বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪০
পর্ব ৪০
স্বাগত মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল তাদের কথায়। আবার নানা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে শুরু করল তারা। দেখতে দেখতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। এবার মৃদু গরম লাগতে শুরু করল। সূর্য মাথার ওপর বেশ খানিকটা উঠে গেছে। বিক্রম মৃদু অধৈর্যভাবে বলল, ‘প্রফেসর বাইরে বেরচ্ছেন না কেন?’
স্বাগত বলল, ‘হয়তো অনেক রাত পর্যন্ত ল্যাপটপে কাজ করেছেন, সে জন্য উঠতে দেরি হচ্ছে।’
বিক্রম বলল, ‘সিয়েমরিপ যেতে হলে দেরি না করাই ভালো। বেশি রোদ উঠলে ঘুরে বেড়াতে কষ্ট হবে। প্রফেসর এখনও যখন ওঠেননি তখন আজ তিনি আমাদের নিয়ে কাজে নামবেন বলে মনে হয় না। তুমি একবার গিয়ে প্রফেসরের ঘরের দরজাতে নক করে দেখ না উনি কী বলেন?’
বিক্রমের কথা শুনে একটু ইতস্তত করে প্রফেসরের ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল স্বাগত। ঠিক তখনই প্রায় ছুটতে ছুটতে চত্বরে উঠে এল কুলি সর্দার হেরুম। সে স্বাগতদের দিকে তাকিয়ে উত্তেজিতভাবে জিজ্ঞেস করল ‘প্রফেসর কই?’ প্রফেসর?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘তিনি ঘরেই আছেন।’- বলেই সে হেরুমের উত্তেজনা লক্ষ করে জানতে চাইল, ‘কিছু হয়েছে নাকি?’
হেরুম জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, কাছেই মারা পড়েছে একজন।’ জবাব দিয়েই হেরুম এগল প্রফেসরের ঘরের দিকে। তাকে অনুসরণ করল স্বাগতরা। হেরুম গিয়ে বেশ কয়েকবার কপাট ধাক্কা দেওয়ার পর দরজা খুললেন প্রফেসর। তাঁর মুখমণ্ডলে রাত জাগার চিহ্ন জেগে আছে বলেই স্বাগতর মনে হল। হেরুম তাঁকে উত্তেজিতভাবে বলল, ‘খুন। খুন হয়েছে স্যর! এখানে আসার পথে একটু আগেই ঘটনাটা জানতে পারলাম!’
প্রফেসর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে খুন হয়েছে? কোথায় খুন হয়েছে?’
হেরুম উত্তর দিল, ‘কাছেই, বেশি দূর নয় জায়গাটা। খুন হয়েছে হোয়াঙ নামের লোকটা। যে জুয়ার আড্ডা চালায়।’
—‘কীভাবে খুন হল? কারা খুন করল তাকে?’ আবারও প্রশ্ন করলেন রামমুর্তি৷
হেরুম উত্তর দিল, ‘লোকজন বলছে ভূতে খুন করেছে। দু’দিন আগে নাকি সে এখানে ব্যাঙ ধরতে এসেছিল। তারপর আজ এখানে তার লাশ উদ্ধার হয়েছে। লোকজন তেমনই বলাবলি করছে।’
স্বাগতর মনে পড়ল দু’দিন আগে সন্ধ্যায় মন্দিরে ফেরার। পথে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল হোয়াঙের। হেরুমের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন প্রফেসর। ইতিমধ্যে স্বাগত ছাড়াও অন্যরা প্রফেসরের ঘরের দরজাতে এসে উপস্থিত হয়েছে। স্বাগত, হেরুমকে জিজ্ঞেস করল, ‘ঠিক কীভাবে খুন করা হয়েছে ওকে?’
হেরুম বলল, “তা ঠিক জানি না। আপনারা কি লাশটা দেখতে যাবেন?”
স্বাগত তাকাল প্রফেসরের দিকে তাঁর ইচ্ছা জানার জন্য। প্রফেসর বললেন, ‘ঘটনাটা যখন এ মন্দিরের কাছেই তখন একবার গিয়ে দেখে আসা যেতে পারে।’
হেরুমের মুখে উত্তেজনাকর খবরটা শোনার পর অন্যদের সিয়েমরিপে যাওয়ার পরিকল্পনাটা হঠাৎই যেন চাপা পড়ে গেল। বিক্রম বলল, ‘আমিও তবে আপনাদের সঙ্গে ব্যাপারটা দেখে আসি স্যর।’
প্রীতম বলল, ‘আমিও যাব।’
প্রফেসর বললেন, ‘এক মিনিটা দাঁড়াও। আমি পোশাকটা বদলে নিই।’ দরজা বন্ধ করলেন তিনি। নাতাশা এরপরই বলে উঠল, ‘আমি কিন্তু ওসব দেখতে যেতে পারব না। আমি এখানেই থাকব। আর আমার সঙ্গে কাউকে থাকতে হবে। একা ফেলে রেখে যাওয়া চলবে না।’
খুনের ঘটনাটা জেনে আবার স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছে নাতাশার মুখে। নাতাশার কথা শুনে সুরভী বলল, ‘ঠিক আছে আমি যাচ্ছি না। আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।’
প্রফেসর কয়েক মিনিটের মধ্যেই পোশাক বদলে তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। সুরভী আর নাতাশাকে রেখে তারা চতুর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। হেরুমকে অনুসরণ করে এগল তারা।
হেরুম তাদের যে জায়গাতে নিয়ে উপস্থিত হল সেখানে বিকালবেলায় খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আসে স্বাগত। গাছে ঘেরা যে জায়গায় তারা দু’জন বসে কথা বলে ঠিক তার বাইরে ফাঁকা জমিটার বিপরীতে জঙ্গলের ভিতর ঘটনাটা ঘটেছে। অর্থাৎ দু’দিন আগে পর্যন্ত সেই পাথুরে নারী মূর্তি যেখানে অবস্থান করছিল, সে জায়গার খুব কাছেই ঘটনাটা ঘটেছে। কারণ স্বাগতরা দেখল সেখানে জঙ্গলের ভিতর বেশ কিছু স্থানীয় মানুষ যাওয়া আসা করছে। ফাঁকা জমিটার মধ্যে পুলিসের গাড়িসহ আরও বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে জায়গায় পৌঁছে স্বাগত একবার তাকাল গাছে ঘেরা যে জায়গায় বসে সে খামের যুবতীর কথা শোনে সেখানে। আলো-আঁধারি খেলা করছে সেখানে। সেদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে অকুস্থলের দিকে পা বাড়াল স্বাগত। জঙ্গলের ভিতর বেশি প্রবেশ করতে হল না। স্বাগতদের। কিছুটা এগিয়েই এক জায়গাতে প্রাচীন স্থাপত্যের কিছু প্রস্তর খণ্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। সেখানেই একটা জায়গা ঘিরে পুলিসসহ স্থানীয় কিছু মানুষের ভিড়। স্বাগতরা সেই ভিড়ে উপস্থিত হয়ে ভিতরে তাকাল। একটা দেহ সেখানে কাত হয়ে পড়ে আছে। পরনে বর্ষাতির মতো পোশাক। বুকের কাছের বোতামগুলো খুলে যাওয়াতে সোনালি ড্রাগনের ছবি আঁকা লাল টি-শার্টের খানিক অংশ দেখা যাচ্ছে। মৃতদেহের মাথাটা একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢাকা দিয়েছে সম্ভবত পুলিসের লোকেরাই। বেশ খানিকটা ফুলেও উঠেছে দেহটা। মৃদু পচা গন্ধও এসে লাগছে স্বাগতর নাকে। স্বাগতরা দেখল পুলিস অধিকর্তা বাকুম এসে উপস্থিত সেখানে। তিনি অধস্তন কর্মীদের দিয়ে মৃতদেহটা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছেন। ভিড় ঠেলে স্বাগতরা তার কাছাকাছি এগতেই তিনি প্রফেসরকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘আপনাদের কথাই ভাবছিলাম। আপনি এসে পড়াতে ভালোই হল। নইলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম।’
এ কথা বলে অফিসার বললেন, “এটা হোয়াঙের মৃতদেহ। দেহটা দেখে মনে হচ্ছে মরার পর অন্তত একটা দিন কেটে গিয়েছে। আপনার সঙ্গে তো ওর পরিচয় ছিল তাই না?”
প্রফেসর একটু আমতা আমতা করে বললেন, ‘হ্যাঁ, তা একটু ছিল। কীভাবে মারা গেছে ও?’
বাকুম বললেন, ‘ঠিক যেভাবে ফঙ মারা গিয়েছিল সেভাবে। মাথার খুলি একদম চুরমার হয়ে গিয়েছে পাথরের আঘাতে। ওই যে ওটার আঘাতে।’ এ কথা বলে তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন মৃতদেহর কিছুটা তফাতে পড়ে থাকা প্রস্তর খণ্ডর দিকে। ভালো করে সেটা দেখে স্বাগতরা অবাক হয়ে গেল। এ প্রস্তর খণ্ডটাও আসলে কোনও যক্ষী বা নারী মূর্তির মাথা। প্রফেসর সেটা দেখে বললেন, ‘অদ্ভুত ব্যাপার। এই দেহটার খোঁজ পাওয়া গেল কীভাবে?’
দু’জন চীনা কাছেই দাঁড়িয়ে মরদেহটার দিকে নিশ্চুপভাবে তাকিয়ে ছিল। তাদের দেখিয়ে বাকুম বললেন, ‘ওরা দু’জন হোয়াঙের শাগরেদ। দু’দিন আগে হোয়াঙ নাকি গাড়ি নিয়ে এখানে ব্যাঙ ধরতে এসেছিল। তারপর সে আর ফিরে যায়নি। ওরা ফোনেও যোগাযোগ করতে পারছিল না হোয়াঙের সঙ্গে। তাই ওরা আজ ভোরবেলা হোয়াঙকে খুঁজতে এখানে আসে। তখন সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের সঙ্গে ওদের দেখা হয়। তিনি ভোরবেলা এখানে লতা-গুল্ম সংগ্রহ করতে এসেছিলেন। তিনিই মৃতদেহটা এখানে প্রথম পড়ে থাকতে দেখেন। ঘটনাচক্রে এ দু’জন লোকের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। রত্নসম্ভবই দেহটা পড়ে থাকার ব্যাপারে জানায় ওদের। ওরাই হোয়াঙের দেহটা আইডেন্টিফাই করে। ঘটনাচক্রে আমি অন্য একটা ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য বিষ্ণুলোকের দিকে যাচ্ছিলাম। সন্ন্যাসীর সঙ্গে রাস্তাতে আমারও দেখা হয়ে যায়। তার কাছ থেকে আমি ব্যাপারটা জানতে পারি। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত তিনিও এখানেই ছিলেন। আমার সঙ্গে কথাবার্তা মেটার পর তিনি ওঁর মন্দিরের দিকে রওনা দিলেন।’—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন বাকুম।
তারপর রামমূর্তি স্যরকে বললেন, ‘আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে।”
—“কী কথা?” জানতে চাইলেন রামমূর্তি।
চারপাশের অন্য স্থানীয় লোকেরা আগ্রহী হয়ে পুলিসকর্তা আর রামমূর্তির মধ্যে কথোপকথন শুনছে। সম্ভবত বাকুম সে ব্যাপারটা খেয়াল করেই বললেন, ‘আগে মরদেহটা পাঠাবার ব্যবস্থা করি তারপর কথা বলছি।’
পুলিসের লোকজন এরপর তাদের কাজ শুরু করল। তালপাতার মাদুর দিয়ে দেহটাকে মুড়ে ফেলা হল। মৃতদেহর কাছে পড়ে থাকা পাথরের মুণ্ডটাকেও পলিথিন দিয়ে জড়িয়ে ব্যাগে ভরে নেওয়া হল। তারপর মৃতদেহ আর যে জিনিসটা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অনুমান সেটা নিয়ে পুলিসকর্মীরা এগল বাইরে ফাঁকা জমিটার দিকে। স্বাগতরাও এগল তাদের পিছনে।
ফাঁকা জমিতে রাখা শবদেহবাহী গাড়িতে মরদেহ তোলা হল। কিছু পুলিসকর্মী তা নিয়ে রওনা হয়ে গেল সিয়েমরিপের দিকে। চীনা দু’জনও তাদের পিছনে অন্য একটা গাড়ি নিয়ে চলল। মরদেহটা চলে যেতেই স্থানীয় মানুষদের জমায়েত হালকা হয়ে গেল। কৌতূহলী যে কয়েকজন সেখানে তখনও দাঁড়িয়েছিল তাদের ধমক দিয়ে হটিয়ে দিলেন বাকুম। সে জায়গায় রইল শুধু স্বাগতরা আর কিছু সঙ্গীসহ পুলিসকর্তা কিম। সবাই চলে যাওয়ার পর বাকুম প্রফেসর রামমূর্তিকে বললেন, ‘ফঙ আর হোয়াঙের দু’টি হত্যার মধ্যেই বেশ মিল আছে। দু’জনকেই পাথরের আঘাতে খুন করা হয়েছে। যে পাথরটা আমরা সংগ্রহ করলাম তার গায়ে হোয়াঙের মাথার চামড়া সমেত কিছু চুল লেগে আছে। আর দুটো পাথরই নারী মূর্তির মাথা।’
প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, তাই তো দেখছি।’
বাকুম বললেন, ‘হোয়াও জুয়ার আড্ডা চালাত। বেশ কয়েকবার নানান পুলিসি ঝামেলাতেও জড়িয়েছে। বেশ কয়েকটা মামলাও আছে ওর নামে। বুঝতেই পারছেন লোকটাকে ঠিক ভালো বলা যায় না। এ ধরনের লোকের শত্রুও প্রচুর থাকে। কাজেই এদের খুন হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়। এটা হতেই পারে যে শহর থেকে কোনও লোক বা লোকেরা ওর পিছু ধাওয়া করে এসেছিল। তারপর জঙ্গলের মধ্যে ওকে একলা পেয়ে খুন করে। কিন্তু আমাকে ভাবাচ্ছে হত্যা ধরনটা। কেউ ওকে খুন করার জন্য অনুসরণ করলে সে নিশ্চয়ই বন্দুক বা অস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে আসবে এবং তা দিয়েই ওকে খুন করবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে খুনি মনে হয় হোয়াঙের গাড়ি নিয়ে ভেগেছে। সেটা এখানে নেই।’ এ কথা বলার পর তিনি একটু থেমে বললেন, ‘আমার ধারণা হোয়াঙ আর ফঙকে একই লোক বা লোকেরা খুন করেছে, কারণ হত্যা পদ্ধতি একইরকম। আর ওই পাথরের মুণ্ডটা হয়তো আপনাদের মন্দির থেকেই সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ, এখানে তো কোনও ভাঙা মূর্তি নজরে পড়ল না।’
পুলিস কর্তার কথায় প্রফেসর কোনও মন্তব্য করলেন না৷
বাকুম এরপর সবাইকে একটু চমকে দিয়ে প্রফেসরকে বললেন, ‘দু’দিন আগে আপনি সিয়েমরিপে হোয়াঙের জুয়ার আড্ডাতে ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ওর সঙ্গী দু’জনই কথাটা আমাকে বলল। যদিও আপনাদের দু’জনের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছিল তাদের জানা নেই। তারা এ কথাও বলল, আপনি এর আগেও বেশ কয়েকবার ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর কারণটা বলবেন? ওর মতো লোকের সঙ্গে আপনি যোগাযোগ রাখতেন কেন? ওর সঙ্গে আপনার কীভাবেই বা পরিচয় হয়েছিল?’
প্রফেসর প্রথমে জবাব দিলেন, ‘আমি এখানে আসার পর সিয়েমরিপ বাজারেই একদিন ওর সঙ্গে পরিচয় হয়।’ এ কথা বলে তিনি স্বাগতদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আমি ওর কাছে যেতাম ইউএস ডলার ভাঙাবার জন্য। অন্য ভারতীয়দের মতো আমিও এদেশে আসার সময় মার্কিন ডলার নিয়েই এসেছিলাম। আমার সঙ্গে ওর পরিচয়ের দিন ওই আমাকে বলেছিল যে, ও মার্কিন ডলার ভাঙিয়ে কম্বোডিয়ান টাকা দেয়। আর তার রেট এখানকার ব্যাঙ্কের বা মানি এক্সচেঞ্জ সংস্থাগুলোর তুলনায় বেশ খানিকটা বেশি। হ্যাঁ, সেদিনও ডলার ভাঙাতেই আমি ওর ওখানে গিয়েছিলাম।’
প্রফেসরের জবাব শুনে তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘সে যে এখানে ব্যাঙ ধরতে আসবে সে কথা আপনাকে জানিয়েছিল?’
প্রফেসর বললেন, ‘না, তেমন কোনও কথা সে বলেনি আমাকে।’
বাকুম একটু চুপ করে থেকে কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, আর এখন কোনও কিছু আপনাকে জিজ্ঞেস করার নেই। আমি যে কাজের জন্য এসেছিলাম এবার সেই কাজের জন্য বিষ্ণুলোকের দিকে যাই। প্রয়োজনে আমি পরে আপনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলব বা সাক্ষাৎ করে নেব।’
এ কথা বলে তিনি তার গাড়ির দিকে এগতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় প্রফেসর তাঁকে প্রশ্ন করলেন — ওদিকে কীসের তদন্ত করতে যাচ্ছেন?’
পুলিস অফিসার বাকুম প্রশ্ন শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে হেসে বললেন, “একটা রিউমার বা গুজবের তদন্ত করতে। গতকাল মন্দিরের বাইরে পরিখাতে নাকি কুমির দেখা গিয়েছে বলে একটা গুজব ছড়িয়েছে। স্থানীয় একজন লোক নাকি পরিখাতে কুমির দেখেছে বলে দাবি করেছে। একসময় পরিখাতে কুমির থাকত ঠিকই কিন্তু এখন ব্যাপারটা অসম্ভব। কে বা কারা কী কারণে গুজবটা ছড়াচ্ছে, সেটা একবার অনুসন্ধান করার প্রয়োজন। দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ আঙ্করের বিষ্ণুমন্দির দেখতে আসেন। তাই ওই জায়গার নিরাপত্তা সম্পর্কে সবসময় আমাদের সতর্ক থাকতে হয়। তারপর আবার এই মন্দির নগরীতে পরপর দুটো খুন হয়ে গেল! কোন ঘটনার সঙ্গে কোন ঘটনার যোগসূত্র বের হয় কে জানে?’
এ কথা বলার পর গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলেন বাকুম ও তাঁর সঙ্গীরা। সে জায়গা ছেড়ে তারা রওনা হয়ে গেলেন বিষ্ণুলোকের দিকে। আর স্বাগতরাও মন্দিরে ফেরার পথ ধরল। গম্ভীরভাবে চিন্তামগ্ন হয়ে হাঁটতে লাগলেন প্রফেসর। স্বাগত ভাবতে লাগল হোয়াঙের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারে প্রফেসর যে সরল ব্যাখ্যা দিলেন তা কি সত্যি? কেন জানি তার মনে হতে লাগল প্রফেসর পুলিসের কাছে সত্যি গোপন করলেন। তাঁরা হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখতে পেল নারেঙ খাম আসছে! স্বাগতদের সামনে এসে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বলল, ‘কী সাংঘাতিক ব্যাপার! শুনলাম জুয়ার আড্ডার মালিক চীনা হোয়াঙ নাকি খুন হয়েছে! আবারও একটা খুন!’
প্রফেসর বললেন, ‘হ্যাঁ, পুলিস বডি তুলে নিয়ে গেল।’
—‘কীভাবে খুন? কারা করল?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘পাথরের আঘাতে। কে খুন করল, কেন খুন করল তা এখনও জানা যায়নি।’
নারেঙ প্রফেসরের উদ্দেশে বলল, “আমি তো আপনার খোঁজে মন্দিরে গিয়েছিলাম। সেখানে আপনাদের দুই সহকারিণীর মুখে ঘটনাটা শুনলাম। আমি একটু আগেই এখানে এসেছি।”
প্রফেসর গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আমার খোঁজে মন্দিরে গিয়েছিলেন! কোনও বিশেষ দরকার আছে কি?’
নারেঙ বলল, ‘না, বিশেষ দরকার কিছু নেই। তবে আমি কাল ফিরে যাব। প্রথমে নমপেন। তারপর সেখান থেকে ফ্রান্সে ফিরে যাব। আমার ছবি তোলার কাজ শেষ। যে ব্যবসায়িক প্রয়োজন ছিল সে সব কথাবার্তাও শেষ। তাই যাওয়ার আগে একবার আপনাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম।’
প্রফেসর বললেন, ‘ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার যাত্রা শুভ হোক।’
নারেঙ বলল, ‘তবে যাওয়ার আগে আপনাকে একটা কথা বলে যাই। পরপর এখানে দুটো খুন হয়ে গেল। এ জায়গার পরিবেশ পরিস্থিতি হঠাৎই কেমন যেন আতঙ্কজনক হয়ে উঠেছে। আপনাদেরও এখানে থাকা ঠিক হবে বলে মনে হয় না। অন্তত কিছু দিনের জন্য হলেও সিয়েমরিপে গিয়ে থাকুন। তেমন হলে সকালে এখানে এসে কাজ করবেন আবার সন্ধ্যা নামার আগে ফিরে যাবেন। এটাকে আপনাদের প্রতি আমার পরামর্শ বলতে পারেন।’
