বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৫
পর্ব ৩৫
হারাজের কথা শুনে তাঁকে প্রণাম জানাল ভাস্কর। সে মনে মনে বলল, ‘আপনার থেকে আমার প্রেয়সীকে চেয়ে নেব আমি।’
তবে মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। ওই মন্দির পরিদর্শন করে যখন ধরণীন্দ্রবর্মন তাঁর প্রাসাদে ফিরলেন তখন বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামতে চলেছে। প্রাসাদে ফিরে তিনি শুনলেন কাকোদর নামে এক ধীবর মহারাজের সাক্ষাৎপ্রার্থী। তাঁর কাছে মহারাজের পাঞ্জার ছাপ আছে। অর্থাৎ মহারাজের সঙ্গে যেকোনও সময় সাক্ষাৎ করতে পারে। প্রাসাদের প্রধান রক্ষী বড়ই আশ্চর্য হয়েছে তার কাছে মহারাজের পাঞ্জা দেখে। মহারাজ তাঁর সিংহাসন আরোহণের পর সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন। কাকোদর তেমনই এক ব্যক্তি যে ধীবরের ছদ্মবেশে মেকং নদীতে ঘুরে বেড়াত। মহারাজ তাঁর আগমনের খবর পেয়েই তৎক্ষণাৎ তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিতে বললেন গুপ্ত কক্ষে।
কাকোদর মহারাজকে বলল, ‘মেকং নদীর এক নির্জন পাড়ে একটা শূন্য নৌকার সন্ধান মিলেছে। সেই নৌকার অগ্রভাগে কাষ্ঠ নির্মিত জলদানবের মাথা আছে। চামেদের নৌকায় যেমন থাকে। খুব বড় নৌকা নয়। আট-দশ জন মানুষ ধরতে পারে তেমন নৌকা। আমার অনুমান তারা আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করেছে। এ সংবাদটা মহারাজকে জানাতে এলাম।’
গুপ্তচরের সঙ্গে আরও কিছু কথাবার্তা বলে তাঁকে পারিতোষিক দিয়ে বিদায় জানাবার পর মহারাজ ব্যাপারটা নিয়ে বেশ ভাবিত হয়ে পড়লেন। আট-দশজন চাম রাজ্যের দখল নিতে পারবে না ঠিকই, কিন্তু তারা ভবিষ্যতে এ রাজ্য আক্রমণের পরিকল্পনা রচনার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করেছে হয় তো। আর একটা ব্যাপারেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তারা গুপ্ত হত্যায় পটু। এ সব ব্যাপার ভেবে নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন পার্ষদদের নিয়ে আলোচনায় বসবেন। আগামী উৎসবের বিষয় নিয়ে আলোচনা করার পাশাপাশি তিনি চামেদের ব্যাপারটাও তাঁদের জানিয়ে রাখবেন রাজ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে। সেই মতো সেই রাতেই মহারাজ তাঁর সব সভাসদদের কাছে বার্তাপ্রেরণ করলেন যাতে পরদিন দ্বিপ্রহরে তাঁরা মন্ত্রণা কক্ষে উপস্থিত হয় সে জন্য।
মহারাজের জরুরি বার্তা পেয়ে পরদিন নির্দিষ্ট সময় মহারাজের প্রাসাদে হাজির হল তাঁর সভাসদরা। তিনি প্রথমে চামেদের আগমনের আশঙ্কার কথাটাই তাঁদের সামনে ব্যক্ত করলেন। ব্রাহ্মণ দিবাকর, সেনাপতি রুদ্ররূপ, শ্রেষ্ঠ পার্ষদ বিরুচ, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গল এ বিষয় নিয়ে খানিক আলোচনার পর মহারাজকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘সতর্ক থাকার প্রয়োজন হলেও এ নিয়ে আশঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। উৎসবের আর মাত্র কিছুদিন বাকি। তা মিটে যাওয়ার পর মেকং নদীর জল সীমান্তে সেনা মোতায়নের ব্যবস্থা করা হবে। আর ইতিমধ্যে গুপ্তচর যদি অন্য কোনও সংবাদ বহন করে আনে, তখন সেই মতো ব্যবস্থা করা যাবে। আপাতত উৎসবের দিকেই মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। কারণ ইতিমধ্যে জম্বুদ্বীপ, সিংহল, শ্যামদেশের বেশকিছু নৃপতিদের কাছে আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। তাঁরা উপস্থিত হবেন বলে সম্মতিও দিয়েছেন। তাঁদের আতিথিয়তায় কোনও ত্রুটি রাখা যাবে না। তাঁরা যেন এ দেশে এসে মোহিত হন। আর চামেদের আগমনের আশঙ্কাটা গোপন রাখতে হবে। কারণ, জনমানসে তা পল্লবিত হয়ে পৌঁছলে আতঙ্ক ছড়াতে পারে, উৎসবের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে।’
পার্ষদদের পরামর্শ শুনে মহারাজ আশ্বস্ত হওয়ার পর উৎসবের আয়োজন প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রবেশ করলেন। ব্রাহ্মণ দিবাকর বললেন, ‘বিষ্ণুলোকে মহারাজ এ রাজ্যের মঙ্গল কামনায় যে বিশেষ পুজোর আয়োজন করবেন সে স্থানে মহারাজকে সকাল থেকেই উপস্থিত থাকতে হবে। হোমযজ্ঞ ইত্যাদি সম্পন্ন হতে বিকাল গড়িয়ে যাবে। অতএব সিদ্ধান্ত হল, বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামার পর তিনি প্রথমে রাজসভাতে আসবেন। সেখানেই তিনি অতিথি অভ্যাগতদের উপহার গ্রহণ ও প্রদান করবেন। অতঃপর প্রাসাদ প্রাঙ্গণে অতিথিদের সঙ্গে নৈশাহার সম্পন্ন করার পর সেদিনের মতো মহারাজের জন্মদিবসের অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটবে। আর মন্দির নগরীর নাগরিকদের জন্য সেই দিন দিবা-রাত্র নগরীর নানান স্থানে আহার ও উপহার প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়া হবে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা। যার একপাশে অঙ্কিত থাকবে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের ছবি, আর অন্যপাশে থাকবে বিষ্ণুলোকের ছবি।’
মহারাজের এই পার্ষদরাই তাঁর জন্ম দিবসের উৎসব সুচারুভাবে পরিচালনা করবেন। তাই তাঁদেরও খুশি রাখা প্রয়োজন। উৎসব উপলক্ষে তাঁদের কারও কোনও ব্যক্তিগত ইচ্ছা থাকলে তা পূরণ করলে খুশি হবেন তাঁরা। তাই কৌশলী মহারাজ আলোচনার শেষ লগ্নে এসে বললেন, ‘এবার বলুন, এই উৎসব উপলক্ষে আপনাদের কী মনোবাঞ্ছা? আপনারা প্রত্যেকে আপনাদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার কথা নিঃসঙ্কোচে আমাকে বলতে পারেন। প্রয়োজন বোধে তার জন্য আগাম কোনও ব্যবস্থা করতে হলে আমি তা করব।’
মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের কথা শুনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গল প্রথমেই জানিয়ে দিলেন, ‘তাঁর কোনও জাগতিক আকাঙ্ক্ষা নেই। ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদে অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হোক, মহারাজ ও তাঁর রাজ্যবাসীর সুখ শান্তি অক্ষুণ্ণ থাকুক তাই তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা।’
অন্যরা একটু ভাবার পর ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ দিবাকর জানালেন, —যে একশত ব্ৰাহ্মণ ওইদিন তাঁর সহযোগী রূপে মন্দিরে পুজোঅর্চনার কাজে নিয়োজিত থাকবেন তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে স্বর্ণ কলস প্রদান করতে পারলে ভালো হয়?’
বিরুচ বললেন, ‘তাঁর মন্দির প্রাসাদে যে জলদেবীর মন্দির আছে সেই মন্দিরের ধ্বজার জন্য একটি স্বর্ণ দণ্ড তাঁর প্রয়োজন। তাতে অতিথি অভ্যাগতদের চোখে মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে।’
সেনাপতি রুদ্ররূপ একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘উৎসব উপলক্ষে আমি কিছু সেনানায়ককে আমন্ত্রণ জানাতে চাই। আমার ভবনেই তাঁরা অবস্থান করবেন। সারা বৎসরকাল ধরে তাঁরা সীমান্ত অঞ্চলে দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকেন শত্রুভয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগকে উপেক্ষা করে। অনেক সময় তাঁদের উপযুক্ত আহার-পানীয় গ্রহণ করাও সমস্যা হয় । উৎসবের দিনে আমি তাঁদের সে অভাব পূরণ করতে চাই। মহারাজ যদি তাঁদের জন্য উৎকৃষ্ট সোমরসের ব্যবস্থা করেন তবে তাঁরা তৃপ্ত হবেন।’
মহারাজ হেসে বললেন, ‘আপনাদের সবার আকাঙ্ক্ষাই উত্তম রূপে পূরণ করা হবে।’
মহারাজ এরপর খেয়াল করলেন। তাঁর সভাসদদের মধ্যে একজন নিশ্চুপ হয়ে আছেন। তিনি কোনও দাবি জানাননি। হয়তো বা সঙ্কোচ বোধ করছেন দাবি জানাতে। তাই তাঁর উদ্দেশে বললেন, ‘বল উগ্রদেব। তোমার কী আকাঙ্ক্ষা। নিঃসঙ্কোচেই বল?’
মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের কনিষ্ঠতম পার্ষদ উগ্রদেব বললেন, ‘আমার কোনও দুর্মূল্য দ্রব্যের আকাঙ্ক্ষা নেই। বিষ্ণুলোকের যে চম্পা নাম্নী নর্তকী আছে তাকে আমি আমার প্রাসাদ মন্দিরের নর্তকী হিসাবে পেতে চাই। বিগ্রহের সামনে নৃত্য প্রদর্শন করবে সে, উৎসব উপলক্ষে যে অতিথিরা আমার গৃহে পদার্পণ করবেন তাঁদেরও নৃত্যপ্রদর্শন করবে ওই নর্তকী।’
মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন, উগ্রদেবের কথা শুনে একটু থমকে গেলেন। চম্পা বিষ্ণুলোকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নর্তকী। মহারাজ স্বয়ং তাঁর নৃত্য উপভোগ করে প্রীত হন। তিনি প্রথমে বুঝতে পারলেন না কী উত্তর দেবেন। তাঁকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে উগ্রদেব বললেন, ‘আমি বুঝতে পারছি মহারাজ অন্য সভাসদদের ইচ্ছা পূরণে আগ্রহী হলেও অজানা কারণে হয়তো আমার ইচ্ছা পূরণে অনীহা প্রকাশ করছেন। থাক তবে, আমার আর অন্য কোনও দাবি নেই। মহারাজ যদি অনুমতি দেন তবে আমি এই সভাস্থল ত্যাগ করতে পারি। আমার মতো গুরুত্বহীন পার্ষদ আলোচনাতে না থাকলে কোনও ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না।’
উগ্রদেবের কণ্ঠস্বর এমনিতেই কর্কশ। কথাগুলো বলার সময় আরও কর্কশ শোনাল তাঁর কণ্ঠস্বর। এবার প্রমাদ গুনলেন মহারাজ। উগ্রদেব যদি ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হয় তবে প্রয়াত হরিদেবের অনুগামীদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। তাছাড়া ভবিষ্যতে যদি আবার চামেদের সঙ্গে যুদ্ধ হয় তখন সকলের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। উগ্রদেব, পার্ষদ বিরুচের জামাতাও বটে। জামাতার ইচ্ছাপূরণ না হলে পার্ষদ বিরুচও অপমানিত বোধ করতে পারেন।’—এ সব ভেবে নিয়ে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন বললেন, ‘ঠিক আছে আমি তাকে তোমার প্রাসাদে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। তাকে আমি তোমায় উপহার দিলাম।’
উগ্রদেবের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘মহারাজের জয় হোক। আপনি বিষ্ণুলোকের প্রধান পুরোহিতকে আপনার নির্দেশ জানিয়ে দেবেন। একদিন পর আমার রক্ষীরা তাকে বিষ্ণুলোক থেকে আমার প্রাসাদে আনতে যাবে। …
মহারাজ বললেন, ‘আমি বিষ্ণুলোকের প্রধান পুরোহিতের কাছে নির্দেশনামা পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সভা ভেঙে গেল।
পরদিন দ্বিপ্রহরে নিজ কক্ষে শুয়ে বিভোর ভাবে বহ্নির কথা ভাবছিল চম্পা। আর মাত্র কিছুদিনের ব্যাপার। আর তারপরই তো সে জম্বুদ্বীপে রওনা হবে ঘর বাঁধার জন্য। কিন্তু এ ক’টা দিন যেন কিছুতেই কাটতে চাইছে না। ঠিক এমন সময় মন্দিরের এক সেবায়েত এসে উপস্থিত হল চম্পার কক্ষের দ্বারে। সে তাকে বলল, ‘প্রধান পুরোহিত তোমাকে ডাকছেন।’
মাঝে মাঝে সন্ধ্যারতির নৃত্যপ্রদর্শনের আগে নৃত্য কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা কারা তাতে অংশ নেবে তা আলোচনা করার জন্য প্রধান পুরোহিত নর্তকীদের ডাক পাঠান। চম্পা ভাবল তেমনই ডাক এসেছে। সে গিয়ে উপস্থিত হল গর্ভমন্দির প্রাঙ্গণে। প্রধান পুরোহিত তাকে মহারাজের নির্দেশ জানিয়ে দিয়ে বললেন, পরদিনই তাকে যেতে হবে রাজপার্ষদ উগ্রদেবের প্রাসাদে। আগামী কাল থেকেই ওই প্রাসাদই হবে নর্তকী চম্পার বাসস্থান। এ কথা শুনে চম্পার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বিগ্রহর দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘হে দেবতা, এ কী হল? তুমি তো সবই জান। এবার আমি বহ্নির সঙ্গে মিলব কীভাবে?’
নিরুত্তর রইল ভগবান বিষ্ণুর স্বর্ণ বিগ্রহ।
চম্পা সে স্থান থেকে নিজ কক্ষে ফিরে আসার পর বিকাল হতেই ছুটল ভাস্কর বহ্নির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। চম্পা মন্দির তোরণের সামনে এসে উপস্থিত হতেই দেখতে পেল বহ্নি অন্যদিনের মতোই সে স্থানে প্রতীক্ষা করছে। চম্পা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বহ্নি উৎফুল্ল ভাবে বলল, ‘সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই মজুরের দল আসে। আমি কাজ শুরু করি। পাথর নিয়ে কাজ আমার। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করি। কিন্তু দিনের শেষে তোমাকে দেখলেই আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।’—এ কথা বলে সে নর্তকী চম্পাকে নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করল। প্রাঙ্গণ অতিক্রম করতে করতে সে এরপর চম্পাকে বলল, ‘তোমাকে আমি যে উপহার দেব বলেছিলাম সে উপহারও আমি প্রস্তুত করতে শুরু করেছি। গৃহে ফিরে গিয়ে সে কাজেই মনোনিবেশ করি। তবে সে কাজ করতে আমার ক্লান্তি বোধ হয় না।’
কিন্তু তার এ কথাতেও চম্পা নির্বাক থাকাতে ভাস্কর বহ্নি চম্পার মুখের দিকে তাকাল। বিকালের রাঙা আলোতে চম্পার মুখমণ্ডলে বিষাদ জেগে আছে!
বহ্নি তা দেখে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে তোমার?’
চম্পা কোনওক্রমে বলল, ‘চল নৃত্যমঞ্চে বসে কথা বলি।’ সে স্থানে গিয়ে বসার পর তাঝোর কান্নায় ভেঙে পড়ল চম্পা। কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, ‘তোমার সঙ্গে আমার আর জম্বুদ্বীপে গিয়ে ঘর বাঁধা হবে না। হয়তো আর কাল থেকে সাক্ষাতও হবে না আমাদের।’
বিস্মিত বহ্নি জানতে চাইল, ‘ঘর বাঁধা হবে না কেন?’
নর্তকী চম্পা এবার খুলে বলল সব কথা। তা শুনে বহ্নিও কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। এমন দুর্যোগ যে হঠাৎ নেমে আসতে পারে সে ভাবেনি। গতকালই সে ভেবে রেখেছিল পুরস্কার স্বরূপ সে মহারাজের কাছে চম্পাকে প্রার্থনা করবে। কিন্তু এক রাতের মধ্যেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল! চম্পা এরপর বহ্নির বাহু আলিঙ্গন করে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে সত্যি ভালোবেসে থাক তবে চল আজ রাত্রেই এই নগরী থেকে পলায়ন করে জম্বুদ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করি।’
বহ্নি বলল, ‘কিন্তু তার জন্য যে প্রস্তুতির প্রয়োজন তা তো আজ রাত্রের মধ্যে করা সম্ভব নয়। সমুদ্র পথ পাড়ি দিতে হলে বড় নাওয়ের দরকার। মাঝি মাল্লার দরকার। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তা সংগ্রহ করা অসম্ভব।’
বহ্নির কথায় ক্রন্দনরত চম্পা বলল, ‘তবে আজই কি আমাদের শেষ সাক্ষাৎ? উগ্রদেব নিশ্চয়ই আমাকে আর মুক্তি দেবেন না।’
বহ্নি খানিক ভেবে নিয়ে বলল, ‘শোনো চম্পা, মহারাজের জন্মদিবসের দিন সবাই উৎসবে মেতে থাকবে। তুমি সেদিন সূর্যাস্তের আগে যেভাবেই হোক বিষ্ণুলোকের সামনে উপস্থিত হবে। হাজার জনতার ভিড়ে কেউ তোমাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারবে না। আমি তোমাকে ঠিক খুঁজে নেব। আর সে রাতেই আমরা মন্দির নগরী ত্যাগ করে রওনা হব জম্বুদ্বীপের উদ্দেশে। আমি ইতিমধ্যেই যাবতীয় প্রস্তুতি গোপনে সেরে রাখছি। এ কথা বলার পর সে চম্পাকে বলল, ‘আমার সঙ্গে যদি তোমার আজকের পর দেখা নাও হয় তবে এই কথাই হয়ে রইল। তবে রোজ সূর্যাস্তের সময় আমি উগ্রদেবের প্রাসাদের সামনে দিয়ে যাব। তোমার যদি সুযোগ হয় তবে তুমি ওই সময় প্রাসাদের অলিন্দে, ছাদে বা কোনও উচ্চ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমাদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ না হলেও আমরা পরস্পরকে দেখতে অন্তত পাব। আর প্রাসাদে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সদা সতর্ক থাকব। উগ্রদেবকেও যথাসম্ভব সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করবে যাতে তার মধ্যে তোমার প্রতি কোনও সন্দেহের উদ্রেক না ঘটে। দেখবে দেখতে দেখতেই মাঝের এ ক’টা দিন কেটে যাবে।” -এ কথা বলে বহ্নি তার উত্তরীয় দিয়ে চম্পার অশ্রু মুছিয়ে দিল। চম্পাকে আলিঙ্গন করল সে। চম্পাও এবার কিছুটা ধাতস্থ হল তার কথা শুনে। সূর্য ডুবে গেল। রাত্রি নামার পর বিষ্ণুলোকের দিকে ফেরার পথ ধরল তারা। বিদায় বেলায় নর্তকী চম্পার কপালে চুম্বন করে তার হতে কিছু স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে ভাস্কর বহ্নি বলল, ‘এই মুদ্রাগুলো তোমার কাছে রাখ। কোনও
খামের যুবতী স্বাগতর উদ্দেশে বলল, তোমাকে আমি মন্দিরের পিছনে যেতে নিষেধ করেছিলাম তাও তুমি সেখানে গেলে! আমার কথা শুনে চল, নইলে তোমার বিপদ হবে। আর যেও না ওখানে। আমার অনুরোধগুলো রেখা” স্বাগত অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কীভাবে জানলে সে কথা?
জরুরি প্রয়োজনে কাজে আসতে পারে। মহারাজের জন্মোৎসবের দিন সূর্যাস্তের আগে বিষ্ণুলোকের মন্দির প্রাঙ্গণে মিলিত হব আমরা। চম্পা মুদ্রাগুলো গ্রহণ করে শেষ বারের মতো চুম্বন করল বহ্নির অধরে। তারপর তারা দু’জন যে যার বাসস্থানের দিকে রওনা হল। পরদিনই দু’জন রক্ষী এসে বিষ্ণুলোক থেকে চম্পাকে নিয়ে গেল উগ্রদেবের মন্দির প্রাসাদে। প্রাকার ঘেরা বিশাল মন্দির প্রাসাদ তার। নর্তকী চম্পাকে হাজির করা হল উগ্রদেবের সামনে। তিনি চম্পাকে বললেন, ‘এ প্রাসাদে যখন এসেই গেছিস তখন তোকে এ প্রাসাদের নিয়ম বিধিগুলো জানিয়ে দিই। আমার অনুমতি ছাড়া এ প্রাসাদ ত্যাগ করা নিষেধ। আমার অপরিচিত কোনও বহিরাগত পুরুষকে এ প্রাসাদে আমি প্রবেশ করতে দিই না। আরও দু’জন তোরই মতো নর্তকী আছে এ প্রাসাদে, তারাও জানে সে রক্ষী হোক বা ভৃত্য, এ প্রাসাদে অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্থাপন নিষিদ্ধ। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল এ প্রাসাদের কোনও ঘটনা বা খবর কোনওভাবে বাইরে পাঠাবার চেষ্টা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আমার প্রাসাদের পশ্চাৎভাগে একটা কুমির ভর্তি পুষ্করিণী আছে। ওরা নরমাংস খেতে ভালোবাসে। মনে রাখবি, তোর ভাগ্যবিধাতা এখন থেকে আর মহারাজ নন, আমি।’—এ কথাগুলো বলে হাসল উগ্রদেব।
নর্তকী চম্পা তাকে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘আমি আপনার নির্দেশ মতোই চলব প্রভু।’
এরপর এক দাসী তাকে নিয়ে গেল সবকিছু দেখিয়ে, বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। তবে এ প্রাসাদে যে বিগ্রহ আছে তা ভগবান বিষ্ণুর নয়, শিবের। মন্দিরের পুরোহিত ও অন্য দু’জন নর্তকীর সঙ্গেও পরিচয় হল তার। চম্পার মনে হল অন্য দু’জন নর্তকী খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করল না তার বিষয়ে। পুরোহিত তাকে জানিয়ে দিল তার নির্দেশ মতো তিন নর্তকী ভোরে দেবতার ঘুম ভাঙার পর, মধ্যাহ্নে তাঁর ভোজনের আগে ও সন্ধ্যারতির সময় পালা করে নৃত্যপ্রদর্শন করবে। বাগান থেকে পুষ্পচয়ন করে মালাও গাঁথতে হবে চম্পাকে।
বিকাল হয়ে এল একসময়। প্রাসাদের প্রাকার এত উঁচু যে বাইরে থেকে কিছু দেখা যায় না। তবে একটা জিনিস তার চোখে পড়ল। সেই মন্দির শীর্ষে ধ্বজা ওড়াবার জন্য এটা সোপান শ্রেণি আছে। শেষ বিকালে সূর্যাস্তের কিছু আগে সে সেই সোপান বেয়ে ওপরে উঠে পড়ল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দেখতে পেল প্রাসাদের সামনে দিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে চলেছে ভাস্কর বহ্নি। তার উদ্দেশে হাত নাড়তে গিয়েও নিজেকে সংযত করে ফেলল চম্পা। প্রহরীর দল চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একসময় বহ্নি তার দৃষ্টিপথের আড়ালে চলে গেল। সূর্যও ডুবে গেল বিষ্ণুলোকের আড়ালে।’’—এ পর্যন্ত বলে থেমে গেল খামের যুবতী।
স্বাগত খেয়াল করল চারপাশে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। সূর্য ডুবে গেছে বিষ্ণুমন্দিরের আড়ালে। মেঘে ছেয়ে যেতে শুরু করেছে আকাশ। যুবতী বলল, ‘আমার কাহিনি শেষ হতে আর বেশি বাকি নেই। তবে আজ এ পর্যন্তই থাক। তুমি এবার যাও। নইলে বৃষ্টি নেমে যাবে। ‘—এ কথা বলে সে নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে অন্যদিকে পা বাড়াতে গিয়ে একবার থামল। তারপর স্বাগতর উদ্দেশে বলল, ‘তোমাকে আমি মন্দিরের পিছনে যেতে নিষেধ করেছিলাম তাও তুমি সেখানে গেলে! আমার কথা শুনে চল, নইলে তোমার বিপদ হবে। আর যেও না ওখানে। আমার অনুরোধগুলো রেখ।’
স্বাগত অবাক হয়ে বলল, “তুমি কীভাবে জানলে সে কথা?”
খামের যুবতী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, ‘আমি জানি।’ —এ কথা বলে সে এগল জঙ্গলের ভিতর দিকে। আর স্বাগতও সে জায়গা ছেড়ে ফেরার পথ ধরল। কিছুটা এগিয়েই সে রাস্তার পাশে একটা গাড়ি দেখতে পেল। টুকটুক নয়, পিছনের ছাদখোলা কেরিয়ার ভ্যানের মতো একটা গাড়ি। তার সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে একটা লোক। গাড়িটার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় লোকটার গায়ে ড্রাগনের ছবি দেখে স্বাগত তাকে চিনতে পেরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। জুয়ার আড্ডার মালিক হোয়াঙ। লোকটাও তাকে চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘মন্দিরে ফিরছ?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ! ‘
তারপর সে জানতে চাইল, ‘তুমি কি প্রফেসরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছ?’
লোকটা উত্তর দিল, ‘না, আমি এখানে ব্যাঙ ধরতে এসেছি। রেসের জন্য বিশেষ ধরনের ব্যাঙ পাওয়া যায় এখানে।’
