বুনোফুলের গন্ধ – লীনা গঙ্গোপাধ্যায়
ডক্টর বৈরাগীকে মিট করে উঠতে উঠতে রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল শাক্যর। অথচ বিকেল চারটে থেকে এসে বসে আছে।
সকাল থেকে রোগী দেখে দুপুর দুটো থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত ডাক্তারবাবু বাড়িতে বিশ্রাম নেন। তিনটে নাগাদ অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন ডক্টর আলম। লাভপুরের কাজ সেরে আসতে দেরি হল বলে ডাক্তারবাবু চেম্বারে ঢুকে গেলেন। সকাল থেকে সন্ধ্যে সাতটা অবধি রোগী দেখেন নিয়ম করে। মাঝে শুধু স্নান-খাওয়ার জন্য ঘন্টা দুইয়ের ফাঁক। এর মধ্যে ঢুকে যেতে না পারলে রাতে যে কখন ছাড়া পাওয়া যাবে, কেউ বলতে পারে না। আজ শাক্যরও সেই অবস্থা দাঁড়াল। সন্ধ্যে সাতটা থেকে ন-টা ডাক্তারবাবু বেশ খোজ মেজাজে থাকেন। তখন যারা আসে, তাদের সঙ্গে রীতিমতো মজলিশ বসিয়ে দেন। সেই চক্করে পড়ে আজ শাক্যর বাড়ি যাওয়াটাই বুঝি বরবাদ হয়ে যায়। এমনিতেই কিছুদিন হল ও প্রমোশন পেয়ে এরিয়া ম্যানেজার হয়েছে। তারপর থেকেই এদিক ওদিক ছুটতে হয়।
এরপর তো মাসে দু-তিনদিনের জন্য কনফারেন্স আছেই। সবগুলোই রেসিডেন্সিয়াল প্রোগ্রাম। আজ মৌয়ের মুখটা মনে করে শাক্যর কষ্টই হল। একা হাতে মেয়ে সামলানো, বাবা-মায়ের দেখাশুনো করা, লোকলৌকিকতা সামলানো সব ওকেই করতে হয়। বোনটার কাছাকাছি বিয়ে হয়েছে। তার আবার বাচ্চাকাচ্চা হবে, তাই যখন তখন বাপের বাড়ি চলে আসে। মউ তো প্রায়ই বলে, “তোমার আর কী! তুমি তো মাস গেলে ক-টা টাকা ফেলে দিয়েই খালাস। গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াও। আমি যে কী করে কী করি, তা আমিই জানি।”
আজ বাড়ি থেকে বেরনোর সময় মৌ পইপই করে বলে দিয়েছিল, “রাতে কিন্তু ফিরে এসো।”
তার কারণও আছে। মৌয়ের খুড়তুতো ভাই আর ওর বউ বিদেশ থেকে এসেছে। মৌ কাল তাদের নেমন্তন্ন করেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে গড়িয়াহাট বাজার থেকে মাছ কিনতে যাওয়ার কথা। এখন শাক্য ভাবছে এই পলাশপুর থেকে বোলপুর পৌঁছতে পাক্কা ঘন্টাখানেক। তারপর কোন ট্রেন পাবে আর কলকাতা কখন পৌঁছোবে কে জানে!
এখন মনে হচ্ছে, আজ হয়তো আর বাড়ি ফেরাই হবে না। কাল সকলে যখন বাড়ি পৌঁছোবে, তখন মৌয়ের মুখ কল্পনা করে রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল শাক্য। মৌ রেগে গেলে মুখে কিছু বলে না, কথা বন্ধ করে দেয়। অনেক সাধ্যসাধনার পর যদি বা কথা বলে, তার ভেতর এমন হুল থাকে যে, শাক্য একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
তখন রাজ্যের পুরোনো কথা, যা আর কোনোদিন উঠবে না মনে হয়েছিল, সেসব কথা উঠে পড়ে। একটা সময় এমন হয়েছিল শাক্য আর মৌয়ের সংসারটাই ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
বছর দুই আগে তাদের ওষুধ কোম্পানিতে একটি মেয়ে জয়েন করল। শাক্যরই টিমে। শাক্য তখন সবে এরিয়া ম্যানেজার হয়েছে। মেয়েটি খুব ডায়নামিক। ঝকঝকে স্মার্ট। ইংরেজিতে ঝরঝর করে কথা বলে। যে টার্গেট দেওয়া হয়, তা মিট-আপ করে। দেখতে শুনতে চটকদার। এই মেয়েটির সঙ্গে শাক্যর একটা অ্যাফেয়ার হয়ে গেল।
মৌ তখন সবে মা হয়েছে। তখন বাচ্চা নিয়ে দিনরাত হিমসিম খাচ্ছে। শাক্যর দিকে তাকানোর সময় নেই। দিনরাত ঝোড়ো কাকের মতো হয়ে থাকে। একটুও সাজে না, চেহারার যত্ন নেয় না। ওইভাবেই ঘুরে বেড়ায়। ওর কাছে গেলে তখন ওর শরীর থেকে বাচ্চার দুধের গন্ধ নাকে এসে লাগত। মউয়ের শরীর থেকে ওর নিজস্ব সুবাস হারিয়ে যাচ্ছিল।
এই সময় ঝড়ের মতো কঙ্কনা এল। শাক্যর কোনো প্রতিরোধ তো কাজ করলই না, বরং শাক্যই সম্পর্কটা নিয়ে অনেকদূর এগোল। মাঝেমধ্যেই ওরা ট্যুরের নাম করে এখানে ওখানে চলে যেত। কঙ্কণার শরীর নিয়ে কোনো ছুঁৎমার্গ ছিল না।
একদিন ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ থেকে শাক্য মৌয়ের কাছে ধরা পড়ে গেল। মৌ বাচ্চা নিয়ে এক কাপড়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। জল সে যাত্রা অনেক দূর গড়িয়েছিল।
মৌয়ের এক দাদা পুলিশ। সে শাক্যকে খুবই মানসিক চাপে রেখেছিল। ওই দাদার বুদ্ধিতেই মৌ সবটা শাক্যর অফিসে জানাল। তাদের জোনাল হেড শাক্যকে ডেকে কিছু বলল না। শুধু মেয়েটাকে বদলি করে দিল অনেক দূরে। শাক্য কাজের ছেলে। কাজের জন্য তাকে সবাই পছন্দ করে। খুব শক্ত ধাতের ডাক্তারকেও শাক্য কবজা করতে পারে তার ব্যবহারে। প্রত্যেকবার তার টার্গেট সকলকে ছাপিয়ে যায় বলে ইনসেনটিভ তার বাঁধা।
সেবার অনেক কষ্টে সব স্বাভাবিক হল। মৌ আবার বাচ্চা নিয়ে ফিরে এসে সংসারের হাল ধরল। তখনই সে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিল শাক্যকে, আর কখনও এমন হলে সে আর কিছুতেই ফিরবে না। তবে শাক্যর নিজের মনের অগোচরে পাপ নেই। শাক্য জানে সুন্দরী মেয়ের প্রতি তার অদ্ভুত আকর্ষণ। সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়ের কাছে সে বারবার পরাস্ত হয়।
শাক্য যখন রাত সাড়ে আটটায় ডাক্তার বৈরাগীকে তার কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করার ব্যাপারে রাজি করিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে, তখন ডাক্তারবাবু বললেন, “সাবধানে যেও। এদিকে তেনাদের বসবাস আছে।”
ঘরে তখন আরও দু-চারজন লোক ছিল। এরা আশেপাশে থাকে আর এই সময়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে খেজুর করতে আসে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে উঠল, “আজ আবার শনিবার, তায় অমাবস্যা।”
শাক্য এসব কিছু মানে না। ভূত প্রেত দত্যি দানো যদি থাকেও, তাতে তার কিছু এসে যায় না। শাক্যর সাফ জবাব, “তারা তাদের মতো থাক, আমি আমার মতো থাকি। তাদের সঙ্গে আমার কোনো লেনাদেনা নেই।”
এই ডাক্তারবাবুটির একসময় কলকাতায় রমরমে প্র্যাকটিস ছিল। তখন থেকেই তিনি ফি সপ্তাহে বীরভূমের এই গাঁয়ে আসতেন বিনে পয়সায় চিকিৎসা করবেন বলে। এর মধ্যেই কী হল কে জানে, একদিন কলকাতার জমজমাট প্র্যাকটিস, বাড়িঘর, নাগরিক অভ্যেস সব ছেড়ে এই অজগাঁয়ে বাড়ি করে চলে এলেন। তার সঙ্গে পরিবারের কেউ আসেনি। এমনকি স্ত্রী-ও না। ডাক্তারবাবু একাই থাকেন। একটি সাঁওতাল পরিবারকে রেখেছেন তাঁকে দেখাশুনো করার জন্য। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে কচিৎ কদাচিৎ আসে। ডাক্তারবাবু নাকি আর কলকাতায় যান না। এ-নিয়ে নানা রটনা আছে। সত্যি মিথ্যে কেউ জানে না।
শাক্য বাইকে ঝড় তুলে বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় কোনো আলো নেই। যেতে যেতে বুঝতে পারছে দু-স্পাশে ধানকাটা শূন্য মাঠ এলিয়ে পড়ে আছে দুঃখিনী মেয়ের মতো।
আজ আকাশে চাঁদের আভাটুকু নেই। নিকষ কালো আকাশের বুকে অসংখ্য তারা ফুটে আছে। এসব দিকে বায়ুদূষণ কম বলে তারাগুলো অনেক বড়ো লাগছে। মনোরম হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে শাকার।
সে মনে মনে হিসেব করছে, সাড়ে নটার মধ্যেও যদি পৌঁছে যেতে পারে, তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখাবে, কোনো ট্রেন পাওয়া যায় কী না। সে এই নিঃঝুম ফাঁকা রাস্তায় বাইকে প্রচুর স্পিড তুলে দিল। এইসব গাঁ-গঞ্জে লোকজন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। খুব ভোর ভোর উঠতে হয় তাদের। তাই পথঘাটে একটাও লোক নেই। শাক্যর মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো মৃতনগরী পেরিয়ে যাচ্ছে।
শাক্য বাইক চালাতে চালাতে একটু আনমনা হয়ে গেল। হঠাৎই বছর দুইয়ের তুরতুরির কয়েকটি দাঁত ওঠা চাঁদপানা মুখটা মনে পড়ে গেল। খুব চটকাতে ইচ্ছে করছে মেয়েকে। তার আদো আদো গলায় ‘বাবা’ বলে ডাক আর খুশিতে ঝিরঝিরে হাসি যেন স্পষ্ট শুনতে পেল। শাক্যর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। হঠাৎ একটা কু-ডাক ডাকল মনে। আর যদি কখনও দেখা না হয় মেয়েটার সঙ্গে।
এমন ভাবনায় নিজেই অবাক হল। তার মৌয়ের কথাও মনে হল বৈকী! এখন তাদের স্বামী স্ত্রী-র সম্পর্কে আর কোনো রোমান্স অবশিষ্ট নেই ঠিকই, সবটাই ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট, তবু মনে হল, মৌয়ের কাছে অদ্ভুত এক নিরাপত্তা আছে, যা সে আর কোথাও খুঁজে পায় না। শাক্য মনে মনে ভাবছে, কত তাড়াতাড়ি সে বাড়ি ফিরবে!
সে সিদ্ধান্ত নিল, আজ যত রাতই হোক সে ফিরবে। তার মনের এই দুর্বলতায় সে নিজেই যথেষ্ট অবাক হল। আর ঠিক এই সময়েই অন্ধকার ধানকাটা মাঠে দপ করে একটা আলো জ্বলে উঠল। আলোটা নিভে গেল না। বরং হাউইয়ের মতো আকাশের দিকে উঠে হারিয়ে গেল, মিলিয়ে গেল। শাক্য বুঝতে পারল না, এই আলোর উৎস কী! সে এ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সোজা এগিয়ে গেল।
আকাশে এখন তারাদের আসর বসেছে। নীল রংয়ের বিন্দুগুলো জ্বলছে নিভছে। নিভছে, জ্বলছে। তারা যেন আকাশ থেকে মাটির দিকে নেমে আসছে। তারা পাক খেতে খেতে নামছে। নামতে নামতে কিছু তারা নিভে যাচ্ছে। যা হঠাৎ কলমল করে উঠেছিল, তা আচমকা নিতে গিয়ে মাঠঘাট পথ আরও আঁধার করে তুলল।
কিছু তারা, যারা শেষপর্যন্ত নেমে আসতে পারল, তারা যেন শাক্যর বাইকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটতে চাইছে। তারা শাক্যকে ঘিরে ফেলতে চাইছে, তাদের ঘেরাটোপে বন্দি করে ফেলতে চাইছে। অবশেষে সব তারা নিভে গিয়ে মাটি এবং আকাশ ঘন আঁধারে ঢেকে গেল।
শাক্য মন থেকে যত ভুলভাল ভাবনা ঝেড়ে ফেলে দিতে চাইল। সে এখন এক মনে বাইক চালাচ্ছে। ঝড়ের গতি তার বাইকে। ঠিক এইসময় অন্ধকার ফুঁড়ে একটা ছায়ামূর্তি শাকার বাইকের সামনে এসে দাঁড়াল। আর একটু হলেই একটা বড়োরকমের অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেত একটা।
শাক্য জোরে ব্রেক করল। এই শব্দে কাছাকাছি কোনো গাছ থেকে পাখি ডানা ঝাপটাল। ডেকে উঠল। ভয় পেয়েছে নির্ঘাৎ!
অনেক দূর থেকে এইসময় কুকুরের কান্না ভেসে এল। শাক্য ছায়ামূর্তির দিকে তাকাল। তার বাইকের আলোয় দেখতে পেল, একটি এঁটেল মাটি রংয়ের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অপূর্ব তার মুখশ্রী। দুম্বাঠাকুরের মতো টানা টানা চোখজোড়ায় ঘন কাজল। তা চোখ থেকে খানিকটা ছড়িয়ে গিয়েছে। মেয়ের চোখে অপার রহস্য। তার কোমর ছাপানো খোলা চুলে একগুচ্ছ শাদা ফুল। টকটকে আগুন রংয়ের কাপড় পরনে।
শাক্য স্থলিত গলায় বলে উঠল, “কে!”
মেয়েটি গলায় কাতর আবেদন নিয়ে বলল, “মু উই গাঁটোতে থাকি কেনে। মেলা দূর থিকে আসছি। আর হাঁটতে টো পারছি লাই। মুকে মুর ঘরটোতে পৌঁছাইন দিবিক?”
মেয়ে এই কথা বলে তার ঝকঝকে সাদা দাঁতে হেসে উঠল। যেন একগুচ্ছ মুক্তো আলো জ্বালিয়ে দিল সারা মুখে। তার চোখের গভীরে কীসের ঝিলিক। ওই চোখের গভীরে সহস্রবার ডুব দেওয়া যায় মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও।
শাক্য মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে বিহ্বল হয়ে গেল। তার সব কিছু কেমন এলোমেলো হয়ে উঠল। সে যে একজন ঘোরতর সংসারী মানুষ, বউ মেয়ে নিয়ে তার আঁটোসাটো সংসার – সেসবের ওপর যেন চৈত্রের বাতাস খেলে গেল। সে একবার ভাবল, বলে দেয় তার ট্রেন ধরার তাড়া আছে। তার পক্ষে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মেয়ের চোখে তখন অপার রহস্যের ঝিলিক।
এই রহস্যের কাছে বশীভূত হয়ে গেল শাক্য। একটা ঘোর লাগা গলায় বলল, “ওঠো।”
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর লাল শাড়ির আঁচল উড়িয়ে শাক্যর গাড়িতে উঠে বসল।
অনেকক্ষণ থেকেই একটা বুনো গন্ধ শাকার নাকে ভেসে আসছিল। মেয়েটি শাক্যর পাশে বসতে ওই বনজ গন্ধ আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
এবার সোজা রাস্তা ছেড়ে শাক্যর বাইক মেয়েটির নির্দেশে মাঠের পথ ধরল। এবড়োখেবড়ো মেঠো পথ। কোথাও কোথাও ধানের গুঁড়িতে ধাক্কা লেগে গাড়ি টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে। শাক্যর এখন নিজের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মেয়েটি যেমন যেমন নির্দেশ দিচ্ছে, সে তেমন তেমন যাচ্ছে। শাক্য যে এভাবে কত দূর এল, তাও আর তার হিসেবে নেই।
এইভাবে গাড়ি চালাতে চালাতে এখন তার ঘুমে দু-চোখ বুজে আসছে। তার যেন দীর্ঘ দীর্ঘ বছরের ঘুম জমা হয়ে আছে।
শাক্য প্রায় ঘুমোতে ঘুমোতে গাড়ি চালাচ্ছে। অনেকক্ষণ থেকে সে আর ওই বুনো গন্ধটা পাচ্ছে না।
হঠাৎ এক ঝাঁকুনিতে ঘুমের চটকা কেটে গেল শাক্যর। আর কতদূর জিজ্ঞেস করবে বলে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল বাইকের পেছনে কেউ নেই।
শাক্যর বুক ধড়াস করে উঠল। বুকের মধ্যে টিপটিপ আওয়াজ। চলন্ত গাড়ি থেকে মেয়েটা নেমে গেল কী করে, কিছুতেই বুঝতে পারছে না শাক্য।
এমনিতে সে ভূত প্রেত কিছুই মানে না। কলেজে পড়তে বিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল সে। এসবের বিরুদ্ধে কত জায়গায়, কত আলোচনায় অংশ নিয়েছে সে। অথচ এখন যা যা ঘটে যাচ্ছে, সে তার কোনো কার্যকারণ খুঁজে পাচ্ছে না।
এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল, তাকে যেন কেউ নেশাগ্রস্ত করে রেখেছে। এখন তার চোখ থেকে ঘুম উধাও। স্বচ্ছ চোখে দেখতে পেল, ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজে। শাক্য গাড়ি বড়ো রাস্তার দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করতেই যেন হাওয়া ফুঁড়ে উঠে এল সেই মেয়ে। ঝরনার মতো হাসতে হাসতে বলল, “পালাইনছিলি কুথাকে? কী ভেবেছিস, মু চলে গেছি?”
এবার শাক্য একেবারে চমকে গেল। এই এতক্ষণে সে একটু ভয়ও পেল। মেয়েটার আচরণের কোনো ব্যাখ্যা সে যুক্তি দিয়ে খুঁজে পাচ্ছে না।
শাক্য কোনোরকমে ঢোঁক গিলে বলল, “চলন্ত বাইক থেকে নামলে কী করে?”
মেয়ে যেন এমন অদ্ভুত কথা শোনেইনি কোনোদিন, এমনভাবে গলায় একটু অবাক হওয়ার সুর তুলে বলল, “তু তো ঘুমাইন ঘুমাইন বাইকটো চালাইনছিলি। মু হেঁটটে গেলে তাড়াতাড়ি ঘরকে যেতম। চল কেনে মুর ঘর ওই জঙ্গলটোর পেছুতে। এসে যেছি।”
শাক্য আর কোনো উত্তর দিল না। আবার সেই বনজ গন্ধ ম ম করছে এখন। ফের ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে যেতে চাইছে তার।
অল্পসময়ের মধ্যে জঙ্গলের পেছনের একটা মাটির বাড়ির উঠোনে এসে বাইক দাঁড় করাল শাক্য। মেয়ে শাক্যর শরীরে ভর দিয়ে নামল আর তখনই শাক্যর শরীর অবশ হয়ে এল। এক অপূর্ব ভালো লাগার ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেল ও।
উঠোনে একটা কুলুঙ্গিতে আলো জ্বলছে। সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে, উঠোন ভরে আলপনা আঁকা। ফুল লতা পাতা পাখির আলপনা। মেয়ে একদৃষ্টে শাক্যর দিকে তাকিয়ে আছে।
শাক্য জানতে চাইল, “তোমার নাম কী?”
মেয়ে জলতরঙ্গ হেসে বলল, “মুর ভালোবাসার মানুষটো মুকে চাঁদমণি বলে ডাকত। আর সকলে বলত, ফুলমণি।”
ফুলমণির কথা শাক্যর কানে বাজল। ফুলমণি স্পষ্ট ‘ডাকত’ কথাটা বলল। এখন কী আর কেউ ডাকে না? শাক্যর ভাবনার ফাঁকে ফুলমণি ধরে গেল। ফিরে এল একটু পরেই। হাতে ঝকঝকে একটা কাঁসার গ্লাস। তাতে তরল কোনো পানীয়। শাক্যর মুখের সামনে ধরে বলল, “খা কেনে। খুব খাটনিটো যেছে তুর।”
শাক্যর মনে অনেক প্রশ্নের ঝড় তাকে বেসামাল করলেও সে শরীরে কিংবা মনে কোনো জোর পাচ্ছে না প্রশ্ন করার মতো। সে ঢকঢক করে ওই পানীয় খেয়ে নিল। বেশ ঝাঁঝ আর টক্-টক্ স্বাদ। এমন পানীয় সে আগে কখনও খায়নি। ওই তরল খাওয়ার একটু পরেই তার শরীর অস্থির লাগতে শুরু করল। সে ওই মাটিতেই বসে পড়ল।
ফুলমণি যেন ভারি মজা পেয়েছে, এমনভাবে হেসে কুটোপাটি হয়ে যাচ্ছে। সে তার দু চোখের তারা নাচিয়ে শাক্যকে বলল, “লাচ দেখবি? দাঁড়া কিনে, মোর সইগুলানকে ডাকি।”
শাক্য দেখল, ফুলমণি তার এক হাত দিয়ে আর এক হাতে তিন তালি দিল। আর অমনি একদল ছেলেমেয়ে মাদল নিয়ে নূপুর পায়ে উঠোন জুড়ে নাচতে লাগল। ওই নাচের। সঙ্গে নিজেরাই গান গাইতে লাগল।
শাক্যরও ওদের সঙ্গে খুব নাচতে ইচ্ছে করল। সে টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়াল। ফুলমণি তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। শাক্য এর আগে কোনোদিন এই নাচ নাচেনি, কিন্তু তার এতটুকু ভুল হচ্ছে না। সে মাদলের তালে তাল মিলিয়ে ফুলমণির সঙ্গে নাচতে লাগল। যেন এইভাবেই সে কতকাল ধরে নেচে যাচ্ছে।
নাচতে নাচতে সে নেশাগ্রস্তের মতো ফুলমণিকে জড়িয়ে ধরল। ফুলমণির শরীর থেকে উঠে আসা মাটি আর বুনো ফুলের গন্ধে সে একেবারে পাগল হয়ে গেল।
শাক্য ফুলমণিকে জড়াতেই ফুলমণি বুকের ভেতর থেকে একটা ছুরি বের করে তাক করল শাক্যর দিকে। ফুলমণির হাতের ধারালো ইস্পাতের ফলা এই আবছা অন্ধকারেও চিকচিক করছে।
শাক্য ভয় পেল না। সে ফুলমণিকে জড়িয়ে ধরে বলে যাচ্ছে, “ভালোবাসি। ভালোবাসি।” এবার ফুলমণি অদ্ভুত শব্দ করে গুঙিয়ে উঠল।
এখন উঠোন ফাঁকা। যারা নাচছিল, তারা কেউ নেই। নেই মাদলের শব্দ। ঘুঙুরের বোল। শাক্য ফুলমণিকে জড়িয়ে ধরে আছে। ফুলমণি সাংঘাতিক হিংস্র হিসহিসে গলায় বলল, “ই শহরের বাবুগুলান মোদিকে ভোগ করবার লিখে আসে শুধু। কেউ ভালোটো বাসে না।” শাক্যর বুকের ভেতর গুমরে উঠল ফুলমণির কথা শুনে। একটু আগে ও কাঁদছিল গঙিয়ে। তখন থেকেই কষ্ট হচ্ছিল মেয়েটার জন্য। শাক্য তার নিজের ঘর সংসার, বউ, মেয়ে সকলের কথা ভুলে গিয়ে ফুলমণির কষ্টে কাতর হয়ে পড়ল। ফুলমণি এখন আবার চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে। সে মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে কাঁদছে। ফুলমণির এই বেদনা শাক্যকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, অনাদি অনন্ত কাল থেকে সে আর ফুলমণি যেন একই তারে বাঁধা পড়ে আছে।
ফুলমণি তখন আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে যাচ্ছে, “একদিন এক ছবিবাবু এলোক। সে বলল, মোর ফটোক তুলবে। মু রাজি হলম। তার আগে মুর মরদটো মুকে ছেড়ড়ে আর ইকটো মেয়াকে বিহা কুরেছে। উ ছবিবাবুর মোর ছবিটো আঁকতে আঁকতে মুকে বুললো, সি মুকে ভালোটোবাসে। সি মুকে কত্ত সোহাগ করল। বুলল, মুকে বিহাটো করবে।”
শাক্য অভিভূত হয়ে শুনছিল। জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”
ফুলমণি বলল, “ইকদিন বুলল দাঁড়া কেনে। ত্বকে লিয়ে আঁকা ছবিটো মেলা দামে বিকাইনছে। টাকাটো লিয়ে আসি।”
শাক্য ফুলমণির মুখে চোখে হাত বোলাচ্ছে। মায়ায় ভরে যাচ্ছে তার মন। সে বলল, “ফিরে এল?”
ফুলমণির চোখে এখন নীরব জলের ধারা। সে বলল, “এলোক লাই।”
শাক্যর চোখেমুখে গভীর কৌতূহল। জানতে চাইল, “তারপর?”
ফুলমণি জলভরা দু-চোখ তুলে বলল, “তখন মোর ভরা মাস। মেলা খোঁজ করে তার ঘরকে গেলম। মুকে দিখে সি মেলা ডরটো পেলক। মুর হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল, ‘ইবার যা কিনে।’ তার ঘরকে বউ ছিল্যা—সব রইনছে যি। সিতো মুকে সত্যিটো বুলে লাই।”
শাক্যর তর সইছে না। সে শেষ জানতে চায়। এদিকে ফুলমণি বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তার খুব কষ্ট হচ্ছে। সে ওইভাবেই বলল, “মু তো টাকা চাই লাই। মু মোর সন্তানের বাপের পরিচয়টো চেয়েছি। সি মুর জিদের কাছে হারটো মেনে বলল, ‘চল কিনে, আজ তুকে মায়ের থানে লিয়ে বিহাটো কুরব।’ ভাবলম, মুর ঘরটা হব্যে। মরদটো হব্যে। ছিলাটো হব্যে। মু গেলম উয়ার সঙ্গে।”
এই কথা বলার পর ফুলমণি কেমন অস্থির হয়ে উঠল। উঠে উঠোন জুড়ে ঘুরতে লাগল। শাক্যর অস্তিত্ব যেন মুছে গিয়েছে তার কাছে। এবার সে চিৎকার করে বলতে থাকল, “উ মুকে বিহার লাগে গলায় ফাঁসটো দিলোক। মুকে লদীতে ভাসাইন দিলোক। মুকে মুর ছিলার মুখটো দিখতে দিলোক লাই।”
শাক্য স্তব্ধ। তার নেশার ঘোর কাটছে। সে বুঝতে পারছে না, ফুলমণি জীবিত না মৃত।
এবার ফুলমণি তেড়ে এল শাক্যর দিকে। ভয়ংকর গলায় বলল, “মোদিকে স্বস্তাটো ভাবি লয়? মোদিগের শরীলটো স্বস্তা আছে? ঘরে বউ বাচ্চা রেখ্যে মুকে ভালোবাসার কুথা বলছিলিক লাই? দিখ কিনে ইবার মিথ্যা ভালোবাসার লিগ্যে কী দামটো দিত্যে হয়।”
ফুলমণি ছুরি নিয়ে শাক্যর কাছে ছুটে যায়। শাক্য প্রতিরোধ করার আগেই সে শাক্যকে লক্ষ করে তার বুকের ভেতর আমূল বিধিয়ে দেয় ওই তীক্ষ্ণ ছুরির ফলা। শাক্যর গলা থেকে আর্ত চিৎকার বেরিয়ে আসে। ফুলমণির উঠোন ভিজে যায় শাক্যর টাটকা রক্তে। ফুলমণি ভয়ানক উল্লাসে বীভৎস হেসে ওঠে। তার ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ সে অশরীরি হয়েও আজও এইভাবেই করে চলেছে।
খুব ভোর বেলা কয়েকজন কৃষক চাষ করতে মাঠে যাওয়ার পথে একদা বসবাস করা ফুলমণি আর শহরের ছবিবাবুর পরিত্যক্ত উঠোন দিয়ে শর্টকাট করতে গিয়ে এক শহরের বাবুকে দেখতে পেল। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, ‘আবার একজনের প্রাণ গেল!’
তারা শাক্যকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে বুঝতে চাইল, সে বেঁচে আছে কী না! তারা তার নাম জানে না। গাঁ ছুঁয়ে ডাকতে লাগল। বোলপুর শহর থেকে কাজের জন্য ভাড়া করা বাইকটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।
জঙ্গল থেকে নানারকম পাখির কলরব ভেসে আসছে। রোদ উঠছে আকাশ জুড়ে। পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বল ভোর। কাছাকাছি কোথাও কোনো গির্জা আছে। ঘণ্টা বাজছে গির্জার।
শাক্য ওদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। সে শুধু মাদলের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। দ্রিম দ্রিম দ্রিম দ্রিম! সে একটি কাজল রংয়ের মেয়ের মুখ দেখতে পাচ্ছে। যে একদিন ভালোবেসেছিল এবং ঠকে গিয়ে পৃথিবী ছেড়েছিল।
মনের গভীর থেকে স্বপ্ন উঠে আসার মতো শাক্যর মনের নিভৃত কোণে ফুলমণি জেগে রইল। সে যেন হাওয়ায় ভেসে ভেসে তার কাছে এসে বলছে, “মুর কী দোষ ছিলোক বুল কিনে! মু যি বিশ্বাসটো কুরেছিলাম।”
যারা শাক্যকে এতক্ষণ ডাকছিল, তারা এবার আরও লোকজন ডাকতে চলে গিয়েছে। শাক্যর শরীর থেকে সবটুকু রক্ত বেরিয়ে গিয়ে সে এখন নির্ভার হালকা ফুরফুরে। পালকের মতো।
তার এখন নিজের সংসার বউ মেয়ে কারও কথা মনে পড়ছে না। সে শুধু ফুলমণির কান্না ভেজা মুখের কথা ভাবছে। সে ভাবছে, ফুলমণিকে যখন শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়েছিল, তখন কী তার খুব ব্যথা লেগেছিল?
তার ভাবনার অবসরে একটা নীল রংয়ের পাখি জঙ্গল থেকে উড়ে উড়ে শাক্যর বুকের ওপর বসল।
শাক্য আবার সেই বুনো ফুলের গন্ধ পেল। আবার সে আচ্ছন্ন হল ওই গন্ধে। এবার সে সত্যি সত্যি গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল।
