বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৮
পর্ব ২৮
রামমূর্তি বললেন, ‘আমার অনুমান মন্দিরের ভিতরে কোথাও এর মাথায় পাথর খসে পড়েছে।’
পুলিস কর্তা বললেন, ‘ওর মাথায় পাথর খসে পড়েছে নাকি কেউ ওকে পাথর দিয়ে আঘাত করেছে সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। এখন ভিতরের দিকে গিয়ে দেখি কোনও কিছু পাওয়া যায় কি না?’—এই বলে তিনি এগলেন সামনের দিকে। সবাই তাকে অনুসরণ করল।
মন্দিরের বাইরের অংশর কক্ষগুলোতে ঢুকতেই ফঙ যে আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছিল তার প্রমাণ মিলল। মেঝেতে পড়ে আছে ফোঁটা ফোঁটা জমাট বাঁধা রক্ত। তবে সেখানে এমন কিছু মিলল না, যা দেখে মনে হয় সেটা ফঙের মাথায় খসে পড়েছিল। এরপর তারা প্রবেশ করল দ্বিতীয় চত্বরটাতে। যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মন্দিরের মূল কাঠামোটা। যেখানে অনেক পাথর খণ্ড পড়ে আছে ঠিকই কিন্তু তা সবই বৃষ্টির জলে, ধোয়া। তার কোনওটা দেখে বোঝার উপায় নেই যে ফঙ তাদের কোনওটার দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল কি না! এরপর তারা প্রবেশ করল মূল মন্দিরে। যেখানে অবশ্য গত রাতে ফঙের উপস্থিতির প্রমাণ মিলল। রক্ত পড়ে আছে ফোঁটা ফোঁটা। সেই চিহ্ন অনুসরণ করতে করতে কক্ষগুলো পেরতে পেরতে সবাই এসে উপস্থিত হল ঠিক সেই জায়গাতে, যেখানে একটা শূন্যস্থানকে ঘিরে তাকে অঞ্জলি নিবেদনের ভঙ্গিতে দেওয়ালের গায়ে বৃত্তাকার স্থাপন করা আছে অলঙ্কার ও উত্তরীয় শোভিত ব্রাহ্মণদের প্রাচীন মূর্তিগুলো। সেই দেওয়ালটার নীচে মেঝেতে পড়ে আছে চাপ চাপ রক্ত! সেই রক্তর কিছুটা তফাতে পড়ে আছে একটা প্রস্তর খণ্ড। একটা নারী মূর্তির গলা সমেত মাথা। পুলিস কমিশনার ঝুঁকে পড়ে সেই প্রাচীন প্রস্তর খণ্ডটা দেখে বললেন, ‘সম্ভবত এটার আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে ফঙের।’
এরপর তিনি জায়গাটার ছাদ আর চারপাশের দেওয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, ‘কিন্তু কোথা থেকে খসে পড়ল এটা?
প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না।’
কিমও ওপর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওপর থেকে মূর্তির মাথাটা খসে পড়লে ওর ধড়টা কোথায়? ধড়টা কি আগেই তবে খসে পড়েছিল? মুন্ডুটাই লেগেছিল। ধড়টা আপনারা বাইরে সরিয়ে নিয়ে গেছেন?’
রামমূর্তি একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘না, এখান থেকে কোনও মূর্তির ভগ্নাংশ আমরা বাইরে নিয়ে যাইনি।’
বাকুম বললেন, ‘এই পাথরের মুন্ডুটা কি এখানেই ছিল?’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘ঠিক খেয়াল করতে পারছি না। তবে অপ্সরা, রক্ষীদের ভাঙা দেহ মুন্ডু বেশকিছু এ মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে আছে। প্রাচীন মূর্তিগুলো ওপর থেকে খসে পড়া ছিল।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পুলিসকর্তা বাকুম বললেন, ‘এই পাথরের মুন্ডুটা মাথার ওপর থেকে খসে পড়েনি বলেই আমার মনে হচ্ছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটা সম্ভাবনার কথাও কিন্তু মাথায় আসছে। তা হল, এটা দুর্ঘটনা নয় খুন। কেউ বাইরে থেকে পাথরের খণ্ডটা এখানে এনে তা দিয়ে আঘাত করেছিল ফঙকে।’
তার কথা শুনে নিস্তব্ধ হয়ে গেল সবাই। প্রফেসর রামমূর্তি এরপর বললেন, ‘কে খুন করল ফঙকে? আর কেনই বা করল?’
কিম বললেন, ‘যেখানে স্থানীয় লোকরা মোটা মজুরির লোভ দেখালেও এইসব পুরনো মন্দিরে ঢুকতে চায় না, রাতে তো এ তল্লাটে থাকেই না, সেখানে ফঙ এত রাতে মন্দিরে ঢুকেছিল কেন সেটাই তো বোধগম্য হচ্ছে না।’
এক পুলিসকর্মী কমিশনারের উদ্দেশে বললেন, ‘স্যর এটা মন্দিরের প্রেতের কাজ নয় তো?’
লোকটার কথা শুনে স্বাগত বুঝতে পারল, প্রাচীন মন্দিরের প্রেতাত্মার ব্যাপারটা এখানকার পুলিসরাও বিশ্বাস করে।
বাকুম অবশ্য তার কথা শুনে বললেন, ‘তুমি চুপ কর।’ এরপর তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই এমন কোনও কারণ আছে যা সব ভয়কে অতিক্রম করে তাকে রাতের বেলা এই মন্দিরে টেনে এনেছিল। সে কারণটা আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে। আর ঘটনাটা যদি খুন হয়ে থাকে তবে সেই খুনিকে খুঁজে বার করতে হবে।’
আর এরপর তিনি তার পুলিসকর্মীদের নির্দেশ দিলেন, ‘ওই পাথরের মাথাটা কাপড়ে জড়িয়ে তুলে নাও, আর সারা মন্দিরটার ছাদ থেকে সব জায়গায় খুঁজে দেখ কোথাও কোনও লোক লুকিয়ে আছে কি না।’ এরপর পুলিস কর্তা, সরকার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আধিকারিক আর স্বাগতরা মন্দিরের বাইরের প্রাঙ্গণে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল। পুলিসকর্মীরা সারা মন্দিরে তল্লাসি শুরু করল। কিছুক্ষণ পর তারা ফিরে এসে বলল, ‘কোনও লোক বা সন্দেহজনক কিছু তারা খুঁজে পায়নি।’
স্বাগতরা এরপর বাইরের দিকে রওনা হল। ঘরগুলো অতিক্রম করে তারা এসে উপস্থিত হল বাইরের প্রাঙ্গণে। যেখানে ফঙের লাশটা পড়ে আছে। পুলিস কর্তার নির্দেশে তাঁর কর্মীরা কাপড় জড়িয়ে ফঙের লাশটাকে উঠিয়ে নিল। তারপর এগল সেই প্রাঙ্গণ ছেড়ে তোরণের বাইরে যাওয়ার জন্য।
বাইরে বেরিয়ে স্বাগতরা খানিকটা অবাক হয়ে গেল। তোরণের বাইরের চত্বরে ইতিমধ্যে ছোটখাট ভিড়ের সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভবত পুলিসের গাড়ি দেখেই কোনও একটা ঘটনা ঘটেছে অনুমান করেই লোকগুলো জমা হয়েছে এখানে। স্থানীয় খামের মানুষ তারা। স্বাগতদের পিছন পিছন পুলিসকর্মীরা কাপড় জড়ানো ফঙের দেহটাকে বার করতেই উপস্থিত জনতার মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল।
বাকুম বললেন, ‘দেখি এরা এই ফঙের সম্পর্কে জানে কি না?’
তার নির্দেশ মতো ফঙের দেহটা গাড়িতে তোলার আগে চত্বরে নামানো হল। আগ্রহী জনতা দেহটাকে ঘিরে দাঁড়াল। ফঙের থ্যাঁতলানো মাথাটা গাড়িতে তোলার আগে চত্বরে নামানো হল। সেটা দেখে তাদের মধ্যে অনেকেই আঁতকে উঠল।
বাকুম তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘একে তোমরা চেনো?’
ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘হ্যাঁ, চিনি। ও ফঙ, মন্দিরে গাইডের কাজ করত।’
পুলিস কর্তা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও কোথায় থাকত জানো? ওর বাড়ি কোথায়?’
লোকটা জবাব দিল, ‘বিষ্ণুলোকের বাইরে বেরিয়ে এদিকে আসার পথে কিছু পুরনো ঘর আছে জঙ্গলের গায়ে। সেখানেই ও থাকত, একাই থাকত।’
বাকুম আবারও তাকে প্রশ্ন করলেন, “তুমি আর কিছু জানো ওর ব্যাপারে?”
লোকটা বলল, ‘না, আর কিছু জানি না। আমিও মন্দিরে ধোয়া মোছার কাজ করি। তাই ওকে চিনতাম। তবে আর তেমন কিছু ফঙের ব্যাপারে জানি না।’
উপস্থিত অন্য কেউ আর ফঙের সম্পর্কে কিছু বলল না
বা বলতে চাইল না। তবে লোকদের মধ্যে একজন কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, “ও কীভাবে মারা গেল? ওর এমন অবস্থা কীভাবে হল?”
বাকুম বললেন, ‘ও রাতে মন্দিরে ঢুকেছিল। তারপর ওকে এ অবস্থায় পাওয়া যায়। আমরা তদন্ত করে দেখছি ব্যাপারটা।’
একথা শোনার পর জনতার মধ্যে আবারও একটা গুঞ্জন উঠল। একজন বলল, ‘নিশ্চয়ই ও মন্দিরের প্রেতেদের হাতে মারা পড়েছে!’
অন্য কয়েকজন তাকে সমর্থন জানিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। তাই হবে নিশ্চয়ই। এই মন্দিরে পুরনো ভূত আছে।’
লোকগুলোর মুখ থেকে ফঙের ব্যাপারে আর কোনও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ বার হবে না বুঝতে পেরে বাকুম বললেন, ‘এবার তোমরা যাও।’ লোকগুলো কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগল চত্বর ত্যাগ করার জন্য। ঠিক সেই সময় অন্য একজন উঠে এল মন্দির চত্বরে। আর তাকে দেখতে পেয়েই কিম বললেন, ‘ওই ভো নারেঙ খাম এসে পড়েছেন।’
নারেঙ সোজা এগিয়ে এসে দাঁড়াল স্বাগতদের কাছে। তারপর ফঙের শবদেহের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে বলল, ‘এ যে ফঙ! ওর এ অবস্থা কীভাবে হল?’
বাকুম প্রথমে জবাব দিলেন, ‘ঠিক কীভাবে হল তা এখনও জানা যায়নি। রাতে মন্দিরে ঢুকেছিল তারপর এই ঘটনা ঘটেছে।’
এ কথা বলে পুলিস কর্তা তাকে প্রশ্ন করল, “এই ফঙ নামের লোকটা আপনার গাইড ছিল? আপনার সঙ্গে ঘুরে বেড়াত?”
নারেঙ জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তিন দিন আগে আমি ওকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’
“তাড়িয়ে দিয়েছিলেন কেন?” জানতে চাইলেন বাকুম।
নারেঙ যে কথা স্বাগতদের বলেছিল সেই একই কথা বলল, ‘লোকটার আচরণ আমার ভালো লাগছিল না। মন্দির ঘোরাবার সময় আমাকে বানিয়ে বানিয়ে নানা মিথ্যা কথা বলত, বার বার আমার থেকে টাকা দাবি করত। লোকজনের সঙ্গে অকারণে ঝগড়া করত। তাতে আমার সম্পর্কেও লোকজনের খারাপ ধারণা তৈরি হচ্ছিল তাই।’
এ কথা বলে নারেঙ একটু থেমে বলল, ‘তবে ও যে মারা যাবে তা আমি ভাবিনি। ওকে বিদায় করার পর এই কদিনের মধ্যে আমি আর ওকে দেখিনি।’
বাকুম জানতে চাইলেন, ‘ও যে সব মিথ্যা কাহিনি আপনাকে শোনাচ্ছিল তার দু-একটা নমুনা বলতে পারেন?’
একটু চুপ করে থেকে নারেঙ বলল, ‘এই যেমন এই মন্দির নগরীতে নাকি গুপ্তধন লুকানো আছে! আমি তাকে মোটা টাকা দিলে সে গুপ্তধন উদ্ধার করে দেবে, সে তার সন্ধান জানে— এইসব আজেবাজে কথাবার্তা।’ নারেঙের কথা শুনে পুলিস কর্তা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ওর লাশটা আমি এখন পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। আপনার যারা বিদেশ থেকে এ জায়গায় এসেছেন তাদের উদ্দেশে একটা কথা বলে যাচ্ছি, আমাকে না জানিয়ে আপনারা এখনই কেউ দেশে ফিরবেন না। ব্যাপারটা দুর্ঘটনা নাকি খুন, এখনও তা স্পষ্ট নয়। তদন্তের স্বার্থে আপনাদের আমার যে কোনও সময় প্রয়োজন হতে পারে। আশা করি আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন।”
একথা বলার পর তিনি পুলিস কর্মীদের সাহায্যে লাশটাকে ভুলে নিয়ে চত্বর ছেড়ে এগলেন গাড়িগুলোর দিকে। পুলিসের গাড়ি আর শববাহী গাড়িটা চলে যাওয়ার পর যে সব লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে ছিল তারাও চলে যেতে শুরু করল। প্রফেসর রামমূর্তি স্থানীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধিকর্তা কিমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার আমরা কী করব? কাজ চালিয়ে যাব না থামিয়ে দেব?’
কিম বললেন, “কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তাতে কোনও বাধা আছে বলে মনে হয় না। তবে এ ঘটনার পর স্থানীয় লোক দিয়ে কাজ করাতে আপনার সমস্যা হবে। গাইড ফঙের মৃত্যু নিয়ে নিশ্চয়ই প্রচার হবে যে ভূতেই তাকে মেরে ফেলেছে। যদি তাকে কোনও মানুষ খুন করে থাকে আর যতক্ষণ সে খুনি ধরা না পড়ছে ততক্ষণ এই ব্যাপারটাই প্রচার হতে থাকবে। জায়গাটা ছোট, তাই খবর ছড়াতে দেরি হবে না।”
তার কথা শুনে নারেঙ খাম বলল, ‘এর মধ্যে আবার খুনের সম্ভাবনাও আছে নাকি? আমি তো ভাবলাম এটা একটা দুর্ঘটনা।’
কিম বললেন, ‘পুলিসের সন্দেহ তেমনও হতে পারে। একটা অপ্সরার ভাঙা মুন্ডুর আঘাতেই ফঙের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। আর যে জায়গায় ওই পাথরটা পাওয়া গেছে সেটা সে জায়গায় থাকার কথা নয়।’
প্রফেসর রামমূর্তি নারেঙকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি এই মন্দিরেই আসছিলেন?’
নারেঙ বলল, ‘না, সে পরিকল্পনা ছিল না আমার। কাছের রাস্তা দিয়ে বিষ্ণু মন্দিরের উদ্দেশে যাচ্ছিলাম একজন গাইড মেলে কি না সে জন্য। দেখলাম দু’জন লোক উত্তেজিতভাবে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। তাদের কথা শুনে জানতে পারলাম এই মন্দিরের দিকে নাকি পুলিসের গাড়ি এসেছে। সে কথা শুনে আমি কৌতূহলী হয়ে এই মন্দিরে চলে এলাম। তারপর দেখছি এই ব্যাপার।’
কিম এরপর রামমূর্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই তেরো নম্বর মন্দির সম্পর্কে কোনও তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন? কোনও দেবদেবী মূর্তি উদ্ধার করতে পারলেন?’
প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘না, তেমন কিছুর খোঁজ পাইনি। পেলে তো তা আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাতাম।’
নারেঙ কিমকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাদের সরকারি নথিতে এই মন্দিরের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ নেই?’
কিম বললেন, ‘আমি তেমন কিছুর খোঁজ পাইনি। হয়তো একসময় ছিল। পলপট বাহিনী তাদের সময়কালে অনেক সরকারি নথিপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিল। এই মন্দির সম্পর্কে কোনও সরকারি তথ্য থাকলেও সে সময় হয়তো তা পুড়ে যায়।’
প্রফেসর রামমূর্তি এবার কিছুটা আক্ষেপের স্বরে বললেন, ‘এখানে কাজ করতে এসে ফঙের মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম মনে হচ্ছে!’
সরকারি অধিকর্তা কিম প্রফেসরকে আশ্বস্ত করার ঢঙে বললেন, ‘আপনারা পুলিসের ঝামেলায় জড়িয়ে যাবেন ভাবছেন। মৃত্যুর ঘটনাটা দুর্ঘটনা বা খুন যাই হোক না কেন আপনারা তো আর তার সঙ্গে যুক্ত নন। আমি সরকারের উপর মহলে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখছি। পুলিস যাতে আপনাদের অহেতুক বিব্রত করতে না আসে সে ব্যাপারটাও আমি দেখব। যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। এ নিয়ে আর বেশি দুশ্চিন্তা করবেন না। নিজেদের কাজ করুন। কোনও সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করবেন আমাকে। এবার আমি যাই।’- এ কথা বলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে কিম এগলেন তার গাড়ির দিকে।
তার গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পর নারেঙ প্রফেসরকে বলল, ‘দুর্ঘটনা যখন ঘটেছে এখন আমার কিন্তু মনে হয় কটা দিনের জন্য আপনাদের কাজ বন্ধ রাখাই ভালো। আবারও হয়তো কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কয়েকটা দিন পরিস্থিতি বিচার করে দেখুন। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলে তারপর আবার কাজ শুরু করুন। তেমন হলে সিয়েমরিপে আমি যে হোটেলে উঠেছি সেখানে ক’দিনের জন্য আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’
রামমূর্তি বললেন, ‘আপনার পরামর্শর জন্য ধন্যবাদ। তেমন মনে করলে আমি জানাব আপনাকে।’
নারেঙ বলল, “ঠিক আছে, আমি এখন বিষ্ণুলোকের দিকে যাই। সাবধানে থাকবেন আপনারা। আমি আবার আপনাদের খোঁজ নিতে আসব।”
নারেঙ চলে যাওয়ার পর প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে এই মন্দিরে কোথাও কুমির আছে বা কুমিরের আনাগোনা আছে। প্রীতম প্রাণীটাকে দেখেছে আর ফঙও মরবার আগে কুমিরের কথা বলেছে। হয়তো প্রাণীটা মন্দিরের কোথাও লুকিয়ে আছে। আমরা তার সন্ধান পাচ্ছি না। রাত নামলে সে বাইরে বেরিয়ে আসে। কাজেই আমাকে না জানিয়ে একলা কেউ মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করবে না। আর রাতে কেউ একলা বাইরে বেরবে না। কুমিরের মুখোমুখি পড়ে গেলে অঘটন ঘটতে পারে।’
বিক্রম বলল, ‘কিন্তু এখানে কীভাবে কুমিরের আগমন ঘটল বলুন তো?’
প্রফেসর রামমূর্তি কিছু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘এখানে তো অনেক কুমির খামার আছে। এমনও হতে পারে কোনওভাবে সেসব জায়গা থেকে পালিয়ে কোনও ভাবে কুমিরটা মন্দির নগরীতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে কোনও খামার মালিক বা অন্য কোনও লোক কোনও কারণে কুমিরটাকে এখানে এনেছিল। তা ওর মাংস খাওয়ার জন্যও হতে পরে। তারপর কোনও কারণে কুমিরটাকে তারা ছেড়ে দেয় বা কুমিরটা পালায়। এই সম্ভাবনার কথাগুলোই আমার মাথায় আসছে এখন। খামের রাজাদের সময় বিষ্ণুলোকের পরিখাতে যে কুমিররা ছাড়া থাকত এই কুমিরটা তাদের বংশধর এই ব্যাপারটার সম্ভবনাও হয়তো বা কিঞ্চিত আছে।’
নাতাশা পুলিস আমার পর নিজের ঘরে ফিরে গিয়েছিল। এবার সে বাইরে বেরিয়ে স্বাগতদের কাছে উপস্থিত হল। তারপর সে প্রফেসরকে বলল, ‘সব তো মিটল। এবার আমার ফেরার ব্যবস্থা করে দিন। আমার এখানে থাকতে খুব ভয় লাগছে।’
প্রফেসর রামমূর্তি নাতাশাকে বললেন, ‘আমাদের কারও দেশে ফেরার ইচ্ছা হলেও আমরা এখন কেউ দেশে ফিরতে পারব না। পুলিস আমাদের তেমনই নির্দেশ দিয়ে গেছে।’
‘পুলিস এমন নির্দেশ দিয়ে গেল কেন?’ জানতে চাইল নাতাশা।
রামমূর্তি স্যর সংক্ষেপে কারণটা ব্যাখ্যা করলেন তাকে। ফঙ খুনও হয়ে থাকতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা শুনে নাতাশার মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সুরভী তার মনে সাহস যোগাবার জন্য বলল, ‘আমরা এতজন একসঙ্গে আছি তোমার এত ভয় পাওয়ার কারণ নেই। মনে সাহস রাখ।’
নাতাশা বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি আর মন্দিরে ঢুকব না। প্রফেসর তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “ঠিক আছে তোমার মন্দিরে ঢোকার দরকার নেই।’
ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল স্বাগতরা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় কেটে গেছে। মজুর সর্দার হেকুম এবার চত্বরে এসে উপস্থিত হল। তার মুখে উত্তেজনার ছাপ দেখে স্বাগত বুঝতে পারল ইতিমধ্যে পথেই যে ঘটনাটা শুনে ফেলেছ। যে তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘ঘটনাটা কি সত্যি? গাইড ফঙ মন্দিরের মধ্যে মারা গেছে?’
