বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৬
পর্ব ০৬
অনেক নীচে অলিন্দের ঠিক নীচের চত্বরে কয়েকজন ট্যুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওপর থেকে পিঁপড়ের মতো দেখতে লাগছে তাদের। ঝুঁকে পড়ে সেদিকে তাকিয়ে প্রীতম বলল, ‘অলিন্দ ঘেরা এই চত্বরগুলোতেই সে সময় সম্ভবত নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠান হতো। খেয়াল করেছি চতুর পাথরের মেঝেতে বেশ কয়েক জায়গাতে নানা ধরনের অলঙ্করণ আর জ্যামিতিক মার্ক কাটা আছে।’
স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও খেয়াল করেছি ব্যাপারটা। নাতাশা বলল, ‘এই মন্দিরের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।’
‘কী অনুভূতি?’, জানতে চাইল সুরভী।
নাতাশা জবাব দিল, ‘আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমি এ মন্দিরে আগে এসেছি! কিছু কিছু জায়গা যেন চেনা লাগছে!’
প্রীতম হেসে বলল, ‘এমন হতে পারে যে পূর্বজন্মে তুমি এ মন্দিরের কোনও অপ্সরা ছিলে। তাই মন্দিরটা তোমার চেনা মনে হচ্ছে!’
কথাটা শুনে নাতাশার অপর দু’জন সঙ্গী হেসে ফেলল। তা দেখে গম্ভীর হয়ে গেল নাতাশা। স্বাগতও হেসে ফেলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘অনেক সময় এমন অনুভূতি হয়। আমারও অজন্তার গুহাচিত্র দেখতে গিয়ে এমন অনুভূতি একবার হয়েছিল। এর কারণ হল বিখ্যাত দ্রষ্টব্য স্থানগুলোর বিভিন্ন ছবি আমরা সে স্থানে যাওয়ার আগে অনেক সময় দেখে থাকি। আর সেগুলো আমাদের মনের ভিতর রয়ে যায়। আর তার ফলে পরবর্তীতে সে স্থানে গেলে মনে হয় আগে কোনওদিন যেন সেখানে এসেছি।’
স্বাগতর ব্যাখ্যা শুনে নাতাশার মুখে হাসি ফুটে উঠল। প্রফেসর রামমূর্তি কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার তাদের কাছে ফিরে এলেন। আবার শুরু হল তাদের মন্দির পরিভ্রমণ। কত অজানা চত্বর, অলিন্দ, কক্ষে ঘুরে বেড়াতে লাগল তারা রামমূর্তি তাদের বুঝিয়ে দিতে লাগলেন স্থাপত্য, মূর্তি, অলঙ্করণের গঠনশৈলী। স্থাপত্যর কোনও অংশ একটি প্রস্তর খণ্ড দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, মন্দির শীর্ষে বিশালাকৃতির মুখমণ্ডলগুলো কীভাবে পাথরের খণ্ড জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল সে সব কথা। স্বাগতরা মন্দির দেখতে দেখতে শুনতে লাগল তাঁর কথা। তিনি যেমন বলেছিলেন তেমনই বেশ কয়েক জায়গাতে অলিন্দ বা কক্ষের মুখ পাথর দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। এ ব্যাপারটাও চোখে পড়ল স্বাগতদের। বেশ কিছু মন্দির প্রাঙ্গণ, চত্বর এমন নির্জন সেখানে দাঁড়িয়ে স্বাগতদের মনে হতে লাগল হাজার বছর ধরে সময় যেন সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। মাথার ওপরের বিষ্ণুর মুখমণ্ডলগুলো ওপর থেকে যেন পাহারা দিচ্ছে সেই প্রাঙ্গণগুলোকে। তারাই একমাত্র জানে এসব প্রাঙ্গণের কাহিনি। একসময় হয়তো এই প্রাঙ্গণগুলোতে শোনা যেত গম্ভীর কণ্ঠে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ অথবা মুখরিত হয়ে থাকত চয়নিকা কিংবা নর্তকী-দেবদাসীদের নিক্কণ ধ্বনিতে। প্রাঙ্গণ সংলগ্ন কক্ষগুলোর ভিতর খেলা করছে জমাট বাঁধা
অন্ধকার। হঠাৎ একসময় স্বাগত খেয়াল করল আলো যেন নরম হয়ে আসছে। আর এরপরই রামমূর্তি বললেন, ‘আজ যতটুকু দেখাবার তা তোমাদের দেখালাম। একদিনে এ মন্দির পুরো দেখা সম্ভব নয়। আবার তোমাদের নিয়ে এখানে আসব। আর কাজের অবসরে তোমরাও এখানে চলে আসতে পার। জায়গাটা তো তোমরা চিনেই নিলে। নিজেরাও আসতে পারবে এখানে। এবার চল বাইরে বেরনো যাক। নইলে ফিরতে অন্ধকার নেমে যাবে। বিষ্ণুমূর্তিটা তোমাদের দেখিয়েই ফেরার পথ ধরব।’
রামমূর্তির কথা শুনে রিস্ট ওয়াচের দিকে তাকিয়ে স্বাগত অবাক হয়ে গেল। পাঁচটা বাজে। এ মন্দিরে ঢোকার পর কীভাবে যে পাঁচ-ছ’ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে তা তারা বুঝতেই পারেনি!
প্রফেসর রামমূর্তিকে অনুসরণ করে সংক্ষিপ্ত পথ ধরে বিষ্ণুলোকের বাইরে বেরিয়ে এল তারা। হাঁটতে হাঁটতে রামমূর্তি তাদের নিয়ে হাজির হলেন মন্দিরে বাইরের অংশে গ্যালারির নীচে একটা উপমন্দিরে। ছোট্ট একটা গর্ভগৃহ। তার মধ্যে অবস্থান করছেন কষ্ঠি পাথরের তৈরি দশবারো ফুট উচ্চতার দণ্ডায়মান বিষ্ণুমূর্তি। ফুলের মালা তার গলাতে। পায়ের নীচে জমা হয়ে আছে ধুপের রাশি। একটা প্রদীপ জ্বলছে গর্ভগৃহে। কয়েকজন লোক আরও কয়েকটা প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। রামমূর্তি বললেন, ‘এটাই এ মন্দিরের একমাত্র বিষ্ণুমূর্তি। সম্ভবত আগে এই মূর্তি মন্দিরের ভিতর ছিল। পরে মূর্তিটাকে বাইরে আনা হয়। ব্যাপারটা বৌদ্ধযুগেও ঘটে থাকতে পারে। যে সব পুরোহিতরা আছেন তারা সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বেলে দিয়ে অন্ধকার নামার আগেই এ স্থান ত্যাগ করবেন।’
স্বাগতরা কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। তারপর সেই মূর্তির উদ্দেশ্য প্রণাম জানিয়ে ফেরার পথ ধরল। অস্তাচলগামী সূর্যের আলো এখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে বিষ্ণুলোকের মাথায় জেগে থাকা দেবতার প্রকাণ্ড মুখমণ্ডলের ওপর। রক্তাভ বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে সেই মুখমণ্ডলগুলি।
মাঠ, বিষ্ণুলোকের প্রধান পরেশ তোরণ অতিক্রম করে জলাশয়ের সামনে বেরিয়ে এল সকলে। বাইরে কোনও ট্যুরিস্ট নেই। বিষ্ণুলোক দর্শন করে ফিরে গেছে তারা। স্বাগতরা যে পথে এসেছিল সে পথ ধরে এগিয়েই জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করল। অনেকেরই এবার ক্লান্ত বোধ হচ্ছে। সেই জন্য ধীর পদক্ষেপে হাঁটছিল তারা। স্বাগতর তেমন ক্লান্তি না লাগলেও সে সবার পিছনে হাঁটছিল। তারা এখন প্রায় তাঁদের বাসস্থানের কাছে পৌঁছে গেছে। সন্ধ্যা নামতে চলেছে এবার। অন্য কারওর চোখে না পড়লেও স্বাগতর হঠাৎ চোখে পড়ল একজনকে। সেই খামের যুবতী। যাঁর সঙ্গে মৃদু পরিচয় হয়েছে তার। সে গত রাত্রে স্বাগতর স্বপ্নে এসেছিল! একটা গাছের গুঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে সে দেখছে স্বাগতদের। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। আর তারপর সে অদৃশ্য হয়ে গেল গাছের আড়ালে। চারপাশের জঙ্গলে দ্রুত অন্ধকার নামতে লাগল।
রামমূর্তির নেতৃত্বে আজ থেকে স্বাগতরা তাঁর সহায়ক হিসাবে কাজ শুরু করবে সকাল ঠিক আটটায়। তিনি মন্দির তোরণের সামনে সবাইকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একটানা বিকেল পর্যন্ত কাজ চলবে। মাঝে কিছু সময়ের জন্য মধ্যাহ্নভোজের অবসর মিলবে এমনই কথা তিনি গত সন্ধ্যায় মন্দির থেকে ফেরার পর সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন। গতকাল বিষ্ণুলোক দেখে ফিরে আসার পর সবাই সামনের চত্বরে বসেই একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছে, রান্না করা খেয়েছে। সে সময় তাদের নিজেদের মধ্যে নানান কথার আদান প্রদান হয়েছে। তা থেকে স্বাগত জানতে পেরেছে তার মতো অন্য চারজন যারা প্রফেসর রামমূর্তিকে সাহায্য করার জন্য এসেছে তারা প্রত্যেকেই ছাত্রজীবনে মেধাবী ছাত্রছাত্রী বলে পরিচিত ছিল। প্রীতম নামের ছেলেটার আবার খেলোয়াড় হিসাবে একটা ব্যাগগ্রাউন্ড আছে। জাতীয় স্তরে ‘জ্যাভলিন’ অর্থাৎ বর্শা ছোড়ার প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটা পদকও একসময় সে জিতেছে। বিক্রম নামের ছেলেটা বেশ হাসিখুশি, মজা করতে ভালোবাসে। গত রাতে বেশ কয়েকবার সে নাতাশাকে ভূতের ভয় দেখাচ্ছিল। নাতাশা নামের মেয়েটাই দলের মধ্যে সবথেকে নরম স্বভাবা। তবে চারজন ছেলেমেয়ের মধ্যে সুরভীকেই সব থেকে ব্যক্তিত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে স্বাগতর। মেয়েটা কম কথা বলে কিন্তু যুক্তিপূর্ণ কথা বলে। গত রাতে ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের সম্পর্কে স্বাগত এমনই মূল্যায়ন করেছে। একদিনের পরিচয়ে মোটের ওপর তাদেরকে স্বাগতর ভালোই লেগেছে। আর স্বাগতর মনে হয়েছে তাকেও ভালো লেগেছে ওদের। রামমূর্তি স্যারের নেতৃত্বে এই অচেনাঅজানা পরিবেশে প্রাচীন মন্দিরে বেশ কিছুদিন একসঙ্গে কাজ করবে তারা পাঁচজন। সে কাজ সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে ন্যূনতম বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গোড়ে তোলা জরুরি। অন্য চারজনের সঙ্গে একটা দিন কাটাবার পর স্বাগতর প্রাথমিকভাবে ধারণা হয়েছে যে একসঙ্গে কাজ করতে সম্ভবত কোনও সমস্যা হবে না।
ভোর পাঁচটা নাগাদই বাইরে থেকে ভেসে আসা পাখির কলরবে স্বাগতর ঘুম ভেঙে গেছিল। প্রচুর টিয়াপাখি আছে এখানে। গতদিন বিষ্ণুলোকে প্রচুর হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামার ক্লান্তিতে ঘুমটা বেশ ভালো হয়েছে স্বাগতর। ঘুম ভেঙে বিছানা ছেড়ে নামার পর শরীরে যেন বেশ একটা চনমনে ভাব অনুভব করল সে। প্রাত্যহিক কিছু কাজকর্ম, স্নান প্রাতরাশ সেরে রামমূর্তির নির্দেশ পালন করার জন্য আটটা বাজার কিছু আগেই বাইরের চত্বরে বেরিয়ে এল সে। প্রায় একই সময় অন্যরাও বাইরে বেরিয়ে এল। স্থানীয় মজুরের দলও হাজির হয়ে গেল মন্দিরের প্রবেশ তোরণের সামনে। রামমূর্তি স্যরের রাত্রিবাসের ঘরটা স্বাগতদের থাকার জায়গার ঠিক বিপরীতে, চত্বরের অন্য পাশে। ঠিক আটটায় ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি তাঁর দু’হাতে চামড়ার ছোট বড় ব্যাগ। তাঁকে দেখে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল সবাই। তিনিও এগিয়ে এলেন। একসঙ্গে সকলে মিলিত হওয়ার পর একটা ব্যাগ থেকে গলায় ঝোলাবার একগোছা আইডেনটিটি কার্ড বার করে স্বাগতের হাতে দিয়ে বললেন, এটা তোমাদের সরকারি পরিচয়পত্র। যে যারটা নিয়ে নাও। সবসময় এটা নিজেদের সঙ্গে রাখার চেষ্টা করবে।’
পরিচয়পত্রতে সাঁটা ছবি দেখে স্বাগত সেগুলো অন্যদের হাতে দিয়ে নিজেরটা গলায় ঝুলিয়ে নিল। এরপর তিনি একগোছা ক্যাপ বা টুপিও বার করে দিলেন তাদেরকে। টুপির গায়ে ভারত ও কম্বোডিয়া সরকারের প্রতীক চিহ্ন আঁকা আছে। সকলে মাথায় পরে নিল টুপিগুলো। রামমূর্তি নিজেও এরপর একটা টুপি মাথায় পরে নিলেন। এরপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচজন যুবক-যুবতীর উদ্দেশে বললেন, ‘আমরা আজ একসঙ্গে কাজ শুরু করার আগে কয়েকটা কথা বলে রাখি। কথাগুলো তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ বা নির্দেশও বলতে পার।’
রামমূর্তি স্যরের কথা শোনর জন্য সকলে তাকাল তাঁর মুখের দিকে। তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘আমরা হাজার বছরের প্রাচীন এক মন্দিরের ভিতর কাজ করতে যাচ্ছি। এ মন্দির থেকে আমরা কী তথ্য বা সামগ্রী উদ্ধার করতে পারব তা আমাদের জানা নেই। আমাদের প্রাথমিক কাজ হল এই মন্দিরটাকে মোটামুটিভাবে তার অবসরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। যদি কোথাও পুনর্গঠনের ব্যাপার থাকে সেটা অবশ্য অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি যে, আমাদের লক্ষ্য হল মন্দিরের কাঠামোটাকে প্রথমে উদ্ধার করা ও তার একটা নকশা প্রস্তুর করা। যদি তা সফলভাবে করতে হয় তবে আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি। কাজ করার সময় মনে রাখতে হবে আমরা কেউ ‘আমি’ নই, ‘আমরা।’ দ্বিতীয় কথা হল তোমরা যেহেতু এখানে বেশ কিছুদিন থাকবে তাই স্থানীয় বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে তোমাদের পরিচয় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মন্দিরের ভিতর আমরা ঠিক কতখানি কাজ করেছি, কোনও মূর্তি বা অন্য কিছু উদ্ধার করতে পেরেছি কি না তা স্থানীয় লোকেদের জানাবে না। এই প্রাচীন মন্দির ও আমাদের কাজের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই গোপনীয়তা বজায় রাখা প্রয়োজন। মন্দিরের বিষয়ে যা কিছু জানাবার তা শুধু আমি দু’দেশের সরকারকেই জানাব।’
রামমূর্তির কথার মাঝেই বিক্রম তাঁকে প্রশ্ন করে বসল ‘অন্য কিছু বলতে কি আপনি গুপ্তধনের কথা বলছেন?’
রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘এ মন্দির বিষ্ণুলোকের
সমসাময়িক। যদিও হাজার বছর অতিক্রম হয়েছে, ট্রেজার হান্টারের দল বহু সময় এই প্রাচীন নগরীতে অভিযান চালিয়েছে তবুও সে সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আমাদের লক্ষ্য এই প্রাচীন মন্দিরের সংস্কার সাধন গুপ্তধন খোঁজা নয়। কাজেই এই ভাবনাটাকে মাথা থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই ভালো। নইলে কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে।’
রামমূর্তি স্যার এরপর তাঁর আগের বক্তব্যে ফিরে গিয়ে বললেন, ‘আমার তৃতীয় কথাটা তোমরা মন দিয়ে শুনবে। কারণ, এ ব্যাপারটার সঙ্গে সকলের নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। অচেনা এক অতি প্রাচীন মন্দিরের ভিতর ঢুকে আমরা কাজ করতে যাচ্ছি। এ সব জায়গায় কাজ করতে গেলে একটা দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এই যেমন হয়তো কোথাও থেকে একটা আলগা পাথর খসে পড়তে পারে কারওর ওপর, অসতর্কভাবে চলতে গিয়ে কেউ কোনও ফাটলের গভীরে পড়ে যেতে পারে, কোথাও কোনও ঘর বা কুপের বাতাস হয়তো হাজার বছর ধরে এই জায়গায় আবদ্ধ থাকার কারণে বিষাক্ত গ্যাসে পরিণত হয়েছে। যা নাকে গেলে অসুস্থ হওয়ার এমনকী মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনাও থাকে। তাছাড়া এই প্রাচীন কক্ষে সেখানে শতশত বছর ধরে জীবন্ত মানুষের পা পড়েনি যেখানে অন্য কোনও বিপদের সম্ভাবনাও থাকতে পারে। কাজেই মন্দিরের প্রবেশ তোরণ অতিক্রম করার পর প্রতিটা পদক্ষেপ সাবধানে ফেলতে হবে। সাবধানে কাজ করতে হবে।
অতি উৎসাহ বা কৌতূহলবশত কেউ এমন কোনও কাজ করতে যাবে না যাতে বিপদের সম্ভাবনা থাকতে পারে। কাজ করতে করতে বা অন্য কোনও কারণে কেউ অন্যদের থেকে বেশি দূরে যাবে না। যাতে একজন কোনও বিপদে পড়লে অন্যজন তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে পারে। দৈবাৎ যদি কোনও বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হয়, তখন একমাত্র কাজ মাথা ঠান্ডা রাখা ও ধৈর্য বজায় রাখা। তবেই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। আশা করি আমি আমার বক্তব্য তোমাদের বুঝিয়ে বলতে পারলাম।’—এ কথাগুলো একটানা বলে থামলেন তিনি।
তাঁর কথা শেষ হওয়ার পর সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, স্যর বুঝেছি।’
রামমূর্তি বললেন, ‘কাজ শুরুর আগে আর একটা কথা বলার আছে। তোমাদের মধ্যে থেকে আমার একজনকে নির্বাচন করা প্রয়োজন যে আমার অনুপস্থিতিতে তোমাদের নেতৃত্ব দেবে। সেই তখন টিম লিডার। তোমরা সকলেই প্রায় সমবয়সি। তবে স্বাগত তোমাদের চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড়। তাই স্বাগতকেই আমি সে দায়িত্ব দিতে চাই। স্বাগত বা তোমাদের এ ব্যাপারে কোনও আপত্তি নেই তো?’
তাঁর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাগত ছাড়া অপর চারজন একসঙ্গে বলে উঠল, ‘না, কোনও আপত্তি নেই।’
স্বাগতও মাথা ঝুঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল রামমূর্তি স্যরের দেওয়া দায়িত্ব পালন করবে সে।
রামমূর্তি বললেন, ‘আমাদের কথা আপাতত শেষ, বাকি কথা মন্দিরে প্রবেশ করে হবে। চল এবার মন্দিরে প্রবেশ করা যাক।’ এই বলে তিনি ব্যাগ দুটো নিয়ে এগলেন প্রবেশ তোরণের দিকে। তাঁকে অনুসরণ করল অন্যরা। সেদিকে এগতে এগতে স্বাগতর কানে এল নাতাশা চাপা স্বরে জানতে চাইল, ‘স্যর অন্য কোনও বিপদ’ বলতে কী বোঝাতে চাইলেন?’
বিক্রম জবাব দিল, ‘ওই ভূত-প্রেতের কথা মনে হয়। যারা এই মন্দিরে বাস করে।’
বিক্রমের জবাব শুনে সুরভী মৃদু তিরস্কারের স্বরে বিক্রমের উদ্দেশে বলল, ‘প্লিজ স্টপ। কাজ শুরু হওয়ার আগে তুমি আর ওকে ভয় দেখিও না।’
প্রবেশ তোরণের সামনে উপস্থিত হল সকলে। স্থানীয় খামের মজুরের দল সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। রামমূর্তি তাদের ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন, এবার ভিতরে প্রবেশ করতে হবে। কিন্তু মন্দিরে প্রবেশ করার আগে তারা তাদের হাতের গাছকাটার জন্য সরঞ্জাম নামিয়ে রেখে তোরণের দিকে মুখ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তারপর একযোগে মাথা নিচু করে তাদের নিজস্ব ভাষায় কী যেন বলতে শুরু করল প্রার্থনার ভঙ্গিতে। তা দেখে প্রীতম রামমূর্তি স্যরকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যর, ওরা কী করছে?’
রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘ওরা ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করছে। এ মন্দিরে যদি প্রেতাত্মাদের বাস থাকে তবে তাদের হাত থেকে তিনি যেন ওদের রক্ষা করেন সেজন্য।’
কথাটা শুনেই নাতাশার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল আর বিক্রমের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল। বিক্রমের যে হাসি পাচ্ছে সেটা সম্ভবত নজর এড়াল না রামমূর্তির। তিনি চাপা চাপা স্বরে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘বহু বিদেশি আঙ্করভাটে আসার কারণে এই লোকগুলো ইংরেজি ভাষা সামান্য হলেও বোঝে। আমাদের কথাবার্তা এদের সামনে এখন যেন না হয় যে তা এদের ধর্ম বিশ্বাস বা ভাবনাকে আঘাত দেয়। এরা সাধারণত পুরনো মন্দিরে প্রবেশ করতে চায় না। তিনজনের পারিশ্রমিকের সমান পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এদের সংগ্রহ করতে হয়েছে। এরা কাজ ছেড়ে চলে গেলে মুশকিলে পড়ব আমরা।’
মিনিট তিনেক ধরে প্রার্থনা করে উঠে দাঁড়িয়ে তোরণের ভিতরে প্রবেশ করার জন্য এগল শ্রমিকের দল। রামমূর্তির সঙ্গে তারা সকলেও এগল তোরণ অতিক্রম করার জন্য। তোরণের ভিতর প্রবেশ করার আগে স্বাগত একবার তাকাল তোরণের মাথার ওপর বসানো বিষ্ণুর প্রকাণ্ড মুখমণ্ডলের দিকে। সকালের আলো এসে পড়েছে সেই মুখমণ্ডলে। স্বাগতর মনে হল বিষ্ণুর ঠোঁটের কোণে যেন জেগে আছে এক রহস্যময় হাসি!
