বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৬
পর্ব ৩৬
হুয়াঙ-এর কথা শুনে স্বাগতর মনে হল, প্রফেসর আজ সিয়েমরিপ গিয়েছিলেন, হয়তো সেখানেই তাঁদের দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা সারা হয়ে গেছে। হোয়াঙ এরপর বলল, ‘ওই ফঙ মারা যাওয়াতে আমার বেশ সমস্যা হল। ও ভালো জাতের ব্যাং চিনত। আমার কাছে ব্যাং ধরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত। ও না থাকায় আমাকেই আসতে হল।’
স্বাগতর মনে পড়ল, হেরুম বলেছিল যে ফঙের সঙ্গে হোয়াঙকে সিয়েমরিপে কথা বলতে দেখেছিল লোকেরা। হতে পারে ব্যাং বিক্রির ব্যাপারেই ফঙ আলোচনা করতে গিয়েছিল হোয়াঙয়ের সঙ্গে। স্বাগত এরপর আর কথা বাড়াল নো হোয়াঙয়ের সঙ্গে, ‘বৃষ্টি নামতে পারে। চলি!’ বলে সে পা বাড়াল মন্দিরের দিকে। কিন্তু একটু এগিয়েই সে দেখতে পেল আর একজনকে। রাস্তা যেখানে মন্দিরে যাওয়ার জন্য বাঁক নিয়েছে তার কিছুটা দূরে একটা গাছের তলায় পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব! এই সাঁঝবেলাতে তিনি এখানে কী করছেন? সাধারণত তিনি লতাপাতা সংগ্রহ করতে এলে ভোরবেলাতেই আসেন। স্বাগতর একবার মনে হল সে গিয়ে কথা বলে সন্ন্যাসীর সঙ্গে। কিন্তু সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। তাই সে আর তার দিকে না তাকিয়ে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকে।
সুরভী-নাতাশা-বিক্রম-প্রীতম দাঁড়িয়েছিল মন্দির চত্বরেই। স্বাগত গিয়ে মিলিত হল তাদের সঙ্গে। বিক্রম স্বাগতকে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রফেসর সিয়েমরিপ থেকে ফিরে এসে তাঁর আগামী পরিকল্পনার ব্যাপারে কিছু বললেন তোমাকে? গাইড ফঙের মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু জানা গেল?’
স্বাগত বলল, ‘প্রফেসর অধিকর্তা কিমের সঙ্গে দেখা করেছেন। তার বা পুলিসের তরফে মন্দিরের ভিতর কাজ করার ক্ষেত্রে কোনও আপত্তি নেই। কাল থেকে মূল মন্দিরের ভিত জরিপের কাজ শুরু হবে।’ এ কথা বলে একটু চুপ করে থেকে সে বলল, ‘প্রফেসরের মুখে শুনলাম, পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট অনুসারে ভারী কিছুর আঘাতে খুলি ভেঙে ওর মৃত্যু হয়েছে। সম্ভবত ওই পাথরের মাথাটা দিয়েই ওকে আঘাত করা হয়েছে।’
নাতাশা প্রশ্ন করল, ‘আমাদের দেশে ফেরার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা করে উঠবে সে ব্যাপারে কিছু বললেন প্রফেসর?’
স্বাগত জানাল, ‘এ ব্যাপারে প্রফেসরের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি।’
তার কথা শুনে বিড়বিড় করে নাতাশা বলল, ‘যেদিন নিষেধাজ্ঞা উঠবে তার পরদিনই আমি ফেরার জন্য রওনা হব।’
এ প্রসঙ্গে আর কথা না বলে স্বাগত বলল, ‘বৃষ্টি নামার আগে আজ রাতের খাবারটা তাড়াতাড়ি বানিয়ে নেওয়া যাক।’
অন্ধকার নামল। হাতে হাতে রান্নার কাজ শুরু করে দিল সবাই। খিচুড়ি, ডিম ভাজা। সাতটার মধ্যেই রান্নার কাজ মিটে গেল। ধীরে ধীরে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস। প্রফেসরের ঘরে বিক্রমকে দিয়ে স্বাগত খাবার পাঠিয়ে দিল। সে খাবার দিয়ে ফিরে আসার পর স্বাগত জানতে চাইল, “স্যর কী করছেন?”
বিক্রম জবাব দিল, ‘ল্যাপটপে কাজ করছেন। দেখে মনে হল মন্দিরের মাপজোকের কাজ।’
প্রফেসরকে খাবার দিয়ে আসার পর একইসঙ্গে খেতে বসল সকলে। তাদের খাওয়া শেষ হতে না হতেই বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল। স্বাগতরা এরপর যে যার ঘরে ফিরে এল।
ঘুমিয়ে পড়ার মতো সময় হয়নি। সবে সাড়ে সাতটা বাজে। খাটে বসে স্বাগত ভাবতে লাগল সারাদিনের কথা, তার অভিজ্ঞতার কথা, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করতে লাগল ঘটনাগুলো— নারেঙ খাম কি মন্দিরের পিছনের সেই ছিদ্রপথ দিয়ে আজ বা আগে কোনওদিন মন্দিরে প্রবেশ করেছিল? গাইড ফঙও কি তার মৃত্যুর দিন ও পথেই মন্দিরে ঢুকেছিল? অপ্সরা বা যক্ষীর মাথাটা কে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ভিতরে? ফঙ নিজেই? নাকি তার হত্যাকারী? জুয়ার আড্ডার চীনাটাই বা হঠাৎ এসে হাজির হয়েছে কেন এখানে? সত্যি কি ব্যাং ধরার জন্য নাকি অন্য কোনও মতলবে? সন্ধ্যাবেলাতে মন্দিরের কাছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের উপস্থিতিও যেন একটু সন্দেহজনক! বিক্রমের থেকে শোনা কথাটাও উঁকি দিল স্বাগতর মনে। বিক্রমের দেখা সেই মহিলা কে? যে অন্ধকার রাতে মন্দির থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল? প্রফেসর রামমূর্তি অত্যন্ত পণ্ডিত ও সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁর সম্পর্কে কোনও বিরূপ ধারণা স্বাগতর ভাবা হয়তো উচিত নয়, কিন্তু তবুও স্বাগতর মনে প্রশ্ন জাগছে, রামমূর্তির মতো মানুষের সঙ্গে জুয়ার আড্ডার মালিকের কীসের সম্পর্ক থাকতে পারে? অথবা বিক্রমের অনুমানই কি ঠিক? কোনও নারীর সঙ্গে সম্পর্ক আছে রামমূর্তি স্যরের? যে সংগোপনে এ মন্দিরে আসে রামমূর্তি সারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে? এ সব প্রশ্নর সঠিক উত্তর স্বাগতর কাছে না থাকলেও প্রশ্নগুলি কিন্তু তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। খামের যুবতীর কথাও মনে হতে লাগল। নিজেকে সে এক অদ্ভুত রহস্যের চাদরে মুড়ে রেখেছে। তার আসল পরিচয় কী? কেন সে নিজের পরিচয় গোপন করে রেখেছে স্বাগতর তা জানা নেই। তবে তার অথবা তার গল্পর প্রতি আকর্ষণ স্বাগত যেন কিছুতেই প্রত্যাখ্যান করতে পারছে না। তবে এই মন্দির সম্পর্কে যে ওই যুবতী অনেক কিছু জানে সেটা তার কথা শুনে বুঝতে পারছে স্বাগত। সে স্বাগতকে বলেছে তার গল্প নাকি শেষের পথে। তার গল্প শেষ হলে এ মন্দিরের রহস্য উন্মোচন হবে কি? এ সব কথাই ভাবতে লাগল স্বাগত। বাইরে বৃষ্টি ঝমঝম শব্দে হয়েই চলেছে। বাইরের প্রাঙ্গণটা ঝাপসা লাগছে। বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে নানান কথা ভাবার পর স্বাগত বিছানায় শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকাল ন’টা নাগাদ নিজেদের ঘর থেকে চত্বরে বেরিয়ে এল সবাই। কুলি সর্দার হেরুম এসে উপস্থিত হওয়ার পর প্রফেসর রামমূর্তির নেতৃত্বে সকলে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল। দিনের সূর্যালোকে মন্দিরের প্রাঙ্গণ আলোকিত থাকলেও স্থানে স্থানে বৃষ্টির জল জমে আছে। আর সেই জমা জলে খেলে বেড়াচ্ছে বড় বড় ব্যাং। তাদের দেখে স্বাগতর মনে পড়ে গেল গত সন্ধ্যায় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়া জুয়ার আড্ডার মালিক হোয়াঙ-এর কথা। প্রফেসর কি জানেন, লোকটা এদিকে ব্যাঙ ধরতে এসেছে? মন্দিরের দ্বিতীয় প্রাঙ্গণটা অতিক্রম করে সবাই প্রবেশ করল মূল মন্দিরের মধ্যে। প্রফেসরের পিছন পিছন তারা গিয়ে প্রথমে হাজির হল ঠিক সে জায়গাতে যেখানে সেই পাথরের ভাঙা মাথাটা পাওয়া গিয়েছিল! যা দিয়ে ফঙকে হত্যা করা হয়েছিল বলে পুলিসের অনুমান। পাথরটা অবশ্য সেদিনই পুলিস তুলে নিয়ে গিয়েছে। স্বাগতরা সেখানে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে দেখল দেওয়াল গাত্রে খোদিত মূর্তিগুলোকে। প্রফেসর বললেন, ‘এবার আশপাশের ঘরগুলোর মাপার কাজ শুরু করব আমরা। দেওয়াল, মেঝে এসবও ভালো করে পরখ করে দেখতে হবে।’
সেই মতো মাপার যন্ত্রপাতি নিয়ে পাশের একটা ঘরে ঢুকে কাজ শুরু করেদিল তারা। ঘরের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা পরিমাপ করা ছাড়াও মেঝে, দেওয়াল গাত্রগুলোও ঠুকে ঠুকে তারা পরীক্ষা করতে লাগল কোথাও কোনও ফাঁপা স্থান বা গুপ্তপথ আছে কি না তা অনুসন্ধানের জন্য। হেরুমকে প্রফেসর একসময় পাঠিয়ে দিলেন রান্নার কাজের জন্য। একটা ঘরের পরিমাপ করার জন্য স্বাগত, প্রীতম আর বিক্রম ঘরটাতে ঢুকল আর পাশের ঘরটাতে প্রফেসর ঢুকলেন সুরভী আর নাতাশাকে নিয়ে। প্রফেসর অন্য ঘরে চলে যাওয়ার পর প্রীতম স্বাগতকে বলল, ‘তোমার থেকে একটা কথা জানতে চাই। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে ফঙের মৃত্যু ছাড়াও আরও কোনও ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে নাকি? অন্য কোনও ঘটনা কি কিছু ঘটেছে? প্রফেসরের সঙ্গে তোমারই তো বেশি কথা হয়। তুমি কি এ ব্যাপারে কিছু জানো?’
প্রশ্নটা শুনে স্বাগত বলল, ‘কেন বল তো?’
প্রীতম বলল, ‘আমার মন যেন তেমনই বলছে। গতকাল রাত বারোটা নাগাদ বিক্রম আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। ওর ঘুম আসছিল না বলে ও বাইরের দিকে তাকিয়ে শুয়েছিল। ও আমাকে ডেকে তোলার পর দেখলাম প্রফেসর বর্ষাতি গায়ে চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশে দেখলেন। তারপর চত্বর থেকে নেমে জঙ্গলের মধ্যে চলে গেলেন। এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে তিনি কোথায় গিয়েছিলেন তুমি জানো? যদি আরও কিছু বিপদের পরিস্থিতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে তবে তা আমাদের কাছে গোপন না করে একযোগে মোকাবিলা করার চেষ্টা করাই ভালো।’
বিক্রম ঘাড় নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল প্রীতমের কথাতে। স্বাগত বেশ অবাক হয়ে গেল প্রীতমের কথা শুনে। সে বলল, ‘আমি সত্যিই জানি না কাল রাতে প্রফেসর কোথায় কেন গিয়েছিলেন?’
এরপর একটু চুপ করে থেকে স্বাগত তাদের বলল, ‘গাইড ফঙের মৃত্যু কেন হল, বা কেন সে খুন হল তা তোমাদের মতো আমারও জানা না থাকলেও ওই ঘটনার পর থেকে আমাদের সকলেরই বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। হ্যাঁ, এটা হতেই পারে যে আমাদের সকলের অলক্ষে এই মন্দিরে কিছু ঘটছে বা ঘটতে চলেছে। তোমরা নিশ্চিন্ত থাক তেমন কোনও বিপদের ইঙ্গিত পেলে আমি সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের জানাব। আমি কিন্তু তোমাদেরই একজন। তেমন কিছু হলে সবাইকে একসঙ্গে তার মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
প্রীতম বলল, ‘হ্যাঁ, সেটাই। আর আমাদের সহকর্মী দু’জন মহিলাও আছে। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে আমাদের।’
স্বাগত বলল, ‘তা তো বটেই। তোমরা সুরভীকে বলে রেখ তার চোখেও যদি সন্দেহজনক কিছু পড়ে তবে সে যেন আমাদের ব্যাপারটা জানায়। নাতাশা তো ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে। ওর সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।’
পাশে ঘরেই কাজ করছেন রামমূর্তি। যে কোনও সময় তিনি এ ঘরে চলে আসতে পারেন। তাই এরপর আলোচনা থামিয়ে স্বাগতরা কাজে মন দিল।
বেলা একটা পর্যন্ত একটানা কাজ করল সকলে। পরপর বেশ কয়েকটা ঘরের মাপজোক, দেওয়াল-মেঝে পরীক্ষা করে দেখা হল। কিন্তু শূন্য ঘরগুলোতে এমন কিছুর সন্ধান মিলল না যা এ মন্দির সম্পর্কে নতুন কোনও কিছুর আভাস দিতে পারে।
বেলা দেড়টা নাগাদ স্বাগতরা মন্দির তোরণের বাইরে বেরিয়ে এল। তার ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে বলে প্রফেসর চলে গেলেন। হেরুম রান্না সেরে রেখেছিল, প্রফেসরের ঘরে সে খাবার দিয়ে এল। স্বাগতরা খাওয়া সেরে যে যার ঘরে ফিরে এল।
স্বাগত ঘরে ফিরে প্রীতমদের মুখ থেকে শোনা কথাটা ভাবতে লাগল—গত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন প্রফেসর? কী এমন কাজ থাকতে পারে যার জন্য বর্ষার মধ্যে মাঝরাতে তাঁকে জঙ্গলে যেতে হল? এ কথা ভাবতে ভাবতেই তার মনে পড়ল গতকাল দুপুরে এ সময় সে মন্দিরের পিছন দিকে গিয়েছিল। আর তারপর স্বাগতর মনে প্রশ্ন জাগল প্রফেসর কি কোনও দিন মন্দিরের পিছনের অংশ ঘুরে দেখেননি? তিনি কি সত্যিই জানেন না মন্দিরের পশ্চাৎভাগের ওই সুড়ঙ্গ বা প্রবেশ পথের কথা?
নানা ভাবনা, প্রশ্ন ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে লাগল স্বাগতর মনে। সময় এগিয়ে চলল। একসময় বিকেল হল। আর বিকেল হতেই অন্য বিকেলগুলোর মতোই খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার জন্য স্বাগত টান অনুভব করতে শুরু করল।
রোদের তেজ একটু কমতেই, অন্যরা ঘর ছেড়ে চত্বরে বেরবার আগেই স্বাগত মন্দির ছেড়ে রওনা হল জঙ্গলের পথে। কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টি হওয়ায় পথের দু-পাশে কোথাও কোথাও জল জমতে শুরু করেছে। বিশেষত বড় বড় গাছগুলোর নীচে। কারণ মাথার ওপর ডালপালার চাঁদোয়া থাকার কারণে সেখানে সূর্যের আলো আসে না। চারপাশ দেখতে দেখতে হেঁটে চলল স্বাগত। বর্ষণের কারণে ঝোপঝাড় গাছ-পালার পাতার ওপর থেকে ধুলোর আস্তরণ সরে গিয়ে তাদের আরও সবুজ প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেল স্বাগত। ঘাস মাটির ওপর জলের প্রলেপ জমা হয়ে আছে। রাস্তা ছেড়ে নেমে যে স্থানে খামের যুবতী উপস্থিত হয়, অর্থাৎ সেই গাছে ঘেরা জায়গার দিকে এগচ্ছিল স্বাগত। কয়েক পা এগতেই তার দৃষ্টি পড়ল এক জায়গাতে। যেখানে ভেজা মাটির ওপর স্পষ্ট জেগে আছে জুতো পরা বেশ কিছু পায়ের ছাপ। ভালো করে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, সেই পদচিহ্নগুলো এগিয়েছে রাস্তার দিকে। আর ছাপগুলো যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল স্বাগত। নারী মূর্তিটা সেখানে আর নেই! পায়ের ছাপগুলো এসেছে সেদিক থেকেই। স্বাগত কৌতূহলী হয়ে সেই স্থানেই উপস্থিত হল। যেখানে এতদিন দাঁড়িয়ে ছিল সেই নারী মূর্তি। না, মূর্তিটা সেখানে নেই। মাটি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে পাথরের ফলকটাকে যার গায়ে রচিত ছিল মূর্তিটা। কে বা কারা কেন উঠিয়ে নিয়ে গেল সেটা? যেখানে মূর্তিটা ছিল সে জায়গার সামনে কাদা-মাটিতে জেগে আছে বেশ কিছু পায়ের ছাপ। সেই ছাপগুলো ভালো করে দেখে স্বাগত বুঝতে পারল, শুধু একজনের নয়, বেশ কয়েক ধরনের জুতোর ছাপ রয়েছে সেখানে। সম্ভবত বেশ কয়েকজন লোক গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে এই সময়কাল পর্যন্ত উপস্থিত হয়েছিল এ স্থানে। তাদেরই কেউ বা তারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে মূর্তিটাকে!
অবাক হয়ে সে জায়গায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল স্বাগত। যদি আশপাশে মূর্তি বা অন্যকিছুর সন্ধান পাওয়া যায় তা দেখার জন্য। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে দেখতে পেল গাছে ঘেরা জায়গার ভিতর থেকে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে সেই খামের যুবতী। স্বাগত এগল তার দিকে।
যুবতীর পিছন পিছন স্বাগত প্রবেশ করল তাদের বসার জায়গাতে। তারপর উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘ওখানে যে মূর্তিটা ছিল সেটা নেই। কেউ বা কারা যেন তুলে নিয়ে গেছে ফলকটা!’
খামের যুবতী বলল, ‘আমি জানি।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘মূর্তিটা কারা নিয়ে গেছে তুমি জানো?’
এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে খামের কন্যা বলল, ‘অন্ধকার, প্রবল অন্ধকার হয়তো নেমে আসতে চলেছে বিষ্ণুলোকের বুকে। আর তার আগে আমার কাহিনিটা তোমাকে জানানো প্রয়োজন। বস তুমি।’
আজ অন্যদিনের থেকে কিছুটা আগে স্বাগত এ স্থানে এসে পৌঁছেছে। যেখানে তারা কথা বলছে সে জায়গা ছায়াময় হলেও এখনও বেশ আলো আছে বাইরে। কাজেই অন্ধকার নামার ব্যাপারটা যে খামের সুন্দরী রূপক অর্থে বলল তা স্বাগতর বুঝতে অসুবিধা হল না। পাথর খণ্ডর ওপর বসল স্বাগত। খামের যুবতীও বসল তার নিজের জায়গাতে। আজ তার মুখমণ্ডলে কেমন যেন একটা গম্ভীর অথবা আশঙ্কিত ভাব ধরা দিচ্ছে। প্রস্তরখণ্ডে বসার পর আর মূর্তি প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস না করে স্বাগত বলল, ‘উগ্রদেবের প্রাসাদে যাওয়ার পর চম্পার কী ঘটল বল?’
খামের যুবতী বলতে শুরু করল তার কাহিনি— “হ্যাঁ, উগ্রদেবের প্রাসাদেই রয়ে যেতে হল নর্তকী চম্পাকে। উঁচু প্রাকার ঘেরা প্রাসাদে সে যেন একটা বন্দি জীবনের মতো। প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার অধিকার বা সুযোগ নেই চম্পার। দ্বাররক্ষীরা সদা জাগ্রত থাকে সেখানে। বাইরের লোকজনের বিশেষ যাওয়া আসা নেই এ প্রাসাদে। কোনও কোনও দিন যখন উগ্রদেব রাজসভাতে যান তখনই সাধারণত তোরণ খোলে বা বন্ধ হয়। পুরোহিতের নির্দেশিত কাজে চম্পা নিয়োজিত থাকে, কাজ না থাকলে সে কখনও মন্দির সংলগ্ন তার কক্ষে বসে ভগবান, বিষ্ণুকে ডাকে এই বন্দিশালা থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য, বহ্নির সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। কখনও কখনও সে ঘুরে বেড়ায় প্রাসাদের সামনের বাগিচাতে অথবা প্রাসাদের বহিঃভাগে যে সব স্থানে তার প্রবেশ করার অনুমতি মেলে সে সব স্থানে। একদিন বাইরে থেকে প্রাসাদ প্রদক্ষিণ করতে করতে প্রাসাদের পশ্চাৎভাগে উপস্থিত হয়েছিল চম্পা। অনুচ্চ থাকার দিয়ে ঘেরা একটা পুষ্করিণী আছে সে স্থানে। কৌতূহলবশত চম্পা গিয়ে হাজির হয়েছিল সে স্থানে। উগ্রদেব মিথ্যা বলেননি তাকে। সে দেখতে পেয়েছিল কয়েকটা বিশালাকৃতির কুমির রোদ পোহাচ্ছে পুষ্করিণীর পাড়ে! কী বিশাল মুখগহ্বর আর হিংস্র দাঁত তাদের। চম্পা পুষ্করিণীর প্রাকারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তাকে দেখতে পেয়ে একটা প্রকাণ্ড কুমির বুকে হেঁটে তার দিকে এগিয়ে আসছিল। সঙ্গে সঙ্গে সে স্থান ত্যাগ করেছিল চম্পা। কুমিরগুলোর প্রাকার অতিক্রম করার ক্ষমতা না থাকলেও চম্পার মনে পড়ে গিয়েছিল উগ্রদেবের থেকে শোনা কথা। পুষ্করিণীর ওই কুমিরগুলো নাকি নরমাংস খেতে ভালোবাসে!
মন্দিরের কাজ অথবা অবসর, সব সময়ই বহ্নির কথাই ভাবে চম্পা। বিকেল হলেই তার মন ব্যাকুল হতে থাকে বহ্নিকে দেখবে বলে। সূর্যাস্তের আগে সে রোজ উঠে গিয়ে দাঁড়ায় সেই ছোট মন্দিরশীর্ষের সোপান শ্রেণিতে। সড়ক পথে প্রাসাদের সামনে দিয়ে অশ্বপৃষ্ঠে বহ্নি একদিক থেকে এসে অন্যদিকে চলে যায়। হয়তো বা কয়েক মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু সেই মুহূর্তর জন্যই সারা দিন অপেক্ষা করে থাকে চম্পা। চোখভরে সে দেখে বহ্নিকে। তারপর নীচে নেমে আসে। যেদিন সন্ধ্যারতির সময় তার নৃত্য প্রদর্শন করার নির্দেশ থাকে সেদিন নৃত্য প্রদর্শন করে। তারপর ফিরে যায়। এভাবে কয়েক দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর একদিন সন্ধ্যারতি সাঙ্গ হলেই পুরোহিত তাকে বললেন, ‘তুমি রোজ বিকেলে মন্দিরের মাথায় ওঠ কেন? এ ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছি, রক্ষী প্রধানও খেয়াল করেছে। ব্যাপারটা সে আমার থেকে জানতে চেয়েছিল।’
চম্পাকে বাধ্য হয়ে মিথ্যা কথা বলতে হল। সে বলল, ‘ওই স্থানে দাঁড়িয়ে আমি বিষ্ণুলোকে সূর্যাস্তের শোভা উপভোগ করি। তাছাড়া এই স্থানে শীতল বাতাস বয় শরীরে আরাম অনুভব হয়।’
পুরোহিত তার জবাব শুনে বললেন, ‘আশা করি তুমি সত্যি কথাই বলছ। তবে একটা কথা সবসময় মনে রাখবে, এ প্রাসাদের অভ্যন্তরে উগ্রদেবের ইচ্ছা, নির্দেশই শেষ কথা। আশাকরি তোমার আচরণে বা কোনও কাজে এমন কিছু প্রকাশ পাবে না যাতে উগ্রদেব তোমার প্রতি রুষ্ট হতে পারেন। পুষ্করিণীর কুমিরগুলো কিন্তু সত্যিই নরমাংসভোজী।’
