বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৫
পর্ব ২৫
দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নারেও প্রথমে জানতে চাইল, ‘ওদিকে কোথায় গিয়েছিলেন?’
স্বাগত বলল, ‘কিছু রসদ কেনার জন্য বাজারে এসেছি। কাজ মিটতে কিছুটা দেরি আছে তাই এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
নারেঙ বলল, ‘আমিও আজই এদিকটাতে এলাম। ভালো হল আপনাদের সঙ্গে দেখা হয়ে। একটা কথা আপনাদের জানানোর আছে।’
—’কী কথা?’ প্রশ্ন করল স্বাগত।
নারেঙ হয়তো সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বুল বলল, ‘বাইরে বেশ গরম। আপনারা ভিতরে ঢুকে ফ্যানের হাওয়ায় কথা বলুন।’
নারেঙ বুলের কথা শুনে বলল, ‘হ্যাঁ, ভিতরে দু-মিনিট বসেই কথাটা বলি।’
অগত্যা দোকানের ভিতরে প্রবেশ করল স্বাগত আর বিক্রম। ভিতরে ঢুকে চারপাশে তাকিয়ে কী কারণে যেন আগের দিনের তুলনায় দোকানটা একটু ফাঁকা মনে হল। বুল তিনটে টুল এনে দিল। নারেঙের মুখোমুখি স্বাগত আর বিক্রম বসল তার কথা শোনার জন্য।
মৃদু চুপ করে থাকার পর নারেঙ বলল, ‘জানাবার কথাটা হল ফঙকে আমি আমার কাছ থেকে গতকাল সকালে তাড়িয়ে দিয়েছি। তার সঙ্গে আমার আর কোনও সম্পর্ক নেই।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘কেন?’
নারেঙ ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘ওর সঙ্গে মিশে দেখলাম লোকটা লোভী, মিথ্যেবাদী আর ঝগডুটে প্রকৃতির। রোজ নানা অছিলায় আমার থেকে টাকা নিত। আজেবাজে জিনিস দেখিয়ে আমাকে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে গল্প শোনাত আঙ্কর সম্পর্কে। সবথেকে বড় কথা অন্য লোকের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করত আমার সঙ্গে গিয়ে। আমি জানি প্রফেসর রামমূর্তি আমাকে পছন্দ করেন না, আর তার কারণ হয়তো ওই ফঙই। নিজেরাই তো দেখলেন অমন পণ্ডিত মানুষটার সঙ্গে ও কেমন মুখে মুখে বাজে তর্ক করছিল! অমন ব্যবহারও অনেকের সঙ্গেই করে থাকে। দু-দিন আগে বিষ্ণু মন্দিরের এক গার্ডের সঙ্গে ওর হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আমি কেন ওর জন্য এসব ফালতু ঝামেলা পোহাতে যাব…!’
গাইড ফঙ-এর সম্পর্কে একঝাঁক অভিযোগ জানিয়ে কথা শেষ করল নারেঙ।
স্বাগত বলল, ‘আপনি ওর বিষয়ে যা ভালো বুঝেছেন তা করেছেন।’
নারেঙ বলল, ‘হ্যাঁ। তাই তাড়িয়ে দিয়েছি। প্রফেসরকে ব্যাপারটা জানিয়ে দেবেন, আর বলবেন যে ওকে যেন মন্দিরের কাছে ঘেঁষতে না দেয়। ভারী বজ্জাত লোক ও। বুলকেও ব্যাপারটা জানাবার জন্য আমি এখানে এসেছিলাম
বুল বলল, ‘আমি দুঃখিত। ওর সঙ্গে পরিচয় থাকলেও আমি জানতাম না ওর এমন স্বভাব চরিত্র। জানলে কখনও ওর সঙ্গে আপনার যোগাযোগ করিয়ে দিতাম না।’
বুলের কথার জবাবে নারেঙ বলল, ‘দুঃখিত হওয়ার দরকার নেই। লোকটাকে তাড়িয়ে বেঁচেছি সেটাই ভালো। মন্দির নগরীটা এখন আমার মোটামুটি চেনা হয়ে গেছে, এখন আমি একলাই ঘুরব আর ছবি তুলব।’
একথা বলে সে স্বাগতদের উদ্দেশে বলল, ‘প্রফেসরকে বলবেন আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি। আমার জন্য তাঁর কাজের ব্যাঘাত ঘটবে না। আমাকে যেন তিনি ভুল না বোঝেন। ওনার সঙ্গে আমি একবার দেখা করতে যাব।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, বলে দেব।’
নারেঙ খাম এরপর পাছে তাদের মন্দিরের ব্যাপারে প্রশ্ন করে সেজন্য স্বাগত তাকে বলল, ‘এবার আমরা চলি। একটা কাজের কথা মনে পড়ল। যেটা করতে হবে।’
নারেঙ বা বুল কেউই আর স্বাগতদের চেয়ার থেকে উঠতে বাধা দিল না। নারেঙ বলল, ‘ঠিক আছে যান। আবার দেখা হবে।’
বুল বলল, ‘আবার আসবেন। আপনাদের সঙ্গে তো ভালোরকম পরিচয় হয়েই গেছে। এবার কিছু কিনলে আরও সস্তা দামে দেব।’
বুলের দোকান ছেড়ে এরপর বাইরে বেরিয়ে এল স্বাগতরা। হাঁটতে হাঁটতে বিক্রম বলল, ‘গাইড ফঙকে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা নারেঙ হঠাৎ আমাদের ডেকে বলতে গেল কেন?’
স্বাগত বলল, ‘সম্ভবত ভবিষ্যতে ফঙের কোনও কাজের দায় যাতে নারেঙের ওপর না চাপে, সেজন্যই সম্ভবত কথাটাও আমাদের জানাল, আর প্রফেসরকেও জানিয়ে দিতে বলল। গাইড ফঙের গতিবিধি কিন্তু বেশ সন্দেহজনক। প্রফেসর বলছিলেন তিনি তাকে জঙ্গলের আড়াল থেকে মন্দিরের ওপর নজর রাখতে দেখেছেন। আর আমিও তাকে জঙ্গলে একলা ঘুরে বেড়াতে দেখেছি।’
বিক্রম বলল, ‘আমাদের ওই প্রাচীন মন্দিরে হয়তো গুপ্তধন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। সেই আশাতেই হয়তো সে মন্দিরের ওপর নজর রাখার চেষ্টা করছে লোকটা।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, আমারও লোকটার ব্যাপারে এমনই ধারণা।’
নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে স্বাগতরা প্রথমে পৌঁছে গেল যেখানে দোকানগুলোয় তাদের রসদ রাখা আছে সে জায়গায়। সময়ের হিসাব মিলিয়ে একসময় স্বাগতরা ফোন করে তাদের টুকটুকটা ডেকে নিল। রসদের ব্যাগ-বস্তাগুলো গাড়িতে তোলার পর ব্যাটারির দোকানে গিয়ে ব্যাটারি নিয়ে রওনা দিল মন্দির নগরীর দিকে।
মন্দির নগরীতে যাওয়ার চেনা রাস্তা ধরেই ফিরতে লাগল তারা। যে সব পর্যটক মন্দির নগরী দেখতে গিয়েছিল ইতিমধ্যে তারাও ফিরে আসতে শুরু করেছে। কম্বোডিয়ার আবহাওয়া ভারতের সমতল অঞ্চলের মতোই। এই মে-জুন মাসে বেশ খানিকটা গরম এখানে। কিন্তু আজ যেন বেশি গরম অনুভূত হতে লাগল স্বাগতদের। তাদের গাড়ি একসময় তোরণ অতিক্রম করে আঙ্করে প্রবেশ করল। জঙ্গলের পথ ধরে মন্দিরের দিকে এগতে থাকল গাড়ি। ছায়াময় জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করলে রোদের তাপ থেকে বাঁচা যায় বলে কিছুটা শীতলতা অনুভব হয় সবসময়। মৃদুমন্দ বাতাসও বয়। কিন্তু আজ যেন একটা গুমোট ভাব চারপাশে। গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। বিক্রম বলল, ‘আজকের আবহাওয়াটা কেমন যেন অস্বস্তিকর।’
স্বাগত সহমত পোষণ করল তার কথায়। তাদের গাড়ির চালক স্থানীয় মানুষ হলেও সেও স্বাগতদেরই মতো বেশ অস্বস্তিবোধ করছে। গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝে মাঝে সে একটা কাপড় দিয়ে ঘাম মুছছে। লোকটা একসময় বলল, ‘আজ রাতে এখানে বৃষ্টি নামবে মনে হয়। বৃষ্টি নামার আগে এখানে এমন গরম হয়।’
এ কথা বলার পর গাছপালার ফাঁক দিয়ে আকাশের যে অংশটা দেখা যাচ্ছে সেদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখুন আকাশে মেঘ জমছে৷’
স্বাগতরা আকাশের দিকে তাকিয়ে একখণ্ড ধূসর মেঘ দেখতে পেল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল নিজেদের জায়গায়। গাড়ির শব্দ শুনে প্রফেসর বাইরে বেরিয়ে এলেন। গাড়ি থেকে ধরাধরি করে বস্তাগুলো আর কাটারিটা নামানো হল। রামমূর্তি স্যর কাছে এসে বললেন, “তোমাদের কোনও অসুবিধা হয়নি তো?”
বিক্রম বলল, ‘না, স্যর অসুবিধা হয়নি। অন্যরা কোথায়?’
রামমূর্তি বললেন, ‘ওরা বেশ কিছুক্ষণ আগে খাওয়া সেরে ঘরে শুতে গেছে। আজ যা গরম তাতে মন্দিরের ভিতর বেশিক্ষণ থাকা গেল না।’
বিক্রম তার হুইস্কির বোতল দুটো প্রফেসরের নজর এড়াবার জন্য ফেরার পথে একটা ব্যাগের মধ্যে পুরে ফেলেছিল। বিক্রম সেটা স্বাগতর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গাড়ির ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে ভারী ব্যাটারিটা ধরাধরি করে রামমূর্তি স্যরের ঘরের দিকে এগল রেখে আসার জন্য। তারা সেদিকে যাওয়ার পর স্বাগত রামমূর্তি স্যরকে জিজ্ঞেস করল, ‘মন্দিরের ভিতর নতুন কিছু চোখে পড়ল স্যর?’
রামমূর্তি সংক্ষিপ্ত জবাব দিলেন, ‘না।’
স্বাগত এরপর বলল, ‘আজ ঘুরতে ঘুরতে যেখানে ব্যাঙের রেস হয় সেখানে গিয়েছিলাম। হোয়াঙ নামের যে লোকটা কাল আপনাকে খুঁজতে গিয়েছিল তার সঙ্গে আমাদের দেখা হল। বিক্রমকে চিনতে পেরে সে বলল আপনার সঙ্গে তার জরুরি দরকার। আপনি যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
স্বাগতর কথা শেষ হতে না হতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কিছু বলেছে?’
স্বাগত বলল, ‘না, শুধু এটুকুই।’
এরপর স্বাগত স্যরকে নারেঙ খামের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ও তার থেকে শোনা কথাগুলো জানাল। তা শুনে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘ওই ফঙ নামের গাইডটা যে একজন ধাপ্পাবাজ লোক তা আমি গোড়া থেকেই বুঝতে পেরেছি। ওর মতলব ভালো নয়।’
গাড়ির ড্রাইভার ব্যাটারি রেখে ফিরে এসে রামমূর্তি স্যরের থেকে ভাড়া বুঝে নিয়ে চলে যাওয়ার পর বাকি জিনিসগুলো স্বাগত আর বিক্রম মিলে স্টোর রুমে রাখল। রামমূর্তি স্যর নিজের ঘরে চলে গেলেন। খাওয়া সেরে বিক্রম আর স্বাগত যখন ঢুকল তখন বিকাল চারটে বাজে। খামের যুবতী সেদিন থেকে তার কাহিনি বলতে শুরু করেছেন তারপর থেকেই বিকাল হলেই স্বাগতর মনটা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। বাইরের মতোই ঘরের ভিতর একটা গুমোট ভাব। ঘুম হবে না স্বাগতর। বিছানায় শুয়ে স্বাগত ভাবতে লাগল পাঁচটা বাজলেই বেরিয়ে পড়বে খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।
ঠিক পাঁচটাতেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল স্বাগত। শূন্য চত্বর কেউ কোথাও নেই। তবে গুমোট ভাবটা একইরকম প্রকট। স্বাগত আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে ধূসর বর্ণের যে মেঘ তারা দেখেছিল তার আকৃতি যেন অনেকটাই বেড়েছে। আর সেই মেঘ যেন স্থান পরিবর্তন করে ভাসতে ভাসতে এগচ্ছে বিষ্ণুলোকের দিকে। ধীর পায়ে হেঁটে চত্বর থেকে নেমে স্বাগত রওনা হল গন্তব্যর দিকে। জঙ্গলের পাতাগুলো আগের মতোই স্থির। কোনও বাতাস নেই। পাখির ডাকও নেই। কেমন যেন একটা থমথমে পরিবেশ চারপাশে। মন্দিরের দিকের পায়ে চলা পথ থেকে বেরিয়ে স্বাগত এগল কিছু দূরে যে স্থানে সে যায় সেদিকে। কয়েক পা এগিয়েই মাটিতে পড়ে থাকা একটা জিনিস দৃষ্টি আকর্ষণ করল স্বাগতর। সেটা কুড়িয়ে নিল সে। জিনিসটা একটা ভাঁজ করা মাপার ফিতে বা টেপ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সেটা নতুন কেনা। এ জিনিস এখানে এল কীভাবে? স্বাগত অনুমান করল সেটা কারও পকেট থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে। স্বাগতর একবার মনে হল জিনিসটা সে আবার মাটিতে ফেলে দেয়। কিন্তু এরপর তার মনে হল ফিতেটা যখন কুড়িয়ে পাওয়া গেছে তখন জিনিসটা কাছে রেখে দেওয়া যেতে পারে। তাদের মাপজোপের কাজে লেগে যেতে পারে মাপার ফিতেটা। সেটা সে পকেটে পুরে আবার হাঁটতে শুরু করল। ঝোপজঙ্গলের ভিতরে সেই একাকী দাঁড়িয়ে থাকা নারী মূর্তিকে পাশ কাটিয়ে প্রবেশ করল গাছে ঘেরা জায়গাটার ভিতর। তবে স্বাগত দেখল সেই খামের যুবতী সেখানে উপস্থিত হয়নি। স্বাগত আজ একটু আগেই এসে উপস্থিত হয়েছে এ জায়গায়। একটা পাথরের উপর বসে সে অপেক্ষা করতে লাগল সেই যুবতীর জন্য।
বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল এভাবে। একসময় গাছের মাথার ফাঁক গলে মাথার উপর যে আকাশ দেখা যাচ্ছিল সেদিকে তাকাল স্বাগত। মেঘরাশি আরও পুঞ্জীভূত হয়েছে। আর তার গতিপথ বিষ্ণুলোকের দিকেই। অন্যদিনের মতোই বিদায়ী সূর্য বিষ্ণুলোকের শীর্ষদেশকে স্পর্শ করেছে তার আড়ালে অন্তর্হিত হওয়ার জন্য। কিন্তু তার আভা অন্যদিনের মতো রক্তবর্ণের নয়। কেমন যেন ফ্যাকাশে।
‘দুর্যোগ নেমে আসতে চলেছে।’— খামের রমণীর কণ্ঠস্বর শুনে স্বাগত দেখল কিছুটা তফাতে সে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাগত তাকে বলল, ‘ঝড় বৃষ্টি হবে বুঝি?’
খামের যুবতীর ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠল। একটা পাথরের উপর বসল সে।
স্বাগত তার উদ্দেশে বলল, ‘বেশ খানিকটা সময় ধরে তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করছি।’
যুবতী বলল, ‘আমি জানি। কিন্তু আরও কেউ একজন কাছাকাছি ছিল। সে দূরে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি আসতে পারিনি।’
খামের যুবতী সেদিন থেকে তার কাহিনি বলতে শুরু করেছেন তারপর থেকেই বিকাল হলেই স্বাগতর মনটা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। বাইরের মতোই ঘরের ভিতর একটা গুমোট ভাবে। ঘুম হবে না স্বাগতর।
স্বাগত জিজ্ঞেস করল, ‘কে সে? আমি তো কাউকে দেখতে পাইনি। তবে একটু আগে কাছেই এক জায়গায় আমি একটা মাপার ফিতে কুড়িয়ে পেয়েছি।’
খামের সুন্দরী স্বাগতর কথার কোনও জবাব না দিয়ে বিষ্ণুলোকের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে যেন বলল, ‘দুর্যোগ আসছে।’
এ কথা বলার পর সে বলল, ‘গল্পটা আমার এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার সেটাই তোমাকে বলি—’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, শুরু কর।’
খামের যুবতী বলতে শুরু করল তার কাহিনি— ‘চম্পা নামের সেই চামদেশীয় রমণীর রাজ অনুগ্রহে বা বিষ্ণুর কৃপাতে আশ্রয় মিলল বিষ্ণুলোকে। অর্থাৎ বিষ্ণুলোকের
বহিঃপ্রাকারের গায়ে পুরোহিত, নর্তকী, চয়নিকাদের জন্য যে সব আবাসস্থল ছিল সেই স্থানে। সন্ধ্যারতি সাঙ্গ হলে বিষ্ণুলোকের অভ্যন্তরে সে সময় কেউ থাকত না। কারণ তখন বিষ্ণুলোকের বাসিন্দা পুণ্যবান আত্মারা জেগে উঠত, ঠিক যেমন আজও তারা জাগে। তাই যেসব মানুষ মন্দিরের কাজে নিয়োজিত থাকত তাদের রাত্রিবাসের কক্ষগুলো ছিল বহিঃপ্রাকারে পরিখা সংলগ্ন স্থানে। ছোট্ট এক কক্ষ তার। মাঝে মাঝে ডাক আসত তার ভগবান বিষ্ণুর সামনে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য। বিশেষত মহারাজ যেদিন সন্ধ্যারতি দেখতে আসতেন, সেদিন। মহারাজ খুশি হতেন তার নৃত্য দেখে। মহারাজের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই চম্পার। তিনি তার জীবন রক্ষা করেছেন, এই অচেনা-অজানা দেশে তার অন্ন বস্ত্র বাসস্থান নির্ধারিত করেছেন। তাই তাঁকে ভগবান বিষ্ণুর মতোই শ্রদ্ধা করে চম্পা নামের সেই যুবতী। তবে একটা ব্যাপার চম্পার মনকে কষ্ট দেয়। তার মনে হয় এত বড় পৃথিবীতে সে একা। সে ক্রীতদাসী নর্তকী হলেও চামদেশে কয়েকজন তারই মতো নর্তকী সহচরী ছিল। যাদের সঙ্গে সে কথা বলতে পারত, সুখ-দুঃখ বিনিময় করতে পারত কিন্তু এখানে তার সে সুযোগ নেই। চম্পা, মন্দিরের অন্য নর্তকীদের সঙ্গে ভাব করার চেষ্টা করলেও তারা তাকে এড়িয়ে চলে, অতি প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ বাক্যালাপ করে না তার সঙ্গে। বিষ্ণুলোকের খামের দেশীয় নর্তকীদের চম্পাকে এড়িয়ে চলার পিছনে দুটো কারণ ছিল। প্রথমত, চম্পা নামের ওই নারী ভিনদেশি। তার ওপর চামের দেশের মেয়ে সে। চামেদের আক্রমণের সময় এই মন্দির নগরীতে যে ধ্বংসলীলা, হত্যালীলা, চলেছিল তা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কারও পক্ষেই ভোলা সম্ভব ছিল না। চামদেশ সম্পর্কিত যে কোনও কিছুকেই খামেরা অপছন্দ করত। এক্ষেত্রে নতর্কীদের মনোভাবের ব্যতিক্রম ছিল না। আর দ্বিতীয় কারণ হল, সেই নারীর নাচ দেখে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন ও তাঁর সভাসদরা বিশেষ প্রীত হতেন, এ ব্যাপারটাও বেশকিছু নর্তকীর মনে ঈর্ষার জন্ম দিয়েছিল। চম্পা নামী মেয়েটি কিন্তু খামের যুবতীদের মতোই পোশাক পরিধান করত। খামের রমণীদের সঙ্গে চাম রমণীর মুখমণ্ডল বা আকৃতিগত তেমন ফারাকও ছিল না। তাই কখনও বা কেউ হয়তো তাকে খামের যুবতী ভেবে বাক্যালাপ করলেও তার পরিচয় জানার পর তার সংস্রব এড়িয়ে চলত। শুধু নর্তকী নয়, মন্দিরের কাজে নিয়োজিত অন্য রমণীদের চম্পার প্রতি একই রূপ ছিল। কাজেই মন্দিরের হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যেও সে ছিল একা। কখনও সে গিয়ে বসে থাকত গর্ভমন্দিরে দেবমূর্তির সামনে সবার পিছনে, কখনও চুপচাপ বসে থাকত পরিখার ধারে। আবার কখনও বা এই মন্দির নগরীর বিভিন্ন মন্দিরে একলা ঘুরে বেড়াত। এই ভাবেই সময় অতিবাহিত হতো তার। তবে সময় থেমে থাকে না। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত-বসন্ত আবর্তিত হয় নিজের নিয়মে। দেখতে দেখতে বেশ কয়েক বছর এই মন্দির নগরীতেই সময় অতিবাহিত করে ফেলল নিঃসঙ্গ সেই তরুণী। তারপর হঠাৎই একদিন এক ঘটনা ঘটল। হয়তো তা ঘটল ভগবান বিষ্ণুর ইচ্ছাতে।’—এ কথা বলার পর সে থেমে গিয়ে বিষ্ণুলোকের দিকে তাকাল। স্বাগতও তার দৃষ্টি অনুসরণ করল। সে দেখল সূর্য বিষ্ণুলোকের আড়ালে অন্তর্হিত হতে শুরু করেছে। আর আকাশের পুঞ্জীভূত মেঘের রাশিও বিষ্ণুলোকের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে স্বাগত বলল, ‘কী ঘটনা ঘটল?’ যুবতী আবার স্বাগতর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল—
‘একদিন বিকালে তেমনই মন্দির নগরীতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল চম্পা নামের সেই যুবতী। ঘুরতে ঘুরতে বিষ্ণুলোক থেকে কিছুটা তফাতে চলে এসেছে সে। হঠাৎই তার চোখে পড়ল এক মন্দির প্রাসাদ। সে প্রাসাদ আগে কোনও দিন খেয়াল করেনি সে। তার সামনে তোরণদ্বারের গায়ে লতাগুল্মে অচেনা সুন্দর ফুল ফুটে আছে। দেবতার সামনে নৃত্য পরিবেশন করার সময় ফুলমালাতে সজ্জিত হয় নর্তকীরা। …সেই মালা অনেক সময় নিজেই গাঁথে চম্পা। তাই সে এগিয়ে গেল তোরণদ্বারের কাছে। তোরণের মাথার উপর রয়েছে বিষ্ণুর মুখমণ্ডল। যেমন এখানে সব তোরণের মাথাতেই থাকে। তবে তোরণের বেশ কয়েকটা স্তম্ভ আঘাতপ্রাপ্ত। তার গায়ের মূর্তিগুলো অঙ্গহীন। চামরা মন্দির নগরীতে বেশকিছু মন্দির প্রাসাদ নষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। সেগুলি তখন সাময়িকভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। মেয়েটা অনুমান করল এ প্রাসাদ তেমনই কোনও প্রাসাদ হবে। কারণ তোরণের সামনে দ্বাররক্ষী বা অন্য কোনও মানুষ চোখে পড়ছে না। যাই হোক নিজের অঞ্চলে পুষ্পচয়ন করতে শুরু করল সে। সার সার লতাগুল্ম নেমে এসেছে মন্দির তোরণের গা বেয়ে, মোটা মোটা সব লতাগুল্ম। তার গায়ে থোকা থোকা ফুল। হঠাৎই একটা লতা স্পর্শ করতেই চম্পার আঙুলে কেমন যেন শীতলভাব অনুভূত হল। এত ঠান্ডা কেন? ব্যাপারটা সে ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই সেই প্রকাণ্ড লতাটা উপর থেকে খসে পড়ে আলিঙ্গন করতে শুরু করল তার শরীর। মাটিতে পড়ে গেল চম্পা। সে লতা ভেবে যা স্পর্শ করেছিল। তা হল লতাগুল্মর সঙ্গে মিশে থাকা একটা অজগর সাপের লেজ! চম্পা কিছুতেই মুক্ত হতে পারছেন সেই নাগপাশ থেকে। একসময় সেই সর্প মেয়েটার সমস্ত শরীর আবৃত করে ফেলল। চম্পা আতঙ্কে চিৎকার করতে লাগল বাঁচাও বাঁচাও বলে। কিন্তু সেই নির্জন স্থানে কে বাঁচাবে তাকে? ক্রমশ শরীর অবসন্ন হয়ে আসতে লাগল তার। কণ্ঠও স্তব্ধ হতে শুরু করল। সেই অজগর সর্প বুঝতে পারল শিকার তার করায়ত্ত হয়েছে। মহাসর্প এবার তার প্রকাণ্ড মুখটা হাঁ করল শিকারের মাথাটা গলাধঃকরণের জন্য। ঠিক সেই সময় মন্দির তোরণের ভিতর থেকে তলোয়ার হাতে ছুটে বেরিয়ে এল একজন। অজগর সর্প তখন তার প্রকাণ্ড চোয়াল দুটোর ভিতর অসহায় নারীর মাথাটা ঢুকিয়ে নিতে চলেছে ঠিক তখনই সেই ব্যক্তি ছুটে এসে তলোয়ারের এক কোপে ছিন্ন করে দিল সর্পের মুণ্ড…।’
