বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৮
পর্ব ৩৮
চস্পা মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল পুরোহিতের কথায়। তারপর এদিন সে নৃত্য প্রদর্শন করে নিজ কক্ষে ফিরে এল। গত দিন বৃষ্টির কারণে মন্দির শীর্ষে উঠতে না। পারার চম্পা দেখতে পায়নি তার প্রিয়তমকে। এদিন সূর্য ঢলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই সে উঠে পড়ল মন্দিরের মাথায়। কিছু সময়ের মধ্যে সে দেখতে পেল অশ্বপৃষ্ঠে তোরণের সামনে দিয়ে চিলা বহ্নিকে। মন্দিরের দিকে একবার সে তাকাল দূর থেকে। চম্পার যেন মনে হল সে বলছে, মাঝে তো আর মাত্র পাঁচটা দিন। এ কটা দিন ধৈর্য ধর। তারপরই আমরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাব অনেক দূরে।
ধীরে ধীরে চম্পার দৃষ্টিপথের আড়ালে হারিয়ে গেল বহ্নি। চম্পাও নীচে নেমে ফিরে এল তার কক্ষে। বাইরে সন্ধ্যা নামল। নিভৃত কক্ষে বসে চম্পা ভাবতে লাগল নির্দিষ্ট দিনে কী উপায়ে সে প্রাসাদ ত্যাগ করতে পারে। এ কাজটা তাকে করতেই হবে। এ কাজের ওপরই নির্ভর করছে তার ভবিষ্যৎ, তার বেঁচে থাকা। শেষ পর্যন্ত নানা কথা ভাবার পর চম্পা বুঝতে পারল এ স্থান থেকে তাকে পালাতে হলে ওই খড়্গা নামের দ্বাররক্ষী প্রধানকেই কোনওভাবে হাত করতে হবে। লোকটা অসৎ, সে উৎকোচ গ্রহণ করে, তার ওপর সে আকৃষ্ট হয়েছে তার প্রতি। এ সুযোগটাই তাকে কাজে লাগাতে হবে। মনে মনে একটা পরিকল্পনা সে ছকে নিল দ্বাররক্ষীকে বশ করার জন্য। সে ঠিক করল পরদিন সে দ্বাররক্ষী খড়্গার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার চেষ্টা করবে। তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবে নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য।
এরপর বহ্নির কথা ভাবতে ভাবতে সে রাত কেটে গেল চম্পার।
পরদিন শুকতারা ফুটে ওঠার সময় চম্পার নিদ্রাভঙ্গ হল ঠিকই। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সে বাইরে বেরল না। সাজি হাতে সে পুষ্প চয়ন করতে বেরল ভালো করে আলো ফুটে ওঠার পর। প্রাসাদ এখন জেগে উঠতে শুরু করেছে। পথ সংলগ্ন বাগিচাতে প্রবেশ করে সে ধীরে ধীরে পুষ্প চয়ন করতে করতে খেয়াল করতে লাগল পথের দিকে। একসময় সে দেখতে পেল প্রাসাদের দিক থেকে খড়্গা আসছে প্রবেশ তোরণে যাওয়ার জন্য। চম্পা আসলে তার প্রতীক্ষাতেই ছিল। খড়্গা কাছাকাছি আসতেই সে বাগিচা ছেড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাকে দেখে খড়াও দাঁড়িয়ে পড়ল। মৃদু বিস্ময়ও ফুটে উঠল তার চোখে। খড়্গা তাকে বলল, ‘আলো তো অনেক আগেই ফুটে গেছে। তুমি এতক্ষণে এ স্থানে কেন?’
চম্পা বলল, ‘মধ্যরাত্রি পর্যন্ত তোমার কথা ভাবতে ভাবতে তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই নিদ্রা ভঙ্গ হতে বিলম্ব হয়েছে। তাছাড়া বিশেষ কারণবশত আমি তোমার সঙ্গে বাক্যালাপ করার জন্যই এখানে তোমার প্রতীক্ষায় ছিলাম।’
দ্বিপ্রহরে মন্দির প্রাঙ্গণ সত্যিই নির্জন হয়ে যায়। মধ্যাহ্নে বিগ্রহর সামনে নৃত্য প্রদর্শন করার পর প্রথমে নিজ কক্ষে ফিরে এল চম্পা তারপর দৈনন্দিন কিছু কাজ সমাধা করে কিছু সময় পর দ্বিপ্রহরে সে গিয়ে উপস্থিত হল মন্দির প্রাঙ্গণে।
খড়্গার মুখ উৎফুল্ল হয়ে উঠল চম্পার কথা শুনে। সে বলল, ‘মধ্যরাত পর্যন্ত তুমি আমার কথাই ভাবছিলে! বল কী বলার আছে তোমার?’
চম্পা বলল, ‘হ্যাঁ, আছে। তবে এ স্থানে সে কথা বলা যাবে না। দ্বিপ্রহরে তুমি মন্দিরে আসতে পারবে? পুরোহিত সে সময় মন্দিরে থাকে না। দেবতাকে প্রণাম করার জন্য তুমি তো মন্দিরে উপস্থিত হতেই পার তাই না? এটুকু বলতে পারি, তুমি যদি আসো তবে লাভবান হবে। আসবে কি?’
একে সুন্দরী নারীর আহ্বান, তার ওপর আবার লাভবান হওয়ার প্রতিশ্রুতি। ব্যাপারটা প্রত্যাখ্যান করতে পারল না প্রধান দ্বাররক্ষী খড়্গা। সে বলল, ‘যদিও আজ থেকে আমার কর্মব্যস্ততা শুরু হবে। গৃহস্বামীর আমন্ত্রণে বিশেষ অতিথিদের আজ কালের মধ্যেই আসার কথা। ঠিক আছে আমি সাক্ষাৎ করব তোমার সঙ্গে। কিন্তু ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে।’
চম্পা বলল, ‘এ ব্যাপারে তুমি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পার।’
এরপর খড়গ আর দাঁড়াল না। এই নর্তকীর সঙ্গে সূর্যালোকে প্রকাশ্য স্থানে দাঁড়িয়ে বেশিক্ষণ বাক্যালাপ করলে অন্যদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে। তাই সে রওনা হল তোরণের দিকে। আর চম্পাও রওনা হল তার কক্ষে ফেরার জন্য।
দ্বিপ্রহরে মন্দির প্রাঙ্গণ সত্যিই নির্জন হয়ে যায়। মধ্যাহ্নে বিগ্রহর সামনে নৃত্য প্রদর্শন করার পর প্রথমে নিজ কক্ষে ফিরে এল চম্পা তারপর দৈনন্দিন কিছু কাজ সমাধা করে কিছু সময় পর দ্বিপ্রহরে সে গিয়ে উপস্থিত হল মন্দির প্রাঙ্গণে। কিছু সময়ের মধ্যেই চম্পার প্রত্যাশামতো সে স্থানে হাজির হল প্রধান দ্বাররক্ষী খড়া। চম্পা তাকে নিয়ে উপস্থিত হল প্রাঙ্গণের পশ্চাৎভাগে এমন একস্থানে যে স্থান বাইরেথেকে সহজে নজরে আসে না। খড়া তাকে বলল, ‘তোমার কী কথা বলার আছে তা দ্রুত বলে ফেল। আমাকে এখনই আবার তোরণে ফিরতে হবে।’
চম্পা বলল, ‘হ্যাঁ, বলছি। তোমাকে দেখে আমার মনে হয়েছে তুমি একজন ভরসাযোগ্য মানুষ। তাছাড়া তোমার সুপুরুষ চেহারাও আমাকে আকর্ষণ করেছে। তাই আমি তোমার কাছে কিছু জিনিস গচ্ছিত রাখতে চাই। অবশ্য তার অর্ধেক ভাগ তুমি পাবে।’
খড়্গ জানতে চাইল, “কী জিনিস?”
চম্পা তার পোশাকের আড়ালে রাখা একটা রেশমের থলি বার করে তা খুলে একমুঠো স্বর্ণমুদ্রা বের করল। যে মুদ্রাগুলো তাকে বহ্নি দিয়েছিল।
স্বর্ণমুদ্রা দেখেই খড়্গার চোখ চকচক করে উঠল।
চম্পা তাকে বলল, ‘এ প্রাসাদে আমি নতুন। আমার এ স্থানে কোনও ভরসাযোগ্য ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় নেই। আমি যে কক্ষে থাকি তা নির্জন স্থানে অবস্থিত। আমি যখন এ মন্দিরে আসি অথবা পুষ্প চয়ন করতে যাই তখন সে কক্ষ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। তাই এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো আমি তোমার কাছে গচ্ছিত রাখতে চাই। শুধু এ কটি স্বর্ণমুদ্রাই নয়, ভবিষ্যতে এক কলস পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রাও আমি তোমাকে দেব গচ্ছিত রাখার জন্য। যার অর্ধেক অংশ তুমি পাবে। অবশ্য তা সংগ্রহ করার জন্য তোমার সাহায্যর প্রয়োজন হবে আমার।’
চম্পার কথা শুনে খড়্গ বিস্মিত হয়ে বলল, “এক কলস এমন স্বর্ণমুদ্রা! এত স্বর্ণমুদ্রা তুমি কোথায় পেলে?”
চম্পা বলল, ‘আমি বিশ্বাস করে কথাটা তোমাকে বলছি, কিন্তু অন্য কেউ জানতে পারলে তাতে তোমার আমার দু’জনেরই ক্ষতি হবে। স্বর্ণলাভ থেকে তুমিও বঞ্চিত হবে।’
লোভী দ্বাররক্ষী খড়্গ বলল, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পার। সে কথা কেউ কোনও দিন জানবে না। আর তোমাকে ভবিষ্যতে কোনও সাহায্য করার প্রয়োজন হলে আমি তা করার চেষ্টা করব।’
চম্পা বলল, ‘তাহলে শোন, এই মুদ্রা আমি পেয়েছি মন্দির নগরীর এক পরিত্যক্ত গৃহ থেকে। চামেদের আক্রমণের সময় সে গৃহ পরিত্যক্ত হয়। গৃহবাসীরা আর সে গৃহে ফিরে আসেনি অথবা চামেদের হাতেই তাদের মৃত্যু হয়। আমি একদিন সেই পরিত্যক্ত গৃহের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই বৃষ্টি নামে। আশ্রয় নেওয়ার জন্য আমি সেই গৃহে প্রবেশ করি। কৌতূহলবশত আমি সেই গৃহের মধ্যে ঘুরতে শুরু করি। তারপর এক কুলুঙ্গির মধ্যে থেকে খুঁজে পাই মোহরের কলস। তার মধ্যে থেকে কিছু স্বর্ণমুদ্রা সংগ্রহ করে আমি বিষ্ণুলোকে আমার গৃহে নিয়ে আসি। ভেবেছিলাম বাকি মুদ্রাগুলো ধীরে ধীরে নিয়ে আসব। কিন্তু তার আগেই আমাকে বিষ্ণুলোক থেকে এ স্থানে নিয়ে আসা হল।’
খড়্গা বলল, ‘অর্থাৎ মুদ্রাগুলো এখনও সে গৃহেই আছে?’
স্বর্ণমুদ্রার থলিটা খড়্গার হাতে তুলে দিয়ে চম্পা বলল,
‘হ্যাঁ, সেই কলস এখনও সেই স্থানেই আছে। আমি কলসটাকে গৃহের মধ্যেই একস্থানে মাটির নীচে লুকিয়ে রেখে এসেছি যে স্থান অন্য কারও পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তুমি যদি একদিন কিছু সময়ের জন্য আমাকে এ প্রাসাদ থেকে বাইরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পার তবে মুদ্রাগুলো আমি নিয়ে আসতে পারি।’
চম্পার কথা শুনে দ্বাররক্ষী প্রধান খড়্গা বলল, ‘সে ব্যবস্থা হয়তো আমি করতে পারি ঠিকই। কিন্তু তাতে দু’জনেরই বিপদের সম্ভাবনা আছে। এ মন্দিরের পুরোহিত সেই সময় তোমার খোঁজ করতে পারে। অথবা প্রভু উগ্রদেবও কোনও কারণে তোমাকে ডেকে পাঠাতে পারেন। তখন তোমার খোঁজ না মিললে আমি বিপদে পড়ব। তিনি ক্ষমাহীন ব্যক্তি। হয়তো বা আমাকে কুমিরের মুখে ছুড়ে ফেলার আদেশ দিলেন। আর তোমাকেও।’
চম্পা বলল, “এ আশঙ্কার কথা আমার মাথাতেও এসেছিল। কিন্তু সে সম্ভাবনার থেকে বাঁচার একটা পথ আমি ভেবে রেখেছি।”
– “তা কেমন?” প্রশ্ন করল খড়গ।
চম্পা বলল, ‘মহারাজের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে যে উৎসব হবে সেদিন তো প্রভু উগ্রদেব বিষ্ণুলোকে যাবেন সে উৎসবে যোগ দিতে। আজ জানতে পারলাম এ মন্দিরের পুরোহিত সে স্থানে যাবেন। তাঁরা কেউ প্রাসাদে থাকবেন না। ওই দিন যদি আমি কিছু সময়ের জন্য বাইরে যাই তবে বিপদের সম্ভাবনা নেই। আমি বাইরে যাব আর কিছু সময়ের মধ্যেই ফিরে আসব।’
খড়্গর হাতে ধরা স্বর্ণমুদ্রার থলি। আর সেগুলোই যেন চম্পার কথার প্রতি বিশ্বাস জাগিয়ে তুলল লোভী দ্বাররক্ষীর মনে। একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘ঠিক আছে এ দিন যদি প্রভু উগ্রদেব আর এই মন্দিরের পুরোহিত প্রাসাদে না থাকেন তবে কিছু সময়ের জন্য যাতে তুমি বাইরে যেতে পার সে ব্যবস্থা করব আমি। তবে মনে থাকে যেন, যে স্বর্ণমুদ্রা তুমি আনবে তার অর্ধেক আমার।’
চম্পা হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আর সব মুদ্রাই তো তোমার কাছেই গচ্ছিত থাকবে। তোমার চিন্তা কী?’
খড়্গ মুদ্রার থলিটা তার পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে হেসে বলল, ‘একদিন একাকী আমায় তোমার নাচও কিন্তু দেখাতে হবে।’
চম্পা হেসে প্রত্যুত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’
মুদ্রার থলি নিয়ে ফিরে গেল দ্বাররক্ষী খড়্গ। সেদিন বিকালেও মন্দিরের মাথায় উঠে বহ্নির দর্শন লাভ করল চম্পা। উৎফুল্ল মনে সে রাতে বহ্নির কথা, তার আসন্ন মুক্তিলাভের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।” দীর্ঘক্ষণ ধরে একটানা তার কথাগুলো বলে থামল খামের যুবতী।
বিষ্ণুলোকের আড়ালে ইতিমধ্যে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে। সে দিকে তাকিয়ে খামের যুবতী স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘না, আমাকে থামলে চলবে না। আজই আমাকে এ কাহিনি শেষ করতে হবে।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, বল, প্রয়োজনে সূর্য ডোবার পরও না হয় আমি আজ আরও কিছু সময় থাকব।’
সেই খামের নারী এবার কিছুটা দ্রুত লয়ে তার কথা আবার বলতে শুরু করল— ‘মাঝে মাত্র তিনটে দিন। দ্বাররক্ষীর সঙ্গে কথা হয়ে যাওয়ার পর একই সঙ্গে উৎফুল্ল আর উৎকণ্ঠার ভাব কাজ করছে তার মনে। পরদিন সায়াহ্নে মন্দিরে নৃত্য পরিবেশন করার কথা ছিল চম্পার। কিন্তু মধ্যাহ্নে অন্য নর্তকীদের মধ্যে একজন এসে তাকে সংবাদ দিল পুরোহিত তাকে মন্দিরে শীঘ্র ডাকছেন।
চম্পা সেই সংবাদ শুনে মন্দিরে উপস্থিত হয়ে দেখল প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে পুরোহিত কথা বলছেন একজন অস্ত্রধারী রক্ষীর সঙ্গে। নাম না জানলেও সেই রক্ষীকে ইতিপুর্বে দেখেছে চম্পা। উগ্রদেবের বিশেষ আস্থাভাজন রক্ষী সে। বিষ্ণুলোক থেকে যে দু’জন রক্ষী তাকে এ প্রাসাদে নিয়ে এসেছিল এ লোকটা তাদেরই মধ্যে একজন। চম্পা পুরোহিতকে প্রণাম জানাবার পর পুরোহিত তাকে বললেন, ‘তোমাকে আর সন্ধ্যাকালে নৃত্য প্রদর্শন করতে হবে না। উগ্রদেব নির্দেশ পাঠিয়েছেন অতিথিদের নৃত্য প্রদর্শন করার জন্য। আপাতত কিছুদিন তোমাকে প্রাসাদের অভ্যন্তরে থাকতে হবে। উৎসব শেষে অতিথিরা বিদায় নেওয়ার পর উগ্রদেব যখন আবার নির্দেশ দেবেন তখন তুমি মন্দিরের কার্যে নিয়োজিত হবে। ষণ্ড নামের এই রক্ষীকে উগ্রদেব পাঠিয়েছেন তোমাকে প্রাসাদের অভ্যস্তরে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তোমার প্রয়োজনীয় বস্তু ইত্যাদি সামগ্রী নিয়ে এসো। ষণ্ড তারপর তোমাকে প্রাসাদের ভিতর নিয়ে যাবে।’
উগ্রদেবের নির্দেশ অমান্য করার ক্ষমতা নেই কারও। চম্পা কক্ষে ফিরে গিয়ে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে হাজির হল মন্দিরের কাছে। এরপর সে যণ্ড নামের রক্ষীর সঙ্গে গিয়ে প্রবেশ করল উগ্রদেবের প্রাসাদের অভ্যন্তরে। এর আগে একদিনই প্রাসাদ অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিল সে। যেদিন তাকে এই স্থানে প্রথম আনা হয়েছিল সেই দিন চম্পা অনুভব করল কেমন যেন একটা হিম শীতল পরিবেশ বিরাজ করছে প্রাসাদের অভ্যন্তরে। স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে আছে উগ্রদেবের প্রাসাদ রক্ষীরা। কী শীতল তাদের চোখের চাহনি। সারা প্রাসাদের অভ্যন্তরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কক্ষগুলোর দরজাতে ভারী পর্দা ঝুলছে। তার ভিতর কেউ আছে কি না বোঝা দুষ্কর। কক্ষ সংলগ্ন বেশ কয়েকটা অলিন্দ্য পেরিয়ে, প্রাসাদের গোলক ধাঁধা অতিক্রম করতে করতে ষণ্ড প্রথমে তাকে এনে দাঁড় করাল এক বৃহৎ কক্ষের সামনে। চম্পাকে সে কক্ষ চিনিয়ে দিয়ে ষণ্ড বলল, ‘এটি প্রমোদকক্ষ। আজ থেকে প্রতি রাত্রিতে প্রভু উগ্রদেবের নির্দেশ মতো তাঁর অতিথিদের মনোরঞ্জন করবে তুমি।’ কক্ষ চম্পাকে চিনিয়ে দেওয়ার পর কয়েকটা কক্ষ অতিক্রম করে এক ক্ষুদ্র কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত করে রক্ষী বলল, ‘এই তোমার বাসস্থান। তোমাকে একটা কথা জানিয়ে রাখি যে, প্রভু উগ্রদেব যতদিন পর্যন্ত না নির্দেশ দেবেন ততদিন এ প্রাসাদের বাইরে পা রাখতে পারবে না তুমি। এমনকী বিনা প্রয়োজনে প্রাসাদের অন্য স্থান বা কক্ষেও প্রবেশ নিষিদ্ধ। নচেৎ প্রভু শাস্তি দেবেন।’
কথাটা শুনে মনে মনে আঁতকে উঠল চম্পা। প্রাসাদের বাইরে না বেরলে সে বহ্নিকে দেখবে কীভাবে? চম্পা একটা কৌশল করার চেষ্টা করল। সে বলল, ‘সূর্যাস্তের আগে একবার ফুল সংগ্রহ করার জন্য তো আমার একবার বাগিচাতে যাওয়া প্রয়োজন। ফুল মালায় সজ্জিত না হলে আমি অতিথিদের নৃত্য প্রদর্শন বা মনোরঞ্জন করব কীভাবে?’
কিন্তু তার এ কথায় কোনও সদর্থক উত্তর মিলল না।
রক্ষী বলল, ‘তোমার নৃত্য প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় ফুল ও অন্যান্য সামগ্রী রক্ষী বা দাসীরা এসে দিয়ে যাবে। তার জন্য বাগিচায় যেতে হবে না তোমাকে। সূর্য ডোবার পর তুমি প্রস্তুত হয়ে হোক। আমি এসে তোমাকে প্রমোদ কক্ষে নিয়ে যাব।’
এই বলে ষণ্ড নামক সেই রক্ষী চলে গেল। সে চলে যাওয়ার পর কক্ষে প্রবেশ করে দ্বার বন্ধ করে চম্পা নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার মনে হতে লাগল বহ্নির সঙ্গে আর যদি দেখা না হয় তার! মাঝের ক’দিন তাকে দেখতে না পেয়ে বহ্নি যদি ভাবে যে চম্পাকে আর সে পাবে না। তখন? সে যদি নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট স্থানে চম্পাকে নিতে না আসে তখন কী হবে। সবচাইতে বড় কথা সে যদি প্রাসাদের বাইরে যেতে না পারে তখন কী হবে? তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মনের বিহ্বল ভাব কাটিয়ে ফেলল চম্পা। সে মনে মনে বলতে লাগল, ‘এ কদিন আমার দেখা পাক বা না পাক নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট স্থানে যে নিশ্চয়ই আমার জন্য প্রতীক্ষা করবে। আর সে ভাবেই হোক আমি প্রাসাদ ত্যাগ করে ওই দিন নির্দিষ্ট স্থানে তাঁর সঙ্গে মিলিত হব। ভগবান বিষ্ণু জানেন আমাদের ভালোবাসা সত্যি। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের মিলনের পথ প্রশস্ত করবেন।—এ কথা ভেবে চোখ মুছে বিছানায় উঠে বসল চম্পা। বিকালে এক রক্ষী এসে প্রয়োজনীয় পুষ্প-চন্দন দিয়ে গেল চম্পার কক্ষে। সে সব দিয়ে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করল চম্পা।
বিষ্ণুলোকের আড়ালে সূর্য অস্ত গেল একসময়। আঁধার নেমে এল মন্দির নগরীতে। তার কিছু সময় পর চম্পার কক্ষদ্বারে টোকা পড়ল। তাকে প্রমোদ কক্ষে নিয়ে যাওয়ার জন্য উপস্থিত হল রক্ষী ষণ্ড।
তার পিছন পিছন গিয়ে চম্পা সেই কক্ষে প্রবেশ করল। সুবৃহৎ সেই কক্ষ মশাল আর প্রদীপের আলোতে আলোকিত। স্তম্ভ-দেওয়ালে নগ্ন নারীমূর্তির সম্ভার। কক্ষের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে নৃত্য প্রদর্শনের জন্য মেঝেতে গালিচা পাতা, আর তাকে ঘিরে মখমলের গদিযুক্ত বেশ কিছু দারু নির্মিত কাঠের আসন। কয়েকজন সুবেশী নারী দামি সোমরস মদিরার পাত্র, খাদ্য সামগ্রী নিয়ে সে স্থানে উপস্থিত হয়েছে। তবে আসনগুলোতে যে অতিথিরা বসবেন তাঁরা এখনও সে কক্ষে উপস্থিত হননি। ষণ্ড, চম্পাকে এক স্থানে দাঁড়াবার নির্দেশ দিল। চম্পার মনে পড়ল বহ্নির কথা। সে নিশ্চয়ই আজও এসেছিল। চম্পার অদর্শনে হয়তো তার মনে অমঙ্গলের আশঙ্কা জেগে উঠতে পারে। এরপরই বহ্নির পরামর্শ মনে পড়ল তাঁর ‘উগ্রদেবকে সব সময় সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে। যাতে তাঁর তোমার প্রতি কোনও সন্দেহের উদ্রেক না হয়।’
