বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৩
পর্ব ২৩
হিংসার পূজারি বৌদ্ধ ভিক্ষু মহামঙ্গল। তিনি সেই রমণীকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পাবার একটা সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই কথাটা মহারাজকে বললেন।
ধরণীন্দ্রবর্মন কয়েকজন পার্ষদের মনে হল মেয়েটার মৃত্যুর আগে যদি তার দ্বারা আমোদের সৃষ্টি হয় তবে ব্যাপারটা মন্দ হয় না। এ ভাবনা থেকেই তারা ভিক্ষু মহামঙ্গলের বক্তব্যের সমর্থনে বলল, ‘হ্যাঁ, মহারাজ একবার পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে এই কন্যা সত্যি নর্তকী কি না? তারপর না হয় ওকে পরীক্ষার জন্য বিষ্ণুসেবকদের কাছে দিয়ে দেওয়া যাবে।’
ঠিক এই সময় বিষ্ণুলোকের ঘণ্টাধ্বনি কানে এল সকলের। ওই ঘণ্টাধ্বনি জানায় যে অনতিবিলম্বে সূর্য ডুবলেই সন্ধ্যারতির কাজ শুরু হবে। ওই শব্দ শোনার পর ধরণীন্দ্রবর্মন আর কালক্ষেপ করলেন না। তিনি বললেন, “তবে তাই হোক।’—এ কথা বলে তিনি সেদিনের মতো গাত্রোত্থান করে রওনা হলেন বিষ্ণুলোকের দিকে। আর তাঁকে অনুসরণ করল একদল সভাসদ ও রজ্জুবদ্ধ সেই নারী।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল খামের যুবতী। সে তাকাল বিষ্ণুলোকের দিকে।
বেশ কয়েক মুহূর্ত সে চেয়ে রইল অস্তাচলগামী সূর্যের আভায় লাল হয়ে ওঠা বিষ্ণুলোকের শৃঙ্গগুলোর দিকে। স্বাগত বলল, ‘তারপর? তারপর কী হল?’
খামের যুবতী আবার তার কথা বলতে শুরু করল। রাজা ধরণীন্দ্রবর্মন মন্দিরে প্রবেশ করার পর সন্ধ্যা নামতে শুরু করল, কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গেই হাজারও প্রদীপের আলোতে ঝলমল করে উঠল বিষ্ণুলোকের কক্ষ-প্রাঙ্গণ অলিন্দগুলো। গর্ভ মন্দিরের সামনেই তাঁর জন্য নির্দিষ্ট সিংহাসনে আসন গ্রহণ করলেন মহারাজ। আর তার পিছনে সভাসদদের বসার স্থান। গর্ভ মন্দিরের ঠিক সামনে থেকে তিনটি থাক বা প্রাঙ্গণ নীচের দিকে নেমেছে। গর্ভগৃহ সংলগ্ন প্রাঙ্গণে নৃত্য পরিবেশন করে মন্দিরের প্রধান নর্তকীরা। যারা নৃত্যে সর্বাধিক পারঙ্গম ও অতীব সুন্দরী, প্রধানত তারাই নৃত্য পরিবেশন করে ভগবান বিষ্ণু ও মহারাজকে তৃপ্ত করে। তাদের পরের ধাপে সেই সব রমণীরা নৃত্য পরিবেশন করে যারা ভবিষ্যতে বিষ্ণুলোকের প্রধান নর্তকীদের স্থান লাভ করতে চায়। তাদের মধ্যেও সকলেই নৃত্যে পারদর্শিনী। আর তৃতীয় অর্থাৎ সর্বশেষ ধাপে যারা নৃত্য প্রদর্শন করে তাদেরকে শিক্ষার্থী বলা চলে। মহারাজ ও মন্দিরের পুরোহিতদের অনুমতিক্রমে তারা ওই শেষ ধাপে নৃত্য পরিবেশন করে, বলা ভালো ওপরের দুই ধাপের নর্তকীদের নাচ দেখে নৃত্য অনুশীলন করে। মহারাজ যে স্থানে আসন গ্রহণ করেন সেই স্থান থেকে দেব বিগ্রহ যেমন দর্শন করা যায় তেমনই দেখা যায় ওই তিনটি ধাপের নর্তকীদের নৃত্য পরিবেশনা। মহারাজ ও পুরোহিত মণ্ডলীর ইচ্ছাক্রমে ভালো নৃত্য পরিবেশন করলে নীচের দুই প্রাঙ্গণের নর্তকীরা ক্রমান্বয়ে ওপরের ধাপে উন্নীত হয়।
সন্ধ্যারতি শুরু হল এক সময়। ঘণ্টাধ্বনি, পুরোহিতদের হাতে ঘূর্ণায়মান প্রদীপ দত্তর আলোকে, উদ্ভাসিত হয়ে উঠল গর্ভগৃহ সংলগ্ন প্রাঙ্গণ। বেশকিছু সময় ধরে রত্নখচিত দেববিগ্রহর সামনে। এক সময় সন্ধ্যারতি শেষ হল। মন্দিরের প্রধান পুরোহিত প্রদীপ শিখা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন মহারাজের সামনে। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সেই পবিত্র অগ্নি আশিসে হাত ছুইয়ে মাথায় গ্রহণ করে দেবতার উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে আবার নিজের স্থান গ্রহণ করলেন। বাদ্যযন্ত্র মৃদু লয়ে বাজতে শুরু করল এরপর। গর্ভগৃহের সামনের দুটি ধাপের প্রাঙ্গণ সংলগ্ন কক্ষ থেকে সুবেশী সুন্দরী নর্তকীরা বাইরে বেরিয়ে এসে সার বেঁধে দাঁড়াল। মহারাজ ও বিগ্রহর উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে এরপর সময়ের নৃত্য পরিবেশন করতে লাগল নর্তকীরা। বাদ্যযন্ত্র দ্রুত লয়ে বাজতে শুরু হওয়ার সঙ্গে ন সঙ্গেই নর্তকীদের পদ সঞ্চারণও দ্রুত হতে শুরু করল। কী অপূর্ব তাদের নৃত্যশৈলী, শরীরের ভঙ্গিমা! রূপের মাধুর্য। স্বর্গের অপ্সরাদেরও যেন তারা হার মানায়! মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন ও তাঁর সভাসদরা মোহিত হয়ে দেখতে লাগলেন সেই নৃত্য। সময় এগিয়ে চলল। এক সময় এক ভৃত্যা মহারাজের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য শীতল পানীয় পাত্র নিয়ে তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল। মহারাজ সেই স্বর্ণপাত্র হাতে তুলে নিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে তাতে চুমুক দিতেই হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল নীচের দিকের সর্বশেষ প্রাঙ্গণে। সেখানে নেচে চলেছে একজন। না তাকে ঠিক শিক্ষার্থী বলে মনে হচ্ছে না। ভালো করে তার দিকে তাকাতেই তাকে চিনতে পারলেন মহারাজ। সেই বন্দি রমণী! প্রধান নর্তকীদের নৃত্য দেখতে দেখতে তার কথা ভুলেই গেছিলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। তার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আর এরপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গুপ্তচর সন্দেহে ধৃত সেই কন্যার নৃত্যজালে যেন বাঁধা পড়ে গেলেন ধরণীন্দ্রবর্মন। কী অসম্ভব সুন্দরভাবে নেচে চলেছে ওই কন্যা। বিষ্ণুলোকের প্রধান নর্তকীদের সমকক্ষ অথবা তার চাইতেও বেশি সুন্দর নৃত্য পরিবেশন করে চলেছে সেই রমণী! মহারাজ আর চোখ ফেরাতে পারলেন না তার থেকে। মহারাজের দৃষ্টি অনুসরণ করে একে একে অন্য পার্ষদরাও দৃষ্টি নিবন্ধ করল সেই যুবতীর দিকে। আর মহারাজের মতো সবারই চোখ আটকে গেল তার ওপর। সে সব বাদ্যযন্ত্র বাজছে তা খামের বাদ্যযন্ত্র। চামেদের বাদ্যযন্ত্রর সঙ্গে খামের বাদ্যযন্ত্রর তাল-লয়ের প্রভূত পার্থক্য। তবু সেই অপরিচিত বাদ্যযন্ত্রর সঙ্গে কী আশ্চর্যভাবে তাল মিলিয়ে নেচে চলেছে সেই যুবতী। সে যে সত্যিই একজন নর্তকী এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রইল না। অন্যসব নর্তকীদের কথা যেন ভুলেই গেল সবাই। তারপর সময়ের নিয়মেই বাদ্যযন্ত্র থেমে গেল। স্তব্ধ হল সুন্দরীদের নিক্কন। তবু রাজা চেয়ে রইলেন সেই অপরিচিত নর্তকীর দিকে। সেই যুবতীও যেন বুঝতে পারল মহারাজও ওপর থেকে তার দিকেই তাকিয়ে আছেন। করজোড়ে ওপর দিকে তাকিয়ে মহারাজের উদ্দেশে প্রণাম জানাল সে। রমণী এরপর আর তার তিন দিনের অভুক্ত শরীরকে ধরে রাখতে পারল না। মূর্ছিতা হয়ে পড়ল সে। সংবিৎ ফিরে পেয়ে মহারাজা এবার তাঁর পার্শ্বচরদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বন্দিনী যে নৃত্যে পারঙ্গম তাতে সন্দেহ নেই।’ বন্দিনীকে উপভোগ হয়ে গেছে, এবার যদি তাকে পরিখার কুমিরদের মুখে ছুড়ে ফেলা হয় তবে সেটাও একটা বেশ উপভোগ্য দৃশ্য হবে। নৃশংসতাও অনেক মানুষের মনকে তৃপ্ত করে। সম্ভবত সেই আশাতেই মহারাজের একজন পার্ষদ বলল, ‘যুবতী নৃত্য পটিয়সী ঠিকই। কিন্তু মহারাজকে একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে প্রাচীনকাল থেকেই নানা দেশে বারবনিতা ও নটীদের গুপ্তচর বৃত্তির কাজে, এমনকী গুপ্তহত্যার কাজেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।’
মহারাজের পার্শ্বচর কথাটা মিথ্যা বলেননি, কিন্তু মহারাজ এখনও ওই ভিনদেশি যুবতীর নৃত্যকৌশলে আবিষ্ট হয়ে আছেন। তাই সেই মুহূর্তে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আপাতত ওই নারীকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হোক। আগামীকাল ওই রমণীকে রাজসভায় নিয়ে এস।’ এই বলে স্বাগতর সামনে বসে থাকা যুবতী হঠাৎই তার কথা থামিয়ে দিল। হঠাৎই কেমন যেন একটা সন্দিগ্ধ ভাব ফুটে উঠল তার মুখমণ্ডলে। স্বাগত বলল, ‘কী হল? থামলে কেন? বন্দিনীর তারপর কী হল?’
সে বলল, ‘মনে হচ্ছে এদিকে কেউ যেন আসছে!’ গাছপালার ফাঁক দিয়ে যতদূর সম্ভব উঁকিঝুঁকি দিয়ে কাউকে না দেখতে পেয়ে স্বাগত বলল, “কই কাউকে দেখছি না তো!’
স্বাগতর কথা শুনে খামের যুবতী যেন মৃদু আশস্ত হয়ে আবার বলতে শুরু করল— মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন বিষ্ণুমন্দির থেকে প্রাসাদে ফিরে এলেন। আর অচৈতন্য যুবতীকে নিয়ে যাওয়া হল কারাগারে। অনেকেই ধারণা করল তাঁর পারিষদদের পরামর্শমতো পরদিন ওই রমণীকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন হয়তো সেই নির্দেশই দিতেন, কিন্তু সেদিন শেষরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন খামের সম্রাট। তাঁর স্বপ্নে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং শঙ্খ-চক্রগদা-পদ্মাধারী শ্রীবিষ্ণু! তিনি মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনকে বললেন, ‘ওই কন্যার নৃত্য দেখে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। ও নির্দোষ, ওকে তুই মুক্তি দে।’ এ কথা বলেই ভগবান বিষ্ণু অন্তর্হিত হলেন মহারাজের স্বপ্ন থেকে। ঘুম ভেঙে গেল মহারাজের। পালঙ্কে উঠে বসে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন আকাশে শুকতারা ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোরের প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ল বিষ্ণুমন্দিরের ওই শৃঙ্গগুলোর মাথায়। মহারাজ প্রাসাদে ডেকে পাঠালেন তাঁর অন্যতম পরামর্শদাতা ব্রাহ্মণ দিবাকরকে। মহারাজের স্বপ্নর কথা শুনে দিবাকর বললেন, ‘ভগবান বিষ্ণু যখন স্বয়ং আপনার স্বপ্নে এসে তাঁর কথা ব্যক্ত করেছেন এখন যে কথা অমান্য করা উচিত হবে না। আপনি ওকে মুক্তি দিন।’
প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাজসভা বসল। রমণীকে হাজির করা হল মহারাজের সামনে। জল দিয়ে কারাগারে তার জ্ঞান ফেরানো হয়েছে, খাদ্যদ্রব্যও দেওয়া হয়েছে, যাতে যখন তাকে পরিখাতে ছুড়ে ফেলা হবে, কুমিররা যখন তাকে গিলে খাবার জন্য চারপাশ থেকে ছুটে আসবে তখন যুবতীর ভয়ার্ত আর্তনাদ, আর্ত চিৎকার শুনে নির্মম আনন্দ উপভোগ করতে পারে মানুষেরা। মাথা ঝুঁকিয়ে মহারাজের সামনে এসে দাঁড়াল সেই যুবতী। মৃত্যু ভয়ে কম্পমান সে।
মহারাজ কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন তার দিকে। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তোর নাম কী?”
‘চম্পা’ নতশিরে কম্পমান কণ্ঠে জবাব দিল তরুণী। এবার নিশ্চয়ই মহারাজ চরবৃত্তির শাস্তি ঘোষণা করবেন। মহারাজের দণ্ড শোনার জন্য মনে মনে উৎফুল্ল হয়ে উঠল অনেকে। কিন্তু তাদের হতাশ করে খামের সম্রাট ধরণীন্দ্রবর্মন তাকে বললেন, ‘তোকে আমি মুক্তি দিলাম। তুই মন্দিরে ভগবান বিষ্ণুকে নৃত্য প্রদর্শন করবি।’
মহারাজের কথা শেষ হতেই বিষ্ণুভক্ত নিবারণ বললেন, ‘হ্যাঁ, এই রমণী মন্দিরে নৃত্যকর্মেই নিয়োজিত থাকুক।’ ব্রাহ্মণ নিবারণের বক্তব্য সমর্থন করে বৌদ্ধ ভিক্ষু মহামঙ্গলও বললেন, ‘মহারাজ সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছেন। করুণাময় বুদ্ধর কৃপা বর্ষিত হোক এই কন্যার প্রতি।’
মহারাজ স্বয়ং ও দুই ধর্মশ্রেষ্ঠ একই বক্তব্য প্রদান করায় অন্য কেউ আর ওই নারীর মৃত্যুদণ্ডর সপক্ষে মতামত ব্যক্ত করার সাহস দেখাল না। রজ্জুবন্ধন থেকে মুক্ত করা হল তরুণীকে। মহারাজের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় হাঁটু মুড়ে বসে তাঁকে প্রণাম জানাল চম্পা নামের সেই কন্যা। রাজ নির্দেশে বিষ্ণু মন্দিরেই আশ্রয় গ্রহণ করল সে।’—এই শেষ বাক্যটা অতি দ্রুত বলে উঠে দাঁড়াল খামের তরুণী।
স্বাগত জানতে চাইল ‘তারপর?’
তরুণী বলল, ‘আজ আর কোনও কথা নয়। এখনই কেউ এসে পড়বে এখানে। তুমি ফিরে যাও। আমিও এই স্থান ত্যাগ করছি।’ —এ কথা বলে সে দু-পা এগিয়ে মুহূর্তর জন্য একবার থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘রাতে তুমি একলা মন্দিরে প্রবেশ কোর না বা জঙ্গলে সন্ধ্যার পর ঘুরে বেড়িও না। বিপদ হতে পারে।’ এ কথা বলার পর স্বাগতকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সেই খামের যুবতী যেন নিমেষের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের ভিতর।
স্বাগত তাকাল বিষ্ণুলোকের দিকে। গল্প শুনতে শুনতে স্বাগত খেয়াল করেনি কখন যেন দিনমণি মুখ লুকিয়ে ফেলেছেন বিষ্ণুলোকের আড়ালে। এখনই সন্ধ্যা নামতে শুরু করবে। স্বাগত তাই সে জায়গা ত্যাগ করে ফেরার জন্য রওনা হল। অন্ধকারও যেন দ্রুত নামতে শুরু করল সেই সঙ্গে। আজও স্বাগতদের মন্দিরটার ব্যাপারে তেমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল না খামের যুবতীর কাহিনিতে। কিন্তু সে স্বাগতকে রাত্রিবেলায় বাইরে বেরতে বারণ করল কেন? কোন বিপদের সম্ভাবনার কথা যে বলতে চাইছে? ভূত-প্রেত-অপদেবতার বিপদ নাকি অন্য কিছুর? এ কথা ভাবতে ভাবতে স্বাগত পৌঁছে গেল যে পথ ধরে সে মন্দির চত্বরে ফিরবে তার মুখটায়। সে পথে প্রবেশ করার আগে স্বাগত একবার পিছন ফিরে তাকাল। আর তখনই সে দেখতে পেল একজনকে। যেখানে পাথরের নারী মূর্তির ফলকটা রয়েছে তার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে সে। কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকার হঠাৎই এত ঘন হয়ে উঠেছে যে তাকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। স্বাগত তবুও তাকে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু স্বাগতর চারপাশেও সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠেছে। তার মনে পড়ল খামের যুবতীর সতর্কবাণীর কথা। তাই সে আর দাঁড়াল না, পা বাড়াল ফেরার জন্য।
স্বাগত ফিরে এসে দেখল তোরণ চত্বরে অন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্বাগত তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই প্রীতম জানতে চাইল, ‘রামমূর্তি স্যর আর তুমি কোথায় গেছিলে? তিনি কোথায়?’
স্বাগত মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘আমরা একসঙ্গে কোথাও যাইনি তো! তিনি কোথায় আমি জানি না।’
প্রীতম বলল, ‘আমি যে জানলার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, তুমি আর স্যর এখানে দাঁড়িয়ে কথা বললে। তারপর তুমি চলে গেলে। আর স্যরও তোমার পর একবার ঘরে ঢুকে আবার তোমার পিছন পিছন এগলেন।’
কথাটা শুনে বেশ আশ্চর্য হল স্বাগত। রামমূর্তি স্যর কি তবে তাকে অনুসরণ করেছেন? তিনি কি দেখেছেন খামের যুবতীর সঙ্গে তার বাক্যালাপ? যে ছায়ামূর্তি সে দেখল সে কি তবে রামমূর্তি স্যরের? প্রীতমের কথা শুনে এ প্রশ্নগুলোই জেগে উঠল তার মনে। তবে সে প্রীতমের কথার জবাবে বলল, ‘তুমি ঠিকই দেখেছ। তবে তিনি আমার সঙ্গে যাননি। তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমি জঙ্গলে নিজের মতো হাঁটতে গেছিলাম।’
এ কথা বলে স্বাগত জানাল, ‘তিনি কাল বা পরশু আমাকে সিয়েমরিপে রসদ কেনার জন্য পাঠাবেন সঙ্গে তোমার আর বিক্রমের মধ্যে কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলেছেন।’
স্বাগতর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রম বলল, তোমার সঙ্গে যাব। একই জায়গায় থাকতে আর ভালো লাগছে না।’
নাতাশা বলল, ‘তোমরা যাই বল, আমার কিন্তু এ জায়গাটা ভালো লাগছে না। ওই মজুরটাকে কে ধাক্কা মারল, প্রীতম এখানে কুমির দেখল কীভাবে? আর আমিও বা কি ভুল দেখলাম?’ নাতাশা ভিতু প্রকৃতির মেয়ে হলেও তার প্রশ্নগুলো নিছক অযৌক্তিক নয়। স্বাগত তার কথার উত্তরে বলল, ‘আমরা যখন এখানে কাজ করতে এসেছি তখন কাজ করতে হবে। দেখা যাক কী হয়?’ এ ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করলে নাতাশার মনে আরও আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। স্বাগত তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বায়ুম মন্দিরে দেখা স্টেগোসেরসের অদ্ভুত মূর্তিটা নিয়ে আলোচনা শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বনের দিক থেকে এসে চত্বরে উঠে এলেন প্রফেসর। তাদের কাছে এসে প্রথমে যেন কৈফিয়ত দেবার স্বরেই স্বাগতকে বললেন, ‘তোমাকে হাঁটতে যেতে দেখে আমারও তারপর হেঁটে আসার ইচ্ছা হল। বিষ্ণুলোকের রাস্তায় কিছুটা হেঁটে এলাম।’
এ কথা বলার পর তিনি স্বাগতকে বললেন, ‘তুমি কালই। সিয়েমরিপ যেও। সকাল নটায় গাড়ি আসতে বলে দিয়েছি। ফর্দ করে দেব, আর টাকাও দিয়ে দেব।’
স্বাগত জানাল, ‘বিক্রম আমার সঙ্গে যাবে।’
রামমূর্তি বললেন, ‘আচ্ছা। আমি বাকিদের নিয়ে মন্দিরের ভিতর কাজ করব।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
রাতটা নির্বিঘ্নেই কেটে গেল। পরদিন সকালে নির্দিষ্ট সময় একটা টুকটুক গাড়ি এসে হাজির হল। ব্যাটারি, বাজারের বস্তা তোলা হল তাতে। স্বাগতর হাতে রামমূর্তি স্যর ফর্দ-টাকা ধরিয়ে দিলেন। স্বাগত আর বিক্রমকে নিয়ে গাড়ি এগল সিয়েমরিপের দিকে। আর তাদের বিদায় জানিয়ে রামমূর্তি স্যর অন্যদের নিয়ে মন্দিরের ভিতর ঢুকে পড়লেন অনুসন্ধানের জন্য।
স্বাগতদের গাড়ি বনপথ ধরে এগল। সুন্দর সকাল। গাছে পাখির ডাক, রাস্তার পাশে ঝোপের উপর প্রজাপতি উড়ছে। কোথাও পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন কোনও স্তম্ভ প্রাকার। তাদের গায়ে খোদিত মূর্তিগুলো যেন ভোরের আলোর স্পর্শ পেয়ে বলছে— ‘দেখ আমাদের। কী সুন্দর আমরা। তোমরা আমাদের দেখবে বলেই তো আমরা যুগ যুগ ধরে এখানে রয়েছি।’
একটা স্তম্ভর গায়ে নৃত্যরত এক নারীমূর্তি দেখে বিক্রম বলল, ‘কী সুন্দর সব মূর্তি-অলঙ্করণ তাই না?”
