বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৮
পর্ব ৪৮
বিদ্যুৎগতিতে সে ছুটে এসে প্রফেসরের ঘরের পিছন দিয়ে জঙ্গলের ভিতর ঢুকল। সে যেদিকে বাতাসের গতিতে মিলিয়ে গেল ও দিকেই বিষ্ণুলোক। আমি বুঝতে পারলাম ওদিকে কিছু ঘটেছে বা ঘটতে চলেছে, তাই আমি ছেলেটাকে আমার পিছন পিছন আসতে বলে এগলাম বিষ্ণুলোকের দিকে। কিন্তু সে নারী যেন মানবী নয়। বাতাসের গতিতে সে এগল। আমি বৃদ্ধ মানুষ। তার পিছনে দ্রুত ছোটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। মাঝপথে হঠাৎই যেন জঙ্গলের মেধ্যে ঝড় উঠল। শুরু হল নানানরকম শব্দ। পাখির দল ভয় পেয়ে ডাকাডাকি শুরু করল। মনে হল কারা যেন জেগে উঠতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের জন্য আমি দাঁড়িয়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা ‘করলাম চারপাশে এমন অদ্ভুত ঘটনা কেন ঘটছে? প্রেতের দল কি সত্যিই তবে জেগে উঠছে? যে শঙ্কা আমার মনে ছিল তা কিন্তু সত্যি হতে চলেছে হাজার বছর পর? কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য আবার সবকিছু থেমে গেল। আমি এগলাম মন্দিরের দিকে। না, সেই নারীকে আমি আর দেখতে পাইনি। রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। আমি দেখলাম সাঁকোর ওপর কে একজন পড়ে আছে। গিয়ে দেখলাম স্বাগত সেখানে অজ্ঞান হয়ে আছে। আমি তার জ্ঞান ফেরালাম। তার কাছ থেকে মন্দিরের ভিতরে কী ঘটেছিল। তা শুনলাম। বাচ্চাটাও সেখানে উপস্থিত হল। আমরা মন্দিরে ফেরার পথ ধরলাম। গতরাতে মন্দিরের ভিতর কী ঘটেছে তা তো আপনারা শুনেইছেন। আমার যা বলার ছিল তা আমি আপনাদের বললাম।’
বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কথা শোনার পর বাকুম বললেন, ‘হেরুম ওই কক্ষে কী পুজোপাঠ করছিল সে সম্বন্ধে আপনাদের কোনও ধারণা আছে? ওই কলসের মধ্যে ধনরত্ন ধরনের কিছু ছিল কি?’
সন্ন্যাসী এ প্রশ্নর কোনও জবাব দিলেন না। স্বাগত বলল, ‘আমিও জানি না। তবে হেরুম যে কোনও পুজোপাঠ করছিল সেটা ঠিক। তারই অঙ্গ হিসাবে সে ওই কলসে নাতাশাকে রক্ত দিতে বলছিল। শেষে হেরুম সেই রক্ত সংগ্রহ করে তার অনুচর বুলের বুকে ছুরি বসিয়ে।’
সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল এরপর। সবাই যেন ঘটনাক্রম নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করতে লাগল। বাকুম একসময় মৌনতা ভঙ্গ করে বললেন, ‘আমার মনে হয় সব সত্য উদঘাটিত হবে ওই নারীকে খুঁজে বার করতে পারলে। সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব আপনি এ অঞ্চল সম্পর্কে সব চাইতে বেশি জানেন। আপনি কি অমন কোনও নারীকে চেনেন বা জানেন যে এ মন্দির সম্পর্কে জেনে থাকতে পারে বা এ মন্দিরের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল?’
সন্ন্যাসী জবাব দিলেন, ‘অমন কোনও নারীর সঙ্গে আমার কোনও দিন বাক্যালাপ হয়নি।’
আরও কিছুক্ষণ ভাবার পর পুলিস অধিকর্তা বাকুম বললেন, ‘ওই নারী হয়তো এখনও এই মন্দিরের মধ্যেই আছে। সে তো বলেছিল কলসটাকে সে যথাস্থানে রেখে আসতে যাচ্ছে। আমাদের মন্দিরে প্রবেশ করা দরকার ওই নারীর সন্ধানে। ওই কক্ষে প্রবেশ করে দেখা দরকার কলসগুলোর মধ্যে মূল্যবান কিছু আছে কি না। তাছাড়া বুলের দেহটাও উদ্ধার করা দরকার।’ এ কথা বলার পর তিনি স্বাগতর উদ্দেশে বললেন, ‘ওই নারী মূর্তি ছাড়া যে চারজন ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশ করেছিল তারা তিনজনই মৃত। একমাত্র আপনিই আমাদের পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে যেতে পারেন। সেখানে আপনি আমাদের নিয়ে চলুন?’
স্বাগত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চলুন তবে।’
নাতাশা বলল, ‘আমার আর মন্দিরে ঢোকার ইচ্ছা নেই।’
সুরভী বলল, ‘আমি তবে নাতাশার সঙ্গে এখানেই বসে থাকি।’ এ ব্যাপারে আপত্তি করল না কেউই।
নাতাশা আর সুরভী সেখানেই রয়ে গেল। বাকিরা প্রবেশ করল মন্দিরের ভিতর। মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করার পর পুলিসকর্তা বললেন, ‘নারেঙ খামকে রওনা করে দেওয়ার সময় আমি যতটুকু জেনেছিলাম, তা আমি আমার দপ্তরের ওপর মহলে আর প্রত্ন অধিকর্তা কিমকে জানিয়ে দিয়েছি। হেরুম আর বুল যে মারা পড়েছে, সেটাও জেনেছেন তাঁরা। এখন দেখা যাক ওই গুপ্তকক্ষ থেকে কী জিনিস উদ্ধার হয়?’
সবাই উঠে এল মন্দিরে উপরিভাগের সেই অলিন্দে যেখান থেকে ভাঙা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে ওপর দিকে। যার ছাদের দেওয়ালেই পাথরের ফলকে খোদিত আছে মুণ্ডিত মস্তকদের মূর্তিগুলো একটা শূন্যস্থানকে কেন্দ্র করে, আর যার কাছেই রয়েছে প্রাচীন কক্ষগুলো। সে জায়গায় এসে প্রথমে সকলে দাঁড়াল। ঠিক এই স্থানেই পাওয়া গিয়েছিল ফঙয়ের লাশ। স্বাগতর মনে পড়ল সামনের কক্ষ থেকে খামের যুবতী গত রাতে নাতাশাকে বের করে এনে ঠিক এ স্থানেই দাঁড়িয়েছিল। নারেঙ খামের একটা কথা সম্ভবত সত্যি। এ স্থান থেকেই সে নাতাশাকে উদ্ধার করে নীচে নিয়ে যায়। স্বাগতর চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছিল বাকুম, সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব আর প্রফেসর রামমূর্তির মুখের ওপর। এ জায়গায় এসে দাঁড়াবার পর সে তাদের মুখ দেখে তাদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছিল। সন্ন্যাসীর গম্ভীর মুখ দেখে স্বাগতর মনে হল তিনি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গী হয়েছেন। তিনি এখনও চান না ওই গুপ্তকক্ষে কেউ প্রবেশ করুক। বাকুম তীক্ষ্ণ নজরে চারপাশের দেওয়াল, মেঝে, সিঁড়ি, ছাদের দিকে দেখার চেষ্টা করছেন। তাঁকে দেখে বোঝাই যায় যে তিনি গতরাতের ঘটনার কোনও সূত্র বা প্রমাণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছেন। স্বাগত দেখল প্রফেসর রামমূর্তি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেওয়ালের গায়ের মূর্তিগুলো যে শূন্যস্থানকে ঘিরে রয়েছে সেদিকে। স্বাগতর মনে হল সেদিকে তাকিয়ে মুহূর্তর জন্য যেন রামমূর্তির ঠোঁটের কোণে আবছা একটা হাসি ফুটে উঠল। আর এরপরই বাকুম চারপাশ দেখে নেওয়ার পর স্বাগতকে বললেন, ‘চলুন এবার আপনি আমাদের পথ দেখান।’
স্বাগত প্রবেশ করল সামনের ঘরটাতে। আর তার পিছন পিছন অন্যরা। ছাদের ফাটল বেয়ে সামান্য কিছু আলো আসছে। বাকুম তাঁর কোমরে ঝোলানো টর্চটা হাতে নিয়ে জ্বালালেন। বেশ কয়েকটা কক্ষ অতিক্রম করে তারা এসে উপস্থিত হল এক কক্ষে। স্বাগত বুঝতে পারল এ কক্ষ থেকেই সে দেওয়াল উন্মুক্ত করে প্রবেশ করেছিল দেওয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই নানান সিঁড়ির গোলকধাঁধার মধ্যে। তারপর গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল সেই গুপ্তকক্ষে। বাকুম প্রত্যেকটা ঘরের দেওয়াল মেঝেতেই টর্চের আলো ফেলেছিলেন। ঘরের মেঝেতে এক জায়গাতে আলো ফেলতেই মেঝেতে কালচে মতো কী একটা পড়ে থাকতে দেখা গেল। বাকুম এগিয়ে গিয়ে সে জায়গা পরীক্ষা করার পর বলল, ‘জমাট বাঁধা রক্ত বলে মনে হচ্ছে!’
স্বাগত বলল, ‘সম্ভবত পালাবার সময় হেরুমের হাতের কলস থেকে রক্ত ছিটকে পড়েছিল। হ্যাঁ, এটাই সেই ঘর যার দেওয়াল সরিয়ে আমি ভিতরে প্রবেশ করেছিলাম।’
বাকুম জিজ্ঞেস করলেন ‘কোন দেওয়াল সেটা?’
স্বাগত তাঁর প্রশ্নের জবাব দেবার জন্য চারপাশের দেওয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে যেন বুঝে উঠতে পারল না সেটা কোন দেওয়াল? সে এগিয়ে গিয়ে প্রথমে সামনের দেওয়ালের নানা জায়গায় চাপ দিতে শুরু করল। তার দেখাদেখি সে কাজে যোগ দিলেন বাকুম নিজেও। প্রীতম আর বিক্রমও একই ব্যাপারে যুক্ত হল। শুধু প্রফেসর রামমূর্তি আর বৌদ্ধ ভিক্ষু নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে সকলে মিলে চেষ্টা চালাল সেই গোপন স্থান উন্মোচন করার। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হল। দেওয়ালগুলোর বিভিন্ন জায়গায় চাপ দিয়ে, আঘাত করেও কোনও প্রবেশপথ উন্মোচিত হল না। স্বাগত একসময় হতাশভাবে বলল, ‘আমি যেন সে সময় একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। অন্ধকারের মধ্যে দেওয়ালের কোন অংশে চাপ দিয়ে ভিতরে ঢোকার পথ উন্মোচন করেছিলাম, তা বুঝে উঠতে পারছি না!’
রত্নসম্ভব বললেন, “আমার মনে হয় ও জায়গা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর চারপাশের দেওয়াল যদি ভাঙতে হয় তাহলে মাথার ওপর থেকে ছাদটাই হয়তো খসে পড়বে। এমনকী মন্দিরটা ধসে পড়াও অসম্ভব নয়। এই কক্ষ মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। হাজার বছর ধরে রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন স্থাপত্য। সামান্য আঘাতেও এই মন্দির ধসে পড়তে পারে। আপনারা এখানে যাঁরা কাজ করতে এসেছেন তাঁদের নিশ্চয়ই বাস্তুবিদ্যা সম্পর্কেও ধারণা আছে। প্রফেসর নিশ্চয়ই আমার বক্তব্যর সঙ্গে সহমত হবেন। এবার আপনাদের এখানে সময় নষ্ট করে কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না।’
প্রফেসরও মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলেন সন্ন্যাসীর কথাতে। বাকুম এবার যেন ব্যাপারটার বাস্তবতা উপলব্ধি করলেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে এবার নীচে নেমে দেখা যাক যে পথ দিয়ে স্বাগত হেরুমের পিছনে বাইরে ছুটেছিলেন সে পথ খুঁজে পাওয়া যায় কি না।’
সে ঘর ত্যাগ করে কিছুক্ষণের মধ্যেই নীচে নেমে এল সবাই। স্বাগত বাইরে যাওয়ার সে পথের অনুসন্ধান করল, কিন্তু আগের মতোই বেশ অনেকটা সময় নিয়ে খুঁজেও সে আগের মতোই ব্যর্থ হল। বাইরে যাওয়ার পথ সে বের করতে পারল না। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ঠোঁটের কোণে আবছা হাসি ফুটে উঠেছে। যেন তিনি চাইছিলেন না এইসব গুপ্ত পথের হদিশ পুনরায় খুঁজে পাক স্বাগত বা পুলিস অফিসার বাকুম।
এরপর মন্দিরের বাইরে প্রাঙ্গণে বেরিয়ে এল। সবাই সেখানে নাতাশা আর সুরভী বসেছিল। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী নাতাশাকে আশ্বস্ত করে হেসে বললেন, ‘আমার মনে হয় না তোমার আর ভয় পাওয়ার কোনও কারণ আছে। আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই বলেই আমার ধারণা।’
এরপর তিনি বললেন, ‘অনুসন্ধান তো শেষ। চলুন এবার তবে বাইরে যাওয়া যাক?’
বাকুমও সম্ভবত বুঝতে পারলেন আর এই জায়গায় সময় নষ্ট করে লাভ নেই। সবাই এগল মন্দিরের বাইরে বেরবার জন্য।
তোরণ অতিক্রম করে মন্দিরের বাইরে এসে দাঁড়াল সবাই। এতক্ষণ ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে তেমন কোনও রহস্যই উদ্ধার করা গেল না এ ব্যাপারটা সম্ভবত বাকুম মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তোরণের বাইরে এসে তিনি বললেন, ‘একবার পিছনের প্রবেশ পথটাও দেখে আসা যাক? যদি সেখানে কিছুর সন্ধান মেলে?’
স্বাগতরা সূর্যোদয়ের পরই মন্দিরে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে সে ঘণ্টা চারেক সময় নানান ঘটনাক্রমে কেটে গিয়েছে, তা তারা কেউই খেয়াল করেনি। সূর্য প্রায় মধ্যগগনে পৌঁছে গিয়েছে। মাথার ওপর চড়া রোদ। রত্নসম্ভব বললেন, ‘আমি এখানেই রইলাম, এই রোদের মধ্যে আমার আর ওখানে যাওয়ার ইচ্ছা নেই।’
নাতাশা জানাল সে ঘরে গিয়ে ‘একটু বিশ্রাম নিতে চায়। তার ওপর দিয়েই সবচাইতে বেশি ধকল গিয়েছে। অগত্যা তার সঙ্গে সুরভীকেও রয়ে যেতে হল। বাকিরা মন্দির ত্যাগ করে বনপথে নেমে রওনা হল মন্দিরের পিছন দিকে যাওয়ার জন্য। সারাটা পথ কেউ কোনও কথা বলল না। প্রফেসরের, মুখ দেখে স্বাগতর মনে হল তিনি যেন গভীরভাবে কিছু ভেবে চলেছেন। বিক্রম শুধু একবার বলল, ‘একটা ব্যাপার আমরা সবাই তাহলে বুঝতে পারছি যে, এই মন্দিরের ব্যাপার নিয়ে ভূত-প্রেতের যেসব কাহিনি প্রচারিত হয়, তা সবই আসলে মিথ্যা। সবই মানুষেরই কীর্তি!’
তার কথায় কেউ কিছু মন্তব্য করল না। স্বাগত চলতে চলতে গত রাতের ঘটনাটা আবারও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করতে লাগল। আশ্চর্যর ব্যাপার আজ সে পথ খুঁজে পেল না কেন? তাহলে কি সে সময় অন্য কোনও জগতে বিচরণ করছিল? সেই খামের যুবতীই বা কোথায়? তার সঙ্গে কি আর দেখা হবে স্বাগতর? গল্পের শেষ অংশটা তো তার জানা হল না। কোনও দুর্যোগ আটকাবার জন্য সে হেরুমের কাজ পণ্ড করার জন্য স্বাগতর ওপর নির্ভর করেছিল?
-এসব কথা ভাবতে ভাবতে স্বাগতরা একসময় পৌঁছে গেল মন্দিরের পিছনের অংশে। মন্দিরের গায়ে যে ফাটলটা আছে তার গায়েও রক্তর ছিটে চোখে পড়ল স্বাগতদের। অর্থাৎ গত রাতের ঘটনা মিথ্যা ছিল না। কলস নিয়ে এ পথে বাইরে বেরিয়েছিল হেরুম। প্রথমে বাকুম তারপর একে একে অন্যরা ফাটল গলে প্রবেশ করল ভিতরে। টর্চের আলোতে তাঁরা দেখতে পেল তাদের দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে রক্ষীদের জীর্ণ ভগ্নমূর্তি। যেমন দ্বার পাহারা দেয় রক্ষীরা। অর্থাৎ শত শত বৎসর আগে একসময় এখান দিয়েই মন্দিরে প্রবেশ-প্রস্থানের একটা পথ ছিল। চারপাশ ধুলো ধূসরিত। পর পর বেশ কয়েকটা ঘর অতিক্রম করল তারা। সে সব ঘরেই কিছু প্রাচীন ভগ্ন মূর্তি রয়েছে। কোনও মূর্তি রক্ষীদের আবার কোনও মূর্তি অপ্সরা বা যক্ষীদের। কিন্তু একসময় এক জায়গায় এসে তাদের থেমে যেতে হল। তাদের চারপাশে সব নিরেট দেওয়াল। সামনে এগবার আর কোনও পথ নেই। হয়তো নিশ্চয়ই সেখানে কোনও দিন দরজা বা কিছু ছিল। যা পরবর্তীকালে বুজিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন আর সে জায়গা চিহ্নিত করার উপায় নেই। জায়গাটা বদ্ধ বলে বাতাস সেখানে খুব ভারী, শ্বাস নিতেও সবার অসুবিধা হতে লাগল।
অগত্যা সবাই ফেরার পথ ধরল। যে ফোকর দিয়ে তারা ভিতরে ঢুকেছিল সেই ফোকর দিয়েই তারা বাইরে বেরিয়ে রওনা হল মন্দিরের সামনের চত্বরে ফেরার জন্য। বাকুমির মুখ দেখে স্বাগত স্পষ্টই বুঝতে পারল এত অনুসন্ধান চালিয়েও কিছু না মেলায় হতাশ তিনি। আর প্রফেসরের মুখ দেখে স্বাগতর মনে হল আগের মতোই তিনি কী যেন ভেবে চলেছেন। স্বাগত ফেরার সময় ভাবতে লাগল গতরাতে কীভাবে হেরুম আর সে পিছনের পথ দিয়ে বাইরে বেরল!
মন্দির তোরণের সামনের চত্বরে ফিরে এল তারা। সন্ন্যাসী তোরণের গায়ে তার ছায়ায় বসে আছেন। বাচ্চা ছেলেটাও ঘর থেকে বেরিয়ে তার পাশে এসে বসেছে। বাকুম প্রফেসর সহ স্বাগতরা চত্বরে উঠে তোরণের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই রত্নসম্ভব জানতে চাইলেন, ‘কিছু পেলেন?’
বাকুম উত্তর দিলেন, ‘পাইনি। ফোকরের ভিতর কিছুটা এগবার পরই পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’
সন্ন্যাসী হাসলেন। যেন তিনি জানতেন ওপথে আর মন্দিরে ভিতর প্রবেশ করা যাবে না। বাকুম বাচ্চা ছেলেটাকে বলল, ‘তুমি দেখেছিলে বুল পাথর দিয়ে ফঙ নামের লোকটাকে মেরেছিল? বুল তোমাকে ভয় দেখিয়ে এই মন্দিরে এনে রেখেছিল?
সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে ছেলেটা জানিয়ে দিল— ‘হ্যাঁ।’ ঠিক এই সময় পুলিসকর্তা বাকুমের ফোন বেজে উঠল। কলটা রিসিভ করে ফোনের ওপাশে যিনি আছেন তাঁর কথা শুনে নিয়ে ফোনটা প্রফেসরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “কিম লাইনে আছেন। উনি কী জানাচ্ছেন তা শুনে নিন।”
প্রফেসর ফোন কানে নিয়ে তাঁর কথা শুনতে শুনতে একবার বললেন, “আর কটা দিন কি সময় পাওয়া যাবে না? তাহলে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখতাম, অন্তত এ মন্দিরের পরিচয় উদ্ধার করা যায় কি না।’
প্রফেসরের কথার জবাব দিয়ে সম্ভবত ফোনটা কেটে দিলেন প্রভু অধিকর্তা কিম। রামমূর্তি বাকুমের হাতে ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে স্বাগতর দিকে তাকিয়ে একটু হতাশভাবে বললেন, ‘এতগুলো মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আর নতুন কোনও দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য সরকারি তরফে এ মন্দিরে আমাদের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হল। আজই আমাদের এ মন্দির ছেড়ে সিয়েমরিপ চলে যেতে হবে। আমাদের সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য বিকাল পর্যন্ত সময় দেওয়া হল। আমাদের আর একটা রাতও থাকতে দিতে রাজি নন কিম। অন্ধকার নামার আগেই সরকারি গাড়ি আসবে আমাদের সিয়েমরিপ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
পুলিস অধিকর্তা বাকুম বললেন, ‘হ্যাঁ। কিম আমাকেও একই কথা জানালেন। এ জায়গা ছেড়ে আজই আপনাদের চলে যেতে হবে। আমার মনে হয় না এত ঘটনার পর এ দেশের সরকার আর দ্বিতীয়বার আপনাদের এখানে কাজের অনুমতি দেবেন।’
এ কথা বলার পর বাকুম বললেন, “কিন্তু আমাকে তো তদন্ত থামালে চলবে না। সরকারের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেশ করতে হবে। খোঁজার চেষ্টা করতে হবে ওই অজ্ঞাত পরিচয় খামের যুবতীকে। পরিখায় কুমির থেকে থাকলে জাল দিয়ে তাদের ধরার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সেটা জরুরি। আমি এখন সে সব কাজের জন্য এখান থেকে বিদায় নেব। কোনও প্রয়োজন হলে আমাকে ফোন করবেন।’
—’আমি তো প্রফেসর একটু ব্যঙ্গের ছলে বাকুমকে বললেন, আপনার সন্দেহের তালিকায় আছি তাই না?’
—’আমাদের পুলিসের চোখে কেউই সন্দেহর ঊর্ধ্বে নয়।’—এ কথা বলে চত্বরের সামনে রাখা তার গাড়ির দিকে পা বাড়ালেন পুলিকর্তা বাকুম।
তিনি চলে যাওয়ার পর প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘স্বাগত, এবার তাহলে সব গোছগাছ করে নিতে হবে আমাদের। নাতাশাদেরও ব্যাপারটা জানিয়ে দাও। আর দুপুরের খাবার ব্যবস্থাও করতে হবে। চাল-ডাল আছে, ফুটিয়ে নিলেই হবে। আজ তো আর হেরুম নেই, এ কাজটা আমাদেরই করতে হবে।’
বিক্রম বলল, ‘রান্নার কাজটা আমিই সেরে ফেলছি। ভাগ্য ভালো হেরুম খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলেনি! শুধু তার লোককে পাঠিয়েছিল মাদক বা ঘুমের ওষুধ মেশানো পানীয় দিয়ে। লোকটা যতই খারাপ হোক এ জন্য তার ধন্যবাদ প্রাপ্য।’
এরপর সে স্বাগতকে প্রশ্ন করল, ‘তুমিও তো পানীয়র বোতল নিয়েছিলে। তবে তোমার ওপর পানীয়র কোনও প্রভাব পড়ল না কেন?’
স্বাগত সেই প্রশ্নর জবাবে তার হাত থেকে বাঁদরিটার বোতল ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলল।
প্রীতম কথাটা শুনে মন্তব্য করল, ‘বাঁদরির আচরণটা অনেকটা মানুষের মতোই তাই না? যেন সে ভালো খারাপ অনুমান করতে পারে বা বুঝতে পারে! সে তোমার হাত থেকে বোতল ছিনিয়ে নিল, তোমার কথা অনুসারে নাতাশা যখন অপ্রকৃতিস্থ ভাবে ছুরি হাতে তোমাকে আক্রমণ করেছিল সে তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার ওপর। আবার যখন নারেঙ পালাতে যাচ্ছিল তখন সে পালাতে দিল না তাকে। ‘
স্বাগত কোনও কথা না বললেও বাঁদরিটা সম্পর্কে একইরকম ধারণা তৈরি হয়েছে তার মনেও।
প্রফেসর রামমূর্তি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে বলল, ‘আপনি এখন কী করবেন?’
সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বললেন, ‘বেলা তো প্রায় দু’টো বাজতে চলল। বেশ অনেকটা পথ আমাকে হেঁটে যেতে হবে। আমার বয়স হয়েছে। রোদের তেজ একটু কমে আসুক, তারপর আমি বায়ুম মন্দিরে ফিরে যাব।’
তাঁর কথা শুনে স্বাগতর মনে হল, স্বাগতরা যতক্ষণ এখানে আছে ততক্ষণ যেন তিনি মন্দির ছাড়তে চাইছেন না। স্বাগত সৌজন্যর খাতিরে বলল, ‘তাহলে দুপুরবেলা আপনি আমাদের সঙ্গে দু’মুঠো ভাত খেয়ে নেবেন।’
রত্নসম্ভব বললেন, ‘আমি ভগবান বুদ্ধকে পুজো না করে আহার গ্রহণ করি না। সে কাজ আজ আমার করা হয়নি। আমি খাব না। তবে বাচ্চাটাকে খেতে দেবেন।’
সন্ন্যাসী আর বাচ্চা ছেলেটা সেখানেই বসে রইল। বিক্রম প্রীতমকে নিয়ে এগল ভাড়ার ঘরের দিকে। প্রফেসরও এগলেন তাঁর ঘরের দিকে। স্বাগত তার ঘরে যাওয়ার আগে সন্ন্যাসীর উদ্দেশে বলল, ‘আপনি কিন্তু আমার ঘরে এসে বিশ্রাম নিতে পারেন। সারারাত আপনার ওপর দিয়েও ধকল গিয়েছে।’
সন্ন্যাসী হেসে বললেন, ‘তার কোনও প্রয়োজন নেই। আমি এখানেই বসি।’
স্বাগত এরপর আর কোনও কথা না বলে পা বাড়াল। নাতাশাদের ঘরে গিয়ে সে খবরটা দিয়ে সে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। তারপর নিজের জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল। কিছু সময়ের মধ্যেই খাবার জন্য ডাক দিল বিক্রম। খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছে তারা। স্বাগত বাইরে বেরিয়ে এল। নাতাশা আর সুরভীও এল। স্বাগত বাচ্চা ছেলেটাকে ডেকে নিল ভাড়ার ঘরের কাছে তাদের খাবার জায়গাতে। প্রফেসরের ঘরের দরজা বন্ধ। প্রীতম বলল, ‘প্রফেসরের খাবারটা বরং ঘরেই দিয়ে আসি।’ খাবার নিয়ে প্রফেসরের ঘরে দিয়ে এগল সে। প্রফেসরের ঘরে ঢুকে খাবার দিয়ে ফিরে আসার পর বিক্রম জানতে চাইল, ‘প্রফেসর কী করছেন?’
প্রীতম বলল, ‘আমাদের এ জায়গা থেকে চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেলেও প্রফেসর এখনও মন্দির সম্পর্কে তাঁর মোহ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। দেখলাম ল্যাপটপ খুলে তিনি মন্দিরের ছবি দেখছেন। ওই যে মন্দিরের ভিতর ওপরে সে জায়গার ছবিটা, যেখানে একটা ফাঁকা জায়গা ঘিরে দেওয়ালের চারপাশ ঘিরে প্রাচীন ব্রাহ্মণদেব মূর্তি খোদাই করা আছে।”
বিক্রম সাধারণত অনেক কথাতেই মজা করে। কিন্তু এবার সে বেশ সিরিয়াস ভাবে বলল, ‘সত্যি কথা বলতে কী আমারও বেশ খারাপ লাগছে মন্দির ছেড়ে চলে যেতে। এতদিন মন্দিরে রইলাম। কীভাবে কখন যেন আমারও মায়া পড়ে গিয়েছে এই মন্দিরের ওপর। এখন ব্যাপারটা অনুভব করতে পারছি। আর প্রফেসরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটা তো আরও স্বাভাবিক। তিনিই তো কাজের নেতৃত্বদান করছিলেন, আমাদের আগে থেকেই এ মন্দিরে এসেছিলেন। মন্দির সম্পর্কে তাঁর আগ্রহই তো সবথেকে বেশি ছিল।’
বিক্রম বলল, ‘এ মন্দিরের পরিচয়টা অন্তত তিনি যদি জেনে যেতে পারতেন তাহলেও হয়তো তাঁর কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো। সেটা জানার শেষ চেষ্টা করার জন্যই তিনি কিমের কাছে আরও একটা দিন সময় চেয়েছিলেন কিন্তু পেলেন না। তবে আমার মতো তোমাদের নিশ্চয়ই ধারণা যে সন্ন্যাসী এ মন্দির সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। কিন্তু তিনি মুখ খুলতে নারাজ। আর জানে স্বাগতকে গল্প বলা খামের যুবতী। বাকুম তাকে খুঁজে বার করতে পারবেন কি না কে জানে। আর তাকে খুঁজে পেলেও হয়তো বা তার কথা আমাদের কানে আসবে না। আমরা তো দেশে ফিরে যাব।’
স্বাগত কারও কথাতে কোনও মন্তব্য করল না। একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা তাকেও যেন গ্রাস করতে শুরু করেছে। তার যেন জেনেও শেষ পর্যন্ত জানা হল না এ মন্দিরের কথা, খামের যুবতীর সঙ্গে আর সম্ভবত কোনওদিনই তার দেখা হবে না, শোনা হবে না তার কাহিনির শেষ অংশ। বহ্নি আর চম্পা কি শেষ পর্যন্ত মিলিত হতে পেরেছিল? স্বাগতর কেমন যেন মনে হতে লাগল এ জায়গার সঙ্গে তার বহু যুগের সম্পর্ক যেন ছেদ করে সে চলে যাচ্ছে।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর ঠিক হল কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকাল চারটের সময় তারা মালপত্র নিয়ে ঘর থেকে চত্বরে বেরবে। হয়তো বা তার কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি তাদের নিতে চলে আসবে। যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকতে হবে সবাইকে। স্বাগতও ঘরে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সে ভাবতে লাগল গত রাতের ঘটনার কথা, এখানে আমার খামের যুবতীর সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথা, তার বলা কাহিনি, স্বাগতর সঙ্গে তার কথোপকথন। আর সেসব ভাবতে ভাবতে স্বাগতর মন আরও বিষণ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। স্বাগত কি নিজের অবচেতনেই ওই খামের যুবতীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল? আর ওই যুবতীও তার প্রেমে? একথাই যেন তার মনে হতে লাগল খোলা জানলার বাইরে চত্বরের দিকে তাকিয়ে স্বাগতর মনে হল চলে যাওয়ার আগে যদি একবারের জন্যও ওই যুবতীর দেখা পাওয়া যেত তবে ভালো লাগত তার। স্বাগত অন্তত কুমিরের মুখ থেকে প্রাণ রক্ষার জন্য একবার তার হাত স্পর্শ করে ধন্যবাদ জানিয়ে যেতে পারত। সময় এগিয়ে চলল বিকালের দিকে। একসময় স্বাগত দেখল প্রফেসর রামমূর্তি তার ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরের সামনে পায়চারি শুরু করেছেন।
ঠিক চারটে নাগাদই ফেরার জন্য তৈরি হয়ে মালপত্র নিয়ে চত্বরের মাঝখানে এসে উপস্থিত হল সবাই। তাদের দেখে প্রফেসর রামমূর্তিও পায়চারি থামিয়ে ঘরে ঢুকে নিজের স্যুটকেস, মালপত্র বার করে এনে স্বাগতদের কাছে সেগুলো রাখবেন। তোরণের গায়ে একইভাবে বসেছিলেন সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব। পাশে বাচ্চা ছেলেটাও বসে। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা ফেরার জন্য রওনা হবেন। তাদের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে প্রফেসর স্বাগতদের বলল, ‘কিম আমাকে আবার ফোন করেছিলেন। তিনি জানালেন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ গাড়ি আমাদের নিতে আসবে। হাতে খানিকটা সময় আছে, চল তোরণের ওখানে গিয়ে বসি?’
প্রফেসর রামমূর্তির পিছন পিছন সবাই এগল সেদিকে। বিকালের সূর্যালোক এসে পড়েছে তোরণ শীর্ষে প্রাচীন বিষ্ণুদেবের মুখমণ্ডলে। সে মুখ এবার যেন কেমন বিষণ্ণ বলে মনে হল। স্বাগতর। এখানে আসার পর ওই প্রাচীন মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে নানা সময় নানা কথা মনে হয়েছে স্বাগতর। কখনও মনে হয়েছে ওই মুখমণ্ডল খুব রহস্যময়। কখনও মনে হয়েছে খুব গম্ভীর, যেন দৃষ্টি উন্মীলিত অবস্থায় ধ্যানে মগ্ন দেবতা, কখনও বা মনে হয়েছে তাঁর ঠোঁটের কোণে জেগে রয়েছে হাসির রেশ আবার এখন যেন দেখে মনে হচ্ছে তাঁর মুখমণ্ডলে বিষণ্নতার ছাপ। হয়তো বা প্রাচীন ভাস্কররা হাজার বছর আগে এমন কৌশল আর দক্ষতার সঙ্গে ওই মূর্তি রচনা করেছিলেন যে তাঁর দিকে তাকালে কোনও মানুষের সে সময়ের মনোভাব ওই দেবতার মুখমণ্ডলে প্রতিফলিত হয়। অথবা ওই মুখমণ্ডল সত্যিই জীবন্ত! হাজার হাজার বছর ধরে সে জেগে আছে, পাহারা দিচ্ছে ওই মন্দিরকে। এ মন্দিরের মায়া রহস্য নিশ্চয়ই জানা আছে ওই মুখমণ্ডলের।—এসব কথা ভাবতে ভাবতে স্বাগতরা এসে দাঁড়াল তোরণের সামনে। সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব তাদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন।
প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘কিম জানিয়েছেন আমাদের নিতে গাড়ি আসতে আরও ঘণ্টাখানেক সময় লাগবে। আর হয়তো আমাদের এ মন্দিরে কোনওদিন আসা হবে না। এই মন্দিরে থাকতে থাকতে মন্দিরটির ওপর আমার একটা মায়া জন্মে গিয়েছে। হয়তো বা আমার সঙ্গীদেরও। তাই সময় যখন হাতে আছে তখন ভিতরে গিয়ে মূল মন্দিরটা একবার দেখে আসি শেষবারের মতো?’— এ কথা বলে তিনি স্বাগতর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের কী ইচ্ছা?’
স্বাগত তাকিয়ে ছিল তোরণের ভিতর দিকে। তারও মনে হচ্ছিল মন্দিরের ভিতরে শেষ একবারের মতো ঘুরে আসতে পারলে ভালো হয়। এমনও তো হতে পারে ওই খামের যুবতী এসে আত্মপ্রকাশ করল তাদের সামনে। হয়তো সে মন্দিরের গোপন কুঠুরিগুলোর মধ্যে কোথাও আত্মগোপন করে ছিল বা আছে। স্বাগতদের উপস্থিতি টের পেয়ে সে বেরিয়ে এসে শেষবারের জন্য দেখা দিল? তাই প্রফেসরের কথা শুনে স্বাগত বলে উঠল, ‘আমারও তেমনই ইচ্ছা। শেষবারের মতো একবার গিয়ে দেখে আসি মন্দিরটা।’
প্রীতম আর বিক্রমও সম্মত্তি প্রকাশ করল স্বাগত আর প্রফেসরের কথায়, এমনকী নাতাশাও কোনও আপত্তি করল না। স্বাগত বুঝতে পারল সবাই আসলে নিজেদের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছিল এই প্রাচীন ভগ্ন মন্দিরকে। তাই এ মন্দিরের সঙ্গে বিচ্ছেদ-বেদনার সুর এই বিদায়বেলাতে সবারহমনেই কমবেশি বেজে উঠেছে। তাই সবাই একবার শেষবারের মতো হেঁটে দেখে আসতে চায় মন্দিরের ভিতর। যেখানে আর কোনওদিন হয়তো তাদের পদচিহ্ন পড়বে না।
সবাই সম্মত হওয়াতে রামমূর্তি সকলকে নিয়ে মন্দির তোরণ অতিক্রম করতে যাচ্ছিলেন। সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবকে স্বাগতকে বলল, ‘আপত্তি না থাকলে আপনিও আমাদের সঙ্গে চলুন না? একসঙ্গে সবাই মন্দিরের ভিতর শেষ একবার ঘুরে আসি? হয়তো আপনার সঙ্গলাভের সৌভাগ্যও আমাদের আর কোনওদিন হবে না।’
সন্ন্যাসী একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, চলুন।’ বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে তিনিও স্বাগতদের সঙ্গী হলেন।
তোরণ অতিক্রম করে শেষবারের মতো মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করল সকলে। তারা যেদিন প্রথমবার এই মন্দিরে প্রবেশ করেছিল, ঠিক সেদিনের মতোই প্রাঙ্গণের অলিন্দের গায়ে, তার মাথার ওপর থেকে সার সার ভগ্নপ্রায় মূর্তিগুলো তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। এ প্রাঙ্গণেই স্বাগতরা প্রথম কাজ শুরু করেছিল। তার চিহ্ন এখনও ছড়িয়ে আছে, জরিপ করা ভগ্ন মূর্তিগুলোর খণ্ডিত দেহাংশে। প্রথম প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে তারা সেই অন্ধকার কক্ষগুলোর ভিতর প্রবেশ করল। মোবাইল টর্চের আলোতে তাদের চোখে পড়ল পরিচিত মূর্তিগুলো। হয়তো বা আবারও শত শত বছর ধরে অন্ধকারের মধ্যেই ডুবে থাকবে এইসব ভাস্কর্য-মূর্তি। কক্ষগুলোকে অতিক্রম করে তারা মূল মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করল। এক জায়গাতে ছিটকে পড়ে আছে নারেঙ খামের ছবি তোলার সেলফি স্টিকটা আর গোপন অস্ত্রের খাপটা। সেটার দিকে তাকিয়ে প্রফেসর বললেন, ‘এখানে আসার পর আমাদের কোনও গ্রুপ ছবি তোলা হয়নি। একটা ছবি তুলতে হবে। স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে ছবিটা।’
পায়ে পায়ে সবাই এগিয়ে গিয়ে মূল মন্দিরের সামনে দাঁড়াল। সবাই শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখতে লাগল মন্দিরটাকে। বিক্রম হঠাৎ বলল, ‘আরে ওই দেখুন বাঁদরিটা ওখানে বসে আছে!’
স্বাগতরাও দেখতে পেল তাকে। দোতলার রেলিংয়ের গায়ে এক কোণে বসে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখছে স্বাগতদের। প্রীতম বলল, ‘আমরা চলে যাওয়ার পর ও একলা রয়ে যাবে এখানে। হয়তো ওরও খারাপ লাগবে আমরা চলে গেলে।’
প্রফেসর মোবাইল ফোন বার করে রত্নসম্ভবের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমাদের একটা ছবি তুলে দিন।’
স্বাগতরা মন্দিরের প্রবেশপথের সামনে মন্দিরকে পিছনে রেখে সকলে সার বেঁধে দাঁড়াল। বাঁদরিটাও সে সময় রেলিং বেয়ে এসে তাদের মাথার ওপর এসে উপস্থিত হল। তা খেয়াল করে প্রফেসর হেসে বললেন, ‘বাঁদরিটাও মনে হয় আমাদের সঙ্গে ছবি তুলতে চাইছে।’
প্রীতম সন্ন্যাসীকে বলল, ‘হ্যাঁ, ওকে সমেত ছবিটা তুলুন। ও তো এখানে আমাদের সঙ্গী ছিল।’
রত্নসম্ভব ছবি তুলে ফোনটা রামমূর্তির হাতে ফেরত দিয়ে বললেন, ‘চলুন তাহলে এবার বাইরে ফেরা যাক।’
প্রীতম সন্ন্যাসীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাওয়ার আগে এ মন্দিরের পরিচয়টা জেনে যেতে পারলে ভালো হতো। আর ওই গুপ্তকক্ষর মধ্যে কী জিনিসই বা রাখা আছে? এসব জানতে বড্ড কৌতূহল হচ্ছে আমার। আমাদের ধারণা আপনি সবকিছু জানেন। যাওয়ার আগে ব্যাপারটা বলুন না আমাদের?’
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি। সে জন্যই ব্যাপারটা বলা সম্ভব নয় আপনাদের। প্রফেসর আগেও জানতে চেয়েছেন ব্যাপারটা। আমি বলিনি। কারণ, হয়তো কথাগুলো কোনওভাবে ভবিষ্যতে জানাজানি হয়ে গেল। ওই গুপ্তকক্ষে পৌঁছবার রাস্তা জানতে পারল কেউ। হেরুমের মতো কেউ আবার এসে হানা দিল এখানে। হেরুম সফল হয়নি কিন্তু সে হল। এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটতে পারে। তাই আমি জানলেও এ মন্দিরের পরিচয় বা ওই গোপন কক্ষর সন্ধান প্রকাশ করতে পারব না।’ এ কথা বলে সন্ন্যাসী বাচ্চা ছেলেটার হাত ধরে ফেরার পথ ধরতে যাচ্ছিলেন ঠিক সেই সময় প্রফেসর রামমূর্তি সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আপনি না বললেও কীভাবে ওই গুপ্তকক্ষের সন্ধান পাওয়া যাবে, তা আমি জানি। আমি সেখানে পৌঁছতে পারলে সম্ভবত এ মন্দিরের রহস্য উন্মোচিত হবে।’
‘তার মানে?’ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে একটু বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করলেন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী।
প্রফেসরের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘আমি জানি কোনও নারীর কাছে ওই প্রাচীন কক্ষে প্রবেশের সন্ধান আছে। ফঙই সম্ভবত প্রথম সন্ধান পেয়েছিল ওই নারীর। সম্ভবত সে নারেঙকে ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত বলে ফেলেছিল, আর তার মাধ্যমে খবরটা পৌঁছেছিল হেরুম আর বুলের কাছে। পাছে সে টাকার লোভে খবরটা অন্য কাউকে দিয়ে দেয় তাই তাকে খুন হতে হল। আমার এখন এও অনুমান কঙ হয়তো সেই নারীর কথা সোয়াঙকেও বলেছিল। অথবা হোয়াঙ তার কথা শুনে ব্যাপারটা আঁচ করেছিল। আর সেই নারীর খোঁজেই সে মন্দির নগরীতে পৌঁছেছিল। তারপর তাকে খুন করে হেরুমরা। বুল-হেরুম-নারেঙ ওই নারীর থেকেই ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশের পথ জানে। তারপর প্রবেশ করে ওই গুপ্তকক্ষে। সে নারীর সন্ধান আমি পেয়ে গিয়েছি।’
স্বাগত খেয়াল করল প্রফেসর রামমূর্তির কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের মুখ। আর তা দেখেই যেন কথাগুলো বলার পর হাসি ফুটে উঠল প্রফেসরের মুখে।
প্রীতম বলে উঠল, ‘কে সেই নারী? স্বাগতর ওই খামের যুবতী?’
প্রফেসর প্রীতমের কথার জবাবে প্রথমে বললেন, ‘না, সেই খামের যুবতী নয়।’
—‘তবে কি সে কোনও প্রেতাত্মা?’ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল বিক্রম।
প্রফেসর রামমূর্তি তাঁর কথার রহস্য বজায় রেখে বললেন, ‘না, সে কোনও প্রেতাত্মাও নয়। সন্ন্যাসী আপনি সম্ভবত জানেন যে যুগ যুগ ধরে কোনও নারীর কাছে গুপ্ত কক্ষে প্রবেশের হদিশ গচ্ছিত আছে। তার পরিচয় আপনি দেবেন, নাকি আমি?’
সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব যেন চেষ্টা করলেন প্রফেসরের কথা না বোঝার ভান করার। তিনি বললেন, ‘আপনার কথা আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে না।’
প্রফেসর বললেন, ‘আমি এবার স্পষ্ট করে দিচ্ছি ব্যাপারটা। কিছু দূরে জঙ্গলের মধ্যে যেখানে লতাগুল্মর আড়ালে পাথরের ফলকের ওপর খোদিত নর্তকী মূর্তি ক’দিন আগেও ছিল সেই মূর্তির কাছেই আছে ওই গোপন কক্ষে প্রবেশের সন্ধান। তার ফলকের পিঠেই খোদাই করা আছে এ মন্দিরের মানচিত্র আর ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশ পথের হদিশ।’
সন্ন্যাসী এবার তার কথা শুনে বিড় বিড় করে যেন বললেন, ‘আমি এ ভয়টাই পাচ্ছিলাম।’
প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘যে রাতে হোয়াঙ এখানে এসেছিল অথবা যে রাতে সম্ভবত সে খুন হয় সে রাতে বুল আর হেরুম কিন্তু খালি হাতে ফেরেনি। তারা ফিরেছিল ওই পাথরের ফলকটাকে সঙ্গে করে। আপনি নিশ্চয়ই ব্যাপারটা আড়াল থেকে খেয়াল করেছিলেন, আর আমিও করেছিলাম। তারা মূর্তিটা নিয়ে মন্দিরে ফিরে আসে আর তা একস্থানে লুকিয়ে রাখে। মন্দিরে ঢোকার পর তাদের দু’জনকে দেখতে না পেলেও তার পরদিন একসময় মন্দিরে ঢুকে ওই মূর্তিটা খুঁজে পেয়েছিলাম কিছুটা কাকতালীয় ভাবেই। প্রথমে আমি দেখি দোতালার বারান্দার একটু নীচে লতাগুল্ম ঢাকা কার্নিশে কী যেন একটা নড়ে উঠল। আমি কাছে যেতেই দেখতে পেলাম বাঁদরিটাকে। সে কিন্তু আমাকে দেখে নড়ল না। ভালো করে তাকাতেই দেখি সে পাথরের ফলকটাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। নারী মূর্তির পিছনে অর্থাৎ ফলকের গায়ে স্পষ্ট খোদাই করা আছে এ মন্দিরের নকশা-মানচিত্র।
এ সন্দেহটা আমার আগেও হয়েছিল ব্রাহ্মণদের ঘিরে থাকা দেওয়ালের গায়ের শূন্যস্থান আর ফলকের গায়ের সাদৃশ্য দেখে। ওই শূন্যস্থানেই বসানো ছিল মূর্তি সমেত ফলকটা। সাধারণত যেসব প্রাচীন মন্দিরে কোথাও কোনও গুপ্ত স্থান থাকে সে মন্দিরের কোনও স্থানেই সেই গুপ্ত স্থানের হদিশও লেখা থাকে লুকানো অবস্থায়। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভেবেছিলাম গতকাল কোনও সময় ওই নকশার সাহায্যে আমি ওই গুপ্তকক্ষের রহস্য উন্মোচন করব। তারপর অন্যদেরকে ব্যাপারটা দেখাব।
কিন্তু নাতাশার অন্তর্ধান, পুলিসের উপস্থিত হওয়া, মাদক পানীয় পান করে অচৈতন্য হয়ে পড়ার ফলে কাজটা আমার পক্ষে করে ওঠা সম্ভব হয়নি।’—এই বলে প্রফেসর সন্ন্যাসীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার জন্য তাকালেন তাঁর দিকে। প্রফেসরের কথা শুনে বিস্মিত সবাই। সন্ন্যাসী নিশ্চুপ। যেন তিনি কী বলবেন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।
