বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৯
পর্ব ২৯
রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি। একটু আগে পুলিস তার দেহ নিয়ে গেল।’
হেরুম জানতে চাইল, ‘কীভাবে সে মারা পড়ল?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘পাথরের আঘাতে। তবে কীভাবে যে আঘাত লেগেছে তা আমরা কেউ জানি না। আর কেন ও রাত্রিবেলা মন্দিরে ঢুকেছিল তাও আমরা কেউ জানি না।’
হেরুম বলল, ‘আমি মনে হয় জানি ও কেন মন্দিরে ঢুকেছিল?’
প্রফেসর রামমূর্তি সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী জানো?’
হেরুম জবাব দিল, “রাস্তায় লোকজন বলাবলি করছে, ও নাকি গুপ্তধন খুঁজে বেড়াত। ওর সম্পর্কে এ কথা আমি আগেও অন্য লোকের মুখে শুনেছি। ও নিশ্চয়ই গুপ্তধন খুঁজতে এ মন্দিরে ঢুকেছিল।’
প্রফেসর বললেন, ‘লোকজনের মুখে আর কী শুনলে তুমি?’
হেরুম বলল, “ওই কথাই। লোকেরা বলছে গুপ্তধন খুঁজতেই নাকি ফঙ মন্দিরে ঢুকেছিল। তারপর ও ভূতের হাতে মারা পড়ে।”
স্বাগত হেরুমের কথা শুনে বুঝতে পারল, দ্রুত এই ভাবনা চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
প্রফেসর এ ব্যাপারে হেরুমের সঙ্গে আর কোনও কথা বললেন না। হেরুমকে তিনি জানিয়ে দিলেন, এদিন আর মন্দিরে কাজ হবে না। এরপর তিনি চিন্তান্বিত মুখে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
সবাই কিছুক্ষণ চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। হেরুম গিয়ে বসল তোরণের প্রবেশ মুখের গায়ে একটা পাথর খণ্ডর ওপরে। বিক্রম জানতে চাইল, ‘আমরা এখন কী করব?’
স্বাগত বলল, ‘মন্দিরের ভিতরে তো আজ আর ঢোকা হবে না। তেমন কিছু করার নেই এখন।’
বিক্রম বলল, ‘তাহলে বরং আমরা আশপাশে একটু ঘুরে আসি।’
প্রীতমও তার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, সকলে মিলে একটু হেঁটে আসি। তাতে স্ট্রেস একটু কমবে। কাল রাত থেকেই সকলের মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ যাচ্ছে। সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকলে সে চাপ আরও বাড়বে।’
স্বাগত বলল, ‘যাও ঘুরে এস তবে। কিন্তু বেশি দূরে যেও না। আর স্থানীয় লোকদের এড়িয়ে চল। হয়তো তারা উৎসাহী হয়ে তোমাদের দেখে জিজ্ঞেসাবাদ করতে পারে।’
সুরভী জিজ্ঞেস করল ‘তুমি যাবে না?’
স্বাগত বলল, ‘না, আমি এখানেই থাকি। একজনের এখানে থাকার দরকার। প্রফেসরের কোনও প্রয়োজন হতে পারে।’
তারা চারজন এরপর চত্বর ছেড়ে নেমে এগল বনের দিকে। আবার চড়া রোদ উঠতে শুরু করেছে। হেরুমকে একলা বসে থাকতে দেখে স্বাগত এগল তার দিকে। তোরণের সামনে পৌঁছে সে একবার ভিতর দিকে উঁকি দিল। ভিতরের শূন্য প্রাঙ্গণটা কেমন যেন থমথম করছে! সে দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সে বসল হেরুমের পাশে। হেরুম তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাজ কি তবে আর হবে না?’
স্বাগত বলল, ‘ঘটনাটার জন্য আজ কাজ বন্ধ রাখবেন প্রফেসর। তার ওপর আমাদের সকলের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ধকল গেছে। হয়তো কাল পরশু থেকেই আবার মন্দিরের ভিতর ঢুকব আমরা। তুমি কাজে আসবে তো?’
হেরুম একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘মন্দিরের ভিতর আর ঢোকা ঠিক হবে কি না সেটাই ভাবছিলাম।’
স্বাগত বলল, ‘কেন? তুমি তো সাহসী লোক। তুমিও কি ভূতে বিশ্বাস কর নাকি?’
হেরুম জবাব দিল, “তা করি না। কিন্তু পরপর দুটো ঘটনা যখন ঘটল তখন আবারও কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কথাটা ভাবছিলাম। ভূত না হলেও অন্য কোনও খারাপ লোকের নজর পড়ে থাকতে পারে এ মন্দিরের ওপর। সে বা তারাই রাত্রিবেলা মন্দিরে যাওয়া আসা করে। হয়তো বা তাদের হাতেই মারা পড়েছে ফঙ। তারা হয়তো চাইছে না এখানে কেউ থাকুক বা আসুক।”
হেরুমের এ কথাটার মধ্যে একটা যুক্তি আছে তা বুঝতে পারল স্বাগত। এমনও হতে পারে সেই লোক বা লোকেরা কোনও অপরাধী। স্থানীয় লোকেরা রাতের বেলাতে মন্দিরের ধারে কাছে আসে না বলে সে বা তারা এই মন্দিরকেই আশ্রয় হিসাবে বেছে নিয়েছে। স্বাগতরা এ মন্দিরে কাজ শুরু করায় তাদের সমস্যা হচ্ছে।
স্বাগত এরপর জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, এ সব মন্দিরে কুমির থাকতে পারে?’
হেরুম একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘থাকার তো কথা নয়। খামার তো সব সিয়েমরিপে। তবে কেউ ছেড়ে দিয়ে গেলে থাকতে পারে।’
স্বাগত এরপর জানতে চাইল, “ফিঙের সম্পর্কে তুমি আর কিছু জানো?”
হেরুম বলল, “যা জানি সেটুকু তো আপনাদের বললামই। লোকটা গরিব। ওর বড়লোক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। লোককে বলত একদিন সে রাজা হবে, গুপ্তধন উদ্ধার করে। প্রফেসর তাঁকে মন্দিরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলেন বলেই সে রাতে মন্দিরে ঢুকেছিল গুপ্তধন খুঁজতে। তারপর মারা পড়ে। তবে লোকটা কিন্তু এখানকার মন্দির সম্পর্কে অনেক কিছু জানত এ কথা আমি অন্য লোকের মুখে শুনেছি।”
হেরুমের কথা শুনে স্বাগতর মনে পড়ল, বিষ্ণুলোকের প্রবেশদ্বারে যখন তারা ফঙকে প্রথম দেখেছিল তখন ফঙ নাতাশার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘ইচ্ছা হলে আমি রাজা হতে পারি।’ তবে কি এ মন্দিরে সত্যি কোনও গুপ্তধন লুকানো আছে। আমরা বা অন্য কেউ সেই গুপ্তধন উদ্ধার করে ফেলতে পারি এ আশঙ্কায় সে নিজেই রাতের অন্ধকারে গুপ্তধন উদ্ধার করতে এসে মারা পড়ল? —এ কথা মনে মনে ভাবল স্বাগত। বেশ কিছুক্ষণ তারা সে জায়গায় চুপচাপ বসে রইল। তারপর হেরুম বলল, ‘যাই, যাওয়ার আগে আপনাদের রান্নাটা করে দিয়ে যাই।’ হেরুমের সঙ্গে স্বাগতও উঠে দাঁড়াল। তারপর একই সঙ্গে এগল। কিছুটা এগিয়ে হেরুম রওনা হল ভাড়ার ঘরের দিকে। স্বাগতর মনে হল ঘরে ঢুকে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। গত রাতে ঘুম হয়নি তার। এ কথা ভেবে সে ঘরের দিকে এগতে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময় সে দেখতে পেল বনপথ বেয়ে ছাতা মাথায় একজন চত্বরের দিকে এগিয়ে আসছে। স্বাগত তাঁকে চিনতে পারল, তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব। তাঁকে দেখে স্বাগত ঘরে না ঢুকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
চত্বরে উঠে এলেন রত্নসম্ভব। স্বাগত তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি জানতে চাইলেন, “রামমূর্তি কোথায়?”
স্বাগত জবাব দিল, ‘তিনি ঘরেই আছেন। আমি তাঁকে ডেকে দিচ্ছি।’
কিন্তু রামমূর্তি স্যরকে ডাকতে হল না। তিনি জানলা দিয়ে রত্নসম্ভবকে দেখতে পেয়ে নিজেই দরজা খুলে এগিয়ে এলেন।
রত্নসম্ভব রামমূর্তি স্যরকে বললেন, ‘ফঙের মৃত্যুর খবরটা শুনে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।’
রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। চলুন আমরা ঘরে বসে কথা বলি?’
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘না, ঘরে এখন আর বসব না। আমি এখন সিয়েমরিপ হাসপাতালে যাব। ফঙের আত্মীয় পরিজন কেউ নেই। তাই ওর দেহ সৎকারের ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে। আপনাকে শুধু একটা কথা বলেই আমি এখনই চলে যাব।’
‘কী কথা?’ জানতে চাইলেন প্রফেসর।
রত্নসম্ভব বললেন, ‘আপনাকে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি এ জায়গা ছেড়ে চলে যান। ফঙকে আমি বারণ করেছিলাম এ মন্দিরের কাছে আসতে। সে শুনল না। তার প্রাণ গেল। আমি বুঝতে পারছি আরও অনেক বড় বিপদ নেমে আসতে চলেছে। আর তাতে আপনাদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা। তাই আপনাদের এ অনুরোধ জানাতে এলাম।’
প্রফেসর জানতে চাইলেন, ‘বড় বিপদ মানে কী ধরনের বিপদ?”
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘যাতে ফঙের মতো আপনাদেরও প্রাণসংশয় হতে পারে।’
এ কথা বলার পর তিনি রামমূর্তিকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললেন, ‘এবার আমি যাচ্ছি। আমার কথা অবহেলা করবেন না।’ এ কথা বলে তিনি পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন প্রফেসর আর স্বাগত। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বন পথে মিলিয়ে যাওয়ার পর প্রফেসর রামমূর্তি অনেকটা স্বগেতোক্তির স্বরে বললেন, ‘ইচ্ছা করলেই কী সরকারি কাজ এভাবে ছেড়ে চলে যাওয়া যায়! সরকার কত টাকা খরচ করছে আমাদের কাজের পিছনে। তাছাড়া দুর্ঘটনাটা ঘটার পর তো পুলিসও আমাদের আপাতত দেশে ফিরতে নিষেধ করল।’
এ কথা বলার পর তিনি জানতে চাইলেন, “অন্যরা সব কোথায় গেল?”
স্বাগত জবাব দিল, ‘কাছেপিঠেই ঘুরতে গেছে সময় কাটাবার জন্য।’
প্রফেসর বললেন, ‘রত্নসম্ভব যে আমাদের এখানে থাকতে নিষেধ করে গেলেন তা আর অন্য কাউকে বলার দরকার নেই। নাতাশার অবস্থা তো দেখছই, প্রচণ্ড আতঙ্কে আছে ও। এ সব কথা কানে গেলে ও আরও ভয় পেয়ে যাবে। এমনিতেই আমরা সমস্যায় আছি, আর সমস্যা বাড়তে দিতে চাই না।”
স্বাগত বলল, ‘ঠিক আছে স্যর।’
রান্না হয়ে গেলে দুপুরের খাবার তাঁর ঘরে পাঠিয়ে দিতে বলে নিজের ঘরে ফিরে গেলেন রামমূর্তি স্যর। স্বাগতও তার ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগল রত্নসম্ভবের বলে যাওয়া সতর্কবাণী। এরপর তার মনে হতে লাগল এই প্রাচীন মন্দিরে হয়তো সত্যিই গুপ্তধন বা কোনও গোপন জিনিস রক্ষিত আছে যার কথা জানেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব। বায়ুম মন্দিরে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রত্নসম্ভব আর রামমূর্তি স্যরের মধ্যে যে কথোপকথন স্বাগতর কানে এসেছিল তার মধ্যেও গোপন কিছু এ মন্দিরে থাকার ব্যাপারে ইঙ্গিত ছিল। সেই ভান্ডগুলোর কথা! তার মধ্যে কী আছে যা সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বলতে চাইছেন না। তিনি চাইছেন না জিনিসগুলো উদ্ধার হোক। তাহলে হয়তো কোনও কারণে বিপদ হতে পারে। হয়তো কোনওভাবে ফঙ ব্যাপারটা জেনে ফেলেছিল আর সেটা উদ্ধার করতে গিয়ে ফঙের জীবনে মৃত্যু নেমে এল। কিন্তু আরও কি কেউ জানে এই মন্দিরের গুপ্তধন বা ওই ভাণ্ডগুলো সম্পর্কে? এ প্রশ্নটা মাথায় আসতেই সেই খামের যুবতীর কথা স্বাগতর মনে এল। নিজের মনের প্রশ্নের জবাবে নিজেই সে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, সে হয়তো জানে।” আর এটাও সে রত্নসম্ভবের মতো জানে যে সে ব্যাপারকে কেন্দ্র করে বিপদ নেমে আসছে। তাই সে স্বাগতকে সাবধান করেছে রাতে একলা মন্দিরে বা জঙ্গলে প্রবেশ না করার জন্য। কিন্তু সেই খামের যুবতী কি স্বাগতকে বলবে সেই গুপ্ত রহস্যর কথা? এ সব কথা ভাবতে ভাবতে একসময় স্বাগত তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
স্বাগতর সংবিৎ ফিরল দরজা ধাক্কানোর শব্দে। দরজা খুলে সে দেখল বিক্রম দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে ধরা তালের রসের একটা বোতল। সে সেটা স্বাগতর হাতে ধরিয়ে বলল, ‘তোমার জন্য নিয়ে এলাম। আমরাও খেলাম। শরীর ঠান্ডা হবে, ঘুম ভালো হবে, শরীর চাঙ্গা হয়ে যাবে।’
বোতলটা হাতে নিয়ে স্বাগত জানতে চাইল, ‘তোমরা বায়ুম মন্দিরের ওদিকে গিয়েছিলে নাকি?’
বিক্রম জবাব দিল, ‘ওদিকে যাইনি। বিষ্ণুলোকে যাওয়ার রাস্তা ধরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কিছুটা এগিয়ে একটা গাছের তলায় বসেছিলাম। তখন দেখি বায়ুম মন্দিরে যে লোকটার কাছে আমরা এই পানীয় খেয়েছিলাম, সে তার সাইকেলের পিছনে শোলার বাক্সে পানীয়র বোতল ফেরি করতে বেরিয়েছে। সুরভীই ওই লোকটাকে দেখে চিনতে পেরেছিল। তার কাছ থেকেই আমরা খেলাম। তোমার জন্যও আনলাম। লোকটাকে বলে দিয়েছি। এদিকে এলে আমাদের এখানে আসার জন্য। সে তো আর মন্দিরের ভিতরে ঢুকবে না। আশা করি ওর এখানে আসা নিয়ে প্রফেসর আপত্তি করবেন না।’
স্বাগত বোতলের ছিপি খুলে কয়েক ঢোক পানীয় গলায় ঢেলে জানতে চাইল, ‘কোনও লোকজনের সঙ্গে দেখা হল? তোমাদের দেখে স্থানীয় কেউ কিছু জানতে চাইল?’
বিক্রম জবাব দিল, ‘না, তেমন কেউ কথা বলেনি আমাদের সঙ্গে। কয়েকজন লোককে দেখে মনে হল তারা আমাদের দেখে নিজেদের মধ্যে চাপা স্বরে কথা বলল। তবে নারেঙ খামের সঙ্গে আমাদের দেখা হল। একটা টুকটুক নিয়ে সে বিষ্ণুলোকের দিক থেকে আসছিল আমরা যখন পান করছিলাম। আমাদের দেখে সে টুকটুক থেকে নামল। সেও এক বোতল পান করল আমাদের সঙ্গে।’
‘কিছু জিজ্ঞেস করল সে?’ আবার পানীয় গলায় ঢেলে জানতে চাইল স্বাগত।
বিক্রম জবাব দিল, “মন্দিরের ব্যাপার নিয়ে সে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। সে বলল, ‘বিষ্ণুলোক যাওয়ার জন্য মনমতো গাইড খুঁজে পায়নি। সে সিয়েমরিপে ফিরে যাচ্ছে।’”
বিক্রম চলে গেল। স্বাগতর ঘড়িতে ইতিমধ্যে বারোটা বেজে গেছে। পানীয়টা শেষ করে বাইরে বেরল সে। রান্না হয়ে গেছিল। একসঙ্গেই তারা পাঁচজন খাওয়া সারল। তারপর যে যার ঘরে ঢুকে পড়ল। পানীয়র প্রভাবেই হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুম নেমে এল স্বাগতর চোখে।
টানা ঘণ্টা চারেক ঘুমাবার পর স্বাগতর ঘুম ভাঙল। বিকাল হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচটা বাজে। বিকাল হলেই বাইরে বেরিয়ে খামের যুবতীর সঙ্গে কথা বলতে যাওয়া নিজের অজান্তেই যেন একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে স্বাগতর। বিকাল হলেই স্বাগত তার কাছে যাওয়ার জন্য, তার গল্প শোনার জন্য তীব্র টান অনুভব করে। এদিনও সে ঘটনার ব্যতিক্রম হল না।
আগের দিনের গল্পে সে বলেছে যে মন্দিরে নর্তকী চম্পা ও জম্বুদ্বীপের যুবক বহ্নির দেখা হয়েছিল সেই মন্দিরই হল স্বাগতদের এই মন্দির। বহ্নি সেই চাম দেশীয় রমণী চম্পাকে অনুরোধ জানিয়েছে তাকে এ মন্দিরে এসে নাচ দেখাবার জন্য। খামের যুবতীর কাহিনিতে ক্রমশ উঠে এসেছে এ মন্দিরের কথা। তার বলা গল্পর শেষ অংশটা মনে পড়াতে স্বাগতর মনে তার সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছাটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
যদিও স্বাগতর একবার মনে হল যে গত রাতের ঘটনার পর রামমূর্তি স্যরকে না জানিয়ে তার বাইরে যাওয়া ঠিক হবে কি না? কিন্তু তারপরই সে ভাবল ওই খামের নারী হয়তো কোনও আলোকপাত করতে পারে ফঙের মৃত্যুর ব্যাপারে। বা তার কাহিনিতে উঠে আসতে পারে এই প্রাচীন মন্দির সম্পর্কে আরও কোনও তথ্য। এ কথা ভাবার পর সে আর দেরি করল না। বিছানা ছেড়ে উঠে পোশাক পাল্টে ঘর থেকে চত্বরে বেরিয়ে এল। বিক্রমদের, নাতাশাদের ঘরের দরজা বন্ধ। গত রাতে জেগে থাকার কারণে আর পানীয়র প্রভাবে ঘুম দিচ্ছে তারা। তবে প্রফেসর রামমূর্তির দরজার দিকে তাকিয়ে স্বাগতর মনে হল দরজাটা বাইরের দিক থেকে বন্ধ করা। কোথায় গেলেন তিনি? চারপাশে তাকিয়ে সে দেখতে পেল না তাকে। চত্বর অতিক্রম করে সে রওনা হল জঙ্গলের দিকে।
গত রাতের টানা বৃষ্টিতে তখনও বন পথের নানান জায়গায় গর্তে জল জমে আছে। গাছপালার পাতা, ওপর থেকে নেমে আসা লতা গুল্মগুলো আরও সবুজ লাগছে। স্বাগত আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল বিকাল হতেই আবার ছোট ছোট মেঘের খণ্ড ভাসতে শুরু করেছে আকাশে। সন্ধ্যা বা রাতে আবার হয়তো ওই মেঘগুলো জড়ো হয়ে বৃষ্টি নামবে। তবে সে মেঘ তখনও বিষ্ণুলোকের দিকে অগ্রসর হয়নি। দিন শেষের সূর্যকিরণ গাছ-পালার ফাঁক দিয়ে নানান স্থানে এসে পড়েছে।
স্বাগত জায়গাটাতে পৌঁছে গেল। অন্য দিনের মতন সূর্যকিরণ আজও এসে পড়েছে পাথরের ফলকের ওপর খোদিত সেই নারী মূর্তির ওপর। স্বাগতর সেই মূর্তির দিকে তাকিয়ে মনে হল ঝোপ জঙ্গলের আড়াল থেকে সে যেন অন্য দিনের থেকে আরও ভালোভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। হয়তো বা সেটা বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়ার জন্যই।
বিকালের সূর্যের আলোতে আজ যেন মূর্তিটা অনেক বেশি পরিষ্কার দেখাচ্ছে। মূর্তিটার পাশ কাটিয়ে গাছে ঘেরা জায়গাটার দিকে যাওয়ার আগে সেই পাথর খোদিত নারীমূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর একটা জিনিস বুঝতে পারল। পাথরের ফলকের গায়ে তার চারপাশের যে লতাগুল্মগুলো ছিল সেগুলো কেউ বা কারা যেন হাত দিয়ে ছিঁড়ে তার গা থেকে সরিয়েছে। সেই পাতা লতার টুকরোগুলো মাটিতে পড়ে আছে। তাই পাথরের ফলকটা ঝোপ জঙ্গলের আড়াল থেকে আরও ভালোভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যেমন মূর্তির পায়ের পাতা সমেত ফলকের নীচের অংশটা এতদিন ঝোপের আড়ালেই ছিল। সেটাও এখন আত্মপ্রকাশ করেছে। ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে সেই মূর্তি। বাম পায়ের পাতাগুলো ডান পায়ের গোড়ালির ওপরের অংশকে বেড় দিয়ে রেখেছে। নারী মূর্তির পায়ের বিভঙ্গ উন্মোচিত হওয়ার পর আজ যেন সেই মূর্তিকে দেখে স্বাগতর মনে হল নারী মূর্তি যেন নৃত্যরতা।
কিছুক্ষণ মূর্তিটাকে দেখার পর সে সেই স্থান ত্যাগ করে গাছে ঘেরা জায়গার ভিতর প্রবেশ করল। সে দেখল ইতিমধ্যেই সেখানে উপস্থিত হয়েছে সেই খামের যুবতী। গাছের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “তুমি কী দেখছিলে মূর্তির ওখানে?”
স্বাগত জবাব দিল, ‘মূর্তিটাই দেখছিলাম, ওর গায়ের চারপাশ থেকে কে যেন ঝোপ জঙ্গলগুলো পরিষ্কার করেছে। নারী মূর্তির পদযুগল আত্মপ্রকাশ করেছে ঝোপের আড়াল থেকে। পায়ে ঘুঙুরের মতো অলঙ্কার, পায়ের মুদ্রা দেখে মনে হচ্ছে ওটা কোনও নর্তকীর মূর্তি।”
কথাটা শুনে খামের যুবতীর ঠোঁটের কোণে একটা অস্পষ্ট হাসি ফুটে উঠে পরক্ষণেই তা মিলিয়ে গেল। গম্ভীর মুখে সে বলল, “আমি ভাবছিলাম হয়তো তুমি আজ থামবে না।”
‘কেন থামব না?’ স্বাগত প্রশ্ন করল।
খামের যুবতী বলল, ‘কারণ, ওই মন্দিরে কী ঘটেছে তা আমি জানি। মৃত্যু হয়েছে এক জনের।’
স্বাগত বলল, ‘খবরটা তবে তুমিও শুনেছ দেখছি। হয়তো আসতাম না, তোমার গল্পর টানে চলে এলাম।’
