বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২০
পর্ব ২০
কাজেই স্বাগতও সে জায়গা ছেড়ে উঠে পড়ল। সে একবার তাকাল বিষ্ণুলোকের দিকে। লাল রং ধরতে শুরু করেছে তার মাথার আকাশে। সূর্যের রং ঠিক রক্তর ফোঁটার মতো লাল। গাছে ঘেরা জায়গাটা থেকে বাইরে বেরিয়ে এল স্বাগত। আর বাইরে বেরিয়েই সে দেখতে পেল যুবতীর অনুমান সত্যি। তবে লোকটা অন্য কেউ নন, প্রফেসর রামমূর্তি হেঁটে আসছেন সেদিকে। স্বাগতও এগল তাঁর দিকে। নারীমূর্তির কাছে যে স্তম্ভর ওপর এসে স্বাগত বসে, সে স্থান আর রাস্তার মাঝামাঝি জায়গায় এসে মিলিত হল তারা দু’জন। রামমূর্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওই জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে কী করছিলে? কিছু আছে নাকি ওখানে?’
অর্থাৎ রামমূর্তি স্যর ওই গাছে ঘেরা জায়গাটার আড়াল থেকে তাকে বাইরে বেরতে দেখেছেন। স্বাগত খামের যুবতীকে কথা দিয়েছে, সে তার কথা অন্য কাউকে বলবে না। তাছাড়া সত্যি কথা বললে রামমূর্তি স্যরের কী প্রতিক্রিয়া হবে স্বাগতর জানা নেই। হয়তো বা তিনি ওই যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বারণ করতে পারেন স্বাগতকে। তাই চুপ করে রইল স্বাগত।
তার জবাব না পেয়ে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘ওই গাছে ঘেরা জায়গাটার ভিতর কিছু আছে নাকি?’
এবার হঠাৎই একটা বুদ্ধি খেলে গেল স্বাগতর মাথায়। সে জবাব দিল, ‘প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য একটু আড়ালে গেছিলাম স্যর। তবে ওখানে তেমন কিছু নেই স্যর, দু-একটা স্তম্ভ, পাথরের খণ্ড এসব পড়ে আছে।’
রামমূর্তি স্যর আক্ষেপের স্বরে বললেন, ‘সময় বড় নির্মম। এখানকার কত কিছুকেই যে সে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে তার ঠিক নেই। চারপাশে পরিখা দিয়ে ঘেরা থাকার কারণে বিষ্ণু মন্দিরটা মোটামুটি অক্ষত আছে এটাই একমাত্র সান্ত্বনা।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘আমাদের মন্দিরটার ব্যাপারে নতুন কিছু তথ্য উদ্ধার করতে পারলেন স্যর?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘এখনও তেমন কিছু নয়। মন্দিরের সব অংশে ভালো করে অনুসন্ধান চালাতে হবে। এমনও হতে পারে প্রাচীন মন্দিরের ভিতর কোনও গুপ্তকক্ষ আছে। যার মধ্যে হয়তো কোনও বিগ্রহ লুকানো আছে, যা আমাদের মন্দির সম্পর্কে পরিচিতি দান করবে। চামেরা যখন এই মন্দির নগরী আক্রমণ করে তখন অনেক বিগ্রহকেই মন্দিরের নানা স্থানে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। তেমন কিছু যদি থাকে তবে সেটা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘তোমাকে একটা কথা বলি স্বাগত। কথাটা শুনলে অন্যরা হয়তো ভয় পেতে পারে। আমার অনুমান মন্দিরের ভিতর অন্য কেউ লুকিয়ে আছে বা প্রবেশ করছে। শুধু ওই পায়ের ছাপই নয়, আমার চোখে এমন আরও বেশ কিছু চিহ্ন ধরা পড়েছে যা মানুষের উপস্থিতির চিহ্ন বলেই মনে হয়। আমি মন্দিরের বেশ কয়েকটা ঘর ও অলিন্দে একলা ঘুরে বেড়িয়েছি যেখানে তোমরা বা মজুরের দল ঢোকেনি। তেমনই একটা ঘরের কোণে দেখলাম সরু লাঠির মতো একটা গাছের ডাল পড়ে
নিজের ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করার সময় স্বাগতর হঠাৎই কেন জানি মনে পড়ে গেল নামের যুবতীর সতর্কবাণীর কথা—রাতে ঘর ছেড়ে বেরিও না।’ বিছানায় শোওয়ার পর ওই খামের যুবতীর কথাই ভাবতে লাগল সা
আছে। আর সেটা দিয়ে দেওয়ালের গায়ে আঁচর কাটা হয়েছে। ওই ডালটা বাইরে থেকে ঘরের ভিতর এল কীভাবে?’
স্বাগত বলল, ‘যে বাঁদরিটা মন্দিরের ভিতর ঘুরে বেড়ায় ওটা তার কাজ নয় তো?’
রামমূর্তি বললেন, ‘সম্ভবত না। কারণ দেওয়ালের গায়ের ছাপগুলোর মধ্যে বৃত্ত বা ত্রিভুজের মতো কিছু আঁকাও আছে। বাঁদর জ্যামেতিক নকশা আঁকবে কীভাবে?’
রামমূর্তি স্যর এরপর বললেন, ‘আর একটা কথা। ওই নারেঙ খাম ও ফঙ মন্দির আর আমাদের কাজের ওপর লক্ষ রাখার চেষ্টা করছে। ওদের হয়তো ধারণা যে মন্দিরের ভিতর গুপ্তধন বা ওই ধরনের কিছু লুকানো থাকতে পারে। আমার ঘরের জানলা দিয়ে জঙ্গলের কিছুটা অংশ দেখা যায়। আজ দুপুরে কাজ শেষ হওয়ার পর, তোমরা ঘরে চলে যাওয়ার পর আমি নিজের ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিলাম। জানলার পাল্লাটা সামান্য একটু খোলা ছিল। বাইরে চোখ যেতেই দেখি, জঙ্গলের কিনারে দাঁড়িয়ে ওরা দু’জন তাকিয়ে আছে মন্দিরের দিকে। আমি জানলাটা খুলতেই ওরা তাড়াতাড়ি জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে গেল! ওদের প্রতি বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।’
তাঁর কথা শুনেই স্বাগত বলল, ‘কিছু সময় আগে আমি যখন এখানে এলাম তখন ওরা দু’জন এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমার সঙ্গে কথাও বলল। নারেঙ মন্দিরে কিছু পাওয়া গেছে কি না সে সম্পর্কে জানতে চাইছিল। আমি কিছু জানাইনি তাকে। সে বলল, ‘কাল ওর আমাদের মন্দিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’
কথাটা শুনে রামমূর্তি স্যর গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ওদের সম্পর্কে আমার ধারণা সঠিক বলেই মনে হয়। তবে নারেঙের কাছে সরকারি কাগজ আছে। তাকে আটকাবার ক্ষমতা আমার নেই। তবে ওই ফঙকে আমি মন্দিরে ঢুকতে দেব না। এমনও হতে পারে যে মন্দিরে গুপ্তধন আছে এ ব্যাপারটা সে-ই নারেঙের মাথায় ঢুকিয়েছে।’
বিষ্ণু মন্দিরের আড়ালে সূর্যদেব ইতিমধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলেছেন। সেদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘চল এবার ফেরা যাক?’
মন্দিরের দিকে এরপর হাঁটতে শুরু করল তারা দু’জন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, ‘ভাবছি কাল একবার বায়ুম মন্দিরে যাব রত্ন সম্ভরের সঙ্গে দেখা করতে।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘আমরাও কি যাব আপনার সঙ্গে?’
তিনি বললেন, ‘তোমাদেরকেও ওই মন্দির দেখাব বলেছি। কিন্তু আমাদের মন্দির ছেড়ে সবাই একসঙ্গে অন্যত্র চলে যাওয়া ঠিক হবে বলে এখন মনে হচ্ছে না। আমাদের অবর্তমানে নারেঙ খাম মন্দিরে ঢুকে পড়তে পারে। ভেবে নিয়ে কাল এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব।’
স্বাগত বলল, ‘বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্ন সম্ভর তো দীর্ঘদিন এ অঞ্চলে আছেন। বেশ কিছুদিন তিনি আত্মগোপনও করেছিলেন ওই মন্দিরে। ওই মন্দির সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি আপনাকে?’
রামমূর্তি স্যর সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, ‘ওর ভিতর প্রবেশ না করার জন্য তিনি আমাকে অনুরোধ করেছিলেন।’ -এ কথা বলে কী যেন ভাবতে ভাবতে তিনি মন্দিরের দিকে এগতে থাকলেন। স্বাগতও তাঁকে আর কোনও প্রশ্ন করল না। পাছে তাঁর ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটে। তারা মন্দিরের কাছে ফিরে আসতেই সন্ধ্যা নামল।
প্রতি রাতের মতোই রান্নার বন্দোবস্ত করা হল সকলে মিলে। গল্পগুজবও হল নিজেদের মধ্যে। তারপর খাওয়া সেরে যে যার ঘরে ফিরে গেল। নিজের ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করার সময় স্বাগতর হঠাৎই কেন জানি মনে পড়ে গেল খামের যুবতীর সতর্কবাণীর কথা—‘রাতে ঘর ছেড়ে বেরিও না!’ বিছানায় শোওয়ার পর ওই খামের যুবতীর কথাই ভাবতে লাগল সে। কবে তার কথা শেষ হবে কে জানে? সে কি সত্যিই এই মন্দিরের আসল রহস্য জানে?—এ সব কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে।
কিন্তু খামের যুবতী তাকে নিষেধ করলেও সে রাতে তাকে ঘরের বাইরে বেরতেই হল। আর বেরতে হল অন্যদেরও। হঠাৎই শেষ রাতের দিকে একটা চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল তার। প্রীতমের গলা— সে চিৎকার করছে, ‘কুমির! কুমির!’
সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে স্বাগত দরজা খুলে বাইরের চত্বরে বেরিয়ে এল। তাকে দেখতে পেয়ে প্রীতম বলল, ‘আমি এইমাত্র একটা কুমির দেখলাম। প্রাণীটা মন্দির তোরণের দিক থেকে চত্বরের এদিকে এগচ্ছিল। আমি চিৎকার করতেই সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে আবার তোরণের দিকে ফিরে গেল।’
কথাটা শুনে স্বাগত এগল প্রীতমের দিকে। রামমূর্তি স্যরও দরজা খুলে ছুটে আসলেন। বিক্রমও বাইরে বেরল। রামমূর্তি স্যর ব্যাপারটা শুনে প্রথমে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ঠিক দেখেছ? কীভাবে দেখলে প্রাণীটাকে?’
প্রীতম দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, ঠিক দেখেছি। বাথরুম করতে বাইরে বেরিয়ে ঘরে ঢোকার সময় তোরণের ওদিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম। মাঝারি আকৃতির কুমির।’
এসব কথাবার্তার শব্দে সুরভী আর নাতাশাও দরজা খুলে এসে দাঁড়াল তাদের কাছে। সুরভীর হাতটা নাতাশা চেপে ধরে আছে। রামমূর্তি স্বগতোক্তির স্বরে বললেন, “কিন্তু কুমির কীভাবে আসবে এখানে। কাছে জলাশয় বলতে তো বিষ্ণুলোকের পরিখা, কিন্তু সেখানে তো কুমির নেই।”
নাতাশা এবার বলে উঠল, ‘কুমিরটা কোনও প্রেতাত্মা নয় তো?’
রামমূর্তি কখনও স্বাগতদের কড়াভাবে কথা বলেন না। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে নাতাশার কথা শুনে স্পষ্টতই বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, ‘তুমি ঘরে যাও। এখানে আরও অনেকদিন কাজ করতে হবে আমাদের। এ জায়গায় থাকতে তুমি যদি আতঙ্ক বোধ কর, তবে দেশে ফিরে যেতে পার। সে ব্যবস্থা আমি করে দেব।’
এ কথা বলে তিনি সুরভীকে বললেন, ‘তুমি নাতাশাকে নিয়ে ঘরে যাও। আমি অন্যদের নিয়ে তোরণের দিকে যাচ্ছি।’
রামমূর্তি স্যরের পিছন পিছন স্বাগতরা এরপর গিয়ে উপস্থিত হল তোরণের সামনে। রামমূর্তি স্যর আলো ফেললেন তোরণের চারপাশে। কোথাও কিছু নেই। তোরণের ভিতরের প্রাঙ্গণে চারপাশের দেওয়াল থাকার কারণে আধো অন্ধকার খেলা করছে। রামমূর্তি সবাইকে নিয়ে তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকলেন। তাঁর টর্চের জোড়ালো আলো পড়তে লাগল প্রাঙ্গণের নানান দিকে। সেই আলো গিয়ে পড়তে লাগল স্তম্ভর গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলোর ওপর। নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে আছে তারা। শূন্য অলিন্দগুলোর মধ্যেও যতদূর আলো গেলো কোথাও জীবন্ত কিছু নেই। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে যথাসম্ভব দেখার চেষ্টা করার পর রামমূর্তি বললেন, এত অন্ধকারের মধ্যে মন্দিরের ভিতরে ঢুকে অনুসন্ধান চালানো ঠিক হবে না। দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সকালে আলো ফুটলে আমরা মন্দিরের ভিতর ঢুকব। মন্দিরের নীচের অংশগুলো ভালো করে খুঁজে দেখব। কুমির তো আর সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে পারবে না। থাকলে একতলাতেই কোনও ঘরে বা অলিন্দে গিয়ে লুকিয়ে থাকবে।’
এ কথা বলে তিনি সকলকে নিয়ে তোরণের বাইরে বেরিয়ে এসে বললেন, , ‘ঠিক আছে, তোমরা এখন ঘরে গিয়ে বাকি রাতটা কাটাও। আমি আমার ঘরের জানলা খুলে বসে থাকছি। প্রয়োজন হলে ডাকব তোমাদের।’
রামমূর্তি স্যরের কথা শুনে সবাই নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল। রামমূর্তি স্যর ঘরে ঢোকার আগে সম্ভবত তাঁর আঙুলের চাপে টর্চের আলোটা হঠাৎ মুহূর্তর জন্য জ্বলে উঠে চত্বর লাগোয়া জঙ্গলের ওপর গিয়ে পড়ল। তারপর আলোটা নিভে গেল ঠিকই। কিন্তু তার পরমুহূর্তেই একটা শব্দ ভেসে এল জঙ্গলের ভিতর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে রামমূর্তি স্যর টর্চটা জ্বেলে আলো ফেললেন জঙ্গলের দিকে। সেই আলোতে স্বাগতরা মুহূর্তর জন্য এক ছায়ামূর্তিকে জঙ্গলের ভিতর যেন অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল! সে দৃশ্য দেখে রামমূর্তি স্যর টর্চের আলো ঘোরাতে লাগলেন জঙ্গলের ওপর। কিন্তু আলো জঙ্গলের ভিতর যে সব জায়গায় প্রবেশ করল সেখানে কাউকেই আর দেখা গেল না। রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘তোমরাও যদি আমার মতো ভুল না দেখে থাক তবে একজন মানুষ পালাল বলে মনে হল।’
স্বাগতরা একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, স্যর, একজন মানুষই বলে মনে হল।’
বিক্রম বলল, ‘লোকটা কে হতে পারে স্যর?’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘জানি না।’
প্রীতম বলল, ‘ওই লোকটা এসে এখানে কুমির ছেড়ে দিয়ে যায়নি তো?’
রামমূর্তি স্যর প্রীতমের কথার জবাবে বললেন, ‘আজ রাতে আর ওই লোকটা বা কুমিরের দেখা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কাল সকালে যা দেখার দেখব। তবে বাকি রাতটুকু আমি জেগে আছি। তোমরা চিন্তা কর না। ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। ভালো করে কাজ করার জন্য ঘুম প্রয়োজন।’ রামমূর্তি স্যরের নির্দেশ পালন করে স্বাগতরা ঘরে ফিরে এল। ব্যাপারটা কী হতে পারে ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়ল স্বাগত।
এদিন ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাগতরা যে যার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। প্রফেসর রামমূর্তিও এসে মিলিত হলেন সবার সঙ্গে। তাঁর চোখে-মুখে রাত্রি জাগরণের চিহ্ন স্পষ্ট। তিনি বললেন, ‘চল এবার মন্দিরের ভিতরে ঢুকে দেখা যাক প্রাণীটার দর্শন মেলে কি না।’ সকলে এগল তোরণের দিকে। বিক্রম বলল, ‘কেউ যদি মন্দিরের ভিতরে কুমিরটাকে ছেড়ে গিয়ে থাকে তবে তার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?’
রামমূর্তি বললেন, ‘আমাদের ভয় দেখিয়ে এ জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে আবার অন্য কোনও কারণও থাকতে পারে।’
সুরভী বলল, ‘কুমিরটা বুলের খামার থেকে আনা হয়নি তো?’
ব্যাপারটা শুনে সে-ও বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল। সবাই মিলে এরপর মন্দিরের সামনের প্রাঙ্গণের আনাচ-কানাচ খুঁজে দেখল, মন্দিরের ভিতরে ঢুকে একতলার ঘর ও তালিন্দগুলোও দেখল, কিন্তু কোথাও চিহ্ন মিলল না।
রামমূর্তি বললেন, ‘হতে পারে। ওই নারেঙ আর গাইড ফঙের আচরণ আমার সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না। নারেঙের সঙ্গে বুলের সম্পর্ক আছে, কুমির সে জোগাড় করতেই পারে।’
প্রীতম বলল, ‘এখানে শুনেছি আরও বেশ কয়েকটা কুমির খামার আছে। কুমিরটা সে সব জায়গা থেকেও সংগ্রহ করে আনা হতে পারে।’
কথা বলতে বলতে মন্দির তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করল সকলে। চত্বরের একপাশে লাঠির মতো কিছু ডাল কেটে রেখে গিয়েছিল মজুররা। রামমূর্তি বললেন, ‘ওই লাঠিগুলো হাতে নাও। বলা যায় না প্রাণীটা হঠাৎ তেড়ে এলে গাছের ডালগুলো আত্মরক্ষার কাজে আসবে।’
স্বাগতরা সেই নির্দেশ মতোই কাজ করল। লাঠি তুলে নিল হাতে। প্রথমে মন্দিরের বাইরের চত্বরটা ও চত্বর সংলগ্ন বারান্দাগুলো ঘুরে দেখল তারা। তারপর সাবধানে প্রবেশ করল ভিতরের চত্বরগুলোতে প্রবেশ করার জন্য যে ঘরগুলো অতিক্রম করতে হয়, তাদের ভিতরে। দু-তিনটে টর্চের জোরালো আলোতে ফালা ফালা হয়ে যেতে লাগল ঘরগুলোর অন্ধকার। প্রতি মুহূর্তেই তাদের মনে হতে লাগল, এই বুঝি কোনও ঘরের কোণে কুমিরটাকে দেখতে পাবে তারা। কিন্তু সেই ঘরগুলোতে কুমিরের সন্ধান মিলল না। যে ঘরটার দেওয়ালে ভাণ্ড হাতে মূর্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেই ঘর অতিক্রম করে ভিতরের চত্বরে নামার সময় প্রফেসর রামমূর্তি মুহূর্তর জন্য থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘প্রীতম তুমি ঠিক দেখেছিলে তো? অনেক সময় রাতেরবেলায় আলোছায়ার খেলা দৃষ্টি বিভ্রমের সৃষ্টি করে। তেমন কিছু হয়নি তো?’
রামমূর্তির কথা শুনে প্রীতম মৃদু আহত স্বরে বলল, ‘আপনাকে কিছু বানিয়ে বলিনি স্যর। আর আমি নেশাও করিনি। স্পষ্ট দেখলাম কুমিরটা তোরণের দিক থেকে বুকে হেঁটে আসছে। আমি ‘কুমির-কুমির’ বলে চিৎকার করাতেই সে লেজ ঘুরিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সেই তোরণের অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।’
প্রীতমের কণ্ঠস্বর শুনে রামমূর্তি বললেন, ‘সরি, মাই বয়। আমি তোমাকে অবিশ্বাস করতে যাব কেন? আসলে এমন দৃষ্টিবিভ্রম অনেক সময় ঘটে থাকে তাই কথাটা বললাম।’
এরপর মূল মন্দিরের চত্বরে নেমে এল তারা। ভোরের আলোয় আলোকিত চত্বর। সেখানেও সেই কুমির চোখে পড়ল না তাদের। ইতিমধ্যে হেরুম এসে উপস্থিত হল সেখানে। রামমূর্তি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকজন কিছু জোগাড় করতে পারলে?’
হেরুম জবাব দিল, ‘না, এখনও নতুন কাউকে রাজি করাতে পারিনি। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
প্রফেসর রামমূর্তি এরপর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে খুব কাছাকাছি কোনও কুমির খামার আছে কি না জানো? যেখান থেকে কুমির চলে আসতে পারে এখানে?’
হেরুম জবাব দিল, ‘যে কটা কুমির খামার সবই সিয়েমরিপে। এখানে কেউ কুমির চাষ করে না। তবে বহু সময় আগে বিষ্ণুলোকের পরিখায় কুমির ছাড়া থাকত বলে শুনেছি।’
রামমূর্তি স্যর এরপর গত রাতের ঘটনার কথা বললেন হেরুমকে। ব্যাপারটা শুনে সে-ও বেশ আশ্চর্য হয়ে গেল। সবাই মিলে এরপর মন্দিরের সামনের প্রাঙ্গণের আনাচ-কানাচ খুঁজে দেখল, মন্দিরের ভিতরে ঢুকে একতলার ঘর ও অলিন্দগুলোও দেখল, কিন্তু কোথাও চিহ্ন মিলল না। প্রফেসর রামমূর্তি এরপর বললেন, ‘এমনও হতে পারে কুমিরটা অন্য কোনও পথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে।’
এ কথা বলার পর তিনি কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, ‘ভাবছি একটু বায়ুম মন্দিরে যাব। তোমাদের সবাইকে মন্দিরটা দেখাব বলেছিলাম, কিন্তু একসঙ্গে সকলে যাওয়া যাবে না। কারণ, স্বাগতর কাছে শুনলাম নারেঙ খাম আবার নাকি আজ আসতে পারে। একটা কাজ করা যাক, স্বাগত-নাতাশা আর সুরভী এখন আমার সঙ্গে চলুক। বিক্রম আর প্রীতম তোমরা মন্দিরটা পাহারা দাও। তোমাদের আর একদিন সে জায়গা দেখিয়ে আনব।’
বিক্রম তাঁর কথা শুনে বলল, ‘আচ্ছা, তাই হবে স্যর।’
