বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১
পর্ব ০১
এ জায়গার চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ঋজু প্রাচীন মহাবৃক্ষরা। তাদের ডালপালা কোথাও কোথাও মিলেমিশে মাথার ওপর চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে। অচেনা কোনও কোনও গাছের গুঁড়িকে আবৃত করে রেখেছে অজগর সাপের মতো লতানো উদ্ভিদ। ওপর থেকে গুঁড়িগুলোকে বেষ্টন করে মাটিতে নেমে তাদের প্রান্তদেশগুলো হারিয়ে গেছে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা প্রাচীন পাথরের ধ্বংসস্তূপের, ইতিহাসের স্মৃতি ফলকগুলোর আড়ালে। প্রাচীন বৃক্ষরাজি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ— সব মিলিয়ে মিশিয়ে চারপাশটা বেশ ছায়াময়। বিকাল শেষ হতে চলেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এ জায়গাকে গ্রাস করে নেবে অন্ধকার। একদিকে দুটো গাছের ফাঁক গলে দূরে বেশ খানিকটা জায়গা চোখে পড়ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকৃতির অতি প্রাচীন এক স্থাপত্য। বনানী ঘেরা জায়গাতে দাঁড়িয়ে সেই মন্দির স্থাপত্যের সম্পূর্ণটা দৃষ্টিগোচর না হলেও তার সার সার পর্বতাকৃতির চূড়াগুলো স্বাগতর দৃষ্টি গোচর হচ্ছে। পশ্চিমমুখী ওই স্থাপত্যের শীর্ষদেশে বেলাশেষের আলো এসে পড়েছে। স্বাগত বইতে পড়েছে পৃথিবী বিখ্যাত ওই প্রাচীন মন্দিরের শীর্ষদেশগুলি নাকি আসলে দেবতাদের বাসস্থান মেরু পর্বতের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল। হাজার বছর আগে ওই মন্দিরকে বলা হতো বিষ্ণুলোক। স্বয়ং বিষ্ণুর আবাসস্থল নাকি ছিল ওই মন্দির। হ্যাঁ, নীল আকাশের বুকে বেলাশেষের আলো মেখে যে হাজার বছরের প্রাচীন মন্দির আজও দাঁড়িয়ে আছে সেটাই মন্দির নগরী আঙ্করভাটের পৃথিবী বিখ্যাত বিষ্ণুমন্দির! স্বাগত আজই এসে উপস্থিত হয়েছে কম্বোডিয়ার ছোট্ট শহর সিয়েমরিপে যার লাগোয়া প্রাচীন মন্দিরময় অঞ্চল আঙ্কর। স্বাগতর এখনও ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি ওই মন্দির ও চারপাশের পুরাকীর্তিগুলো। কিন্তু অবশ্যই সে দেখবে সেসব। কারণ, যে কাজে সে এখানে এসেছে তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে ওই বিষ্ণুমন্দিরসহ চারপাশের প্রাচীন স্থাপত্যগুলো। বেশ কিছু বছর ধরেই ভারত সরকারের সহায়তায়, তাদের পুরাতত্ব বিভাগের নেতৃত্বে এখানকার নানান মন্দির সংস্কার-পুনর্গঠনের কাজ চলছে। হাতেকলমে সে কাজ দেখা ও শেখার জন্য পুরাতত্ব বিভাগে নব নিযুক্ত একদল তরুণ-তরুণীকে এখানে পাঠাচ্ছে ভারত সরকার। স্বাগত তাদেরই একজন। কাজেই নিছক ভ্রমণের উদ্দেশে নয়, তার কাজের কারণেই তাকে ঘুরে বেড়াতে হবে হাজার বছরের প্রাচীন এই মন্দির নগরীতে, তার ধ্বংসস্তূপে। স্বাগত বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেয়ে রইল বিষ্ণুলোকের দিকে। মনে মনে সেদিকে তাকিয়ে সে ভাবল, হাজার বছর ধরে এমনই কত সূর্যাস্ত-সূর্যোদয়ের, ইতিহাসের কত রোমাঞ্চকর পট পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী ওই মন্দির! কত না জানি আনন্দবেদনা আবর্তিত হয়েছে ওই মন্দিরকে ঘিরে। ইতিহাসবিদরা তার কিছুটা জানেন ঠিকই, কিন্তু সবটুকু তো তাঁদের পক্ষেও জানা সম্ভব হয় না। সব কিছু তো আর লেখা থাকে না। যে সব মানুষ তাদের ছেনি-হাতুড়ির ঘায়ে তিলে তিলে পাথর কুঁদে নির্মাণ করেছিল আশ্চর্য সুন্দর এই মন্দির, যে সব নারীরা এই সূর্যাস্তের আগে মন্দির নগরীকে প্রদীপমালায় সাজিয়ে তোলার জন্য প্রস্তুতি নিত, যে ব্রাহ্মণ, রাজপুরুষরা অর্ঘ্য নিবেদন করতে যেতেন- তারা আজ কোথায়? সময়ের রথচক্রতলে আজ হারিয়ে গেছে তারা। সে সব নরনারীরা যে সত্যি এক সময় ছিল শুধু তার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই আঙ্করভাটের মন্দির-ধ্বংসস্তূপ।
এ সব কথা কিছুক্ষণ ধরে ভাবার পর স্বাগতর খেয়াল হল, নিজের মনে হাঁটতে হাঁটতে সে তার অস্থায়ী বাসস্থান বা রাত্রিবাসের জায়গা থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছে। সে জায়গাটা গাছের আড়ালে পড়ে যাওয়াতে স্বাগত যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। তবে ও জায়গা খুব বেশি দূর নয়। পাঁচ-সাত মিনিটের হাঁটা পথ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সেখানেও একটা ছোট মন্দির আছে। ছোট বলতে বিষ্ণুমন্দিরের তুলনায় আকারে ছোট, ক্ষুদ্র বলতে ঠিক যেমন বোঝায় তেমনটা নয়। জীর্ণ, ভেঙে পড়া সেই মন্দিরেই রেনোভেশন বা পুনর্গঠনের কাজ করবে স্বাগতরা। সিয়েসরিপের সরকারি অতিথিনিবাস থেকে এ জায়গাতে যাওয়া-আসা কিছুটা সময় সাপেক্ষ বলে কাজের সুবিধার্থে ওই মন্দিরেরই একাংশে প্লাইউডের দেওয়াল আর টিন দিয়ে বেশ কয়েকটা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তারই একটা ঘরে স্বাগতর থাকার ব্যবস্থা।
স্বাগতর মনে হল সেখানে ফেরার আগে এ জায়গায় কিছুটা সময় বসে নেওয়া যাক। এই শান্ত, বনানী বেষ্টিত জায়গাটা বেশ ভালো লাগছে তার। শব্দ বলতে শুধু মাঝে মাঝে মাথার ওপর থেকে ভেসে আসা পাখির কলকাকলি। দিনের শেষে ধীরে ধীরে বাসায় ফিরে আসতে শুরু করেছে তারা। এখানে বসার মতো জায়গার অভাব নেই। কিছুটা তফাতেই মাটির ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, নানান আকৃতির পাথরের ব্লক, স্তম্ভ ইত্যাদি পুরাকীর্তির নিদর্শন।
তাদের কোনও কোনওটার গায়ে আজও জেগে আছে প্রাচীন ভাস্করদের হাতের ছোঁয়া নানান ধরনের অলঙ্করণ, ফুল-পাতার নকশা। কয়েক পা এগিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা তেমনই একটা পাথরের ওপর বসল স্বাগত। সে জায়গা থেকেও অস্তাচলগামী সূর্যের আলোতে আঙ্করের বিষ্ণুমন্দিরের শীর্ষদেশগুলো দেখা যাচ্ছে। সে যেখানে গিয়ে বসল তার সামনের একটা অংশ বুনো ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ। গালিচার মতো পুরু ঘন সবুজ শৈবালদলের আস্তরণ জমা হয়ে আছে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রস্তর খণ্ডগুলোর ওপর। সম্ভবত বর্ষার জল আসে সে জায়গাতে। কেমন যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে সেদিকটাতে। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। পাথরের খণ্ডের ওপর বসে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎই সেই ঝোপ জঙ্গল সমৃদ্ধ জায়গার একস্থানে চোখ আটকে গেল স্বাগতর। মাথার ওপরের গাছের ডালপালার ফাঁক গলে ছুরির ফলার মতো শেষ বিকেলের রাঙা আলো এসে পড়েছে এক জায়গাতে। আর সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে প্রায় এক মানুষ সমান এক পাথরের ফলক। শ্যাওলার আস্তরণ জমেছে সেই পাথরের স্তবকের গায়েও। তবে তার গায়ে জেগে আছে এক নারীমূর্তি! পাথরের ভাস্কর্য। মূর্তিটা দেখে কৌতূহল জন্মাল স্বাগতর মনে। যেখানে সে বসেছিল সে জায়গা ছেড়ে উঠে মূর্তিটার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল স্বাগত। তাঁর মনে হল পাথরের ফলকটা সম্ভবত কোনও মন্দির গাত্র বা স্তম্ভর অংশ ছিল একসময়। সে স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখন এখানে একলা পড়ে আছে। স্বাগত ভালো করে তাকাল পাথর খোদিত সেই নারীমূর্তির দিকে। সময় তাকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করলেও তার রূপ-লাবণ্য শরীরকে এখনও গ্রাস করে নিতে পারেনি। বলা যেতে পারে হাজার বছর পরও অক্ষত আছে পূর্ণাবয়ব সেই রমণী মূর্তি। দেখেই বোঝা যায় সে মূর্তি অতি প্রাচীন। ছবির বইতে দেখা খামের রমণী অর্থাৎ এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের মতো লম্বা ঝুলের পোশাক সেই সুন্দরী নারীর পরনে। মাথার চুল ওপরের দিকে বৃত্তাকার খোঁপার মতো বাধা। গলদেশ কণ্ঠমালায় আবৃত। কঙ্কন সমৃদ্ধ তার একটি বাহু ওপর দিকে তুলে ধরা। সে হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট দিয়ে সে ধরে রেখেছে বৃন্ত সমেত এক পুষ্প। গোলাপ পাপড়ির মতো তার ওষ্ঠাধর, ধনুকের মতো ভ্রুযুগল। তরঙ্গর মতো কোমরটা কিছুটা বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই যুবতী। সব মিলিয়ে এক সুন্দরী যুবতী যেন হাজার বছরের প্রাচীন অতীত থেকে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘যে ভাস্কর পাথরের বুকে এমন জীবন্ত নারী মূর্তি গড়ে তুলেছিলেন তাকে তারিফ করতেই হয়।’ -এ কথা মনে মনে স্বাগত ভাবল মূর্তিটাকে দেখতে দেখতে। মূর্তিটাকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে স্বাগত কেন জানি মনে হল সেই অপরূপার ঠোঁটের কোণে যেন মৃদু বিষণ্ণভাব জেগে আছে! কিছুক্ষণ আগে স্বাগত যেমন তাকিয়ে দেখছিল দূরে জেগে থাকা বিষ্ণুমন্দিরের শীর্ষদেশগুলো, ঠিক তেমনই এ নারীও যেন চেয়ে আছে সেদিকেই— গাছের ফাঁক গলে চোখে পড়া বেলাশেষের আলোমাখা ওই বিষ্ণুলোকের দিকেই। মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে স্বাগত ভাবতে লাগল, ‘এই প্রাচীন নারীমূর্তি কার? কোনও যক্ষীর? কোনও নর্তকীর? নাকি কোনও নগরনটীর? মূর্তির শরীরে কিছু অলঙ্কার আছে ঠিকই তবে প্রাচীনকালে রাজপরিবারের বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীদের শরীরে অলঙ্কারের যে পরিমাণ আধিক্য থাকত তা এই নারীর নেই। মাথায় মুকুটও নেই। যার ফলে অনুমান করা যায় নারী সম্ভবত তেমন কোনও উচ্চবর্ণের মানুষ ছিল না। এমনও হতে পারে এ রমণী কোনও চয়নিকা ছিল, মন্দিরের পুজোর জন্য পুষ্প চয়ন করত। এমনকী এ নারী কোনও বৌদ্ধ উপাসিকাও হতে পারে। ওই বিষ্ণুমন্দিরসহ এখানকার অনেক মন্দির তো পরবর্তীকালে বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়েছিল। যে কারণে আঙ্করভাটের প্রধান মন্দিরকে ‘হিন্দু-বৌদ্ধ’ মন্দির নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
মূর্তিটার দিকেই তাকিয়ে ছিল স্বাগত। হঠাৎই একঝাঁক টিয়াপাখির ট্যাঁ-ট্যাঁ শব্দে ডাকতে ডাকতে একদিক থেকে উঠে স্বাগতর ঠিক মাথার ওপর দিয়েই অন্য দিকে উড়ে গেল। আর সেই শব্দে স্বাগতর চিন্তাজাল ছিন্ন হল। অন্যপাশে যেদিক থেকে টিয়ার দল হঠাৎই পাখা ঝাপটে উড়ে গেল স্বাগত সেদিকে তাকাল। আর সেই মুহূর্তে দেখতে পেল আর এক নারীকে। পাথরে খোদিত নারী নয় রক্তমাংসর জীবন্ত এক নারী। প্রথম দৃষ্টিতে তার আকৃতির জন্য বালিকা মনে হলেও ভালো করে তাকাবার পর স্বাগত বুঝতে পারল সে একজন যুবতী এবং সম্ভবত খামের জনজাতির রমণী। খামের রমণীরা আসলে বেশ ছোটখাট চেহারার হয়। মুখমণ্ডলের আকারও বেশ কিছুটা ছোট হয়। তাই হঠাৎ তাদের দেখলে বালিকা বলে ভ্রম হয়। স্বাগত অবশ্য আজ এখানে আসার পর এমন বেশ কিছু মহিলা দেখেছে। স্বাগত এই প্রোজেক্টে যার তত্ত্বাবধানে কাজ করতে এসেছে সেই প্রফেসর রামমূর্তি এদেরকে চিনিয়ে দিয়েছেন খামের জনজাতির মহিলা বলে। যে খামের জনজাতি একসময় গড়ে তুলেছিল আঙ্করভাটের বিখ্যাত মন্দির-বিষ্ণুলোক। যে রমণী হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়েছে তার পরনের পোশাকও খামের রমণীদের মতনই। গলা থেকে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত নেমে এসেছে লম্বা ঝুলের সিল্কের হলুদ বর্ণের পোশাক। চওড়া কাপড়ের কারুকার্য করা কোমরবন্ধ। তবে তার কাঁধ আর বাহু যুগল উন্মুক্ত। একটা উত্তরীয় ভি আকৃতির মতো করে রাখা আছে তার বক্ষের ওপর। শুভ্র মুখমণ্ডলের খামের যুবতী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্বাগতর দিকে। ঠিক যেমন স্বাগত তাকিয়ে দেখছে তার দিকে।
কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময়ের পর স্বাগত সেই অপরিচিত যুবতীকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদু অস্বস্তি বোধ করে আবার পাথরের খোদিত মূর্তিটার দিকে চোখ ফেরাতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় সেই নারী তাকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কোন দেশের মানুষ? ওখানে তুমি কী করছ?’
স্বাগত তাঁকে স্বাগত জবাব দিল, ‘আমি ইন্ডিয়া থেকে এসেছি। এই মূর্তিটা দেখছি। খুব সুন্দর মূর্তিটা!’
স্বাগতর জবাব শুনে যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল খামের যুবতীর ঠোঁটের কোণে। সে আবার জানতে চাইল, ‘তুমি কি ট্যুরিস্ট? তোমার সঙ্গীরা কোথায়?’
প্রশ্ন শুনে স্বাগত বলল, ‘না, আমি ট্যুরিস্ট নই। এখানে কাজে এসেছি। ওই যে ওদিকে একটা পুরনো ভাঙা মন্দির আছে সেই মন্দিরটার রেনোভেশনের কাজে, অর্থাৎ তাকে আবার মেরামত করার কাজে, ঠিকঠাকভাবে গড়ে তোলার জন্য আমি এখানে এসেছি। ওই যে সেই মন্দিরটা, যার গায়ে বিরাট বিরাট গাছের শিকড় সাপের মতো জড়িয়ে আছে।’—এ কথা বলে সে আঙুল তুলে দেখাল যেদিকে মন্দিরটা আছে।
সূর্যদেব এবার সম্ভবত মেরু পর্বত অর্থাৎ বিষ্ণু মন্দিরের চূড়াগুলোর আড়ালে চলতে শুরু করেছেন। জায়গাটা হঠাৎই যেন আরও ছায়াময় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। স্বাগতর জবাব শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মেয়েটা বলল, “ও কাজ করে কী হবে? যে সময় হারিয়ে গেছে তা তো আর কোনও দিন ফিরবে না।”
মেয়েটার কথা শুনে স্বাগত হেসে বলল, “সে সময় আর ফিরবে না ঠিকই, কিন্তু ওই যে আঙ্করভাটের বিষ্ণুমন্দির, চারপাশের আরও সব মন্দির, সারা পৃথিবী থেকে কত লোক ছুটে আসে এসব মন্দিরের অপরূপ সৌন্দর্য দেখার জন্য, এখানকার প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য। আর সে কারণেই এ জায়গার ভাঙা মন্দিরগুলোকে যথা সম্ভব আগের মতো আবারও গড়ে তোলা প্রয়োজন। যাতে আরও মানুষ তোমাদের দেশের এইসব প্রাচীন শিল্পকীর্তি দেখে আরও মুগ্ধ হয়। তারা ফিরে যেতে পারে এদেশের গৌরবোজ্জ্বল অতীতে।” একটানা কথাগুলো বলে থামল স্বাগত।
মেয়েটা যেন স্বাগতর কথা শুনে কিছুটা স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, সেই অতীতের কত ঘটনা যে এখানে ছড়িয়ে আছে কেউ তা জানে না!’
স্বাগত এরপর মেয়েটাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি এখানেই থাক?’
মেয়েটা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এখানেই।’
স্বাগত এরপর তাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, ‘এখানে তুমি কোথায় থাক?’ কিন্তু তার আগেই সেই রমণী স্বাগতর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাটির দিকে মাথাটা ঝুঁকিয়ে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই সে হারিয়ে গেল লতাগুল্ম বেষ্টিত একটা ভগ্ন প্রাকারের আড়ালে। জায়গাটাতে হঠাৎই যেমন সে আবির্ভূত হয়েছিল তেমনই সে অন্তর্হিত হল সেই স্থান থেকে। আর এরপরই কিছুটা দূর থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘হাই মাই বয়! ওখানে কী করছ?’
যেখানে স্বাগতর রাত্রিবাসের জায়গা, অর্থাৎ যে ভাঙা মন্দিরটা আছে, সেখান থেকে যে পথ ধরে স্বাগত জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এ জায়গায় এসে পৌঁছেছে, স্বাগত দেখল তার ঠিক মুখটাতে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রফেসর রামমূর্তি। স্বাগত তাকে দেখেই এগল তাঁর দিকে। প্রৌঢ় প্রোজেক্ট ডিরেক্টর, অভিজ্ঞ প্রত্নতত্ববিদ প্রফেসর রামমূর্তি হাসিখুশি চেহারার মানুষ। স্বাগত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, ‘ভাবলাম তুমি এদিকেই এসেছ, তাই চলে এলাম। কেমন লাগছে এ জায়গা?’
স্বাগত বলল, ‘খুব সুন্দর, নিরিবিলি। যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখানে একটা পাথরের ফলকের গায়ে নারীমূর্তি পড়ে আছে। সেটাই দেখছিলাম।’
রামমূর্তি বললেন, ‘এখানে নানান জায়গাতে এমন নানান মূর্তি, শিল্পকর্ম ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। সত্যি কথা বলতে কী, এই নগরীর বিষ্ণুমন্দির, বায়ূম মন্দির ও আরও দু-একটা স্থাপত্য ছাড়া অন্য স্থাপত্যগুলো কিছুটা অবহেলা অনাদরে পড়ে আছে। গত একশো বছর ধরে নানান সময় এই বিশাল আঙ্করভাটকে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঠিকই, কিন্তু মাঝে মধ্যেই সেই উদ্যোগ নানান কারণে থমকে যায়। নানান রাজনৈতিক ঝড় বয়ে গেছে এই দেশের ওপর দিয়ে, তাছাড়া এ দেশটা অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা সবল নয়। এইসব রেনোভেশনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের দরকার। যা ব্যয় করার সামর্থ্য এদেশের নেই। বর্তমানে অবশ্য ভারতের মতো কিছু দেশ এই প্রাচীন নগরীর সংস্কারের ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সব কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে আরও বেশ কিছু বছর সময় লাগবে।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘তোমার মতো আর যে চারজন তরুণ-তরুণী কাজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য এখানে আসছে তারা আজ রওনা দিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন বাঙালি তরুণীও আছে। বাকি একজন মহারাষ্ট্রের, অন্য দু’জন দিল্লির। চারজনই অবশ্য বর্তমানে দিল্লিতে থাকে। কাল ভোরে ওরা রাজধানী নমপেনে এসে পৌঁছবে। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে রাতে সড়ক পথে রওনা হয়ে পরশু ভোরে এখানে সিয়েমরিপে পৌঁছে যাবে। তোমাদের নিয়ে কাজ শুরু করার আগে আঙ্করভাটের প্রধান স্থাপত্য ওই বিষ্ণুমন্দিরটা দেখিয়ে আনব। তাতে তোমাদের খামের স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয়ে যাবে। তোমাদের কাজ করতে সুবিধা হবে।’
আঙ্করভাটের বিষ্ণুমন্দিরের আড়ালে এবার সূর্য অদৃশ্য হয়ে গেছে। বিদায়ী সূর্যের লাল আভাটুকুই শুধু জেগে আছে মন্দিরের মাথায় আকাশের বুকে। স্বাগত আর রামমূর্তি দু’জনেই কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন সেদিকে। রামমূর্তি তারপর বললেন, ‘চল এবার ফেরা যাক।’
তারা দু’জন এরপর হাঁটতে শুরু করল নিজেদের আস্তানায় ফেরার জন্য।
কয়েক পা এগবার পরই চারপাশে যেন দ্রুত অন্ধকার নেমে আসতে লাগল। রামমূর্তি বললেন, ‘এই জঙ্গল ঢাকা জায়গাটা এমনই, সূর্য ডুবে গেলে খুব তাড়াতাড়ি অন্ধকার নামে। তাই সূর্য ডুবতে দেখে তোমাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আমি গত প্রায় ছ’মাস ধরে এ অঞ্চলে পড়ে আছি। চোর-ডাকাত বা লোকজনের উপদ্রব এদিকে খুব একটা নেই। সেদিক থেকে এ জায়গাটা নিরাপদ। আর রাতে তো স্থানীয় লোকদের কেউ এই আঙ্করভাটের ছায়া মাড়ায় না। এমনকী রেনোভেশনের কাজে যে স্থানীয় শ্রমিকদের নিযুক্ত করা হয়েছে তারাও ভয়ে এ জায়গা ছেড়ে চলে যায়।’
স্বাগত কথাটা শুনে জানতে চাইল, ‘কীসের ভয়?’
প্রফেসর রামমূর্তি হেসে জবাব দিলেন, ‘প্রেতাত্মাদের ভয়!’
স্বাগত কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন, ‘সেটা কেমন ব্যাপার?’
হাঁটতে হাঁটতে প্রফেসর রামমূর্তি বলতে লাগলেন, “ব্যাপারটাকে স্থানীয় খামের মানুষদের ধর্ম বিশ্বাসও বলা যেতে পারে। এর পিছনে আছে কিছু প্রাচীন লোককথা। আজ থেকে হাজার বছর আগে খামের রাজ দ্বিতীয় সূর্যবর্মন আঙ্করভাটের প্রধান মন্দির নির্মাণ করে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশে তা উৎসর্গ করেন। পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরিরা ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এই মন্দির নগরী। তুমি হয়তো জানো আঙ্করভাটের ওই অতুলনীয় সুন্দর মন্দিরের অপর নাম ‘বিষ্ণুলোক।’ খামেরা বিশ্বাস করতেন বা করেন, স্বয়ং বিষ্ণুর বাসস্থান ওই মন্দির। প্রচলিত হিন্দু ধর্মের ভাবনা অনুসারে মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা শুদ্ধ হয়ে বিষ্ণুলোকে স্থান পায়। সে কারণে, শ্রাদ্ধের মন্ত্রেও বার বার বিষ্ণুলোকে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। আজ থেকে হাজার বছর আগেও এখানকার খামের অধিবাসীদের মধ্যে সেই ধারণা প্রচলিত ছিল। তবে সবার আত্মাকে নাকি স্থান দেওয়া হতো না এই মন্দিরে। রাজা, অভিজাত সম্প্রদায় ও পুণ্যবান মানুষরা যাতে বিষ্ণুলোকে স্থান পায় সে জন্য নির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতি, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান পালন করা হতো বিষ্ণুমন্দিরের প্রধান তোরণের বাইরে। আর তারপরই আত্মারা প্রবেশের অনুমতি পেত বিষ্ণুলোকে। খামের রাজ সিদ্ধান্ত নিতেন, অনুমতি দিতেন ওই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের। কিন্তু বিভিন্ন কারণে যারা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো বা হয়েছে তাদের আত্মারা নাকি আজও এ অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় ওই বিষ্ণুলোকে প্রবেশের লোভে। ওইসব আত্মারা নাকি দুষ্ট প্রকৃতির। যে কারণে তার বিষ্ণুলোকে প্রবেশ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। আর তারা নাকি বিষ্ণুমন্দিরকে ঘিরে থাকা আঙ্করভাটের অন্য মন্দিরে আজও বসবাস করে। অন্ধকার নামলে তারা জেগে ওঠে। তাদের ভয়েই রাতে এখানে স্থানীয় লোকজন থাকতে চায় না।”—একটানা কথা বলে থামলেন প্রফেসর রামমূর্তি। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জনে পৌঁছে গেল আঙ্করভাটের প্রাচীন এক মন্দিরের কাছে তাদের রাত্রিবাসের স্থানে।
