বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৩
পর্ব ৪৩
বেশ খানিকক্ষণ ধরে খোঁজাখুঁজির পরও নাতাশাকে পাওয়া গেল না। এত সুন্দর সকাল, কিন্তু অজানা আশঙ্কাতে ধীরে ধীরে সকলের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। একসময় প্রফেসর বললেন, ‘এখানে সে নেই বলেই তো মনে হচ্ছে। চল এবার মন্দিরের দিকে ফেরা যাক। তোমরা যখন অন্যদিকে গিয়েছিলে তখন যদি সে মন্দিরে ফিরে এসে থাকে?’ প্রফেসরের কথা শোনার পর দ্রুত মন্দিরের দিকে এগল সকলে। কিন্তু চত্বরে উঠে তারা দেখল নাতাশা ফিরে আসেনি। চত্বরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রফেসর চিন্তিতভাবে বললেন, “মেয়েটা কোথায় গেল বল তো?’
বিক্রম বলল, ‘একবার সবাই মিলে মন্দিরের ভিতরে গিয়ে খুঁজে আসি স্যর?’
প্রফেসর বললেন, ‘নাতাশা কি একলা মন্দিরের ভিতর ঢুকতে সাহস করবে?’
তাঁর কথায় সুরভীও বলল, ‘নাতাশা কিছুতেই একলা মন্দিরে ঢুকবে না।’
কিন্তু প্রীতম বলল, ‘আশপাশের সব জায়গাতেই যখন ওকে খুঁজে এলাম, তখন একবার মন্দিরের ভিতরে ঢুকে দেখাও ভালো। এমন তো হতে পারে যে, ঘর থেকে বেরিয়ে কোনও কারণে মন্দিরে ঢুকেছিল অথবা ঢুকতে বাধ্য হয়েছিল, এখন বেরতে পারছে না অথবা ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে।’
প্রীতমের কথাটা স্বাগত একেবারে উড়িয়ে দিতে পারল না। কত অপ্রত্যাশিত অদ্ভুত ব্যাপারই তো এখানে ঘটছে! তাই সে প্রীতমকে সমর্থন জানিয়ে বলল, ‘আমারও মনে হয় মন্দিরের ভিতরটা একবার দেখে আসা দরকার।’
সে এ কথা বলার পর প্রফেসর রামমূর্তি যেন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্তভাবে বললেন, ‘বলছ যখন চল৷’
বিক্রম ছুটে গিয়ে ঘর থেকে একটা টর্চ আর লাঠি নিয়ে এল। তারপর তারা এগল তোরণের দিকে। বিষ্ণুর মুখমণ্ডল বসানো সেই প্রাচীন তোরণ অতিক্রম করে তারা পা রাখল ভিতরের প্রাঙ্গণে। জায়গাটা সূর্যালোকে আলোকিত হলেও সেখানে জল এখনও শুকায়নি। স্বাগতদের কাজ করার পর সাজিয়ে রাখা মূর্তি, মূর্তির খণ্ডাংশগুলো ভিজে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তার আড়াল থেকে ব্যাঙ ডাকছে। প্রাঙ্গণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুরভী বেশ কয়েকবার নাতাশার নাম ধরে ডাকল। সেই ডাক মন্দিরের ভিতর দিক থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল। নাতাশার কোনও সাড়া মিলল না। এরপর তারা প্রবেশ করল মন্দিরের ভিতরে যাওয়ার জন্য ভগ্ন কক্ষগুলোর মধ্যে। ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে সেই পাথরের ঘরগুলোর মধ্যে পড়েছে। টর্চের আলো ফেলে ঘরগুলো দেখতে দেখতে একসময় তারা ভিতরের প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল। মূল মন্দিরের তাকিয়ে স্বাগতরা বেশ কয়েকবার নাতাশার নাম ধরে ডাক দিল। কিন্তু তাদের কণ্ঠস্বর চারপাশের স্থাপত্যে প্রতিধ্বনিত হল শুধু। এবারও তার সাড়া মিলল না। স্বাগতরা এবার মূল মন্দিরের ভিতরে ঢুকে তাকে খুঁজতে শুরু করল। এক সময় তারা উঠে এসে উপস্থিত হল সেই জায়গাতে যেখানে দেওয়ালের গায়ে একটা শূন্য জায়গাকে কেন্দ্র করে রচিত আছে মুণ্ডিত মস্তক ব্রাহ্মণদের প্রাচীন মূর্তিগুলো। যেখানে পড়েছিল সেই অন্ধরার প্রাচীন পাথুরে মুণ্ডটা। যার আঘাতে হত্যা করা হয়েছিল গাইড কঙকে। অলিন্দ সেখানেই শেষ। কিছুটা তফাত থেকে ছাদে ওঠার সিঁড়ি উঠে গিয়েছে। তা বেয়ে ওপর থেকে জমা জল নামছে। বিক্রম বলল, “একবার ছাদে উঠে দেখে আসব নাকি স্যর?”
প্রফেসর বললেন, ‘না, ও কাজ কর না। এমনিতেই ধাপগুলো ভাঙা, তার ওপর জল ঝরছে। ওপরে উঠতে গেলে যেকোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর এই সিঁড়ি বেয়ে নিশ্চয়ই নাতাশার পক্ষে ওপরে ওঠা সম্ভব নয়।”
স্বাগতও কাজটা করতে নিষেধ করল বিক্রমকে। তাদের কথা শুনে বিক্রম সিঁড়ির কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে এল। সুরভী বলল, ‘কোথাও তো নাতাশাকে পেলাম না! এবার কী হবে স্যর?’
প্রফেসর চিন্তিতভাবে বললেন, ‘চল আগে মন্দির থেকে বেরই। তারপর দেখি কী করা যায়।’
সে স্থান ত্যাগ করে এরপর বাইরে বেরবার রাস্তা ধরল তারা। মন্দির তোরণের বাইরে এসে দাঁড়াল সকলে। বেলা ন’টা বেজে গিয়েছে। চড়া রোদ উঠতে শুরু করেছে। তারা বাইরের চত্বরে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হেরুম এসে হাজির হল। তাকে দেখে সুরভী বলল, ‘তুমি তো হেঁটেই মন্দির তোরণ থেকে এখানে আসা যাওয়া কর। আসার পথে তুমি নাতাশা ম্যাডামকে দেখতে পেলে?”
হেরুম জবাব দিল, ‘না, তাঁকে দেখিনি। তিনি কি ওদিকে গিয়েছেন?
সুরভী বলল, “তাকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল হেরুন। তারপর বলল, ‘আপনাদের একটা কথা বলি। আমি এতদিন ভূতপ্রেত অপদেবতায় তেমন বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু চারপাশে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তাতে আমার মনে হচ্ছে হয়তো বা তেমন কিছু থাকলেও থাকতে পারে। নাতাশা ম্যাডামকে খুঁজে গেলে আমার মনে হয় আপনাদের এ জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। অন্তত আজকের রাতটা আপনাদের শহরে গিয়ে। কাটানোই ভালো। বলা যায় না কোনও বিপদ ঘটতে পারে। আপনাদের সঙ্গে এতদিন ধরে কাজ করতে করতে আপনাদের ভালোবেসে ফেলেছি আমি। অপরাধ নেবেন না, তাই এ কথাগুলো বললাম।’
প্রীতম জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি বিশেষ করে আজকের দিনটার কথা বলছ কেন?’
হেরুম বলল, ‘এই মন্দিরনগরীতে রাতে তো প্রায় কোনও মানুষই থাকে না। হাতেগোনা কয়েকজন গার্ড বা ওই ধরনের কিছু লোক, বা বিষ্ণু মন্দিরের কয়েকজন লোক থাকে ওই মন্দিরে। কিন্তু তারাও আজকের দিনে বাইরে চলে যায়। আপনাদের কোনও বিপদ ঘটলে সাহায্যের জন্য কাউকে পাবেন না। বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামার পর আজ একজন জনপ্রাণীকেও খুঁজে পাবেন না এখানে।’
প্রীতম আবার প্রশ্ন করল, ‘কেন? তারাও চলে যায় কেন?’
হেরুম বলল, ‘আজ আষাঢ় পূর্ণিমা। এখানকার মানুষের বিশ্বাস, যে সব খারাপ শক্তি এখানে থাকে তারা এই আষাঢ় পূর্ণিমার দিন একসঙ্গে মিলিত হয়ে বিষ্ণুলোকের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়। তোরণ ভেঙে ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে যাতে তাদের মুক্তি লাভ হয় সে জন্য। তারা যাতে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য আজ তোরণের সামনে পুজো করে গণ্ডি কেটে দুপুরবেলার পর তোরণ ভালো করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিষ্ণুলোকের ভিতর প্রবেশ করতে না পেরে প্রেতাত্মারা নাকি ভয়ঙ্কর খেপে ওঠে। তখন তারা কোনও মানুষকে পেলে নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করে। অর্থাৎ মেরে ফেলে।’
তার কথা শুনে কেউ আর কোনও মন্তব্য করল না। হেরুমের কথা শুনে মনে হল ভূত চতুর্দশী বা হ্যালুইন নাইটের মতো ব্যাপার তাহলে সব দেশেই আছে। যে রাতে প্রেতাত্মারা জেগে ওঠে বলে মনে করা হয়। শুধু স্থানকাল ভেদে এ দিনের উদ্যাপন পদ্ধতি বা ধর্মীয় রীতি আলাদা।
সুরভী প্রফেসরকে বলল, ‘নাতাশাকে খোঁজার ব্যাপারে এবার কী করবেন বলুন?
রামমূর্তি বললেন, ‘সেটাই তো ভাবছি।’
প্রীতম বলল, ‘সুরভী পাঁচটার সময় ঘুম ভেঙে দেখেছে নাতাশা ঘরে নেই। যদি নাতাশা ভোরের আলো ফোটার পরও ঘর ছেড়ে থাকে তাহলে অন্তত চার ঘণ্টা হয়ে গেল তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার মনে হয় এবার ব্যাপারটা আমাদের পুলিসকে জানানো উচিত।’
সুরভী বলল, ‘হ্যাঁ স্যর, আমারও তাই মনে হয়।’
হেরুম বলল, ‘পুলিসের বড় সাহেব তো এদিকেই এসেছেন। একটু আগে আমি যখন আসছি, তখন দেখলাম তাঁর গাড়ি বিষ্ণুলোকের দিকে গেল।’
প্রফেসর তাঁর পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ডায়াল করলেন পুলিসকর্তা বাকুমকে। তাঁকে ফোনে ধরার পর রামমূর্তি ঘটনাটা ব্যক্ত করলেন। তারপর তিনি ফোনের লাইন কেটে দিয়ে বললেন, ‘বাকুম জানালেন তিনি বিষ্ণুলোকে আছেন। তিনি এখনই রওনা হচ্ছেন এখানে আসার জন্য।’
খুব চড়া রোদ উঠতে শুরু করেছে। সবাই তাই তোরণের নীচে ছায়ায় গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগল পুলিসের আসার জন্য। পিছনে মন্দিরের ভিতরটা কেমন যেন থমথম করছে। কড়া রোদ ওঠার পর ব্যাঙের ডাক থেমে গিয়েছে। নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে সবাই সম্ভবত একই কথাই ভাবতে লাগল যে, নাতাশা কোথায় অদৃশ্য হল? আর তার সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে কি না সে আশঙ্কাও দানা বাঁধতে শুরু করল স্বাগতদের মনে। সুরভী শুধু একবার বলল, ‘নাতাশার যতক্ষণ খোঁজ না মিলছে, ততক্ষণ কিন্তু আমি এ জায়গা ছেড়ে কোথাও যাব না।’
আধ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিসকর্তা বাকুম এসে উপস্থিত হলেন তার কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে। তিনি চত্বরে উঠে আসার পর স্বাগতরা তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি বললেন, ‘ব্যাপারটা আমাকে একটু খুলে বলুন।’
প্রফেসর আর সুরভী মিলে মোটামুটি বিস্তারিতভাবেই তাঁকে বলল নাতাশার নিখোঁজ হওয়া ও তাকে খুঁজে না পাওয়ার ব্যাপারটা। মন দিয়ে সব কথা শোনার পর বাকুম জানতে চাইলেন, ‘কেউ কি তাকে কিডন্যাপড করেছে বলে মনে হয়? কিন্তু দিনের আলো ফোটার পর এই চত্বর থেকে তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া মনে হয় যুক্তিসঙ্গত নয়। অবশ্য ব্যাপারটা যদি রাতে ঘটে থাকে তবে তা হতে পারে।’
প্রফেসর বললেন, “আমরা ঠিক কেউ বুঝে উঠতে পারছি না, তার কী ঘটেছে। কীভাবে সে নিখোঁজ হল।”
সুরভী বলল, ‘কিন্তু রাতের বেলা কখনওই সে একলা বাইরে বেরত না। যদি কোনও দিন বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হতো তাহলেও আমার ঘুম ভাঙিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেত। সন্ধ্যা নামার পর বাইরে বেরতে ভয় পেত সে।’
—‘কীসের ভয়?’ জানতে চাইলেন বাকুম।
—‘ভূতের ভয়। এখানকার স্থানীয় লোকরা যে সব কথা বলে সে সব শুনে আর খুনের ব্যাপার ঘটার পর ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে৷’ প্রীতম বলল।
বাকুম আবার প্রশ্ন করলেন, “তাহলে কি তিনি এ জায়গায় থাকতে চাইছিলেন না?”
সুরভী বলল, “হ্যাঁ, সে আর এখানে থাকতে চাইছিল না। দেশে ফিরে যেতে চাইছিল।”
প্রফেসর বললেন, ‘আমি হয়তো সে ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু আপনার নিষেধাজ্ঞার কারণে তাকে দেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি।’
অফিসার বললেন, ‘এমনও তো হতে পারে যে, তিনি নিজেই এ জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছেন?’
বিক্রম এবার বলে ফেলল, ‘কাল রাতে ঘুম চোখে জানলার বাইরে তাকিয়ে আমি যেন দেখেছিলাম যে, একজন কেউ এই চত্বর ছেড়ে জঙ্গলের দিকে চলে যাচ্ছে।’
কথাটা শুনে বাকুম সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এ কথাটা আগে বলেননি কেন? তাহলে হয়তো সেই মহিলা তিনিই ছিলেন?’
সুরভী কথাটার মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে বলল, ‘যে সন্ধ্যার পর একলা ঘরের বাইরে বেরতে ভয় পায় সে মাঝরাতে জঙ্গলে ঢুকবে এ কথাটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’
বাকুম বললেন, ‘আমার পুলিস জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অত্যাধিক ভয় পেলে মানুষ এমন সব কাজ করে বসে, যা সাধারণ অবস্থায় বা সামান্য ভয় পেলেও সে করতে পারত না।’
পুলিস অফিসার বাকুমের এ যুক্তিটাও মনে ধরল না সুরভীর। সে বলল, “কিন্তু সে একলা একলা অন্য জায়গায় চলে যাবে তা কি সম্ভব? এ জায়গা তার পরিচিত নয়। তাকে যতটুকু চিনেছি তাতে একলা দেশে ফেরাও কার্যত অসম্ভব। আমাদের সঙ্গে সে এই প্রথম দেশের বাইরে পা রেখেছে।”
সুরভীর কথা শুনে বাকুম একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘কিন্তু এ কাজে যদি কেউ তাকে সাহায্য করে থাকে? এখানে অন্য কারও সঙ্গে কি তার পরিচয় হয়েছিল? কেউ কি এর মধ্যে এখানে এসেছিল? যার সঙ্গে মিস নাতাশার কথা হয়ে থাকতে পারে?’
সুরভী বলল, ‘এ দেশে আসার পর আমাদের মতোই তিনচারজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। মিস্টার নারেঙ খাম, কুমির খামারের মালিক বুল আর ওই গাইড ফঙ।’
পুলিসকর্তা জানতে চাইলেন, ‘প্রথম দু’জনের সঙ্গে কি তার ইদানীং কথাবার্তা হয়েছিল?’
সুরভী বলল, ‘কাল সকালে নারেঙ খাম এসেছিলেন। তখন আমি আর নাতাশাই এখানে ছিলাম।’
বাকুম বললেন, ‘নারেঙ খামের সঙ্গে তার কি এমন কোনও কথাবার্তা হয়েছিল, যা আপনার অস্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল?’
জেরার উত্তরে সুরভী প্রথমে বলল, “না, তেমন কোনও কথা তো হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে না। নাতাশা কাল খুনের ঘটনাটা শুনে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। নারেঙ শুনে বললেন, ‘চারপাশের পরিবেশ তারও ভালো বলে মনে হচ্ছে না। তিনি জানালেন, আজ তিনি দেশ ছেড়ে চলে যাবেন।’ তারপর সাধারণ টুকটাক দু-একটা কথাবার্তা বলে চলে গেলেন।”
এ কথা বলে, সুরভী একটু যেন ভেবে নিয়ে বলল, ‘ও হ্যাঁ। নারেঙ আমার কাছে জল খেতে চেয়েছিলেন। আমি ঘরে গিয়ে জলের বোতল এনে দিলাম। সেই দু-তিন মিনিটের মধ্যে যদি তাদের দু’জনের মধ্যে কোনও কথা হয়ে থাকে, তবে তা আমার জানা নেই।’
—‘নারেঙকে কি মিস নাতাশা পছন্দ করতেন?’ আবার প্রশ্ন করলেন বাকুম।
প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করে সুরভী উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, তবে তার পিছনে একটা কারণও আছে। আমাদের সঙ্গে নারেঙ খামের পরিচয় হয় নমপেনের কিলিং ফিল্ডে। সেখানে হত্যাকাণ্ডের স্মারকগুলো দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে নাতাশা। নারেঙ সেখানে তখন উপস্থিত হয়ে স্মেলিং সল্ট দিয়ে নাতাশার জ্ঞান ফেরান। তার ভয় কাটাবার চেষ্টাও করেন।’
সুরভীর কথাতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল বিক্রম আর প্রীতম। বাকুম বললেন, ‘নারেঙ কাল বিকালে আমার অফিসেও এসেছিল যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। আজ ভোরের ফ্লাইটে তার নমপেন যাওয়ার কথা। তারপর সেখান থেকে ফ্লাইটে প্যারিস ফেরার কথা।’
কথাটা শুনেই প্রফেসর বললেন, ‘নারেঙকে আমাদের মতো আপনি দেশ ছাড়তে নিষেধ করেননি? ফঙ তো তার সঙ্গেই ঘুরত। সকলের ক্ষেত্রেই তো একই নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ হওয়া উচিত।’
এ কথাটা শুনে পুলিসকর্তা যেন মৃদু অন্তস্তিবোধ করলেন। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তাকেও আমি মৌখিকভাবে আপাতত দেশ ছাড়তে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু নারেঙের সরকারি ওপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ। ওপরতলা থেকে আমার কাছে ফোন এল। তারা বলল, নারেঙের সঙ্গে ফঙের হত্যাকাণ্ডের যেহেতু কোনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রমাণ পুলিসের হাতে আসেনি, তাই তাকে আটকে রাখা যাবে না। সে এদেশের সঙ্গে ব্যবসা করতে চায়। তাকে আটকে রাখলে ফরেন ইনভেস্টরদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। এ দেশটা গরিব দেশ। আমাদের টাকার দরকার। আমি সরকারি কর্মচারী। ওপরতলার নির্দেশের পর তাকে আটকানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।’
প্রফেসর এবার খানিক উষ্মা প্রকাশ করে বললেন, ‘আমারও তাহলে উপর মহলে কথা বলা উচিত ছিল বা উচিত হবে। আমরাও কিন্তু ভারতীয়। আর আমরা এখানে বেড়াতে আসিনি। আপনাদের সরকারের অনুরোধে আপনাদের সাহায্য করতে এসেছি।’
সুরভীও এবার বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে পুলিস অফিসারের উদ্দেশে বলল, ‘যেভাবেই হোক নাতাশাকে আজকেই আমাদের খুঁজে দিতে হবে। সে এখানেই নিশ্চয়ই কোথাও আছে। আমরা ব্যাপারটা ভারতীয় দূতাবাসকে জানাব। প্রয়োজনে পুলিসের সম্পর্কে কমপ্লেন করব। আপনার নিষেধাজ্ঞার জন্যই তাকে দেশে পাঠানো যায়নি। তার যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে তার দায় আপনার ওপরেও বর্তাবে।’
স্বাগতর মনে হল, প্রফেসর আর সুরভীর যৌথ আক্রমণে যেন একটু চাপে পড়ে গেলেন পুলিসকর্তা। একটু ভেবে নিয়ে তিনি মোবাইল ফোন বের করে ডায়াল করলেন। তারপর নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘দেখুন তো আজ ভোরের ফ্লাইটে নারেঙ খাম নামের কেউ নমপেন রওনা হয়েছেন কি না? সে জন্মসূত্র এদেশের নাগরিক, কিন্তু বর্তমানে ফ্রান্সের নাগরিক। আর দেখুন নাতাশা নামের ভারতীয় পাসপোর্টধারী যুবতী তার সঙ্গে একই ফ্লাইটে নমপেন বা অন্যত্র অন্য কোনও ফ্লাইটে রওনা হয়েছে কি না? যে বিমান ছাড়বে তার প্যাসেঞ্জার লিস্টেও যদি যুবতীর নাম থেকে থাকে তবে তাকে ফ্লাইটে উঠতে দেবেন না। আমাকে যথাসম্ভব দ্রুত খবরগুলো পাঠান।’ এ কথা বলার পর ওপাশের লোকটার সঙ্গে আরও দু-চারটে কথা বলে ফোন রেখে দিলেন বাকুম।
এরপর তিনি প্রথমে সুরভীর উদ্দেশে বললেন, ‘এয়ারপোর্টে আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিস অফিসারের সঙ্গে কথা বললাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা চলে আসবে। আপনি মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন ম্যাডাম। তাকে খোঁজার জন্য যা চেষ্টা করার করব। আশা করি, তার কোনও খোঁজ মিলবে।’ এ কথা বলার তিনি প্রফেসরকে বললেন, ‘মিস নাতাশার ছবি আছে নিশ্চয়ই। সেটা আমাকে দিন।’
প্রফেসর বলল, ‘হ্যাঁ, আমার মোবাইলে ওর আইডেন্টিটি কার্ডের কপি আছে। যেখানে ওর নাম, বয়স, ছবি সবকিছু আছে। আপনার ই-মেল অ্যাড্রেস বলুন, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
প্রফেসর রামমূর্তি বাকুমের থেকে ই-মেল অ্যাড্রেস নিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নাতাশার আইডেন্টিটি কার্ডের কপি পাঠিয়ে দিলেন।
পুলিস অফিসার বললেন, ‘সরকারিভাবে আমাকে একটা মিসিং কমপ্লেনও করতে হবে। ই-মেলও করতে পারেন। সেটা করে দিন।’
রোদের তেজ প্রচণ্ড বেড়েছে। কে বলবে গতকাল বিকেল থেকে শেষ রাত পর্যন্ত এখানে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। খোলা আকাশের নীচে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না। ইতিমধ্যেই ঘেমে উঠেছে সবাই। বিক্রম তাই বলল, ‘চলুন, আমরা তোরণের ছায়ার তলায় গিয়ে দাঁড়াই।’
সেই মতো সকলে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। প্রফেসর তাঁর মোবাইলে কমপ্লেন লেটার টাইপ করতে শুরু করলেন ই-মেল করার জন্য। বাকুম তাঁর সহকর্মীকে নির্দেশ দিলেন খবরটা অন্যত্র জানাবার জন্য। তাঁর নির্দেশ পালন করে সেই পুলিসকর্মী তাঁর ওয়াকিটকির মাধ্যমে মন্দিরনগরীতে কর্মরত ও অন্যত্র খবরটা জানাতে লাগলেন।
বাকুম তোরণের ভিতর দিকে তাকালেন। তারপর তোরণ অতিক্রম করে এগলেন ভিতরের প্রাঙ্গণের দিকে। স্বাগত আর প্রীতমও এগল তাঁর সঙ্গে। প্রাঙ্গণের ভিতরে ঢুকে তিনি বললেন, ‘মন্দিরটা আপনারা ভালো করে খুঁজে দেখেছেন তো?’
বিক্রম বলল, ‘হ্যাঁ, ভালো করে খুঁজে দেখেছি সে নেই।’ বাকুম এরপর এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন চত্বরের এক জায়গায়। যেখানে ভাঙা মূর্তিগুলো রেখেছিল স্বাগতরা। প্রাচীন মূর্তিগুলির নানা দেহাংশ। একটা নারী মূর্তির মুণ্ড দেখিয়ে বাকুম বললেন, ঠিক এমনই একটা পাথরের মুণ্ডর আঘাতে হোয়াঙকে খুন করা হয়েছে। আমার কিন্তু বিশ্বাস ওই মুণ্ডটা এ মন্দির থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে।’
এরপর তিনি বললেন, ‘হোয়াঙের গাড়িটা উদ্ধার হয়েছে। বিষ্ণুলোকের কাছাকাছি জঙ্গলের মধ্যে সেটা পাওয়া গিয়েছে।’
কিছুক্ষণ প্রাঙ্গণের ভিতর ঘোরাঘুরির পর সবাই আবার তোরণের নীচে ফিরে এল। প্রফেসর পুলিস অফিসারকে বললেন, ‘ই-মেলটা আপনাকে পাঠিয়ে দিলাম।’
এরপরই এয়ারপোর্ট থেকে ফোন এল বাকুমের মোবাইলে। সিয়েমরিপ এয়ারপোর্ট ছোট এয়ারপোর্ট, খুব বেশি বিমান সারা দিনে ওঠানামা করে না। তার ওপর এখন সবকিছুই কম্পিউটার সিস্টেমের আওতায়। তাই খবর সংগ্রহ করতে বিশেষ দেরি হয়নি।
বাকুম ওপাশের পুলিসকর্মীর থেকে কথা শুনে নেওয়ার পর স্বাগতদের বললেন, ‘সকাল ন’টা পর্যন্ত মাত্র তিনটে ফ্লাইট ছেড়েছে। তার প্যাসেঞ্জার লিস্টে বা যে বিমানগুলো আজ উড়বে তার প্যাসেঞ্জার লিস্টে মিস নাতাশার নাম নেই।’
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সুরভী বলল, ‘আমি জানতাম থাকবে না। কারণ সে তার পাসপোর্ট আমার কাছে রাখতে দিয়েছিল। সেই ব্যাগ আমার ঘরেই আছে।’
বাকুম বললেন, ‘তবে নারেঙ খামের চলে যাওয়ার ব্যাপারটা সত্যি। আজ ভোরের ফ্লাইটে তিনি নমপেন রওনা হয়েছেন।’ এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘দেখি তো তাঁকে ফোনে পাওয়া যায় কি না?’
নারেও খামের নাম্বার ডায়াল করে তিনি সেটা কানে ধরে তারপর তা নামিয়ে বললেন, ‘ফোন ডেড। সম্ভবত তিনি ফ্রান্সে ফেরার ফ্লাইটে উঠে পড়েছেন। এবারে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল যে তার সঙ্গে নাতাশা যায়নি।’
সুরভী বলল, ‘তবে তো সে এখানেই কোথাও আছে। খুঁজে বের করুন তাকে।’
বাকুম বললেন, ‘সে চেষ্টা যে আমি করছি তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। তবে ইচ্ছা হলে আপনারা আজ থেকে সিয়েনরিপে গিয়ে থাকতে পারেন। প্রয়োজন হলে আমি থাকার ব্যবস্থা করে দেব।’
প্রস্তাবটা শুনে রামমূর্তি স্বাগতর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি না হয় এখানে থেকে গেলাম। আর তোমরা না হয় সিয়েমরিপে গিয়ে থাকলে? তোমার কী মত?’
স্বাগত কিছু জবাব দেবার আগে সুরভী দৃঢ়ভাবে বলল, ‘যতক্ষণ না নাতাশার খোঁজ মিলছে, ততক্ষণ সবাই এ জায়গা থেকে চলে গেলেও আমি কিন্তু যাব না। আমি নাতাশার সঙ্গে একসঙ্গে এ জায়গায় এসেছিলাম। ওকে না নিয়ে আমি এখান থেকে কোথাও ফিরব না।’
বিক্রমও বলল, ‘হ্যাঁ, এমন হল যে সে এখানেই ফিরে এল। আমার মনে হয় আমাদের এ জায়গা ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে না৷’
স্বাগতও একই ভাবনা ভাবল। তাই সে পুলিসকর্তা আর রামমূর্তি স্যরের উদ্দেশে বলল, ‘আমাদের এখানেই থাকা ভালো।’
রামমূর্তি স্যর বললেন, ‘তবে তাই হোক।’
বাকুম একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আসলে আজকের রাতে এখানে কেউ থাকে না। এমনকী আমার ফোর্সের লোকজনও থাকতে চায় না। বংশ পরম্পরায় এ প্রথা বা নিয়ম চলে আসছে এখানে। তাই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আপনাদের সিয়েমরিপ যাওয়ার কথা বলেছিলাম। ঠিক আছে দেখা যাক কী করতে পারি। আমি যাই। ভালো করে চারপাশটা খোঁজার চেষ্টা করি। প্রয়োজনে আবার আসব। আপনারা কোনও ইনফরমেশন পেলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন।’
প্রফেসর বললেন, ‘আচ্ছা।’
পুলিশকর্তা বাকুম তাঁর কর্মীদের নিয়ে চলে যাওয়ার পর প্রফেসর বললেন, ‘এখানে থাকলে খেতে তো হবে কিছু। কাল রাতেও তো তেমন কিছু খাওয়া হয়নি কারও। হেরুম তুমি রান্নাটা করে দিয়ে যাও।’
প্রফেসরের নির্দেশ মেনে হেরুম তার দায়িত্ব পালনের জন্য এগল।
রামমূর্তি এরপর বললেন, ‘আমি ঘরে যাচ্ছি। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করি কোথায় গেল মেয়েটা? তিনি ঘরের দিকে এগবার পর সুরভীও তার ঘরের দিকে এগল। তোরণের নীচে বসে রইল বিক্রম, প্রীতম আর স্বাগত। চুপ করে বসে তারা যে যার মতো ভাবার চেষ্টা করতে লাগল নাতাশা কোথায় গিয়ে থাকতে পারে। বেলা দুপুরের দিকে এগতে শুরু করল।
খানিক বাদে প্রীতম বলল, ‘ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে নিই। গতকাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি, তারপর আজ এই ঘটনা। শরীর ও মন দুটোই খুব ক্লান্ত লাগছে। একটু রেস্টের দরকার।’
প্রীতম ঘরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই বিক্রম ও উঠে দাঁড়াল। ঠিক সেই সময় সুরভী তার ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে একটু উত্তেজিতভাবে এগিয়ে আসতে লাগল।
স্বাগতদের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর উত্তেজিতভাবে বলল, ‘পুলিস অফিসারকে বলেছিলাম নাতাশার পাসপোর্ট ইত্যাদি কাগজপত্র আমার কাছেই আছে। কিন্তু এখন দেখছি নেই!’
—‘নেই মানে?’ বিক্রম প্রশ্ন করল।
সুরভী বলল, ‘ঘরে ঢুকে অন্য প্রয়োজনে আমি আমার ব্যাগটা খুলেছিলাম। তার মধ্যে একটা পাউচ ব্যাগে নাতাশার পাসপোর্ট ছিল। এখন দেখছি ব্যাগটা নেই! ঘরের ভিতরও ভালো করে খুঁজলাম, কোথাও পেলাম না!’
স্বাগতরা সবাই বিস্মিত হল। প্রীতম বলে উঠল, ‘তার মানে কি নাতাশা স্বেচ্ছায় আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে?’
স্বাগতর মনেও এই একই প্রশ্নই জাগল। বিক্রম বলল, ‘কিন্তু প্যাসেঞ্জার লিস্টে তো নাতাশার নাম নেই বলল পুলিস অফিসার! নাতাশা যদি নিজে থেকে চলে গিয়ে থাকে তবে তো সে যথাসম্ভব দ্রুত এ জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে?’
প্রীতম এবার একটা নতুন ভাবনার কথা বলল, ‘এমনও তো হতে পারে যে, আমরা যেভাবে এখানে এসেছি অর্থাৎ সড়ক পথে সে নমপেন গিয়েছে, সেখান থেকে সে ফ্লাইট ধরার চেষ্টা করবে?’
স্বাগত বলল, ‘যাই হোক ব্যাপারটা রামমূর্তি স্যরকে এখনই জানানো দরকার।’
সকলে মিলে তারা এগল রামমূর্তি স্যরের ঘরের দিকে। তিনি দরজা খুলে বাইরে বেরবার পর সুরভী কথাটা জানাল তাকে। কথাটা শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেন বাকুমকে।
তাঁকে সঙ্গে দু-এক মিনিট কথাবার্তা বলে ফোন রেখে রামমূর্তি স্বাগতদের বললেন, ‘বাকুম বলছেন তিনিও নাকি এমনই অনুমান করছিলেন। তাঁর অনুমান নাতাশা কোনও দুর্ঘটনার কবলে পড়েনি বা কেউ তাকে অপহরণ করেনি। এটা একটা আশার ব্যাপার। সে হয়তো আবার মত বদলে ফিরে আসতে পারে। বাকুম বললেন তিনি নমপেন এয়ারপোর্টেও ব্যাপারটা জানিয়ে রাখছেন। দেখা যাক কী হয়।’
এ কথা বলে তিনি স্বাগতকে বললেন, ‘হেরুমকে বল যে যেন সবার ঘরেই খাবার পৌঁছে দেয়।’ এ কথা বলে তিনি সম্ভবত ঘরের ভিতর ঢুকতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় সাইকেলের বেলের টিংটিং শব্দ শুনে তারা দেখল একজন সাইকেল নিয়ে ইতিমধ্যে চত্বরে ঢুকে পড়েছে। তার সাইকেলের পিছনে থার্মোকলের বাক্স, দেখে বোঝা যাচ্ছে যে তালের রস বিক্রেতা। তবে যে লোকটা রস বিক্রি করতে আসে এ লোকটা সে লোক নয়। তাকে দেখে বিক্রম বলল, ‘আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এমন কেউ যদি আসে তবে ভালো হয়।’
প্রফেসরও যেন কিছুটা উৎসাহ প্রকাশ করে বললেন, ‘হ্যাঁ, শরীরটা একটু ঠান্ডা করা দরকার। তাছাড়া স্নায়ুর চাপও কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে।’
রস বিক্রেতা এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। তারপর বাক্সর ঢাকা খুলে বোতলগুলো দেখিয়ে বলল, ‘খুব ভালো পানীয়। মাত্র এক ডলার।’
বিক্রম বলল, ‘আমরা অন্য একজনের থেকে এ পানীয় কিনি। যে বায়ুম মন্দিরের দিক থেকে আসে। তোমরা এ পানীয় ভালো হবে তো?’
পাঁচজনের জন্য পাঁচ বোতল পানীয় কেনা হল। আর একটা বোতল পড়েছিল বাক্সে। লোকটা সেটা তুলে ধরে বলল, এটা নিয়ে নিন, পয়সা দিতে হবে না। আমার উপহার। এরপর থেকে আমি মাঝে মাঝে এখানে আসব পানীয় দিতে।’
বলাবাহুল্য বিক্রমই সেই অতিরিক্ত বোতলটা নিল। প্রফেসরই পয়সা মেটালেন। লোকটা সাইকেল নিয়ে চত্বর ছেড়ে চলে গেল। রামমূর্তি বললেন, ‘যাও এবার ঘরে ঢুকে পড়।’ এই বলে তিনি নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন।
স্বাগতর তখনই ঘরে ঢোকার ইচ্ছা হল না। সে বলল, ‘তোমরা ঘরে গেলে যেতে পার। আমি পরে যাচ্ছি।’
তার কথা শুনে বোতল হাতে যে যার ঘরের দিকে রওনা হল। স্বাগত গিয়ে বসল তোরণের নীচে। তার পিছনে নিস্তব্ধ মন্দির। কিছুক্ষণ সে সেখানে বসে থাকার পর ঘরে ফিরে যাওয়ার আগে একবার মনের খেয়ালে তোরণের ভিতরের চত্বরে গিয়ে দাঁড়াল। চারপাশে কেমন যেন থমথমে পরিবেশ। প্রাচীন ভগ্নপ্রায় মূর্তিগুলো যেন চেয়ে আছে তার দিকে। তাদের দিকে তাকিয়ে স্বাগত মনে মনে ভাবল, ‘খামের যুবতী তার গল্পটা শেষ করে যেতে পারল না। জানি না এ মন্দিরের রহস্য উন্মোচিত হবে কি না! এই মূর্তিগুলো যদি কথা বলতে পারত তবে ভালো হতো।’
কয়েক মিনিট সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর স্বাগত পিছু ফিরল তোরণের বাইরে বেরবার জন্য। সে তোরণের কাছে পৌঁছতেই তার হাতের বোতলটাতে একটা হ্যাঁচকা টান অনুভব করল। কেউ যেন পিছন থেকে ছিনিয়ে নিল বোতলটা। চমকে উঠে পিছনে ফিরে তাকাতেই সে দেখতে পেল সেই বড় বাঁদরীটাকে। বোতলটা ছিনিয়ে সেটা নিয়ে যে দেওয়ালের খাঁজ বেয়ে দ্রুত ছাদের ওপর উঠে গেল। তারপর একবার সে স্বাগতর দিকে মুহূর্তর জন্য ফিরে তাকিয়ে এক লাফে স্বাগতর চোখের আড়ালে বোতল নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল৷
স্বাগত তোরণের বাইরে বেরিয়ে পড়ল। ভাঁড়ার ঘরের পাশে ছাউনির নীচে হেরুম রান্না করছিল। সে তাকে বলল সবার ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য। হেরুম সম্মতি জানাবার পর বলল, ‘আবারও একবার ভেবে দেখবেন, আজ রাতে এখানে থাকা ঠিক হবে কি না। আজ কিন্তু আষাঢ় পূর্ণিমার রাত!’
স্বাগত তার কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে এগল ঘরের দিকে। নানান ভাবনা ভিড় করছে তার মাথাতে।
