বোতল শয়তান – ১
হাওয়াই দ্বীপে এক লোক বাস করত। তার নামটা গোপন রাখছি। কারণ সে বেঁচে আছে এখনও। তাই আমরা তাকে কিউই বলে ডাকব।
কিউই ছিল গরীব। কিন্তু সাহসী আর কর্মঠ লোক হিসেবে সুনাম ছিল তার। পড়াশোনাও জানত বেশ। তাছাড়া নাবিক হিসেবে যথেষ্ট দক্ষ ছিল। স্টীমার নিয়ে ঘুরে বেড়াত। ওয়েইল বোট নিয়ে মাঝেমধ্যেই চলে যেত হামাকুয়া উপকূলে।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই কিউই-র মনে ইচ্ছে জাগল সারা দুনিয়াটা ঘুরে দেখতে হবে। সে উদ্দেশ্যেই স্যান ফ্র্যানসিসকোগামী এক জাহাজে চেপে বসল একদিন।
স্যান ফ্র্যানসিসকো চমৎকার শহর। বন্দরটাও চমৎকার। আর ধনী লোকেরও অভাব নেই এ শহরে। বিশেষ করে একটা পাহাড় তো মনোরম সব প্রাসাদে ছেয়ে রয়েছে।
এ পাহাড়ের ওপর দিয়েই একদিন হেঁটে যাচ্ছিল কিউই। পকেট ভর্তি টাকা তার। দুপাশের চমৎকার সব অট্টালিকাগুলো দেখে বিস্ময় জাগছিল মনে।
‘কি দারুণ সব বাড়ি!’ ভাবল সে, ‘আর যারা এসব বাড়িতে বাস করে তাদের তো কোন চিন্তাই নেই। কি সুখী তারা!’
এসব ভাবতে ভাবতেই একটা বাড়ির সামনে এসে পড়ল সে। অন্য বাড়িগুলোর চেয়ে ছোট এটা। কিন্তু খেলনার মত সুন্দর। সিঁড়িগুলো রূপোর মত ঝকঝকে। ফুলে ফুলে ছেয়ে রয়েছে বাগানটা। জানালাগুলোতে যেন হীরের ঝলকানি। থমকে দাঁড়াল কিউই। আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল বাড়িটার অসাধারণ সৌন্দর্য। হঠাৎ তার নজর গেল একটা জানালার দিকে। এক লোক চেয়ে রয়েছে তার দিকে। বুড়ো মত। মাথা জোড়া টাক। মুখে সাদা দাড়ি। কেমন মলিন, বিষণ্ণ দেখাচ্ছে তাকে। কিউই অবাক হয়ে গেল। এ লোকের তো এমন মন খারাপ করে বসে থাকার কথা নয়।
সত্যি কথা হচ্ছে, কিউই আর সেই বুড়ো একে অন্যের দিকে চেয়ে পরস্পরকে তখন হিংসে করছে। ভাবছে ‘আহা! ও কত সুখী!’
হঠাৎ মৃদু হাসল লোকটা। হাতছানি দিয়ে কিউইকে ডাকল। ভেতরে আসার জন্যে। কিউই ঢোকার সময় দরজার কাছে দেখা হল ওদের।
‘এ বাড়িটা আমার,’ বলল বুড়ো, দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ‘ঘরগুলো ঘুরে দেখবে?’
মনের আনন্দে রাজি হল কিউই। বুড়ো ওকে, তল-কুঠরি থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাল। আশ্চর্য নিখুঁত একটা বাড়ি। তাক লেগে গেল কিউই-র।
‘সত্যি,’ বিস্ময় কাটিয়ে বলল কিউই, ‘এ বাড়ির কোন তুলনা নেই। আমার এমন একটা বাড়ি থাকলে সারাদিন হাসিমুখে থাকতাম আমি। অথচ আপনি কিনা মুখ কালো করে বসে রয়েছেন। কারণটা কি?’
‘কোন কারণ নেই,’ বলল বুড়ো। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এরকম বা এরচেয়েও সুন্দর বাড়ির মালিক হতে চাও? কিছু টাকা নিশ্চয় আছে তোমার সঙ্গে?’
‘তা আছে। পঞ্চাশ ডলারের মত, কিউই জবাব দিল। কিন্তু এরকম একটা বাড়ির দাম তো তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি।’
কি যেন হিসেব করল বুড়ো। ‘খুব কম হয়ে গেল,’ বলল সে। ‘তবে ইচ্ছে করলে পঞ্চাশ ডলারে এটা কিনতে পার তুমি।’
‘বাড়িটা?’ উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করল কিউই।
‘না, বাড়িটা নয়,’ ঠাণ্ডা গলায় বলল বুড়ো। ‘বোতলটা। তোমাকে জানিয়ে দেয়া ভাল; এই যে বাড়ি, বাগান, ধন সম্পত্তি দেখতে পাচ্ছ, সব কিন্তু বোতলের কল্যাণে। সব দিয়েছে ছোট্ট একটা বোতল।’
কাবার্ড খুলে বোতলটা বার করল সে। পেটটা গোল। লম্বা গলা। দুধের মত সাদা ওটার কাঁচ। রঙধনুর সাত রঙ খেলা করে চলেছে অনবরত। বারবার বদলে যাচ্ছে বোতলের কাঁচের রঙ। ভেতরে আবছা ভাবে নড়ে বেড়াচ্ছে কি যেন একটা। ছায়া আর আগুনের শিখার মত।
‘এটার কথাই বলছিলাম,’ বুড়ো বলল। সব দেখে শুনে হেসে উঠল কিউই। ‘আলিফ লায়লার গল্প ফেঁদেছেন দেখছি।’
‘আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?’ প্রশ্ন করল লোকটা। ‘চেষ্টা করে দেখ তো এটা ভাঙতে পার কিনা।’
বুড়োর হাত থেকে বোতলটা নিল কিউই। ইচ্ছেমত আছাড় মারল মেঝেতে। ঠুকল সজোরে। প্রতিবারই মেঝে থেকে লাফিয়ে উঠল -ওটা। ঠিক টেনিস বলের মত। কিছুই হল না ওটার। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল কিউই। ঘেমে উঠেছে সে।
‘আশ্চর্য জিনিস তো,’ কিউই-র কণ্ঠে বিস্ময়। ‘দেখে তো মনে হয় কাঁচের তৈরি। ঠুনকো।
‘কাঁচই ওটা,’ বলল বুড়ো। এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি গভীর শোনাল তার দীর্ঘশ্বাস। তবে নরকের আগুনে তৈরি। একটা বাচ্চা শয়তান বাস করে ওটার ভেতর। নড়াচড়া দেখলে না তখন? ও-ই নড়ছিল। বোতলটা যে কিনবে শয়তানের বাচ্চাটা তারই হুকুম তামিল করবে। যাই চাওয়া হোক না কেন-ভালবাসা, খ্যাতি, টাকা- পয়সা, বাড়িঘর, এমন কি শহর-সব কিছুই করে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে ওর। কেবল মনের ইচ্ছের কথাটা উচ্চারণ করলেই হল। বোতলটা এক সময় নেপোলিয়নের কাছেও ছিল। এরই দৌলতে তিনি পৃথিবীর সম্রাট হয়েছিলেন। কিন্তু যেই বেচে দিলেন অমনি পতন হল তাঁর। ক্যাপ্টেন কুক এই বোতলের সাহায্যে অনেক নতুন জায়গা আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু বোতল হাতছাড়া করতেই মারা পড়লেন। আসল কথা হচ্ছে, বোতলটা বেচে দেয়ার সাথে সাথে সব ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। আর বোতলের মাধ্যমে যা করে নেয়া যায় তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। নইলে চরম অমঙ্গল নেমে আসে।’
‘আপনি বোতল বেচতে চাইছেন কেন?’ জানতে চাইল কিউই
‘আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। তাছাড়া বয়সও হয়েছে,’ বলল বুড়ো। ‘সত্যি কথাটা বলছি তোমাকে, একটা কাজই কেবল পারে না শয়তানটা। আয়ু বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা নেই ওর। আরও একটা কথা খোলাসা করে বলে দিচ্ছি, কেউ যদি বোতলটা বেচে দেয়ার আগেই মারা যায় তবে নরকের আগুনে তাকে চিরতরে পুড়ে মরতে হবে।’
‘বাপরে বাপ! কি ভয়ানক কথা,’ চমকে গেল কিউই। ‘আমার ও- জিনিসের দরকার নেই। বাড়ি ছাড়াও চলছে আমার। চলবেও। নরকের আগুনে পুড়ে মরতে চাই না।’
‘উত্তেজিত হয়ো না। একটু ভেবে দেখ,’ শান্ত স্বরে বলল বুড়ো। ‘বুঝে শুনে শয়তানটাকে ব্যবহার করলেই আর চিন্তা নেই। সব পাওয়া হয়ে গেলে বোতলটা বেচে দেবে অন্য কারও কাছে। আমার মত। তারপর পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বসে বসে খাবে আর ঘুমোবে।’
‘কিন্তু দুটো ব্যাপারে খটকা লাগছে,’ বলল কিউই। ‘আপনার মন খারাপের কারণটা বুঝতে পারছি না আমি। আর এত কম দামে বোতল বেচে দিচ্ছেন কেন? আপনার মতলবটা কি শুনি।’
‘মন খারাপের কথা বলছ? দিন যে ফুরিয়ে আসছে, বাবা। নরকের আগুনে কে পুড়ে মরতে চায় বল। বোতলটার আরেকটা বিশেষত্ব আছে। সে-জন্যেই এত কমে ছেড়ে দিতে চাইছি। বহু বছর আগে বোতলটা পৃথিবীতে নিয়ে আসে শয়তানদের রাজা। তখন এটার দাম ছিল আকাশচুম্বী। সবার আগে প্রেস্টার জন কেনেন বোতলটা। কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। কিন্তু সবার তো আর অত টাকা নেই। ফলে পড়ে গেল ওটার দাম। তাছাড়া কম দামে বেচতে না পারলে লাভ নেই। যে দামে কিনেছ সে দামে বেচে দিলে আবার তোমার কাছেই ফিরে আসবে বোতল। পোষা কবুতরের মত। গত কয়েক শতাব্দীতে নামমাত্র দামে এসে ঠেকেছে ওটা। নব্বই ডলার দিয়ে আমি কিনেছি বোতলটা। আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে। খুব বেশি হলে ঊননব্বই ডলার নিরানব্বই সেন্টে বোতলটা বিক্রি করতে পারব আমি। তার একচুল এদিক ওদিক করা চলবে না। তাছাড়া কাউকে ঠকিয়ে বেচে দিলেও কাজ হবে না। তাহলে আবার আমার ঘাড়ে এসে চাপবে ওটা। মোদ্দা কথা, এ বোতল বেচে লাভ করতে গেলেই মরণ। সমান দামও নেয়া চলবে না। কমে বেচতে হবে। এবং ক্রেতাকে সব খুলে বলতে হবে।’
‘বেচে দিলেই পারেন। কে মানা করেছে?’ প্রশ্ন করল কিউই।
‘বেচতে পারলে কি আর বসে থাকতাম? কিন্তু কি করব, কেউ যে আমার কথা বিশ্বাস করতে চায় না। বলে বুড়োর মাথা খারাপ। আমাকে এড়িয়ে চলে সবাই। তুমি নতুন লোক দেখে সাহস করে – ডাকলাম।’
‘আপনি যে সত্যি কথা বলছেন তার প্রমাণ কি?’ জিজ্ঞেস করল কিউই।
‘প্রমাণ এখনই পাবে। তোমাকে দেখে হঠাৎই বুদ্ধিটা এল মাথায়,’ জবাব দিল বুড়ো। ‘পঞ্চাশ ডলার দিয়ে বোতলটা কিনে নাও। শয়তানটাকে হুকুম কর তোমার টাকা ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে। তারপর দেখ। ফেরত পাবেই।’
‘ঠকাচ্ছেন না তো?’ মিন মিন করে প্রশ্ন করল কিউই।
কসম কাটল বুড়ো।
‘ঠিক আছে। বিশ্বাস করলাম,’ কিউই বলল। টাকা দিয়ে দিল বুড়োকে। বুড়ো দিল বোতল।
‘বোতল শয়তান,’ ডাকল কিউই, ‘আমার পঞ্চাশ ডলার ফিরিয়ে দাও।’
কথা ক’টা উচ্চারণ করার সাথে সাথেই আবার ভারী হয়ে উঠল ওর পকেট। এসে গেছে পঞ্চাশ ডলার।
‘নাহ্, সত্যিই দারুণ জিনিস,’ এবার স্বীকার করল কিউই।
‘দেখলে তো? বিশ্বাস হল এবার? নিশ্চিন্তে বোতলটা নিতে পার তুমি,’ বলল বুড়ো।
কিউই-র বিশ্বাস হলেও ভয় কাটেনি। ‘এটা নিয়ে যদি বিপদে পড়ি?’ বলল সে।
‘বেশি লোভ না করলেই হল। বিপদে পড়বে না, আর যদি বিপদে পড়েই যাও তবে আমার কাছে ফিরে এস। আমি বোতলটা আবার কিনে নেব।’
বুড়োর কথা এবার আর অবিশ্বাস করতে পারল না কিউই। বোতলটা টেবিল থেকে তুলে নিল সে।
‘তুমি আমাকে বাঁচালে, বাবা। কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ জানাব-ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।’ কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ল বুড়োর কণ্ঠে
বুড়োর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে এল কিউই। বোতল বগলদাবা করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাবল, ‘বোতলের কথা সব সত্যি হলে জিতেছি বলা যায়। দেখি তো।
প্রথমেই পকেটের টাকাগুলো গুনে দেখল সে। ঠিক যা ছিল তাই রয়েছে। ঊনপঞ্চাশটা আমেরিকান ডলার আর একটা চিলি পিস। বুড়ো মিথ্যে বলেনি তাহলে,’ ভাবল সে।
তবু সন্দেহ পুরোপুরি দূর হচ্ছে না তার। সে ভাবল এবার অন্য কিছু পরীক্ষা করে দেখা যাক। শহরের এ অঞ্চলের রাস্তাগুলো ঝকঝকে তকতকে, পরিষ্কার। তাছাড়া ভরদুপুর বলে লোকজনের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। কিউই বোতলটা রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত পা চালাল। দুবার পিছু ফিরে চাইল সে। নাহ্, যেখানে রেখেছে ঠিক সেখানেই রয়েছে বোতলটা। ‘যাক বাবা, বাঁচা গেল!’ ভাবল সে। শেষবারের মত বোতলটা দেখে নিয়ে মোড় ঘুরল কিউই, কিন্তু বেশিদূর আর যাওয়া হল না তার। কি যেন গুঁতো মারছে কনুইতে। চেয়ে দেখে বোতল বাবাজী হাজির হয়ে গেছে। বোতলের লম্বা গলাটা সেঁটে রয়েছে কনুইয়ের সঙ্গে। আঠার মত। আর গোল পেটটা ঢুকে বসে আছে কোর্টের পকেটে।
‘বুড়োর কথাই ঠিক। বোতল কম দামে না বেচা পর্যন্ত মুক্তি নেই,’ আনমনে বলল সে।
সহজে হাল ছাড়বার পাত্র নয় কিউই। আরও প্রমাণ চাই তার। দোকান থেকে এবার ছিপি খোলার যন্ত্র কিনল ও। তারপর মাঠের নির্জন এক কোণে চলে গেল। যন্ত্রটা দিয়ে বোতলের ছিপি খোলার বহু চেষ্টা করল সে। কিন্তু তার সব পরিশ্রমই পানিতে গেল। ছিপি খুলল না। যেমনকার ঠিক তেমনি রইল।
‘এ আবার কোনদেশী ছিপিরে, বাবা, বলল কিউই। হাত পা কাঁপতে লাগল তার। ঘেমে নেয়ে উঠল সে। বোতলের অদ্ভুত আচরণে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। খানিক বাদে সামলে নিয়ে হাঁটা ধরল।
বন্দরে ফেরার পথে একটা দোকান চোখে পড়ল তার। বিভিন্ন দ্বীপ থেকে সংগৃহীত নানা ধরনের টুকিটাকি জিনিস বিক্রি করছে এক লোক। তাকে দেখে কিউই-র মাথায় নতুন এক বুদ্ধি খেলল। দোকানে ঢুকল সে। দোকানির কাছে একশো ডলারে বেচতে চাইল বোতলটা। লোকটা তো প্রথমে হেসেই খুন। বলল বড় জোর পাঁচ ডলার দিতে পারে সে’।
তবে বোতলটা যে অদ্ভুত তাতে কোন সন্দেহ রইল না লোকটার মনে। এমন কাঁচ কখনও চোখে পড়েনি তার। দুধ সাদা কাঁচের বোতলে অন্য রঙগুলো কি চমৎকার ভাবেই না খেলে বেড়াচ্ছে। ভেতরে আবার ছায়ার মত কি যেন ভাসছে। সব দেখে লোভ সামলাতে পারল না দোকানি। শেষমেশ ষাট ডলারে রফা হল। বোতলটা কিনে নিল সে। জানালার পাশে যে শেলফটা রয়েছে, তার তাকে রেখে দিল ওটা।
‘আবার দেখব বুড়োর কথা সত্যি কিনা,’ ভাবল কিউই। ‘পঞ্চাশ ডলারে বোতল কিনে ষাট ডলারে গছিয়ে দিয়েছি। ভালই লাভ করেছি। তবে বুড়োর কথামত বোতল ফিরে এলে আর কোন সন্দেহ থাকবে না আমার।’
সুতরাং জাহাজে নিজের কেবিনে গিয়ে বসে রইল কিউই। মনে সন্দেহ। বোতলটা হয়ত না-ও ফিরতে পারে। এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ।
হঠাৎ একটা জিনিস বার করার জন্যে সিন্দুক খুলেই দেখতে পেল সেখানে বোতলটা জাঁকিয়ে বসে রয়েছে। আসলে কিউই জাহাজে ফিরে আসার আগেই পৌঁছে গেছে বোতলটা। ‘বুড়ো তো ভাল আপদ গছিয়ে দিয়েছে,’ ভাবল সে। তবে বুড়োর কথা যে সত্যি তাতে কোন সন্দেহ রইল না তার।
লোপাকা নামে কিউই-র এক নাবিক বন্ধু আছে। এ জাহাজেই রয়েছে সে। একসাথেই এসেছে ওরা। এ সময় কিউই-র কেবিনে এল লোপাকা।
ওকে সিন্দুক খুলে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘কি দেখছ অমন করে?’
বোতলটা বার করে লোপাকাকে দেখাল কিউই। খুলে বলল সব ঘটনা। বোতলের ক্ষমতার কথাও বাদ দিল না।
‘বড় অদ্ভুত কথা শোনালে,’ সবশুনে বলল লোপাকা।
‘আমার ভয়, করছে,’ বলল কিউই। ‘তখন বুড়োর কথায় গলে গিয়ে কিনে ফেলেছিলাম। এখন এটা নিয়ে কি করি বল তো।’
‘অত চিন্তা করছ কেন! বুড়ো তো বোতল ফেরত নেবে বলেছেই। ওর কাছে আবার বেচে দিয়ে এস গে, পরামর্শ দিল লোপাকা।
‘না, বুড়ো মানুষটাকে আর বিপদে ফেলতে চাই না। বেচারা আজ আছে কাল নেই। ঈশ্বর না করুন বোতল বেচার আগে পটল তুললে চিরতরে ওকে আগুনে পুড়ে মরতে হবে। তারচেয়ে বরং আমিই রেখে দিই। বেচে দেব কারও কাছে,’ কিউই বলল।
‘আমার কাছে বেচতে পার,’ লোপাকা বলল, ‘তবে তার আগে প্রমাণ চাই। শয়তানটা তার ক্ষমতা দেখাতে পারলে বোতলটা আমিই কিনব। জানই তো একটা স্কুনার কেনার ইচ্ছে আছে আমার। বহুদিনের শখ। ওটা ‘নিয়ে বেরিয়ে পড়ব আমি। দ্বীপ-দ্বীপান্তরে ঘুরে বেড়াব। ব্যবসা করব।’
‘আমার চিন্তা ভাবনা আবার অন্যরকম,’ কিউই বলল। ‘কোনা উপকূলে চমৎকার একটা বাগান বাড়ি চাই আমার। যার প্রতিটা ঘরে খেলা করবে রোদ। বাগানে ফুটে থাকবে রঙিন সব ফুল। জানালায় লাগানো থাকবে দামি কাঁচ। দেয়ালে দেয়ালে ছবি ঝুলবে। মেঝেতে পাতা থাকবে পুরু কার্পেট। তিনতলা হবে বাড়িটা। রাজ প্রাসাদের মত ব্যালকনিতে রোজ বিকেলে বসে থাকব। কোন চিন্তা থাকবে না আমার। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটাতে পারব ও বাড়িতে। সে সঙ্গে প্রচুর টাকা থাকলে তো কথা-ই নেই।’
কিউই-র কথা শুনে বুদ্ধি বাতলে দিল লোপাকা। বলল, ‘চল, হাওয়াই-এ ফিরে যাই। বোতলটা নিয়ে যাব সাথে করে। তোমার কথা সত্যি হলে ওটা কিনে নেব আমি। স্কুনার চাইর শয়তানটার কাছে।
দু’জনে হাওয়াই ফিরে যেতে মনস্থ করল। পরদিন জাহাজে চেপে রওনা দিল ওরা। চলছে তো চলছেই। পথ যেন আর ফুরায় না। শেষমেশ বোতলসহ ফিরে এল হনলুলুতে। জাহাজ বন্দরে ভেড়ার সাথে সাথেই এক পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল ওদের।
‘তোমার জন্যে একটা সুখবর আছে,’ হাসিমুখে কিউইকে বলল বন্ধুটি।
‘কি সুখবর? শিগগির বল,’ ব্যস্ত হয়ে বলল কিউই।
‘তুমি শোননি? তোমার চাচা উইল করেছেন। কোনা উপকূলে তাঁর যে জমি রয়েছে সমস্তই পাবে তুমি। তাঁর জীবদ্দশাতেই,’ বলল সে।
‘বল কি! তবে তো এক্ষুণি চাচার সঙ্গে দেখা করতে হয়,’ কিউই আনন্দে আটখানা।
‘সেজন্যে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে তোমাকে। তোমার চাচা দেশভ্রমণে বেরিয়েছেন। শেষ বয়সটা ঘুরে ফিরেই কাটাতে চান তিনি। চমকে দেবেন বলে তোমাকে কিছুই জানাননি। এই তো, দিন দশেক হল রওনা দিয়েছেন।
‘এখন তবে বাড়ি বানানো বাকি রইল,’ লোপাকা বলল।
‘হ্যাঁ, কিন্তু টাকা পাব কোথায়?’ উদ্বিগ্ন মুখে বলল কিউই।
‘তুমি তোমার চাচার উকিলের সঙ্গে দেখা কর গিয়ে। তিনি হয়ত উপায় বাতলে দিতে পারবেন,’ বলল বন্ধুটি।
‘ঠিক বলেছ,’ সায় দিল কিউই আর লোপাকা। উকিলের কাছে গেল ওরা দু’জন। উকিল জানালেন কিউই-র চাচা ওর জন্যে ব্যাংকে বেশ কিছু টাকা রেখেছেন। তাঁর ইচ্ছে কিউই যেন কোনা উপকূলে চমৎকার একটা বাড়ি বানায়।
একথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল ওরা। চাচা-ভাইপোর ইচ্ছের কি অদ্ভুত মিল।
‘বাড়ি বানাবার টাকা তো পেয়েই গেলে,’ উত্তেজিত হয়ে বলল লোপাকা।
‘বাড়ি বানাবার কথা ভাবছেন আপনারা?’ জিজ্ঞেস করলেন উকিল। ‘ভাল একজন আর্কিটেক্টের কার্ড আছে আমার কাছে। দারুণ সুনাম তাঁর।’
‘তাহলে তো কথাই নেই,’ বলল লোপাকা। ‘সব কিছু হয়ে যাচ্ছে পানির মত। চল, আর্কিটেক্টের সঙ্গে দেখা করি আমরা।’
ব্যাংকে একবার ঢুঁ মেরে ওরা দু’জনে গেল আর্কিটেক্টের কাছে। গিয়ে দেখে টেবিলের ওপর বিভিন্ন ধরনের বাড়ির নকশা বিছিয়ে বসে রয়েছেন তিনি।
ভদ্রলোক সব শুনে বললেন, ‘নতুনত্ব চান? দেখুন এটা পছন্দ হয় কিনা।’ কিউই-র হাতে একটা নকশা তুলে দিলেন তিনি।
নকশাটা চোখের সামনে মেলে ধরেই চিৎকার করে উঠল কিউই। এ যে তার কল্পনার সেই নকশা, ঠিক এভাবেই বানাবে বাড়িটা, ভেবে রেখেছে সে।
‘এই নকশাটা নেব আমি। এটা দেখেই বাড়ি বানাব। মনের মত একটা বাড়ি পেলে আর কিছু চাই না আমার,’ ভাবল সে।
কিউই আর্কিটেক্টকে তার মনের সব ইচ্ছেগুলো জানিয়ে দিল দরজা-জানালা কেমন হবে, বাগানটা কোথায় থাকবে, ছবিগুলো কোন ঘরে টাঙাতে হবে সবই জানাল। অবশেষে আর্কিটেক্টকে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করে বসল সে, ‘বাড়িটা বানাতে মোটমাট কত পড়বে?’ ব্যাংকে ওর কত টাকা আছে জানাল কিউই।
আর্কিটেক্ট ওকে নানা প্রশ্ন করলেন। বহু হিসেব নিকেষ কষে যা জানালেন তার দশভাগের এক ভাগও নেই ব্যাংকে।
কিউই হতাশ ভঙ্গিতে চাইল লোপাকার দিকে। কিউই-র চোয়াল ঝুলে পড়েছে। ‘ভেব না। টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে,’ কিউইকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল লোপাকা। কিউই ভেবে পেল না লোপাকা এত নিশ্চিত হচ্ছে কি করে।
আর্কিটেক্টের কাছ থেকে বিদায় নিল ওরা। লোপাকা তাঁকে বলল, ‘শিগগিরই আবার আসছি আমরা। আপনি কাজ শুরু করুন।
বাইরে বেরিয়ে লোপাকা বলল, ‘তুমি এত ভেঙে পড়ছ কেন? বোতলটার কথা ভুলে গেছ? একবার চেয়েই দেখ না, টাকা হয়ত শয়তানটাই জোগাবে।
‘তাই তো, বোতলের কথাটা তো মনেই আসেনি,’ উত্তেজিত হয়ে উঠল কিউই।
দু’জনে বাড়ি না ফিরে চলে এল নির্জন এক রাস্তায়। তারপর কোটের পকেট থেকে বোতলটা বার করল কিউই। আস্তে করে ডাকল, ‘বোতল শয়তান, আমার টাকা চাই। অনেক টাকা। যে টাকা প্রাসাদের মত একটা বাড়ি বানাবার পরও ফুরোবে না। ‘
মুহূর্তেই কিউই-র কোট-প্যান্টের পকেটগুলো অসম্ভব ভারী হয়ে উঠল। টাকা। তারপর রাস্তার ওপরই পড়তে লাগল টাকার বাণ্ডিল। লোপাকা আর কিউই দু’জন মিলে কুড়োতে কুড়োতে হাঁপিয়ে উঠল একসময় থেমে গেল টাকার বৃষ্টি। ওরা বুঝল এসে গেছে প্রয়োজনীয় টাকা।
দু’জনে তক্ষুণি আবার ফিরে এল আর্কিটেক্টের কাছে। তাঁর সঙ্গে চুক্তি করল কিউই। বাড়ির সব খরচ মিটিয়ে দিল। তারপরও প্রচুর টাকা রয়ে গেল তার কাছে। এক সঙ্গে এত টাকা দেখে আর্কিটেক্টের তো চক্ষু চড়কগাছ। এত অল্প সময়ে এত টাকা কোত্থেকে এল ভেবে পেলেন না তিনি। জিজ্ঞেস করতে যাওয়াটাও অভদ্রতা। ফলে কৌতূহল মনে চেপেই রইলেন।
ক’দিন পর লোপাকা আর কিউই আবার বেরিয়ে পড়ল সমুদ্র- যাত্রায়। এবারের গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া। ওরা ঠিক করল বাড়িটা বানানোর ব্যাপারে দু’জনের কেউই মাথা ঘামাবে না। আর্কিটেক্ট আর বোতল শয়তান নিজেদের ইচ্ছেমতই বানাক বাড়িটা। ওদের ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে এদের দু’জনের।
