বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৪
পর্ব ৩৪
আর ঘুমাল না। দেখতে দেখতে বিকেল হল একসময়। স্বাগত বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই খামের যুবতীর কথা শোনার জন্য অদৃশ্য টান অনুভব করল। পাঁচটা বাজার পর আবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল স্বাগত। সে তাকাল আকাশের দিকে। আবার খণ্ডখণ্ড মেঘ ভাসছে আকাশে। অর্থাৎ গত দু’দিনের মতোই সন্ধ্যায় বা রাতে আবার বৃষ্টি নামবে। স্বাগত প্রফেসরের ঘরের এদিকে তাকিয়ে দেখল তাঁর জানলার একটা পাল্লা খোলা। হয়তো বা রামমূর্তি ঘরের ভিতর থেকে দেখছেন তাকে। রোজ একই সময় স্বাগত কোথায় যায় সেটা দেখে রামমূর্তি স্যরের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। হয়তো বা জেগেওছে। ইতিমধ্যে একদিন তিনি এ ব্যাপার নিয়ে স্বাগতকে প্রশ্ন করেছিলেন, আর গতকাল নিজেই তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি যদি স্বাগতকে চত্বর ছেড়ে যেতে দেখে সন্দেহ প্রকাশ করে, তাকে অনুসরণ করেন তবে সমস্যা হতে পারে। তাই স্বাগত চত্বরটার এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করতে শুরু করল। কিন্তু সময় যত এগতে থাকল, ততই খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য স্বাগতর মন ছটফট করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত একটা কৌশলের আশ্রয় নিল। সে সোজা রামমূর্তির ঘরের জানলার কাছে গিয়ে বলল, ‘স্যর কী কাজ করছেন?’
রামমূর্তি জানলার কাছে এসে বললেন, ‘কী ব্যাপার? কিছু বলবে?’
স্বাগতকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল। সে বলল, ‘আমি একটু বিষ্ণুলোকের দিকে যাব। ভিতরে ঢুকব না। দেখব সূর্যাস্তের সময় জায়গাটা কেমন লাগে?’ আশা করছি পথ চলতি গাড়ি পেয়ে যাব নিশ্চয়ই। রামমূর্তি বললেন, ‘যাও, তবে অন্ধকার নামার আগেই ফিরে এস। মনে হচ্ছে আজও বৃষ্টি নামবে।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি, অন্ধকার নামার আগেই ফিরব।’
এরপর সে আর দাঁড়াল না। চত্বর অতিক্রম করে নেমে পড়ল জঙ্গলের পথে। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গেল সে। চারপাশে অন্য দিনের মতো আজও কোনও লোকজন নেই। তবে গত রাতের বৃষ্টির জল মাটি থেকে এখনও শুকোয়নি। আর ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে। স্বাগত দেখল সেই খামের যুবতী নর্তকীর মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছে। স্বাগত তার কাছাকাছি যেতেই সে ফিরে তাকাল স্বাগতর দিকে, তারপর সে স্থান ছেড়ে এগল গাছে ঘেরা জায়গাটার দিকে। স্বাগত তাকে অনুসরণ করল। গাছগুলোর আড়ালে কিছুটা তফাতে মুখোমুখি পাথরের ওপর বসল তারা রোজ যেমন বসে। যুবতী তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যে রোজ আমার কাছে আসো, আমার গল্প শোনো সে কথা তুমি কাউকে বলেছ? বিশেষত আমার মুখে শোনা কাহিনির কথা?’
স্বাগত বলল, ‘না, তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের কথা বা গল্পের কথা আমি কাউকে বলিনি। কিন্তু কেন বল তো?’
খামের যুবতী বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি যে কাহিনি তোমাকে বলছি সে কাহিনি অন্য কেউ জেনেছে বা জানে। আমার অনুমান যদি সত্যি হয় তবে ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসতে চলেছে।’
—‘কী বিপদ?’ প্রশ্ন করল স্বাগত।
যুবতী বলল, ‘ভয়ঙ্কর বিপদ। সে বিপদ থেকে যেভাবেই হোক মুক্তির রাস্তা খুঁজতে হবে।’
স্বাগত বলল, ‘বিপদটা সম্পর্কে যদি না জানি তবে মুক্তি পাওয়ার উপায় খুঁজব কীভাবে?”
মেয়েটা বলল, “আমার কাহিনি শেষ না হলে তুমি তা বুঝতে পারবে না। আচ্ছা আমার কাহিনি শুনতে শুনতে তোমার কেমন অনুভূতি হয়?’
স্বাগত বলল, “ভালোই লাগে। বিশেষত আমাদের মন্দিরের প্রসঙ্গ তোমার কাহিনিতে উঠে আসায় কাহিনির প্রতি আমার বাড়তি আগ্রহ জন্মাচ্ছে। না হলে কি আর রোজ এখানে আসি?”
সেই নারী জিজ্ঞেস করল, “কখনও কি তোমার মনে হয় যে, এ কাহিনি তুমি আগে শুনেছ?”
স্বাগত বলল, ‘না, তেমন মনে না হলেও তোমার কাহিনি আমার মনে ছাপ ফেলছে। এই যেমন কাল রাতেই একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম।’ এ কথা বলে সে স্বপ্নে কী দেখেছে তা সংক্ষেপে ব্যক্ত করে হাসল তার দিকে তাকিয়ে। যুবতী কিন্তু হাসল না। সে বলল, ‘আমার কাহিনিটা শেষ করতে হবে। এমন হতে পারে হঠাৎই কোনও কারণে তোমার বা আমার সাক্ষাৎ হয়তো বন্ধ হয়ে গেল। তাই আর সময় নষ্ট না করে সেটাই শুরু করছি।”
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, বল?’
সে এরপর বলল, ‘তোমাকে বলেছিলাম যে, এক সন্ধ্যায় মন্দিরে নৃত্য প্রদর্শনের পর উগ্রদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল নর্তকী চম্পার। পরদিন সে সেই ঘটনা জানাল ভাস্কর বহ্নিকে। বহ্নির মুখ থেকে চম্পা শুনল মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন কেন বিশেষ খাতির করেন উগ্রদেবকে। তারপর তারা দু’জন ধরণীন্দ্রবর্মনের স্তুতি করে প্রেমালাপে মত্ত হয়েছিল। আর তার পরদিন ঘটল একটা ঘটনা।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, এখানেই তুমি কাহিনি শেষ করেছিলে সে ঘটনার কথা বলবে বলে।’
খামের কন্যা বলতে শুরু করল, “আগেই তোমাকে বলেছি যে, চম্পার সঙ্গে অন্য নর্তকীদের তেমন মেলামেশা ছিল না। চম্পা অজ্ঞাতকুলশীল অথবা সে একদা চামেদের সংস্পর্শে ছিল বলে, অথবা ঈর্যান্বিত হয়ে তাকে এড়িয়ে চলত মন্দিরের অন্য নর্তকীরা। পরদিন ভোরবেলা পুষ্পচয়ন করে নিজের কক্ষে বসে মালা গাঁথতে গাঁথতে চম্পা ভাবছিল তার প্রিয়তমের কথা। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে সে দেখতে পেল মন্দিরেরই এক নর্তকী দাঁড়িয়ে আছে। আর তার সঙ্গে এক বৃদ্ধা। নর্তকীর নাম ভ্রামরী। কক্ষে বৃদ্ধাকে নিয়ে প্রবেশ করে সে বলল, ‘ভাবি, তোমার সঙ্গে একদিন সাক্ষাৎ করতে আসব, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। আজ আমার মাতৃদেবী আমার কাছে এসেছেন। তাই তাঁকে নিয়ে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চলে এলাম। হয়তো সর্বসমক্ষে কোনওদিন বলতে পারিনি। কিন্তু তোমার নৃত্য দেখে আমি মুগ্ধ। জানি না, তোমার মতো কোনওদিন নৃত্যে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারব কি না।’ নর্তকীরা কোনও দিন কেউ সম্ভবত ঈর্ষার কারণেই চম্পার সামনে তার নৃত্যের প্রশংসা করা দূরে থাক অতি প্রয়োজন ছাড়া বাক্যালাপও করে না তার সঙ্গে। ভ্রামরী নামের নর্তকী তাঁর মাকে সঙ্গে করে তাঁর কক্ষে সাক্ষাৎ করতে আসায়, তার নাচের প্রশংসা করাতে খুশি হল চম্পা। বৃদ্ধাকে প্রণাম জানিয়ে চম্পা তাঁদের আসন গ্রহণ করতে অনুরোধ করল। ভ্রামরী বসার আগে দরজার কপাটটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল। কাষ্ঠাসনে বসল তারা দু’জন। ভ্রামরী বলল, ‘তোমার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করতে এলাম, কিছু উপহার তো তোমাকে দেওয়া প্রয়োজন। তবে আমার ক্ষমতা খুব সীমিত। তুমি এই উপহার গ্রহণ কর’- —এ কথা বলে সে তার মধ্যমা থেকে একটি সর্বাঙ্গুরীয় খুলে বাড়িয়ে দিল চম্পার দিকে। সর্পাঙ্গুরীয়, অর্থাৎ সাপের মতো দেখতে। তার মাথায় একটা সবুজ পান্না। এই অযাচিত উপহার গ্রহণ করার জন্য চম্পা প্রস্তুত ছিল না। যে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে বলল, ‘এত মূল্যবান উপহার গ্রহণ করতে আমি অক্ষম। তাছাড়া আমি ফুলমালা ছাড়া অন্য অলঙ্কার ধারণ করি না। তুমি তোমার মাতাকে নিয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছ। এটাই আমার কাছে সব থেকে আনন্দের ব্যাপার, বড় উপহার।’
নর্তকী ভ্রামরী বলল, ‘তুমি উপহার গ্রহণ না করলে আমি দুঃখ পাব।’
চম্পা হাতে না নেওয়াতে ভ্রামরী সেটা তাকে দেওয়ার জন্যই হাত বাড়িয়ে দেওয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখল। ভ্রামরী এরপর তার কথা শুরু করল। সে বলল ‘আমার মা তোমার অপূর্ব নৃত্যশৈলীর কথা আমার কাছ থেকে শুনেছেন। মা ছাড়া আমার অন্য কেউ নেই। পিতার মৃত্যু ঘটেছে। উনিও তোমাকে দেখতে আগ্রহী
ছিলেন তাই সঙ্গে আনলাম।’
বৃদ্ধা জানতে চাইলেন, ‘শুনেছি, তুমি নাকি চাম দেশীয় কন্যা? তা কি সঠিক?’
চম্পা নিজের পরিচয়ের বিস্তৃত ব্যাখ্যা না দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি সে দেশ থেকেই এদেশে এসেছি।’
ভ্রামরী এরপর চম্পার নৃত্যশৈলীর প্রশংসা আর তাঁর মায়ের রূপের প্রশংসা শুরু করল। তাদের কথাগুলো ভালোই লাগছিল চম্পার শুনতে। প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। চম্পাও তাদের সঙ্গে বাক্যালাপে যোগ দিল। একসময় ভ্রামরী বলল, ‘আমার মা একজন রাজপার্ষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চায়, কীভাবে তা করা যায় বল তো?’
চম্পা জানাল, ‘তাঁরা তো রাজসভাতে যান। সেখানে গেলে সম্ভবত তাঁদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। অথবা তাঁদের গৃহে।’
ভ্রামরী বলল, ‘একজন বিধবা নারীর পক্ষে রাজসভাতে যাওয়াটা ঠিক শোভনীয় নয়। আর রাজপার্ষদ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গল ছাড়া অন্যদের গৃহে সাক্ষাৎ করার জন্য আগাম অনুমতির প্রয়োজন হয়। নাহলে দ্বাররক্ষীরা কিছুতেই তাঁদের মন্দির প্রাসাদে অপরিচিতদের প্রবেশ করতে দেয় না, পাছে কোনও চাম গুপ্ত ঘাতক প্রাসাদে ঢুকে তাঁদের হত্যা করার চেষ্টা করে সেজন্য।’
চম্পা বলল, ‘তাহলে তোমরা মহামঙ্গলের সঙ্গে গিয়েই সাক্ষাৎ কর। যতদূর জানি তিনি দয়ালু ব্যক্তি। ভগবান বুদ্ধর ভাবনাকে অনুসরণ করে তিনি পরিচিত-অপরিচিত সকলের সঙ্গেই মধুর ব্যবহার করেন। তাদের সেবা করার চেষ্টা করেন।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘না, তার সঙ্গে দেখা করলে হবে না। আমার প্রয়োজন অন্য এক রাজপার্ষদের সাক্ষাৎ করার।’
‘কে তিনি?’ জানতে চাইলে চম্পা।
বৃদ্ধা জবাব দিলেন, ‘তিনি উগ্রদেব।’
ভ্রামরী এরপর বলল, ‘তুমি যদি আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর একটা গোপন সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দাও তবে তোমার কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকব। যে কোনও প্রয়োজনে তোমার পাশে থাকব।’
চম্পা বলল, ‘আমি কীভাবে তাঁর সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করাব?’
ভ্রামরী বলল, ‘তাঁর সঙ্গে যে তোমার বিশেষ পরিচয় আছে তা আমি দেখেছি। দু-দিন আগে তিনি মহারাজের সঙ্গে মন্দিরে সন্ধ্যারতি দেখতে এসেছিলেন। আরতি শেষ হলে সবাই চলে গেলে তিনি তোমার জন্য দ্বার প্রান্তে প্রতীক্ষা করছিলেন। তারপর তুমি এলে। তাঁর সঙ্গে তোমার বাক্যালাপ হল। তিনি তোমাকে কিছু একটা উপহার দিলেন। তারপর চলে গেলেন। আমি কিছুটা দূরেই একটা স্তম্ভর পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি। দোহাই তোমার, তুমি তাঁর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দাও, আমরা কাউকে কিছু জানাব না ৷’
এবার ভ্রামরী ও তার মায়ের আগমনের কারণ ও তাকে সর্বাঙ্গুরীয় উপহার দেওয়ার কারণটা বুঝতে পারল চম্পা। সে বলল, ‘আমার সঙ্গে সভাসদ উগ্রদেবের ওই দিনই প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি আমার নাচের প্রশংসা করলেন এবং একটি মুদ্রা দান করলেন। আমার সঙ্গে তাঁর কোনও বিশেষ পরিচয় নেই, আমি কোনও দিন তাঁর প্রাসাদে যাইনি বা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিনি। তাঁর প্রাসাদ কোথায় অবস্থিত তা আমার জানা নেই।’
চম্পার এ কথা শুনে ভ্রামরী আর তাঁর মায়ের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। ভ্রামরী বলল, ‘তুমি সত্যি বলছ?’
চম্পা বলল, ‘আমি ভগবান বিষ্ণুর নামে শপথ করে বলছি তাঁর সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই।’
বিষ্ণুলোকের বাসিন্দারা কেউ ভগবান বিষ্ণুর নামে শপথ নিয়ে মিথ্যা কথা বলে না। সে বুঝতে পারল তার ভ্রম হয়েছে। একটা আতঙ্কও যেন ফুটে উঠল মাতা ও কন্যার মুখে। কক্ষ ত্যাগ করার জন্য উঠে দাঁড়াল তারা। চম্পা বলল, ‘অঙ্গুরীয়টা তুমি নিয়ে যাও।’
ভ্রামরী বলল, ‘ওটা তোমাকে ফেরত দিতে হবে না। আমাদের বাক্যালাপের কথা মন্দিরের কেউ যেন জানতে না পারে।’
চম্পা জবাব দিল, ‘সে ব্যাপারে তুমি নিশ্চিন্ত থাক। কিন্তু অঙ্গুরীয় আমি নেব না৷ – এই বলে যে কুলুঙ্গি থেকে সবুজ পান্না খচিত সেই সর্পাঙ্গুরীয়টা ভ্রামরীর হাতে গুঁজে দিল। এরপর তারা আর দাঁড়াল না। সেই কক্ষ ত্যাগ করল। ঘটনাটা বেশ অবাক করল চম্পাকে।
একদিন পরই চম্পার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল ভাস্কর বহ্নির। সে ভ্রামরীর আগমনের কাহিনি সবিস্তারে জানাল বহ্নিকে। সে শুনে বলল, ‘ভালো করেছ তুমি ওই উপহার প্রত্যাখ্যান করে। উগ্রদেবের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ করার পিছনে নিশ্চয়ই কোনও গূঢ় কারণ আছে। যা জানাজানি হলে তারা বিপদে পড়তে পারে। যে কারণে তুমি উগ্রদেবের সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ করাতে অক্ষম জানার পরও তারা তোমার মুখ বন্ধ রাখার জন্য ওই পান্না খচিত সর্পাঙ্গুরীয় তোমাকে দিতে চেয়েছিল।’
চম্পা প্রশ্ন করল, ‘কী এমন গোপন ব্যাপার হতে পারে সেটা?’
একটু ভেবে নিয়ে বহ্নি বলল, ‘হয়তো এমন কোনও ব্যাপার, যা মহারাজের কানে গেলে তাদের বিপদ হতে পারে।
এমনও হতে পারে মহারাজের বিরুদ্ধে কোনও চক্রান্ত শুরু হয়েছে।’
কথাটা শুনে চম্পা ভয় পেয়ে গেল। সে বলল, “আমি একা নারী। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন আমার প্রাণ রক্ষা করেছেন। বলা যেতে পারে আমি তাঁর আশ্রিতা। এই অচেনা দেশে তুমি ছাড়া আমার কোনও বন্ধু নেই। এ রাজ্যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে কে রক্ষা করবে আমাকে? শুনেছি, চামেদের আক্রমণের সময় বিষ্ণুলোকের নর্তকীরা নির্যাতিতা হয়েছিল, তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছিল, পরিখার কুমিরের মুখে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল!’
তার কথা শুনে ভাস্কর বহ্নি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সে বলল, ‘শোন চম্পা। আর তিন মাসের মধ্যেই আমার কাজ শেষ হয়ে যাবে। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের পঞ্চাশতম জন্মদিবস। সে উপলক্ষে বিষ্ণুমন্দিরের উৎসব হবে। তার আগেই মন্দির সংস্কারের কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি—’
বহ্নির কথা শেষ হওয়ার আগেই চম্পা শঙ্কিতভাবে বলল, ‘তারপরই কি জম্বুদ্বীপে ফিরে যাবে তুমি?’
বহ্নি আর চম্পা কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল পরস্পরের দিকে। বহ্নি দেখল, বিচ্ছেদের আশঙ্কায় চম্পার চোখ ছলছল করছে। কিন্তু বহ্নির ঠোঁটে এরপর হাসি ফুটে উঠল, সে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি ফিরে যাব, কিন্তু তোমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাব সেই সুন্দর দেশে। আমরা বিবাহ করব। ঘর বাঁধব সেখানে। অবশ্য তুমি যদি আমাকে বিবাহ করতে চাও।’
বহ্নির কথা শুনে আনন্দ-বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল চম্পা। মুহূর্তের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কাতে তার চোখে জমতে থাকা বেদনার অশ্রু আনন্দাশ্রুতে পরিণত হয়ে ঝরতে শুরু করল। সে বহ্নির হাত দুটো আঁকড়ে ধরে বলল, ‘তুমি সত্যি বলছ ভাস্কর?’ বহ্নি বলল, ‘হ্যাঁ। সত্যি বলছি। আর মাত্র তিন মাস প্রতীক্ষা কর তুমি। আমি মহারাজের কাছ থেকে আমার প্রাপ্য অর্থের পরিবর্তে তোমাকেই চেয়ে নেব।’
‘তিনি যদি তাতে রাজি না হন?’ জানতে চাইল চম্পা৷
বহ্নি বলল, ‘তাহলে আমরা গোপনে নগরী ত্যাগ করব।
একবার সমুদ্রে ভেসে গেলে তিনি নিশ্চয়ই একজন নর্তকীর জন্য তাকে ধরে আনতে নৌবহর পাঠাবেন না। তার বদলে তিনি বহু সংখ্যক নর্তকী ক্রয় করতে পারবেন।’
চম্পা আবার প্রশ্ন করল, ‘ভগবান বিষ্ণু কি ক্রুদ্ধ হবেন না তাতে? আমি তো তাঁকে নৃত্যপ্রদর্শন করি।’
ভাস্কর বহ্নি বললেন, ‘না, তিনি রুষ্ট হবেন না। তিনি তো ভালোবাসারই দেবতা, তাঁর এক রূপ তো কৃষ্ণ। দেবতা সর্বত্র বিরাজমান। জম্বুদ্বীপেও তাঁর প্রচুর মন্দির আছে। আমি নিজ হাতে তাঁর মূর্তি রচনা করব জম্বুদ্বীপে। তাঁর সামনে নৃত্য পরিবেশন করবে তুমি।’ -এ কথা বলে বহ্নি আলিঙ্গন করল তাকে। নিভৃত মন্দির প্রাঙ্গণে চুম্বন চুম্বনে পরস্পরকে ভরিয়ে দিতে থাকল তারা।”
–এ পর্যন্ত বলে খামের রমণী থামল। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বৃষ্টি আজও নামবে। এই বৃষ্টির রাতগুলোই বড় ভয়ঙ্কর! স্বাগতও আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল, খণ্ডখণ্ড মেঘগুলো আবার একসঙ্গে জড় হচ্ছে। খামের যুবতী বলল, ‘যতদূর সম্ভব এগিয়ে রাখি গল্পটা। বলা যেতে পারে আসল কাহিনির শুরু এখান থেকেই।’ এ কথা বলে সে আবার শুরু করল—
“সময় এগিয়ে চলল। মহারাজের নির্দেশে সর্বত্রই দ্রুত গতিতে মন্দির সংস্কার নতুন রাজধানী নির্মাণের কাজ চলছে। ভাস্কর বহ্নিও ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার কাজে। তবু তারই মধ্যে সে আর চম্পা সাক্ষাৎ করল। চম্পা এখন স্বপ্নে বিভোর। কবে কাজ শেষ হবে ভাস্করের? কবে সে পাড়ি দেবে জম্বুদ্বীপের পথে।——এই চিন্তাই করত সে। মনে মনে সে ভগবান বিষ্ণুকে প্রার্থনা জানাত, ‘হে ভগবান, তুমি আমাদের আশীর্বাদ কর।’
কিন্তু ভগবানের মনের কথা সাধারণ মানুষের জানা থাকে না। ঈশ্বর কী করেন, কেন করেন তা একমাত্র তিনিই বলতে পারেন। তাই হয়তো কিছু দিনের মধ্যেই একটা অন্যরকম ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটল। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের জন্মোৎসবের আর মাস খানেক মাত্র বাকি। মহারাজ নিজেও ব্যস্ত সে উৎসবের আয়োজন নিয়ে। বিশেষত মন্দির নগরীর সৌন্দর্যায়ন নিয়ে। কারণ, সারা দেশ থেকে অতিথি অভ্যাগতরা এসে উপস্থিত হবে মন্দির নগরীতে। শুধু বিষ্ণুমন্দির নয়, মন্দির নগরীর অন্যসব মন্দির দেখেও যেন তারা চমৎকৃত হয় তার জন্যই সচেষ্ট তিনি। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন নিজেই বিভিন্ন মন্দিরে উপস্থিত হচ্ছেন কাজের অগ্রগতি চাক্ষুষ করার জন্য। তেমনই একদিন তিনি গিয়ে উপস্থিত হলেন ভাস্কর যে মন্দিরে কাজ করছে সে মন্দিরে। তিনি বহ্নির কাজ দেখে চমৎকৃত হয়ে বললেন, ‘শুনেছিলাম, জম্বুদ্বীপের ভাস্কররা মন্দির নির্মাণে অত্যন্ত দক্ষ। সে কারণে তিনি বিষ্ণুলোক নির্মাণের সময় জম্বুদ্বীপ থেকে ভাস্কর এনেছিলেন। সেই সত্য আবার প্রমাণিত হল। এই মন্দির দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না যে একদিন চামেদের আক্রমণে মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অপূর্ব তোমার শিল্প রচনা। আমার জন্ম উৎসবের দিন আমি কিছু মানুষকে পুরস্কৃত করব। তোমাকেও করব। তুমি ভেবে রেখ তুমি কী চাও? তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করব আমি।’
