, মেকানোবোট এই উচ্চতাতেই ঝুলন্ত অবস্থায় থাকবে। এখন অন্য আর্মটার সাহায্যে কায়দা করে জয়েন্টে স্কু ঢুকিয়ে….

    হঠাৎ, আমাকে সম্পূর্ণ বেকুব বানিয়ে দিয়ে, চোখের সামনের দৃশ্যপট বেমালুম বদলে গেল!

    এই মুহূর্তে আমি শূন্যে ভাসমান। অনেকটা নীচে একটা পাহাড়ি উপত্যকা চোখে পড়ছে। এককালে সেই উপত্যকা হয়তো সবুজ ছিল, কিন্তু এখন তার জায়গায় জায়গায় পোড়া কালো ছোপ।

    হতভম্ব হয়ে ব্যাপারটা কী হল ভাবছি, এমন সময় হেলমেটের কমিউনিকেটার অর্পিতার গলা ভেসে এল।

    “অভিনন্দন, অনির্বাণ। শেষ পর্যন্ত তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হল। তোমাকে একটা ড্রোন রেসকিউ মিশনে পাঠানো হচ্ছে।”

    কথাটা শুনেই একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করলাম। তবে সেটা প্রকাশ করলাম না।

    মুখে বললাম, “তাহলে কী এটা একটা উড়ন্ত ড্রোন? আমি কী প্যাংগং লেকের কাছাকাছি আছি?”

    “হ্যাঁ, ড্রোন। তবে, প্যাংগং নয়। এটা দकসুন।”

    আমি আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়লাম।

    “দকসুম? সেটা আবার কোন জায়গা?”

    “কাশ্মীরেরই একটা উপত্যকা। সাবেক শ্রীনগর থেকে একশো কিলোমিটার দূরে।” অর্পিতা জানাল, “নিশ্চয়ই জানো, ডাল লেকে অ্যান্টিম্যাটার বিস্ফোরণের পরে কাশ্মীরের বায়ুসেনা ছাউনি এখন অনন্তনাগে। এ জায়গাটা তার কাছেই। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার। স্থানীয় মানুষের কয়েকজন হয়তো কোনোক্রমে বেঁচেবর্তে আছে।”

    “অঃ। তা প্যাংগং-এর বদলে আমি এখানে কেন?”

    একটু ইতস্তত করে অর্পিতা এই প্রশ্নের জবাব দিল।

    “আসলে, বায়ুসেনার কাছ থেকে হঠাৎ এই ড্রোন রেসকিউ মিশনের অনুরোধ আসে। এখানে একটা দুর্গম জায়গায় মাটিতে একজন আহত লোক পড়ে আছে, তাকে জীবিত উদ্ধার করাটা খুব জরুরি। এদিকে, মিলিটারি ছাড়াও, সব ক্যাম্পের সিভিলিয়ান ড্রোন রেসকিউ এক্সপার্টরা প্যাংগং-এ কাজ করছে। অগত্যা আমি তোমাকেই মেকানোবোট থেকে সরিয়ে এনে এই ড্রোনে…”

    বুঝেছি। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ইঞ্জিনিয়ার হলেও, একসময় বাংলা সাহিত্য আমার প্রিয় বিষয় ছিল। সময় পেলেই আর্কাইভ থেকে বিগত দিনের বইপত্র ঘাঁটতাম। এখন নিজের অবস্থা দেখে একটা পুরোনো প্রবচন মনে পড়ে যাচ্ছে।

    — ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো!

    মনের ভাব মনেই চেপে রেখে জানতে চাইলাম, “লোকটা আছে কোথায়?”

    “সঠিক জায়গাটার কোঅর্ডিনেট তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।” অর্পিতা বলল, “কিন্তু ওখানে পৌঁছোনো, লোকটাকে উদ্ধার করা এবং ওখান থেকে বেরিয়ে আসা, পুরোটা কিন্তু তোমায় নিজেকেই করতে হবে। ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্স দিতে পারব না।”

    “কেন?”

    “ওখানে না কী একটা আর্মি সাপ্লাই ড্রোন দুর্ঘটনায় পড়েছে, অনন্তনাগ যাওয়ার পথে। তারপর থেকেই সিগন্যালিং-এর গণ্ডগোল হচ্ছে।”

    “আচ্ছা, বেশ। কোঅর্ডিনেট পাঠাও, যাচ্ছি।” হঠাৎ করে মেকানোবোট ছেড়ে ড্রোনে এসে পড়ায় প্রথমে একটু অসুবিধা হচ্ছিল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সড়গড় হয়ে গেল। মাটি থেকে দুশো মিটার উঁচুতে উড়ে অর্পিতার পাঠানো কোঅর্ডিনেটে পৌঁছতে সময় লাগল মিনিট তিনেক। এবার আহত লোকটাকে খুঁজে বার করার পালা।

    ড্রোনের উচ্চতা পঞ্চাশ মিটারে নামিয়ে আনলাম। তারপর চক্কর দেওয়া শুরু করলাম। নীচের উপত্যকায় কোনো জীবিত প্রাণীর দেখা নেই। তবে সেখানে আমার ছায়া পড়েছে। চৌকো ছায়া। ওপরে ঘূর্ণায়মান চারটে রোটেটর ব্লেডের আলাদা ছায়া।

    ওই তো! একটা উঁচু টিলার ওপরে লোকটা এলিয়ে পড়ে আছে। পরণে একটা জোড়াতালি দেওয়া আদ্যিকালের রেডিয়েশন স্যুট। বেঁচে আছে তো?

    আরও বিশ মিটার নেমে এসে ড্রোনের সাউন্ড অ্যামপ্লিফায়ার চালু করলাম।

    যাক, বেঁচে আছে! ওর হার্টের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনে হয়, কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। কী কারণ?

    একটু এদিক-ওদিক তাকাতেই একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল।

    একটা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ। পাথরের আড়ালে থাকায় প্রথমে দেখতে পাইনি। এটাই তাহলে বায়ুসেনার ঘাঁটিতে জিনিসপত্র সরবরাহের সেই ড্রোন। কিন্তু…

    কিন্তু ওটার গায়ে একটা দড়ির ফাঁস কেন? আর সেই ফাঁসের লাগোয়া লম্বা দড়ির শেষ প্রান্ত মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার হাতের কাছে কেন? লোকটা কী পুরোনো দিনের কায়দায় ল্যাসো বা দড়ির ফাঁস ছুঁড়ে ড্রোন নামাতে চেয়েছিল?

    এবার পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার। মিলিটারির সাপ্লাই ড্রোনে অস্ত্র না থাকলেও, প্রতিরক্ষার কোনো ব্যবস্থা অবশ্যই ছিল। ড্রোন নামাতে গিয়ে নির্ঘাৎ সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ছোবলেই বাছাধন কাবু হয়েছে।

    সে যা-ই হোক, এখন আমাকে আসল কাজটা করতে হবে। লোকটাকে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে।

    ড্রোন সাবধানে আরও নীচে নামালাম। লোকটার থেকে আমি এখন ঠিক দেড় মিটার উঁচুতে। ওর স্যুটের হেলমেটের ভাইজর প্রায় স্বচ্ছ। তার মধ্য দিয়ে এবার ওর মুখ দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত স্থানীয় বাসিন্দা। ক্ষয়াটে ফর্সা মুখে তীক্ষ্ণ নাক, গোঁফ-দাড়ির জঙ্গল। চোখের পাতা বোজা। বয়েস মনে হয় বছর চল্লিশ হবে।

    এই অবস্থানে ড্রোন স্থির রেখে রোবো আর্মের সাহায্যে লোকটাকে অক্ষত অবস্থায় তোলাটাই চ্যালেঞ্জ। তা হোক। আজকে সবাই দেখতে পাবে, অনির্বাণ রায় কী করতে পারে!

    দুটো রোবো আর্ম-কে তিন ফিট দূরত্বে রেখে লোকটার শরীরের দু-দিক দিয়ে মাটিতে ঠেকালাম। এবার সন্তর্পণে, জমির দু-ইঞ্চি নীচ দিয়ে দুটো আর্ম লোকটার শরীরের নীচে এনে একটা দোলনার মতো তৈরি করলাম। একটা আম ঘাড়ের নীচে রেখেছি, কারণ ঘাড়ের মেরুদণ্ডে চোট থাকতে পারে। আশা করি, আমার কাজে ওর ওই রদ্দি রেডিয়েশন স্যুটের কোনো ক্ষতি হয়নি। ড্রোনের সেন্সরে এই অঞ্চলের রেডিয়েশন কোএফিশিয়েন্ট যা দেখাচ্ছে, তাতে স্যুটের ক্ষতি হলে বেচারা ক্যান্সার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরবে।

    এবার নিজেকে ওপরে তুলতেই, কিছুটা ধুলোবালি-সহ লোকটার শরীর আমার তৈরি ওই দোলনায় চেপে শূন্যে উঠল। আর ঠিক তখনই, নড়াচড়ার জন্য হোক বা রোটেটর ব্লেডের হাওয়ার ঝাপটায়, লোকটার জ্ঞান ফিরে এল। ও ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল।

    তাকিয়েই কিন্তু আঁতকে উঠল। ডান হাতটা রেডিয়েশন স্যুটের কোমরের কাছে নিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল। সম্ভবত কোনো অস্ত্র। তবে পারল না। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল। বোধহয় ডান হাতে চোট লেগেছে।

    ওর আঁতকে ওঠার যথেষ্ট কারণ আছে। চোখ মেলেই যদি কেউ দেখতে পায়, মুখের ঠিক সামনে একটা কদাকার ড্রোন, গায়ে লাল-লাল সেন্সর জ্বলজ্বল করছে…

    ওকে আশ্বস্ত করার জন্য ঝটপট ড্রোনের মাইক্রোফোন অন করলাম।

    “তিষ্ঠ, বৎস!” মূল ভাষায় বললাম, “আমি মানুষ, তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি।”

    মনে হল, ও আমার কথা পুরোপুরি বুঝতে পারল না। তবে গলার স্বর শুনে কিছুটা শান্ত হল। হয়তো বুঝেছে, আমি ওর ভালোই চাই।

    সেই সুযোগে আমি প্রশ্ন করলাম, “তোমার নাম কী?”

    এবার মনে হয় বুঝতে পেরেছে, কারণ রেডিয়েশন স্যুটের মাইক্রোফোন থেকে ক্ষীণ স্বরে উত্তর এল।

    “ইউসুফ।”

    হুম, কাশ্মীরেরই লোক। জানা দরকার, কোথা থেকে এসেছে। সেই আস্তানা যদি নিরাপদ হয়, আর সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে ওকে সেখানে ছেড়ে আসাই যথেষ্ট।

    “ইউসুফ, তোমার সঙ্গে কেউ ছিল কী?” আমি জানতে চাইলাম।

    “না।” অতি কষ্টে ও মাথা নাড়ল, “আমি… আমি একাই এসেছিলাম।”

    এতক্ষণ ধরতে পেরেছি, ও কাশ্মীরী ভাষায় কথা বলছে। তবে সাবেক হিন্দি আর আমার মূল ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায়, কথোপকথন কোনোমতে চলে যাচ্ছে।

    “তোমার আঘাত খুব গুরুতর নয় তো? নিজের আস্তানায় ফিরতে চাও?”

    “হ্যাঁ।”

    “বেশ। সেটা কোনদিকে, আমাকে দেখাতে পারবে?”

    ইউসুফ ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে নীচের জমির দিকে তাকাল। তারপর বাঁ হাত তুলে একটা দিক দেখিয়ে দিল। আমি সেদিকে উড়ে চললাম। গতিবেগ খুব একটা বাড়ানোর সাহস হল না।

    যেতে যেতে প্রশ্ন করলাম, “তোমাদের আস্তানায় কজন পেলাম। লোক আছে?”

    “তিনজন।”

    “মাত্র তিনজন?” কথাটা শুনে আমি অবাক হলাম।

    “হ্যাঁ। আমি, আমার বুড়ি মা আর আয়েষা।”

    “মা তো বুঝলাম, আয়েষাটা কে? তোমার বউ?”

    “না, বিবি মারা গেছে। আয়েষা আমার মেয়ে। তেরো বছর বয়েস।”

    “ওঃ!” বলে, একটু চুপ করে থেকে, প্রশ্ন করলাম, “কিন্তু তোমাদের পাড়া-প্রতিবেশি? তারা কেউ নেই?”

    “ছিল। সবাই লে ক্যাম্পে চলে গেছে।”

    “তাহলে তোমরা যাওনি কেন?” আমি হতভম্ব, “মাত্র তিনটে মানুষ এই পরিস্থিতিতে টিকে আছোই বা কী করে?”

    এবারে ইউসুফ গড়গড় করে অনেক কথা বলে গেল। যেটুকু ধরতে পারলাম, তার সারমর্ম এরকম। বারংবার শত্রুর আক্রমণে বিধ্বস্ত দকসুম বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়লে সেনাবাহিনী জীবিত অধিবাসীদের এখান থেকে সরিয়ে নেয়। তবে তার জন্য সকলকে কাছের সিনথান টপ অবধি পায়ে হেঁটে পৌঁছতে হয়। সেখানে ছাড়া আর কোথাও এয়ারফোর্সের উদ্ধারকারী যান নামাতে পারছিল না। কিন্তু ইউসুফের বউ তিন বছর আগে যে মিসাইল অ্যাটাকে মারা যায়, তাতেই আয়েশা সারাজীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যায়। তাকে আর বৃদ্ধা, অথর্ব মা-কে নিয়ে ইউসুফের পক্ষে সেখানে পৌঁছোনো সম্ভব ছিল না। তারা একটা অ্যান্টি-নিউক্লিয়ার বাংকারে আশ্রয় নেয়। সারা উপত্যকায় হাতে গোনা এরকম কয়েকজন মানুষ রয়ে গেছে। মাসে একবার সিনথান টপ-এ আর্মি ত্রাণসামগ্রী ফেলে যায়, সেটুকুই এদের ভরসা। কিন্তু এ মাসে ত্রাণ আসেনি, ফলে সকলে অনাহারে রয়েছে।

    শুনে খুব খারাপ লাগছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা কথা মনে হল।

    “ত্রাণ আসেনি বলেই কী তুমি ওই টিলার ওপর উঠে দড়ির ফাঁস দিয়ে এয়ারফোর্সের সাপ্লাই ড্রোন নামাতে গেছিলে?”

    “হ্যাঁ। নামিয়েও ফেলেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা ঝটকা লেগে ছিটকে পড়লাম। আর কিছু মনে নেই। তারপর তুমি এলে।”

    এর উত্তরে আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই কানের কাছে একটা মেয়েলি গলা শুনতে পেলাম।

    “অভিনন্দন, অনির্বাণ!”

    এ আবার কী? ওহো, অর্পিতা! এতক্ষণে সংযোগ ফিরেছে।

    “দারুণ কাজ করেছ! এর পর ড্রোন রেসকিউ-তেও তোমাকে পাঠানো যাবে।” উৎফুল্ল সুরে সে বলল, “এবার আর একটা কো-অর্ডিনেট পাঠাচ্ছি, সেখানে লোকটাকে পৌঁছে দিলেই তোমার কাজ শেষ।”

    প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ড্রোনের রিসিভারে নতুন কো-অর্ডিনেট এসে পৌঁছল। কিন্তু সেই কো-অর্ডিনেট খতিয়ে দেখে আমি ধন্দে পড়লাম। এ তো ইউসুফের দেখানো পথের ঠিক উলটো দিক!

    “তুমি সিওর তো, অর্পিতা?” আমি কমিউনিকেটরে বললাম, “কারণ ইউসুফ, মানে, যাকে উদ্ধার করলাম আর কী, এর উলটো দিকে যেতে বলছে!”

    কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর আবার অর্পিতার গলা শোনা গেল।

    “আসলে, সেনা কর্তাদের ধারণা, যেহেতু আমি ড্রোন অ্যাটাক করেছিল, সেহেতু লোকটা পাকিস্তানের চর অথবা উগ্রপন্থী হতে পারে। আমার কাছে এয়ার ভাইস মার্শাল সাদিয়া কুরেশি-র নির্দেশ এসেছে, ওকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনন্তনাগের এয়ারফোর্স বেস-এ নিয়ে যেতে হবে। এই কো-অর্ডিনেট ওখানকারই।”

    সর্বনাশ! পাকিস্তানের চর অথবা উগ্রপন্থী? শুধু আমাদের দেশ কেন, গোটা দুনিয়াটাই এখন ধ্বংস হতে বসেছে। তা সত্ত্বেও এদের দৌরাত্ম্য কমেনি? ঘৃণাভরে একবার ইউসুফের দিকে তাকিয়ে আমি নতুন পথে রওনা দিলাম।

    কিন্তু ঠিক তখনই ইউসুফ ছটফট করে উঠল।

    “ওদিকে… ওদিকে যাচ্ছ কেন? কোথায় যাচ্ছ?”

    “অনন্তনাগে। এয়ারফোর্সের ঘাঁটিতে।” শুকনো গলায় বললাম।

    “না না!” ও শিউরে উঠল, “ওদের জিনিস চুরি করতে গেছিলাম। হাতে পেলেই ওরা আমাকে জেলে ভরবে।”

    “ভরুক! তুমি পাকিস্তানের স্পাই না টেররিস্ট, সেটা যাচাই হওয়া দরকার।”

    ইউসুফ আকুল হয়ে বলল, “আমি স্পাই বা টেররিস্ট নই, বিশ্বাস করো! আমাদের খাবার ছিল না বলেই….”

    আমি কোনো জবাব দিলাম না। রোবো আম দিয়ে শক্ত করে ওকে চেপে ধরে এগতে লাগলাম। উগ্রপন্থীকে কিছুমাত্র বিশ্বাস নেই। বৃদ্ধা মা, আয়েষা, পুরোটাই হয়তো একটা ধোঁকার টাটি! আষাঢ়ে গল্পো ফেঁদে আমাকে ভুলিয়ে নিজের ডেরায় ফিরবার মতলব।

    ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা বৃথা, এটা বুঝতে পেরেই বোধহয় ইউসুফ আর ধ্বস্তাধ্বস্তি করছিল না। কিন্তু মিনিটখানেক পরে হঠাৎ করেই একটা ফোঁপানোর আওয়াজ শুনতে পেলাম। চমকে উঠে ওর দিকে তাকালাম।

    ইউসুফের চোখে জল। ও বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে। সাউন্ড অ্যামপ্লিফায়ার দিয়ে শোনা যাবে কী?

    “মেয়েটা… মেয়েটা দু-দিন না খেয়ে আছে! দুপুরবেলা বলছিল-আব্বু… আব্বু, খুব খিদে পেয়েছে…”

    আমি মাঝ-আকাশে থমকে দাঁড়ালাম। এই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত জানি, কীভাবে জানি বলতে পারব না, ইউসুফ গুপ্তচর বা সন্ত্রাসবাদী নয়!

    আমার মতই, ও একজন সাধারণ নাগরিক। আমার মতই, একজন বাবা।

    ড্রোনের মুখ ফিরিয়ে আমি ইউসুফের দেখানো পথে ফিরে চললাম। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ও আরও একবার নড়েচড়ে উঠল। তবে মুখে কিছু বলল না।

    আমি গতি বাড়ালাম। মন বলছে, বাধা আসতে দেরি নেই।

    আমার অনুমান অভ্রান্ত। একটু পরেই কমিউনিকেটরে অর্পিতার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম।

    “কোথায় যাচ্ছ তুমি, অনির্বাণ? এক্ষুনি মুখ ফেরাও!”

    “অসম্ভব!” আমি শক্ত গলায় বললাম, “ইউসুফকে ওর মেয়ের কাছে ফিরিয়ে দিতেই হবে!”

    “তুমি… তুমি এ কাজ করতে পারো না!” অর্পিতার গলায় এবার আতঙ্ক, “বাহিনীর আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার অধিকার কারুর নেই!”

    উত্তর না দিয়ে আমি ইউসুফের দিকে তাকালাম।

    “আর কত দূর, ইউসুফ?”

    “তুমি যেভাবে যাচ্ছ, তাতে বেশিক্ষণ লাগবে না।” ও বলল, “বড়োজোর পাঁচ মিনিট।”

    পাঁচ মিনিট? এয়ারফোর্সের পক্ষে তা অনেক সময়। দাঁতে দাঁত চেপে আমি ড্রোনের গতি আরও বাড়ালাম।

    “থামো, অনির্বাণ। ভাইস মার্শাল তোমাকে ফিরতে বলছেন!” অর্পিতা এখন প্রায় হিস্টিরিয়াগ্রস্ত, “না হলে তোমাকে ওই ড্রোন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে!”

    সেটা অবশ্য ওরা করতেই পারে। তবে আমি যতদূর সম্ভব বাধা দেব। ড্রোনের ওপর পুরোপুরি মনঃসংযোগ করলাম। বেগ আরও বাড়ল।

    কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য টের পেলাম, আমরা একা নই। সেন্সর জানাচ্ছে, এয়ারফোর্সের তিনটে অ্যাটাক-ক্র্যাক্ট আমাদের পিছু নিয়েছে। এগুলো অসম্ভব দ্রুত উড়তে পারে। মিসাইল-সহ নানারকম অস্ত্রও আছে।

    অন্তত একটা অ্যাটাক-ক্র্যাফ্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, মানুষের পরিচালিত। কেন না, তারা কাছাকাছি আসার পরেই মাইক্রোফোনে পুরুষকণ্ঠ গমগম করে উঠল।

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়! আমি স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ সাক্সেনা বলছি। ভাইস মার্শাল সাদিয়া কুরেশির পক্ষ থেকে আপনাকে আদেশ করছি, আপনি বন্দিকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে ফিরে চলুন।”

    কোনো উত্তর দিলাম না, থামলামও না। এখনও ওরা আমাকে ড্রোন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। শেষ মুহূর্ত অবধি চেষ্টা চালিয়ে যাব। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। ইয়ে, এটা আর একটা পুরোনো বাংলা প্রবচন।

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়। আপনাকে সতর্ক করা হচ্ছে, এই অবাধ্যতার ফল ভালো হবে না!”

    ড্রোনের ওপর দিকের হিট সেন্সরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির আভাস পেতেই, আমি ঝট করে অনেকটা নীচে নেমে এলাম। মাথার ওপর দিয়ে একটা আলোর ঝলক চলে গেল। নিম্নক্ষমতার লেসার বিম। সম্ভবত আমার ড্রোনকে ধ্বংস করা নয়, অকেজো করাই এর উদ্দেশ্য ছিল।

    “আর কত দূর?”, ইউসুফকে প্রশ্ন করলাম।

    “বেশি দূর নয়। এসেই গেছি।”

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়!” ওদিকে স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ সাক্সেনার সাবধানবাণী শোনা যাচ্ছে, “আপনাকে শেষবারের মতো সতর্ক করা হচ্ছে। এখনই থামুন!”

    এবারেও উত্তর দিলাম না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেছনে ডানদিকের যান থেকে একটা তীক্ষ্ণ শিসের মতো শব্দ হল।

    একেবারে শেষ মুহূর্তে বাঁ দিকে সরে যাওয়ায় মিসাইলটা লক্ষভ্রষ্ট হল। সেটা গিয়ে উপত্যকায় আছড়ে পড়ায় কান ফাটানো শব্দের সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে একটা বড়োসড় গর্ত তৈরি হল।

    আর ঠিক তখনই, ড্রোনের ম্যাগনিফায়েড ভিউ-তে প্রায় তিনশো মিটার দূরে বাংকার-এর ধাতব দরজাটা আমার চোখে পড়ল। আগেই পড়ত, যদি না কতগুলো পাথর দিয়ে আড়াল করা থাকত।

    এগোতে এগোতেই, এবার উচ্চতা কমাতে লাগলাম। আর দুশো মিটার দূর, পঞ্চাশ মিটার উচ্চতা… দেড়শো মিটার, পঁচিশ মিটার… একশো, দশ…

    বাংকারের দরজা থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরে আর জমি থেকে দু-মিটার ওপরে থাকার সময় বুঝতে পারলাম, একটা অ্যাটাক-ক্র্যাফ্ট আমার প্রায় মাথার ওপর চলে এসেছে। আর সময় নেই।

    “তুমি ঠিক আছ তো?” রুদ্ধশ্বাসে ইউসুফকে জিজ্ঞেস করলাম, “মাটিতে নামিয়ে দিলে দৌড়ে বাংকারে চলে যেতে পারবে?”

    “হ্যাঁ, কিন্তু…”, একটু ইতস্তত করে ও বলল, “তোমার কী হবে?”

    এই পরিস্থিতিতেও, ওর নির্বুদ্ধিতা দেখে চোখ কপালে উঠল।

    “গর্দভ, এটা কী সত্যিকারের আমি?”

    বলতে বলতেই, মাটির একদম কাছাকাছি এসে রোবো আর্ম আলগা করে দিলাম। ইউসুফ মাটিতে উবু হয়ে বাসে পড়ল। তারপর কোনোমতে উঠে দাঁড়াল।

    “দৌড়োও, ইউসুফ!” প্রাণপণ চেঁচিয়ে উঠলাম, “আরেবা অপেক্ষা করে আছে।”

    আমার কথায় কাজ হল। টলোমলো পারে ইউসুফ বাংকারের দিকে দৌড় শুরু করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই…

    একটা আলোর ঝলক। তারপরেই আমার চোখের সামনে ঘন অন্ধকার নেমে এল। হয় আমার রেসকিউ ড্রোনটা ধ্বংস হয়ে গেল, কিংবা তার সঙ্গে আমার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হল। অথবা, দুটো ঘটনাই একসঙ্গে ঘাটে থাকতে পারে।

    “পাপা, পাপা, ওঠো! এখন ঘুমোচ্ছ কেন? খাবে না?”

    ঝিলমের ডাকে ধীরে ধীরে চোখ মেললাম। রাত হয়ে গেছে। টেবিলের ওপরেই মাথা রেখে এলিয়ে পড়েছিলাম।

    “ঘুমোচ্ছি না, মা।”

    বলে, উঠে পড়লাম। হেলমেটটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলাম। প্রত্যাশামতোই, সেটা এখন নির্জীব, নিস্পন্দ।

    মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। ভাবলাম, খোলা হাওয়ায় একটু ঘুরে আসি। কিন্তু তাঁবুর বাইরে পা রাখতেই বিপত্তি।

    চারজন সশস্ত্র রোবোকপ তাঁবুর চারদিকে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। আমাকে দেখে সামনের জন এগিয়ে এল।

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে আপনাকে নজরবন্দি রাখা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ না হওয়া পর্যন্ত আপনার তাঁবুর বাইরে বেরোনোর অনুমতি নেই।”

    অতএব সুড়সুড় করে ফিরে এলাম। ঘড়িতে দেখলাম রাত দশটা বাজে। ঝিলমকে নিয়ে খেতে বসলাম।

    শুতে যাওয়ার সময় মেয়ে একবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে, পাপা? টেন্টের বাইরে রোবোকপ কেন?”

    “ও কিছু নয়, মা। ওরা আমাদের পাহারা দিচ্ছে।”

    জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়লাম পরেরদিন বেলা এগারোটার দিকে। ঝিলম ততক্ষণে স্কুলে চলে গেছে। রোবোকপরা তাকে বাধা দেয়নি।

    টেবিলে বসে অকেজো হেলমেটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, এমন সময় বিপ বিপ আওয়াজ করে সামনে রাখা মনিটরের আলো জ্বলতে নিভতে লাগল। ইনকামিং ভিডিও কল। টাচ প্যাড মারফত কলটা নিলাম। প্রথমে স্ক্রিনে শুধুই অন্ধকার।

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়।” একটু পরে একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর জানাল, “ভারতীয় বায়ুসেনার ভাইস মার্শাল সাদিয়া কুরেশি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চান।”

    দপ করে স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠল। বায়ুসেনার উর্দিতে ভাইস মার্শাল সাদিয়া কুরেশিকে বসে থাকতে দেখলাম। ভদ্রমহিলার বয়েস আমার মতোই হবে। কিন্তু মুখের প্রত্যেকটি রেখা কঠিন। দেখলেই বোঝা যায়, পোড়-খাওয়া সৈনিক। সেই মুখ সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন, পেছনের ন্যাড়া দেওয়ালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই।

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়।”

    বারংবার এই সম্বোধনে বিরক্তি ধরে যাচ্ছিল, কিন্তু ভাইস মার্শালের গম্ভীর, নৈর্ব্যক্তিক গলায় সেই একই কথা বুক কাঁপিয়ে দিল।

    পুরোনো দিনের কায়দায় হাত জোড় করে বললাম, “বলুন ম্যাডাম।”

    “আপনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে।” একই ভঙ্গিতে মহিলা বললেন, “গতকাল সন্ধ্যায় আপনি সেনাবাহিনীর আদেশ সরাসরি অমান্য করেছেন। তার থেকেও বড়ো অভিযোগ, বাহিনীর কাজে অসহযোগিতা শুধু নয়, প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করেছেন। আপনি কি জানেন, এটা দণ্ডনীয় অপরাধ?”

    “জানি, ম্যাডাম! কিন্তু…”

    “কোনো কিন্তু নেই!” ভাইস মার্শালের স্বর এবার ঝাঁঝালো হল, “আপনি একজন সম্ভাব্য উগ্রপন্থীকে বাহিনীর হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করেছেন, এমনকী তাকে পালাতেও সাহায্য করেছেন। এই ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতিতে উগ্রপন্থা সম্পূর্ণ দমন করতে না পারলে, তার পরিণতি আমাদের পক্ষে কতটা ভয়ানক হতে পারে, সে বিষয়ে আপনার কোনো ধারণা আছে কী?”

    “ইউসুফ উগ্রপন্থী নয়!” মরিয়া হয়ে বলে ফেললাম, “ওর মেয়ে আয়েষা উপোস করে ছিল বলেই ও আর্মি সাপ্লাই চুরি করতে যায়। আমারও ওই বয়েসের একটা মেয়ে আছে। ইউসুফ সত্যি কথাই বলেছে। বিশ্বাস করুন, আমি জানি!”

    এর উত্তরে সাদিয়া কুরেশি চট করে কিছু বলতে পারলেন না। সেই অবসরে আমি আরও একটা দুঃসাহসিক কাজ করলাম। ভয়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকলে চলবে না, একটা জিনিস আমাকে জানতেই হবে।

    “ম্যাডাম, ইউসুফ কী শেষ পর্যন্ত ওর মেয়ের কাছে ফিরতে পেরেছিল?” সৈনাধ্যক্ষকেই পালটা প্রশ্ন করে বসলাম, “না কী আপনারা ওকে….?”

    সাদিয়া কুরেশি একটু নড়েচড়ে বসলেন। এই মুহূর্তে ওঁকে একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল।

    “কন্ট্রোল রুমে বসে আমি নিজেই মিশনটা সুপারভাইজ করছিলাম।” একটু পরে নীচু গলায় উনি বললেন, “আপনার ড্রোন ধ্বংস করার পর সাক্সেনাকে বলেছিলাম ওই সম্ভাব্য জঙ্গিকেও নিকেশ করতে। কিন্তু সে ক্র্যাফটের লেসার বিম এনগেজ করার মুহূর্তে আমাদের পেনিট্রেটিভ আল্ট্রাসাউন্ডে বাংকারের ভেতরের দৃশ্য ধরা পড়ে। সেখানে সত্যিই এক বৃদ্ধা আর এক পঙ্গু কিশোরী ছিল। আমি তৎক্ষণাৎ সাক্সেনার কম্যান্ড ওভাররাইড করি। ইউসুফ বেঁচে যায়।”

    একটু থেমে উনি যোগ করলেন, “আর সিনথান টপে আবার ত্রাণ পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছি।”

    এরপর উনি পুরোপুরি চুপ করে গেলেন।

    কেন জানি না, হঠাৎ আমার একটা বেয়াড়া ধরনের সন্দেহ হল।

    “মাফ করবেন ম্যাডাম, কিন্তু আপনার… মানে, আপনারও কী আয়েষার বয়েসী একটা মেয়ে আছে?”

    “না!”

    “নেই? ওঃ, দুঃখিত। আমি ভাবলাম…”

    “মেয়ে নয়, ছেলে!”

    আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। পোড় খাওয়া সেনানায়ক আর আমি চুপ করে পরস্পরের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

    তবে, ওই কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই এয়ার ভাইস মার্শালের মুখের প্রতিটি রেখা আবার কঠোর হয়ে উঠল।

    “নাগরিক অনির্বাণ রায়।” তীব্র দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে উনি ঘোষণা করলেন, “সেনার কাজে বাধা দিয়ে আপনি যে গর্হিত অপরাধ করেছেন, তার শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে। আপাতত গ্রেফতার করা না হলেও, আপনার দূরনিয়ন্ত্রিত কাজের অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রত্যাহার করা হল। আপনার সবরকম আর্থিক লেনদেনও আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে।”

    মনিটর স্ক্রিন ফের অন্ধকার হয়ে গেল।

    একটা নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ারটা সরাতে যাচ্ছি, হঠাৎ আবার ভিডিও কল। ও প্রান্তে এবার অর্পিতা। এখন তার ছলাকলা উধাও। চোখেমুখে অকৃত্রিম উদ্বেগের ছাপ।

    “আর্মির নির্দেশ, তোমাকে আর দূরনিয়ন্ত্রিত কাজ দেওয়া যাবে না!” কোনো ভণিতা না করেই সে বলল, “কী হবে, অনির্বাণ?”

    “কী আবার হবে?” আমি গলার স্বর যথাসম্ভব নিরুত্তাপ রাখলাম, “গতরে খেটে খাব, ওই চাষী-মজুরদের মতো!”

    “সে না হয় হল, কিন্তু ওরা তো তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও ফ্রিজ করে দিয়েছে। কোনোকিছু দরকার হলে এখন তো কিনতেও পারবে না!”

    এ কথার আর কী জবাব দেব। শুধু কাঁধ ঝাঁকালাম।

    “একটা কাজ করি, অনির্বাণ?” একটু ইতস্তত করে অর্পিতা বলল, “প্রসন্ন এখন বাড়িতে আছে। সন্ধ্যার দিকে ওকে দিয়ে তোমাদের টেন্টে কিছু জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিই? বেশি কিছু নয়। কিছু খাবার, ওষুধপত্র, মেয়েটার জন্য স্যানিটারি প্যাড… পাঠাই?”

    কোনো উত্তর না দিয়েই কলটা কেটে দিলাম। আমি জানি, কিছু না বললেও অর্পিতা ওসব পাঠিয়ে দেবে। এখন আমি অনেক কিছুই জানি।

    এরপর ইনফ্লেটোম্যাটের ওপর লম্বা হয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গতকাল সন্ধ্যা থেকে মনের ওপর ধকল তো আর কম যায়নি।

    বিকেলবেলা ঝিলম স্কুল থেকে ফিরে এসে ধাক্কা দিয়ে আমার ঘুম ভাঙাল। আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়লাম। তারপর একটু হাত-পা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তাঁবুর বাইরে বেরোলাম। রোবোকপরা কোন ফাঁকে বিদায় নিয়েছে। বাধা না পেয়ে ক্যাম্পের একদম শেষদিকে, ফোর্স ফিল্ডের ধারের সেই ফাঁকা জমির দিকে পা চালালাম।

    বাপ রে, জোর বেঁচে গেছি! গ্রাফাইটের সেই গোলাটা তিরবেগে হাঁটুর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। লাগলে আর দেখতে হত না।

    ফোর্স ফিল্ডের ধারের সেই ‘মাঠ’-এ ক্রিকেট খেলা ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে। সেখান থেকে সমবেত হর্ষধ্বনি ভেসে এল।

    “বাউন্ডারি… বাউন্ডারি…”

    ওরা হেলমেট পেল কোথায়? ওঃ, একটা বাতিল রেডিয়েশন স্যুটের মাথার অংশটা কেটে নিয়েছে। যাক গে, এখন ওই নিয়েই খেলুক। পরে আমার অকেজো হেলমেটটা ওদের দিয়ে দেব।

    ফিল্ডারদের পাশ কাটিয়ে আমি ক্যাম্পের সীমানায় গিয়ে দাঁড়ালাম। এখনও রোদের যথেষ্ট তেজ রয়েছে। ফোর্স ফিল্ডের ওপাশে, সেই রোদের মধ্যেই চাষী আর মজুররা তাদের যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। চরাচরব্যাপী ধ্বংসের পটভূমিতে এ যেন জীবনের জয়গান।

    হয়তো আমাকে এবার ওদের মতোই কায়িক শ্রমের কাজে নামতে হবে। তা হোক, আমার তাতে কোনো আফসোশ নেই। অনেকদিন পরে একবার বুক ভরে শ্বাস নিলাম।

    বাংলার এক প্রাচীন সাহিত্যিক অদ্ভুত একটা লাইন লিখেছিলেন। আর্কাইভ থেকেই পড়া।

    “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়।”

    নয়, সত্যিই নয়!

    আমার মেয়ে ঝিলম আমার দেশ। কাশ্মীরের মানুষ ওই ইউসুফ, আর তার পঙ্গু আত্মজা আয়েষা আমার দেশ। আপাত-কঠোর ওই এয়ার ভাইস মার্শাল সাদিয়া কুরেশি আমার দেশ। যাকে আমি ঢলানি মহিলা ভাবতাম, সেই অর্পিতা দাস আমার দেশ। ক্যাম্পে আমার প্রতিবেশিরা, এই খেলোয়াড়রা, ওই কৃষক আর শ্রমিকরা, সবাই, সব্বাই আমার দেশ।

    আণবিক অস্ত্রে একটা দেশকে পুড়িয়ে-ঝুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া যায়। কিন্তু তাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা অত সহজ নয়!

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকালীগুণীন ও চতুরঙ্গের ফাঁদ – সৌমিক দে
    Next Article হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }