বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২১
পর্ব ২১
রামমূর্তি বললেন, “তবে তোমাদের এখানে থাকার দরকার নেই। বাইরের চত্বরটাতে থাকলেই হবে। ওই নারেঙ খাম যদি মন্দিরে ঢোকে তবে তার পিছন পিছন ঘুরে দেখবে সে কী করার চেষ্টা করছে। তবে ওই গাইড ফঙকে ভিতরে ঢুকতে দেবে না। মন্দিরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতিপত্র নেই ওর কাছে।’ এ কথা বলার পর তিনি হেরুমকে বললেন, ‘কাল আমরা আবার মন্দিরের ভিতরে ঢুকব। তুমি আমাদের দুপুরের রান্নাটা সেরে ফেল। আমাদের ফিরে আসতে দু-তিন ঘণ্টা সময় লাগবে।’ এরপর সবাই ফিরে চলল বাইরের প্রবেশ তোরণের দিকে। সেদিকে এগতে এগতেই রামমূর্তি স্যর একটা গাড়িকে ফোন করলেন আসার জন্য।
স্বাগতরা সবাই তোরণের বাইরে বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা টুকটুক এসে হাজির হল। রামমূর্তি স্যর স্বাগত, নাতাশা আর সুরভীকে নিয়ে রওনা হলেন বায়ুম বুদ্ধ মন্দিরের দিকে। স্বাগত বুঝতে পারল রামমূর্তি সার আসলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্যই বায়ুমে যাচ্ছেন। বনপথ ধরেই গাড়ি এগিয়ে চলল। এদিকে এর আগে স্বাগতদের যাওয়া হয়নি। বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন একদা মন্দির নগরীর এদিকেও ছড়িয়ে আছে। আর যেটা তাদের চোখে পড়ল তা হল বাঁদরের আধিক্য। জঙ্গলের ভিতর, ধ্বংসস্তূপে ছোট বড় দলে বসে আছে তারা। রামমূর্তি স্যরের মুখটা বেশ গম্ভীর। কী যেন ভেবে চলেছেন তিনি। আধঘণ্টা সময়মতো পথ চলার পর সামনের জঙ্গল ফিকে হয়ে গেল। স্বাগতদের চোখে পড়তে শুরু করল বিশাল বায়ুম বুদ্ধ মন্দির, বলা ভালো এক সময়ের বিশাল এক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।
একসময় জঙ্গলের বাইরে এক উন্মুক্ত স্থানে এসে উপস্থিত হল গাড়ি। তার একপাশে বিশাল জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিরাট এক স্থাপত্যের ভগ্নাবশেষ। আঙ্করের মতো অত বিরাট না হলেও এই স্থাপত্যের ব্যাপ্তিও কম নয়। তবে বাইরে থেকেই দেখে বোঝা যায় মন্দিরটা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। হয়তো এ মন্দিরের চারপাশে পরিখার ঘেরাটোপ ছিল না বলেই সময় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থাবা বসিয়েছে এই মন্দিরের ওপর। তবে মন্দিরের বেশ কিছু স্তম্ভ সময়ের ভ্রূকুটিকে
অগ্রাহ্য করে এখনও জেগে আছে। তার মাথায় বসানো আছে বিরাট বিরাট সব পাথুরে মুখমণ্ডল। যা আঙ্করের মন্দিরগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মন্দিরটার দিকে তাকিয়ে রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘এই বায়ুম বা বায়ন বুদ্ধ মন্দিরকে আঙ্করের দ্বিতীয় আশ্চর্য বলা যায়। রাজা সপ্তম জয়বর্ধন আনুমানিক তেরশো শতকে এই মন্দির নির্মাণ করেন বলে অনুমান করা হয়। তিনি বৌদ্ধ ছিলেন। বিষ্ণুলোকের মতো এটাও সে অর্থে ছিল রাষ্ট্রীয় মন্দির। তবে বহুবার এ মন্দিরের চরিত্র বদল হয়। কারণ, জয়বর্ধনের পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজা তাঁদের ধর্ম পরিবর্তন করেন। কেউ আবার বৈষ্ণব বা শৈব্য ধর্মে ফিরে আসেন, কেউ বা আবার হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এবং তাঁরা তাঁদের ভাবনা অনুসারে মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীতে নানা সংযোজন পরিমার্জন করেন। তবে তাঁরা কেউই পূর্বতন রাজার সৃষ্টিকে ধ্বংস করেননি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য এ মন্দির স্থায়ীভাবে বুদ্ধ মন্দিরেই পরিণত হয়।’ রামমূর্তি স্যরের কথা শুনতে শুনতে স্বাগতদের গাড়ি এসে থামল বিরাট বড় একটা টিনের ছাউনি দিয়ে ঘেরা একটা জায়গার সামনে। সে জায়গা থেকে একপাশে একশো পা এগলেই বায়ুম মন্দির। আর অন্যপাশে একটা চৌকনো ভিত্তি প্রস্তরের ওপর সেই টিনের শেড। বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে সেখানে বসে আছেন বিশালাকৃতির এক পাথরের বুদ্ধ। বেশ কিছু লোকজনও আছে সেখানে। ঘণ্টাও বাজছে। গাড়ি থেকে নামার পর রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘রত্নসম্ভর বায়ুম মন্দিরের মধ্যেই এক প্রাচীন কক্ষে থাকেন। সেখানে যাওয়ার আগে একবার ওই মূর্তির কাছে গিয়ে দেখি উনি ওখানে আছেন কি না?
রামমূর্তি স্যরকে অনুসরণ করে স্বাগতরা বেদীর ওপর টিনের শেডের নীচে উঠে এল। বিশাল মূর্তিটা প্রাচীন হলেও বর্তমানে তা নিত্যপুজো পায়। মূর্তির গলায় ফুলের মালা পরানো। সামনে প্রদীপ আর গোছা গোছা ধূপ জ্বলছে। স্নিগ্ধ হাসি জেগে আছে তথাগতের মুখমণ্ডলে। আর তার সামনে চত্বরের মতো জায়গাটাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে বেশ কিছু স্থানীয় লোকজন। তারা কেউ বা ধ্যানমগ্ন। আবার কেউ তাকিয়ে আছে আশ্চর্য সুন্দর করুণাময়ের মুখমণ্ডলের দিকে। স্বাগতরা দেখতে পেয়ে গেল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভরকে। চত্বরের এক কোণে বসে আছেন তিনি। তাঁর সামনে রাখা আছে তাঁর ঝোলাটা। তিনিও দেখতে পেয়ে গেলেন তাদের। ঝোলাটা কাঁধে তুলে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি এগিয়ে এলেন স্বাগতদের সামনে। তারপর বললেন, “বায়ুম বুদ্ধ মন্দিরে আপনাদের স্বাগত জানাই।’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘হ্যাঁ, চলে এলাম। আমার সহকর্মীদের মন্দিরটা দেখানোও হবে আর তার সঙ্গে আপনার সঙ্গে কথা বলাও হবে। শুনলাম আপনি আমার খোঁজ করছিলেন।’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি আজ না এলে হয়তো কাল সকালে আমি আপনার কাছে যেতাম।’
নাতাশা চেয়েছিল বুদ্ধ মূর্তিটার দিকে। সে বলল, ‘এত সুন্দর বুদ্ধমূর্তি আগে কখনও দেখিনি!’
মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাঁ, বায়ুমের বুদ্ধ মূর্তিগুলোর মতো এত স্নিগ্ধ-হাস্যময় মুখমণ্ডলের বুদ্ধ মূর্তি আপনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাবেন না। এটাই এখানকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মন্দিরের ভিতরে চলুন, সেখানেও এমন কিছু হাস্যময় বুদ্ধ মূর্তি দেখতে পাবেন। যদিও বহু মূর্তিই বর্তমানে নষ্ট হয়ে গেছে। খামের রুজের শাসনকালেও অনেক মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
স্বাগতরা এরপর রত্নসম্ভরের সঙ্গে সে স্থান ত্যাগ করে এগল রাস্তার উল্টোদিকে বায়ুম মন্দিরে ওঠবার জন্য। মন্দিরের সামনের অংশটা ছাদহীন, শুধু স্তম্ভগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আঙ্করের সব মন্দিরের মতো এ মন্দিরও উঁচু ভিত্তিবেদীর ওপর স্থাপিত। সিঁড়ি বেয়ে বেদীতে ওঠার সময় রত্নসম্ভর স্বাগতর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ মন্দিরে এখনও কয়েকটা ঘর কিছুটা বাসযোগ্য আছে। তারই একটাতে আমি থাকি। ভগবান বুদ্ধের ধ্যান করি, পড়াশোনা করি। আর ভেষজবিদ্যার চর্চা করি। স্থানীয় কিছু গরিব মানুষ আমার কাছে ওষুধ নিতে আসে। সাধ্যমতো আমি তাদের চিকিৎসাও করি। এভাবেই ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদে আমার দিন চলে যায়।’
মন্দির বেদীর ওপর উঠে এল সকলে, ছাদহীন মন্দিরটার ভিতরের অংশ অনেকটা দেখা যাচ্ছে। প্রবেশ পথের সামনেই বসানো আছে একটা প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তি। কিন্তু তার মুখমণ্ডল ক্ষয়ে গেছে। রত্নসম্ভর সবাইকে নিয়ে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করলেন। চারপাশে সার সার প্রাচীন স্তম্ভ আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। একসময় যারা ধরে রাখত মাথার ওপরের ছাদকে। সেই ছাদের চিত্রগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে তখনও পড়ে আছে চারপাশে। বিষ্ণুলোকের মতো এ মন্দিরের সংস্কার সাধনের কাজ করা হয়নি। খসে পড়া দেওয়াল-ছাদের প্রস্তর খণ্ডগুলোকে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়নি। কিছুটা এগবার পর একসার স্তম্ভ সংলগ্ন কয়েকটা প্রাচীন কক্ষ দেখতে পেল স্বাগতরা। কক্ষগুলোর সামনে একসময় হয়তো অলিন্দ ছিল। স্তম্ভগুলো একসময় ধরে রাখত তার ছাদকে। তেমনই একটা কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে সন্ন্যাসী বললেন, ‘এই আমার বাসস্থান। দাঁড়ান আমার থলেটা ঘরে রেখে আসি।’
এ কথা বলে তিনি সেই প্রাচীন কক্ষের কাঠের দরজাটা খুললেন ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের সূর্যের আলো প্রবেশ করল সে ঘরে। বাইরে দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতর তাকিয়ে স্বাগত দেখল ঘরের দেওয়াল জুড়ে টাঙানো কাঠের পাটাতনের ওপর রাখা আছে কাপড় জড়ানো অনেক পুঁথি! দেখেই বোঝা যায় সে সব প্রাচীন জিনিস। আর রয়েছে একটা বিছানা, কিছু মাটির পাত্র ইত্যাদি।
রত্নসম্ভর তাঁর থলেটা ঘরের ভিতর রেখে বাইরে বেরবার পর স্বাগত তাকে বলল, ‘আপনার ঘরে অনেক পুঁথি দেখতে পেলাম! ওগুলো কি সব বৌদ্ধ পুঁথি?’
রত্নসম্ভর মৃদু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রাচীন পুঁথি সব। আমার আগেও বহু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এখানে থাকতেন, তাঁদেরই সংগ্রহ করা পুঁথি সব। বিভিন্ন সময় তাঁরা নানান জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছিলেন এ সব। পলপটের সেনারা যখন এখানে হানা দিয়েছিল তখন আমি ওই পুঁথিগুলো এ মন্দিরের একটা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে রেখে তার ওপর পাথর চাপা দিয়ে পালিয়ে ছিলাম। জেনারেল পলপটের কমরেডরা পুঁথিগুলো পেলে নিশ্চয়ই পুড়িয়ে ফেলত। হিন্দু-বৌদ্ধ যে কোনও ধর্মের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষী ছিল তারা।’
সুরভী জানতে চাইল, ‘পুঁথিগুলো কোন ভাষাতে লেখা?’
রত্নসম্ভর জবাব দিলেন, ‘পালি ও সংস্কৃত ভাষায়।’
নাতাশা জানতে চাইল, ‘আপনি পুঁথিগুলো পাঠ করতে জানেন?’
ঘরের দরজা বন্ধ করে সবাইকে মন্দির দেখাবার জন্য এগতে এগতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘তা বলতে পারেন। শৈশবে যে বৌদ্ধ মঠে আমি প্রতিপালিত হয়েছিলাম সেখানে আমাকে ভবিষ্যতে বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য পালি ভাষায় পাঠ দান করেছিলেন ভিক্ষুরা। আর যুবা বয়সে এখানকারই এক বৃদ্ধ হিন্দু ব্রাহ্মণের থেকে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করি।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘কী লেখা আছে ওই পুঁথিগুলোতে?’
রত্নসম্ভর বললেন, ‘এ দেশে প্রাচীন ধর্ম, সমাজ, আচারব্যবহার ইত্যাদি নানান বিষয়ে ওই পুঁথিগুলোতে লেখা আছে। তবে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কিত পুঁথিই তার মধ্যে বেশি।’
রত্নসম্ভর এরপর স্বাগতদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে শুরু করলেন মন্দির। বহু বুদ্ধমূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানান জায়গায়। দেওয়াল স্তম্ভের গায়েও রয়েছে নানান ধরনের খোদিত চিত্র-অলঙ্করণ। তবে তার অধিকাংশই ক্ষয়প্রাপ্ত। এই মন্দির বিষ্ণুলোকের থেকে কিছুটা নবীন হলেও সময় এর ওপর থাবা বসিয়েছে বেশি। স্বাগতদের নিয়ে একসময় মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে গেলেন সন্ন্যাসী। মন্দিরের প্রধান কাঠামো যেখানে অবস্থিত। তাদের মাথার ওপর অবশ্য এখনও ছাদ আর চুড়ো আছে। আর সেখানে বসানো আছে বিশালাকৃতির মুখমণ্ডল। প্রফেসর রামমূর্তি স্বাগতদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওই মুখগুলো কার মুখ বলতো?’
নাতাশা বলল, ‘কেন? ভগবান বিষ্ণুর মুখ। যেমন এখানকার সব মন্দিরে আছে।’
রামমূর্তি স্যর হেসে বললেন, ‘না, একইরকম দেখতে হলেও ওগুলো ভগবান বিষ্ণুর মুখমণ্ডল নয়। একই আদলে তৈরি করা মহারাজ জয়বর্ধনের মুখ। যিনি এই মন্দির নির্মাণ করান। ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায় এই মূর্তিগুলোর মুখমণ্ডল বিষ্ণুর মুখমণ্ডলের তুলনায় কিছুটা গোলাকার। তাছাড়া মুকুট ও অলঙ্কারেরও পার্থক্য আছে।’
রামমূর্তি স্যরের কথাকে সমর্থন জানিয়ে সন্ন্যাসী রত্নসম্ভর বললেন, ‘উনি ঠিকই বলেছেন। এইসব মুখমণ্ডল বৌদ্ধভক্ত মহারাজ জয়বর্ধনের।’
মূল মন্দিরে প্রবেশ করল সবাই। তার ভিতরের স্তম্ভ, দেওয়াল ছাদে রয়েছে নানান ধরনের চিত্র। কোথাও ফুললতাপাতার অলঙ্করণ, বৌদ্ধদের উপাসনার দৃশ্য সহ প্রাচীনকালের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার দৃশ্য, বিভিন্ন পশুপাখির ছবি ইত্যাদি। তবে মন্দিরের গর্ভগৃহতে কোনও মূর্তি নেই। কারুকাজ মণ্ডিত শূন্য এক মূর্তি বেদী রয়েছে সেখানে। শুধু একটা বড় ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে বেদির উপর। রত্নসম্ভর বললেন, ‘ওই প্রদীপটা আমিই সকাল-সন্ধ্যায় এসে জ্বালিয়ে রেখে যাই। জনশ্রুতি অনুসারে এই বেদীর ওপর দশ ফুট উচ্চতার দণ্ডায়মান একটা মূর্তি করেছিলেন মহারাজ জয়বর্ধন। যে মূর্তি ছিল পান্না দিয়ে তৈরি। ভগবান বুদ্ধের রাজবেশ। মূর্তিটা বহুমূল্য রত্নের অলঙ্কার দিয়েও শোভিত ছিল।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘মূর্তিটা গেল কোথায়?’
রত্নসম্ভর বললেন, ‘বেশ কয়েকটি প্রাচীন গ্রন্থে সে মূর্তির উল্লেখ আছে। তবে তা কোথায় গেল সেটা.. একমাত্র বলতে পারবে আমাদের চারপাশে এই নিস্তব্ধ দেওয়ালগুলো।’
মন্দিরের গর্ভগৃহ আর অন্যন্য জায়গাগুলো দেখার পর সকলে বাইরে বেরিয়ে এল। রামমূর্তি স্যর রত্নসম্ভরকে বললেন, ‘এবার আপনি এ মন্দিরের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য জিনিসটা ওদেরকে দেখিয়ে দিন।’
তার কথা শুনে বৌদ্ধ ভিক্ষু সবাইকে নিয়ে এগলেন কাছেই এক অলিন্দর দিকে। থাম সমৃদ্ধ অলিন্দর মাথায় এখনও ছাদ আছে। স্বাগতরা উপস্থিত হল সেই অলিন্দে। তার দেওয়ালের গায়ে ছোট ছোট পাথরের ব্লকে নানান ধরনের ছবি খোদিত আছে। স্বাগতদের নিয়ে এগিয়ে গিয়ে রত্নসম্ভর গিয়ে দাঁড়ালেন এক জায়গায়। তারপর আঙুল দিয়ে দেওয়ালের একটা দিকে দেখালেন!
গায়ে খোদিত একটা ছবির প্রতি স্বাগতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করালেন। আর তা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল স্বাগত, সুরভী আর নাতাশা। আঙ্করসহ যত মন্দির তাদের দেখার সুযোগ হয়েছে সেসব জায়গায় তারা মূর্তি দেখেনি বা দেখবে বলে ভাবেনি।
রত্নসম্ভরের দেখানো জায়গায় দেওয়ালের গায়ে রয়েছে একটা বৃত্তাকার অলঙ্করণ। আর তার ভিতর খোদিত আছে ডাইনোসরের একটা মূর্তি। পিঠের ওপরে পাপড়ির আকৃতির শল্ক বসানো, দীর্ঘ লেজওয়ালা ডাইনোসরের ভাস্কর্য। যার ছবি বইয়ের পাতাতেই কেবল দেখা যায়— ‘স্টেগোসেরাস!’ প্রফেসর রামমূর্তি স্বাগতদের উদ্দেশে হেসে বললেন, ‘তোমরা ওটাকে দেখে যে প্রাণী ভাবছ সেটাই ওটা। হ্যাঁ, ডাইনোসর। জুরাসিক যুগের শেষের দিকে আবির্ভাব হয়েছিল স্টেগোসেরাসের। আনুমানিক পনেরো কোটি বছর আগে এরা পৃথিবীতে বাস করত। আর বারো কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে যায়।’
স্বাগত বিস্মিত ভাবে বলল, ‘কিন্তু এই ছবি হাজার বছর আগে খামের শিল্পীরা আঁকলেন কীভাবে? আমার যতটুকু ধারণা এই ডাইনোসরের ফসিল তো মাত্র কয়েকশো বছর আগে আবিষ্কার হয়, তারপর তার ছবি আঁকা হয়। কিন্তু তার আগে আটশো-হাজার বছর আগে এই ছবি কীভাবে আঁকা সম্ভব?’
রামমূর্তি বললেন ১৮৭০ সাল নাগাদ চার্লস মর্গে নামের এক প্রত্নবিদ প্রথম ইউরোপে স্টেগোসেরাসের জীবাশ্মর কিছু অংশ খুঁজে পান। তবে সেই খণ্ডিত জীবাশ্ম দিয়ে প্রাণীটার ছবি রচনা করা যায়নি। তারপর আরও কিছু জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রাণীটার আকৃতি রচনা করা হয়। বলা যেতে পারে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর নিখুঁত অবয়ব বিজ্ঞানীরা রচনা করেন একশো বছর আগে। অথচ তার ছবি আটশো-হাজার বছর আগেই এঁকে ফেলল খামের শিল্পীরা।’
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘ঠিক এমন একটা ভাস্কর্য এখানকার “তা ফোম’ নামে এক মন্দিরেও আছে।’
সুরভীও জানতে চাইল, ‘তা হলে কীভাবে এখানে আঁকা হল বারো-পনেরো কোটি বছর আগেকার প্রাণীর ছবি?’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘এটাকে একটা আনসলভড মিস্ট্রি বলা যেতে পারে। এমনও হতে পারে হাজার দু-হাজার বছর আগেও হয়তো কম্বোডিয়ার জঙ্গলে এই তৃণভোজী বিশালাকৃতির ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত। প্রাচীন খামের অধিবাসীরা তাদেরকে দেখেছিলেন বলেই এমন নিখুঁত ছবি আঁকতে পেরেছিলেন। ভবিষ্যতে জীববিজ্ঞানীরা হয়তো ব্যাপারটার সপক্ষে প্রমাণ তুলে আনবেন।’
সন্ন্যাসী রত্নসম্ভর বললেন, ‘এই প্রাচীন আঙ্কর সাম্রাজ্যে এমন আরও নানানরকম রহস্য আছে যতক্ষণ না কেউ তার সম্মুখীন হচ্ছে ততক্ষণ তা বিশ্বাস করা শক্ত। শুধু প্রাকৃতিক নয়, অতিপ্রাকৃত রহস্যও।’
স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘তার মানে?’
বৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু যেন তার প্রশ্নের জবাবে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
স্বাগতরা তিনজন নিজেদের মোবাইল ফোনে ওই আশ্চর্য ভাস্কর্যর ছবি তুলে নিল। তারপর সে জায়গা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল সকলে। রামমূর্তি স্যর এরপর স্বাগতদের বললেন, ‘তোমরা তিনজন এবার মন্দিরের বাকি অংশগুলো ঘুরে ঘুরে দেখ। আমি সন্ন্যাসীর ঘরে বসে ওর সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বলব। আধঘণ্টা পর তোমরা সেখানে এসো। তারপর আমরা ফেরার জন্য রওনা হব।’ — এ কথা বলে রামমূর্তি স্যর রত্নসম্ভরের সঙ্গে এগলেন তাঁর ঘরের দিকে, আর স্বাগতরাও হাঁটতে শুরু করল মন্দিরের বাকি অংশ দেখার জন্য। নাতাশা, স্বাগতকে জিজ্ঞেস করল, ‘রত্নসম্ভর তাঁর কথায় ‘অতিপ্রাকৃত রহস্য বলতে কী বোঝাতে চাইলেন? ভূত-প্রেত?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘আমি জানি না। ওটা উনিই বলতে পারবেন।’
সুরভী, নাতাশাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল, ‘তোমার এই ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে রামমূর্তি স্যর কিন্তু বেশ অসন্তুষ্ট। আমরা এতগুলো মানুষ সবসময় এক সঙ্গে আছি, তবুও তুমি ভয় পাচ্ছ কেন? মন ঠিক করার চেষ্টা কর। আমরা যে কাজে এসেছি তার সফলতার ওপর কিন্তু ভবিষ্যতে আমাদের কেরিয়ার নির্ভর করছে। মন থেকে এসব ভাবনা মুছে ফেল।’
নাতাশা আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করে বলল, ‘সে চেষ্টা তো আমি করছি। কিন্তু আঙ্করে আসার পর আমার কেন জানি বার বার মনে হচ্ছে কেউ বা কারা যেন আমাদের অলক্ষ্যে লক্ষ করছে! যেন অশুভ কিছু একটা ঘটবে বা ঘটতে চলেছে!’
সুরভী বা স্বাগত কোনও মন্তব্য করল না নাতাশার কথায়। মন্দিরের ভিতর ঘুরে বেড়াতে শুরু করল তারা। দেখতে লাগল জীর্ণ মন্দিরটাকে?
বেলা এগারোটা বাজে। চড়া রোদ উঠেছে আজকে। মন্দির চত্বরের মাথার ওপর ছাদহীন বলে সেই রোদ এসে গায়ে লাগছে। সত্যি প্রচণ্ড উত্তাপ। মিনিট দশেকের মধ্যেই দড়দড় করে ঘামতে শুরু করল তারা। সুরভী এক সময় বলল, ‘তেমন আকর্ষণীয় কিছু তো আর দেখছি না। আমরা বরং একটু বসে বিশ্রাম নিই। তারপর রত্নসম্ভরের ঘরের কাছে ফিরে যাব।’
নাতাশাও সম্মতি জানাল সুরভীর কথায়। স্বাগত বলল, ‘ঠিক আছে, তোমরা ওখানে চলে যেও। আমি আর একটু ঘুরে সেখানে পৌঁছচ্ছি।’
সুরভীরা কাছেই এক স্তম্ভর ছায়ায় গিয়ে বসল আর স্বাগত ঘুরতে শুরু করল মন্দিরটা, যদি তার চোখে চমকপ্রদ কিছু পড়ে সেই আশায়।
তবে কিছু ভাঙা বুদ্ধ মূর্তি ছাড়া স্বাগতর চোখেও তেমন কিছু ধরা দিল না। হয়তো এ মন্দিরে দেখার মতো অনেক কিছুই ছিল, কিন্তু হাজার বছরের সময়কাল আজ গ্রাস করে নিয়েছে সেসব কিছু। হাঁটতে হাঁটতে একসময় স্বাগত খেয়াল করল নিজের অজান্তেই সে পৌঁছে গেছে রত্নসম্ভরের ঘরের কাছে। ঘড়ি দেখল স্বাগত। রামমূর্তি স্যরের দেওয়া আধঘণ্টা সময় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তাই সে এগল ঘরটার দিকে।
