বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ১৪
পর্ব ১৪
এ কথাটা শুনতে শুনতেই স্বাগত পৌঁছে গেল বাঁকের মুখে। আর তারপরই সে দেখতে পেল তিনজনকে—নারেঙ খাম, কুমির ব্যবসায়ী বুল আর তাদের দু’জনের সঙ্গে গাইড ফাং। মূর্তি শোভিত একটা দেওয়াল গাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারা। নারেঙ খামের হাতে ধরা একটা স্টিলের সেলফি স্টিক। তার মাথায় একটা ক্যামেরা বসানো। স্বাগত অনুমান করল, নারেঙ তাঁর গাইড ফঙের উদ্দেশে বলছিল। স্বাগত তাদের মুখোমুখি হতেই নারেঙ বলল, ‘আরে আপনি যে! আবার দেখা হয়ে গেল!
স্বাগত হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, দেখা হয়ে গেল। ছোট জায়গা তাই দেখা হওয়াটাই স্বাভাবিক।’
নারেঙ বলল, ‘আমিও ভাবছিলাম হয়তো আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আপনার সঙ্গী-সঙ্গীনিরা কোথায়?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘তারা আসেনি। আমি একলাই এসেছি।’
বুল এবার প্রশ্ন করল, ‘একলা কেন?’
এখানে আসার আসল কারণটা না বলে স্বাগত বলল, “তারা কাজের জায়গায় কাজ করছে। আজ আমার ওখানে তেমন কাজ নেই। তাই আবার বিষ্ণু মন্দির দেখতে চলে এলাম। এই প্রাচীন মন্দির এত সুন্দর যে বারবার দেখতে আসতে ইচ্ছা হয়।’
নারেঙ বললে ‘ঠিক বলেছেন। এ মন্দির যে এত সুন্দর তা এখানে না এলে বুঝতামই না। ইতিমধ্যে আমাদের এই গাইড ফঙ আমাদের যতটুকু দেখিয়েছে তাতেই বড় আশ্চর্য লাগছে!’
এ কথা বলে সে পিছনের দেওয়ালচিত্রটা দেখিয়ে বলল, ‘যেমন এই ছবিটা। কেমন অদ্ভুত দৃশ্য তাই না? ফঙ আমাদের এতক্ষণ এই মূর্তিগুলো সম্পর্কেই বোঝাচ্ছিল।’
স্বাগত তাকাল দেওয়ালে খোদিত মূর্তিগুলোর দিকে। কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে ধরা বলের মতো গোলাকৃতি বস্তু। লোকগুলোকে দেখতে স্বাগতদের মন্দির কক্ষে কলস হাতে ধরা লোকগুলোর মতোই। মুণ্ডিত মস্তক, উর্ধাঙ্গ উন্মুক্ত। স্বাগত যাতে ছবিটা ভালোভাবে দেখতে পায় যে জন্য নারেঙ ছবিটার গা থেকে একটু সরে দাঁড়াতেই আর একটা জিনিস দেখতে পেল স্বাগত। লোকগুলোর সামনে একটা কুমির মুখটা হাঁ করে আছে সে। দেওয়াল চিত্রটা ভালো করে দেখার পর স্বাগত বলল, ‘না, দেখিনি। আসলে একদিনে আমাদের পক্ষে সব কিছু দেখা সম্ভব হয়নি।’
স্বাগতর কথা শুনে নারেঙ গাইড ফঙকে বলল, ‘এই ভদ্রলোক আমাদের বন্ধু। তুমি ওকে এই আশ্চর্য ছবিটার সম্পর্কে বল।’
গাইড ফঙ এতক্ষণ স্বাগতর দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। নিশ্চিতভাবেই যে চিনতে পেরেছে স্বাগতকে। মিস্টার নারেঙের কথা শুনে সে যেন অনিচ্ছাকৃতভাবেই বলল, ‘এটা হল পিণ্ড দানের ছবি। মৃত মানুষদের আত্মারা যাতে বিষ্ণুলোকে প্রবেশের অনুমতি লাভ করে সে জন্য পিণ্ডদান করা হতো। পিণ্ড ভক্ষণ করানো হতো কুমিরদের। সে সময়ে কুমিরদের ভগবান বিষ্ণুর প্রেরিত জীব বলে মনে করা হতো। এই ছবির লোকগুলোর হাতের গোলাকার বস্তুগুলো হল পিণ্ড। ওরা পিণ্ড খাওয়াচ্ছে কুমিরকে।’
ফঙ তার কথা শেষ করতেই নারেঙ বলল, ‘দেখলেন তো কি আশ্চর্য ব্যাপার?’
গাইড ফঙ এরপর নারেঙ খামের কথার পৃষ্ঠে মন্তব্য করল, ‘এমন বহু আশ্চর্য ব্যাপার এই বিষ্ণুলোক আর এর চারপাশে ছড়িয়ে আছে স্যর। যে সব বিদেশিরা বিষ্ণুলোক সম্পর্কে দু-চারটে ইংরাজি বই পড়ে মনে করে যে আঙ্করের সব কিছু তাদের জানা হয়ে গেছে তারা আসলে অনেক কিছুই জানেন না। বইতে কি আর সব কিছু লেখা থাকে? অথচ তারা স্থানীয় মানুষদের থেকেও নিজেদেরকে বেশি বিজ্ঞ ভাবেন।’
ফঙের কথাটা শুনে স্বাগতর মনে হল ফঙ যেন আসলে
রামমূর্তি স্যরের উদ্দেশেই কথাগুলো বলল তাকে শুনিয়ে। ফঙের কথাতে অবশ্য কোনও মন্তব্য করল না স্বাগত। ফঙ এরপর নারেঙ খামকে বলল, ‘চলুন স্যর? আরও অনেক বিস্ময়কর জিনিস আছে এ মন্দিরে। যত সময় এগবে তত বেশি ট্যুরিস্টরা মন্দিরে ঢুকবে। তখন তাদের ভিড়ে মন্দির ভালো করে দেখাতে অসুবিধা হবে।’
গাইড ফঙ এর তাড়া শুনে নারেঙ, স্বাগতকে বলল, ‘আমরা এবার অন্যদিকে যাই। আর আপনিও নিজের মতো করে মন্দির দেখুন। আবার দেখা হবে।’
স্বাগতও প্রতুত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ, আবার দেখা হবে।’
মন্দিরের গোলোকধাঁধায় গাইড ফঙের পিছনে নারেঙ খাম আর বুল অদৃশ্য হয়ে গেল। তারা চলে যাওয়ার পর স্বাগত কয়েক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে মনের খেয়ালে সেই পিণ্ডদানের দৃশ্যর বেশ কয়েকটা ছবি তুলল। তারপর তিনতলায় ওঠার পথ খুঁজতে লাগল। সে পথ মিলে গেল একসময়। তবে কোনও এক জায়গা থেকে সিঁড়ি সরাসরি তিল তলায় ওঠেনি।
নানান জায়গা থেকে সিঁড়ির ধাপ খানিকটা করে ওপরে উঠেছে। সেই প্রতিটা ধাপের শেষে রয়েছে নানা ধরনের প্রাচীন চিত্র, মূর্তি সমৃদ্ধ অলিন্দ অথবা বিবর্ণ, নির্জন, শূন্য কক্ষ। সেই ধাপগুলো অতিক্রম করে এক সময় স্বাগত পৌঁছে গেল মন্দিরে সর্বোচ্চ তলে। সে যেখানে উঠে এল সেখান থেকে পূর্ব আর পশ্চিমে সার সার ঘর চলে গেছে। সেই ঘরগুলোর হায়ে অলিন্দও আছে। কক্ষ সংলগ্ন অলিন্দ। থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি যাচ্ছে স্বাগতর।
অলিন্দ থেকে মন্দিরের নীচের অংশে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। স্বাগত বুঝতে পারল এ জায়গা মন্দিরের তৃতীয় তল হলেও সে আসলে নয়দশ তলা বাড়ির সমান উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। অলিন্দের দু’দিকে তাকিয়ে স্বাগত কাউকে দেখতে পেল না। তার মনে হল, কৌতূহলী কিছু মানুষ ছাড়া হয়তো এত ওপরে সচারচর কেউ ওঠে না। এত বড় মন্দিরের নীচের অংশের সব কিছুইতো একদিনে দেখে শেষ করা যায় না। রামমূর্তি স্যরের নির্দেশ মতোই স্বাগত পূর্ব দিকে এগল। বিশাল বিশাল ঘর সব।
একটা ঘরের মধ্যে দিয়ে অন্য ঘরে প্রবেশ করা যায়। তবে ঘরগুলোর অতি জীর্ণ দশা। মাথার ওপর থেকে ছাদের চলটা খসে পড়েছে, কোথাও আবার দেওয়ালের গায়ের প্রাচীন ভাস্কর্যগুলো খসে পড়েছে। তবুও তারই মধ্যে থেকে পাল্লাবিহীন দরজা-জানলা দিয়ে প্রবেশ করা সূর্যালোকে উঁকি দিচ্ছে তারা যেন চেয়ে আছে স্বাগতর দিকে। স্বাগত অনুমান করল এই কক্ষ-অলিন্দ-গ্যালারিগুলো মন্দির শীর্ষে অবস্থান করায় আর দরজা জানলার কপাটগুলো বহু যুগ আগে খসে পড়ার কারণে ঝড় জল প্রাকৃতি দুর্যোগের ধাক্কা বহু শত বছর ধরে সহ্য করে আসতে হচ্ছে এই কক্ষগুলোকে। তাই এই কক্ষগুলোর এমন করুণ অবস্থা।
এক অসম্ভব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে কক্ষ আর অলিন্দে। স্বাগত শুনতে পাচ্ছে নিজের পায়ের শব্দ। সাবধানে একটার পর একটা ঘর অতিক্রম করতে করতে স্বাগত এক সময় পৌঁছে গেল পূর্ব দিকের শেষ ঘরটাতে। ঘরে পা রেখেই চারপাশে তাকিয়ে সে একটা দেওয়ালের গায়ে দেখতে পেল রামমূর্তি স্যর যে ছবির খোঁজে তাকে বিষ্ণুলোকে পাঠিয়েছেন সেটা। পুরো একটা দেওয়াল জুড়ে খোদিত আছে একদল মানুষের মূর্তি। স্বাগত সেদিকে এগতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই মাথার ওপর একটা অদ্ভুত শব্দ শুরু হল আর মুহূর্তের মধ্যে ঘরের মধ্যে যেন ধুলোর ঝড় উঠল। যতক্ষণ না সেই বিশাল বিশাল বাদুরগুলো সে ঘর ছেড়ে বাইরের আকাশে উড়ে গেল এতক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল স্বাগত। তারপর সব কিছু আবার আগের মতো শান্ত হয়ে গেল। স্বাগত মাথার ওপরের ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল এ ঘরের ছাদটাকে কয়েকটা লোহার কড়ি বরগা দিয়ে ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনও এক সময় এ ঘরের সংস্কারের ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল। ওই লোহার বিমগুলোই তার প্রমাণ। এ কক্ষে আরও একটা উন্মুক্ত জানলা ও দরজা আছে। ঘরের যে দেওয়ালে প্রাচীন চিত্রটা খোদিত আছে সেদিকে যাওয়ার আগে স্বাগত বিপরীত দেওয়ালের জানলাটা দিয়ে বাইরে তাকাল। নীচে মন্দিরের ভিতরের চত্বরটা সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছে এই জানলা দিয়ে। একবার সেদিকটা দেখে নিয়ে স্বাগত গিয়ে দাঁড়াল দেওয়াল চিত্রগুলোর সামনে। স্বাগতরা যে নামহীন মন্দিরে কাজ করছে সেখানকার মূর্তিগুলোর মতোই হুবহু একইরকম এ মূর্তিগুলোও। অস্ত্রধারী সৈনিকরা তাদের নিরাপত্তার ঘেরাটোপে একদল মুণ্ডিত মস্তক, কলসবাহী লোককে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। তবে অজানা মন্দিরের ছবির সঙ্গে এ মন্দিরের এ ছবিটার একটা পার্থক্য আছে। তা হল মুণ্ডিত মস্তক লোকগুলোকে নিয়ে এগিয়ে চলা সৈনিক বা রক্ষীদের মধ্যে অগ্রবর্তী লোকটা সামনের দিকে তর্জনী তুলে স্পষ্টভাবে তাদের যাত্রাপত্র নির্দেশ করছে। সে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে সামনের দরজাটা। যেন কলস হাতে ধরা লোকগুলোকে ওই পথেই যেতে হবে।
কী আছে ওদিকে? ছবি তোলার আগে তা দেখার জন্য স্বাগত গিয়ে দাঁড়াল সেই উন্মুক্ত প্রস্থান পথের সামনে। সেই দরজার বাইরে মহাশূন্য। বাইরে পা রাখলেই অনেক নীচে গিয়ে পড়তে হবে। তাহলে ওই সৈনিক হাত তুলে এ পথ দেখাচ্ছে কেন? উন্মুক্ত দরজার গায়ের পাথরের স্তম্ভ ধরে স্বাগত প্রথমে নীচের দিকে তাকাল। মন্দিরের বাইরের অংশটা দেখা যাচ্ছে। স্বাগত ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পেল দরজার ঠিক বাইরেই এখনও একটা সিঁড়ির ধাপ ঝুলন্ত অবস্থায় বাইরের দেওয়ালের গায়ে আটকে আছে। এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল স্বাগত। কোন একদিন এ কক্ষে ওঠা নামার জন্য পাথরের সিঁড়ি ছিল। মহাকাল তার অস্তিত্বকে গ্রাস করে নিয়েছে। দরজার নীচে আজ তার একটা চিহ্ন শুধু জেগে আছে। স্বাগত এরপর দৃষ্টি দিল দূরের দিকে। যত দূর তার চোখ যায় দেখা যাচ্ছে গাছের সবুজ মাথাগুলো। বিশাল এক অঞ্চলকে চাঁদোয়ার মধ্যে বেশ অনেকটা দূরে একটা বিন্দু চোখে পড়ল তার। লাল রঙের একটা বিন্দু। ভালো করে সেটা দেখার পর স্বাগত অনুমান করল ওটা একটা পতাকা। স্বাগত মনে মনে হিসাব করে বুঝতে পারল ওই অঞ্চলেই তাদের মন্দিরটার অবস্থান। অর্থাৎ রামমূর্তির নির্দেশ মতো মন্দিরের ছাদে পতাকা টাঙিয়ে ফেলেছে হেরুম। আর সেই পতাকাটাই স্বাগত দেখতে পাচ্ছে। এ ব্যাপারটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে স্বাগতর মনে আরও একটা প্রশ্নের উদয় হল। তবে কি ওই অগ্রবর্তী সৈনিক কলম হাতে ধরা লোকগুলোকে নিয়ে স্বাগতদের মন্দিরটার দিকে যাওয়ার কথা বলছে? স্বাগতর মনে হল সম্ভবত ব্যাপারটা তাই। হাজার বছর আগে হয়তো এই দরজা দিয়ে মন্দিরের বাইরে নেমে দূরের ওই মন্দিরটাতে যাওয়ার কোনও সোজা রাস্তা ছিল। এই বিষ্ণুলোক থেকেই কলস বা ঘড়াগুলো বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ওই অনামী মন্দিরে। কিন্তু কী ছিল তার মধ্যে?
স্বাগত আবার ফিরে এল মূর্তিগুলোর কাছে। সঙ্গে করে সে একটা ব্রাশ এনেছিল। সেটা দিয়ে মূর্তিগুলোর গা থেকে যথা সম্ভব ধুলো পরিষ্কার করল। ধুলো মুছে দিতেই কলমগুলোর গায়ে শিকলের চিহ্ন ফুটে উঠল। এরপর সে রামমূর্তি স্যরের কথা মতো ছবি তুলল মূর্তিগুলোর। ঘণ্টাখানেক সময় এভাবেই কেটে গেল। এরপর সে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে ফেরার পথ ধরল। স্বাগত প্রথমে ভেবেছিল মন্দিরটাতে খানিকটা ঘুরবে সে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ায় তার মনে হল রামমূর্তি স্যর হয়তো প্রতীক্ষা করে আছেন ছবিগুলোর জন্য। তাই সে বিষ্ণুলোকে আর ঘুরে না বেড়িয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল। তিনতলা থেকে দোতলায় নেমেই সে দেখতে পেল, ইতিমধ্যেই প্রচুর ট্যুরিস্ট প্রবেশ করেছে মন্দিরে। বেলা যত বাড়ছে ট্যুরিস্টদের সংখ্যা ততই বাড়ছে। তাদের পাশ কাটিয়ে একতলায় নেমে সে এগল বাইরে বেরনোর জন্য। সে যখন মন্দির তোরণের নীচ দিয়ে বাইরে বেরতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় সে দেখতে পেল ফঙকে। তবে মিস্টার নারেঙ বা বুল তার সঙ্গে নেই। স্বাগতর সঙ্গে তোরণের চাতালে বসা ফঙের চোখাচোখি হতেই ফঙের ঠোঁটের কোণে একটা বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। সে স্বাগতকে বলল, ‘আপনি এখানে কী দেখতে এসেছিলেন আমি জানি।’
স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘কী জানো তুমি?’
ফঙ আঙুল তুলে বাইরের আকাশটা দেখাল। বাদুরের ঝাঁক তখনও আকাশে উড়ছে।’
ফঙের ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হল না স্বাগতর। অর্থাৎ ফঙ জানে ওই বাদুরগুলো কোন জায়গায় থাকে। আর কেন তারা ওড়াউড়ি করছে।
স্বাগত আর কোনও কথা বলল না ফঙের সঙ্গে। বিষ্ণুলোক থেকে বেরিয়ে সে ফেরার জন্য রওনা হয়ে গেল।
বন পথে প্রবেশ করে কিছুটা এগোবার পরই সে গাছপালার ফাঁক দিয়ে উড়তে থাকা পতাকাটা দেখতে পেল। হ্যাঁ, লাল-নীল, কম্বোডিয়ার জাতীয় পতাকাটা তাদের কাজের জায়গাতেই ওড়ানো হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে একটা বাঁকের মুখে দূর থেকে সে দেখতে পেল সেই স্থান। যেখানে গতকাল শেষ বিকালে
হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে একটা বাঁকের মুখে দূর থেকে সে দেখতে পেল সেই স্থান। যেখানে গতকাল শেষ বিকালে সেই রহস্যময় যুবতীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। খামের যুবতীর আচরণ অদ্ভুত হলেও সে স্বাগতকে গল্প শোনাবে বলেছে।
সেই রহস্যময় যুবতীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। খামের যুবতীর আচরণ অদ্ভুত হলেও সে স্বাগতকে গল্প শোনাবে বলেছে। সময় সুযোগ হলে একদিন বিকালে স্বাগত তার কথা শুনতে আসবে।—এ কথাটা স্বাগত আরও একবার মনে মনে ভেবে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে। মন্দিরের ভিতরে একটা ছাদে বিরাট একটা দণ্ডের মাথায় উড়ছে পতাকাটা। বাইরে কাউকে দেখতে না পেয়ে তোরণ অতিক্রম করে ভিতরের চত্বর হয়ে ঘরগুলোতে প্রবেশ করল সে।
একটা ঘরের ভিতর রক্ষী মূর্তির সাফাই করছিল স্বাগতর চার সহকর্মী। সুরভী বলল, ‘রামমূর্তি স্যর ভিতরে জঙ্গল সাফাইয়ের তদারকি করছেন। স্বাগত এগল সেদিকে। সে ঘরে সার বাঁধা মূর্তিগুলো আছে সে ঘরটা অতিক্রম করে বাইরে বেরবার সময় স্বাগত একবার তাকাল দেওয়াল চিত্রর দিকে। হ্যাঁ, ঠিক এমনই মূর্তি সে দেখে এসেছে বিষ্ণুলোকে।
সেই কক্ষ থেকে ভিতরের প্রাঙ্গণে নেমে স্বাগত দেখল মজুরের দল মূল মন্দিরের নানা স্থানে উঠে গাছপালা কাটছে। আর রামমূর্তি স্যর প্রাঙ্গণের এক পাশে অলিন্দের ছাদের নীচে দাঁড়িয়ে তাদের কাজ দেখছেন।
স্বাগতর তার কাছে গিয়ে ক্যামেরটা তুলে দিল তার হাতে। তারপর বলল তার অভিজ্ঞতার কথা। বিষ্ণুলোকে যাওয়ার পথে স্বাগতর সঙ্গে যে বৌদ্ধ ভিক্ষু রত্ন সম্ভবের দেখা হয়েছিল, তিনি যে রামমূর্তি স্যরকে বায়ুম মন্দিরে যেতে বলেছেন, বিষ্ণুলোকে মিস্টার নারেঙ খাম, বুন আর ফঙের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া, সব ঘটনাই স্বাগত জানাল স্যরকে।
এমনকী এ মন্দিরের মাথায় ওড়ানো পতাকাটা যে বিষ্ণুলোকের সেই কক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে সে কথাও স্বাগত বলল রামমূর্তি স্যরকে। সব শোনার পর তিনি ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার খুলে ছবিগুলো দেখতে শুরু করলেন। বেশ কিছু সময় ধরে তিনি ছবিগুলো দেখার পর স্বাগতকে একটা ছবি দেখিয়ে বললেন, ‘আঙ্কর মন্দিরের এই ছবিটার জন্যই অনেকে মনে করেন কুমিরদের পিণ্ড ভক্ষণ করানো হতো। গতদিন তোমাদের ছবিটা দেখানো হয়নি। ছবিটা তোমার চোখে পড়েছে দেখে ভালো লাগল। ভালো করেছ ছবিটা তুলে।’
স্বাগত বলল, ‘এই ছবিটার সামনেই নারেঙ খাম আর বুন দাঁড়িয়ে ছিল। ফঙ বলছিল এটা পিণ্ড ভক্ষণ করাবার দৃশ্য! ছবিটা বেশ আকর্ষণীয়। তাই তারা চলে যাওয়ার পরে ছবিটা তুলেছি।
রামমূর্তি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে স্বাগতকে বললেন, ‘তুমি তো বেশ কিছুদিন হয়ে গেল এখানে আছ। এই মন্দিরের আশপাশে কোন বাচ্চা তোমার কোনদিন চোখে পড়েছে কি? এই ধর আট-দশ বছর বয়সি কোন বাচ্চা?
স্বাগত বলল, ‘না, কেন?’
রামমূর্তি আরও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বললেন, “তুমি এসো আমার সঙ্গে। একটা জিনিস দেখাই তোমাকে।”
রামমূর্তি স্যরের পিছনে হেঁটে এসে স্বাগত প্রবেশ করল সে ঘরে যেখানে দেওয়ালের গায়ে সৈনিক আর কলস হাতে লোকগুলোর মূর্তি খোদাই করা আছে। সেই দেওয়ালের সামনে গিয়ে রামমূর্তি হাঁটু ভাজ করে বসলেন। স্বাগতও বসল, দেওয়ালটার নীচে মূর্তিগুলো পরিষ্কার সময় যে ধুলো খসে পড়েছিল তা ছড়িয়ে আছে। আর তার ওপর জেগে আছে বেশ কয়েকটা জুতোর ছাপ। সেগুলো স্বাগতদেরই হবে। তারই ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকটা ছোট ছোট খালি পায়ের ছাপ কিছুটা অস্পষ্টভাবে জেগে আছে। রামমূর্তি বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগে এখানে দাঁড়িয়ে মূর্তিগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ কলমটা পকেট থেকে পড়ে গেল। সেটা মাটি থেকে ওঠাতে দেখেই ছাপগুলো নজরে এল।’
