বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩০
পর্ব ৩০
যুবতী বলল, ‘এমন যে কিছু ঘটবে তা আমি অনুমান করেছিলাম, সে জন্যই তোমাকে রাতে না বেরবার অনুরোধ করেছিলাম।’
স্বাগত বিস্মিতভাবে বলল, “তুমি জানতে এমন কিছু ঘটতে পারে? কীভাবে জানলে?”
সে উত্তর দিল, ‘হয়তো বা আরও ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে। তবে কী ঘটতে পারে, কেন ঘটতে পারে, তা এখনই তোমাকে আমি জানাতে পারব না। তবে আমাকে হয়তো তোমাকে জানাতে হবে সে কথা। তবে এখন নয়।’
প্রফেসর রামমূর্তি মন্দির সম্পর্কিত ব্যাপারে কোনও বিষয় বাইরের লোককে বলতে নিষেধ করেছেন। তবু আজ স্বাগত তার মনের ভিতর ঘুরপাক খেতে থাকা দুটো কথা তাকে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘তুমি তো আমাদের মন্দির সম্পর্কে অনেক কথা জানো। ওই মন্দিরে যে ভাণ্ডধারী শূদ্র ব্রাহ্মণদের মূর্তি আছে সেই ভাণ্ডগুলোর মধ্যে কী ছিল? কোনও মণিমাণিক্য? হীরা জহরত? ওই ভাণ্ডগুলো কি মন্দিরে এখনও রাখা আছে?’
প্রশ্ন শুনে খামের সুন্দরী কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর বলল, “ওই ভাণ্ডগুলোতে কী বহন করা হতো সে কথা আমি জানলেও এখন বলতে পারব না। তবে একটা কথা বলি, আমি যে কাহিনি তোমাকে শোনাচ্ছি তার সঙ্গে ওই ভাণ্ডগুলোর সম্পর্ক আছে। আমি জানি না, কাহিনির শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারব কি না? তোমাকে ওই ভাণ্ডগুলোর ব্যাপারে জানাতে পারব কি না?”
স্বাগত বলল, ‘এমন কথা বলছ কেন?’
যুবতী বলল, ‘হয়তো বা কাহিনি শেষ করার আগেই কোনও ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটল মন্দির নগরীতে। আমার সঙ্গে আর তোমার দেখাই হল না।’
স্বাগতর মনে হল সে যদি এখন ওই নারীকে জিজ্ঞেস করে যে ভয়ঙ্কর বিপদটা কী? তবে এ প্রশ্নর জবাব সে পাবে না। তাই সে আর প্রশ্ন না করে বলল, ‘এবার তুমি তোমার গল্পটা শুরু কর।’
খামের সুন্দরী বলল, ‘হ্যাঁ, সেটাই বলি।’ কিছুটা তফাতে একটা প্রস্তর খণ্ডর ওপর বসল যুবতী। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করল—
“জম্মুদ্বীপ দেশীয় বাস্তুকার যুবক নর্তকীকে সেই পরিত্যক্ত মন্দিরে তার নাচ দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে ফিরে এল। চম্পাও ফিরে এল তার ঘরে। সারা রাত তার ঘুম এল না। যুবকের প্রতি অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছে সে। সেই আকর্ষণ যুবক বহ্নি তার প্রাণ রক্ষা করেছে বলে শুধু নয়। চম্পা অনুভব করতে লাগল অন্য এক আকর্ষণ। যা ইতিপূর্বে সে আগে কোনও দিন অনুভব করেনি। যে অমোঘ আকর্ষণ নারী-পুরুষের মধ্যে সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকে চলে
নিজের কক্ষ ত্যাগ করে চম্পা গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভগৃহর সামনে। দ্বিপ্রহরের পর থেকে বিকাল পর্যন্ত। গর্ভগৃহে লোকজনের আনাগোনা তেমন হয় না। পুরোহিতরাও এ সময় বিশ্রাম নিতে যান।
আসছে সেই আকর্ষণ। আবার সে এ কথাও ভাবতে লাগল যে রাজা ধরণীন্দ্রবর্মণের বিষ্ণু মন্দিরের আশ্রিতা সে। রাজা বা মন্দিরের কেউ যদি জানতে পারে যে সে ওই মন্দিরে একাকী ভিনদেশি যুবককে নৃত্য পরিবেশন করেছে তবে কোনও অমঙ্গল ঘটবে না তো? রাজরোষ বা পুরোহিতদের রোষানলে পড়বে না তো সে? সারারাত এই দোলাচলের মধ্যে কাটল চম্পার। একদিকে বহ্নি নামক যুবকের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আবার অন্যদিকে রাজা বা পুরোহিতদের রোষানলে পড়ার ভয়। চম্পা বুঝে উঠতে পারছিল না তার কী করা উচিত?
ভোর হল একসময়। প্রতিদিনের মতোই সে কাননে পুষ্প চয়ন করতে বেরল। সে দেখতে পেল রাজপথ ধরে রক্ষী পরিবৃত এক সারি অশ্বশকট যাচ্ছে। শকটগুলোর মধ্যে একটা শকট স্বর্ণ নির্মিত। তাকে ঘিরে চলছে পতাকাবাহকরা। রাজা ধরণীন্দ্রের পতাকা। স্বর্ণ নির্মিত রথ চম্পার চেনা। মহারাজ ধরণীন্দ্রের শকট। ভোরবেলা কোথায় চলেছেন তিনি? একজনকে জিজ্ঞেস করে চম্পা জানতে পারল মহারাজ চলেছেন নির্মীয়মান নগরী পরিদর্শনে। সে স্থানে দু’দিন অতিবাহিত করে তারপর তিনি ফিরবেন মন্দির নগরীতে। এ কথা জানার সঙ্গে সঙ্গেই চম্পার মনে হল, অর্থাৎ এ দিন সন্ধ্যায় তার মন্দিরে সন্ধ্যারতির সময় ডাক আসার সম্ভাবনা নেই। বিকালে সে যেতেই পারে সেই নির্জন মন্দিরে ভিনদেশি যুবকের আহ্বানে। কিন্তু তবুও সে সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। সূর্য ক্রমশ মাথার ওপরে উঠতে শুরু করল। দুপুরও হল এক সময়। এরপর বিকাল হবে। দ্বন্দ্ব চলছে চম্পার মনে। এক সময় তার মনে হল সে মন্দিরের বিগ্রহর সামনে গিয়ে বসলে হয়তো তার মন শান্ত হবে। তারপর সে সিদ্ধান্ত নেবে কী করবে?
নিজের কক্ষ ত্যাগ করে চম্পা গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভগৃহর সামনে। দ্বিপ্রহরের পর থেকে বিকাল পর্যন্ত গর্ভগৃহে লোকজনের আনাগোনা তেমন হয় না। পুরোহিতরাও এ সময় বিশ্রাম নিতে যান। তারপর বিকাল হলে সবাই সে স্থানে ধীরে ধীরে উপস্থিত হয় সন্ধ্যারতির প্রস্তুতির জন্য। এদিনও গর্ভগৃহ প্রাঙ্গণে কেউ নেই। কক্ষের মধ্যে একাকী দণ্ডায়মান ফুলমালা শোভিত শঙ্খ চক্র গদা-পদ্মধারী দেবতা। প্রদীপের আলোয় ঝলমল করছে মূল্যবান পাথর খচিত তার অলঙ্কার। চৌকাঠের সামনে দেবতার উদ্দেশে হাঁটু মুড়ে বসল চম্পা। তারপর চোখ মুদে দেবতার উদ্দেশে বলল, ‘ভগবান তুমি সব জানো। তুমি আমাকে বলে দাও আমার কী করা উচিত?’ এ কথা দেবতার উদ্দেশে বলার পর চোখ মুদে মনকে শান্ত করার জন্য বসে ছিল সে। কিন্তু হঠাৎই তার প্রণামের ভঙ্গিতে জড়ো করা হাতের ওপর নরম কী যেন একটা এসে পড়ল! চোখ খুলে সে দেখল সেটা একটা পদ্ম। ভগবান বিষ্ণুর গলায় যে পদ্মফুলের মালা পরানো আছে তার থেকেই একটা পদ্মফুল এসে পড়েছে হাতে। দেবতার মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে চম্পার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল! তার যেন মনে হল দেবতা তার দিকে চেয়ে হাসছেন? যেন তিনি বলছেন তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হোক। তবে কি দেবতা নিজেই তার দিকে ফুল ছুঁড়ে দিলেন, আশীর্বাদ করলেন? হ্যাঁ, সে কথাই মনে হল চম্পার। বাইরে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে আসছে। এরপর আর চম্পা সেখানে দাঁড়াল না। দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে পদ্মফুলটা বুকে নিয়ে গর্ভ মন্দির ত্যাগ করে নিজের কক্ষে ফিরে এল সে। তারপর নৃত্য প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত পোশাক, ঘুঙুর আর সেই পদ্মফুল নিয়ে রওনা হল মন্দিরের উদ্দেশে।
মন্দিরের সামনে পৌঁছেই সে দেখল তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বহ্নি। সে যেন তারই জন্য প্রতীক্ষা করছিল। চম্পা তার সামনে উপস্থিত হয়ে তাকে প্রথাগতভাবে নমস্কার করতেই বহ্নি হেসে বলল, ‘আমি জানতাম অপরূপা তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। তুমি আসবে।’ চম্পা তার কথা শুনে লজ্জাবোধ করল, ‘সে বলল, ‘চল ভিতরে যাই। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে কেউ আমাদের দেখে ফেলতে পারে।’
চম্পাকে নিয়ে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল বহ্নি। মন্দিরের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব সব অপ্সরাদের মূর্তি। তবে কয়েকটা মূর্তি যে আঘাতপ্রাপ্ত তাও তার চোখে পড়ল। বহ্নি তাকে বলল, ‘চামেদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত এ মন্দিরের মূর্তি অলঙ্করণগুলোকে আবার নবরূপে সাজিয়ে তুলছি আমি। এ মন্দিরে যে বিগ্রহ ছিল তা চামেরা লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে। এই মন্দির প্রাসাদ নতুন করে সেজে ওঠার পর মহারাজ এখানে নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করবেন, হয়তো বা সভাসদদের কাউকে এই মন্দির প্রাসাদ উপহার দেবেন।’
চম্পা জানতে চাইল, ‘এত বড় মন্দির প্রাসাদ তুমি একাকী কীভাবে সাজিয়ে তুলবে। তা কি সম্ভব?’
বহ্নি জবাব দিল, ‘না, একাকী নয়। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই একদল শ্রমিক-ভাস্কর এ স্থানে এসে উপস্থিত হয়। আমার নির্দেশমতো তারা কাজ করে বিকালের আগেই ফিরে যায়। তারপর আমি একাকী থাকি এখানে। কাজের পরিকল্পনা রচনা করি বা একাকী কাজ করি। তারপর সন্ধ্যা নামলে রাজপ্রাসাদের নিকটে আমার বাসস্থানে ফিরে যাই।’
কথা বলতে বলতে তারা দু’জন উপস্থিত হল মন্দিরের ভিতরের অংশের প্রাঙ্গণে। যেখানে একটা স্তম্ভযুক্ত বেদী দেখতে পেল চম্পা। নৃত্য বেদী। যেখানে নৃত্য পরিবেশন করত নতর্কীরা। বেদীর পিছনের অংশে কয়েকটি কক্ষও রয়েছে। বেদী থেকে একটা ক্ষুদ্র সাঁকোও সংযুক্ত আছে কক্ষগুলোর সঙ্গে। কক্ষ থেকে যে পথ বেয়ে নর্তকীরা মর্তে যাওয়া আসা করত। সেই কক্ষগুলো দেখিয়ে ভাস্কর বহ্নি বলল, ‘ওই কক্ষে গিয়ে তুমি উপযুক্ত সাজ গ্রহণ করতে আমি পার, তোমার জন্য প্রতীক্ষা করছি।’”
খামের যুবতি এ পর্যন্ত কথা বলে একটু থামল। সে সুযোগে স্বাগত তাকে প্রশ্ন করল, ‘কই, আমাদের মন্দিরে তেমন কোনও নৃত্যমঞ্চের অস্তিত্ব নেই তো?’
খামের যুবতী বলল, ‘না, তা আর আজ নেই। ধরণীন্দ্রবর্মণের আমলেই বিশেষ কারণবশত পরবর্তীকালে ওই মন্দিরের অনেক পরিবর্তন সাধন করা হয়। ওই মঞ্চসহ বেশ কিছু স্থান ভেঙে ফেলা হয়, কিছু মূর্তি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নতুন মূর্তি রচনা করা হয়। মহারাজের নির্দেশে সে কাজ করেছিল বাস্তুকার বহ্নি।’
এ কথা বলার পর আবার তার কাহিনিতে ফিরে এল খামের যুবতী—
“কিছুক্ষণের মধ্যেই নাচের পোশাকে সজ্জিত হয়ে সাঁকো বেয়ে নৃত্যমঞ্চে উপস্থিত হল নর্তকী চম্পা। বেলা শেষের সূর্যের আভা তখন এসে পড়েছে নৃত্যমঞ্চে। চম্পার হাতে ধরা সেই পদ্মফুল। ভগবান বিষ্ণুকে যে নৃত্যভঙ্গিতে নর্তকীরা পুষ্প নিবেদন করছে এইরূপ নৃত্যশৈলীতে যেন চম্পা বাস্তুকারকেও পুষ্প নিবেদন করছে। এমন নৃত্যশৈলীতে নৃত্য পরিবেশন করতে শুরু করল চম্পা। তার ঘুঙুরের শব্দ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সেই নির্জন মন্দির চত্বরে। মঞ্চের সামনে পাথরের আসনে বসে অপলক দৃষ্টিতে সেই নৃত্য প্রত্যক্ষ করতে লাগল ভিনদেশি যুবক বহ্নি। একের পর এক নৃত্য পরিবেশন করে চলল নর্তকী চম্পা। নৃত্যকলা সম্পর্কে তার যতটুকু জানা আছে, যতটুকু দক্ষতা আছে তার সব কিছু যেন উজাড় করে ঢেলে দিতে লাগল যুবকের উদ্দেশে। তার সেই নৃত্য দেখে সবার অলক্ষে যেন ভগবান বিষ্ণুও হাসলেন। চম্পা যখন নৃত্য শেষ করল তখন বিষ্ণুলোকের আড়ালে সূর্য অস্তমিত হয়েছে। বাকরুদ্ধ বহ্নি। তার মনে হতে লাগল এতক্ষণ যার নৃত্য দেখল সে কোনও মানবী নয়, স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনও অপ্সরা যেন তার সামনে নৃত্য প্রদর্শন করল। গোধূলির শেষ আলোটুকু তখনও মুছে যায়নি। মঞ্চ থেকে নেমে চম্পা সেই পদ্মফুলটা তুলে দিল ভাস্করের হাতে।
সংবিৎ ফিরে পেতে বেশ কিছুটা সময় লাগল বহ্নির। তারপর সে বলল, ‘তুমি কি সত্যি কোনও রক্ত মাংসের মানবী নাকি অপ্সরা বা যক্ষী? মানবীর শরীর ধারণ করে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছ?’
চম্পা বলল, ‘আমি অতি সামান্য এক নর্তকী। অপ্সরা হলে কি আমি নাগপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারতাম না? তাদের অনেক ভগবান প্রদত্ত ক্ষমতা থাকে। প্রেত-যক্ষী-স্বর্গের অপ্সরা আমি কোনওটাই নই। আমি একজন রক্ত মাংসর নারী, আপনি তো আমাকে সর্পের কবল থেকে রক্ষা করার পর স্পর্শ করে দেখেছেন। প্রয়োজনে আবার স্পর্শ করে দেখুন আমি রক্ত মাংসের মানুষ কি না?’
শেষ বাক্যটা নেহাতই কথার কথা বলেছিল চম্পা। কিন্তু যুবক বহ্নি চম্পার হাত দুটো স্পর্শ করল। সেই স্পর্শে যেন শিহরন খেলে গেল চম্পার শরীরে। হয়তো বা একই ঘটনা ঘটল বহ্নির ক্ষেত্রেও। পরস্পরের হাত ধরে বেশ কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল তারা। যখন অন্ধকার নামল তখন সংবিৎ ফিরল তাদের।
চম্পা বলল, ‘এবার আমাকে ফিরতে হবে।’
কিছুক্ষণের মধ্যে মন্দির ত্যাগ করল চম্পা। অন্ধকার পথে তাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য বহ্নি চলল তার সঙ্গে। ওই মন্দিরের পশ্চাৎভাগ থেকে একটা সড়ক ছিল, সে পথেই চলল তারা। সে সময় বিষ্ণুলোকের সঙ্গে কাছাকাছি মন্দির প্রাসাদগুলো পাথুড়ে সড়ক দিয়ে সংযুক্ত ছিল। আর মন্দিরগুলোর সম্মুখ ভাগে প্রধান সড়ক তো ছিলই। রাত্রিকালে প্রধান সড়ক মশালের আলোতে উজ্জ্বল থাকত। শকট, লোকজন চলাচল করত। নির্জনতার কারণেই, লোকজনের চোখে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম বলে সে পথ ধরেই এগল তারা দু’জন…।”
এ পর্যন্ত শোনার পর স্বাগত বলল, ‘বিষ্ণুলোকের শীর্ষদেশের এক কক্ষ থেকে জঙ্গলের মধ্যে থেকে মাথার সিঁথির মতো অমন একটা পথে আমাদের মন্দিরের দিকে এগতে দেখেছি।’
যুবতী বলল, ‘হ্যাঁ, ওই সেই প্রাচীন পথ। যা গিয়ে
যুবতী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘পশ্চাৎভাগে মন্দিরে প্রবেশের ওই পথ মহারাজের সময় পাথর গেঁথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে সে পাথর খসে গিয়ে মন্দিরে প্রবেশের পথ সৃষ্টি হয়েছে।
মন্দিরের পশ্চাৎভাগে শেষ হয়েছে। যদিও স্থানে স্থানে আজ মুছে গেছে।’
স্বাগত জিজ্ঞেস করল, ‘ও পথ দিয়ে এখনও মন্দিরে প্রবেশ করা যায় নাকি?’
যুবতী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘পশ্চাৎভাগে মন্দিরে প্রবেশের ওই পথ মহারাজের সময় পাথর গেঁথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে সে পাথর খসে গিয়ে মন্দিরে প্রবেশের পথ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঝোঁপ জঙ্গল আর পাথর খণ্ডের ওই পথ দিয়ে তুমি কখনও মন্দিরে প্রবেশের চেষ্টা করো না। তাতে তোমার বিপদ হতে পারে। ওই প্রাচীন প্রবেশমুখের ভিতর সাপ থাকতে পারে, মাথার ওপর থেকে পাথর খসে পড়তে পারে, সে পথ অন্ধকার, আর তাছাড়া…।’ এই বলে থামল সে।
স্বাগত জানতে চাইল, ‘তাছাড়া আর কী?’
এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে খামের যুবতী বলল, ‘ও পথ তোমার পক্ষে বিপদজ্জনক। তাই তোমাকে সাবধান করে দিলাম।’ এরপর স্বাগতকে আর প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে খামের যুবতী আবার ফিরে এল তার মূল কাহিনিতে— ‘তারা দু’জন সেই নির্জন পথ ধরে হাঁটতে লাগল। নিজেদের জীবন সম্পর্কে তারা কথা বিনিময় করতে লাগল। বহি তাকে জানাল তার পিতা-মাতা কেউ জীবিত নেই। তাই তার পিছুটান নেই বলে সমুদ্রপথ অতিক্রম করে এত দূরে সে উপস্থিত হয়েছে অর্থ উপার্জনের জন্য। সে অবিবাহিত। ইচ্ছা আছে এ স্থান থেকে অর্থ উপার্জন করে জম্বুদ্বীপে ফিরে গিয়ে তারপর বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হবে সে।
চম্পা জানতে চাইল, ‘নিজ দেশে কি বিবাহর জন্য তোমার কন্যা নির্বাচন করা আছে?’
বহ্নি বলল, ‘না, তেমন কেউ তো নির্বাচন করা ছিল না। তবে…।’
‘তবে কী?’ জানতে চাইল চম্পা।
জবাব না দিয়ে বহ্নি শুধু হাসল।
এক সময় পথ শেষ হয়ে গেল। বিষ্ণুলোকের বাইরের প্রাকারের প্রদীপ মালাগুলো দেখা যেতে লাগল। চম্পাকে এবার বিদায় নিতে হবে। ঠিক সেই সময় বহ্নি বলল, ‘তুমি আমাকে নৃত্য প্রদর্শন করলে, কিন্তু কোনও উপহার তো তোমাকে দেওয়া হল না।’
চম্পা জবাব দিল, ‘আমি তো কোনও উপহারের প্রত্যাশায় নৃত্য প্রদর্শন করিনি। উপহারের আমার প্রয়োজন নেই। অন্য নতর্কীদের মতো অলঙ্কার বা স্বর্ণমুদ্রায় আমার কোনও আকর্ষণ নেই। আমার ফুল মালাই ভালো।”
চম্পার নির্লোভ ব্যবহারে খুশি হল বহ্নি। বিদায় মুহূর্তে বহ্নি বলল, ‘আমি কিন্তু আবারও তোমার প্রতীক্ষায় রইলাম।’
বহ্নির কথার জবাবে নতর্কী চম্পা বলল, ‘আমি আবার আসব।’
সে রাতে ঘরে ফিরে চম্পার ঘুম হল না। বহ্নির স্পর্শ যেন চম্পার হাতে লেগে আছে। নিজের অঙ্গুলি চুম্বন করতে লাগল চম্পা। আর বহ্নিও চম্পার উপহার দেওয়া পদ্মফুল বুকে জড়িয়ে বিনিদ্র রজনী যাপন করতে লাগল।
বহ্নির অমোঘ আকর্ষণে পরদিন আবারও মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হল চম্পা। আবারও সে নৃত্য পরিবেশন করল। মোহিত হয়ে তা প্রত্যক্ষ করল বহ্নি। দু’জনের পরিচিতি পরিণত হল গভীর প্রেমে। পতঙ্গ যেমন বহ্নির দিকে প্রবল আকর্ষণে ধাবিত হয় তেমনই সবার অলক্ষে মিলিত হতে লাগল তারা দুই জন।
একদিন বহ্নি চম্পাকে বলল, ‘এতদিন হয়ে গেল তুমি তো আমার থেকে কোনও দিন কোনও উপহার গ্রহণ কর না। তবে আমি ভেবেছি তোমাকে এমন উপহার দেব যা তুমি প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।
মানুষ তো অমর নয়, এই পৃথিবী ছেড়ে আমাদের একদিন চলে যেতে হবে। কিন্তু সেই উপহার যুগ যুগ ধরে রয়ে যাবে। হাজার বছর পরও তার মধ্যে বেঁচে থাকবে আমাদের ভালোবাসা।”
