বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৪৯
পর্ব ৪৯
গতর মনে পড়ল, একদিন সে ফঙকে ওই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। জঙ্গলের মধ্যে একটা পরিমাপের টেপও খুঁজে পেয়েছিল। সম্ভবত ফুঙই সর্ব প্রথমে দেওয়ালের গায়ে মুণ্ডিত মস্তক সন্ন্যাসীদের ঘিরে থাকা শূন্যস্থানের রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাগতর মনে হল প্রফেসরের অনুমান সঠিক।
বিক্ৰম হঠাৎ বলল, ‘তাহলে আমরা ওই মূর্তি সমেত ফলকটাকে কি তাক থেকে নামিয়ে আনব? কোন তাকে রাখা আছে ফলকটা? যাওয়ার আগে নয় আমরা এ মন্দিরের রহস্য উন্মোচন করে যাই?’
সন্ন্যাসী এবার বললেন, ‘আমার অনুরোধ এ কাজটা আপনারা করতে যাবেন না।’
সন্ন্যাসীর উদ্দেশে প্রফেসর বললেন, ‘আমরা এ মন্দিরের সংস্কার আর পরিচয় উদ্ঘাটনের জন্য আমাদের দেশ থেকে কাজ করতে এসেছিলাম। প্রচুর পরিশ্রমও করেছি সবাই মিলে।’ কিন্তু আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সফল হইনি। এখন যখন এ মন্দিরের পরিচয় জানার সুযোগ এসেছে, তখন তা হাতছাড়া করি কীভাবে বলুন? আজ যখন ওই গোপন কক্ষে প্রবেশের জন্য অনুসন্ধান চালানো হচ্ছিল, তখন আমি ইচ্ছা করেই কথাটা বাকুমকে বলিনি। যাতে তিনি এ মন্দিরের রহস্য উন্মোচনের জন্য নিজে কৃতিত্ব দাবি করতে না পারেন। আর তাছাড়া তিনি তো আমাকেও দুষ্কৃতী সন্দেহ করছেন। তবে মন্দিরের পরিচয় উদ্ধার করতে পারলে বা ওই গোপন কক্ষ থেকে কোনও প্রাচীন জিনিস উদ্ধার হলে সেসবও আমি তুলে দেব এ দেশের সরকারের হাতে। আর তাতে প্রমাণ হবে আমি এ মন্দিরে কোনও গুপ্তধনের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছিলাম না, আর তার জন্য আমি কোনও ষড়যন্ত্র বা অপরাধও করিনি।’
প্রফেসরের দিক থেকে বিচার করলে তাঁর কথার মধ্যে যুক্তি আছে। তাছাড়া এখন হয়তো আর প্রফেসরের সন্ন্যাসীর অনুরোধ রাখা সম্ভব নয়। এ কথা বুঝতে পেরেই সম্ভবত সন্ন্যাসী চুপ করে গেলেন।
প্রফেসর এরপর মন্দিরের ওপরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন ওই যে ওই তাকটা।
নীচ থেকে সেদিকে তাকিয়ে স্বাগতর মনে হল, লতাগুল্মর আড়াল থেকে সেই ফলকটার কিছুটা অংশ যেন উঁকি দিচ্ছে সেখানে। বিক্রম, প্রীতম মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করতে যাচ্ছিল ফলকটা তাক থেকে উদ্ধার করবে বলে। ঠিক সেই সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বাঁদরিটা এতক্ষণ তাদের মাথার ওপর বসে তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে যেন বুঝতে পারল প্রফেসর রামমূর্তি আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কথোপকথন। সে যেন বুঝতে পারল বিক্রমরা কেন মন্দিরে প্রবেশ করতে চাইছে। যেন প্রতিবাদের স্বরে একটা চিৎকার করে উঠল সে। তার চিৎকার শুনে মন্দিরে ঢোকার আগে দাঁড়িয়ে পড়ল বিক্রমরা। এরপর একটা অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটাল বাঁদরিটা। সে দ্রুত কয়েকটা লাফে পৌঁছে গেল ফলকটার কাছে, তারপর আঁকড়ে ধরল ফলকটা! প্রফেসর বললেন, ‘বাঁদরিটাকে তাড়াতে হবে দেখছি!’ বিক্রম মাটি থেকে একটা ছোট পাথরের টুকরো কুড়িয়ে নিল সেটা ছোড়ার ভঙ্গি করে বাঁদরিটাকে ভয় দেখাবার জন্য, আর বাঁদরিটা এরপরই পাথরের ফলকটাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে ওপর দিকে লাফ দেবার চেষ্টা করল মূর্তি সমেত ফলকটাকে নিয়ে পালাবার জন্য। কিন্তু একটা বাঁদরির পক্ষে ভারী পাথরের ফলক নিয়ে লাফ দেওয়া কি সম্ভব? পাথরটা স্থানচ্যুত হল ঠিকই কিন্তু বাঁদরি পাথরের ফলকটা নিয়ে ওপরে উঠতে পারল না। ওপরদিকে ওঠার পরিবর্তে সে কার্নিশ থেকে সেই নারী মূর্তি সমেত ছিটকে পড়ল নীচে পাথর বসানো প্রাঙ্গণে। কলকটা আছড়ে পড়ায় মুহূর্তের জন্য একটা প্রচণ্ড শব্দ হল আর ধুলোর ঝড় উঠল। স্বাগতরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল যেখানে বাঁদরিটা ফলকটা নিয়ে আছড়ে পড়ল সে জায়গায়। তারা দেখল, প্রাচীন কলকটা একেবারে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছে। আর তার মধ্যে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে বাঁদরিটা। রক্ত বেরচ্ছে তার নাক-কান দিয়ে। প্রাণীটার চোখের পাতা বন্ধ, শরীরটাও স্থির। সম্ভবত পাথরে আছড়ে পড়ে মাথায় চোট লেগে মারা গেল প্রাণীটা। দৃশ্যটা অবশ্যই মর্মান্তিক। স্বাগতরা কেউই চায়নি এটা ঘটুক। প্রফেসর আফশোসের স্বরে বললেন, ‘কেন যে প্রাণীটা এ কাজ করতে গেল কে জানে। খুব দুঃখজনক ঘটনা ঘটল।’ স্বাগতর দৃশ্যটা যেন সহ্য হচ্ছিল না। সে অন্যদিকে মুখ ফেরাল। সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বললেন, ‘ওর অনেক বয়স হয়েছিল। আঘাতটা আর ও সহ্য করতে পারল না। আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, চল্লিশপঞ্চাশ বছর আগে আমি যখন এ মন্দিরে এসে আত্মগোপন করেছিলাম তখনও ও এখানেই ছিল।’
প্রীতম সন্ন্যাসীর কথা শুনে বলল, ‘বাঁদর কি এত বছর বাঁচে?’
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আর প্রীতমের প্রশ্নের জবাব দিলেন না। বিষণ্ণভাবে তিনি বললেন, ‘তবে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার শেষ। ইচ্ছাটাও পূর্ণ হল। ও চাইছিল না যে, ফলকটা কেউ হাতে পাক, প্রবেশ করুক ওই গুপ্তকক্ষে। সে জন্যই সম্ভবত ও ফলকটা নিয়ে পালাবার চেষ্টা করছিল। ফলকটা একদম চুরমার হয়ে গেছে, এখন আর ওই নকশা দেখে আর কোনওদিন ওই গুপ্তকক্ষে পৌঁছতে পারবেন না কেউ। এমনকী আমিও না। বহু যুগ আগে আমি যখন এখানে আত্মগোপন করেছিলাম তখন ফলকটা খসে পড়েছিল দেওয়াল থেকে। তবে বেশি ওপর থেকে না পড়ার কারণে ফলকটা অক্ষতই ছিল। আমি দেখেছিলাম ওর পিছনে আঁকা মন্দিরের নকশা, ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশের পথ। তবে আমি সেখানে প্রবেশ করিনি। মহামঙ্গলের পুঁথিতে ওই কক্ষে প্রবেশ করতে নিষেধ করা ছিল। এ মন্দির ত্যাগ করার সময় আমিই এই ফলকটাকে নিয়ে গিয়ে বাইরে জঙ্গলের মধ্যে রেখে এসেছিলাম যাতে চট করে কেউ না বুঝতে পারে এই মূর্তি-ফলকটা মন্দিরেরই অংশ। যেমন আরও অনেক মূর্তি মন্দির নগরীর নানান স্থানে পড়ে আছে যাদের সঙ্গে এ মন্দিরের কোনও সম্পর্ক নেই। তাদের ভিড়েই আমি সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম ওই নারীকে। বহু বছর আগে ওই ফলকের গায়ে আমি নকশা দেখেছিলাম তা আজ আর আমার মনে নেই। কাজেই কেউ আর প্রবেশ করতে পারবে না।’
প্রফেসরের মুখমণ্ডলেও এবার স্পষ্ট হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছেও ব্যর্থ হলেন তিনি। কয়েক মুহূর্তর জন্য একটা অসীম নৈঃশব্দ্য নেমে এল চারপাশে। স্বাগতর হঠাৎ মনে হল শেষ একবার অনুরোধ করা যাক সন্ন্যাসীকে। সে সন্ন্যাসীকে বলল, ‘ওই গুপ্তকক্ষে যাবার হদিশ যখন আর কেউ কোনও দিন জানতে পারবে না, তখন নিশ্চয়ই আপনার আর আতঙ্কর কিছু নেই। আপনি যদি দয়া করে আমাদের বলেন যে, এ মন্দিরটা কীসের মন্দির আর কী রাখা আছে ওই গুপ্তকক্ষে? খামের যুবতী আমাকে বলেছিল তার গল্প শেষ হলে আমি বুঝতে পারব সব ঘটনা। কিন্তু সে তার গল্প শেষ করে যেতে পারেনি। সে কাহিনি সম্ভবত আপনার জানা। দয়া করে যদি সেটুকুও অন্তত আমাকে বলেন?’
স্বাগতর কণ্ঠস্বর একটা কাতর আবেদন ছিল। তা সম্ভবত এবার আর উপেক্ষা করতে পারলেন না বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তিনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ঠিক আছে আমি সে কাহিনি শোনাব আপনাদের। ওই খামের যুবতীর সঙ্গে সম্ভবত আর কোনও দিনই আপনার দেখা হবে না। তার কাহিনির না বলা অংশের মধ্যে সত্যি লুকিয়ে আছে এ মন্দিরের পরিচয়। কিন্তু সে কথা শোনার আগে আপনাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আপনার প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস করেই আমি কথাগুলো বলব।’
স্বাগত জানতে চাইল, ‘কী প্রতিশ্রুতি?’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘যদি কোনও দিন আপনার স্মৃতিতে ফিরে আসে আপনি ঠিক কোন পথে কীভাবে ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশ করতে পারেন, তবে সে কথা আপনি জানাবেন না কাউকে, আপনি কোনও দিন ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করবেন না। এমনকী আপনি আর কোনওদিন ফিরে আসবেন না এই মন্দিরে বা মন্দির নগরীতে। ভগবান বিষ্ণুর নামে শপথ করে আপনি এই প্রতিশ্রুতি দিন আমাকে।’
স্বাগত বলল, ‘আমি ভগবান বিষ্ণুর নামে শপথ করে বলছি এ মন্দিরের গুপ্তকক্ষের প্রবেশপথ কখনও আমার মনে পড়লেও তা আমি কোনওদিন কারও কাছে ব্যক্ত করব না। আর আমি কোনওদিন ফিরে আসব না এই প্রাচীন নগরীতে।’
বেলা ইতিমধ্যে পড়ে আসছে, আলো নরম হয়ে আসতে শুরু করেছে। স্বাগতর থেকে শপথ গ্রহণের পর সন্ন্যাসী বললেন, ‘চলুন বসে কথা বলি। অবশ্য আমার কথা বলতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’
সকালের দিকে যে পাথর খণ্ডগুলোয় বসে সকলে কথা বলছিল সেই পাথর খণ্ডগুলোর ওপরে গিয়ে বসল স্বাগতরা। কিছুটা তফাতে নাতাশাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সুরভী আর বাচ্চা ছেলেটা। মৃত বাঁদরিটার দিকে তারা যায়নি দৃশ্যটা এড়াবার জন্য। তারাও এসে বসল স্বাগতদের সঙ্গে। একটু চুপ করে থাকার পর সন্ন্যাসী বললেন, ‘আমি আপনাদের যা বলব তা সবই প্রাচীন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গলের পুঁথি থেকে আমার জানা। সাবধানতাবশত তিনি তাঁর পুঁথিতে গুপ্তকক্ষের সন্ধান না লিখলেও সে সময়ের ঘটনার বাকি সবটুকুই লিখে গেছিলেন। স্বাগতর মুখ থেকে আপনারা ওই খামের যুবতীর বলা কাহিনির অংশটুকু শুনেছেন। যেখানে এসে তার কাহিনি শেষ করেছিল আমি সেখান থেকেই সেই কাহিনি শুরু করছি।’
বায়ুম বুদ্ধ মন্দিরের বৃদ্ধ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বলতে শুরু করলেন তাঁর কথা
‘খড়্গার সাহায্যে উগ্রদেবের প্রাসাদ ত্যাগ করে বিষ্ণুলোকের উদ্দেশে রওনা হল চম্পা। উদ্বেলিত আনন্দমুখর জনস্রোতের দিকে মিশে হাজার বছর আগে এমনই এক বিকালে বিষ্ণুলোকের উৎসবস্থলের দিকে এগিয়ে চলল সে। যত এগতে লাগল জনজোয়ার যেন তত বাড়তে লাগল। আর বাড়তে লাগল চম্পার মনের ভিতর উৎকণ্ঠা। বহ্নিকে জানিয়ে সে কি প্রাণ রক্ষা করতে পারবে মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মনের? সে কি শেষ পর্যন্ত পারবে বহ্নির সঙ্গে জলযানে চড়ে নদী পথ বেয়ে সাগরে পৌঁছে জম্বুদ্বীপের উদ্দেশে রওনা হতে? এ দুটো প্রশ্ন তীব্রভাবে চম্পার মনকে উত্তেজিত করে তুলল। যথাসম্ভব দ্রুত এগবার চেষ্টা করতে লাগল সে। যদিও জনস্রোতই তাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিল বিষ্ণুলোকের কাছে। সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে গেল চম্পা। এত মানুষ আগে সে কখনও দেখেনি! বিষ্ণুলোকের তোরণের বাইরে পরিখার ধারে যতদূর পর্যন্ত চম্পার চোখ যাচ্ছে শুধু মানুষের মাথা। আর তার মধ্যে জেগে আছে বিষ্ণুলোকের প্রবেশ তোরণের সামনে রংবেরঙের পতাকা দিয়ে সাজানে উঁচু মঞ্চটা। মহারাজ কিছুক্ষণের মধ্যেই মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে সে মঞ্চে উঠে জনতার অভিবাদন গ্রহণ করবেন।
কিন্তু এত মানুষের মধ্যে বহ্নিকে সে খুঁজে পাবে কীভাবে? যদিও বহ্নি বলেছে সে তাকে ঠিক খুঁজে নেবে। সেই জনসমুদ্রর মধ্যে প্রথমে এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বহ্নির খোঁজে চারপাশে তাকাতে লাগল চম্পা। সময় যত এগতে লাগল বহ্নির দেখা না পেয়ে আরও উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগল চম্পা। ক্রমেই বেড়ে চলেছে জনস্রোত। মহারাজের মন্দির ত্যাগ করে বাইরে বেরবারও সময় হয়ে এল। মহারাজকে কাছ থেকে দেখার জন্য একটা বড় জনপ্রবাহ এগতে লাগল মঞ্চের দিকে। চম্পা আর এক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে প্লাবন তাকে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে নিয়ে চলল সেই মঞ্চের দিকে। বহ্নি কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ই পৌঁছে গেছিল সেই স্থানে। কিন্তু এত জনজোয়ার যে সে স্থানে হবে বহ্নি তা কল্পনা করতে পারেনি। সেও খুঁজে বেড়াচ্ছিল চম্পাকে। জনজোয়ার যখন চম্পাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে তখন কিছুটা তফাত থেকে একসময় চম্পাকে দেখতে পেল বহ্নি। সে ডাক দিল চম্পার নাম ধরে। কিন্তু লোকজনের প্রচণ্ড কোলাহলে, গগন বিদারিত বাদ্যযন্ত্রর শব্দে বহ্নির ডাক শুনতে পেল না চম্পা। সন্ন্যাসীর কথা শুনতে শুনতে হঠাৎই এবার স্বাগতর মনে হতে লাগল এ দৃশ্য যেন তার দেখা! যেন এ দৃশ্যের সাক্ষী ছিল সে। রত্নসম্ভব বলে চললেন, ‘বহ্নির চোখের সামনে দিয়ে জনস্রোত চম্পাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলল মঞ্চর দিকে। বহ্নি
মঞ্চের কাছে উদভ্রান্তর মতো উপস্থিত হল চম্পা। কোথায় বহ্নি? সে এখন কীভাবে তাঁকে খুঁজে বের করবে? সে দেখতে পেল সোনার ছাতার নীচে ধরণীন্দ্রবর্মন এগিয়ে আসছেন মঞ্চের দিকে। তার মনে পড়ে গেল উগ্রদেবের প্রাসাদে চামেদের কথোপকথন।
এবার চেষ্টা করতে লাগল চম্পাকে অনুসরণ করার। কিন্তু তার সামনে অগণিত জনতার ভিড়। সে সেই ভিড় ঠেলে আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে লাগল চম্পাকে অনুসরণ করার। কিন্তু তার থেকেও দ্রুত গতিতে জনপ্লাবন চম্পাকে নিয়ে সামনের দিকে এগচ্ছে। ঠিক এই সময় শিঙা, ঢাক-ঢোল-দুন্দুভির শব্দ হঠাৎই আরও জোরে বাজতে শুরু করল। বিষ্ণুলোকের তোরণ উন্মুক্ত হয়ে গেল। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন তাঁর পাত্র-মিত্র-সভাসদদের নিয়ে মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। তুমুল হর্ষধ্বনি উঠল জনতার মধ্যে। রক্ষী সভাসদ পরিবেষ্টিত হয়ে তিনি এগলেন মঞ্চের দিকে। ঠিক সেই সময় মঞ্চের কাছে উদভ্রান্তর মতো উপস্থিত হল চম্পা। কোথায় বহ্নি? সে এখন কীভাবে তাঁকে খুঁজে বের করবে? চারপাশে তাকিয়ে যথাসম্ভব সে খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল বহ্নিকে। সে দেখতে পেল সোনার ছাতার নীচে ধরণীন্দ্রবর্মন এগিয়ে আসছেন মঞ্চের দিকে। মহারাজকে দেখামাত্রই তার মনে পড়ে গেল উগ্রদেবের প্রাসাদে চামেদের কথোপকথন। এখনই তো ঘটে যেতে পারে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা। কী করবে চম্পা? মঞ্চের কাছে পৌঁছে গেলেন মহারাজ…।’
সন্ন্যাসীর কথা শুনতে শুনতে চোখ বুজে এল স্বাগতর। সে যেন নিজেই দেখতে পেতে লাগল বহু শতাব্দী আগে এমনই এক বিকালের ঘটনা। তার চোখে ভেসে উঠল ধরণীন্দ্রবর্মন এগিয়ে চলেছেন মঞ্চের দিকে, স্বাগতর কানে বাজতে থাকল চারপাশে অজস্র জনতার কোলাহল। সন্ন্যাসীর কথাগুলো যেন তাকে পৌঁছে দিয়েছে কোন সুদূর অতীতে!
রত্নসম্ভব বলে চললেন— ‘মহারাজ মঞ্চের সামনে গিয়ে উপস্থিত হলেন। চম্পা শেষ একবার জনতার ভিড়ের মধ্যে তাঁর প্রেমিককে খোঁজার চেষ্টা করল, কিন্তু তাকে সে দেখতে পেল না। যদিও বহ্নি তখন মঞ্চর দিকেই এগবার চেষ্টা করছিল চম্পার সন্ধানে। চম্পা এরপর দেখতে পেল মহারাজ কাঠের সোপান শ্রেণি বেয়ে মঞ্চে উঠতে শুরু করেছেন। মুহূর্তর মধ্যে তার কর্তব্য স্থির করে নিল চম্পা। তার মনে হল রক্ষা করতে হবে তার প্রাণরক্ষাকারী অন্নদাতা মহারাজকে। এখনই তাঁকে জানাতে হবে ওই ভয়ঙ্কর চক্রান্তের খবর। চম্পা সামনের লোকজনকে ধাক্কা মেরে ছিটকে সরিয়ে দিয়ে ছুটতে লাগল মঞ্চের দিকে।
স্বাগতর মনের আয়নাতেও তখন ভেসে উঠেছে সেই দৃশ্য। সে পৌঁছে গেছে সুদূর অতীতে। সে এবার দেখতে পেল চম্পাকে। ভিড় ঠেলে সে ছুটছে মঞ্চের দিকে। স্বাগত যে বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সে চিৎকার করে উঠল ‘চম্পা’ বলে। সে চিৎকার শুধু তার অতীত দর্শনের মধ্যেই রইল না, সত্যি সত্যি তার মুখ থেকেও সে ডাক খানিকটা শব্দে বেরিয়ে এল! আর তা শুনে কথা থামিয়ে দিলেন সন্ন্যাসী। স্বাগতর উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আপনার কী হল স্বাগত?’
সন্ন্যাসীর ডাকে যেন হুঁশ ফিরল স্বাগতর। সুদূর অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এসে চোখ মেলল সে। সন্ন্যাসী চেয়ে আছেন তার দিকে। বিক্রম স্বাগতকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি অসুস্থ বোধ করছ? নাকি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলে?”
স্বাগত একটু অপ্রস্তুতভাবে জবাব দিল, ‘সন্ন্যাসীর কথাগুলো চোখ বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন সেই সুদূর অতীতে পৌঁছে গেছি। সবকিছু যেন আমার চোখের সামনে ঘটছে! আমি ঠিক আছি।’
রত্নসম্ভব তার কথা শুনে মৃদু হাসলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন— ‘চম্পা যখন মঞ্চের দিকে এগচ্ছিল তখন তাকে দেখতে পেয়ে খানিক তফাত থেকে বহ্নি তার নাম ধরে ডাক দিল। কিন্তু এবারও সে ডাক কানে গেল না চম্পার। সে পৌঁছে গেল মঞ্চের সামনে। এতক্ষণ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে মঞ্চে উঠে পড়েছেন মহারাজ, ধীর পায়ে তিনি এগচ্ছেন মঞ্চের কেন্দ্রস্থলের দিকে। চম্পাও আর দেরি করল না। রক্ষীদের চমকে দিয়ে তাদের ফাঁক গলে চম্পাও মঞ্চে উঠে পড়ল। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন মঞ্চের কেন্দ্রস্থলে এসে দাঁড়ালেন প্রজাদের অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য। অস্তাচলগামী সূর্যের আলো তখন ছড়িয়ে পড়েছে বিষ্ণুলোকে, মহারাজের স্বর্ণ কিরীটে। উদ্বেলিত জনতা হর্ষধ্বনি যেন তখন আকাশকে ছুঁতে চলেছে। মহারাজ তাঁর দক্ষিণহস্ত তুললেন প্রজাদের অভিবাদনের জন্য। ঠিক সেই সময় চম্পা মহারাজের সামনে এসে তাঁর দেহটাকে আড়াল করে দাঁড়াল। মহারাজ বিস্মিতভাবে তাকালেন নর্তকীর দিকে। তিনি তাকে তাঁর সামনে এভাবে হঠাৎ এসে দাঁড়াবার কারণ জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন। চারপাশ থেকে মহারাজের দেহরক্ষীরাও তাদের দিকে ছুটে আসছিল কিছু একটা ঘটতে চলেছে অনুমান করে। চম্পাও মহারাজকে বলতে যাচ্ছিল তার কথা, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একটা তির ছুটে এসে চম্পার পিঠে বিদ্ধ হয়ে তার হৃৎপিণ্ড কুঁড়ে দিল, তার আঘাতে ছিটকে পড়ল চম্পা! তোরণের মাথায় লুকিয়ে থাকা চাম তিরন্দাজ তক্ষক নির্দিষ্ট লক্ষ্যে তির ছুড়েছিল ঠিকই, কিন্তু চম্পা মহারাজকে আড়াল করে দাঁড়ানোয় সে তির মহারাজের হৃৎপিণ্ডকে আঘাত না করে এসে বিঁধল চম্পার হৃৎপিণ্ডে। মুহূর্ত সময়ের পার্থক্য হওয়াতে বেঁচে গেলেন মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন। তাঁকে এসে ঘিরে দাঁড়াল তাঁর দেহরক্ষীরা। বিহ্বলভাব কাটতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল মহারাজের। তিনি বুঝতে পারলেন এ তির আসলে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তাঁকে লক্ষ্য করেই। তিরবিদ্ধ এই নর্তকীই তাঁর জীবন রক্ষা করেছে। তিনি আর অন্য সকলে গিয়ে দাঁড়ালেন চম্পার সামনে। মহারাজ জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে বল? তির ছুড়ল কে?’
চম্পা দেখতে পেল মহারাজ সঙ্গে তাঁর অন্য সভাসদদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন উগ্রদেবও। মহারাজের সঙ্গে পিছন পিছন তাঁর অন্য সভাসদরাও মঞ্চে উঠেছিলেন। উগ্রদেবকে দেখতে পেয়ে মৃত্যুপথযাত্রী চম্পা তার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই উগ্রদেবই আপনাকে আজ হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। ও চামেদের তার প্রাসাদে এনে রেখেছে। ওর নির্দেশেই তক্ষক নামের এক চাম তির ছুঁড়েছিল আপনাকে হত্যা করার জন্য।’
যন্ত্রণাকাতর চম্পার চোখ এরপর বুজে এল। কথা জড়িয়ে এল তার। উগ্রদেব এবার মঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই তাকে ধরে ফেলল মহারাজের রক্ষীরা। একদল সৈন্য মহারাজের নির্দেশে ছুটল উগ্রদেবের প্রাসাদের দিকে। আর একদল ছুটল যেদিক থেকে তিরটা এসেছে সেই তোরণের দিকে। উপস্থিত জনতাও সব দেখে খানিক সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। এবার আতঙ্ক সঞ্চারিত হল তাদের মধ্যেও। যে যেদিকে পারল তারাও পালাতে শুরু করল। আনন্দধ্বনি পরিবর্তিত হল আতঙ্কিত চিৎকারে। চম্পা যখন মঞ্চে উঠে মহারাজকে আগলে দাঁড়িয়ে ছিল তখন বহ্নিও পৌঁছে গেছিল মঞ্চের কাছাকাছি। তিরের আঘাতে চম্পার লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যে বিহ্বল-কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল সে। কিছু সময়ের জন্য যেন তার বাহ্যিক চেতনাও লুপ্ত হয়ে গেছিল। তার মনে হচ্ছিল সে যে দৃশ্য দেখল তা কি সত্যি? নাকি কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে সে। এরপর হুঁশ ফিরল তার। সে ছুটে মঞ্চের ওপর উঠে চম্পার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। চম্পা তখন চোখ বন্ধ করে বলে চলেছে, ‘বহ্নি? বহ্নি তুমি কোথায়? তুমি আমাকে জম্বুদ্বীপে নিয়ে যাবে না?’
বহ্নি চম্পার তির বিদ্ধ রক্তাক্ত দেহের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘এই তো আমি, চোখ মেল চম্পা। এই তো আমি এসেছি তোমায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। চোখ খোল চম্পা।’
তার কথা শুনে চোখ মেলল চম্পা। কোনওক্রমে হাতটা সে ওঠাল বহ্নিকে স্পর্শ করার জন্য। বহ্নি তার হাত স্পর্শ করল ঠিকই কিন্তু এরপরই চম্পার হাতটা খসে পড়ল। সে শুধু বিড়বিড় করে বলল, ‘আমার জম্বুদ্বীপে যাওয়া হল না।’ আর এরপরই চম্পার দেহটা মোচড় দিয়ে উঠে চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল! মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন তার সঙ্গী দিবাকর, রুদ্ররূপ, মহামঙ্গল, বিরুচরা প্রত্যক্ষ করলেন এই করুণ দৃশ্য! এরপরই অন্ধকার নেমে এল বিষ্ণুলোকে। চম্পার মৃতদেহ মঞ্চ থেকে নামিয়ে সে দেহ কোলে নিয়ে বসল বহ্নি। চোখের জল বাঁধ মানছে না তার।’—এ পর্যন্ত বলে এরপর থেমে গেলেন সন্ন্যাসী। হয়তো ভাবতে লাগলেন পরের কথা প্রকাশ করবেন কি না। তাকে থেমে যেতে দেখে বিক্রম বলল, “তারপর? তারপর কী ঘটল?”
রত্নসম্ভব প্রশ্ন শুনে বললেন, ‘হ্যাঁ, তারপরের ঘটনার সঙ্গেই সরাসরি জড়িয়ে গেল এই প্রাচীন মন্দির। এবার সেই আসল ঘটনাটাই আপনাদের শোনাই।’
বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আবার বলতে শুরু করলেন, ‘রক্ষীরা ধরে ফেলল উগ্রদেবকে। পালাতে পারল না ঘাতক তক্ষক বা উগ্রদেবের প্রাসাদে তার সম্রাট হবার জন্য প্রতীক্ষারত মদ্যপ চামেরাও। যদি কোনওক্রমে সত্যি কথা বলে নিজেদের জীবনরক্ষা করা যায় সে জন্য সবকথা প্রকাশ করে ফেলল তারা। এমনকী প্রকাশ পেল নর্তকী ভ্রামরীর নামও। সে-ই নাকি উগ্রদেবকে প্ররোচিত করেছিল মহারাজকে হত্যা করার জন্য। উগ্রদেবকে কারাগারে নিক্ষেপের নির্দেশ দিয়ে সভাস্থল থেকে প্রাসাদে ফিরে এসেছিলেন মহারাজ। চাঁদ তখনও মধ্য গগনে পৌঁছয়নি, রাত নামার প্রথম প্রহরের মধ্যেই সব সংবাদ পৌঁছে গেল মহারাজের কাছে। মহারাজ প্রথমেই নির্দেশ দিলেন, ভ্রামরী আর তার মাতাকে রাতের মধ্যেই শিরশ্ছেদ করে তাদের দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হোক। আর পরদিন সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে খড়্গঙ্গাঘাতে হত্যা করা হোক উগ্রদেব ও চামেদের। তাদের দেহ প্রকাশ্যে টাঙানো থাকবে বিষ্ণুলোকের প্রধান তোরণের সামনে। একদিন পর তাদের দেহও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে। উগ্রদেবের কোনও পারলৌকিক কার্য হবে না, পিণ্ডদানও হবে না। যাতে বিষ্ণুলোকে প্রবেশের অধিকার থেকে তার আত্মা বঞ্চিত হয়। এরপর তিনি ব্রাহ্মণ দিবাকর ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে ডেকে বললেন পরদিন যেন যথাযথ মর্যাদা সহকারে বাস্তুকার বহ্নির সঙ্গে আলোচনা করে নর্তকী চম্পার দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়। তবে পরিখাতে তার পিণ্ডদান সম্ভব নয়। কারণ তিরে বিষ মেশানো ছিল। তার হৃৎপিণ্ড পরিখার জলে নিক্ষেপ করলে তা কুমিরদেরও মৃত্যুর কারণ ঘটাতে পারে। মহারাজের নির্দেশমতোই সে সব কার্য সম্পাদিত হল। ভ্রামরী আর তার মাতাকে ধরে এনে হত্যা করে তাদের দেহ অগ্নিকুণ্ডে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হল। শেষ রাতে জল্লাদ যখন উগ্রদেব আর চামেদের বধ্যভূমিতে নিয়ে গেল তখন উগ্রদেবের ওপর খড়া নেমে আসার আগে সে চিৎকার করে বলল, ‘যদি আমি কোনও দিন যে কোনও শরীর ধারণ করে অথবা ছায়া বা কায়া হয়েও এই পৃথিবীতে ফিরে আসি, তবে ওই নর্তকী চম্পার আত্মা যেখানেই আত্মগোপন করে থাকুক না কেন প্রথমেই আমি তাকে খুঁজে বের করে নির্মম শাস্তি দেব। তারপর আমি দখল নেব বিষ্ণুলোকের।’ যদিও তাঁর এই বার্তা মহারাজের কাছে সে সময় পৌঁছল না। উগ্রদেব আর চামেদের হত্যা করে পরদিন ভোরে তাদের দেহ টাঙিয়ে দেওয়া হল বিষ্ণুলোকের তোরণের সামনে, জনতা যাতে পাপিষ্ঠদের পরিণাম প্রত্যক্ষ করতে পারে তার জন্য। ব্রাহ্মণ দিবাকর ও সন্ন্যাসী মহামঙ্গল ও তাঁদের দায়িত্ব পালন করলেন। বহ্নি তার প্রেয়সীর দাহকার্যের জন্য এই মন্দির প্রাঙ্গণ নির্বাচন করল, এই মন্দিরেই তো গড়ে উঠেছিল তাদের ভালোবাসা। তবে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করা আর হল না চম্পার। আর বহ্নি চম্পাকে যে উপহারটা দেবে বলেছিল সেটাও দেওয়া হল না।’
এটি সেই চম্পারই মূর্তি। যার পিছনে খোদিত ছিল এ মন্দিরের নকশা। বহ্নি ঠিক করল সে জম্বুদ্বীপে ফিরে যাবে। তবে যাওয়ার আগে সে এ মন্দিরে রেখে যাবে চম্পার মূর্তিটা। যাতে শত-সহস্র বছর পরও এ মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে চম্পা। আর সেই কাজই করেছিল সে।’
এরপর আবারও কয়েক মুহূর্তর জন্য থামলেন সন্ন্যাসী। সূর্য এগতে শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের আড়ালে প্রবেশ করার জন্য। নিস্তব্ধ মন্দির প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়েছে বেলাশেষের আলো। সবাই চেয়ে আছে সন্ন্যাসীর দিকে তিনি কী বলেন তা জানার জন্য। রত্নসম্ভব শুরু করলেন কাহিনির অন্তিম অংশ—
‘সারাদিন বিষ্ণুলোকের তোরণের বাইরে টাঙানো রইল উগ্রদেবের মৃতদেহ। বহু মানুষ তা প্রত্যক্ষ করল। কেউ কেউ ঘৃণায় প্রস্তরখণ্ড বা নিষ্ঠীবনও নিক্ষেপ করল মৃতদেহের উপর। একসময় সন্ধ্যা নামল বিষ্ণুলোকে। মৃতদেহগুলো নামিয়ে সেগুলো অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের প্রস্তুতি শুরু হল। সে সন্ধ্যায় ধরণীন্দ্রবর্মন তাঁর প্রাসাদের মন্ত্রণাকক্ষে সেনাপতি রুদ্ররূপের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ যে ঘটনা ঘটেছে, তাতে নাগরিকদের মনে আবারও চামেরা এ দেশ আক্রমণ করতে পারে সেই আশঙ্কা ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। যে আলোচনার সময় ব্রাহ্মণ দিবাকর, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মহামঙ্গলও উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় যে কক্ষে প্রবেশ করলেন মহারাজের আর এক পার্শ্বচর বিরুচ এবং তার কন্যা। যার সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল উগ্রদেবের। বিরুচ কন্যার স্ফীত উদর। সে সন্তানসম্ভবা। তার গর্ভে উগ্রদেবের সন্তান। আসন্ন সন্তানপ্রসবা বলে সে কিছুদিন ধরে তার পিতার প্রাসাদেই ছিল। শ্রেষ্ঠী বিরুচ মহারাজকে বললেন, ‘আমার কন্যা আপনার কাছে একটি আবেদন জানাতে এসেছে।’
‘কী আবেদন?” জানতে চাইলেন মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন।
বিরুচ কন্যা বলল, ‘মহারাজ। আমার স্বামী তার পাপের শাস্তি পেয়েছে। তবে তার আত্মাকে বিষ্ণুলোকে প্রবেশের থেকে বঞ্চিত করবেন না, দয়া করে তাঁর পারলৌকিক কার্য সম্পাদনের অনুমতি দিন। তাঁর পিণ্ড-হৃৎপিণ্ড পরিখাতে নিক্ষেপের অনুমতি দিন।’
মহারাজ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না, তা সম্ভব নয়, ওই পাপিষ্ঠর আত্মাকে আমি কোনওভাবেই বিষ্ণুলোকে আশ্রয়দানের ব্যবস্থা করে দিতে পারি না।’
মহারাজের জবাব শুনে বিরুচ বললেন, ‘মহারাজ আপনার নিশ্চয়ই স্মরণে আছে যে, একবার মৃগয়াকালে আপনি নদীতে পতিত হয়েছিলেন। এক মহাকায় কুমির আপনাকে আক্রমণ করে। আমি আমার জীবন বিপন্ন করে আপনার জীবন রক্ষা করি। আপনি সে সময় সেই কাজের জন্য আমাকে অর্ধেক রাজত্ব পর্যন্ত উপহার দিতে চেয়েছিলেন। আমি তা গ্রহণে রাজি হইনি। সে ঘটনা স্মরণ করে দয়া করে আজ আমার সন্তানসম্ভবা কন্যার আবেদনে সাড়া দিন।’
বিশ্বস্ত পার্শ্বচর, একদা তাঁর জীবনরক্ষাকারী বিরুচের এ কথা শুনেও মহারাজের মন গলল না। তিনি বললেন, ‘প্রয়োজনে আমি আজও আপনার হাতে আমার অর্ধেক রাজত্ব তুলে দিতে পারি। কিন্তু আপনার কন্যার অনুরোধ আমি রক্ষা করতে পারব না।’
বিরুচ কন্যা ক্রন্দনরত স্বরে বলল, ‘মহারাজ তবে আমার, মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিন। আমার আর আমার গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যুর ব্যবস্থা করুন আপনি।’
মহারাজ বললেন, ‘এ আদেশ আমি দিতে পারি না। কারণ, আমি জানি তুমি ও তোমার পিতা নির্দোষ। তাছাড়া গর্ভস্থসন্তানকে হত্যা করা মহাপাপ।’
বিরুচ কন্যা এবার বলে উঠল, ‘তবে আত্মহননের পথই আমি বেছে নেব। আর তার জন্য দায়ী থাকবেন আপনি।’ আর এ কথা বলার পর বিরুচ কন্যা যে কথা বলল তাতে চমকে উঠলেন মহারাজ ও তাঁর পার্শ্বচরেরা। সে বলল, “আমার স্বামী আপনাকে হত্যার চক্রান্ত করছে তা না জানলেও ওই ভ্রামরী নামের নর্তকী আমার স্বামীর প্রাসাদে গিয়ে তাঁকে কী কথা জানিয়ে উত্তেজিত করেছিল, সে কথা আমি আমার স্বামীর মুখ থেকে শুনেছি। ওই নর্তকী হল সেই মাহুতের কন্যা যে মাহুত পদদলিত করেছিল আমার স্বামীর পিতা এ রাজ্যের সিংহাসনের দাবিদার হরিদেবকে। আজও অনেকে হরিদেবকে, ‘রাজা হরিদেব’ নামেই সম্বোধন করে। হাতি দিয়ে রাজা হরিদেবকে হত্যা করার পরমুহূর্তেই ওই মাহুতকে হত্যা করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঘর ছেড়ে বেরবার আগে ওই মাহুত তার স্ত্রীকে জানিয়ে গেছিল কার নির্দেশে সে কী কাজ সম্পাদন করতে যাচ্ছে। তাকে প্রভূত অর্থের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। তবে সে জানত না যে, ওই কাজ করার পর তাকেও হত্যা করা হবে প্রমাণ লোপাটের জন্য। যাঁর নির্দেশে সে কাজ করা হয়েছিল তার নাম মাহুতের বিধবা পত্নী আর কন্যা ভ্রামরী জানিয়েছিল আমার স্বামীকে। সে নাম আমি এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র আমার পিতাকে বলেছি। কিন্তু আত্মহননের আগে আমি সে কথা জানিয়ে যাব সবাইকে। তাতে এ রাজ্যের হিতসাধন হবে না। এখনও এ রাজ্যের বহু মানুষ প্রয়াত হরিদেবকে শ্রদ্ধা করেন।’
বিরুচও তাঁর কন্যার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আমার কন্যা যদি আত্মঘাতী হয়, তবে আমিও আত্মহননের পথ বেছে নেব এবং তার আগে হরিদেবের মৃত্যুর রহস্য প্রকাশ করে যাব।’
নিস্তব্ধ হয়ে গেল কক্ষ। মহারাজ বুঝে উঠতে পারলেন না, তিনি এবার কী করবেন? তবে তাঁর সঙ্কটমোচনের জন্য এগিয়ে এলেন বুদ্ধিমান ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ দিবাকর। তিনি বিরুচ আর তাঁর কন্যাকে বললেন, ‘আপনারা কিছু সময়ের জন্য বাইরে গিয়ে প্রতীক্ষা করুন। মহারাজ তাঁর সিদ্ধান্ত কিছুক্ষণের মধ্যে জানিয়ে দেবেন।’
তাঁরা কক্ষ ত্যাগ করার পর মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার পক্ষে কীভাবে আমাকে হত্যার চক্রান্তকারীকে বিষ্ণুলোকে আশ্রয়দানের ব্যবস্থা করা সম্ভব?”
ব্রাহ্মণ দিবাকর বললেন, ‘আমার মাথায় একটা ভাবনা এসেছে যাতে দু’কূল রক্ষা করা সম্ভব। আপাতত উগ্রদেবের দেহ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা বা তার পিণ্ড-হৃৎপিণ্ড পরিখাতে নিক্ষেপ করে তার আত্মাকে বিষ্ণুলোকে প্রবেশ করানো—এ দুটোর কোনওটারই প্রয়োজন নেই। উগ্রদেবের হৃৎপিণ্ড তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনও গোপন স্থানে সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা করা হোক। কিন্তু যার সন্ধান বিরুচ বা তার কন্যা বা পৃথিবীর অন্য কেউ জানবে না। সবই তো ভগবান বিষ্ণুর ইচ্ছা। যদি কোনওদিন কোনও যুগে দেবতা তার পাপ ক্ষমা করে দেন, উগ্রদেবের কোনও উত্তরপুরুষ সুদূর ভবিষ্যতে ওই গুপ্তস্থানে গিয়ে তার পারলৌকিক কার্য সম্পাদন করে উগ্রদেবের দেহাবশেষ ওই হৃৎপিণ্ড পরিখার জলে নিবেদন করে তার আত্মার মুক্তি ঘটাতে পারে। যদিও দূর ভবিষ্যতে সেই দেহাবশেষ কারও পক্ষে উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কম।’
কিছুক্ষণ আলোচনার পর পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করে মহারাজ সম্মত হয়ে গেলেন এ প্রস্তাবে। কিন্তু কোথায় লুকানো থাকবে উগ্রদেবের হৃৎপিণ্ড? মহারাজের হঠাৎ মনে পড়ে গেল এ মন্দিরের কথা। এখানে তিনি বহ্নিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এক গুপ্তকক্ষ নির্মাণের। মহারাজের ইচ্ছা ছিল এ মন্দিরে তার কিছু রত্ন লুকিয়ে রাখার। ভবিষ্যতে যদি কোনও সময় তাঁর রাজ্য আবার আক্রান্ত হয়, তবে যাতে ওইসব মহামূল্যবান রত্ন সামগ্রী রক্ষা পায় সেজন্য।
মহারাজ এরপর ডেকে পাঠালেন বিরুচ আর তাঁর কন্যাকে। ব্রাহ্মণ দিবাকর তাঁদের জানালেন তাঁদের পরিকল্পনার কথা। মহারাজ এ মুহূর্তে উগ্রদেবের আত্মাকে বিষ্ণুলোকে প্রবেশের সুযোগ না দিলেও ভবিষ্যতে কোনও দিন উগ্রদেবের আত্মা প্রবেশ করবে বিষ্ণুলোকে। ব্রাহ্মণের বোঝানোতে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে ফিরে গেলেন বিরুচ আর তাঁর কন্যা।
মহারাজ এরপর তাঁর সেনাপতি রুদ্ররূপ, ব্রাহ্মণ দিবাকর ও সন্ন্যাসী মহামঙ্গলের সাহায্যে তাঁদের পরিকল্পনা মতো কাজ শুরু করলেন। উগ্রদেবের মৃতদেহ নামাবার পর ব্রাহ্মণ দিবাকর পিণ্ডদানের জন্য তার দেহ থেকে হৃৎপিণ্ড বের করে নিয়ে তা কলসে রাখলেন। সে কলস এরপর নিয়ে যাওয়া হল বিষ্ণুমন্দিরের ত্রিতলে এক কক্ষে। যে কক্ষ থেকে একটা সোপানশ্রেণি নেমে মিলিত হয়েছিল এ মন্দিরের পশ্চাৎদ্বারের সঙ্গে। মহারাজ ডেকে পাঠালেন ভাস্কর স্থপতি বহ্নিকে। তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে পাঠানো হল বিষ্ণুলোকে। মধ্যরাতে সঙ্গোপনে বিষ্ণুলোকের পশ্চাদ্ভাগের ওই কক্ষ থেকে ওই কলস নিয়ে নীচে নেমে সেনাপতি রুদ্ররূপ, ব্রাহ্মণ দিবাকর আর মহারাজের কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক রওনা হলেন এ মন্দিরের গুপ্তস্থানে লুকিয়ে রাখার জন্য। তবে ওই গুপ্তকক্ষে প্রবেশের অনুমতি মহারাজ তাঁর সেনাপতি রুদ্ররূপ বা ব্রাহ্মণ দিবাকরকেও দেননি। বহ্নি একাই প্রবেশ করেছিল সেই গুপ্ত কক্ষে।’
সন্ন্যাসীর এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্বাগতর মনে ভেসে উঠল তার দেখা স্বপ্নটা। ব্রাহ্মণ কলস তুলে দিলেন তাঁর হাতে। তারপর বহন করে রওনা হলেন সেই গুপ্তকক্ষর দিকে! সে দৃশ্য নিছক স্বপ্ন! নাকি স্বাগত সত্যিই সেই সুদূর অতীতে সে কাজ করেছিল? সাক্ষী ছিল সে রাতের? এমনই যেন মনে হতে লাগল স্বাগতর।
সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বললেন, ‘এ মন্দিরের ওই গুপ্তকক্ষে কলস রেখে ফিরে এল বহ্নি। তারা মন্দির ত্যাগ করার পর ওই পশ্চাৎত্তোরণ পাথর দিয়ে গেঁথে দেওয়া হল। এ মন্দিরে আর কোনও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হল না। পরিত্যক্ত আর জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল এই মন্দির। পরদিনই জম্বুদ্বীপে ফেরার জন্য এই মন্দির নগরী ছেড়ে তার প্রেয়সীকে, তার ভালোবাসাকে, এই মন্দিরে, মন্দির নগরীতে রেখে জম্বুদ্বীপের উদ্দেশে রওনা হল বহ্নি। মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন বা মহামঙ্গল যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন বহ্নি আর কোনওদিন এ দেশে ফিরে আসেনি।’— কথা শেষ করলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী।
বিক্রম বলে উঠল, “তাহলে ওই গুপ্তকক্ষে ওই কলসে শুধু উগ্রদেবের দেহাবশেষই ছিল। অন্য কোনও গুপ্তধন ছিল না? স্বাগত যে ওখানে আরও কলস দেখেছিল?”
সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব বলল, ‘ওই কলসগুলো সম্ভবত মহারাজের নির্দেশে বহ্নি আগেই সেখানে রেখেছিল ওসবের মধ্যে মহারাজ তাঁর ধনসম্পদ রাখবেন বলে। মহামঙ্গলের লেখা অনুসারে এ মন্দিরে ধন-রত্ন জাতীয় কোনও গুপ্তধন নেই।’
প্রীতম জানতে চাইল, ‘হেরুম কি তবে সত্যি রাজ বংশধর? উগ্রদেবের সিংহাসন লাভ তো হয়নি। তবে বুল তাকে রাজকুমার বলে সম্বোধন করত কেন?’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘সম্ভবত সে উগ্রদেবের কোনও উত্তরসূরি। মহামঙ্গলের পুঁথি থেকেই জেনেছি বিরুচ কন্যা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিল। এ দেশে যাঁরা সিংহাসনে আরোহণ করেছেন তাঁদের বংশধরদের এখানে ‘রাজকুমার’ বলে সম্বোধন করা হয়। উগ্রদেব সিংহাসনে আরোহণ করেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর পিতা হরিদেবকে তাঁর সমর্থকরা রাজা হরিদেব বলেই সম্বোধন করত। তাই হরিদেব, উগ্রদেব রাজা না হলেও তাদের উত্তর পুরুষদেরও রাজকুমার বলে সম্বোধন করা হয়।’
বিক্রম আবার প্রশ্ন করল, ‘ওই কলসে হেরুম রক্ত মিশিয়েছিল কেন?’
সন্ন্যাসী জবাব দিলেন, ‘উগ্রদেবের হৃৎপিণ্ড নিশ্চয়ই এত দিনে ধূলিকণায় পরিণত হয়েছে। সেই ধূলিকণা মেশানো পিণ্ড আর কুমির ভক্ষণ করবে না। তাই তাতে রক্ত মেশানোর প্রয়োজন ছিল। যাতে কুমির পিণ্ড ভক্ষণ করে।”
প্রফেসর এতক্ষণ নিশ্চুপ ছিলেন। এবার তিনি সন্ন্যাসীর কাছে জানতে চাইলেন, ‘হেরুম তাহলে নিছকই এক প্রাচীন কাহিনির ওপর নির্ভর করে তার পূর্বপুরুষকে জাগিয়ে তুলে ক্ষমতা, ধনসম্পদ লাভ করতে চেয়েছিল? এভাবে কি কোনও মৃত মানুষকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব?’
একটু চুপ করে থেকে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘এটা বিশ্বাসের প্রশ্ন। আপনারা শহরের মানুষরা সব ঘটনা বিশ্বাস না করলেও আমি করি। হেরুমের মতো আমিও বিশ্বাস করি উগ্রদেবের জেগে ওঠা সম্ভব। বিশ্বাস করি, প্রাচীন আত্মারা আজও বিষ্ণুলোকে প্রবেশের জন্য চেষ্টা করে, প্রতীক্ষা করে। তার প্রমাণও আমি পেয়েছি। কাল রাতে যখন হেরুম তার পূর্বপুরুষের পিণ্ডদান করার জন্য বিষ্ণুলোকের দিকে গেছিল। তখন উগ্রদেবের জেগে ওঠার প্রত্যাশায় বনের মধ্যে কারা যেন জেগে উঠেছিল! সেই কায়াহীনরা বাতাসের ঝড় তুলে এগচ্ছিল বিষ্ণুলোকের দিকে, উগ্রদেবের জেগে ওঠার প্রত্যাশায়, তার নেতৃত্বে বিষ্ণুলোকের দখল নেওয়ার জন্য। আপনিও হয়তো বা গত রাতে তা প্রত্যক্ষ করে থাকতে পারেন।’
প্রফেসর একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘হ্যাঁ, তেমনই যেন কিছু একটা ঘটেছিল বলে মনে হচ্ছে!’
স্বাগত বিড়বিড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, সে ঝড় আমিও দেখেছি। কারা যেন পরিখার দিকে ছুটে আসছিল জঙ্গলের ভিতর থেকে। হেরুমকে কুমির টেনে নিয়ে যাবার পর সে ঝড় থেমে যায়।’
আর এরপরই প্রীতম হঠাৎ বলল, ‘আরে দেখ, বাঁদরিটা এখনও মরেনি, ও নড়ছে। সন্ন্যাসী দেখুন ওকে বাঁচাতে পারেন কি না।’
প্রীতমের কথা শুনে স্বাগতরা দেখল বাঁদরিটা সত্যি তখনও মরেনি। সে নড়ছে! যেন উঠে বসার চেষ্টা করছে! সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই নিজেদের জায়গা ছেড়ে এগল বাঁদরিটার দিকে। তাকে ঘিরে দাঁড়াল সবাই। তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই স্বাগত যেন একটা মৃদুগন্ধ অনুভব করল। না বাঁদরির শরীরের গন্ধ নয়। এ গন্ধ তার চেনা। সেই খামের যুবতীর শরীরে লেগে থাকতে এই গন্ধ! স্বাগত প্রথমে মৃদু চমকে উঠে চারপাশে তাকাল। না চারপাশে কোথাও নেই সেই যুবতী। স্বাগত এবার তাকাল বাঁদরিটার দিকে। বাঁদরিটা এবার চোখ মেলল। তার চোখের দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে স্থির হল স্বাগতর দিকে। বাঁদরিটা যেন উঠে বসার চেষ্টা করেও পারল না। সে এবার তার একটা হাত ধীরে ধীরে উঠিয়ে বাড়িয়ে দিল স্বাগতর দিকেই। যেন সে স্বাগতকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। তার হাতের পাতাটা ছুঁতেই এক আশ্চর্য অনুভূতি সঞ্চারিত হল স্বাগতর মনে, তার শরীরে। এ স্পর্শ যেন তার চেনা! কোনও সুদূর অতীতে যেন যে এমনভাবেই স্পর্শ করেছিল কারও হাত, কোনও মানবীর হাত! নিজের অজান্তেই স্বাগতর মুখ থেকে একটা মৃদু শব্দ বেরিয়ে এল -“চম্পা!”
আর এরপরই স্বাগতর হাত থেকে বাঁদরির হাতটা খসে পড়ল। যেমন বহু শতাব্দী আগে বহ্নির হাত থেকে খসে পড়েছিল চম্পার হাত। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল তার চোখের পাতা! তার চোখের কোণ দিয়ে ঠিক মানুষেরই মতো বেরিয়ে এল কয়েক ফোঁটা জল। আবার স্থির হয়ে গেল তার দেহ। সন্ন্যাসী রত্নসম্ভব ঝুঁকে পড়ে বাঁদরিটার বুক স্পর্শ করে বলল, ‘এবার সত্যিই সব শেষ। মারা গেল ও।’ স্বাগত স্থির দৃষ্টিতে চেয়েছিল শেষ বিকালের মায়াময় আলো মাখা বাঁদরিটার মুখের দিকে। বাঁদরি নয়, ও যেন কোনও মানবীর মুখ! ঠিক এই সময় মন্দিরের বাইরের চত্বরের ওদিক থেকে বেশ কয়েকবার গাড়ির হর্নের শব্দ ভেসে এল। প্রফেসর বললেন, ‘এবার আমাদের ফিরতে হবে। গাড়ি এসে গেছে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
প্রফেসর রামমূর্তির কথায় স্বাগতর সংবিৎ ফিরল।
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘হ্যাঁ, ফিরতে হবে এবার। তবে ওর দেহটাও তুলে নিয়ে যাই।’—এই বলে তিনি ধীরে ধীরে বাঁদরির দেহটা কোলে তুলে নিলেন স্বাগতর সাহায্যে।
প্রফেসর রামমূর্তি বললেন, ‘এ দেহটা নিয়ে কী করবেন সন্ন্যাসী?’
রত্নসম্ভব জবাব দিলেন, ‘জানেন তো এখানকার অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে, মৃত মানুষরা বাঁদরের রূপ ধারণ করে থাকে। এমনও হতে পারে এটা কোনও প্রাচীন মানবীর দেহ। এ দেহ আমি পরিখার জলে বিসর্জন দেব। কুমিরগুলো হয়তো এখনও সেখানেই আছে। আমার এ কাজে হয়তো বা বিষ্ণুলোকে প্রবেশের সুযোগ পাবে কোনও প্রাচীন মানবীর আত্মা।’
এ কথা বলার পর মুহূর্তর জন্য সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হল স্বাগতর। বিষণ্ণ এক হাসি ফুটে উঠল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রত্নসম্ভবের ঠোঁটের কোণে। গাড়ির হর্নের শব্দ আবার শোনা যাচ্ছে। নিশ্চুপভাবে এরপর সবাই এগল মন্দির ত্যাগ করার জন্য। তোরণের বাইরে এসে সন্ন্যাসী বললেন, ‘আপনারা যান, তারপর আমি যাব।’ সকলে তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে নিজেদের মালপত্র তুলে নিয়ে এগল গাড়ির দিকে। গাড়িতে উঠে বসার পর স্বাগত শেষ একবার তাকাল সেই প্রাচীন মন্দিরের দিকে। সূর্য তখন অদৃশ্য হতে চলেছে বিষ্ণুলোকের আড়ালে। স্বাগত দেখল, বিদায়ী সূর্যের শেষ আলোক রশ্মি এসে পড়েছে তোরণের মাথার ওপর সেই প্রাচীন মুখমণ্ডলে। সে যেন চেয়ে আছেন স্বাগতদের দিকে। আর তোরণের নীচে বাঁদরির মৃতদেহটা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রত্নসম্ভব।
গাড়ি চলতে শুরু করল এরপর। স্বাগতরা যখন প্রাচীন মন্দির নগরীর তোরণ অতিক্রম করল ঠিক তখনই সে নগরীর বুকে, বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করল। আর সেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল, স্বাগতর পিছনে পড়ে রইল সেই প্রাচীন মন্দির, মহারাজ ধরণীন্দ্রবর্মন, উগ্রদেবের কাহিনি, প্রাচীন ইতিহাসের বুকে ঘুমিয়ে থাকা জম্বুদ্বীপ থেকে আসা ভাস্কর বহ্নি আর নর্তকী চম্পার প্রেম কাহিনি।
***
