অশোকের নরককুম্ভ – অভীক মুখোপাধ্যায়
রাধাগুপ্তর কপালের পাশের ধূসর চুলগুলো ঘামে ভিজে উঠেছে। তিনি উদ্গ্রীবভাবে বধ্যভূমিতে এদিক-ওদিক পায়চারি করে চলেছেন। হঠাৎ তাঁর পিঠ ধনুকের মতো টানটান হয়ে উঠল। একদল লোক পেছন থেকে ঝনঝন শব্দ তুলে চিৎকার করে চলেছে— ‘সম্রাট আসছেন! পথ ছাড়ো! পথ ছাড়ো।’
প্রধানমন্ত্রী ঘুরে দাঁড়িয়ে দূরে চোখ কুঁচকে তাকালেন। কয়েকজন রানি এগিয়ে আসছিলেন। সাজে বিলাস-বৈভবের স্বাভাবিক ছোঁয়া। কিন্তু প্রত্যেক রমণীই নীরব। হিমশীতল চাহনি। তাঁদের সামনে হাঁটছিলেন খাটো চেহারার একজন ব্যক্তি। “ওহ!” প্রথমে চিনতে না পারলেও পরক্ষণেই নিজের দৃষ্টির বিভ্রম শুধরে নিলেন রাধাগুপ্ত। অশোক নিজেই…। সাদা, সোনালি বস্ত্রে মোড়া সম্রাটের চালচলন থেকে রাজকীয় আভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে।
সম্রাট কাছাকাছি এসে পড়তেই প্রভুর কঠোর দৃষ্টির সমক্ষে রাধাগুপ্ত মাথা নত করে প্রণাম জানালেন। মুখ তুলতেই তাঁর চোখে পড়ল রানিদের মুখে ঘৃণার তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে।
চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রধানমন্ত্রী। অসভ্য, একগুঁয়ে, নির্বোধ রমণীর দল! তিনি মনে মনে গালিবর্ষণ করলেন রানিদের। এখনও এরা তাঁকে অবহেলা করে। যদি এখনও সাবধান না হয়, তাহলে আবার রক্তগঙ্গা বইবে—কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই রাধাগুপ্তর ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা দিল।
অশোক বললেন, “ঠিক সময়ে উপস্থিত হয়েছ তুমি, রাধাগুপ্ত।” সম্রাটের চোখের রক্তাভ শিরা বিদ্বেষে চকচক করছে, “ঠিক স্থানেও…।”
পেটের মধ্যে ক্রমশ উদীয়মান শঙ্কাটাকে অগ্রাহ্য করেই রাধাগুপ্ত বললেন, “এ তো আমার বহু প্রতিভারই একটা, প্রভু।” মুখের হাসিটাকে সমানতালে ধরে রেখেছেন তিনি। “বলুন, আমি কীভাবে আপনার সেবা করতে পারি?”
অশোক উত্তর দিলেন, “দেখছি তুমি আমাদের সবচেয়ে মনোরম রঙ্গমঞ্চ থেকে আসছ,” তাঁর দৃষ্টি তখনও দূরের শূলে চড়ানো ভয়াল মৃতদেহগুলোতে স্থির। প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শূলে চাপিয়েছিলেন তিনি। “আজকের বিনোদন কি তোমার মনে ধরেছে, রাধাগুপ্ত?”
“আপনার চিত্রনাট্য ভয়ঙ্কর, সম্রাট।” কায়মনোবাক্যে কথাটা স্বীকার করে নিলেন রাধাগুপ্ত। ‘তবে এ-বিষয়ে এখানে বিশদে বলা সমীচীন হবে বলে মনে করি না। সুকুমারী রানিদের সমক্ষে …”
থেমে যেতে হল প্রধানমন্ত্রীকে। সম্রাট অশোক হাত তুলে তাঁর অসমাপ্ত বাক্যে আচমকাই বিরামের যতি বসিয়ে দিয়েছেন। অশোক মুখ ফিরিয়ে নিজের মহিষীদের দিকে তাকালেন।
“না না, তা কেন হবে? আমার রানিরা সবাই রাজনীতির ভয়াবহতার সঙ্গে ভালোভাবেই পরিচিত। কেউ কোনো বিভীষিকাসম সেনানায়কের কন্যা, কেউ-বা অত্যাচারী মন্ত্রীর ভগ্নী। এই সামান্য নাটক দেখে কি আর তাদের বুকে কাঁপন ধরবে?” এক রানির দিকে হাত তুলে প্রশ্ন করলেন অশোক, “প্রিয়তমা, এখানে ঠিক কোন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, তা নিয়ে বিশদে বলব নাকি?” প্রশ্নটা সকল রমণীকে একইসঙ্গে করা হল আসলে। কোনো উত্তর এল না। একটা অশ্লীল হাসি হাসলেন সম্রাট। বললেন, “হাঃ- তোমাদের নীরবতাকেই আমি সম্মতি বলে ধরে নিলাম। তাহলে শোনো, শুনে বলো— আমি তোমাদের ধাটা সঠিক ধরতে পেরেছি কিনা?”
অশোক একটু থেমে শুরু করলেন, “কোনো এক নগরীর সকল বাগিচায়, উদ্যানে খুব ঝলমলে ফুল ফুটছিল। ফলগুলো জন্মাচ্ছিল একেবারে টসটসে রসাল, সুস্বাদু।” অশোক বলে চললেন, “কিন্তু ওই ফুলে-ফলে ভরা গাছগুলোকে সেখানকার রাজার অত্যন্ত বিরক্তিকর বলে মনে হল। তিনি সৌন্দর্য খুঁজে পেলেন কাঁটাঝোপে তাই তিনি আদেশ দিলেন-সব গাছ কেটে ফেলা হোক। থাকবে শুধু ওই নিরাবরণ কাঁটাগাছগুলো, যেগুলো তাঁর চোখে ভালো লাগে।
‘মহারাজ, এ কেমন পরিকল্পনা?’ — আশঙ্কায় ভরা স্বরে বলল রাজার সভাসদেরা। ‘ফুল আর ফলের গাছগুলোকে রক্ষা করে কাঁটাগাছগুলোকে কেটে ফেলাটাই কি বুদ্ধিমানের কাজ হতো না?’
হম্মম! রাজা মহান মানুষ। উদার মনের ব্যক্তি। পাঁচশত সভাসদকে নিজের আদেশ পালনের জন্য যথেষ্ট সুযোগ দিলেন। তিন-তিনবার সভাসদদের জানালেন, কাঁটাগাছ বাদে বাকি সব কেটে ফেলো। কিন্তু তিনবারই সভাসদগুলো….”
অশোক থামলেন। এক দাস ফাঁসির মঞ্চ থেকে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসেছে। শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে সম্রাট প্রশ্ন করলেন, “এখনও পর্যন্ত কাহিনিটা কেমন লাগছে?” দাসটি ইত্যবসরে নত হয়ে সম্রাট এবং প্রধানমন্ত্রীকে প্রণাম জানিয়ে একটি সিলমোহর করা পুঁথি রাধাগুপ্তর হাতে তুলে দিল। সবাই নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“এই নথিতে পাঁচশো জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই আদেশ অনুপালিত হয়েছে।” দাস অধোবদনে বলল কথাগুলো।
“রাধাগুপ্ত, চেঁচিয়ে পড়ে শোনাও,” সম্রাট কঠোর স্বরে আদেশ দিলেন।
প্রধানমন্ত্রী সিল ভেঙে পড়তে শুরু করলেন অপরাধীদের নাম ও পদ। সম্রাটের উদ্দেশে সম্বোধন করলেও মুখ তুলে তাকানোর সাহস জোগাড় করতে পারেননি। প্রথমের কয়েকটা নাম পাঠ করামাত্রই উপস্থিত রানিদের দীর্ঘশ্বাসে অবিশ্বাসীর বিস্ময়বোধক হাঁসফাঁস শব্দ উঠল। অচিরেই সেই বিস্ময়ের স্থানে জন্ম নিল হাহাকার। একের পর এক রানি কান্নায় ভেঙে পড়ে অজ্ঞান হতে লাগলেন। হবে না-ই বা কেন? তাঁদের অতি পরিচিত নামগুলো কানে এসে বাজছিল, বুকে এসে লাগছিল। পিতা, তাতা, ভ্রাতাদের নাম যে!
সকল রানি এবং তাঁদের দাসীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে নতজানু হয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। কেউ জ্ঞান হারালেন। কেউ করুণা ভিক্ষা করে চিৎকার করছিলেন। অশোক তাঁর মন্ত্রীর পড়া থামিয়ে দিলেন।
অশোকের চোখে সন্তুষ্টির দৃষ্টি, পায়ের কাছে পড়ে কাঁপতে থাকা পরাজিত রমণীদের দিকে তাকালেন, “দেখলে তো, নাটকের শেষটা কেমন হল? প্রিয় রানিরা, তোমাদের স্বামী এখনও জীবিত আছে, এত কান্নাকাটির কিছু নেই। যদিও পিতা, ভ্রাতা, তাতদের হারিয়েছ। এত অপদার্থ, অবিশ্বস্ত মানুষ দিয়ে সাম্রাজ্য চলতে পারে কি, তোমরাই বলো?”
চোখের পলক ফেলতে যেটুকু বিরতি লাগে, সেটুকুতে শ্বাস নিয়ে আবার বলতে লাগলেন অশোক, “আর সুন্দর গাছগুলোর জন্যও কেঁদো না, প্রিয়ারা। মহিমান্বিত অশোকবৃক্ষ এখনও উদ্যান আলো করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও রানিরা, আনন্দ করো! অশোকের প্রজ্জ্বল রূপ তোমাদের হৃদয় ভরিয়ে তুলুক। চলো, রাধাগুপ্ত, আমাদের অনেক কাজ আছে।”
বধ্যভূমি ছেড়ে অন্য পথে সম্রাট এগিয়ে গেলেন। রাধাগুপ্ত পেছনে ফেলে আসা দৃশ্যপটের দিকে করুণ দৃষ্টিপাত করলেন। রমণীরা নিজেদের সামলে ছুটে গেলেন শূলে চড়ানো দেহগুলোর পানে, যেখানে এক এক করে তাঁদের প্রিয়জনদের নিথর শরীরীগুলোকে শূল থেকে নামিয়ে শোয়ানো হচ্ছিল।
সন্ধ্যায় অশোক প্রাসাদে ফিরলে পরে শোকে মুহ্যমান রানিদের নিয়ে উদ্যানে গেলেন। উদ্যান! উদ্যান না বলে একে মরুদ্যান বলাই ভালো। রিক্ততা, শূন্যতার মাঝে সম্রাটের সমনামী একখানা বৃক্ষ কেবল দাঁড়িয়ে আছে। একটি অশোকগাছ নির্জন সেই প্রান্তরে, কাটা বৃক্ষরাজির গুঁড়ির মাঝে অক্ষত অবস্থায় দণ্ডায়মান।
সম্রাট বিড়বিড় করে বললেন, “গাছটাকে দেখো! কালো, খসখসে কাণ্ড। অথচ দৃঢ়, শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে। এটা… এটা যেন ঠিক আমারই মতো। প্রতিটা পাতা সবুজ, চকচক করছে। টসটসে তুষারকণার মতো আঁটসাঁট ফুলে ভরা। দেখো, কত সুন্দর এই অশোক গাছটা!”
রানিরা স্নান উৎসাহে সম্মতি জানালেন। পরে রাতে সম্রাট নিদ্রামগ্ন হলে তাঁরা সরে গেলেন বারান্দার নিভৃত কোনায়। সম্রাটের কর্ণগোচর হবে না এমন একটা নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে নিজেদের বুকে জমিয়ে রাখা দুঃখ উজাড় করে কাঁদলেন, অভিযোগ ব্যক্ত করলেন, শাপশাপান্ত করলেন। সঙ্গিনীরা তাঁদের দুঃখে সমব্যথী হল। দাসীরা সহানুভূতির মৃদু শব্দে সান্ত্বনা দিল।
‘তাঁর শুধু একবার মাত্র ইচ্ছে হল, আর তিনি উপড়ে দিলেন এই সাম্রাজ্যের কত শত মহীয়ান অভিজাত বংশের শেকড়গুলোকে…! আজ আমাদের পিতা, ভ্রাতা কেউ জীবিত নেই। কে দাঁড়াবে আমাদের হয়ে? এই ক্ষতি কী করে সইব আমরা?”
কোনো এক রানির বুক থেকে বেরিয়ে আসা এই নিনাদের শব্দগুলোকে প্রশমিত করার জন্য এক দাসী ক্ষুব্ধ স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল, “এই দানবসম অশোকের ছায়াতলে ফুটে থাকার চেয়ে শুষ্ক মাঠে ফুটে উঠে মাটিতে মিশে যাওয়া অনেক বেশি শ্রেয়, রানিরা।”
“আমরাই কি একা সয়ে যাব?” দৃঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন এক রানি। “কেন আমরা অসহ্য যন্ত্রণা সইব, আর তিনি নির্দ্বিধায় ঘুমোবেন — বিবেকহীনের মতো? এমন অপরাধকে কি আমরা বিনা শাস্তিতে, প্রতিশোধহীন অবস্থাতেই ছেড়ে দেব? আমাদের পরিবারের হয়ে কিছু করার ক্ষমতাই কি আমাদের নেই?”
দাসী চুপিসাড়ে হাত নেড়ে রানিদের কাছে ডেকে নিল। মাথাগুলো ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে এল তৎক্ষণাৎ। শুরু হল মগজ-মন্থন, যার উদ্দেশ্য একটাই, অশোককে কষ্ট দেওয়া, আর তার মাধ্যমে নিজেদের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও প্রশমিত করা।
*****
প্রতিদিনের মতোই ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করেছেন সম্রাট। স্নান সেরেছেন। নতুন বস্ত্র ধারণ করেছেন। তারপর ডেকে নিয়েছেন নিজের আপ্তসহায়ককে। কিছু প্রয়োজনীয় কাজের বিবরণী দিতে দিতেই ভোরের আলো ফুটেছে। তিনি পায়চারি করার জন্য প্রাসাদের উদ্যানের দিকে এগিয়ে গিয়েছেন। অনাবৃত ঝোপঝাড়, কাটা গুঁড়ি, বিবর্ণ ঘাস- সবকিছু এক এক করে চোখে মেপে নিতেই তাঁর মুখে সেই হাসি দেখা দিয়েছে, যা কেবল এমন একজন শাসকের মুখেই ফুটে উঠতে পারে, যিনি মনে করেন গোটা পৃথিবী তাঁর নিয়ন্ত্রণে আছে। এমন সময় তাঁর দৃষ্টি পড়ল ক্ষতবিক্ষত অশোক বৃক্ষটির ওপর।
কেউ অশোকগাছটার সব ফুল তুলে নিয়ে, মাটিতে ফেলে, দলিত-মথিত করেছে। রাগে অশোকের শির পর্যন্ত জ্বলে উঠল। থরথর করে কাঁপতে লাগলেন সম্রাট। এমন বিশ্বাসঘাতকেরা ধারেকাছে থাকলে তাঁর শাস্তি নেই। ক্ষুরধার বুদ্ধি তাঁর। ধরতে বিলম্ব হল না যে কে বা কারা এই কাজ করতে পারে। তিনি নিজের রানি আর দাসীদের ধরে এনে প্রশ্ন করার আদেশ দিলেন। রাজাদেশ পালিত হল। ধরে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হল রানি আর দাসী মিলিয়ে প্রায় পাঁচশোজন’কে। অসহনীয় অত্যাচারের মুখে পড়ে তাঁরা সত্যিটা উগড়ে দিলেন।
অমন প্রকাণ্ড অশোক বৃক্ষটির প্রতি অমন ইচ্ছাকৃত এই ক্ষতি নথিভুক্ত করা হল। শাস্তিস্বরূপ পাঁচশো নারীকে দোষী সাব্যস্ত করার পরে সম্রাটের চোখে সামনে পুড়িয়ে মারা হল। রাজপরিবারের নারীদের দণ্ডাদেশের সংবাদ আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল প্রাসাদের বাইরে। লোকমুখে প্রতিবার পুনর্কথনে তাঁর নির্মমতার কাহিনি আরও ভয়াল হয়ে উঠল, জন্ম নিল অশোকের নতুন উপাধি — চন্ডাশোক।
মন্ত্রীসভায় একাকী বসে রাধাগুপ্ত মনে মনে আঁক কষছিলেন। ভাবছিলেন, কত প্রাণ গিয়েছে সম্রাটের অহংকারের বলি হয়ে, আর কত প্রাণ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে পরের বিস্ফোরিত ক্রোধের যুপকাষ্ঠে বলি হওয়ার জন্য। যেন তাঁর চিন্তারই উত্তর দিয়ে এক প্রহরী এসে জানাল যে, কয়েকজন মন্ত্রী তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী। রাধাগুপ্ত তখনই তাঁদের ভিতরে আসার অনুমতি দিলেন। মন্ত্রীরা প্রবেশ করতেই নিজে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন মহামন্ত্রী।
“মহামাত্য,” আগত মন্ত্রীদলের একজন বললেন, “আপনি মহান চাণক্যের উত্তরসূরী। আমরা কেন এখানে সমবেতভাবে উপস্থিত হয়েছি তা জানেন নিশ্চয়ই।”
নীরবে মন্ত্রীদের আসন গ্রহণ করার ইঙ্গিত দিলেন রাধাগুপ্ত।
সাময়িক কিছু আনুষ্ঠানিকতার পরে তাঁরা যা বললেন, তার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, সাম্রাজ্যে ঘটিত যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে সঠিক শাস্তি বিধান করা সম্রাটের অধিকার তথা দায়িত্ব। ভগবান ব্রহ্মা স্বয়ং পৃথিবীকে রক্ষা করতে এবং মানবকে তাদের কর্তব্য পালনে সক্ষম করতে রাজদণ্ডের সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু দণ্ড ভয়ঙ্কর এক দানব। তার অসংখ্য বাহু, পদ, দাঁত এবং চোখ। দণ্ডের উদ্দেশ্য দুষ্কৃতিদের মনে ভীতি সঞ্চার করা। কিন্তু দণ্ডের মুখই যেন রাজার একমাত্র মুখ না হয়ে ওঠে সেটাও দেখতে হবে। রাজাকে হতে হবে বসন্তের সূর্যের মতো মৃদু, যার আলোতে বিকাশ ঘটবে।
“মাননীয়রা,” রাধাগুপ্তকে উত্তরে বলতে হল, “আপনাদের বক্তব্য নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যে রাজার নিন্দা করে বা তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তার জিভ ছিঁড়ে ফেলা উচিত বলেই আমি মনে করি। যে রাজপ্রাসাদে আক্রমণ করে, তার হাত আর মাথা কেটে দেওয়া সমীচীন। এগুলো তো ন্যায়সঙ্গত শাস্তি, আমাদের সম্রাটও এগুলোই করে থাকেন। না কি আপনারা এ-বিষয়ে সন্দেহ রাখেন?”
মন্ত্রীগণ তাড়াহুড়ো করে মহামাত্যকে আশ্বস্ত করলেন। “আমরা শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন রাখি না। কিংবা সম্রাটের দেশদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ার অধিকার নিয়েও নয়। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ড যেন রাষ্ট্রের নামে হয়, তা যেন ব্যক্তিগত প্রতিশোধ চরিতার্থ করার রূপ ধারণ না করে। বিজ্ঞাপনে যেন ব্যক্তিগত ক্রোধ প্রকাশ না পায়। তাঁকে দেখা উচিত প্রজাদের রক্ষক রূপে। শোনেননি কি, লোকে কী নামে ডাকছে আমাদের প্রভুকে?”
নাকের ডগাটা একবার চুলকে নিলেন রাধাগুপ্ত। “আমি বুঝতে পারছি, মহাশয়গণ। কিন্তু এত কথা তো আমরা সিংহাসন সমক্ষে বলতে পারি না। তবে এরপরেও যদি ওই এক সহস্র মানুষের পেছনে নিজেদের নাম লেখানোর অভীদা থাকে তো আমার আর কিছু বলার নেই। কী বলেন?”
একজন অমাত্য বলে উঠলেন, “পাহাড়ের পাদদেশের একটি গ্রামে একজন তাঁতির ছেলে আছে, নাম গিরিকা। অল্পবয়সী হলেও সে গ্রামের সকল মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করে। পাশবিক আনন্দে সহপাঠীদের পেটায়। অবোলা জীবদেরও ছাড়ে না। একঘেয়েমি দূর করার জন্য মনুষ্যেতর জীবগুলোকে শুদ্ধু এনে যন্ত্রণা দেয়। পিতা-মাতার প্রতি তার মনে কোনো শ্রদ্ধা বা ভয় নেই। এমন জঘন্য স্বভাবের ব্যক্তিকে যদি রাষ্ট্রের কাজে লাগানো যায়। হে রাধাগুপ্ত, আমরা চাই তাকে রাজকার্যে বধিকের ভূমিকা দেওয়া হোক। তাহলে সম্রাট এমনতর যন্ত্রণা তথা মৃত্যুদণ্ড থেকে দূরে থাকতে পারবেন। হয়তো এমনও হতে পারে, এমন কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলে পরে তিনি সেসবের পিছু ধাওয়া করাটাও বন্ধ করে দিলেন।”
রাধাগুপ্তর মনে পড়ে গেল সম্রাট অশোকের দুই কাজল-কালো চোখ, যে চোখে আগুন ধ্বকধ্বক করে জ্বলে অহরহ। যুদ্ধক্ষেত্রে সেই পাবকচক্ষু আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু শাস্তির দিনে, এমন ভয়াবহ ভাব সাম্রাজ্যকেই অস্থির করে তুলতে পারে। তিনি অস্ফুটে বললেন, “তবে তা-ই হোক।”
*****
সভা বসল একটি নতুন করে বানানো নাতিলম্ব গম্বুজাকৃতি মঞ্চের নিচে। মঞ্চের ওপরে বসে সম্রাট রাতেরবেলায় নিজের বাগিচা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। আজও সেখানেই বসেছেন তিনি। দিনমানে উন্মুক্ত স্থান বলে সম্রাটের মাথার ওপর একটা চাঁদোয়া টাঙানো হয়েছে। অস্থায়ী ছায়াটুকু ছাড়া আর কোনো স্বস্তি পরিবেশে নেই। মঞ্চটির কারণে যেটুকু ছায়া সৃষ্টি হয়েছে, তাতেই দাঁড়িয়ে আছেন রাধাগুপ্ত। সমানে খোলা জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে আছে গিরিকা। চোখ দুটো বিস্ফারিত, লাল টকটক করছে। রোদের তাতে ঘেমেনেয়ে কুশ্রী মুখটাকে আরও বীভৎস দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে প্রাচীন কোনো অতিমানবকে অরণ্য থেকে তুলে আনা হয়েছে।
“অয়, বালক! তুমি কি মগধের প্রধান বধিকের ভূমিকা পালন করতে ইচ্ছুক?” সম্রাট সরাসরি গিরিকার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন।
গিরিকা নোংরাভাবে হাসতেই সবুজাভা দাঁতগুলো দেখা গেল। “কেন নয়, সম্রাট। আমি মনের আশ মিটিয়ে মানুষ মারতে পারব যে। ভারতবর্ষের প্রতিটা লোককেও যদি, যদি পৃথক পৃথক প্রকারে প্রাণে মারার নির্দেশ দেন, তাহলেও তা আমার কাছে হাতের ধুলোর ঝেড়ে ফেলার মতোই ব্যাপার।”
নড়েচড়ে বসলেন অশোক। “যদি বলা হয় মারার আগে তার স্বীকারোক্তি নিতে হবে?”
“আমার হাতে কোনো অপরাধী পড়লে চুপ করে থাকতে পারবে না। এমন পদ্ধতি আমি অবলম্বন করব, প্রভু, সে সব কথা গড়গড়িয়ে বলে দেবে।”
“কেমন পদ্ধতি? আর কীভাবে মারবে শুনি?” অশোকের কণ্ঠে কৌতূহল।
গিরিকা বলল, “এখানে আসার পথে কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে প্রচার করতে দেখে এলাম। মনে হল, তাদের যন্ত্রণা দেওয়ার পথই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। সম্রাট, আপনি কি জানেন নরকের রক্ষীরা কীভাবে পাপীদের শাস্তি দেয়? তারা বলে শাস্তি পাঁচ ধাপে দেওয়া হয়। প্রথমে দুটি উত্তপ্ত লৌহশলাকা গেঁথে দেওয়া হয় দুই হাতের তালুতে, তারপর দু-পায়ের চেটোকে একটাই শলাকা দিয়ে গাঁথা হয়, শেষে চতুর্থ শলাকা দিয়ে বিদ্ধ করা হয় বুক। তখন পাপীর দগ্ধ দশা। ভয়াবহ যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে, কিন্তু মরতে পারে না। যতক্ষণ না তার পাপকর্ম ধ্বংস হয়, ততক্ষণ সে ছটফট করতে থাকে।”
কথাগুলো বলতে-বলতে নিজের কথার অন্ধকার কল্পনা করে তৃপ্ত হয়ে গিরিকা যেন উন্মত্ত আনন্দে কেঁপে উঠল।
সে বলে চলল, “নরকের রক্ষীগুলো অপরাধীদের মাটিতে ফেলে কুড়ুল দিয়ে কোপায়। তারপর পা ধরে উলটো করে ঝুলিয়ে দেয়, উল্লম্বভাবে ত্বক ছাড়িয়ে ফেলে ধারালো ছুরিকার সাহায্যে। এরপর তাকে একটা রথের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে বারবার জ্বলন্ত অঙ্গারের প্রান্তর জুড়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। দেহের সংস্পর্শে এলেই রক্তাভ অঙ্গার থেকে আগুন ফুঁসে বেরিয়ে আসে। তদুপরি, একটা জ্বলন্ত পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে গিয়ে তাকে ধাক্কা মারতে মারতে ওঠানামা করানো হয় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা বহ্নিশিখার ঢালে। শেষে তার মাথা নিচের দিকে করে ছুঁড়ে দেওয়া হয় একটা বিশাল তামার হাঁড়ির মধ্যে, তার মধ্যে তখন ফুটছে গলন্ত ধাতু। সেই হাঁড়ির মধ্যে সে সিদ্ধ হতে থাকে। বুদ্বুদ ওঠে। তাকে একবার তোলা হয়, আবার পরক্ষণেই ডোবানো হয়। এমন নিরন্তর চলতে থাকে। পাশাপাশি খুন্তি দিয়ে গলন্ত ধাতুটাকে নাড়ানো হতে থাকে। গলে গলে খুলে আসে মাংস। তবুও সে মরে না, যতক্ষণ না তার পাপকর্ম ভস্ম হয়।”
অমাত্যরা আশা করেছিলেন নতুন বধিক নিয়োগ করলে সম্রাটকে তীব্র নিষ্ঠুরতা থেকে দূরে রাখা যাবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটল ঠিক বিপরীতটা। গিরিকার উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ, প্রত্যেকটি বাক্য সম্রাটের মনের মধ্যে অনুরণন তুলল। নির্মমতার গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে খেতে সম্রাটের মনে অদ্ভুত এক মোহ জন্ম নিল, যা ক্রমশ গভীর হতে লাগল সময়ের সঙ্গে। ঠিক হল, মগধের বুকেই নরকের অনুকরণে একটা স্থানের জন্ম হবে। অশোকের নরক।
সম্রাট সেখানে তাঁর শত্রুদের বন্দি করে পাঠাবেন। তারা নরক যন্ত্রণা ভোগ করবে। অথচ সেই স্থানটিকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক মনোরম উদ্যান। অপরূপ তথা অরক্ষিত। বাইরে কোথাও কোনো প্রাকার কিংবা প্রহরা থাকবে না।
গিরিকা খুটিনাটি প্রতিটা ব্যাপারই কানখাড়া করে শুনল। আতিশয্যে ভরা বাহ্যিক সাজসজ্জা থেকে শুরু করে বিলাসবহুল স্নানাগার, ফুলে সাজানো পথ ধরে এগিয়ে গেলে দেখতে পাওয়া মিথুনমূর্তি হোক কিংবা ঝর্না, সবই তার মানসচক্ষে ফুটে উঠছিল। সে বুঝতে পারছিল, সব মিলিয়ে যা জন্ম নেবে, তা হবে পৃথিবীর বুকে একখানা স্বর্গোদ্যান। কিন্তু কেবল যারা তার ফাঁদে পড়েছে, তারাই জানে – গিরিকা স্বর্গের ভেতরে নরক সাজানোতেও সমান ধরনের যত্নবান।
বাগানটি প্রস্তুত হলে গিরিকা আনন্দ হাত ঘষে চণ্ডাশোকরে বলল, “প্রভু, এই বর দান করুন যে, যে-ই এই স্থানে প্রবেশ করবে, সে যেন জীবিত ফিরতে না পারে।”
সম্রাট তার ইচ্ছা পূরণ করার আদেশ দিলেন, “যাও, আরম্ভ করো তোমার কাজ।”
গিরিকা সত্যি সত্যিই সেই উদ্যানে ভয়ঙ্কর কর্মযজ্ঞ চালিয়ে সেটাকে নরক বানিয়ে তুলল। তার আর তার প্রভুর উপাধির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে ডাকা হতে লাগল ‘চণ্ডগিরিকা’ নামে। তার নিষ্ঠুর অপকীর্তির কথা দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল, এবং তা সম্রাট অশোককে এক জ্বর শাসক রূপে প্রতিষ্ঠিত করল স্বমহিমায়।
তারপরেই এল কলিঙ্গ যুদ্ধ। কলিঙ্গ মগধ সাম্রাজ্যের তুলনায় ছোটো হলেও প্রবল শক্তিধর ছিল। নিজের শাসনকালের অষ্টম বর্ষে, চন্দ্ৰগুপ্ত মৌর্যের বংশধর অশোক শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী সেই রাজ্যকে জয় করার জন্য এগিয়ে গেলেন, যারা একসময় তাঁর পিতামহের শক্তিশালী সেনাদলকেও প্রতিহত করেছিল।
অশোক তাঁর সৈন্যদের নেতৃত্ব দিলেন শেষ যুদ্ধে, যেখানে ছোটো হলেও সমান সাহসী কলিঙ্গ সেনা তাঁর প্রতিপক্ষ রূপে মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
যুদ্ধ শেষ হল।
বিজয়ী অশোক দাঁড়ালেন রণক্ষেত্রে।
চারদিকে শত সহস্র মরদেহ ছড়িয়ে রয়েছে তখন। মৃতদেহের ভিড়ে চোরেরা চুপিসাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কেড়ে নিচ্ছিল অস্ত্র, বর্ম, মুদ্রা, আর যা কিছু তাদের পক্ষ বহন করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বিশাল শকুনের পাল কাঁপিয়ে পড়ছিল পচতে থাকা মৃতদেহগুলোর ওপর- যকৃৎ ঠুকরে খাচ্ছিল, চোখ নিয়ে গেভুক খেলছিল। চারপাশে ভয়ঙ্কর শ্বাপদের দল তখন হাড় চিবোচ্ছে, খেয়োখিয়ি করছে নিজেদের মধ্যেই। রক্তস্নাত মাটিতে কিলবিল করছে পোকামাকড়, আর তার ওপরে অনুরণিত হয়ে চলেছে মাংস লোভী মক্ষিকার গুঞ্জন।
এসব দেখতে দেখতে অশোকের স্নায়ুগুলো বিকল হয়ে আসছিল। নিজের কৃতকর্মের ভয়াবহতা তাঁকে পঙ্গু করে তুলছিল ক্রমশ। চেতনায় ঢুকে পড়ছিল কলিঙ্গের মাটি থেকে উঠে শোকের স্রোত। সেই রক্তরাগ, যা তাঁকে অন্ধ করে তুলেছিল, তা ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে যেতে শুরু করল। অশ্রু আর থামে না। যখন চোখের ঝাপসা ভাব কাটল, তখন পাপের ভয়ঙ্কর ভার তাঁর মনে চেপে বসেছে। কাঁধ নুইয়ে এল, হাঁটু ভেঙে পড়ল। অজগরের মতো জাপটে ধরছিল অসহ্য অপরাধবোধ।
রাজধানীতে ফিরে তিনি প্রথমেই গেলেন নিজের অভিশপ্ত উদ্যানে। নরকে। নরক ধ্বংসের সংকল্প তখন তাঁর মনে। ঢুকেই তিনি পেয়ে গেলেন গিরিকাকে। বছরের পর বছর ধরে অমানবিক নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে প্রায়োন্মাদ হয়ে যাওয়া বিকৃতদেহী গিরিকা। ফটকের ছায়াতে সে দাঁড়িয়ে ছিল।
অশোকের উদ্দেশ্য বুঝতে না পারলেও প্রভুকে চিনে নিয়ে গিরিকা সতর্ক করল, “প্রভু, আপনি আমাকে বর দিয়েছিলেন— কেউ যেন এই স্থানে প্রবেশ করলে আর জীবিত ফিরতে না পারে।”
অশোক হতভম্ব। “ তুমি কি আমাকে বধ করতে চাইছ?”
গিরিকার দেহের মতোই বুদ্ধিও স্থূল। উৎসাহভরে উত্তর দিল, “নিশ্চয়ই।”
স্তম্ভিত সম্রাট।
এ কাকে এনে রেখেছেন তিনি উদ্যানে?
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তিনি প্রশ্ন, “আমাদের মধ্যে কে প্রথমে এই স্থানে প্রবেশ করেছিল, গিরিকা?”
গিরিকা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, “আমি প্রভু!”
অশোক বললেন, “তাহলে প্রথম মৃত্যু তোমারই হওয়া উচিত।”
গিরিকা বুঝল তার অন্ত আসন্ন। তবুও যখন অশোকের সৈন্যরা তাকে বন্দি করতে এল, সে ভীষণভাবে লড়ল। একা একশো জনকে শেষ করে বন্দি হয়েছিল গিরিকা। অবশেষে নরকোদ্যানের প্রহরীদের হাতে সে জীবন্ত হয়ে মরেছিল।
এরপর সম্রাট অশোক নিজের হাতে নরকোদ্যান ধ্বংস করলেন, মুক্তি দিলেন সকল বন্দিদের।
অশোকের জীবনের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হল।
তবে এ-কথা ভাবার কোনো কারণ নেই যে এই একটি কাজেই অশোক নিজের রক্তাক্ত অতীতের সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এ ছিল দীর্ঘ প্রায়শ্চিত্ত পথের প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু অন্তত এই প্রথম পদক্ষেপটাই তাঁকে নরকের গহ্বর থেকে টেনে তুলেছিল।
