সবুজ অন্ধকারে নীল মৃত্যুতে – সুকুমার রুজ
ওফ। কী অন্ধকার। কোথাও একটু আলোর বিন্দুও দেখা যাচ্ছে না। কেন? এত অন্ধকার কেন? তবে কী রাত নেমেছে? নাকি চোখে দেখতে পাচ্ছি না কিচ্ছু? হয়তো দেখতেই পাচ্ছি না। তাই চারিদিক এমন আঁধার ঢাকা মনে হচ্ছে। রুমি কোথায় গেল? ওর কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না কেন? রুমি! রুমি….! এ কী! গলা থেকে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছে না কেন? তবে কী স্বপ্ন দেখছি আমি? নাহ। স্বপ্ন নয়। ঘুমিয়ে তো নেই, যে স্বপ্ন দেখব। জেগে আছি তো। এ কী! চোখদুটোও তো খুলতে পারছি না। মনে হচ্ছে যেন কেউ আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে চোখের পাতাদুটো। দু-হাতে টেনে চোখদুটো খুলতে পারলে….। আরে! হাত পাও তো নাড়াতে পারছি না। তবে কী মারা গেছি আমি! তাই বা কী করে হয়। ওই তো দূরে একটা গাড়ি যাওয়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। হ্যাঁ, শুনতে তো পাচ্ছি ঠিক। ভাবতেও তো পারছি। তা হলে…! নিশ্চয় মরিনি আমি।
আমার তো দিব্যি মনে পড়ছে, বিকেলে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলাম এ.এস.আই সরকারের বাড়ি। ওর বোনের বিয়েতে নেমন্তন্ন। পেছনে রুমি আমাকে আঁকড়ে ধরে। জঙ্গল এলাকাটা তাড়াতাড়ি পার হওয়ার জন্য বেশ জোরেই চালাচ্ছিলাম। গাড়ির স্পিডের কাঁটা একশো ছাড়িয়ে ছিল মনে পড়ছে। হঠাৎ সামনে একটা টানটান কাছি চোখে পড়েছিল। রাস্তার এ-ধার থেকে ও-ধারে দুটো গাছের সঙ্গে টানটান করে বাঁধা ছিল। মনে পড়ছে, ব্রেকও কষেছিলাম। কিন্তু ওই মোটা দড়িটা বুকে ঠেকার আগে থামতে পারিনি। তারপর…! তারপর আর কিছু মনে পড়ছে না। তা হলে কী ছিনতাইবাজদের কবলে? রুমির গায়ে গয়না ছিল বেশ কিছু। তা ছাড়া রুমি আজ সেজেও ছিল দারুণ। সবুজ কাঁথাস্টিচ, কালো ব্লাউজ, লিপস্টিক, রুজ, ব্লাশার, আই-লাইনিং। দারুণ দারুণ লাগছিল ওকে।
রুমি! রুমি…। ওহ! গলাটা কেন যে কাজ করছে না। হাত-পা, সারা শরীরটাই অসাড় হয়ে আছে। ওই তো। একটা পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছি। প্যাঁচার ডাক মনে হচ্ছে। প্যাঁচা, নাকি কাঠঠোকরা! ব্রেনটা ভাল কাজ করছে না। আমি কী পাকারাস্তার ওপর পড়ে আছি, নাকি জঙ্গলে? বুঝতে পারছি না। অনুভূতি শক্তিটাও হারিয়েছি মনে হচ্ছে। আমি মাটিতে শুয়ে আছি নাকি হাওয়ায় ভাসছি; তাও বুঝতে পারছি না। তবে বেঁচে আছি, এটা বুঝতে পারছি। অন্তত মগজের কিছুটা অংশ নিশ্চয় কাজ করছে। তা না হলে ভাবতে পারছি কী করে। আমি রথীন দত্ত, কাঁকনতোড় থানার ও.সি। ডাকাত-ছিনতাইবাজদের টিট করার জন্য আমাকে ট্রান্সফার করা হয়েছে। অথচ আমি নিজেই ছিনত করলে। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস। আমার রুমিকে জঙ্গলে টেনে নিয়ে গেছে? ওর গায়ের গয়নাগুলোই নিয়েছে। নাকি আরও কিছু…?
উঃ। আর ভাবতে পারছি না। ভাবতে চাইছিও না। পি ভাবা ছাড়া আর কিছু করতেও তো পারছি না। আমার মতো কাছেপিঠে কোথাও পড়ে আছে? ও বেঁচে কী না কে জানে। হয়তো বেঁচে নেই। অনেক কজন পর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হয়তো…!
রুমি। আমার মিষ্টি রুমি। তোমাকে হয়তো ে খেয়েছে ওই কুত্তাগুলো। তোমার স্বামী একজন পুলিশ অলর হয়েও তোমাকে রক্ষা করতে পারল না। ওহ! আমি আর স করতে পারছি না রুমি, তোমার অবস্থা ভেবে আমার মর যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মরতেও তো পারছি না। ফ একাংশ যে বেঁচে আছে! মনে পড়ছে, একবার ভিড় তোমার বুকে কনুই মারার জন্য এক বেয়াদপকে কেমন চটি দিয়েছিলাম। অথচ এখন আমি….! তুমি কী বেঁচে আছ কনি নিশ্চয় বেঁচে আছ। এত সহজে তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পার না। তুমি বলেছিলে, “আমরা দু-জনে কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না। মরি তো দুজনে একসঙ্গে মরব।” এই বলে দুজ হাতে-হাত ধরে সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম একসঙ্গে হানিমুন, সেই সমুদ্রস্নান, সেই অঙ্গীকার তা বেশি পুরোনে হয়নি। তুমি মরতে পার না। তুমি মরতে পার না রুমি
এইতো, কাছাকাছি কারও নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি যেন। তা হলে নিশ্চয় রুমিও পড়ে আছে কাছাকাছি! কমি কী আমার মতো অসাড় হয়ে গেছে? আমার মতো কোন স্টেজে আছে। হয়তো নড়াচড়ার শক্তি অবধি নেই ওর উ শয়তানগুলো…! যদি বেঁচে যাই তা হলে দেখে নেব শুয়োরের বাচ্চাগুলোকে। একটা একটা করে তুলব, আর লক-আে পিটিয়ে আধমরা করব। বেঁচে কী উঠব না? কেউ হাসপাতালে পৌঁছে দিলে ঠিক বেঁচে যাব। হয়তো তেমন কিছু হয়নি আমার! শরীরের কিছু অংশের নার্ভাস সিস্টেম কোলাঙ্গ করে গেছে মনে হচ্ছে।
পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম কোলাদ। বহুদিন আগে শোনা গম্ভীর গলার এই মেডিক্যাল টার্মগুলো হঠাৎ মনে পড়ে গেল কী করে। কবে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে ট্রেনিং নেওয়ার সময় কয়েকটা ফিজিওলজি ও অ্যানাটমির ক্লাস করতে হয়েছিল। অ্যানাটমির জ্ঞান না থাকলে লক-আপে আসামী পেটানোর সময় চোট পেয়ে আসামী মারা যেতে পারে। রক্তারক্তি হতে পারে। তাই পুলিশ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারবাবু এসেছিলেন ক্লাস নিতে। তাঁর বলা জবরজং শব্দগুলো তো ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে মনে পড়ে যাচ্ছে এখন। যদ্দুর সম্ভব আমার এখনকার এই অবস্থাকে বলে ‘গিলে বারে সিনড্রোম’। রগে আচমকা জোর চোট লাগলে এমন হয়। মারাত্মক শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করা যায় খালি হাতে, শারীরবিদ্যা সঠিকভাবে জানা থাকলে। যেমন কণ্ঠনালীর ওপর আচমকা জোরে রদ্দা মারলে কখনও কখনও এই অবস্থা হয়। ডাক্তারের কথাগুলো কানে বাজছে যেন, “ব্রেনের থ্যালামাস সেরিবেলাম আর বেসাল গ্যাঙলিয়নের মাঝে সাময়িক বাধা এসে যায়। তাতে ব্রেনের কিছু অংশ কাজ করে, বাকিটা নিষ্ক্রিয় থাকে। এই অবস্থায় আপাতদৃষ্টিতে মৃত মনে হয়। আক্রান্ত স্নায়ুতন্ত্রের ওই বাধা সরে গেলে, আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পায়।”
এইসব বলতে বলতে ব্ল্যাকবোর্ডে এঁকে বুঝিয়েছিলেন সেই ডাক্তার কাম শিক্ষক। কী করে যে সব মনে পড়ে যাচ্ছে। ব্রেনের সেরিব্রাম এরিয়ার ডানদিকটা বোধহয় সজীব হয়ে আছে। তাই স্মৃতিটা খানিক কাজ করছে। সুষুম্না-শীর্ষকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ায় শরীরের অঙ্গ ও মাংসপেশিগুলোকে নির্দেশ দিতে পারছে না মস্তিষ্ক। সে কারণেই হয়তো সেরিব্রাম, মানে গুরু মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই মগজের গুহায় গুহামানবের মতো লুকিয়ে থাকা কথাগুলো গুহা থেকে বেরিয়ে পড়ছে।
“আপনারা মনে রাখবেন। এই অবস্থায় কিন্তু হৃৎপিণ্ড ক্ষীণভাবে চালু থাকে। চিকিৎসা করলে সুস্থ হয়ে যায়।” ডাক্তারের গম্ভীর গলাটা বাজছে কানে। তা হলে আমিও নিশ্চয় সুস্থ হয়ে যাব। যদি কেউ হাসপাতালে দয়া করে পৌঁছে দেয়। হয়তো সুস্থ হতে সময় লাগবে। লাগুক না। ব্যাটারা যাবে কোথায়! এ অঞ্চলের সবকটা ছিনতাইবাজকে চিনি! একবার লক-আপে পুরেও ছিলাম কয়েকটাকে। কিন্তু স্থানীয় নেতার টেলিফোন পেয়ে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তবুও কড়কানি দিয়েছিলাম ভালই। পেঁদিয়ে হালুয়া টাইট করে দিয়েছিলাম। তারই ঝাল মেটাল বোধহয়। ওরে ব্যাটা! আমিও ও.সি. রথীন দত্ত। নেহাত অফ-ডিউটিতে একা পেয়ে গেছিস। দিনের বেলা বলে আর্মস্ নিইনি সঙ্গে। কী ভুল যে করেছি। বেঁচে যদি যাই…।
আরে! একটা গোঙানির শব্দ পেলাম যেন। তবে কী পাশেই পড়ে থাকা রুমির জ্ঞান ফিরেছে? ও কী আমাকে দেখতে পাবে? নাকি অন্ধকারে….। রাস্তা দিয়ে দু-একটা গাড়ি যাওয়ার শব্দ কানে আসছে। তা হলে আমরা নিশ্চয় জঙ্গলের মধ্যে পড়ে আছি। রাস্তায় থাকলে তো…। আচ্ছা। গাড়ির আলো কী পড়বে না শরীরে? হয়তো ঝোপঝাড়ের আড়ালে ফেলে দিয়ে গেছে। তা না হলে সেই বিকেল থেকে কারুর কি নজরে পড়তাম না। গোঙানিটা কানে আসছে। শব্দটা যেন আরও কাছে। তাহলে নিশ্চয় রুমি দেখতে পেয়েছে আমাকে। হয়তো আঁধার নামেনি এখনও। গোধূলির আলো আছে। আমার চোখের নার্ভগুলো কাজ করছে না বলেই হয়তো সব অন্ধকার লাগছে।
নাহ। সব তো অন্ধকার নয়। হালকা হলুদ বিন্দুবিন্দু কিছু দেখা যাচ্ছে। সূর্য ডোবা আলোতে সর্ষেক্ষেত যেমন দেখতে লাগে অনেকটা ঠিক…! না-না-না, ঠিক সর্বেক্ষেতের মতো নয়। অনেকদিন আগে কলকাতায় কোনো এক চিত্রশিল্পীর ছবির একজিবিশনে একটা ছবি দেখেছিলাম। ছবিটার নাম ছিল সানফ্লাওয়ার। অনেকটা সেরকম কিছু দেখতে পাচ্ছি। হলুদ রংটা হালকা সবুজে বদলে যাচ্ছে যেন। রুমির পরনের কাঁথাস্টিচ শাড়িটার মতো রং। তাও তো নয়। সবুজ থেকে কমলা, না, না কমলাতেও থামল না। কমলা থেকে গাঢ় লাল হয়ে গেল। ঠিক যেন জমাট বাঁধা রক্ত। রক্তগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। বেগুনি, হ্যাঁ, বেগুনিই তো! নাকি গাঢ় নীল। শুধু একটা জমাট বাঁধা রং দেখতে পাচ্ছি। আর কিছুই নয়। যাঃ! হ্যালুসিনেশন নাকি গাঢ় নীলটা আবার কালো হয়ে গেল। কালো ঠিক নয়। ঘন সবুজ অন্ধকার। অন্ধকার কি ঢেকে দিচ্ছে আমাদেরকে! তা হলে, আমাদের তো কেউ দেখতে পাবে না! আচ্ছা! রুমি যদি বেঁচে থাকে, ও কী কোনওরকমে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে না? এমনিতে ও তো সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সবাই যেন চোখ দিয়ে গিলে খেতে চায় ওকে। ওর কনকচাঁপা রংয়ের শরীর, শরীরটাও ফুলের মতো। অসাধারণ সুন্দরী। চোখ তো টানবেই। আমার চোখও তো টেনেছিল বেলগ্রামে পোস্টিং থাকার সময়। আমি নিজের করে নিতে পেরেছিলাম রুমিকে। ওই কুত্তার বাচ্চাগুলোর নখের আঁচড়ে হয়তো ছিঁড়েখুড়ে রক্তে ভর্তি হয়ে আছে ওর মুখ।
কোথায় তুমি? রুমি তুমি কোথায়? একটু চিৎকার করতে চেষ্টা কর তুমি! কেউ অন্তত আমাদেরকে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দিক! আচ্ছা! কোনো জোয়ান মদ্দর চোখে পড়লে, ও এসে আবার রুমির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না তো? আমাকে তো মৃতই ভাববে। ওর সোনা রং শরীরটা হয়তো উদোম হয়ে আছে! ওর শখের কাঁথাস্টিচ শাড়িখানা হয়তো ছিঁড়ে ফেলেই দিয়েছে। এ অবস্থায় দেখে সেও হয়তো…। না না, মানুষ কী এত পাষণ্ড হয়। হয় না। তাই বা কী করে বলা যাবে! এই তো কিছুদিন আগেই কাগজে একটা খবর ছিল, ‘এক যুবতীকে গলা টিপে মেরে ফেলার পর তাকে ধর্ষণ করেছে এক পশু।’
হ্যাঁ, পশু ছাড়া আর কী। ডারউইনের মতে, মানুষ তো এক সময় পশুই ছিল। বনমানুষ, এপম্যান। হোমো অ্যাবিলিস, পিথেকানথ্রোপাস ইরেকটাস, নিয়ানডারথাল। কী আশ্চর্য। কোনো একসময়ে পড়া বিষয়গুলো একের পর এক মনে পড়ে যাচ্ছে। সব শেষে এল হোমো স্যাপিয়েনস। বুদ্ধিমান মানুষ। বুদ্ধিটা বেড়েছে। কিন্তু পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো যায়নি নিশ্চয়। তা না হলে কী করে খবর হয়; চৌদ্দোবছরের মেয়েকে ধর্ষণকারী সাতষট্টি বছরের স্থানীয় নেতাকে পুলিশ আড়াল করতে চাইছে।
আমিও তো ফরেস্টের রেঞ্জার সাহেবকে আড়াল করতে ফুলমতির এফ.আই.আর নিইনি। ফুলমতি তার ছেঁড়াখোড়া শরীরটা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গিয়েছিল। রেঞ্জার যা করেছিল, তা পশুর কাজ ছাড়া আর কী। আর আমি? কিন্তু আমার যে উপায় ছিল না! টেলিফোনে আর একটা পশু হুমকি দিয়েছিল যে!
আচ্ছা, এই শাল-মহুলের জঙ্গলেও পশু আছে নিশ্চয়! বাঘ বোধহয় থাকে না। হায়না কী থাকে? শেয়াল নিশ্চয় থাকে! শেয়াল সব জঙ্গলেই থাকে। তা হলে কি শেষে শেয়ালের পেটেই যেতে হবে!
কাছাকাছি কিসের শব্দ যেন! শেয়াল এল নাকি! শেয়ালের পায়ে কী শব্দ হয়! না পায়ের শব্দ তো নয়; ক্যুইক্যুই শব্দ শুনতে পাচ্ছি! নিশ্চয় দু-দুটো মাংসল শরীর দেখে শেয়ালটা খুশিতে কাঁই-কুইিয়ে উঠেছে! নাঃ, কানদুটো ঠিকমতো ধরতেই পাচ্ছে না বোধহয়! শেয়ালের আহ্লাদ মনে হচ্ছে না। এ তো গোঙানির শব্দ! তা হলে নিশ্চয় রুমি! হ্যাঁ, রুমিই তো! ওর অস্পষ্ট গলা, “মা, মা গো! বাঁচাও! কে আছ বাঁচাও আমাদেরকে…!”
একদম আমার কাছেই রুমির আর্তস্বর। তা হলে ও নিশ্চয় আমার কাছেই আছে। হয়তো, আমার বুকের ওপরেই লুটিয়ে পড়েছে! কিন্তু আমি কিছুই অনুভব করতে পারছি না। আমাকে কী রুমি মৃত ভাবছে? নাকি মনে করছে, অজ্ঞান হয়ে গেছি! আমার এই অবস্থাকে অজ্ঞান বলা যায় কী? জ্ঞান তো আছে আমার। শুনতে পাচ্ছি, ভাবতেও পারছি। শ্বাস-প্রশ্বাসও নিচ্ছি নিশ্চয়, তা না হলে বেঁচে আছি কী করে! ও কী আমার বুকের ওঠা-নামা টের পাচ্ছে না? আমি নিজে তো কিচ্ছু টের পাচ্ছি না। কোনো যন্ত্রণার অনুভূতিও তো নেই! সব অসাড় হয়ে আছে। মগজের মোটর এরিয়াটা কাজ করছে শুধু।
মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়েই কী এমন হল? নাকি তার ওপর ছিনতাইবাজগুলো পিটিয়েছে? মাথায় হয়তো মেরেছে ভারী কিছু দিয়ে। হয়তো মেরে ফেলতেই চেয়েি আমাকে। কিন্তু আমি মরিনি। এই তো আবার সেই হলুদ ফুল। দেখতে পাচ্ছি। লক্ষ-লক্ষ-বিন্দু-বিন্দু হলুদ। না, ফুল তো নর বিন্দুগুলো জমাট বেঁধে হলুদ শাড়ি হয়ে গেল। তা হলে কী দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাচ্ছি! হ্যাঁ, শাড়িই তো। ফুলমতির শাড়ি হলুদের ওপর রক্তের ছোপও দেখতে পাচ্ছি দু-এক জায়গায় ওই তো ফুলমতি! বুধিয়া সর্দারের কচি বউ। ও এখানে ক করে এল? আমাকে দেখে হাসছে আবার। হাতে তালি মের খিলখিলিয়ে হাসছে। কী অসহ্য! থানা থেকে তো কা কাঁদতে বেরিয়ে এসেছিল ও। এখন ওভাবে হাসছে কেন আমাদের এই অবস্থা দেখেই হাসছে। হয়তো রুমির চটকানো উদোম শরীরটা দেখে হাসছে। ফুলমতি যেন একদম আমার মাথার কাছে।
তুই হাসি থামা ফুলমতি! আমি মাফ চাইছি তোর কাছে বিশ্বাস কর তোর এফ.আই.আর নেওয়ার উপায় ছিল ন আমার। তুই আসার আগে বারতিনেক ফোন এসেছিল বে কী করব বল, আমাকে তো চাকরি বাঁচাতে হবে। কী হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলি যে! বুঝতে পারছি, তুই আমার ওপর রেগে আছিস তোর মরদ বুধিয়াকে জেলে পাঠানোর জন্য। কিন্তু কী করব বল? ও রেঞ্জার সাহেবের মাথাটা দু-ফাঁক করে দিয়েছিল যে! আমারও তো চাকরি! ওকে না ধরে নিস্তার ছিল ন আমার। রেঞ্জার সাহেব যে খোদ বনমন্ত্রীর লোক ছিল। কী হল? আবার কাঁদতে শুরু করলি কেন রে ফুলমতি!
নাহ! এ তো ফুলমতির কান্না মনে হচ্ছে না! এ তো আমার রুমির কান্নার শব্দ! ওর কান্না মেশানো গলা, “ওগো তুমি কথা বলছ না কেন গো! আমি এখন কী করব…। হে ভগবান! এ তুমি কী করলে…! আমার যে সব গেল ঠাকুর…!”
কান্নায় ভেঙে পড়ল রুমি। হয়তো আমার বুকের ওপরেই আছাড়ি-পিছাড়ি করছে! আমি কিছুই অনুভব করতে পারছি না। ওর ভগবানের কাছে ওর আর্তনাদ পৌঁছচ্ছে কি না কে জানে! কিন্তু আমার কানের ভেতর দিয়ে সে আর্তনাদ ঢুকে গিয়ে ক্রিয়াশীল থাকা মগজটুকুতে হাতুড়ি চালাচ্ছে। এ সময় রুমিকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। যেমন সর্বস্ব হারানো ফুলমতিকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম বুধিয়াকে দশবছরের মেয়াদে জেলে নিয়ে যাওয়ার সময়। তখন মনে না চাইলেও শুকনো কথাগুলো বলতে পেরেছিলাম ফুলমতিকে। কিন্তু, এখন মন চাইছে আকুল হয়ে; অথচ এখন একটু শব্দ করার শক্তিও আমার নেই! হে ঈশ্বর! একবার অন্তত আমাকে…।
কে ঈশ্বর? ঈশ্বর তো আমি বিশ্বাসই করি না। তা হলে…? মরণকালে মতিভ্রম হয় নাকি মানুষের! ঈশ্বর এসে কী আমার শরীরের নির্জীব স্নায়ুতন্ত্রকে সজীব করতে পারবে? এর জন্য ডাক্তার চাই ডাক্তার। যে সে ডাক্তার নয়; ভাল ডাক্তার। কিন্তু ডাক্তারের কাছে পৌঁছে দেবে কে! আর যে পারছি না। মৃত্যুটাই আসুক না হয়! এই নিরালম্ব হয়ে, জীবনমৃত হয়ে বেঁচে থেকে কী হবে! অবশ্য বেঁচে থাকবই বা আর কতক্ষণ! এখুনি হয়তো হায়না কিংবা শেয়ালের আনাগোনা শুরু হবে।
যদি হায়না আসে, তা হলে কার শরীরে আগে কামড় বসাবে? রুমির, না আমার? পশুরা কী জানে, নারীদেহ পুরুষের দেহের চেয়ে নরম হয়! হয়তো জানে। নরম মাংসের লোভে হয়তো রুমির শরীরেই আগে কামড় বসাবে! রুমি হয়তো প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠবে! সে আর্তনাদ দশগুণ হয়ে আমার বুকে বাজবে। অথচ আমি কিছুই করতে পারব না। তার চেয়ে ভাল হয়, যদি আমার টুটিটা আগে ছিড়ে ফেলে। তাহলে নিশ্চয় আমি মরে যাব। আমাকে আর রুমির আর্ত-চিৎকার শুনতে হবে না। কিন্তু সে দৃশ্য কী রুমি সহ্য করতে পারবে?
আরে….! রুমির কান্নাটা আর শুনতে পাচ্ছি না। তবে কী ও অজ্ঞান হয়ে গেল! নাকি নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে কোনওরকমে এগিয়ে গিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছে? যদি কোনো সহৃদয় মানুষের দেখা পায়! তা হলে আমাকেও কী তুলে নিয়ে যাবে? নাকি মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাবে? আমি হায়না বা শেয়ালের পেটেই যাব! আর রুমি বেঁচে যাবে! না না, রুমির বাঁচাই তো দরকার! ওর অবশ্যই বাঁচা দরকার। ও বেঁচে গেলে আমিও বেঁচে থাকব। ওর পেটের মধ্যে আমার অংশই তো বেড়ে উঠছে একটু একটু করে। আমার বংশধর, আমার নামেই তো পরিচিত হবে। নাকি রুমির নামে। যার নামেই পরিচিত হোক তবুও তো আমার রক্ত বইবে তার শরীরে। কিন্তু এই দুর্ঘটনায় ওর মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেল না তো? তিনমাস চলছিল। এই সময়টা নাকি খুব সাবধানতার, ডাক্তার বলেছিল। ভগবান! ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়!
এ কী! আমি ভগবানকে ডাকছি কেন? ভগবানে তো আমার বিশ্বাস নেই। অসহায় হয়ে গেলে কী মানুষ ভগবান-বিশ্বাসী হয়ে পড়ে! রুমির কিন্তু ভগবানে বিশ্বাস আছে। কথায় বলে, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’। তা হলে রুমির বিশ্বাস কী ওর ভগবানকে টেনে আনতে পারবে এই জঙ্গলে! ইস! চোখে যদি একটু দেখতে পেতাম! অপ্টিক নার্ভগুলো ইন্যাটিভ হয়ে গেছে। ঘন সবুজ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই….!
না না, নীল রং দেখতে পাচ্ছি যেন! পুরো আকাশটা যেন ক্রমশ নেমে আসছে আমার চারদিকে। ঘন নীল আকাশ। নাকি নীল সমুদ্র। সে সমুদ্রের মধ্যে আমি যেন ক্রমশ ভেসে যাচ্ছি! হ্যাঁ সমুদ্রই তো! ওই তো রুমি বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে ঢেউ সামাল দিচ্ছে! দূরে ঝাউগাছের বন দেখা যাচ্ছে যেন! তা হলে দীঘার সমুদ্র নিশ্চয়! আমি জল টেনে টেনে সমুদ্রের ভেতরে যাচ্ছি ক্রমশ। আর রুমি কোমরজলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, “ফিরে এসো, ফিরে এসোও..ও..ও।”
মাঝে মাঝে উঁচু ঢেউ আমাকে কিংবা রুমিকে আড়াল করে দিচ্ছে। তবুও ওকে ভয় পাইয়ে দিতে আমি আরও গভীরে যাচ্ছি। এ কী! এখন, এখন তো আমার চারপাশে শুধু নীল জল! ভয়ংকর জল আমাকে ঘিরে ধরেছে। আমি আর নড়তে চড়তে, হাত-পা ছুড়তেও পারছি না। আমি কী তবে আর ডাঙায় ফিরতে পারব না? নীল জল যেন আমার শরীরে, গলায় চেপে বসেছে। কথা বলতে পারছি না। ক্রমশ শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে যেন! রুমি কী আমার পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছে? ও ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। পড়ে গেছে জলে। ঢেউ ওকে ঠেলে নিয়ে গেছে বালিয়াড়ির দিকে। ওখান থেকে ও চিৎকার করছে, “ফিরে এসো, রথীন, ফিরে এসো…। কে আছ বাঁচাও মানুষটাকে…!”
রুমি তো একা নয়, ওর সঙ্গে গলা মিলিয়েছে অনেকে। অনেকজন মিলে চিৎকার করছে। না, চিৎকার তো করছে না! ওরা তো গান গাইছে। হ্যাঁ, গানই তো;
“শাল মহুলের দেশে যাব গ…
শালের পাতা কুড়াঞে লিব
তিরিশ ট্যাকা হাজার পাব গ….
মহাজনের ঘরে দিব
রোলগোড়ের মাকড়ি লিব
ডুরে শাড়ি কিনতে যাব গ…”
ও! তা হলে রুমি নয়; শালপাতা কুড়ানি ছমড়ির দল। ওরা তো জঙ্গলের ভেতর থেকেই বেড়িয়ে আসছে। ওরা কী দেখতে পাবে না আমাদের? এই সময় রুমি যদি একটু চিৎকার করত! অন্তত যদি একটু কাঁদতেও পারত! ওদের মন খুব ভাল। দেখতে পেলে হয়তো…। ওই দলে আবার ফুলমতি নেই তো? ও থাকলে আবার….?
ফুলমতি দয়া করিস, একটু দয়া করিস! এ যাত্রায় আমাদের বাঁচিয়ে দিস্ ফুলমতি। যাঃ! ভাবনাগুলো কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কাকে বলতে চাইছি! কে ফুলমতি! ও কেনই বা আমাদের বাঁচাতে আসবে। ওর স্বামীকে তো…। এই তো আবার ভাবতে পারছি মনে হচ্ছে। আচ্ছা! পাতাকুড়ানিরা ফিরছে এখন। তার মানে এখনও সন্ধে নামেনি। তা হলে এখনও আশা আছে। কারওর নজরে যদি পড়ে যাই আমরা; তা হলে বেঁচে যাব। আচ্ছা। এত বাঁচার ইচ্ছাটাই বা হচ্ছে কেন? মরে গেলেই বা কী ক্ষতি হবে। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী বলেই কী এত বাঁচার আকাঙক্ষা। আর কিছুক্ষণ পরেই আঁধার নামবে। ঘিরে ধরবে মাংসখেকো জন্তু-জানোয়ারের দল। ছিঁড়েখুড়ে খাবে দেহটাকে। নাঃ। আর ভাবতে পারছি না। তার চেয়ে ভাল হয় এখুনি মৃত্যু এলে। ঈশ্বর বলে যদি সত্যিই কেউ থাকে, তাহলে আমার মৃত্যু দাও। নয়তো মগজের সজীব অংশটুকু কোলাস্ করে দাও।
আচ্ছা! আমি যে মরে যাইনি; তা-ই বা বলছি কী করে। রুমি তো আমাকে দেখে মৃতই ভেবেছে। যে কেউ দেখে মৃত ভাববে। হয়তো ক্লিনিক্যাল ডেথ আমার হয়নি এখনও। কিন্তু বাহ্যিকভাবে তো মৃত আমি। ব্রেনের সামান্য কিছু অংশ বেঁচে থাকলেই কী জীবিত বলা যায়। আমার হাত-পা তো কাজ করছে না! বেঁচে থাকতেও কী কাজ করে ঠিকমতো? করে না তো। তা যদি করত, তা হলে ফুলমতিকে রেপ করার জন্য ফরেস্টের রেঞ্জারকে তো অ্যারেস্ট করা দরকার ছিল। তা তো করেনি। তখনও শুধু কানদুটোই কাজ করেছিল। টেলিফোনের কয়েকটা কথা শুনেছিল কানদুটো। আর মগজটাও তখন আংশিক কাজ করেছিল। নিজের চাকরির নিরাপত্তা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারিনি। বিবেক, মনুষ্যত্ব, কর্তব্য এসব সৃষ্টি হওয়ার অংশগুলো অকেজো হয়ে গিয়েছিল। তা হলে তখনও তো পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম কোলাঙ্গ করেছিল। ঠিকই, শুধু এখন কেন; বেশিরভাগ সময়ই আমাদের পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম কোলাপ্স্ হয়ে থাকে। তা না হলে কেউ কুকাজ করলেও আমরা দেখতে পাই না। অন্যায় করলে বাধা দিতে পারি না। কেমন যেন জড়োসড়ো হয়ে থাকি। ঠিক এখনকার মতই। এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে ভাল ডাক্তার দরকার। কিন্তু কে পৌঁছে দেবে ডাক্তারের কাছে?
সবুজ অন্ধকারের মধ্যে নীল-নীল, ছায়া-ছায়া কাদের দেখা যাচ্ছে যেন! কে? কে দাঁড়িয়ে মাথার কাছে? কেউ কী এল? ডাক্তারের কাছে পৌঁছে দেবে! কে তুমি? আরে! আপনি তো নেতাজি! আপনি কী করে এই জঙ্গলে এলেন? ও আপনি নন, আপনার ছবি। সে তো থানার দেওয়ালে মাথার কাছে ঝোলানো, গান্ধীজির ছবির পাশে। আরে এ যে দেখছি থানার দেওয়াল! দেওয়ালে শুধু আপনি নন। আপনার সঙ্গে মহাত্মাজি। ও পাশে কে? দিদির ছবি মনে হচ্ছে। আপনাদের সঙ্গে ও কেন! আসলে আপনারা নন, আপনাদের ছবি। আপনাদের ছবিটা থাকলেই তো যথেষ্ট। আপনাদের আদর্শ-ফাদর্শ, চিন্তা-ভাবনা, এ সবের দরকার কী! ওসব কোনো কাজে লাগে না। পেরিফেরাল নার্ভাস সিস্টেম কোলাঙ্গ হয়ে থাকলে, আপনাদের পথ-নির্দেশ মগজ গ্রাহ্য হবে কী করে।
এ কী। আপনারা পিছিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন যে! ভয় পেলেন? নাকি লজ্জা? ও! আসলে থানার দেওয়ালগুলোও সরে যাচ্ছে। দেওয়াল সরতে সরতে জঙ্গলের ওপাশে চলে গেল যে। যাঃ। জঙ্গলটাই থানার দেওয়ালের ভেতরে চলে এল। জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীগুলোও চৌহদ্দির ভেতরে নিশ্চয়! ঘন সবুজ অন্ধকার। অন্ধকার না কী জঙ্গল। ঠিক বুঝতে পারছি না। আশ্চর্য। জঙ্গলটাও ক্রমশ বাড়ছে যে। জঙ্গল বাড়তে বাড়তে সারা দেশ হয়ে গেল। না কী সারা দেশটাই জঙ্গল। জঙ্গলে হিংস্র জন্তু থিকথিক করছে। ওরা জন্তু না কি ছিনতাইবাজ! হ্যাঁ, ছিনতাইবাজ তো। চারিদিকেই দেখছি টানটান কাছি বাঁধা। যে দিকে তাকাচ্ছি সে দিকেই কাছি। কিছু দেখতে পাচ্ছি কী করে? অপটিক নার্ভ তো কোলাপ্স হয়ে আছে। মনের চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি হয়তো। বেঁচে থাকা মস্তিষ্কটুকু কাজ করছে। শ’য়ে শ’য়ে ছিনতাইবাজ পুরো জঙ্গল জুড়ে। কত রংবেরঙের পোশাক ওদের গায়ে। লাল জামা, গেরুয়া আলখাল্লা, ফুল-ফুল ছাপ পাঞ্জাবি, তেরঙ্গা ফতুয়া। কত ধরনের পোশাক। ওরা আবার মাঝে মাঝে পোশাক বদল করছে। কারওকে ঠিকমতো চেনা যাচ্ছে না। এখুনি লালা জামা তো পরক্ষণেই তেরঙ্গা ফতুয়া। এ কী দেখছি আমি! শুধুই পাল্টে যাচ্ছে সাদা থেকে কালো, কালো থেকে সাদা। কখনও সব রং মিলেমিশে ঘোর কালো। এ কী! আমার দিকেই এগিয়ে আসছে ওরা! আরে! আমার গায়ের সমস্ত পোশাক নিশ্চয় খুলে নেবে! আমিও পুরো উলঙ্গ হয়ে যাব। একদম উলঙ্গ।
যাঃ। ন্যাংটা করে দিল আমাকে। রুমিকে তো আগেই নাঙ্গা করে দিয়েছে। আমাদেরকে নাঙ্গা করে পালিয়ে গেল ওরা! কোথায় পালাচ্ছে কে জানে! সুইজারল্যান্ড নাকি হংকং আমাদের দিকে পায়ে পায়ে কে এগিয়ে আসছে যেন! ধূর্ত শেয়াল নিশ্চয়। ওই তো থাবা বাড়িয়েছে। না-না শেয়াল নয়। শেয়ালের থাবা এত বড় হয় না। এ নিশ্চয় নেকড়ে। বিশ্বের সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী। ওর থাবায় কী বিশ্রী গন্ধ। বারুদের, নাকি তেলের গন্ধ! হ্যাঁ খনিজ তেলের গন্ধ! এবার আমাদের রক্তের গন্ধে ভুরভুর করবে থাবা। তা হলে কী এবার মরব! নাকি মরেই আছি। নাঃ। অবশিষ্ট মস্তিষ্কটুকুর মৃত্যু ঘটছে এবার। এইতো, এইতো ঘন নীল মৃত্যুতে ঢেকে যাচ্ছি আমি, আমরা। আমরা মরছি! আহা কী শাস্তি। মরছি আমরা!
