বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৩৯
পর্ব ৩৯
এই সব ভাবতে ভাবতেই কক্ষের অপর প্রান্তের একটা দরজা খুলে গেল। সেই দরজা দিয়ে প্রমোদ কক্ষে প্রথমে প্রবেশ করলেন উগ্রদেব। আর তাঁর পিছন পিছন আরও পাঁচজন ব্যক্তি। উগ্রদেবকে দেখেই কক্ষে উপস্থিত দাসী-ভৃত্যা-রক্ষীরা মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁকে প্রণাম জানাল, একই কাজ করল চম্পাও। অতিথিদের উদ্দেশে উগ্রদেব বললেন, ‘এই প্রমোদ কক্ষ আপনাদের জন্য দিবা-রাত্রি প্রস্তুত থাকবে। আমার অবর্তমানেও যখন ইচ্ছা আপনারা এ স্থানে উপস্থিত হতে পারবেন। আপনাদের আমোদের জন্য সব কিছু প্রস্তুত থাকবে এ স্থানে। আপনারা আসন গ্রহণ করুন।’ এ কথা বলে উগ্রদেব রৌপ্য ও দারুকাঠ নির্মিত একটি আসনে উপবেশন করলেন। তারপর অতিথিরাও আসন গ্রহণ করলেন। তারা চম্পার নৃত্য দেখার আগে দাসীরা অতিথিদের কাছে উপস্থিত হয়ে সোমরস পরিবেশন করতে শুরু করল। চম্পা দেখতে লাগল তাদের। রুক্ষ চেহারার লোকজন সব, কারও কারও চেহারাতে ক্লান্তি ও ফুটে আছে। তাদের মধ্যে হঠাৎই একজন লোককে দেখে চম্পার মনে হল তাকে যেন ইতিপূর্বে সে কোথাও দেখেছে। কয়েক মুহূর্তর মধ্যেই লোকটাকে চিনতে পেরে চম্পা বিস্মিত হয়ে গেল। লোকটার নাম কালচক্র। যে চাম সৈন্যদলের সঙ্গে সে এ দেশে এসেছিল, সে দলেই ছিল কালচক্র নামের এই তিরন্দাজ! চম্পা এরপর ভালো করে অন্য অতিথিদের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই বুঝতে পারল তারা খামেরদের মতো পোশাক পরিধান করে থাকলেও তারা আসলে চাম জনগোষ্ঠীর লোক! খামেদের চিরশত্রু চামেরা এ প্রাসাদে কেন? মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন কি তবে তাঁর শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়েছেন? অথবা দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে কোনও রাজনৈতিক কারণে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী? সে জন্যই তাদের নিজের জন্ম উৎসবে আমন্ত্রণ করে এনেছেন!
চম্পা ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। অতিথিদের মদ্য পরিবেশনের পর উগ্রদেব নির্দেশ দিলেন, ‘নর্তকী, নৃত্য শুরু কর।’
সবাইকে মাথা নত করে প্রণাম জানিয়ে চম্পা তার নৃত্য প্রদর্শন শুরু করল। তার পদসঞ্চার, ঘুঙুরের শব্দে ধীরে ধীরে মুখরিত হয়ে উঠতে লাগল প্রমোদ কক্ষ। একের পর এক নৃত্য প্রদর্শন করে চলল চম্পা। যুদ্ধবাজ জাতি চামেদের নৃত্য ও মদিরার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ আছে। যে কারণে যুদ্ধক্ষেত্রেও তারা নর্তকীদের সঙ্গে নিয়ে যায়। তাদের মদিরার পাত্র পূর্ণ করে দিতে লাগল দাসীরা। তা পান করতে করতে চম্পার আশ্চর্য সুন্দর নৃত্য উপভোগ করতে ‘লাগল চামেরা। মাঝে মাঝে উল্লসিত শব্দও করতে লাগল তারা। তবে উগ্রদেব চম্পার নৃত্যর প্রতি তেমন আকৃষ্ট হয়েছেন বলে তার মনে হল না। তিনি যেন গভীরভাবে কিছু ভেবে চলেছেন বলে মনে হল চম্পার। তার নৃত্য দেখে উগ্রদেবের মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না।
দীর্ঘক্ষণ নেচে চলল চম্পা। একসময় যখন চামেরা মদিরার নেশায় কেউ ঢুলতে শুরু করল, কেউ বা অসংলগ্ন প্রলাপ করতে শুরু করল তখন উগ্রদেব ইঙ্গিতে নাচ থামাতে নির্দেশ দিলেন। থেমে গেল চম্পা। আর এরপর উগ্রদেব অতিথিদের নিয়ে কক্ষ ত্যাগ করলেন। চম্পাও ফিরে গেল তার কক্ষে।” —এ কথা বলতে বলতেই হঠাৎই উঠে দাঁড়াল খামের যুবতী। তারপর আক্ষেপের স্বরে বলে উঠল, ‘না, আমার গল্প আর শেষ করা হল না! আর মাত্র সামান্য অংশ বাকি ছিল। তোমাকে শোনানোর খুব দরকার ছিল সেটা।’
সূর্য যদিও বিষ্ণুলোকের আড়ালে চলে গেলেও স্বাগত বলল, ‘তবে কাহিনিটা শেষ করে যাও তুমি। আমার আরও কিছুটা সময় থাকতে কোনও আপত্তি নেই।’
প্রত্যুত্তরে খামের যুবতী বলল, ‘আবার সেই পূর্ণিমা আসছে! হাজার বছর পর সেই আষাঢ় পূর্ণিমা। জানি না আর তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারব কি না? আমি অন্যের চোখে ধরা দিতে চাই না।’ আর এ কথা বলেই সে বাইরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করল সে স্থান ত্যাগ করার জন্য। তার অঙ্গুলি নির্দেশ অনুসরণ করে স্বাগত দেখতে পেল প্রফেসর রামমূর্তি আসছেন! তাঁকে দেখে স্বাগত গাছে ঘেরা অংশর বাইরে বেরিয়ে এল। তাঁরা দু’জন কাছাকাছি এসে উপস্থিত হল। প্রফেসর চারপাশে ভালো করে তাকালেন। স্বাগতর মনে হল, বিশেষত যে স্থানে সেই পাথরের ফলকের ওপর খোদিত নারী-মূর্তিটা ছিল, সেই শূন্যস্থানের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য যেন তার চোখের দৃষ্টি থেমে গেল।
স্বাগত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, ‘আমি অনুমান করছিলাম, তোমাকে এখানেই পাওয়া যাবে, তাই চলে এলাম।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, এ জায়গাতে বসে থাকতে আমার খুব ভালো লাগে। তাই চলে আসি।’
তিনি একবার বিষ্ণুলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সন্ধ্যা হয়েছে। চল, এবার ফেরা যাক। ফিরতে ফিরতে কথা বলি।’
তারা দু’জন মন্দিরের দিকে ফেরার জন্য পা বাড়াল। কয়েক কদম হাঁটার পর তিনি বললেন, ‘তোমার সঙ্গে একটা ব্যাপারে একটু আলোচনা করে নিতে চাই।’
—‘কী?’ জানতে চাইল স্বাগত।
স্বাগতকে একটু অবাক করে দিয়ে প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘ভাবছি, মন্দিরের অনুসন্ধানের কাজ কিছু দিনের জন্য বন্ধ রাখব, আর তেমন মনে করলে এ মন্দিরের কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেব।’
স্বাগত প্রশ্ন করল, ‘হঠাৎ আপনি এ কথা ভাবছেন কেন?’
রামমূর্তি স্যর জবাব দিলেন, ‘দুটো কারণে এ ভাবনাটা আমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে তো আমরা মন্দিরে খোঁজাখুঁজি করলাম, কিন্তু তেমন কিছুই পাওয়া গেল না যাতে এ মন্দিরের পরিচয় সম্পর্কে আমরা অবগত হতে পারি। এমনও হতে পারে আমাদের অনুসন্ধান পদ্ধতি ভুল হচ্ছে। নতুন ভাবনা নিয়ে যদি অনুসন্ধান করতে হয় তবে তার পরিকল্পনা রচনার জন্য আমার কিছু দিন সময় দরকার। সেই জন্যই কিছু দিন কাজ স্থগিত রাখা দরকার। অযথা পরিশ্রম করে লাভ কী? আর মন্দিরের থেকে আমার কাজ উঠিয়ে নেওয়ার ভাবনাটা আমার মাথায় আসছে তোমাদের নিরাপত্তার কারণে। গাইড ফঙ-এর মৃত্যুটা বড় রহস্যময়। তাছাড়া ওই কুমির দেখার ঘটনাসহ আরও বেশ কিছু ঘটনাও রহস্যময়। আমি ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কেউ বা কারা নজর রাখছে এ মন্দিরের ওপর। হয়তো তাদের ধারণা এ মন্দিরে গুপ্তধন জাতীয় কোনও সম্পদ লুকানো আছে, অথবা তারা অন্য কোনও কারণে চায় না যে, আমরা এ মন্দিরে থাকি। আমাদের এখান থেকে সরাবার জন্য তারা চেষ্টা শুরু করতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি তোমাদের কারও কোনও ক্ষতি হয় তার দায়ভার আমাকেই বহন করতে হবে। আমিই তো তোমাদের এখানে কাজের জন্য এনেছি। কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভাবনাটা সে কারণেই আমার মাথায় আসছে।’
প্রফেসর রামমূর্তির কথা শুনে স্বাগত বলল, ‘আপনি কাকে বা কাদের সন্দেহ করছেন যারা এ মন্দিরের ওপর নজর রাখছে, বা আমরা এ মন্দির থেকে চলে যাই তা চাইছে?’
একটু চুপ করে থেকে প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘নারেঙ খাম হতে পারে, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব হতে পারেন, আবার এমন কেউ বা কারা হতে পারে যাদের আমরা চিনি না, জানি না। আর এই শেষ অংশ, যাদের আমরা চিনি না, সত্যিই যদি তাদের দিক থেকে বিপদ আসে তবে সেটা মারাত্মক হতে পারে। হয়তো তারাই খুন করেছে ফঙকে।’
স্বাগত বলল, ‘আপনি যদি সাময়িকভাবে কিছু দিনের জন্য কাজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আমরা কী করব? কোথায় থাকব? নাকি দেশে ফিরে যাব?’
রামমূর্তি বললেন, ‘সাময়িকভাবে কাজ স্থগিত রাখলেও তোমাদের থাকার ব্যাপারটা সিয়েমরিপেই করব। কয়েকদিনের জন্য দেশে ঘুরে আসতে পারতে তোমরা। সে ক্ষেত্রে তোমাদের সঙ্গে নাতাশাকেও আমি পাকাপাকিভাবে দেশে পাঠিয়ে দিতে পারতাম। ওর যা মনের অবস্থা তাতে এ জায়গাতে ওকে আর কাজ করানো উচিত হবে না। এমন আতঙ্কিত অবস্থায় থাকলে কাউকে দিয়ে কাজ করালে অন্য কোনও বিপদ ঘটতে পারে। সমস্যাটা তৈরি হল ফঙ খুন হওয়াতে। এ অবস্থায় আমাদের দেশ ছাড়ার ক্ষেত্রে পুলিসেরও অনুমতির প্রয়োজন দরকার। সেটা যতক্ষণ না পাওয়া যাবে ততক্ষণ দেশে ফেরা যাবে না।’
কথা বলতে বলতে মন্দির চত্বরে পৌঁছে গেল দু’জন। ভাড়ার ঘরের কাছে দাঁড়িয়ে গল্প করছে অন্যরা। তাদের দিকে তাকিয়ে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার আগে রামমূর্তি স্বাগতকে বললেন, ‘কাজ বন্ধ করার ব্যাপারে বা এ জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়ে ওদের কাউকে এখনই কিছু বলার দরকার নেই। ভাবনাটা আজই আমার মাথায় এসেছে। আর একটু ভেবে নিই ব্যাপারটা নিয়ে। তবে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা দু’ দিনের মধ্যেই নেব। ইতিমধ্যে কিম আর বাকুমের সঙ্গেও আবার একবার কথা বলে নেব তাদের মতামত জানাবার জন্য।’
—এ কথা বলে তিনি হাঁটতে শুরু করলেন তাঁর ঘরের দিকে। আর স্বাগত গিয়ে দাঁড়াল অন্যরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। স্বাগত সেখানে উপস্থিত হতেই বিক্রম জানতে চাইল, ‘কোথা থেকে এলে দু’জনে? ‘
স্বাগত জবাব দিল, ‘কোথাও যাইনি। দু’জনে আশপাশে আলাদা আলাদা হাঁটছিলাম। ফেরার পথে দেখা হল, একসঙ্গে কথা বলতে বলতে ফিরলাম।’
প্রীতম জিজ্ঞেস করল, ‘স্যর, আমাদের কাজের ব্যাপারে কোনও পরিকল্পনার কথা বললেন নাকি?’
স্বাগত একটু চুপ করে থেকে উত্তর দিল, তিনি বললেন, ‘আগামী এক-দু’দিনের মধ্যেই তিনি তাঁর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেবেন।’
তার কথা শেষ হতে না হতেই নাতাশা বলল, ‘আমার আর একটা দিনও এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। আজ দুপুরেও একটা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছি আমি!’
—’কী স্বপ্ন?’ জানতে চাইল স্বাগত।
বিক্রম হেসে বলল, ‘ও স্বপ্ন দেখেছে, একজন মুকুট পরা রাজা। সে ওকে নিয়ে যেতে এসেছিল বিয়ে করবে বলে।’
নাতাশা ধমকের সুরে বিক্রমকে বলল, ‘তুমি চুপ কর। এসব ইয়ার্কি আমার আর ভালো লাগছে না। তোমরা কেউ আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছ না। আমার খুব ভয় করছে স্বপ্নটা দেখার পর থেকে।’
নাতাশার এ কথা শোনার পর পরিবেশটা হালকা করার জন্য বিক্রম কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু পাছে নাতাশা আরও খেপে ওঠে তাই সুরভী হাতের ইশারায় বিক্রমকে থামিয়ে দিল।
স্বাগতর প্রশ্নের উত্তরে নাতাশা বলল, “‘ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন। বিয়ে করতে নয়, সোনার মুকুট পরা কিন্তু ভয়ঙ্কর দেখতে মিশমিশে কালো একটা লোক স্বপ্নের মধ্যে আমাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছিল। স্বপ্নের মধ্যে দেখলাম আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম এই মন্দিরের মধ্যে। লোকটা হঠাৎ এসে উপস্থিত হল আমার সামনে। সে আমাকে বলল, ‘তুই খুব সুন্দর দেখতে তো! চল তোকে বিষ্ণুলোকে নিয়ে যাব।’
আমি বললাম, ‘আমি কোথাও যাব না।’
সে বলল, ‘তোকে যেতেই হবে।’
এরপর তার আরও কিছু লোকজন উপস্থিত হল। তারা আমাকে জোর করে এ মন্দির থেকে নিয়ে গেল বিষ্ণুলোকের সামনে পরিখার ধারে। লোকটা এরপর তার সঙ্গীদের বলল, ‘ওকে জলে ফেলে দে!’
আমি বললাম, ‘আমাকে জলে ফেলবে কেন?’
সে অট্টহাস্য করে বলল, ‘জ্যান্ত মানুষরা বিষ্ণুলোকে থাকতে পারে না।’
এরপরই লোকগুলো আমাকে জলে ফেলে দিল। আমি দেখলাম বিরাট বড় একটা কুমির এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। আর তারপরই আমার ঘুম ভেঙে গেল।” কথা শেষ করে মৃদু কেঁপে উঠল নাতাশা।
স্বাগত বুঝতে পারল, ‘ব্যাপারটা স্বপ্ন হলেও তার আতঙ্ক এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে নাতাশার মনকে। আর, নাতাশা যে লোকটার বর্ণনা দিল, সে লোকটার কথা শুনে স্বাগতর কেন যেন মনে পড়ে গেল খামের যুবতীর মুখে শোনা উগ্রদেবের চেহারার কথা।
স্বাগত নাতাশার মনে সাহস জোগাবার জন্য বলল, ‘আমরা সবাই তো একসঙ্গে আছি এখানে। তুমি ভয় পেও না। স্বপ্নের মধ্যে ভয়ঙ্কর ঘটনা আমরা প্রত্যেকেই কোনও না কোনও সময় দেখে থাকি। ওটা নিয়ে আর বেশি ভেব না।’ নাতাশা তার কথায় কোনও জবাব দিল না।
তারা কথা বলতে বলতেই অন্ধকার নেমে গেল। রান্নার কাজ শুরু করল তারা। রাত আটটার মধ্যেই খাওয়া সেরে যে যার ঘরে ফিরে গেল। ঘরে ফিরে কিছু কাজকর্ম সেরে স্বাগত বিছানায় শুয়ে পড়ল। খোলা জানলা দিয়ে বাইরের প্রাঙ্গণ, মন্দির তোরণটা দেখা যাচ্ছে। আকাশ আজ মেঘহীন। বেশ বড় চাঁদ উঠেছে তোরণের মাথার ওপর। প্রায় গোলাকৃতি চাঁদ। তার আকৃতি আর উজ্জ্বলতা দেখে স্বাগত বুঝতে পারল আর দু-তিন দিনের মধ্যেই পূর্ণিমা। আর এরপরই তার মনে পড়ল খামের যুবতীর বলা কথাটা —‘আবার সেই পূর্ণিমা আসছে! হাজার বছর পর সেই আষাঢ় পূর্ণিমা!’
গল্পটা আজ শেষ করে যেতে পারল না খামের যুবতী। হাজার বছর আগে আষাঢ় পূর্ণিমাতে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মণের জন্মোৎসবের দিন কিছু কি ঘটেছিল? খামের যুবতীর কথা শুনে স্বাগতর তেমনই অনুমান হচ্ছে। কিন্তু কী সেই ঘটনা? স্বাগত কি আর তা জানতে পারবে? আর তার সঙ্গে খামের যুবতীর দেখা হবে কি না সে ব্যাপারে ফিরে যাওয়ার আগে আশঙ্কা প্রকাশ করে গিয়েছে সে। সত্যিই যদি স্বাগতর আর তার সঙ্গে দেখা না হয় তাহলে হয়তো বা এ মন্দিরের রহস্য আর কোনও দিন জানা হবে না স্বাগতর প্রফেসরও তো এ মন্দির ছেড়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারে ভাবনা শুরু করেছেন। চাঁদের দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভাবতে ভাবতে স্বাগত এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।
পর দিন বেলা আটটা নাগাদ ঘর ছেড়ে চত্বরে বেরিয়ে এল স্বাগত। একে একে অন্যরাও চত্বরে এসে দাঁড়াল। মেঘমুক্ত আকাশ। সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে চারপাশ। জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। সবাই একসঙ্গে মিলিত হওয়ার পর স্বাগত সুপ্রভাত বিনিময়ের পর নাতাশাকে জিজ্ঞেস করল, ‘রাতে ঘুম ভালো হয়েছে তো?’
নাতাশা মৃদু হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
নাতাশা সত্যিই বেশ সুন্দরী। সকালের আলোতে তার মুখমণ্ডল আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। তা দেখে স্বাগতর মনে হল গতকালের ভয়ের ভাবটা যেন অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে সে। চারপাশের পরিবেশ এত সুন্দর যে তার প্রভাবে সকলের মুখমণ্ডলেই উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে নানা কথাবার্তা গল্প চালাল তারা। মন্দিরের বিষয়ে কোনও কথা নয়, নিজেদের পারিবারিক জীবন, স্কুল-কলেজের নানা কথা থেকে দেশের রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে নানান কথা। সবার মধ্যেই একটা চনমনে ভাব জেগে উঠতে শুরু করেছে। স্বাগতর ব্যাপারটা ভালো লাগল।
সুরভী এক সময় স্বাগতকে জিজ্ঞেস করল, ‘প্রফেসর কি আজ আমাদের দিয়ে কোনও কাজ করাবেন?’
প্রফেসরের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সেদিকে তাকিয়ে স্বাগত বলল, ‘আমাকে উনি কিছু জানাননি। দেখা যাক ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে কী বলেন?’
বিক্রম বলল, ‘আমাদের যদি কোনও কাজ না থাকে তবে সবাই মিলে সিয়েমরিপ থেকে ঘুরে আসা যেতে পারে। কারও কিছু কেনাকাটার দরকার থাকলে তা করাও যাবে, আর ভালো-মন্দ খাবারও খাওয়া যেতে পারে। আমার কিন্তু এর আগের দিন কুমিরের বার্গার খেতে দারুণ লেগেছিল!’
প্রীতম বলল, ‘প্রস্তাবটা মন্দ নয়। আমার শেভিং ব্লেডসহ টুকিটাকি কিছু কেনার আছে।’
সুরভী বলল, ‘এখানকার খামের মেয়েরা যে ধরনের পোশাক পরে সেরকম একটা পোশাকের সেট আমার কেনার ইচ্ছা আছে। দেশে নিয়ে গিয়ে পরব।’
নাতাশা বলল, ‘হ্যাঁ, প্রস্তাবটা মন্দ নয়, গেলে ভালোই হয়। তবে বলে রাখছি ওখানে যাওয়ার ব্যাপারে দুটো বিষয়ে আমার আপত্তি আছে। এক বুলের কুমির খামারে যাওয়া চলবে না, আর আমি ওসব কুমিরের মাংসর দোকানে খেতে যাব না।’
এরপর বিক্রম স্বাগতকে বলল, ‘প্রফেসর বাইরে এলে আমাদের কোনও কাজ না থাকলে সিয়েমরিপ যাওয়ার কথাটা তুমিই তবে তাঁকে বল।’
