বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২২
পর্ব ২২
স্বাগত ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার কয়েক ফুট তফাতে দুটো স্তম্ভ আছে যা একসময় ধরে রেখেছিল কক্ষগুলোর সামনের ছাদকে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। থামের গায়ে হাত দিয়ে স্বাগত ভাবল রামমূর্তি স্যরের কথা বলা কি শেষ হল? সে কি দরজা ধাক্কা দেবে? নাকি অপেক্ষা করবে তাঁর বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য। ঠিক সেই সময় ঘরের ভিতর থেকে রামমূর্তি স্যরের কণ্ঠস্বর তার কানে এল। রামমূর্তি স্যর রত্নসম্ভরকে বললেন, “তবে আপনি বলছেন যে ওই কলসগুলো মন্দিরের কোনও গোপন স্থানে লুকানো আছে। আর ওই কলসগুলো উদ্ধার করলে কোনও বিপদ হতে পারে।’
রত্নসম্ভর বললেন, ‘হ্যাঁ, ওই জন্যই ওই মন্দিরে কাজ করা থেকে আপনাকে বিরত থাকতে বলছি।’
রামমূর্তি বললেন, ‘কিন্তু একজন প্রত্নতত্ত্ববিদ হিসেবে আমার ওই কলসগুলো উদ্ধার করা দরকার। জানা দরকার ওর মধ্যে কী আছে?’
রত্নসম্ভর বললেন, “অনেক সময় অনেক কিছু না জানাই মঙ্গলজনক হয়।”
রামমূর্তি স্যর অনুরোধের স্বরে বললেন, ‘আপনার কাছে। শেষবারের মতো জানতে চাইছি, ওই কলসগুলো ওই মন্দির প্রাসাদের কোন স্থানে লুকানো আছে সেটা জানা থাকলে দয়া করে আমাকে বলুন?’
বৌদ্ধ ভিক্ষু রত্নসম্ভর বললেন, ‘কলসগুলোর ভিতরে কী রাখা আছে তা আমি বলতে পারব না। তবে কলসগুলো যেখানে রাখা আছে সেই গুপ্তকক্ষের সন্ধান একজন জানে। দেখুন তাকে খুঁজে বার করতে পারেন কি না? দয়া করে এ ব্যাপারে আর কোনও প্রশ্ন করবেন না আমাকে।’
রত্নসম্ভরের কথার প্রত্তুত্তরে রামমূর্তি স্যর কী যেন একটা বললেন, কিন্তু সে কথা কানে গেল না স্বাগতর। কারণ তার মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হল একটা জিনিস দেখে। তার সামনে রোদ্দুরের ওপর একটা ছায়া এসে পড়েছে। মানুষের অবয়ব। পর মুহূর্তেই তার উৎসটা স্বাগত বুঝতে পারল। তার কয়েক হাত তফাতে স্তম্ভর আড়ালে আরও কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে! সে কি আড়ি পেতে ঘরের কথাবার্তা শুনছে? স্বাগতর কানে কথাগুলো এলে নিশ্চয়ই তার কানেও কথাগুলো যাচ্ছে।
স্বাগত বলল, ‘কে? কে দাঁড়িয়ে আছে ওখানে?’
স্বাগতর কথা শুনে যে থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল সে গাইড ফঙ! তাকে দেখে স্বাগত বলল, ‘তুমি এখানে কী করছ?’
ফঙ প্রথমে বলল, ‘কেন? এই মন্দিরে ঢোকাও আমার নিষেধ নাকি?’
তারপর সে বলল, ‘আমি সন্ন্যাসীর কাছে এসেছি।’ স্বাগত আর ফঙের কথাবার্তার শব্দ সম্ভবত কানে গেল ঘরের ভিতরে থাকা রামমূর্তি স্যর ও রত্নসম্ভরের। ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন তাঁরা দু’জন। ফঙকে দেখেই রামমূর্তি বললেন, ‘এ এখানে কেন?’
ফঙ জবাব দিল, ‘আমি ওষুধ নিতে এসেছি এখানে।’
সন্ন্যাসী রত্নসম্ভর বললেন, ‘হ্যাঁ, ও মাঝে মাঝে আমার কাছে ওষুধ নিতে আসে। ফঙ আপনার পরিচিত নাকি?
রামমূর্তি সংক্ষেপে জবাব দিলেন, ‘আমাদের মন্দিরে গিয়েছিল।’
রত্নসম্ভর বললেন, ‘ও তো সর্বত্রই ঘুরে বেড়ায়। আঙ্কর জায়গাটা চেনে ও। এ জায়গা সম্পর্কে অনেককিছু জানে ও।’
রত্নসম্ভরের মুখ থেকে ফঙের প্রশংসা নিশ্চিত ভালো লাগল না রামমূর্তি স্যরের। লোকটাকে তিনি মোটেও পছন্দ করেন না আর সন্দেহের চোখেও দেখছেন। তিনি কোনও মন্তব্য করলেন না রত্নসম্ভরের কথা শুনে। আর এরপরই স্বাগতরা দেখতে পেল সুরভী আর নাতাশা ফিরে আসছে। তারা দু’জন স্বাগতদের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘামে ভিজে গেছে তাদের টি-শার্ট। তারা উপস্থিত হতেই রামমূর্তি রত্নসম্ভরকে বললেন, ‘সবাই ফিরে এসেছে, এবার আমি চলি।’
রত্নসম্ভর ফঙকে বললেন, ‘তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি ওদের এগিয়ে দিয়ে আসছি।’ সকলে এগল বাইরে বেরবার জন্য। নিশ্চুপভাবেই হেঁটে চলল সকলে, রোদের তেজ প্রচণ্ড তীব্র। সবারই পোশাক ঘামে ভিজে গেছে। একসময় সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরের বাইরে নেমে এল সকলে। কিছু দূরে তাদের টুকটুকটা দাঁড়িয়ে আছে। রত্নসম্ভর স্বাগতদের উদ্দেশে বললেন, ‘মন্দির কেমন দেখলেন আপনারা?’
স্বাগত বলল, ‘ভালো। বিশেষত ওই ডাইনোসরের ছবির কথাটা সারাজীবন মনে থাকবে। তবে রোদ যদি একটু কম হতো তবে আরও ভালো করে ঘুরে দেখতে পারতাম।’
নাতাশা বলল, ‘আজ সূর্যদেব যেন আগুন বর্ষণ করছেন। খুব গরম লাগছে এ জায়গাটা নেড়া বলে।’ সকলকে বিদায় জানাতে গিয়েও রত্নসম্ভর বললেন, ‘আপনারা যদি যাওয়ার আগে শরীর ঠান্ডা করতে চান তবে তার ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি। এখানকার সাধারণ মানুষরা, বিশেষত যারা রোদের মধ্যে পরিশ্রম করে তারা ওভাবেই শরীর ঠান্ডা রাখে। সূর্যের তাপ থেকে দেহকে রক্ষা করে।’
কথাটা শুনে রামমূর্তি স্যর জানতে চাইলেন, ‘কীভাবে?’
তার কথার জবাবে রত্নসম্ভর আঙুল তুলে দেখালেন কিছুটা তফাতে একটা আম গাছের ছায়ায় বসে থাকা লোকের দিকে। শোলার তৈরি একটা বাক্স নিয়ে বসে আছে লোকটা। রত্নসম্ভরকে অনুসরণ করে এরপর লোকটার সামনে সবাই গিয়ে দাঁড়াল। রত্নসম্ভর লোকটাকে ইঙ্গিত করতেই সে বাক্সর ডালাটা খুলল। বরফ ভর্তি বাক্সর ভিতর থেকে উঁকি দিচ্ছে ঘোলাটে রঙের পানীয় ভর্তি প্লাস্টিকের বোতল। একটা বোতল বার করে তুলে ধরল লোকটা। আড়াইশো বা তিনশো মিলিলিটারের বোতল হবে সেটা। রামমূর্তি স্যর জানতে চাইলেন, ‘কী পানীয় এটা?”
রত্নসম্ভর বললেন, ‘তালের রস। অবশ্য কিছুটা জারিত। বেশি খেলে অবশ্য নেশা হয়। কিন্তু এইরকম ছোট এক বোতল খেলে সমস্যা হয় না। শরীর মন চাঙ্গা হয়। একবার পরখ করে দেখতে পারেন। এখানে ইউরোপীয় ট্যুরিস্টরাও খুব খায়।’
স্বাগতও এবার চিনতে পারল জিনিসটাকে। সে বলল, ‘আমাদের বাংলাদেশেও এ জিনিস পাওয়া যায়। বাংলাতে একে তাড়ি বলে। আমি একবার এক গ্রামে বেড়াতে গিয়ে খেয়েছিলাম। খেতে মন্দ লাগেনি। তবে মৃদু গন্ধ আছে।’
রত্নসম্ভর আর স্বাগতর কথা শুনে রামমূর্তি স্যর একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আচ্ছা দেখি তো কেমন জিনিস?’
প্রথমে একটা বোতল খোলা হয়। সেটা এক ঢোক করে পান করেই যেন তৃপ্তি অনুভব করল সবাই। রোদে ঘুরতে ঘুরতে সবারই গলা কাঠ হয়ে এসেছিল। জিনিসটা চেখে দেখার পর সেটা যে তেমন ক্ষতিকারক নয় তা বুঝতে পেরে রামমূর্তি স্যর বললেন, “ঠিক আছে, সবার জন্য একটা করে বোতল কিনে নিই। বিক্রম, প্রীতম আর হেরুমের জন্যও নেব।’
তালের রসের বোতলগুলো কেনার পর রত্নসম্ভরের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল সবাই। গাড়ি চলতে শুরু করতেই যে যার বোতলের বরফ দেওয়া তালের রসে চুমুক দিতে শুরু করল। সত্যিই যেন সকলের দেহমন শীতল হয়ে আসতে লাগল তা পান করে। স্বাগত দেখল সুরভী আর নাতাশার মুখমণ্ডলেও যেন তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠেছে। জঙ্গলের ফুরফুরে বাতাসও যেন শরীর জুড়িয়ে দিতে লাগল সকলের। দেখতে দেখতে নিজেদের মন্দিরের সামনে পৌঁছে গেল গাড়িটা।’ স্বাগতরা তোরণের সামনের বাঁধানো চত্বরটাতে উঠে আসতেই প্রীতম আর বিক্রম তোরণের আড়াল থেকে বেরিয়ে স্বাগতদের কাছে এল। রামমূর্তি স্যর তাদের প্রশ্ন করলেন, ‘নারেঙ খাম কি এসেছিল?’
প্রীতম জবাব দিল, ‘না, সে আসেনি। তবে অন্য একজন আপনাকে খুঁজতে এসেছিল।’
রামমূর্তি স্যর ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইলেন, ‘কে লোকটা?’
প্রীতম জবাব দিল, ‘নাম বলল, হোয়াঙ। সে মাঝবয়সি, চাইনিজ।’
রামমূর্তি স্যর সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘সে কী বলল তোমাদের?’
প্রীতম বলল, ‘আপনি অন্যত্র কাজে গেছেন জানাতে সে বলল, তার নাম হোয়াঙ। ‘ফ্রগ রেস’ চালায়। আপনি ফিরে এলে আমরা যেন আপনাকে জানাই সে এসেছিল। এ কথা বলেই সে চলে গেল।’
বিক্রম জিজ্ঞেস করল, “স্যর ‘ফ্রগ রেস’ ব্যাপারটা কী?”
রামমূর্তি স্যর যেন একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘ব্যাঙের দৌড়।’
সিয়েমরিপের কয়েকটা জায়গায় খেলাটা হয়। তোমরা আসার আগে মন্দিরের কাজ যখন শুরু হয়নি তখন সিয়েমরিপে গেলে সময় কাটাবার জন্য আমি কয়েকবার খেলাটা দেখতে গেছি। ওখানেই ওই হোয়াঙ নামে লোকটার সঙ্গে আমার পরিচয়। হয়তো বা ও এখানে কোনও কাজে এসেছিল, তাই আমার সঙ্গেও দেখা করতে এসেছিল। এ কথা বলার পর তিনি জানতে চাইলেন, ‘রান্না হয়ে গেছে?’
বিক্রম জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘খাবারটা আমার ঘরে পাঠিয়ে দিও।’ ওই বলে তিনি নিজের ঘরের দিকে এগলেন। তাড়ির বোতলগুলো বিক্রমের হাতে দিতে সে খুব খুশি হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুপুরের খাওয়া সেরে যে যার ঘরে ঢুকে পড়ল। বাইরে আজ প্রচণ্ড রোদ। বিছানায় শুয়ে স্বাগতর মনে পড়ল বন্ধ ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসা প্রফেসর রামমূর্তি ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভরের কথোপকথন। রত্নসম্ভর বলছিলেন, এ মন্দিরে যে কলসগুলো লুকানো আছে তার সন্ধান জানা আছে এক জনের! কে সেই মানুষ? কী আছে ওই কলসগুলোর মধ্যে? আর এ কথা ভাবতে ভাবতেই স্বাগত মনে এল এক নারীর কথা। যে খামের যুবতী। তাকে পুরনো দিনের গল্প শোনাতে শুরু করেছে সে। রত্নসম্ভরের বলা সেই ‘একজন’?
সেই খামের যুবতীর কথা ভাবতে ভাবতেই স্বাগত ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকাল পাঁচটা বেজে গেছে। হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়েই বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল স্বাগত। এক অমোঘ টান সে অনুভব করছে ওই খামের যুবতীর কথা শোনার জন্য। আজ বায়ুম মন্দিরে প্রফেসর রামমূর্তি আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভরের মধ্যে যে কথোপকথন স্বাগতর কানে এসেছে তা যেন খামের যুবতীর গল্পর প্রতি স্বাগতর আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বাগত তাই আর দেরি করল না। পোশাক পাল্টে সে বাইরে বেরিয়ে পড়ল সেই নির্দিষ্ট স্থানে যাবার জন্য। চত্বরে কেউ নেই। চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে স্বাগত দ্রুত হাঁটতে লাগল চত্বরটা অতিক্রম করার জন্য। চত্বর ছেড়ে সে নামতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় প্রফেসর রামমূর্তির কণ্ঠস্বর তার কানে এল— ‘কোথায় যাচ্ছ?’
স্বাগত পিছনে তাকিয়ে দেখল, ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন রামমূর্তি স্যর। কাজেই আবার সে পিছু ফিরে এগল তাঁর দিকে। রামমূর্তি স্যরের কাছে পৌঁছে স্বাগত জবাব দিল, ‘জঙ্গলের মধ্যে একটু বেড়াতে যাচ্ছি স্যর।’
রামমূর্তি বললেন, ‘তুমি এত দ্রুত হেঁটে যাচ্ছ যে দেখে মনে হল তুমি কোনও জরুরি কাজে যাচ্ছ বা তোমার জন্য কেউ কোথাও প্রতীক্ষা করছে!’
স্বাগতকে বাধ্য হয়ে মিথ্যা কথা বলতে হল। সে বলল, ‘তেমন কোনও ব্যাপার নয় স্যর। আসলে বিকালের এই সময়টা আমার জঙ্গলের ভিতর ঘুরে বেড়াতে বা বসে থাকতে ভালো লাগে। চারপাশের এ সময় বেশ মনোরম হয়ে ওঠে। আমার কোনও কাজ আছে স্যর?’
রামমূর্তি প্রথমে জবাব দিলেন, ‘না, এখন কোনও কাজ নেই। তবে আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনের কিছু রসদ কিনে আনতে হবে সিয়েমরিপ থেকে। আমার মন্দির ছেড়ে বেশি দূরে যাওয়াটা এখন ঠিক উচিত বলে মনে করছি না। ভাবছি কাল বা পরশু তোমাকে সিয়েমরিপে পাঠাব জিনিসগুলো কিনে আনার জন্য। আর আমার ঘরের ব্যাটারিটা আবার চার্জ করিয়ে আনার জন্য। দোকানগুলোতে তোমাদের চেনা হয়ে গেছে। আশা করি অসুবিধা হবে না। আর গাড়ির ব্যবস্থাও আমি করে দেব। বিক্রম বা প্রীতম একজন কাউকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যেও।’
স্বাগত জবাব দিল, “আচ্ছা স্যর। আপনি যেমন বলবেন।’
রামমূর্তি স্যর এরপর বললেন, ‘তোমার বিকালবেলা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাসটা একদিক থেকে ভালো। ওই নারেঙ খাম বা ফঙ যদি তোমার চোখে পড়ে তবে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।’
স্বাগত উত্তর দিল, ‘অবশ্যই স্যর।’
রামমূর্তি স্যর আর স্বাগতকে আটকালেন না। তিনি বললেন, “ঠিক আছে তুমি যাও। আমি ঘরে বসে কাজ করি।’
রামমূর্তি স্যরের মনে যাতে কোনও সন্দেহ না জাগে সে জন্য স্বাগত এরপর ধীর পায়ে চত্বরটা অতিক্রম করে প্রবেশ করল জঙ্গলের ভিতর।
স্বাগত আজ আর মূর্তির কাছে মাটিতে শোয়ানো স্তম্ভর উপর বসল না। সে সোজা গিয়ে উপস্থিত হল গাছের আড়ালে যে জায়গাতে বসে খামের যুবতীর কথা শোনে যে জায়গায়। স্বাগত দেখল যুবতী বসে আছে সেখানে যেন তারই প্রতীক্ষায়। স্বাগত হাসল তাকে দেখে, খামের সুন্দরীর ঠোঁটের কোণে ও যেন মুহূর্তের জন্য একটা আবছা হাসি ফুটে উঠল। তার কিছুটা তফাতে একটা পাথর খণ্ডর ওপর স্বাগত বসল, তারপর কথা শুরুর জন্য যুবতীকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কখন এসেছ?’
স্বাগতর প্রশ্নর জবাব না দিয়ে যুবতী জানতে চাইল, ‘বায়ুম মন্দির কেমন লাগল?’
স্বাগত বলল, ‘ভালো। তবে ওই মন্দিরটা বিষ্ণুলোকের থেকে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেখলাম। বায়ুম মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করলে বিষ্ণুমন্দিরকে এক অর্থে অক্ষতই বলা চলে।’
যুবতী বলল, ‘তা তো হবেই। ও যে বিষ্ণুলোক। তিনি যতদিন চাইবেন, ততদিন দাঁড়িয়ে থাকবে আঙ্করের এই মন্দির।’
স্বাগত এরপর জানতে চাইল, ‘তুমি কীভাবে জানলে আমরা বায়ুম মন্দির গিয়েছিলাম?’
যুবতী তাকাল বিষ্ণুলোকের দিকে। তারপর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, ‘আমি জানি।’
স্বাগতও তাকাল বিষ্ণুলোকের দিকে। সূর্যদেব মেরু পর্বতের আড়ালে যাত্রা শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে সাড়ে পাঁচটা বাজে। স্বাগত তাই এরপর আর অন্য কথায় সময় নষ্ট না করে বলল, ‘ধরণীন্দ্রবর্মন মৃগয়ায় গিয়ে বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে ফিরে এলেন। হরিদেব পুত্র উগ্রদেবের সঙ্গে রাজপার্ষদ শ্রেষ্ঠী বিরুচের কন্যার বিবাহ সম্পন্ন হল। তারপর কী হল বল শুনি?’
খামের যুবতি একটু চুপ করে থাকার পর বলতে শুরু করল তার কথা— ‘মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন ওই মৃগয়ার ঘটনার পর ফিরে এসে আবার তাঁর প্রজা প্রতিপালনের কাজ শুরু করেছিলেন। আর তার সঙ্গে সঙ্গে নতুন রাজধানী নির্মাণের কাজ আর বিষ্ণুলোকের সংস্কার, তার মধ্যে নতুন কিছু কাঠামো নির্মাণের কাজও করে চলেছিলেন তিনি। সারাদিন রাজকার্যে ব্যস্ত থাকতেন তিনি। সন্ধ্যা নামার একটু আগে ঠিক ওইসময় তিনি কোনও কোনও দিন রাজসভা ভঙ্গ হলে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করতেন। বিষ্ণুমন্দিরে সন্ধ্যারতি ও বিগ্রহর সামনে যে নৃত্য পরিবেশিত হয় তা প্রত্যক্ষ করার জন্য। একদিন শেষ বিকালে রাজসভায় সিংহাসনে বসেছিলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। তিনি এদিন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যারতি দেখতে যাবেন। তাই রথচক্র আর রক্ষীরা প্রস্তুত হয়ে আছে সভা ভঙ্গ হলেই তাঁকে সে স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সিংহাসনে বসা মহারাজ গবাক্ষের দিকে তাকিয়ে দেখলেন বাইরে বিষ্ণুলোকের শৃঙ্গগুলোর আড়ালে সূর্যদেব ঢলতে শুরু করেছেন। তা দেখে তিনি সেদিনের মতো সভাভঙ্গের নির্দেশ দিতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় একদল সৈন্য প্রবেশ করল রাজসভায়। তাদের সঙ্গে রজ্জুবদ্ধ এক যুবতী। সৈন্যরা তাকে নিয়ে হাজির হল মহারাজের সামনে। রক্ষী দলপতি মহারাজকে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘এই নারী চামদেশীয় গুপ্তচর। বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করার চেষ্টায় ঘোরাঘুরি করছিল। আমরা ওকে বন্দি করে এনেছি।’
‘চামেদের গুপ্তচর’-এ কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসে মহারাজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন সেই যুবতীর দিকে। ছিন্ন বসন, ধূল মলিন অঙ্গ তার। বয়স অনুমানিক অষ্টাদশ বছরের কিঞ্চিত বেশি হতে পারে। তার মুখমণ্ডলে ধৃত হবার জন্য আতঙ্কভাব স্পষ্ট। মহারাজ কঠিন কণ্ঠে তাকে প্রশ্ন করলেন ‘—তুই চাম রাজ্যের কন্যা? ‘
যুবতী মৃদু কণ্ঠে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
‘তুই চামেদের গুপ্তচর?’ আবারও প্রশ্ন করলেন তিনি।
রমণী জবাব দিল, ‘না, মহারাজ।’
“তবে তুই মন্দিরের কাছে কী করছিলি?” জানতে চাইলেন মহারাজ।
—‘খাদ্য অন্বেষণে ঘুরতে ঘুরতে এই স্থানে উপস্থিত হয়েছিলাম।’ জবাব দিল তরুণী।
ধরণীন্দ্রবর্মন বললেন, ‘চামদেশ থেকে সীমানা অতিক্রম করে নদী-জঙ্গল পেরিয়ে তুই খাদ্যান্বেষণে এখানে এসেছিস একথা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? সত্যি কথা বল, নইলে এখনই আমি তোর মুণ্ডচ্ছেদের নির্দেশ দেব।’
মহারাজের কথা শুনে আতঙ্কে কেঁপে উঠে রমণী বলল, ‘আপনি বিশ্বাস করুন মহারাজ, আমি গুপ্তচর নই। সামান্য একজন নর্তকী। চামরাজ যখন এ দেশ আক্রমণ করেন তখন তাঁর সেনাদলের সঙ্গে আমি এখানে আসি। কিন্তু তারা পালাবার সময় আমাকে ফেলে রেখেই চলে যায়। আমার সে দেশে ফেরার পথ জানা নেই। বছরকাল যাবৎ আমি আপনার রাজ্যেই আছি। কখনও ভগ্ন মন্দিরে আবার কখনও জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকতাম। কেউ আমাকে আশ্রয় দিতে চায়নি। যারা চেয়েছিল তারা আমাকে তাদের সঙ্গে দুষ্কর্মে লিপ্ত হতে বলেছিল। আমি রাজি হইনি। গত তিন দিন ধরে আমি এক মন্দিরে লুকিয়ে ছিলাম। আজ ক্ষুধার জ্বালায় বাধ্য হয়ে বাইরে বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বিষ্ণুলোকের কাছে উপস্থিত হয়েছিলাম। তারপর সৈন্যরা আমাকে বন্দি করল।’
মেয়েটার কথা শোনার পর একজন রাজপার্ষদ বললেন, ‘এই রমণীর কথা শুনে মনে হচ্ছে ও অতীব ধূর্ত। চাম সৈন্যরা ওকে গুপ্তচরবৃত্তির কাজেই এখানে রেখে গেছে বলে অনুমান। ভিনদেশী গুপ্তচরদের যে শাস্তি প্রাপ্য আপনি ওকে সেই শাস্তিই প্রদান করুন।’
রাজপার্যদের এই কথা মাথা নেড়ে সবাই সমর্থন জানালেন। খামের রাজ্যে ভিনদেশি গুপ্তচরদের জন্য নারী পুরুষ নির্বিশেষে একটি মাত্র শাস্তি বরাদ্দ আছে তা হল মৃত্যুদণ্ড। সভাসদরা যখন এই নারীকে গুপ্তচর বলেই সন্দেহ করছেন এখন সেই দণ্ডই প্রাপ্য নারীর। তবু বিচক্ষণ রাজা যুবতীর দণ্ডাদেশ ঘোষণা করার আগে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই যে সত্যি কথা বলছিস তার প্রমাণ কী?’
মহারাজের কথা শুনে সেই রমণী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘আমার কাছে প্রমাণ তো কিছু নেই। শৈশবে আমাকে সমুদ্রতীরের এক দাসের হাট থেকে কিনে চাম দেশে নিয়ে এসে আমাকে নৃত্যের শিক্ষা দেয় এক ব্যক্তি। নর্তকী বিক্রি করাই ছিল তার কাজ। তারপর সে আমাকে বিক্রয় করে দেয় এক চাম সেনাধ্যক্ষর কাছে। যুদ্ধর অবসরে মনোরঞ্জনের জন্য যে আমাকে সঙ্গে করে এ দেশে আনে। আমি যুদ্ধবিগ্রহ বা গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারে কিছুই জানি না মহারাজ। ভগবান বিষ্ণু নিশ্চয়ই জানেন আমি সত্যি কথা বলছি।’ এ কথা বলতে বলতে হাতজোড় করে মাহারাজের সামনে হাঁটুমুড়ে পড়ে রইল সেই রমণী।
যুবতী নিজের বক্তব্যর সপক্ষে কোনও প্রমাণ উপস্থিত করতে পারছে না। গুপ্তচরেরা অনেক সময়ই নিজের প্রাণ রক্ষার স্বার্থে এমন মিথ্যা কথা বলে থাকে। কাজেই মহারাজ তার দণ্ডাদেশ শোনাতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, রাজ পরামর্শদাতা মহামঙ্গল বললেন, ‘এই নারী যদি নর্তকী হয়ে থাকে তবে নিশ্চয়ই নৃত্য পরিবেশনায় দক্ষ হবে। একবার পরীক্ষা করে দেখা যাক ওর কথা সত্যি কি না? বিষ্ণুলোকে নৃত্য পরিবেশনের সময় তো হয়ে এল।’
