বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৪
পর্ব ৪৪
বিকাল হল এক সময়। স্বাগত ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল। অন্যদের ঘরের দরজাগুলো সব বন্ধ। প্রফেসর কি কোনও খোঁজ পেলেন নাতাশার ব্যাপারে? স্বাগত একবার ভাবল তাঁর ঘরের দরজায় নক করে। কিন্তু পরক্ষণেই স্বাগতর মনে হল প্রফেসরের কাছে কোনও খবর এলে তা নিশ্চয়ই তিনি সবাইকে জানাতেন। কারণ, সবাই উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে তা তিনি জানেন। তাই তার ঘরে যাওয়া থেকে বিরত হল সে। বিকাল হলেই সেই খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া যেন স্বাগতর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে এ ক’দিনে বিকাল হলেই তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য স্বাগতর মন উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু ওই যুবতীর কথাতে স্বাগত বুঝতে পেরেছে, যে স্থানে তারা সাক্ষাৎ করতে যেত সে স্থানে আর তাদের দেখা হবে না। সে জন্যই সে রাতে এসে গল্পের শেষটা শুনিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর তার পক্ষে সম্ভব হল না। তবে এ ব্যাপারে স্বাগত নিশ্চিত যে তাকে গল্পটা শোনাবার ব্যাপারে খামের যুবতীর কোনও উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু কী সেই উদ্দেশ্য? ব্যাপারটা স্পষ্ট নয় স্বাগতর কাছে। তবে সে তার কাহিনি শেষ করতে পারলে এ মন্দিরের পরিচয় সম্পর্কে স্বাগত জানতে পারত। সেটা হয়তো আর কোনও দিন জানা যাবে না। নির্জন প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তারা এ মন্দিরে আসার পর থেকে যে সব ঘটনা ঘটেছে তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করতে লাগল সে। কিন্তু কোনও রহস্যের সমাধানই স্পষ্ট হল না তার কাছে।
সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। তার আলো এসে পড়েছে তোরণের মাথার ওপর বসানো বিষ্ণুমূর্তির মুখমণ্ডলে। তার দিকে তাকিয়ে স্বাগতর মনে হল সে যেন তাকিয়ে আছে স্বাগতর দিকেই। তাঁর ঠোঁটের কোণে যেন জেগে আছে এক রহস্যময় হাসি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রহস্য বুকে আগলে রয়েছে সে। কিন্তু সে নির্বাক।
স্বাগতর হঠাৎ মনে হল, ‘আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে, ওই খামের যুবতী একটা শেষ চেষ্টা করতে পারে স্বাগতকে তার কাহিনির শেষ অংশটা শোনাবার জন্য। সমস্ত শঙ্কাকে অতিক্রম করে শেষবারের জন্য সে উপস্থিত হল ওই নির্জন গাছে ঘেরা জায়গাটাতে। —এ কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাগতর ইচ্ছা হল জায়গাটাতে যাওয়ার। তবে সে খানিকক্ষণ ভাবল, এ অবস্থায় মন্দির প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে সে স্থানে যাওয়া উচিত হবে কি না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা অমোঘ টান অনুভব করতে লাগল জায়গাটাতে যাওয়ার জন্য। তার মনে হতে লাগল এই মন্দিরের রহস্য উন্মোচন করতে পারে একমাত্র ওই নারী, হয়তো বা নাতাশার অন্তর্ধান সম্পর্কেও সে কোনও খবর দিতে পারে। কারণ গত রাতে তো খামের যুবতী এ প্রাঙ্গণে এসেছিল, তারপর হয়তো বা বাকি রাত মন্দিরের কাছাকাছিই ছিল। হয়তো সে দেখে থাকতে পারে রাতের আঁধারে কোন দিকে গেছে নাতাশা। সে একাই গিয়েছে, নাকি অন্য কারও সঙ্গে গিয়েছে? নাতাশার অন্তর্ধান সম্পর্কে ওই খামের যুবতীর কাছে খোঁজ থাকতে পারে এই ভাবনাটাই যেন শেষ পর্যন্ত স্বাগতকে মন্দির চত্বর ছেড়ে যাওয়ার জন্য বেশি তাড়িত করল। কারণ, নাতাশার খোঁজ পাওয়াটাই এই মুহূর্তে সবথেকে বেশি জরুরি। স্বাগত মন্দির ছেড়ে রওনা হল তাঁর গন্তব্যের দিকে। আজ যেন কেমন নিঝুম লাগছে চারপাশ। পাখির ডাকও শোনা যাচ্ছে না। যে রাস্তা মন্দির নগরীতে প্রবেশ করে বিষ্ণুলোকের দিকে চলে গিয়েছে সে রাস্তায় উঠে এল স্বাগত।
অন্যদিন এ সময় টুকটুক গাড়ি দেখা যায়। বেলা শেষে বিষ্ণুলোকের দিক থেকে তারা ট্যুরিস্ট নিয়ে ফেরে। রাস্তার দু-পাশে যতদূর চোখ যায় তাকাল স্বাগত। কোনও মানুষ বা গাড়ি চোখে পড়ল না। স্বাগতর মনে পড়ল পুলিসকর্তা বাকুম বলেছিলেন দুপুরে পুজোপাঠের পর বিষ্ণুলোকের তোরণ বন্ধ করে সবাই এই মন্দির নগরী ত্যাগ করে। আষাঢ় পূর্ণিমার রাতে এই প্রাচীন নগরীতে থাকে না কেউ। হয়তো ইতিমধ্যেই জনশূন্য হয়ে গিয়েছে বিষ্ণুলোক, জঙ্গলময় এই প্রাচীন নগরী। শুধু স্বাগতরাই রয়ে গিয়েছে এখানে। আর যারা আছে স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস অনুসারে তারা মানুষ নয়। তারা প্রেতাত্মার দল!
স্বাগত সেই রাস্তা অতিক্রম করে এগল নির্দিষ্ট জায়গার দিকে।
যে স্থানে স্বাগত খামের যুবতীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সে জায়গা এমনিতেই নির্জন। কিন্তু আজ যেন আরও বেশি শব্দহীন মনে হচ্ছে। গাছের ফাঁক দিয়ে বিদায়ী সূর্যের আলো আজও যে জায়গায় এসে পড়েছে সেখানে একসময় সেই নারী মূর্তিটা থাকত। আজ সে জায়গা শূন্য। স্বাগত কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল সেদিকে। তারপর প্রবেশ করল গাছ ঘেরা জায়গাটার ভিতর। না, সেখানে খামের যুবতী উপস্থিত হয়নি। একটা পাথরের ওপর বসল সে, রোজই যেমন বসে। গাছের মাথার ফাঁক গলে বিষ্ণুলোকের চূড়াগুলো দেখা যাচ্ছে। দিন শেষের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে তার ওপর। স্বাগত প্রতীক্ষা করতে লাগল যদি সেই যুবতী আসে সে জন্য। স্বাগত ভাবতে লাগল যুবতীর কেন এত ভয়? কীসের এত ভয়? যে কারণে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে সবসময় বাঁচিয়ে রাখতে চায়? সে কি কোনও অপরাধী? কিন্তু তাকে দেখে তো তা মনে হয়নি। সে যখন তার কাহিনি শোনায় তখন কাহিনির সুখ-দুঃখর অনুভূতিগুলো অনেক সময়ই তার মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠে। তবে কি কেউ খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে? যে তার খোঁজ পেলে বিপদ নেমে আসবে? সেই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই কি স্বাগতকে গল্প শোনাবার জন্য উদগ্রীব? কিন্তু কী সেই বিপদ ? আর স্বাগতই বা সে বিপদ থেকে তাকে মুক্ত করবে কীভাবে? এ সব প্রশ্ন স্বাগতর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। আবার কখনও সে ভাবতে লাগল নাতাশার কথা। কোথায় গেল মেয়েটা? তার যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে তবে তার দায় কি প্রফেসর রামমূর্তি বা স্বাগতদের ওপর বর্তায় না? তারা তো রক্ষা করতে পারেনি নাতাশাকে। এ সব কথা ভাবতে ভাবতে সময় এগিয়ে চলল। হঠাৎ স্বাগত খেয়াল করল চারপাশের আলো কমে আসছে।
স্বাগত তাকাল আকাশের দিকে। সূর্য ঢলতে শুরু করেছে বিষ্ণুমন্দিরের আড়ালে। তবে সে কারণে নয়, মেঘ জমতে শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের আকাশে। বৃষ্টি নামবে। ঘড়ি দেখল স্বাগত। সে মন্দির প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পর এক ঘণ্টা সময় কেটে গিয়েছে। সে বুঝতে পারল খামের যুবতী আর এখানে আসবে না। আর তার মন্দির ছেড়ে বাইরে বেশিক্ষণ থাকাও উচিত হবে না। স্বাগত উঠে দাঁড়াল। তারপর সেই গাছে ঘেরা জায়গা থেকে বাইরে বেরিয়ে ফেরার জন্য রওনা হল। দ্রুত কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ। সে যখন বড় রাস্তাটা অতিক্রম করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই একজনকে দেখতে পেল সে। মন্দিরের রাস্তা ধরে ঝোলা কাঁধে আসছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব! স্বাগত তাঁকে কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখতে পেল। তারপর তিনি রাস্তা ছেড়ে পাশের জঙ্গলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তিনি কি মন্দিরে গিয়েছিলেন? তিনি কি কোনও খবর জানিয়ে এলেন, প্রফেসর রামমূর্তিকে? নাকি তিনি আড়াল থেকে মন্দিরটা দেখে এলেন? বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবও তো চান না যে স্বাগতরা এই মন্দিরে থাকুক। কিন্তু কেন? এসব কথা ভাবতে ভাবতে স্বাগত এগল মন্দিরের দিকে। স্বাগত যখন মন্দির প্রাঙ্গণে উঠে এল ঠিক সেই সময়ই যেন সন্ধ্যা নামল বিষ্ণুলোকে।
কালো মেঘে ঢেকে দিল অস্তাচলগামী সূর্যকে। প্রফেসর রামমূর্তি, সুরভীর ঘরের দরজা আগের মতোই বন্ধ। তারা কেউ কি বাইরে বেরয়নি? সন্ন্যাসী মন্দিরে এসেছিলেন কি না তা জানতে স্বাগত প্রফেসরের ঘরের দিকে যাচ্ছিল কিন্তু ঠিক সেই সময় বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য স্বাগত আর প্রফেসরকে না ডেকে এগল নিজের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকে যখন সে দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই মন্দির তোরণের দিকে নজর গেল তার। সেই বড় বাঁদরিটা মন্দির তোরণের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সে তাকিয়ে আছে স্বাগতর ঘরের দিকেই। স্বাগত এরপর দরজা বন্ধ করে দিল। স্বাগত বাতি জ্বালাবার জন্য সুইচ টিপল, কিন্তু আলো জ্বলল না। হয়তো বা ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গেছে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। স্বাগত কোনও খবর আছে কি না তা জানার জন্য ফোন করল প্রফেসর রামমূর্তিকে। কিন্তু তাঁর ফোন বন্ধ। অগত্যা অন্ধকার ঘরে শুয়ে সে নানা কথা ভাবতে লাগল।
স্বাগত একসময় খেয়াল করল রাত প্রায় আটটা বাজতে চলেছে। অন্য এমন বৃষ্টির রাতে প্রফেসর স্বাগতকে ফোন করে অন্যদের জানিয়ে দিতে বলে যে সবাই যেন ঘরেই শুকনো খাবার খেয়ে নেয়। কিন্তু আজ তিনি ফোন করেননি। স্বাগতর মনে হল তাঁকে আবার ফোন করা দরকার। স্বাগত ফোন করল তাঁকে। কিন্তু রামমূর্তির ফোন সুইচড অফ। স্বাগত এরপর ফোন করল প্রীতমের নম্বরে। তার ফোনে রিং হল কিন্তু সে ধরল না। স্বাগত তৃতীয় ফোনটা করল বিক্রমকে। তার ফোনও একই রকমভাবে বেজে গেল। এত রাত হয়ে গেল বিক্রম আর প্রীতমের ঘুম কি তবে ভাঙেনি? কিন্তু কেন? তালের রস পান করলে ঘুম একটু বেশি হয় ঠিকই, তা বলে তো তাদের এতক্ষণ ঘুমোবার কথা নয়। খটকা লাগল স্বাগতর মনে। এরপর সে কিছু সময় অন্তর অন্তর আরও বেশ কয়েকবার ফোন করল তিনজনের মোবাইল ফোনেই। কিন্তু কারও থেকেই কোনও সাড়া এল না। এরপর আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তা জেগে উঠতে লাগল স্বাগতর মনে। সে শেষ একবার ডায়েল করল সুরভীর নম্বরে। কিন্তু কোনও উত্তর মিলল না। স্বাগত এবার মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল কিছু একটা ঘটেছে। বৃষ্টির মধ্যেই বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে পড়ল। কিন্তু দরজা খুলতে যেতেই সে দেখল দরজাটা খুলছে না। বাইরে থেকে দরজার বাজ বোল্টা টেনে দিয়েছে কেউ! কে করল কাজটা? ওই বাঁদরিটা নাকি? বাঁদরের স্বভাব অনেক সময় মানুষকে অনুকরণ করা। নাকি কাজটা অন্য কোনও লোক করেছে? তার সঙ্গীরা এ কাজ কেউ করবে না নিশ্চয়ই। স্বাগতর হঠাৎ মনে পড়ে গেল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কথা। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে স্বাগত একমাত্র তাকেই দেখেছিল মন্দিরের কাছাকাছি।
তিনি ফিরে এসে এ কাজটা করেননি তো? স্বাগতর মনে পড়ল প্রফেসর বলেছিলেন সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবও সন্দেহের ঊর্ধে নয়! কিন্তু স্বাগতকে ঘরে আটক রেখে তাঁর লাভটা কী? ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না স্বাগত। এরপর সে দরজা খোলার জন্য লাথি মারতে লাগল দরজাতে। সে শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল অন্ধকার বৃষ্টিস্নাত প্রাঙ্গণে। এরপর সে জানলার কাছে এসে কখনও প্রফেসর আবার কখনও অন্য সঙ্গীদের উদ্দেশে চিৎকার করে ডাকতে থাকল। কিন্তু এত শব্দ আর চিৎকারেও তাদের কোনও সাড়া মিলল না। তারা কি সবাই কোথাও চলে গিয়েছে? স্বাগতকে না জানিয়ে তা তো হতে পারে না। কিছু যে একটা ঘটেছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল স্বাগত। কিছুক্ষণ হাঁকডাক করার পর হতাশভাবে বিছানায় বসে পড়ল। সে বুঝতে পারল সকাল না হলে সম্ভবত তার এ ঘর থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। উত্তেজনা, হতাশা আর
ক্লান্তি ঘিরে ধরল তাকে। জানলার বাইরে বৃষ্টিস্নাত অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় চোখ বুজে এল স্বাগতর। সে ঘুমিয়ে পড়ল বিছানাতে।
চাঁদের আলোতে প্রশস্ত পথ ধরে স্বাগত হেঁটে চলেছে। তার পিছনে বিষ্ণুলোক আর অনতি দূরে আরও একটি মন্দির। স্বাগতদের গন্তব্য সেখানেই। শুধু স্বাগত নয়, তার সঙ্গে চলেছে আরও বেশকিছু লোক। তাদের মধ্যে আছেন এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, স্বর্ণালঙ্কার পরিহিত এক ব্রাহ্মণ, আর একদল শূদ্র ব্রাহ্মণ। তাদের হাতে ধরা মুখবন্ধ ধাতব কলস। আর এই দলটাকে ঘিরে চলেছে একদল অস্ত্রধারী সৈনিক। চাঁদের আলোতে মাঝে মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে তাদের হাতের অস্ত্র। কিন্তু সবাই আশ্চর্যরকম নিশ্চুপ, নিজেদের মধ্যে কেউ সামান্য বাক্যালাপও করছে না। চারপাশও আশ্চর্যরকম নিঝুম। তাদের পায়ের মৃদু শব্দ ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। পথে লোকজন থাকার তো কোনও প্রশ্নই নেই। একে তো মধ্যরাত, তার ওপর মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন নির্দেশ দিয়েছেন বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামার পর থেকে আগামী কাল ভোরের আলো ফোটার আগে অবধি কোনও ব্যক্তি তাদের গৃহ বা মন্দির ত্যাগ করে পথে বেরতে পারবে না। এ আদেশ অমান্য করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। যাঁরা এই নিস্তব্ধ রাত্রিতে হেঁটে চলেছে তাদেরই কেবল আজ রাতে পথ চলার অনুমতি আছে।
মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের নির্দেশেই এক গোপন কাৰ্য সম্পাদন করতে যাচ্ছে তারা। পুরো দলটা পৌঁছে গেল মন্দিরের কাছে। প্রাচীন মন্দিরটি বর্তমানে সংস্কার করা হয়েছে। মন্দির তোরণের শীর্ষে জেগে থাকা বিষ্ণুর মুখমণ্ডল ওপর থেকে তাকিয়ে আছে আগন্তুকদের দিকে। তোরণ অতিক্রম করে তারা সকলে প্রবেশ করল মন্দিরের ভিতরে। রক্ষীরা দুটো মশাল জ্বালাল। প্রাঙ্গণের দুপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অস্ত্রধারী সৈনিকের মূর্তি! এতই নিখুঁত তাদের গঠন যে তাদের জীবন্ত বললে ভ্রম হয়। তবে কেউ সেই প্রাঙ্গণে দাঁড়াল না। কাজ শেষ করে ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের ফিরে যেতে হবে। মন্দিরের বহির্ভাগের কক্ষে প্রবেশ করল সকলে। তা অতিক্রম করে প্রবেশ করল মূল মন্দিরের সামনের প্রাঙ্গণে। তার একপাশে একটা নৃত্যমঞ্চ। সেদিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য স্বাগত থমকে দাঁড়াল। বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল তার। স্বর্ণালঙ্কার পরিহিত ব্রাহ্মণ তাকে বললেন, ‘থামলে কেন? রাত্রি শেষের আগেই কাজ শেষ করে আমাদের ফিরে যেতে হবে।’
মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল সকলে। এ মন্দিরের প্রতিটা অলিন্দ, কক্ষ স্বাগতর নখদর্পণে। একের পর এক কক্ষ অতিক্রম করে একসময় সোপান শ্রেণি বেয়ে তারা মন্দিরের দ্বিতলে উঠে এল। অলিন্দ থেকে দেখা যাচ্ছে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকা বিষ্ণুলোক। অন্যরাতে বিষ্ণুলোকের প্রধান তোরণের বাইরে ও তোরণ প্রাকারে মশালের প্রদীপের আলো জ্বলে, কিন্তু মহারাজের নির্দেশে আজ সব নিষ্প্রদীপ। এ রাত্রি আলোকময় হোক তা তিনি চান না। সম্ভব হলে চাঁদের আলোকেও আজ তিনি ঢেকে দিতেন। বেশ কয়েকটা অলিন্দ অতিক্রম করে এক স্থানে এসে থামল সকলে৷ সে স্থানে দেওয়ালের গায়ে পাথরের ফলকের ওপর খোদিত আছে এক নারীমূর্তি। আর তাকে ঘিরে ভাণ্ড হাতে শূদ্র ব্রাহ্মণের দল। ঠিক যেমন শূদ্র ব্রাহ্মণেরা এসেছে স্বাগতর সঙ্গে। স্বাগত এরপর সকলের উদ্দেশে বলল, ‘মহারাজ নির্দেশ দিয়েছেন এ পর্যন্তই আপনারা আসতে পারবেন। আমি বাকি কাজ সম্পন্ন করে ফিরে আসব।’
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আর ব্রাহ্মণ প্রধানও মহারাজের এ নির্দেশের কথা জানেন। তাঁরা মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন স্বাগতর কথায়। সৈনিকরা সঙ্গে একটা থালার মতো দেখতে পাত্র এনেছিল। সেটা তারা স্বাগতর ইঙ্গিতে নামিয়ে রাখল। শূদ্র ব্রাহ্মণরা একে একে মুখবন্ধ ভাণ্ডগুলো সাজিয়ে রাখল সেই পাত্রে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণ প্রধান সেই ভাণ্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে কীসব মন্ত্রোচ্চারণ করলেন। তারপর মুখ তুলে তাকালেন স্বাগতর দিকে। স্বাগত বুঝতে পারল তাদের কাজ শেষ। সে থালা সমেত ভাণ্ডগুলো মাথায় তুলে নিল, তারপর প্রবেশ করল অন্ধকার এক কক্ষে। অন্ধকার হলেও এসব কক্ষ স্বাগতর এতটাই পরিচিত যে চোখ বন্ধ করে সে তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। একের পর এক
কক্ষ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট এক কক্ষে পৌঁছে দেওয়ালের গায়ে সে এক স্থানে আঙুলের চাপ দিতেই পাথরের দেওয়াল খুলে খানিকটা ফাঁক হয়ে গেল। এক সংকীর্ণ পথে প্রবেশ করল স্বাগত। সে পথে কখনও সিঁড়ি দিয়ে ওঠা আবার কখনও নামা। একমাত্র স্বাগতর পক্ষেই যেন এই গোলকধাঁধায় বেয়ে চলা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত এক কক্ষে এসে প্রবেশ করল সে। অন্ধকার ঘর। স্বাগত জানে এ কক্ষে দেওয়ালের গায়ে একটা লক্ষী মূর্তি আছে। সেই মূর্তির কাছে গিয়ে সে তার হাতের তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে যক্ষী মূর্তির দু-চোখে চাপ দিল। তার আঙুল দুটো মূর্তির চোখের মধ্যে কিছুটা বসে গেল। মৃদু ঘড় ঘড় একটা শব্দ হল, কাছেই দেওয়ালের একটা অংশ ফাঁক হয়ে গেল। স্বাগত তার ভিতরে ঢুকে ভাণ্ড সমেত পাত্রটা একপাশে নামিয়ে রাখল। তারপর পোশাক থেকে চকমকি পাথর বার করে তা ঘষল। দেওয়ালের গায়ে একটা কুলুঙ্গীতে একটা প্রদীপ রাখা ছিল। সে সেটা জ্বালিয়ে ফেলল। আলোকিত হয়ে উঠল ঘর। বেশ বড় আকৃতির একটা ঘর। দেওয়ালের গায়ে খোদিত আছে অপ্সরাদের মূর্তি, আর সে কক্ষের কেন্দ্রে আছে কারুকাজ মণ্ডিত এক বেদী। স্বাগতকে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন এই মন্দিরে এই গোপন কক্ষ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সম্ভবত তাঁর রত্নভাণ্ড লুকিয়ে রাখার জন্যই। থালার মধ্যে মুখবন্ধ যে ঘড়াগুলো রাখা আছে তার মধ্যে একটির আকৃতি সামান্য বড়। স্বাগত কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল সেই ঘড়া বা কলসটার দিকে। তারপর ভাণ্ডগুলি সমেত থালার মতো পাত্রটাকে স্থাপন করল বেদীর ওপর। এ কক্ষের অবস্থান সে ছাড়া একমাত্র জানেন মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন। যদিও এ মন্দিরে এই গুপ্তকক্ষর সন্ধান সে আরও একজনের কাছে গচ্ছিত রেখে গেল। এমনও হতে পারে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গুপ্ত কক্ষেই সঞ্চিত থাকবে এই ভাণ্ডগুলো। কাজ শেষ হল স্বাগতর। প্রদীপটা সে নিভিয়ে দিল। সেই কক্ষের বাইরে এসে যক্ষী মূর্তির দু-চোখে চাপ দিতেই আবার কক্ষের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। যে পথে এ স্থানে এসেছিল, সে পথেই বেরবার জন্য রওনা হল স্বাগত। যেখানে সে অন্যদের রেখে গিয়েছিল সে স্থানে পৌঁছে স্বাগত দেখল সেই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ বা শূদ্র ব্রাহ্মণরা সে স্থানে বসে আছেন।
স্বাগতকে দেখে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ জানতে চাইলেন, ‘তোমার কাজ সম্পন্ন হয়েছে তো?’
স্বাগত জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এবার তবে ফেরা যাক। মন্দিরের পশ্চাৎভাগ দিয়ে আমরা নির্গত হব।”
মহারাজ আমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছেন।
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, আমার কাজ তো শেষ। মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই আমি বন্দরের উদ্দেশে রওনা হব। জম্বুদ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করব আমি।”
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আর ব্রাহ্মণ কুলপতি অন্যদের নিয়ে এগলেন বাইরে বেরবার জন্য। কিন্তু স্বাগত কিছু সময়ের জন্য সে স্থানে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল দেওয়ালের গায়ে পাথরের ফলকে খোদিত নারী মূর্তির দিকে। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়াল ফেরার জন্য। অন্যরা তখন দ্বিতল ছেড়ে একতলে নেমে পড়েছে। আনমনে হাঁটছিল স্বাগত। সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে অসতর্কতায় পদস্খল হয়ে গেল তার। সে গড়িয়ে পড়ল নীচে। যে জায়গায় গিয়ে সে পড়ল সে স্থান প্রবল অন্ধকার। যাদের সঙ্গে নিয়ে সে এসেছিল ইতিমধ্যে তারা মশাল নিয়ে চলে গিয়েছে। আলো ছাড়াই এ মন্দিরের যে কোনও স্থানে স্বাগত চলাচল করতে পারে এমনই চেনা এ মন্দিরের অভ্যন্তর। কিন্তু যে স্থানে এসে সে পড়েছে হঠাৎই যেন সে স্থান অচেনা মনে হল স্বাগতর। কোন দিকে বাইরে বেরবার পথ কিছুই যেন সে ঠাহর করতে পারছে না। হঠাৎ তার কানে এল পরিচিত এক নারী কণ্ঠস্বর— ‘ওঠো ওঠো ভাস্কর, ওঠো।’
কণ্ঠস্বরটা শুনেই স্বাগত চমকে উঠে বসল।
আবারও সেই কণ্ঠস্বর। বলল, ‘ওঠো ওঠো, দোহাই তোমার। জাগো জাগো…’
এবার চোখ মেলল স্বাগত। বিছানায় উঠে বসেছে সে। স্বাগত বুঝতে পারল এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল। নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। মুহূর্তের মধ্যে স্বাগতর বাস্তব পরিস্থিতি মনে পড়ে গেল—ঘর বন্দি সে!
কিন্তু এরপরই আবার সেই কণ্ঠস্বর কানে এল তার— ‘আমি এসেছি। এই যে আমি এখানে।’
স্বাগত তাকাল জানলার দিকে। সে দেখল জানলার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে সেই খামের যুবতী! স্বাগত তাকে দেখামাত্রই খাট থেকে নেমে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি কখন যেন থেমে গিয়েছে। আষাঢ় পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে আকাশে। সে আলো এসে পড়েছে রহস্যময়ী খামের কন্যার মুখমণ্ডলে।
স্বাগত তার উদ্দেশে উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘তুমি কি আমাকে গল্প শোনাতে এসেছ? কিন্তু বাইরে কিছু একটা ঘটেছে! কে যেন বাইরে থেকে আমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে!’
খামের যুবতী বলল, ‘না, গল্প শোনাবার সময় এখন আর নেই। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। তুমি এখনই বাইরে বেরও। ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে।’ – এই বলে সে জানলার পাশ থেকে সরে গেল দরজা খোলার জন্য।
স্বাগতও এগল দরজার দিকে। খামের যুবতী দরজা খুলতেই স্বাগত বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর বলল, ‘কী ঘটেছে তুমি কিছু জান? আজ সকাল থেকে আমাদের এক সঙ্গিনী নিখোঁজ। অন্যদের ফোন করলাম সাড়া মিলছে না!’
খামের যুবতী বলল, ‘হ্যাঁ জানি। তাদের যদি জীবন রক্ষা করতে হয় তবে এখনই তোমাকে মন্দিরের ভিতরে যেতে হবে।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘মন্দিরের ভিতর কোথায়?’
যুবতী বলল, ‘এক গুপ্ত কক্ষ। যে স্থান তুমি চেন। মন্দিরের ভিতরে ঢুকলেই তুমি পৌঁছতে পারবে সে জায়গাতে।’
স্বাগত যুবতীর কথা বুঝতে না পেরে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল।
খামের কন্যা তাকে তাড়া দিয়ে বলল, ‘দোহাই আর দেরি কর না। আর সময় নেই। ইতিমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। সে কাজ যদি থামানো না যায় তবে তুমি আমি, তোমার সঙ্গীরা কেউ রক্ষা পাব না। সব থেকে ভয়ের ব্যাপার হল ধ্বংস হবে এই বিষ্ণুলোক। চল, চল…।’
খামের যুবতীর কথা স্বাগত ঠিক বুঝতে না পারলেও তার আহ্বান কেন জানি সে অস্বীকার করতে পারল না। স্বাগতর মনের ভিতর থেকেও কেউ যেন বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, আর সময় নষ্ট করা যাবে না। তোমাকে যেতে হবে সে স্থানে, রক্ষা করতে হবে বিষ্ণুলোককে।’
খামের কন্যা। আবারও তাকে তাড়া দিয়ে বলল, ‘চল, চল, সে জেগে উঠলে সর্বনাশ হবে।’
স্বাগত এরপর আর দেরি করল না। সে অনুসরণ করল খামের যুবতীকে। অতি দ্রুত সে এগতে থাকল মন্দির তোরণের দিকে। যেন মাটিতে পা পড়ছে না তার। যেন সে উড়ে চলেছে। মন্দির নগরীর মাথার ওপর আষাঢ় পূর্ণিমার চাঁদ। চারপাশে কেমন যেন অসীম নিস্তব্ধতা। অন্যদিন বৃষ্টি শেষে ব্যাঙের কলতান শোনা যায়। কিন্তু সে শব্দও আজ নেই। সারা মন্দির নগরী যেন কোনও অজানা আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে আছে! তোরণের ভিতর প্রবেশ করার আগে মাথার ওপর একবার তাকাল স্বাগত। হাজার বছর ধরে তোরণের মাথায় অবস্থানরত ভগবান বিষ্ণুর বিরাট মুখমণ্ডল আষাঢ় পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে কেমন যেন রহস্যময় মনে হচ্ছে। খামের যুবতীর সঙ্গে স্বাগত তোরণের ভিতর প্রবেশ করল। মন্দির গাত্রের মূর্তিগুলো যেন চেয়ে আছে তাদের দিকে। যুবতী থামল না। এগিয়ে চলল সে। অন্ধকার কক্ষগুলোতে প্রবেশ করে তারা পৌঁছে গেল মন্দিরের ভিতরের প্রাঙ্গণে। তারপর প্রবেশ করল মূল মন্দিরে। কক্ষ, অলিন্দ অতিক্রম করে তারা উঠে এল দোতালায়।
অলিন্দ থেকে দেখা যাচ্ছে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিষ্ণুলোককে। কোনও আলো জ্বলছে না সেখানে। চাঁদের আলোতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন্দির নগরীর সর্ববৃহৎ স্থাপত্য। যাকে কেন্দ্র করে হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছিল এই মন্দির নগরী।
