কেষ্টরায়ের প্রত্যাবর্তন – সুখেন্দু হীরা
নদীয়া জেলায় জলঙ্গী নদীর তীরে তেহট্ট একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। তেহট্ট বর্তমানে তেহট্ট মহকুমার সদরও বটে। তেহট্টের প্রাচীন নাম ছিল ত্রিহট্ট। ইংরেজ আমলের আগে এ-অঞ্চলে তিনটি স্থানে সপ্তাহে দু-দিন করে হাট বসত। বারে বারে জলঙ্গী নদী গতি পরিবর্তন করায়, নদীর পূর্বতীরে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তিনটি হাট একত্রে বসতে শুরু করে। তখন এই অঞ্চলের নাম হয় ব্রিহট। ত্রিহট থেকে অপভ্রংশে তেহট্ট।
এই তেহট্টের ইতিহাসের প্রধান সাক্ষী শ্রীকৃষ্ণরায়। যাকে আদর করে তেহট্টবাসী ডাকে কেষ্টরায়। কৃষ্ণরায় তেহট্টের প্রাণের ঠাকুর। তেহট্ট ঠাকুরপাড়াতে কৃষ্ণরায় মন্দির ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করে দেন নদীয়ারাজ রুদ্র রায়।
নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার। তিনি মাটিয়ারিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাটিয়ারি হল রানাঘাট গেদে রেলপথের বাণপুর টেশনের নিকট। ভবানন্দ মজুমদারের পৌত্র রাঘব মজুমদার পরবর্তীতে ‘রায়’ উপাধি গ্রহণ করে হয়ে যান রাঘব রায়। এই রাঘব রায় মাটিয়ারি থেকে রাজধানী রেউই গ্রামে নিয়ে যান। এই রেউই গ্রাম-ই পরবর্তীকালে পরিচিত হয় কৃষ্ণনগর নামে। রাঘব রায় কৃষ্ণনগরের কাছে দিগনগর-এ এক বিরাট দিঘি খনন করেন এবং তার কাছে রাঘবেশ্বর শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
রাঘব রায়ের পুত্র রুদ্র রায় ছিলেন খুব কৃষ্ণভক্ত। তিনিই রেউই গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখেন কৃষ্ণনগর। তেহট্টের কৃষ্ণরায় মন্দিরের প্রতিষ্ঠা লিপি অনুযায়ী রুদ্র রায়ের আমলে প্রতিষ্ঠিত হলেও রাঘব রায়ের রাজত্বের আগে থেকে ত্রিহট্ট গ্রামে শ্রীকৃষ্ণরায় ছিলেন। আগে মাটির মন্দির ছিল। রুদ্র রায়ের আমলে ইস্টক নির্মিত জোড় বাংলা মন্দির হয় ঠাকুরপাড়াতে। জোড় বাংলা মন্দির বঙ্গদেশে কমই দেখা যায়। টেরাকোটা কাজে সমৃদ্ধ ছিল সে মন্দির, যদিও কয়েকবার সংস্কারের ফলে পোড়ামাটির কাজ এখন অবলুপ্তপ্রায়।
শ্রীকৃষ্ণরায়ের বিগ্রহ কষ্টিপাথরের। কৃষ্ণরায় গ্রামের কুল-দেবতা। তাই মনে করা হয়, কৃষ্ণরায়ের জনপ্রিয়তা দেখে প্রজানুরঞ্জনের জন্য রুদ্ররায় ঠাকুরের জন্য মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণরায়ের রথ-সহ অন্যান্য বৈষ্ণব তিথিতে এখানে অনুষ্ঠান হয়। সবচেয়ে বড়ো উৎসব মাঘী পূর্ণিমাতে। এই মহোৎসবে ২৪ প্রহর হরিনাম কীর্তন, সাধু সমাগম, নরনারায়ণ সেবা হয়ে থাকে। আগে বারদোলের সময় কৃষ্ণরায় কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি যেতেন, ফিরতেন রথের পর।
কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে বারদোলের মেলায় ১২টি বিগ্রহ থাকত। কিছু রাজবাড়ির বিগ্রহ আর কিছু বাইরে থেকে অর্থাৎ কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির জমিদারি এলাকার বিভিন্ন মন্দির থেকে আসত। বর্তমানে নানা কারণে সব মূর্তি আসে না। আগে যে বিগ্রহগুলি থাকত সেগুলি হল, ১) বিরহীর বলরাম, ২) বহিরগাছির লক্ষীকান্ত, ৩) রাজবাড়ির ছোটনারায়ণ, ৪) রাজবাড়ির বড়ো নারায়ণ, ৫) শান্তিপুরের গড়ের গোপাল ৬) অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ ৭) নবদ্বীপের গোপাল (৮) ত্রিহট্টের কৃষ্ণরায় ৯) রাজবাড়ির কৃষ্ণচন্দ্র ১০) রাজবাড়ির গোবিন্দদেব ১১) বিরহীর মদনগোপাল ১২) শ্রী গোপীমোহন।
একবার রথ থেকে কৃষ্ণরায় পড়ে যান। পড়ে গিয়ে কৃষ্ণরায় বিগ্রহের ডান হাত ভেঙে যায়। তারপর বিগ্রহ নিয়ে মতনৈক্য শুরু হয়। সেই থেকে কৃষ্ণরায় আর কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি আসেন না। এ-নিয়ে মামলা মোকদ্দমা সব হয়েছে। বর্তমানে অগ্রদ্বীপের গোপীনাথও কৃষ্ণনগর যান না। তাদের সঙ্গে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির কেস-কাছারি হয়েছে। এখন গোপীনাথের ছবি বসিয়ে একটি রথ টানা হয়। আগে দুটি রথ টানা হত একটি গোপীনাথের, অপরটি কৃষ্ণরায়ের।
এই পড়ে গিয়ে হাত ভাঙার ঘটনাটা অনেকে জানতেন না তবে কৃষ্ণরায়ের হাত ভাঙার জন্য তেহট্টবাসীর শাপে বর হয়েছিল। সে ঘটনা পরে বলছি। শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শ্রীরাধিকার বিগ্রহ থাকে। কিন্তু কৃষ্ণরায়ের কোনো রাধিকা নেই। এ-নিয়েও এখানে একটি জনশ্রুতি আছে।
আগে কৃষ্ণরায়ের রাধিকা ছিল। রামদেব নামের এক ব্যক্তির লক্ষ্মী নামে এক বাল্যবিধবা কন্যা ছিল। লক্ষ্মীদেবী ছিলেন কৃষ্ণরায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি ভক্তিভরে কৃষ্ণরায়ের সেবা করতেন। তিনি কোনোভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তখন তাঁর পিতা রামদেব বা গুরুদেব তাকে ভৎসনা করলে তিনি রাধিকা বিগ্রহের সঙ্গে বিলীন হয়ে যান। পরবর্তীকালে দুর্বৃত্তরা মন্দির আক্রমণ করে রাধা বিগ্রহের অলংকারের লোভে মূর্তিটি চুরি করে নিয়ে যায়। সেই থেকে কৃষ্ণরায় একাকী জীবন যাপন করছেন।
এই কৃষ্ণরায়ও একবার চুরি হয়ে যায়। সময়টা ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জুন, ভোর চারটে। সকালের আলো ঠিকভাবে ফুটতে তখনও অনেকটা দেরি। পুব দিকের আকাশে ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা দিয়েছে সবে। এমন সময় নিত্যদিনের নিয়ম মেনে কৃষ্ণরায়কে জাগাতে যান পুরোহিত। গিয়ে দেখেন মন্দিরের দরজা হাট করে খোলা। তালা কেটে দরজা খোলা হয়েছে। এক অশনি সংকেতে পুরোহিত মশাই মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করে দেখেন কৃষ্ণরায় শয়নে নেই। পুরোহিতের মাথায় যেন বাজ পড়ল। খবর ছড়াতে বিলম্ব হল না।
সাধারণ লোক স্বাভাবিক সময়ে ঘুম ভাঙার আগেই উঠে পড়ছেন এই দুঃসংবাদে। হাহাকার পড়ে গেল চারিদিকে। বেলা যত বাড়তে লাগল তত খবর চাউড় হতে লাগল। লোকজন রাস্তায় নেমে এল। প্রায় দশ হাজার লোক জড়ো হয়ে গেল দেখতে-দেখতে। তেহট্ট পি.ডব্লিউ.ডি. মোড়ে অবরোধ শুরু হয়ে গেল। ঘেরাও হল থানাও। সেদিন তেহট্টে কারও বাড়িতে হাঁড়ি চড়ল না। কৃষ্ণরায়ের অন্তর্ধান-শোকে অরন্ধন চলেছিল বেশ কয়েকদিন।
তখন তেহট্ট থানার ও.সি. অর্থাৎ অফিসার্স-ইন-চার্জ অর্থাৎ ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ছিলেন সাব ইন্সপেক্টর প্রবীর চ্যাটার্জী। এস.ডি.পি.ও. তেহট্ট অর্থাৎ সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার, তেহট্ট অর্থাৎ তেহট্ট মহকুমার পুলিশ আধিকারিক ছিলেন সুব্রত ভট্টাচার্য। জনগণের দাবি অবিলম্বে তাঁদের প্রাণের ঠাকুর কেষ্টরায়কে ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো কথাই তারা শুনতে চাইছে না। বেলা গড়িয়ে গেল সারা তেহট্ট অবরুদ্ধ হয়ে রইল। মানুষজনও শোকে মুহ্যমান। পরম আত্মীয় বিয়োগেও এমন শোকের আবহাওয়া তৈরি হয় না।
এস.ডি.পি.ও. সাহেব বাহিনী-সহ ও.সি.-কে নিয়ে পি.ডব্লিউ.ডি. মোড়ে এগোতে গেলে জনগন ঢিল পাটকেল ছুড়তে লাগল। অনেক বুঝিয়ে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করা হল। পুলিশ জানত কৃষ্ণরায়ের সঙ্গে তেহট্টবাসীর ভীষণ ভাবাবেগ জড়িয়ে আছে। বলপ্রয়োগ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বেলা তিনটের সময় এস.ডি.পি.ও তেহট্ট আশ্বাস দেন, এক সপ্তাহের মধ্যে কেষ্টরায়কে ঠিক খুঁজে এনে দেবেন। তারপর গিয়ে অবরোধ উঠল।
তেহট্ট থানার পুলিশ তদন্ত শুরু করল। স্থানীয় কিছু সন্দেহভাজন ঘরচোরকে তোলা হল। জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। কিন্তু কেষ্টরায়ের হদিশ পাওয়া গেল না কিছুতেই। সবাই বলাবলি করল একা ওপারের ডাকাতদের অর্থাৎ বাংলাদেশের ডাকাতদের।
তেহট্ট থানা সীমান্তবর্তী থানা। তখন সীমান্তে ছিল না কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্তবর্তী থানাগুলোতে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ডাকাতি হত। বাংলাদেশের ডাকাতরা সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সীমানায় ঢুকে পড়ত। তারপর পাটক্ষেত বা ধানখেতের মধ্যে লুকিয়ে থাকত। রাত দশটা বাজলে তারা নেমে পড়ত ডাকাতি করতে।
ভারতের সীমান্তে প্রহরায় থাকত এবং এখনও থাকে বি.এস.এফ অর্থাৎ বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। আর বাংলাদেশ সীমান্তে থাকত বি.ডি.আর অর্থাৎ বাংলাদেশ রাইফেলস। এখন অবশ্য বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বলে বি.জি.বি. অর্থাৎ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। সন্ধ্যা হলে বি.ডি.আর. সীমান্ত ছেড়ে চলে যেত। তাদের রাত পাহারায় কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কারণ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কোনো ভয় নেই। এত দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রাতের আঁধারে নজরদারি করা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষে সম্ভব হত না সবসময়।
রাত হলেই সীমান্তবর্তী থানাগুলো তটস্ত হয়ে থাকত। সীমান্তবর্তী এলাকায় যেখানে তারা পাহারা দিতেন, তার অন্যদিকে ডাকাতি করে বাংলাদেশী ডাকাতরা বেরিয়ে যেত। পুলিশের উচ্চ পদাধিকারীও রাত জেগে এই ডাকাতি বন্ধ করতে পারতেন না। যতদিন না সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে, ততদিন এই অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের।
কাঁটাতার দেওয়ার ফলে কিছু জমি কাঁটাতারের ওপারে থাকায় সেটা অরক্ষিত হলেও সার্বিকভাবে সীমান্তবর্তী এলাকায় সুরক্ষা বেড়েছে। গরু চুরি বা ঘর ডাকাতি থেকে মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তবর্তী গ্রামের গৃহস্থরা।
এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। কেষ্টরায় ফিরলেন না। তখন সীমান্তে কাঁটাতার না থাকায় দিনের বেলা চাষের মাঠে গেল দু-দেশের লোকেদের সাক্ষাৎ হত। সাক্ষাৎ হলে তাঁরা সুখ-দুঃখের কথা কইত। ওপারের লোকজনও জেনে গেল কেষ্টরায় নিখোঁজ হয়েছেন। ওপারের লোকজনই খবর দিল মেহেরপুর জেলার শালিকা গ্রামে একজনের বাড়িতে কৃষ্ণরায় আছেন। আরও জানা গেল শালিকা গ্রামের তিন ডাকাত ইমরান, জুম্মত ও ইমাদুল কৃষ্ণরায়কে চুরি করে নিয়ে গেছে। সেই গ্রামে খালেক শেখ এক ‘লাইনম্যান’ থাকে।
লাইনম্যান শব্দটি সে সময় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে খুবই পরিচিত শব্দ ছিল। লাইনম্যান মানে মিডলম্যান অর্থাৎ মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি। সীমান্তবর্তী এলাকাতে যে চোরাচালান চলত, তার মধ্যস্থতা বা দালালি করত এরা। এরা এপারের ক্রেতা এবং ওপারের বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ করে দিত। প্রয়োজন বোধে তাদের পুলিশ, বি.এস.এফ, বি.ডি.আর.-এর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে দিত।
তখন তেহট্ট সীমান্তে দিয়ে পাচার হত অর্থাৎ ভারত থেকে যেত গরু, চিনি, নুন, ডিম, মাছ। ওপার থেকে আসত ছাট কাপড়, সুপারি, ‘ইলেকট্রনিক গুডস’ ইত্যাদি। ছাট কাপড় বলতে বাংলাদেশে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির পোশাক বানানোর পর যে কাপড় উদ্বৃত্ত হত, সেগুলো ভারতে পাচার হত। এই চোরাচালানকে সাধারণ লোক ‘ব্ল্যাক’ করা বলত। এমনকী যারা বিনা পাসপোর্ট-এ বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসত এবং ভারত থেকে বাংলাদেশ যেত, তাকে ‘ব্ল্যাক’-এ যাওয়া বলত।
তেহট্টের দিকে এরকম লাইনম্যান ছিল সুবল ঘোষ, গবরা শেখ ও সফদার শেখ। সুবল ঘোষ দু-একবার থানায় ধরাও পড়েছে। তাই ওসি তেহট্ট সুবল ঘোষকে চিনতেন।
সুবল ঘোষের থানায় ডাক পড়ল। সুবল ঘোষের সঙ্গে ওপারের খালেক শেখের গভীর বন্ধুত্ব। খালেক এপারে আসলে সুবলের বাড়িতে ওঠে। সুবল সাইকেল চালিয়ে মেহেরপুর পর্যন্ত ঘুরে আসে। থানার বড়োবাবু সুবল ঘোষকে বলেন, “যদি খালেককে বলে কেষ্টরায়কে আনতে না পার, তোমাকে পিডব্লিউডি মোড়ে ঝোলাব। অর্থাৎ ঝুলিয়ে পেটাব।” এসডিপিও সাহেবও কড়াভাবে বলেন, “তাহলে তোমাকেও খালেকের সঙ্গে শালিকা গ্রামে গিয়ে থাকতে হবে।”
কেষ্টরায় চলে যাওয়ার কারণে সুবল ঘোষেরও মন খারাপ। সুবল ঘোষ আরও দুই লাইনম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে। তিনজন মিলে বাংলাদেশের শালিকা গ্রামে যায়। খালেকের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলে। খালেক শালিকার তিন ডাকাতকে ভালো মতো চেনে। খালেক তিনজনের সঙ্গে কথা বলেন। সৌভাগ্যক্রমে কৃষ্ণরায় তখনও শালিকা গ্রামে আছেন। বিদেশে পাড়ি দেননি। এত প্রাচীন এবং ঐতিহ্যশালী বিগ্রহ বিক্রি হল না?
কারণ কৃষ্ণরায়ের হাত ভাঙা। সেই যে কৃষ্ণনগরে রথ থেকে পড়ে কৃষ্ণরায়ের হাত ভেঙে যায়। এই খুঁতের জন্য ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছিল না। এ যেন সেই খুঁতওয়ালা মানুষ বা ছাগ যাকে দেবতার সামনে বলি দেওয়া যায় না। খুঁতওয়ালা মানুষ, যাকে বলি দিতে নিয়ে গিয়েও ছেড়ে দিতে হয়। এক্ষেত্রেও প্রায় সে রকমই ঘটল। তিন ডাকাত কৃষ্ণরায়কে ফেরত দিতে রাজি হল। কীসের বিনিময়ে জানা যায়নি।
তিন ডাকাত বলে, “আমরা সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে ‘ইন্ডিয়া”-র পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আসব। আমরা ইন্ডিয়াতে ঢুকব না। লাইনম্যানদের হাতে কেষ্টরায়কে তুলে দেব না। কারণ ওদের বিশ্বাস নেই, ওরা বেশি দামে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেবে।” এই কথা ওসি তেহট্টকে জানায় সুবল ঘোষ। প্রবীরবাবু বলেন, “ঠিক আছে আমি আনতে যাব।”
জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের এক রাতে ওসি তেহট্ট প্রবীর চ্যাটার্জী, সঙ্গে সুবল – বাংলাদেশের সীমানায় পাট খেতের আড়ালে অপেক্ষা করতে থাকে। তাদের দূর থেকে লক্ষ্য রাখতে থাকে সাদা পোশাকে থানার পুলিশ। বি.এস.এফ. ও বি.ডি.আর.-কে কিছু জানানো হয়নি। জানানো মানে হাজার আইনি জটিলতা।
বর্ষাকাল, ব্যাঙের ডাক, ঝিঝি পোকার ডাক, সদ্য সদ্য অমাবস্যা গেছে, শুক্লপক্ষ হলেও চাঁদ উঠে ভুলেও গো, তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার, জোলো হাওয়া, সাপখোপের ভয়, সব মিলিয়ে গা ছমছমে পরিবেশ। কতক্ষণ অপেক্ষ করতে হবে কে জানে?
অবশেষে রাত দুটোর সময় বেশ দূরে টর্চের আলো জ্বলে ওঠে। বুকে আশার সঞ্চার হল। আরও এগোতে দেখা যায় একটি আলোর বিন্দু উঠছে আর নামছে। আরও কাছে আসতে বোঝা গেল বিড়ি টানছে একজন। আরেকজানের হাতে একটি বস্তা। তাতেই বন্দি আছেন কৃষ্ণরায়।
কৃষ্ণরায় থানায় পৌঁছাতেই সারা তেহট্টে সাড়া পড়ে গেছে। ভোর হওয়ার আগেই থানা ভরে গেল লোকে। থানা প্রাঙ্গনেই শুরু হল কীর্তন। থানার সামনের কালী মন্দিরের আপাতত ঠাঁই হলো কৃষ্ণরায়ের। সবাই প্রবীরবাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে চায়। প্রবীরবাবু বলছেন, “কেষ্টরায় নিজের ইচ্ছাতেই ফিরেছেন।”
ঠিক হল পরবর্তী ১৪ জুলাই, উলটো রথের দিন মহাসমারোহে কৃষ্ণরায়ের অভিষেক হবে মন্দিরে। ওইদিন পর্যন্ত তেহট্ট জুড়ে চলতে থাকে উৎসব। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলেছিল উৎসব। সিদ্ধান্ত মতো উলটো রথের দিন কেষ্টরায় তাঁর নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন।
.
তথ্য ঋণ:
১) ক্ষিতীশ-বংশাবলি-চরিত্র: শ্রীকীর্তিকেয় চন্দ্র রায়
২) বর্তমানের আলোকে অতীতের কৃষ্ণরায়: তথ্য সংকলন ভক্তরাম বিশ্বাস
.
“এই ঘটনা আমি তৎকালীন ওসি তেহট্ট প্রবীর চ্যাটার্জির কাছে শুনেছিলাম। পরবর্তীকালে প্রবীরবাবু যখন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতে সি.আই. (সার্কেল ইন্সপেক্টর) ভাঙ্গড় ছিলেন, তখন আমি এসডিপিও বারুইপুর ছিলাম। তিনি ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে ঢুকে প্রাচীন বিগ্রহ উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন শুনে রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। প্রবীরবাবু অবসর গ্রহণের পর ১০ জুলাই ২০২২ মারা যান। এই লেখার সময় তেহট্ট থানার রেকর্ড ঘেঁটে, সুবল ঘোষ (নাম পরিবর্তিত) এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে লেখা হয়েছে।”
