বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১৩
পর্ব ১৩
প্রী-তম তার মোবাইল ফোনের ক্যামেরাতে বেশ কয়েকটা ছবি তুলল মূর্তিটার। তারপর সে জায়গা থেকে সবাই সরে এসে স্বাগত যেখানে বসে ছিল তার চারপাশে পড়ে থাকা পাথরখণ্ডগুলোর উপর বসল সকলে। নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। বিক্রম বলল, আজ ওই কলস হাতে লোকগুলোর ছবি দেখার পর থেকেই আমার কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে মন্দিরের মধ্যে ওই কলসগুলোতে গুপ্তধন লুকানো আছে। যদিও তা উদ্ধার করা গেলে সেটা সরকারি সম্পত্তি হবে, কিন্তু সেটা যদি আমরা উদ্ধার করতে পারি তা একটা বিরাট ব্যাপার হবে।’
প্রীতম বলল, ‘এ সব প্রাচীন মন্দিরে আজও গুপ্তধন লুকিয়ে থাকার সম্ভবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে মন্দিরটা যে কোন দেবতার মন্দির সেটা এখনও পর্যন্ত বোঝা গেল না।’
নাতাশা বলল, ‘রামমূর্তি স্যরের মতো আমারও অনুমান মন্দিরের যে অংশটা লতাপাতায় এখনও আবৃত তার ভিতর প্রবেশ করলে হয়তো আমরা মন্দিরটার সম্পর্কে ধারণা পাব। কারণ, ওটাই তো মন্দিরের প্রধান অংশ। গুপ্তধন উদ্ধার না হলেও মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবদেবীর কোনও মূর্তি পাওয়া যেতে পারে।’
মন্দিরটার সম্পর্কে নানা কথা আলোচনা করতে লাগল তারা। তারপর একসময় আলো কমে আসতে লাগল। সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেছে বিষ্ণুলোকের আড়ালে। আকাশের লাল আভাও মুছে যেতে শুরু করেছে। অন্ধকার নামলেই এই প্রাচীন মন্দিরে প্রেতাত্মারা জেগে ওঠে! এ কথাটা মনে হয় মনে পড়ল নাতাশার। তাই সে প্রথমে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চল এবার ফেরা যাক।’
স্বাগত সহ অন্যরাও এবার উঠে দাঁড়াল নিজেদের আস্তানায় ফেরার জন্য। ঠিক সেই সময় একজনকে দেখতে পেল তারা। বিষ্ণুলোকের ট্যুরিস্ট গাইড ফঙ, যে সকালবেলা মন্দিরে ঢুকেছিল। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল, সে এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে স্বাগতদের লক্ষ করছিল। স্বাগতরা তাকে দেখতে পেতেই সে বনপথ ধরে যেদিকে বিষ্ণুলোক সেদিকে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই সে স্বাগতদের দৃষ্টিপথের বাইরে চলে গেল।
স্বাগতরাও ফেরার রাস্তা ধরল। বিক্রম বলল, ‘ফঙ কি তবে মন্দির থেকে বেরিয়ে এ তল্লাটেই সারাদিন ঘুরে বেড়াচ্ছিল? নাকি লোকটা আমাদের ওপর নজরদারি করছে?’
প্রীতম বলল, ‘কে জানে? তবে ওর বলা একটা কথা আমার বেশ অদ্ভুত লেগেছিল।’
‘কী কথা?’ জানতে চাইল সুরভী।
প্রীতম জবাব দিল, ‘বিষ্ণুমন্দিরে নাতাশার দেওয়া টাকাটা ফিরিয়ে দেবার সময় লোকটা বলেছিল, আমি ভিক্ষা নিই না। ইচ্ছা হলে আমি এ দেশের মালিক হতে পারি! ওর এই কথাটা বড় অদ্ভুত না? দেশের মালিক হতে পারি, মানে কী?’
বিক্রম বলল, ‘এমন বড় বড় কথা অনেকেই বলে?’
প্রীতম বলল, ‘তা বলে ঠিকই। কিন্তু আমার ওর কথাটা শুনে মনে হয়েছে ওর ওই কথার মধ্যে অন্য কোনও ইঙ্গিত আছে।’
‘কী ইঙ্গিত?’ প্রশ্ন করল নাতাশা।
বিক্রম বলল, ‘দেশের মালিক হওয়া, এ কথার একটা অর্থ হল বড়লোক হওয়া। হয়তো ও এমন কিছুর সন্ধান জানে যাতে ও বড়লোক হয়ে যেতে পারে।’
বিক্রম লোকটার সম্পর্কে কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘তেমন কিছুর সন্ধান জানা থাকলে ও লোক নিশ্চয়ই ছেঁড়া চটি পায়ে গাইডগিরি করত না।’
কথা বলতে বলতে একসময় তারা পৌঁছে গেল মন্দির চত্বরে। ঠিক তখনই অন্ধকার নামল চারপাশে।
রাতে খাওয়া শেষ হবার পর প্রফেসর রামমূর্তি স্বাগতকে বললেন, ‘কাল তুমি আমার একটা কাজ করে দিতে পারবে?’
স্বাগত বলল, ‘বলুন স্যর?’
তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের বললাম না যে ওই মূর্তির মতো দেওয়াল চিত্র আমি আগে বিষ্ণুমন্দিরের কোথায় যেন দেখেছি। জায়গাটা আমার মনে পড়েছে। ওটা আমি দেখেছি বিষ্ণুমন্দিরের তিন তলার গ্যালারির পূর্ব দিকের একটা ঘরে। তুমি জায়গাটা খুঁজে ওই মূর্তিগুলোর ছবি তুলে আনতে পারবে? আমি বিষ্ণুমন্দিরের ওই মূর্তিগুলোর সঙ্গে আমাদের এই মূর্তিগুলো একটু মিলিয়ে দেখতে চাই। কাল হেরুমের লোকেরা মূল মন্দিরের গায়ের গাছপালা সরাবে। তাই আমার এখানে থাকা প্রয়োজন।’
স্বাগত বলল, ‘আমি চেষ্টা করব সার।’
রামমূর্তি বললেন, ‘আশা করি সকাল আটটা নাগাদ রওনা হলে তুমি কাজ শেষ করে দুপুরের মধ্যেই আবার এখানে ফিরে আসতে পারবে। কাল সকালে তুমি রওনা হবার আগে আমি তোমাকে ক্যামেরা দিয়ে দেব।’
কথা হয়ে গেল। রামমূর্তি এগলেন নিজের ঘরের দিকে। আর স্বাগতও ঘরে ফিরে বিছানাতে শুয়ে পড়ল। বিছানায় শুয়ে স্বাগত ভাবতে লাগল সেই খামের যুবতীর কথা। মেয়েটার আচরণ বেশ রহস্যজনক। জানলার বাইরে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা এ মন্দির সম্পর্কে সত্যিই কিছু জানা আছে ওই খামের যুবতীর? মেয়েটা অবশ্য স্বাগতকে বলেছে যে সে এক প্রাচীন কাহিনি তাকে শোনাবে যার সঙ্গে এ মন্দিরের সম্পর্ক আছে। দেখা যাক তার সঙ্গে আবার স্বাগতর দেখা হয় কি না? তার মুখ থেকে কোনও কাহিনি সত্যিই জানা যায় কি না? এ সব কথা ভাবতে ভাবতে স্বাগত একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল আটটার সময় স্বাগত যখন চত্বরে বেরিয়ে এল তখন হেরুম আর তার লোকেরা হাজির হয়ে গেছে। চত্বরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে রামমূর্তি স্যর কথা বলছিলেন হেরুমের সঙ্গে। স্বাগত তাদের কাছে যখন এগিয়ে গেল তখন রামমূর্তি স্যর হেরুমের হাতে একটা ভাঁজ করা কাপড় তুলে দিয়ে বললেন, ‘এই পতাকাটা কোনও একটা ছাদের মাথায় যথা সম্ভব উঁচু একটা দণ্ডে টাঙিয়ে দাও। তারপর যেভাবে বললাম সেভাবে কাজ শুরু করবে। আমরা যেন আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে ওই জায়গাতে প্রবেশ করতে পারি। তুমি যদি কাজের জন্য আরও লোক জোগাড় করে আনো তাহলেও আমার আপত্তি নেই।’
রামমূর্তি স্যরের কথা শুনে হেরুম বলল, ‘সেটা করতে পারলে তো আমারও কাজের সুবিধা হতো। কিন্তু আপনি তো জানেনই যে এসব পুরনো মন্দিরের ভিতরে ঢুকে কেউ কাজ করতে চায় না।’
স্বাগত পৌঁছে গেল তাদের কাছে। হেরুমকে নির্দেশ দেওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল রামমূর্তি স্যরের। তিনি এরপর ইশারায় তাকে স্থান ত্যাগ করতে বলে স্বাগতকে দেখে তাঁর কাঁধ থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে সেটা স্বাগতর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার সরকারি পরিচয়পত্রটা সঙ্গে আছে তো? বিষ্ণুমন্দিরে ঢোকার সময় ওটা গলায় ঝুলিয়ে নিও। এমনিতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করবে।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘আর কোনও ছবি তোলার বা অন্য কাজের দরকার নেই তো স্যর?’
তিনি বললেন, ‘তোমার ইচ্ছা হলে তুমি অন্য ছবি তোমার জন্য আমার ক্যামেরাতে তুলতেই পার। তাতে কোনও আপত্তি নেই। তবে যে ছবির কথা বললাম সেগুলো যত্ন করে তোলা চাই। পুরো প্যানেলটার ছবি তুলবে কয়েকটা। তারপর প্রত্যেকটা মূর্তির ক্লোজ ছবি তুলবে। বিশেষ করে খেয়াল করবে মূর্তির হাতের কলসগুলোকে। ওগুলোর গায়ে কোনও কিছু লেখা বা আঁকা আছে কি না?’
স্বাগত বলল, ‘আচ্ছা স্যর। নতুন কিছুর সন্ধান পেলে আপনাকে জানাব।’
রামমূর্তি সারের সঙ্গে কথা বলে স্বাগত এরপর রওনা হয়ে গেল বিষ্ণুমন্দির যাওয়ার জন্য।
আলো ঝলমলে সুন্দর সকাল। মাথার ওপর টিয়াপাখির ঝাঁক উড়ে গিয়ে বসছে এ ডাল থেকে সে ডালে। রাস্তা চিনতে স্বাগতর অসুবিধা হবে না। গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে কিছু দূরে দেখা যাচ্ছে বিষ্ণুলোকের শৃঙ্গগুলো। কিছুটা এঁকেবেঁকে হলেও রাস্তা এগিয়েছে সেদিকেই। যে পথ ধরে রামমূর্তি স্যরের সঙ্গে তারা গিয়েছিল ওই বিষ্ণুমন্দির দেখতে। নিশ্চিন্ত মনেই বনপথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে হাঁটতে লাগল স্বাগত। ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে বিষ্ণুলোক। কিন্তু হঠাৎই স্বাগতকে থেমে যেতে হল। রাস্তার পাশে একটা গাছের আড়াল, ঠিক তার সামনেই বেরিয়ে এসে দাঁড়াল একজন। লোকটা মুখ ফিরিয়ে স্বাগতর দিকে তাকাতেই তাঁর মুখ আর পোশাক দেখে স্বাগত তাঁকে চিনতে পারল। লোকটা হল সিয়েমরিপে যাওয়ার সময় বনপথে দেখা রামমূর্তি স্যরের পরিচিত রত্নসম্ভব নামের বৌদ্ধ ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী। লোকটা বয়সে বৃদ্ধ এবং সন্ন্যাসী, তাই স্বাগত হাত জোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার জানাল তাঁকে। সন্ন্যাসী আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তাঁর ডানহাতটা তুলে ধরে বললেন, ‘ভগবান বুদ্ধ আপনার মঙ্গল করুন।’
এরপর সন্ন্যাসী স্বাগতর দিকে ভালো করে তাকিয়ে তাঁর পরিচয় অনুমান করতে পারলেন।
তিনি বললেন, ‘আপনি ভারতীয় তাই তো? রামমূর্তির সঙ্গে মন্দির সংস্কারের কাজ করছেন?’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন।’
তিনি বললেন, ‘সেদিন রামমূর্তির সঙ্গে আপনাকে দেখেছিলাম। আমার পরিচয় হয়তো আপনি জানেন।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, রামমূর্তি স্যর জানিয়েছেন। একদিন বায়ুম বুদ্ধ মন্দিরেও নিয়ে যাবেন বলেছেন।’
সন্ন্যাসী বললেন, “ভগবান বুদ্ধর দেশের লোক আপনারা। আপনাদের স্বাগত জানাই সেখানে। তাছাড়া রামমূর্তিকে আমার কিছু বলার প্রয়োজন আছে। তিনি এলে ভালোই হয়।”
স্বাগত বলল, ‘আমি আপনার কথা জানিয়ে দেব তাঁকে।’
স্বাগত যে পথ ধরে এগচ্ছিল, সে পথ ধরেই ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলেন শ্রমণ। স্বাগতও তাঁর পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
সন্ন্যাসী স্বাগতকে প্রশ্ন করল, ‘মূল মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করেছেন আপনারা? যেখানে কক্ষ, অলিন্দগুলো ধাপে ধাপে ওপর দিকে উঠে গেছে? মন্দিরের যে অংশের মাথায় চূড়া বসানো আছে?’
যদিও রামমূর্তি স্যর মন্দিরের বিষয়ে বাইরের লোকদের কাছে কিছু জানাতে নিষেধ করেছেন, তবুও এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে মিথ্যা কথা বলতে পারল না স্বাগত। সে বলল, ‘ওর ঠিক সামনের চত্বর পর্যন্ত পৌঁছে গেছি আমরা। মজুররা গাছপালা সরিয়ে ফেললে এবার আমরা ওর ভিতরে প্রবেশ করব।’
সন্ন্যাসী একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘হয়তো ওর ভিতর প্রবেশ না করাই ভালো।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘কেন?’
প্রাচীন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘আসলে এখানকার পুরনো মন্দিরগুলোর সঙ্গে এমন অদ্ভুত কিছু ঘটনা বা ব্যাপার জড়িয়ে আছে যা আপনারা বাইরের লোকেরা ঠিক বিশ্বাস করবেন না। ওসব মন্দিরে প্রবেশ করলে বিপদ নেমে আসতে পারে।’
হাঁটতে হাঁটতে স্বাগত জানতে চাইল, ‘আপনি কি কোনওদিন ওই মন্দিরে প্রবেশ করেছেন?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ, একবারই। সে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। খামের রুজের সৈন্যরা তখন এ অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছে। নির্বিচারে তারা মানুষজনকে খুন করছে নাহুল নামে এক সৈন্যাধক্ষের নেতৃত্বে। তাদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। আমার তখন যুবা বয়স, সদ্য এসেছি এখানে। একদিন রাতে তারা বায়ুম মন্দিরে হানা দিল। বেশ কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মারা পড়ল। আমি কোনওক্রমে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এসে ক’দিনের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলাম ওই মন্দিরে। এর ক’দিনের মধ্যেই অবশ্য পলপটের শাসনের অবসান হল। পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হল, আমি আবার বায়ুমে চলে গেলাম।’
ধীরে ধীরে বৃদ্ধ কথাগুলো বলার পর স্বাগত একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি তো মন্দিরের ভিতরে ঢুকেছিলেন। কী আছে ওই মন্দিরের ভিতরে? কার মন্দির ওটা? কোনও অদ্ভুত জিনিস মন্দিরের ভিতরে চোখে পড়েছিল কি?’
প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন বৃদ্ধ। তারপর সম্ভবত ওই মন্দিরের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই বললেন, ‘অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে চাইলে বায়ুম মন্দিরে আসবেন। আমি আপনাদের দেখাব। তাহলে আপনারা বুঝতে পারবেন কত অদ্ভুত, রহস্যময় এই প্রাচীন মন্দির নগরীতে ছড়িয়ে আছে। রামমূর্তিকেও আমি দেখিয়েছি সেটা। তিনিও দেখে বিস্মিত হয়েছেন।’ এ কথা বলার পর কয়েক পা এগিয়েই তিনি থেমে গেলেন। রাস্তা থেকে একটা শুঁড়িপথ জঙ্গলের অন্যদিকে চলে গেছে। তার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘আপনি বিষ্ণুলোকে যাবেন তাই তো?’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, রামমূর্তি স্যর ওখানে আমাকে একটা কাজে পাঠাচ্ছেন।’
মাঠটা অতিক্রম করে মূল মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল স্বাগত। ভিতরে প্রবেশ করার পর আগের দিনের মতোই স্বাগতর যেন মনে হল সে অন্য কোনও জগতে প্রবেশ করল। শীতল একটা ভাব অনুভব হল তার শরীরে…।
বৃদ্ধ আকাশের প্রেক্ষাপটে জেগে থাকা বিষ্ণুলোকের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এখানকার যত প্রাচীন রহস্য আছে তা সবই ওই বিষ্ণুমন্দিরকে কেন্দ্র করেই। তবে দিনের বেলা সে সব কিছু বোঝা যায় না। যান ঘুরে আসুন। আমাকে এবার অন্য পথ ধরতে হবে। তথাগত আপনাদের সব বিপদ থেকে দূরে রাখুন।’ এ কথা বলে বৃদ্ধ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আবার আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তাঁর হাতটা স্বাগতর দিকে তুলে ধরে মন্দিরের দিকের রাস্তা ছেড়ে সেই শুঁড়িপথের মধ্যে প্রবেশ করলেন। সন্ন্যাসীর বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে স্বাগত এগল বিষ্ণুলোকের দিকে।
স্বাগত কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল বিষ্ণুমন্দিরের সামনে পরিখার কাছে। ইতিমধ্যেই নানা দেশ থেকে আগত ট্যুরিস্টরা প্রতিদিনের মতো এসে উপস্থিত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম আশ্চর্য স্থাপত্য আঙ্করের বিষ্ণুমন্দির দর্শন করবে বলে। সাঁকো পেরিয়ে তারা এগচ্ছে মন্দির তোরণের ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। পকেট থেকে সরকারি পরিচয়পত্রটা বার করে সেটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে স্বাগতও উঠে পড়ল সাঁকোতে। তোরণের দিকে এগতে এগতে স্বাগতর হঠাৎ মনে পড়ে গেল ক-রাত আগে দেখা স্বপ্নটার কথা। পরিখার মধ্যে পড়ে গেছিল সে। তার দিকে এগিয়ে আসছিল কুমিরের দল! সেই খামের যুবতীর কথাও আবার মনে পড়ে গেল স্বাগতর। সে বলেছে স্বাগতকে প্রাচীন দিনের কাহিনি শোনাবে।
স্বাগত ভাবল, ‘যদি আজ বিকালে সুযোগ পাওয়া যায় তবে ওই জায়গায় যেতে হবে। দেখি আজও মেয়েটা আসে কি না? তার কাহিনি শোনায় কি না?’
মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতেই তোরণের ভিতর প্রবেশ করল স্বাগত। তোরণ আর মন্দিরের মধ্যবর্তী স্থানে যে জলাশয়টা আছে, যাতে বিষ্ণুমন্দিরের প্রতিবিম্ব ধরা দেয়। সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে ট্যুরিস্টের ঝাঁক। ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবেও কেউ কেউ ঘুরে দেখছে তালগাছ ঘেরা ঘাসের গালিচা ছাওয়া জায়গাটা। মাঠটা অতিক্রম করে মূল মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল স্বাগত। ভিতরে প্রবেশ করার পর আগের দিনের মতোই স্বাগতর যেন মনে হল সে অন্য কোনও জগতে প্রবেশ করল। শীতল একটা ভাব অনুভব হল তার শরীরে, চারপাশে চলে গেছে নানা বারান্দা গ্যালারি। এই গ্যালারিগুলোর কিছু অংশ রামমূর্তি স্যর দেখিয়েছেন স্বাগতদের। তবে তিনি এ কথাও স্বাগতদের বলেছেন যে এই বিশাল মন্দিরের সব গ্যালারি সব কক্ষ একদিনে দেখা সম্ভব হয় না। যেমন স্বাগত যে কক্ষতে যাচ্ছে সে কক্ষে আগের দিন তাদের নিয়ে যেতে পারেননি রামমূর্তি স্যর। স্বাগত ভাবল আগে কাজটা সেরে আসা যাক তারপর হাতে সময় থাকলে মন্দিরটা আবার ঘুরে দেখার চেষ্টা করবে।
একবার দেখলে কি মনের আশ মেটে? আগের দিন রামমূর্তিই স্বাগতদের পথপ্রদর্শকের কাজ করেছিলেন। মন্দিরের ভিতরের গোলকধাঁধা একবারে চেনা সম্ভব নয়। স্বাগত একজন নিরাপত্তা কর্মীর কাছে ওপরে ওঠার রাস্তাটা জেনে নিয়ে সিঁড়িটা খুঁজে বার করল। কাঠের পাটাতন দিয়ে বানানো সিঁড়ি। মন্দিরের ভিতর, বাইরের গায়ের অনেক সিঁড়িই বহু যুগ আগেই ধসে পড়েছে। পর্যটকদের মন্দির ঘুরে দেখার জন্য এই কাঠের সিঁড়িগুলো বানানো হয়েছে।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল স্বাগত। এ মন্দিরের এক একটা তলার উচ্চতা অন্তত তিন তলা বাড়ির সমান। দোতলাতে কিছু পর্যটক ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছবি তুলছে। অন্য অংশর মতো দোতলাতেও রয়েছে নানান ধরনের মূর্তি দেওয়াল চিত্র।
সে সব দেখতে দেখতে স্বাগত তিনতলায় ওঠার পথটা খুঁজতে শুরু করল। একটা অলিন্দ ধরে এগিয়ে একটা বাঁকের মুখে পৌঁছতেই একটা কণ্ঠস্বর কানে এল তার—‘টাকাপয়সার ব্যাপার নিয়ে তুমি কোনও চিন্তা কর না। এ মন্দিরটা যেমন ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে তেমনই আশপাশের মন্দিরগুলোও আমাকে ভালো করে ঘুরিয়ে দেখাবে। জায়গাগুলোর সম্পর্কে তুমি যা জানো তা আমাকে বলবে। তার জন্য যত সময় লাগুক। যত দিন লাগুক আমার কোনও অসুবিধা নেই।’
