বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৭
পর্ব ৩৭
পুরোহিতের মুখ থেকে সেদিনের কথা শুনে চম্পা বুঝতে পারে রক্ষীরা এ প্রাসাদের খুঁটিনাটি সবকিছুর ওপরই নজর রাখে। তার আচরণ হয়তো বা রক্ষীদের মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সে কি পারবে নির্দিষ্ট দিনে এই প্রাসাদ ত্যাগ করে উৎসবস্থলে গিয়ে বহ্নির সঙ্গে মিলিত হতে? শঙ্কা জাগে চম্পার মনে।
একদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর চম্পা দেখল আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। বেলা যত বাড়তে লাগল, আকাশ যেন ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যেতে লাগল। এদিন মধ্যাহ্নে চম্পার বিগ্রহের সামনে নৃত্য প্রদর্শন করার কথা। সে যখন মন্দিরে এসে উপস্থিত হল তখন চারপাশে অন্ধকার নেমে আসতে লাগল। বিগ্রহের সামনে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ শিখাগুলো কাঁপতে লাগল বাতাসে। কোনওক্রমে আলো-আঁধারিতে বিগ্রহের সামনে নৃত্য প্রদর্শন করল চম্পা। তারপর সে যখন পুরোহিতের অনুমতি নিয়ে মন্দির ত্যাগ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই প্রবল বর্ষণ শুরু হল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। মন্দিরের বহিঃদেশের ছাদ যুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতি প্রাঙ্গণে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হল চম্পাকে। আর এরপরই একজন লোক প্রাকার তোরণ থেকে ছুটে এসে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নিল প্রাঙ্গণের ছাদের নীচে। চম্পার কিছুটা তফাতেই সে উঠে এসে দাঁড়াল। তার নাম না জানলেও অস্ত্রধারী লোকটাকে চেনে চম্পা। সর্বক্ষণ তোরণ পাহারা দেয় লোকটা। সে দ্বাররক্ষী।
প্রথমে সে চম্পাকে খেয়াল করেনি। কিন্তু তারপরই চম্পার দিকে দৃষ্টি গেল তার। এই প্রাসাদের লোকেরা বিনা প্রয়োজনে বাক্যালাপ করে না চম্পার সঙ্গে। ফুলমালা সজ্জিত সুন্দরী চম্পাকে দেখে এবং সম্ভবত তাকে বর্ষণ মুখর দিনে একাকী দেখে তার প্রতি আকর্ষণ জাগল সেই দ্বাররক্ষীর মনে। চম্পার দিকে তাকিয়ে হেসে সে প্রশ্ন করল, ‘শুনেছি, তুমি নাকি বিষ্ণু মন্দিরের শ্রেষ্ঠ নর্তকী ছিলে এ কথা কি সত্যি?’
চম্পা হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, অনেকে সেকথাই বলেন।’
সেই রক্ষী এবার কিঞ্চিৎ আত্মশ্লাঘার সঙ্গে নিজের আত্মপরিচয় দান করে বলল, “আমার নাম, খড়্গা। এ প্রাসাদের প্রধান দ্বাররক্ষী আমি।’
চম্পা মুহূর্তের মধ্যে চিন্তা করে নিল যে, এ লোকটাকে যদি তুষ্ট করা যায়, তবে ভবিষ্যতে তার সুবিধা হবে। উগ্রদেবের অনুমতি না মিললে এই লোকটির হয়তো সাহায্য লাভ করতে পারে নির্দিষ্ট দিনে এ প্রাসাদ ত্যাগ করার ব্যাপারে।
চম্পা তাই খড়্গ নামের সেই ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য বলল, ‘আপনি একজন সুদর্শন শক্তিমান পুরুষ। প্রধান দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব পরিচালনা করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিই বটে।’
সুন্দরী চম্পার কথা শুনে খুশি হল প্রধান দ্বাররক্ষী খড়্গা। গুল্ফ মর্দন করে সে বলল, “এ প্রাসাদের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রভু উগ্রদেব আমার ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। কারণ, এ প্রাসাদের প্রবেশ তোরণ আমার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্য প্রাসাদের মতো এ প্রাসাদে সবাইকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না এবং উগ্রদেবের অনুমতি ছাড়া কাউকে প্রস্থানও করতে দেওয়া হবে না। মহারাজের পার্ষদ উগ্রদেবের নির্দেশ মতো তাঁর এই প্রাসাদে মানুষের প্রবেশ-প্রস্থান আমিই নিয়ন্ত্রণ করি।’
চম্পা বলল, ‘প্রভু উগ্রদেব যে সঠিক ব্যক্তির হাতেই এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সমর্পণ করেছেন, তা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এ প্রাসাদে মানুষের গতিবিধির ওপর এত কঠিন নিয়ন্ত্রণ কেন?’
প্রধান দ্বাররক্ষী খড়্গা বলল, ‘কারণ, তাঁকে কেউ গুপ্ত হত্যার চেষ্টা করতে পারে। তার পিতাকেও তো…।’ কথাগুলো তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলেও খড়া শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বাক্যটা আর শেষ করল না। চম্পার অবশ্য বুঝতে অসুবিধা হল না খড়্গার অসম্পূর্ণ কথাটা। খড়া এরপর তাকে বলল, ‘সামনেই তো পূর্ণিমা তিথি। আর মাত্র দশ দিন বাকি। আমার কাজের দায়িত্ব আরও বেড়ে যাবে।’
চম্পা জানতে চাইল, ‘কেন?’.
সে জবাব দিল মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে বহু জন সমাগম হবে এই মন্দির নগরীতে। যাঁরা মহারাজার সভাসদ তাঁরাও নিজেদের পরিচিত লোকজনকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন এই উৎসব উপলক্ষ্যে। বেশকিছু অতিথির এ প্রাসাদেও আসার কথা উগ্রদেবের আমন্ত্রণে। তাঁরা এখানে এসে থাকবেন, বাইরে যাওয়া-আসা করবেন। কাজেই দ্বার রক্ষক হিসাবে আমাকে আরও দায়িত্ব পালন করতে হবে সে সময়। খেয়াল রাখতে হবে তাঁদের সঙ্গে কোনও অবাঞ্ছিত ব্যক্তি যাতে প্রাসাদে প্রবেশ করতে না পারে।’
এ কথা বলার পর দ্বাররক্ষক বলল, ‘আমার নৃত্য দেখার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ আছে। একসময় আমি নটী গৃহে যেতাম তাদের নাচ দেখার জন্য। কিন্তু দ্বাররক্ষীর দায়িত্ব গ্রহণের পর সে স্থানে যাওয়া আর আমার পক্ষে সম্ভব হয় না।’
এ কথা শুনিয়ে খড়্গা নামের দ্বাররক্ষী প্রধান যেন চম্পাকে বোঝাতে চাইল চম্পার নাচ দেখার ইচ্ছা আছে তার।
চম্পা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘সময় সুযোগ মতো আমি একদিন নাচ দেখাব তোমাকে।’
কথাটা শুনে খড়্গার চোখ চকচক করে উঠল। সে বলল, ‘সত্যি দেখাবে?’
চম্পা বলল, ‘হ্যাঁ, সত্যি। তবে গোপনে। প্রভু উগ্রদেব জানতে পারলে কূপিত হবেন। হয়তো দণ্ডও দিতে পারেন।’
দ্বাররক্ষী বলল, ‘হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। তিনি যেন জানতে না পারেন। তাঁর ক্রোধ বড় সাংঘাতিক। আমি গোপনেই তোমার নৃত্য দেখব। হয়তো তুমি জান যে এ মন্দিরে নর্তকীরা যখন বিগ্রহের সামনে নৃত্য প্রদর্শন করে তখন পুরোহিত ছাড়া অন্য কারও সেখানে উপস্থিত থাকা, অর্থাৎ নর্তকীদের নৃত্য দেখা নিষেধ। এমনটা না হলে আমার ইচ্ছাপূরণে সুবিধা হতো।’
এ কথা বলার পর হয়তো সে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু খড়মের খটখট শব্দ শোনা গেল। পুরোহিত বাইরের দিকে আসছেন। সতর্ক হয়ে গেল দ্বাররক্ষী। চোখের ইশারায় সে চম্পাকে বুঝিয়ে দিল, পরে কথা হবে। পুরোহিত বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তিনি চম্পা আর খড়্গার দিকে তাকালেন। তারা দু’জন এমনভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, যেন তাদের মধ্যে কোনও কথাবার্তাই হয়নি।
একইভাবে বেশ কিছুক্ষণ সেই স্থানেই দাঁড়িয়ে রইল সকলে। খানিক পরে তোরণের দিক থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। কে এসেছে তা দেখার জন্য দ্বাররক্ষী এগল তোরণের দিকে। আর তার কিছুক্ষণ পর চম্পাও মন্দির ত্যাগ করে বর্ষণের মধ্যেই রওনা হল নিজ কক্ষের দিকে। কক্ষে ফিরে চম্পা ভাবতে লাগল, যেভাবেই হোক ওই প্রধান দ্বাররক্ষীকে বশ করার চেষ্টা করতে হবে তাকে। লোকটাকে প্রলুব্ধ করেই মুক্তির পথ খুঁজতে হবে তাকে। উৎসবের আর মাত্র দশ দিন বাকি। যেভাবেই হোক ওইদিন পালাতে হবে তাকে।
মাঝে সামান্য সময়ের জন্য বৃষ্টির গতি একটু কমে এলেও বিকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রাবল্য আরও বাড়তে লাগল। চম্পা ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করতে লাগল বৃষ্টির প্রাবল্য যাতে কমে যায়। সে যাতে মন্দিরের মাথায় উঠে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। বিকাল হওয়ার পর চম্পার একবার মনে হল যে রোজকার মতো মন্দির শীর্ষে গিয়ে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল প্রবল বর্ষণের মধ্যে সে স্থানে গিয়ে উঠলে তাকে দেখে নিশ্চিত সন্দেহ জাগবে রক্ষীদের মনে। কাজেই এদিন সেই কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখল সে। বহ্নিকে দেখতে না পাওয়ার কারণে বিষণ্ণতায় মন ভরে গেল তার। রাত্রিকালে আহার গ্রহণ না করেই বহ্নির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল চম্পা। তবে বহ্নি কিন্তু সেদিনও এসেছিল সেই প্রবল বর্ষণ উপেক্ষা করে। চম্পাকে দেখতে না পেয়ে সেও বিষণ্ণ চিত্তে ফিরে গেল।” —একটানা কথাগুলো বলে থামল খামের নারী।
গাছের মাথার ফাঁক গলে বিষ্ণুলোকের শীর্ষদেশের এক অংশ চোখে পড়ছে। সেদিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল সে। খামের যুবতী তার কাহিনি শুনিয়ে চললেও তার মুখমণ্ডলে জেগে আছে স্পষ্ট চিন্তার ভাব! কথা বলতে বলতে এক মুহূর্তের জন্যও হাসির ভাব ফুটে ওঠেনি তার ঠোঁটের কোণে। কেমন যেন যান্ত্রিকভাবে অথবা গভীর চিন্তাগ্রস্তভাবে কথাগুলো স্বাগতকে শুনিয়ে চলেছে সে।
এরপর আবার সে বলতে শুরু করল, “ভোর রাতে শুকতারা যখন ফুটে ওঠে তখন চম্পার ঘুম ভাঙে। সে কক্ষ ত্যাগ করে বাগিচার পুষ্পচয়ন করতে যায় মালা গাঁথার জন্য। এদিনও নির্দিষ্ট সময়তেই ঘুম ভাঙল তার। আকাশে শুকতারা ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুলের সাজি নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করে বাগিচার দিকে এগল সে। প্রাসাদের প্রবেশ তোরণ, বাগিচার স্থানে স্থানে সে স্তম্ভগুলো রয়েছে সেখানকার মশালের আলোগুলো নিভুনিভু হয়ে এসেছে। প্রাসাদের অন্য লোকদের ঘুম ভাঙতে এখনও খানিক বিলম্ব আছে। প্রহরীর দল রাত্রি জাগরণের পর ঢুলছে। ভোরের আলো ফুটলে নতুন রক্ষীরা এলে তারা বিশ্রামে যাবে। প্রবেশ তোরণ থেকে পাথর বসানো পথ সোজা এগিয়েছে প্রাসাদের দিকে। সে পথের দু’পাশে বাগিচা। তারই একস্থানে পুষ্পচয়ন করতে শুরু করল চম্পা।
শুকতারা মুছে গিয়ে ভোরের আলো ফোটার উপক্রম হল। চম্পার পুষ্পচয়নের কাজ প্রায় শেষ এখন। বাগিচা ছেড়ে পাথর বাঁধানো পথে উঠে মন্দিরের দিকে যাওয়ার উপক্রম করছিল সে। হঠাৎ দেখতে পেল দু’জন নারীকে। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সামনের পথ ধরে এগিয়ে আসছে তারা। তাদের পরনে লম্বা ঝুলের পোশাক, মুখমণ্ডল অবগুণ্ঠনে ঢাকা। তাদের হাঁটার ভঙ্গিমা আর হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ফিরিয়ে চারপাশে তাকানো দেখে চম্পার মনে হল, সকলের অলক্ষে যেন তারা প্রাসাদ ত্যাগ করতে চাইছে! তাদের দেখে কৌতূহল সৃষ্টি হল চম্পার মনে। পথের গায়ে একটা স্তম্ভে তখনও মশাল জ্বলছে। সেই দুই নারীকে ভালোভাবে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে পড়ল চম্পা। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে সেই স্তম্ভর কাছে এগিয়ে এল সেই দুই অবগুণ্ঠনধারী। চম্পা শুনল, তাদের একজন অপরজনকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি চল। বিষ্ণুলোকে সবাই জেগে ওঠার আগেই আমাকে সেখানে ফিরে যেতে হবে। নইলে কারও মনে সন্দেহ জাগতে পারে।’
চম্পার মনে হল, এ কণ্ঠস্বর যেন সে কোথাও শুনেছে! স্তম্ভর পাশ কাটিয়ে তারা সোজা রাস্তা ধরে চলে গেল তোরণের দিকে। তোরণ খোলার অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল এরপর। চম্পা বুঝতে পারল তোরণ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল সেই দু’জন। আলো ফুটতে শুরু করল এরপর। চম্পাও রাস্তায় উঠে এগল নিজ কক্ষে ফেরার জন্য।
কিছুটা এগতেই সে দেখতে পেল তোরণের দিক থেকে হেঁটে আসছে দ্বাররক্ষী খড়্গা। পথের মধ্যে মুখোমুখি দেখা দু’জনের। লোকটাকে সন্তুষ্ট করে চম্পা তার কার্যোদ্ধার করবে এমনই পরিকল্পনা নিয়েছে। চম্পা তাকে বলল, ‘আমার কী সৌভাগ্য! সূর্যোদয়ের মুহূর্তেই আবারও তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়ে গেল! ভাগ্যবতী আমি।’
যদিও রাত্রি জাগরণের ফলে ক্লান্তির ছাপ লেগে আছে প্রধান দ্বাররক্ষীর মুখে, কিন্তু ভোরবেলা সুন্দরী-যুবতী চম্পার মুখে এ কথা শুনে দ্বাররক্ষী খড়্গ হেসে বলল, ‘আমারও ভালো লাগল তোমার দেখা পেয়ে।’
চম্পা তাকে বলল, ‘অন্য দিন তো তোমাকে এ সময় এ পথে দেখিনি? আমি তো প্রতিদিন এ সময় পুষ্পচয়ন করি।’
খড়্গা জবাব দিল, ‘এ প্রাসাদে সাধারণত বাইরের লোক তো কেউ আসে না। সূর্যাস্তের পর আমি আমার অধস্তন দ্বাররক্ষীদের কাছে তোরণের দায়িত্ব দিয়ে নিজ কক্ষে ফিরে যাই। কিন্তু গতকাল ঠিক সূর্যাস্তের সময়ই দু’জন এসে উপস্থিত হল উগ্রদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। আমি হয়তো তাদের ফিরিয়েই দিতাম। কিন্তু তারা অনুরোধ করতে লাগল মহারাজের সভাসদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার জন্য। শেষ পর্যন্ত আমি তাদের অনুরোধ ফেলতে পারলাম না। প্রাসাদে খবর পাঠালাম। উগ্রদেব আগ্রহ প্রকাশ করলেন তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। তাঁর এক পার্শ্বচর এসে প্রাসাদে নিয়ে গেল তাদের। কিন্তু গৃহস্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা কখন বাইরে বেরবে তা তো আমার জানা ছিল না। তার ওপর প্রায় শেষ রাত পর্যন্ত বৃষ্টি হল। তাই তোরণ সংলগ্ন কক্ষেই রয়ে গিয়েছিলাম আমি। সে দু’জন এখন ফিরে যাওয়ার পর আমি এখন বিশ্রাম নিতে যাচ্ছি।’
চম্পা বলল, ‘যে দু’জন নারীকে তোরণ অতিক্রম করে বাইরে যেতে দেখলাম ওরা কি তারাই?’
—খড়্গ বলল, ‘হ্যাঁ।’
চম্পা জানতে চাইল, ‘ওরা কারা?’
জবাবটা দিতে গিয়েও যেন চুপ করে গেল প্রধান দ্বাররক্ষী। সে বলল, ‘আমি এবার কক্ষে ফিরে যাই। খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার আমাকে ফিরে আসতে হবে।’
চম্পা বুঝতে পারল খড়্গা সে মুহূর্তে ওই দুই নারীর পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছে না। চম্পা তাকে বলল, ‘ঠিক আছে তুমি যাও। তবে যাওয়ার আগে এটা গ্রহণ কর।’—এই বলে সে তাকে খুশি করার জন্য ডাঁটা সমেত একটা ফুল এগিয়ে দিল তার দিকে। দ্বাররক্ষী হেসে ফুলটা গ্রহণ করার মুহূর্তে হঠাৎই তার আঙুলে দৃষ্টি পড়ল চম্পার। খড়্গার আঙুলে রয়েছে একটা স্বর্ণাঙ্গুরীয়। সর্প আকৃতির সেই অঙ্গুরীয়র মাথায় বসানো একটা সবুজ পান্না! সেই পুষ্প গ্রহণ করার পর খড়্গা আর দাঁড়াল না। আবার আমাদের সাক্ষাৎ হবে বলে সে রওনা হল তার বাসস্থানের দিকে। কিন্তু তার হাতে পরা অঙ্গুরীয়টা কোথায় যেন ইতিপূর্বে দেখেছে চম্পা! কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ওই অঙ্গুরীয়র পরিচয় স্পষ্ট হয়ে গেল চম্পার কাছে। দ্বাররক্ষকের আঙুলে পরা অঙ্গুরীয় হল সেই অঙ্গুরীয় যা উগ্রদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তাকে উপহার দিতে চেয়েছিল বিষ্ণুলোকের নর্তকী ভ্রামরী। অর্থাৎ কিছু সময় আগে যে দু’জন নারীকে সে এই প্রাসাদ ত্যাগ করতে দেখল তারা হল ভ্রামরী ও তার মাতা! শেষ পর্যন্ত তারা সাক্ষাৎ করতে সমর্থ হয়েছে উগ্রদেবের সঙ্গে। চম্পা অনুমান করল প্রধান দ্বাররক্ষী খড়্গাকে এই সর্পাঙ্গুরীয় উৎকোচ দিয়েই তারা সে সুযোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু ভ্রামরী আর তার মায়ের উগ্রদেবের সঙ্গে গোপন সাক্ষাৎ করার জন্য কী এমন প্রয়োজন ছিল! যে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাবার জন্য তারা উপস্থিত হয়েছিল চম্পার কাছে? অঙ্গুরীয় উৎকোচ দিতে চেয়েছিল তাকে? আর প্রবল বর্ষণ সিক্ত রাতে এ প্রাসাদে উপস্থিত হয়ে দ্বাররক্ষীকে দুর্মূল্য উৎকোচ দিয়ে সাক্ষাৎ করল উগ্রদেবের সঙ্গে। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে রহস্যজনক কিছু যে লুকিয়ে আছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না চম্পার। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরে এল। তারপর এ সব চিন্তা ছেড়ে সে ভাবতে লাগল তার প্রিয়তম বহ্নির কথা। উৎসবের মাঝে মাত্র কয়েকটা দিন। সে ভাবতে লাগল ওই দিন কীভাবে এই প্রাসাদ ত্যাগ করা যায়? যেভাবেই হোক কাজটা করতে হবে।’
এদিন মধ্যাহ্নে চম্পা নৃত্য প্রদর্শন করার জন্য উপস্থিত হল মন্দিরে। মন্দির প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে দেখল প্রাঙ্গণ থেকে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ মুখে দাঁড়িয়ে পুরোহিত কথা বলছেন একজনের সঙ্গে। লোকটার পরনে রাজকর্মচারীর পোশাক। পথ আগলে দাঁড়িয়ে তারা বাক্যালাপ করছে বলে তাদের কিছুটা তফাতে চম্পা দাঁড়িয়ে পড়ল। সেই রাজকর্মচারী পুরোহিতকে বলল, ‘ইতিমধ্যেই বিষ্ণুলোক তো বটেই, নগরীর প্রতিটা প্রাসাদ মন্দির সেজে উঠতে শুরু করেছে। অতিথি অভ্যাগতদের দলও একে একে উপস্থিত হতে শুরু করেছেন মন্দির নগরীতে। আপনার মতো এ নগরীর প্রতিটি মন্দিরের ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা ওই দিন বিষ্ণুলোকের তোরণ প্রাঙ্গণে উৎসবস্থলে আমন্ত্রিত। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন আপনাদের সকলকেই স্বর্ণসহ নানান উপহার প্রদান করবেন। আপনার নিমন্ত্রণের কথাটা মহারাজের সভাসদ উগ্রদেবকে জানিয়ে দিয়ে গেলাম।’
লোকটার কথা শুনে পুরোহিত উৎসাহ ভরে জানতে চাইলেন, “তিনি কী বললেন আপনাকে?”
রাজকর্মচারী বলল, “উগ্রদেব বললেন, তিনি আপনাকে ওই উৎসবস্থলে অবশ্যই পাঠাবেন। তাঁর বেশ কিছু অতিথিও নাকি থাকবেন সে স্থানে। তাছাড়া তিনি তো নিজেও ওইদিন বিষ্ণুলোক প্রাঙ্গণে অন্য সভাসদদের সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন।”
উগ্রদেবের অনুমতি ভিন্ন এ প্রাসাদের কেউ অন্য স্থানে যেতে পারে না। কাজেই উগ্রদেব ব্যাপারটাতে সম্মতি জানিয়েছেন শুনে স্বর্ণলাভের প্রত্যাশায় উৎফুল্ল ব্রাহ্মণ বললেন, ‘আমি অবশ্যই নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যাব।’
রাজকর্মচারী বলল, “ঠিক আছে, আমি এবার যাই। আমাকে আরও বেশ কয়েক স্থানে নিমন্ত্রণ জানাতে যেতে হবে।”
লোকটা প্রাঙ্গণ ছেড়ে বেরবার জন্য রওনা হওয়ার পর পুরোহিতের দৃষ্টি পড়ল চম্পার ওপর। তিনি উৎফুল্লভাবে চম্পাকে বললেন, ‘মহারাজের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে যে অনুষ্ঠান হবে সেখানে আমাকে নিমন্ত্রণ জানাতে এসেছিল এই রাজকর্মচারী।হওই উৎসব উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠান, আমোদের আয়োজন করা হবে মন্দির নগরীতে। আমি তো ওই দিন মধ্যাহ্নের আগেই সে স্থানে রওনা হয়ে যাব। আমার অনুপস্থিতিতে ওই দিন যেন দেবতার উদ্দেশে নৃত্য প্রদর্শনের কোনও ত্রুটি না হয়।’
