বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ৮
পর্ব ০৮
একটানা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা কাজ করা হল প্রথম দিনে। ঠিক বিকেল চারটের সময় রামমূর্তি বললেন, ‘আজকের মতো আমাদের কাজ শেষ।’ কিছুক্ষণের মধ্যে মজুররাও মন্দিরের ভিতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। তারপর সকলে মিলে তোরণের বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে বেরবার পর মজুররা আর দাঁড়াল না। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকটা পথ পেরিয়ে অন্ধকার নামার আগেই এই প্রাচীন মন্দির নগরী ত্যাগ করতে হবে তাদের। তারা চলে যাওয়ার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে স্বাগতরাও যে যার ঘরে ঢুকে পড়ল। বেশ কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার পর যখন আবার তারা রাতের রান্না খাওয়ার জন্য বাইরে বেরল তখন মন্দির নগরীতে অন্ধকার নেমে গেছে। আকাশে চাঁদও উঠেছে। নিজেদের মধ্যে নানা গল্পগুজব করতে করতে সে সব পর্ব মেটাল তারা। নৈশ আহার মিটলে তারা ঘরে ঢোকার আগে রামমূর্তি বললেন, ‘কাল আমাকে সিয়েমরিপ যেতে হবে রসদ কিনে আনার জন্য। মজুররা এলে তাদের কাজ বুঝিয়ে দিয়েই বেরিয়ে পড়ব। আমি তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব ভাবছি। শহর আর দোকানপাট চেনা হয়ে যাবে। প্রয়োজনে অন্য দিন আমি তাহলে তোমাদেরও শহরে পাঠাতে পারব সেখান থেকে কিছু কিনে আনার প্রয়োজন হলে।’
রামমূর্তির থেকে পরদিনের পরিকল্পনা জেনে নিয়ে তারা পাঁচজন যে যার ঘরে ঢুকে পড়ল।
রাত ন’টা নাগাদ ঘরে ঢুকে স্বাগত বিছানায় শুয়ে পড়েছিল। সারা দিনের পরিশ্রমের কারণে কিছু সময়ের মধ্যেই ঘুম নেমে এসেছিল তার চোখে। কিন্তু মাঝরাতে হঠাৎ গরম অনুভব হওয়াতে স্বাগতর ঘুম ভেঙে গেল। মাথার ওপরের পাখাটার গতি কমে গেছে। ধীরে ধীরে ঘুরছে সেটা। ব্যাটারি চালিত আলো পাখা। হয়তো বা ব্যাটারির চার্জ কমে এসেছে। গরমের মধ্যে কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর স্বাগতর মনে হল জানলাটা। খুলে দিলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে। তাই খাট ছেড়ে নেমে জানলা খুলল সে। সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে টাটকা বাতাস প্রবেশ করতে শুরু করল ঘরের ভিতরে। ঘড়ি দেখল স্বাগত। রাত একটা বাজে। চাঁদের মৃদু আলোতে নিঝুম বাইরের পাথুরে চত্বরটা। চত্বরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মন্দির তোরণ। জেগে আছে তোরণের মাথার ওপর পাথরের তৈরি বিশালাকৃতির বিষ্ণুর মুখমণ্ডলও। যেন তিনি এই মধ্য রাতেও জাগ্রত হয়ে আছেন বনভূমি আবৃত হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরকে পাহারা দেওয়ার জন্য। জানলার বাইরে একটু তাকিয়ে দেখার পর সে আবার বিছানায় ফিরে আসতে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় একটা ব্যাপার চোখে পড়ল তার। প্রবেশ তোরণের ঠিক মুখেই কে একজন যেন দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে! ভালো করে চোখ কচলে সে তাকাল সেদিকে। হ্যাঁ, কেউ একজন যেন আছে! নড়ছে সে! ভালো করে তাকে দেখার চেষ্টা করল স্বাগত। দূর থেকে আলো-আঁধারির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটা কিছুটা খর্বকায় বলেই মনে হল স্বাগতর। আর
সেই আকার দেখে তার আরও একটা কথা মনে হল, যে দাঁড়িয়ে আছে সে কোনও খামের নারী হতে পারে। কারণ, তাদের আকৃতি এমন ছোটখাট হয়। যে নারীর সঙ্গে স্বাগতর জঙ্গলের মধ্যে পরিচয় হয়েছে তারও আকৃতি ছোটখাট। স্বাগত দেখার চেষ্টা করতে লাগল তাকে। মাঝে মাঝে নড়ছে সেই ছায়ামূর্তি। ওই ছায়ামূর্তি যেই হোক না কেন এত রাতে তোরণের সামনে কী করছে? এরপর স্বাগতর মনে হল, স্থানীয় মানুষরা তো রাতে মন্দির নগরীকে এড়িয়ে চলে। তবে যে এসেছে সে কি বহিরাগত কেউ? কী মতলবে সে এখানে এসেছে?
স্বাগতর মনে এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাওয়ার পর সে ভাবল, ব্যাপারটা একবার দেখা দরকার। তেমন কোনও ব্যাপার হলে সে রামমূর্তি আর অন্যদের ডেকে তুলবে। তার আগে তোরণের সামনে গিয়ে দেখা দরকার ওকে?
স্বাগতর ঘরের কোণে একটা লাঠি ছিল। সেটা নিয়ে সন্তর্পণে দরজা খুলে বেরিয়ে সে সোজা এগল মন্দির তোরণের দিকে। চারপাশে ঘুমন্ত পৃথিবী। নাকি সাধারণ মানুষের ভাবনামতো এ সময় জেগে থাকে অন্যরা সেই সব প্রাচীন প্রেতাত্মারা। স্বাগত অবশ্য এসব ব্যাপার বিশ্বাস করে না। তাই সে সাহসে ভর করে এগল। কিন্তু সে তোরণের পৌঁছতেই মূর্তিটা হঠাৎই যেন অদৃশ্য হয়ে গেল!
কাছাকাছি স্বাগত তোরণের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। না কোনও মানুষ সেখানে নেই! তবে সে তোরণের ভিতর ঢুকে পড়ল? স্বাগতর মন বলল, এত রাতে মন্দিরের ভিতর ঢোকা তার ঠিক হবে না। আর এরপরই হঠাৎ সে দেখতে পেল একজনকে। তোরণের কার্নিশে বসে আছে একটা বাঁদর! তবে কি তাকেই তোরণের সামনে দেখল সে। প্রাণীটার দেহই কি আলোছায়ায় বিভ্রম ঘটাল তার চোখে? প্রাণীটা চেয়ে আছে স্বাগতর দিকে। চেয়ে আছে কার্নিশের মাথার ওপরের বিষ্ণু মূর্তিটাও। বাঁদর কি রাতে ঘুমায় না? দলবল ছাড়া প্রাণীটা একা এভাবে জেগে বসে আছে কেন? – এ প্রাণীটা আর স্বাগত বেশ কয়েক মূহূর্ত চেয়ে রইল পরস্পরের দিকে। আর তখনই স্বাগতর মনে পড়ে গেল সকালবেলা মজুর সর্দার হেরুমের মুখে শোনা কথাটা প্রাচীন প্রেতাত্মারা বাঁদরের রূপ ধরে থাকে! বাঁদরটা এরপর ধীরে ধীরে উঠে গেল আরও ওপর দিকে। সে হারিয়ে গেল বিষ্ণুর প্রকাণ্ড মুখমণ্ডলের আড়ালে। স্বাগতও এরপর এগল ঘরে ফিরে শুয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু ধন্ধটা তার মনের মধ্যে রয়েই গেল! সে কি বাঁদরটাকেই দেখেছিল? নাকি সত্যিই কোনও মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। যে স্বাগতকে আসতে দেখে আত্মগোপন করল তোরণের অভ্যন্তরে হাজার বছরের প্রাচীন মন্দিরের অন্ধকারে?
সূর্যদেব যথা নিয়মেই পরদিন ভোরের আলো ছড়িয়ে দিলেন বিষ্ণুলোক আর তাকে ঘিরে থাকা অরণ্য বেষ্টিত প্রাচীন মন্দিরগুলোর মাথায়। টিয়া পাখির ডাকে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। ঘুম ভাঙার পর খোলা জানলা দিয়ে বাইরেটা চোখে পড়ল স্বাগতর। ভোরের নতুন আলোতে প্রবেশ তোরণের মাথায় বসানো বিষ্ণু মূর্তিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোনও অন্ধকার নেই সেই জায়গাতে। স্বাগতর মনে পড়ে গেল গত রাতের ঘটনাটা। একবার মনে মনে ভাবল তার অভিজ্ঞতার কথা সে রামমূর্তি স্যর আর অন্যদের জানাবে। কিন্তু তার পরক্ষণেই সে ভাবল যখন নিশ্চিত নয় যে সেখানে কোনও মানুষই ছিল তখন ব্যাপারটা জানিয়ে কাজ নেই। তাতে অযথা কারওর মনে আতঙ্ক জন্মাতে পারে। বিশেষত নাতাশা বাঁদর দেখার কথা শুনলেও ভয় পেয়ে যেতে পারে। মেয়েটা ভীতু প্রকৃতির। সেও শুনেছে যে প্রেতাত্মারা এখানে বাঁদরের রূপ নিয়ে থাকেই। কাজেই স্বাগত সিদ্ধান্ত নিল ব্যাপারটা অন্যদের না জানানোর। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ দুটো বাইক রিকশ বা টুকটুক এসে হাজির হল মন্দির তোরণের বাইরে। সকাল আটটাতে মজুরের দলও এসে উপস্থিত। স্বাগতরাও যে যার নিজেদের ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। প্রফেসর রামমূর্তি কিছুক্ষণ হেরুমের সঙ্গে কথাবার্তা বলে এদিনের মতো তাদের কাজ বুঝিয়ে দিলেন। তারপর স্বাগতদের বললেন, ‘চল, এবার শহরের দিকে রওনা হওয়া যাক।’
দুটো টুকটুকে তিন জন করে ভাগ হয়ে উঠে বসল তারা। রামমূর্তি যে গাড়িতে উঠল সেটাতে উঠল স্বাগত আর প্রীতম। তারা রওনা হল সিয়েমরিপ শহরের দিকে। তাদের চলার পথের দু’পাশে বড় বড় গাছের জঙ্গল। তার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ছোটখাট সৌধের ধ্বংসাবশেষ বা তাদের খণ্ডিতাংশ। কোথাও হয়তো দাঁড়িয়ে আছে একটা প্রাকারের অংশ, কোথাও কোনও একাকী স্তম্ভ বা বিশাল আকৃতির প্রস্তরখণ্ড। সকালের আলো স্থানে স্থানে গাছের ফাঁক গলে এসে পড়েছে তাদের ওপর। আর সেই আলোতে তাদের গা থেকে উঁকি মারছে নানান ধরনের মূর্তির অবসর বা অলঙ্করণ। কোন সেই শত-সহস্র বছর আগে প্রাচীন খামের শিল্পীরা যে সব ভাস্কর্য রচনা করেছিলেন তারা যেন আলোর স্পর্শ পেয়ে পাথরের গা থেকে আত্মপ্রকাশ করার চেষ্টা করে বলতে চাইছে, ‘আছি আছি, খণ্ডিত হলেও আমরা এখনও টিকে আছি তোমরা আমাদের দেখবে বলে। আর আমাদের তোমরা দেখলে নিশ্চয়ই তোমাদের মনে পড়বে সেই সব প্রাচীন শিল্পীদের কথা, যারা একদিন পাথরের বুকে ফুটিয়ে তুলেছিল। আমাদেরকে। এখনও আমরা যতটুকু রয়েছি তা দেখেই নিশ্চয়ই তোমরা ধারণা করতে পারবে শতশত বছর পূর্বে কেমন আশ্চর্য সুন্দর ছিল খামের রাজাদের প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির নগরী।’
এ সবই দেখতে দেখতে চলল সকলে। রামমূর্তি স্বাগতকে বললেন, “নিজেরাই দেখতে পাচ্ছ যে কী বিশাল অঞ্চল নিয়ে ছড়িয়ে আছে এই মন্দির নগরীর প্রাচীন চিত্রগুলো। এই পুরাকীর্তিগুলোর সুসংবদ্ধ রূপদান করতে বা কাঠামো রচনা করতে কয়েক যুগ সময় লেগে যাবে। এবং সে কাজ করতে বিপুল পরিমাণ অর্থেরও প্রয়োজন। যা কম্বোডিয়ার মতো ছোট দেশের পক্ষে জোগাড় করা বেশ কঠিন ব্যাপার।”
প্রীতম বলল, ‘আমি ভাবছি এত সমৃদ্ধশালী প্রাচীন নগরী কীভাবে পরিত্যক্ত হয়ে গেল? কেন হল?’
প্রফেসর বললেন, ‘বলা যেতে পারে নির্মাণকালের সময় ধরে এই মন্দির নগরীর আয়ুষ্কাল ছিল আনুমানিক আড়াইশো থেকে তিনশো বছর। তারপর নগরী পরিত্যক্ত হয় ও পাঁচশো বছরের মতো সময়কাল ধরে এখানে মানুষের আনাগোনা ছিল না বললেই চলে। আঙ্করের বিষ্ণুমন্দির পুনরায় আবিষ্কারের পর তাকে ঘিরে থাকা এই মন্দির নগরীকেও ধীরে ধীরে কিছুটা উদ্ধার করা গেছে। বহু কারণ আছে এই মন্দির নগরী পরিত্যক্ত হওয়ার পিছনে। তার মধ্যে প্রধান তিনটে কারণ তোমাদের বলি। চাম জাতির আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিষ্ণুলোক ও তাকে ঘিরে থাকা মন্দির নগরী। কারণ, মন্দিরে একই সঙ্গে ধনসম্পদ ও নারী দুটোই পাওয়া যেত। এখানেই তারা এসে ঘাঁটি গেড়ে ছিল ও সে সময় অনেক মন্দিরও ধ্বংস করে। মন্দির ভাঙার পিছনে কারণ ছিল কোথাও কোনও গুপ্ত কক্ষে আরও সোনা বা রত্নরাজি লুকিয়ে আছে কি না অনুসন্ধান করা। খামের রাজারা কিছুদিনের মধ্যে চামদের থেকে এ নগরী পুনরুদ্ধার করে ঠিকই, কিন্তু নিরাপত্তার কারণে তারা তাদের রাজধানী সাত-আট কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। বায়ুম মন্দির আছে সেদিকে। সেই সময় থেকে ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হতে থাকে এই মন্দির নগরী। দ্বিতীয়ত, এ নগরীর বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ পাড়ি দেয় মেকং নদীর অববাহিকার দিকে। অর্থাৎ যেদিকে কম্বোডিয়ার বর্তমান রাজধানী নমপেন অবস্থান করছে সেদিকে। মেকং নদীর উর্বর পলি মাটির কারণে সে স্থান এই স্থানের চেয়ে চাষাবাদের পক্ষে অনেক বেশি অনুকূল ছিল, নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা চালানো যেত। আর সবথেকে বড় কথা সেখানে হিংস্র চাম জাতির আক্রমণের ভয়ও ছিল না। তৃতীয় কারণ হল সূর্যবর্মন ও জয়বর্ধনের পরবর্তীকালে এ অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি হতে থাকে। অনেক খামের নৃপতি বৌদ্ধ ধর্মও গ্রহণ করেন। বিষ্ণুলোক বুদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হলেও, বাকি মন্দিরগুলোকে বৌদ্ধরা তেমনভাবে নিজেদের দখলে নেয়নি। রাজধর্ম বৈষ্ণব থেকে বৌদ্ধ ধর্মে রূপান্তরিত হওয়ায় এই হিন্দু মন্দিরগুলোও তাদের গুরুত্ব হারিয়ে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। আরও বেশ কিছু কারণ মিলিয়ে মিশিয়ে একদিন জনশূন্য হয়ে যায় এই মন্দির নগরী।’
রামমূর্তি বৌদ্ধদের কথা বলা শেষ করতে না করতেই কিছুটা কাকতালীয়ভাবেই স্বাগতদের চোখে পড়ল এক মুণ্ডিত মস্তক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। রাস্তার পাশে একটা ঝোপ থেকে পাতা সংগ্রহ করে তিনি তাঁর কাঁধের থলেতে ভরছেন। আর তাঁকে দেখা মাত্রই রামমূর্তি গাড়িটা একটু থামাবার নির্দেশ দিলেন। সন্ন্যাসীও গাড়ির শব্দ শুনে কাজ থামিয়ে ফিরে দাঁড়ালেন। স্বাগতদের গাড়িটা তাঁর সামনে এসে থেমে গেল। লোকটাকে দেখে স্বাগতর মনে হল তিনি প্রৌঢ়ও হতে পারেন অথবা বৃদ্ধও হতে পারেন। তাঁর বয়স অনুমান করা মুশকিল। রামমূর্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখানে কী করছেন আপনি?’
সন্ন্যাসী জবাব দিলেন, ‘কিছু ঔষধি লতাপাতা সংগ্রহ করতে এসেছি।’
রামমূর্তি আবার তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘এতটা পথ হেঁটে এলেন?’
সন্ন্যাসী হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, হেঁটেই। করুণাময়ের আশীর্বাদে আমার শরীর এখনও হাঁটাচলার পক্ষে উপযুক্ত আছে।’
রামমূর্তি আর সন্ন্যাসীর কথাবার্তার ধরন দেখে স্বাগত বুঝতে পারল তাঁরা দু’জন পরস্পরের পূর্ব পরিচিত। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এরপর রামমূর্তিকে জিজ্ঞেস করলেন,
‘আপনি কেমন আছেন?’
রামমূর্তি বললেন, ‘ভালোই আছি। আমার সঙ্গে যাদের দেখছেন এরা সব ভারত থেকে এসেছে আমাকে সাহায্য করার জন্য। সবাই মিলে কাল থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছি।’
রামমূর্তির কথা শুনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মুহূর্তর জন্য চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘তাহলে সত্যিই আপনি ওই মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করবেন?’
রামমূর্তি হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি সরকারি লোক। সরকার যে কাজের দায়িত্ব দিয়েছে সে দায়িত্ব আমাকে পালন করতেই হবে।’
সন্ন্যাসী আর রামমূর্তির মধ্যে শেষ দুটো বাক্য বিনিময় শুনে স্বাগতর কেন জানি মনে হল তাঁদের দু’জনের প্রশ্নোত্তরের মধ্যে অন্য কোনও একটা কথা যেন লুকিয়ে আছে!
রামমূর্তি এরপর বললেন, ‘আমরা সবাই সিয়েমরিপ যাচ্ছি রসদ কিনে আনার জন্য।’
বৌদ্ধ শ্রমণ বললেন, ‘যান। তবে এনাদের একবার বায়ুম মন্দির—বুদ্ধ মূর্তি দেখাতে নিয়ে যাবেন।’
রামমূর্তি বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই নিয়ে যাব। আশা করি সেখানে গেলে আপনার সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ হবে।’
প্রফেসরের কথা শুনে মৃদু হাসলেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তারপর স্বাগতদের দিকে তাকিয়ে ডান হাতটা আশীর্বাদের মুদ্রায় তুলে ধরে বললেন, ‘ভগবান বুদ্ধ আপনাদের সকলের মঙ্গল করুন, সকল বিপদ থেকে আপনাদের রক্ষা করুন।’ রামমূর্তির নির্দেশে আবার চলতে শুরু করল গাড়ি। সেই বৌদ্ধ শ্রমণকে কিছুটা পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার পর প্রীতম জানতে চাইল, ‘এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কে? ‘
প্রফেসর জবাব দিলেন, ‘ওনার নাম রত্নসম্ভব। এখানে আসার পর বায়ুম বুদ্ধ মন্দির দেখতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। তারপর বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ ও কথাবার্তাও হয়েছে। উনি বায়ুম মন্দিরের ভিতরেই এক জায়গায় থাকেন। ওর সঙ্গে কথাবার্তা বলে বুঝেছি এ অঞ্চল সম্পর্কে বেশ ভালো জানা আছে ওঁর।’
স্যরের কথা শুনে প্রীতম জানতে চাইল, ‘বায়ুম মন্দির কি বাসযোগ্য স্থান? অর্থাৎ সে মন্দির কি এখনও অক্ষত অবস্থায় আছে?’
রামমূর্তি জবাব দিলেন, ‘সে মন্দিরের অবস্থা বিষ্ণুলোকের চেয়ে করুণ। তবে মন্দিরের ভিতর এখনও কয়েকটা ছাদ যুক্ত প্রাচীন ঘর আছে। তারই একটাতে বাস করেন রত্নসম্ভব। কাজের ফাঁকে আমি একদিন ওই বায়ম বা বায়ুম মন্দির আর সেখানকার বুদ্ধ মূর্তি দেখাতে নিয়ে যাব।’ এ কথা বলার পর আর কোনও কথা না বলে নিজের কী যেন ভাবনায় ডুবে গেলেন প্রফেসর রামমূর্তি।
আধ ঘণ্টা মতো সময় লাগল স্বাগতদের গাড়ি দুটোর প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ সমৃদ্ধ বনপথ অতিক্রম করতে। তারপর বিশাল এক প্রাচীন তোরণ অতিক্রম করে মন্দির নগরীর বাইরে বেরিয়ে পড়ল তারা। এই তোরণের মাথাতেও খোদিত আছে বিশালাকৃতির বিষ্ণু মুখমণ্ডল। বর্তমানে মন্দির নগরীতে প্রবেশ করার জন্য এটাই প্রধান তোরণ। স্বাগতরা মন্দির নগরীতে প্রবেশ করেছে এই তোরণ দিয়েই। তোরণের বাইরে বেশ কিছু পর্যটকদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
মন্দির নগরী আঙ্করভাটে প্রবেশের আগে বিশাল মুখমণ্ডল সমৃদ্ধ হাজার বছরের প্রাচীন তোরণের সামনে গাড়ি থামিয়ে পর্যটকরা কেউ ছবি তুলছে আবার কেউ বা বিস্মিত অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সেই প্রকাণ্ড মুখমণ্ডলের দিকে।
এই প্রথমবার তারা দর্শন করছে কোনও হিন্দু দেবতার অমন বিশালাকৃতির মুখ। তোরণ থেকে বেরলেই দু’পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু প্রাচীন ভগ্ন মূর্তি। শেষ নাগের শরীর হাতে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা।
এখন সে শরীর খণ্ডিত হয়ে গেছে মহাকালের গ্রাসে। ঠিক যেমন খণ্ডিত হয়ে গেছে মূর্তিগুলোও। আর দু’পাশে সারিবদ্ধ ভগ্ন মূর্তিগুলোর মধ্যে দিয়ে একটা সাঁকো পেরিয়ে রাস্তা রওনা হয়েছে সিয়েমরিপ শহরের দিকে। মন্দির নগরীর ভিতরের কাঁচা বা পাথুরে রাস্তা নয়, চওড়া মসৃণ পিচওয়ালা রাস্তা। সেই রাস্তা ধরেই স্বাগতদের টুকটুক দুটো রওনা হল শহরের দিকে।
