বোতল শয়তান – ২
বেশ কিছুদিন বাদে ওরা ফিরে এল অস্ট্রেলিয়া থেকে। এসে দেখে কোনা উপকূলে চমৎকার এক প্রাসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের বুঝতে বাকি রইল না বাড়িটা কার। ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়িটা দেখল ওরা। কিউই যা যা চেয়েছিল সবই রয়েছে বাড়িটায়। যথাস্থানে।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বানানো হয়েছে বাড়িটা। জাহাজ থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। তিনতলা বাড়ি, বিশাল সব ঘর। ব্যালকনি রয়েছে। সামনে ফুলের বাগান। ফল বাগানও রয়েছে। জানালায় স্বচ্ছ কাঁচ। কারুকাজ করা আসবাবপত্র বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে ঘরগুলোর সৌন্দর্য। বিভিন্ন ধরনের ছবি ঝুলে রয়েছে দেয়ালে। ওগুলোর ফ্রেম সোনার তৈরি। ব্যালকনিগুলো এত বড় যেন একেকটা আস্ত শহর এঁটে যাবে ওগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যে। কিউই ভেবে পেল না কোন দিকটা বেশি সুন্দর। সামনেটা নাকি পেছনটা।
বাড়ি দেখা শেষ হলে বারান্দায় গিয়ে বসল ওরা।
‘তোমার মনের মত হয়েছে?’ প্রশ্ন করল লোপাকা।
‘আমি মনে মনে যা চেয়েছিলাম বাড়িটা তারচেয়ে অনেক বেশি সুন্দর।’
‘তোমার ইচ্ছে তো পূরণ হল। এবার আমার একটা কথা রাখবে?’ বলল লোপাকা।
‘অবশ্যই রাখব,’ বলে বসল কিউই।
‘আমি শয়তানটাকে নিজের চোখে একবার দেখতে চাই। তুমি ওকে দেখা দিতেঁ বল।’
‘অসম্ভব। আমি ওর কাছে আর কিছু চাইব না। আমার বিপদ হবে।’
‘তুমি তো কোন সুযোগ সুবিধা চাইছ না। কেবল একবার দেখে কৌতূহল মেটাবে, ব্যস। ওকে হুকুম কর।’
কিউই তবু দ্বিধা করতে লাগল।
শেষ পর্যন্ত লোপাকার অনুরোধ ফেলতে পারল না সে। ‘আসলে আমার নিজেরও প্রচণ্ড কৌতূহল রয়েছে। দেখি মেটে কিনা।’ তারপর ডাকল, ‘বোতল শয়তান, দেখা দাও একবার।’
কথাটা শোনামাত্রই বোতলের বাইরে বেরিয়ে এল একটা মাথা ঢুকে গেল তক্ষুণি আবার। অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে!
কিউই আর লোপাকাঁ বসে রইল মূর্তির মত। ঘটনার আকস্মিকতায় যেন বোবা হয়ে গেছে ওরা। রাত গভীর হতে হুঁশ ফিরল ওদের।
‘বোতলটা আমার চাই। এই শয়তানই পারবে আমার ইচ্ছে পূরণ করতে। একটা স্কুনার পেয়ে গেলেই বেচে দেব ওটা। যত দ্রুত সম্ভব। সত্যি কথা বলতে লজ্জা নেই, শয়তানটা বড্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছে আমাকে, বলল লোপাকা।
বোতল বেচার জন্যে কিউই তখন এক পায়ে খাড়া। কিম্ভূত জিনিসটা প্রচণ্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছে তাকেও। ফলে লোপাকার কাছে তক্ষুণি বোতল বেচে দিল সে।
‘লোপাকা,’ টাকা বুঝে পেয়ে বলল কিউই, ‘কিছু মনে কোরো না, ভাই। তোমাকে যে এখন চলে যেতে হবে। এত রাতে তোমাকে একা ছাড়া ঠিক নয় বুঝতে পারছি। কিন্তু কি করব বল। শয়তানটাকে দেখার পর থেকে আর কিছু ভাল লাগছে না আমার। ওটা দূর হয়ে গেলে তবে স্বস্তি পাব আমি। তোমাকে একটা লণ্ঠন দিচ্ছি। বোতলটা রাখার জন্যে ঝুড়িও দেব। তুমি বোতল নিয়ে শিগগির চলে যাও, ভাই। রাতটা অন্য কোথাও কাটিয়ে দিয়ো।’
‘কিউই,’ লোপাকা বলল, ‘আর কেউ হলে তোমার ব্যবহারে দুঃখ পেত। বোতল কিনে নিয়ে তোমাকে বাঁচালাম আমি। আর তুমি কিনা এই রাত দুপুরে আমাকে তাড়িয়ে দিতে চাইছ! শয়তানের বোতল নিয়ে গোরস্থানের পাশ দিয়ে যেতে হবে। বাবারে! তোমাকে আমি দোষ দিচ্ছি না। কারণ ভয় আমিও পেয়েছি। ঠিক আছে, চলি।’
তুমি আমার ওপর রাগ কোরো না, ভাই। আমাকে মাফ করে দিয়ো,’ কিউই অনুনয় করল।
‘না না, রাগ আমি করিনি। তোমার জায়গায় হলে আমিও হয়ত একই কাজ করতাম। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তুমি সুখে থাক, আর আমার ইচ্ছে যেন পূরণ হয়। মৃত্যুর পর যেন স্বর্গে আমাদের দেখা হয়, বন্ধু। বোতল শয়তান যেন তাতে বাদ সাধতে না পারে।’
লোপাকা বেরিয়ে গেল বাইরে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল কিউই। লণ্ঠন হাতে রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে লোপাকা। এখন ঠিক গোরস্থানের সামনে দিয়ে যাচ্ছে সে। বন্ধুর জন্যে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল কিউই। সারা শরীর কাঁপছে তার। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাল বোতল শয়তানের কবল থেকে তাকে মুক্ত করার জন্যে। গোরস্থানটা পেরিয়ে গেল লোপাকা। মোড় ঘুরল। মিলিয়ে গেল লণ্ঠনের আলো। ঘরে ফিরে এল কিউই।
পরদিন ঝলমলে রোদ উঠল। বাড়িটার শোভা বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। চেয়ে চেয়ে কেবল অবাক হতে লাগল কিউই। ভয়-ডর সব কোথায় পালিয়ে গেল তার। মনের সুখে ও বাড়িতে দিন কাটাতে লাগল সে। পেছন দিকটাতে থাকে ও। ওখানেই খায়, ঘুমোয়, কাগজ পড়ে। কেউ এলে ঘরে নিয়ে যায় সে। সব ঘুরিয়ে দেখায়।
সবার মুখে এখন কিউই-র বাড়ির নাম। একজন চীনা কাজের লোক রেখে দিয়েছে সে। পুরো বাড়িটা ঝেড়ে মুছে ঝকঝকে তকতকে করে রাখাই তার কাজ।
এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। তারপর একদিন কিউই কাউলুয়া-তে বেড়াতে গেল। তার বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব রয়েছে ওখানে। থাকল সেরাতটা। পরদিন সকালে উঠেই বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিল সে। বাড়ির জন্যে তার মন কেমন করছে। ফলে ঘোড়ায় চেপে বসল ও। ফিরে চলল বাড়ির পথে। তখন সবে বিকেল হয়েছে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দেখে এক সুন্দরী তরুণী সমুদ্রে গোসল করছে। মেয়েটিকে দেখামাত্রই ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল কিউই।
‘তুমি কে?’ প্রশ্ন করল সে, ‘তোমাকে তো চিনলাম না!’
‘আমি ককুয়া। আমার বাবার নাম কিয়ানো,’ বলল মেয়েটি। ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইল, ‘আপনি কে?’
‘বলছি,’ কিউই বলল। লাফিয়ে নামল ঘোড়া থেকে। ‘একটু অপেক্ষা কর। তার আগে আমার একটা প্রশ্নের জবাব দাও দেখি। তুমি ‘ কি বিবাহিতা?’
ওর কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠল ককুয়া। ‘প্রশ্নটা তো আমারও,’ বলল সে। ‘আপনি নিজে বিয়ে করেছেন?’
‘না, ককুয়া, জবাব দিল কিউই। ‘সত্যি কথা বলতে কি তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত ও নিয়ে ভাবিনি আমি। তোমার চেয়ে সুন্দরী মেয়ে কখনও চোখে পড়েনি আমার। আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি, ককুয়া। তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তোমার আপত্তি থাকলে বলে দাও, আমি চলে যাচ্ছি। আর রাজি থাকলে বল, কাল তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলব আমি।’
কোন কথা বলল না ককুয়া। কেবল সাগরের পানে চেয়ে মুচকি হাসল।
‘ককুয়া,’ কিউই বলল, ‘মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। আমি কি তবে ধরে নেব তুমি রাজি? তবে চল তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করি গিয়ে। ‘এক্ষুণি।’
কিউইকে ফেলে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল ককুয়া। মুখে রা নেই। বার কয়েক পেছন ফিরে তাকাল কেবল। আবার সরিয়ে নিল দৃষ্টি। দ্রুত। কি আর করা। বাধ্য হয়ে ওকে অনুসরণ করল কিউই।
এভাবেই ককুয়াদের বাড়িতে পৌঁছে গেল ওরা। কিউইকে আসতে দেখে কিয়ানো বেরিয়ে এলেন বারান্দায়। সাদরে ডেকে নিয়ে গেলেন ভেতরে। কিউইকে ভালমতই চেনেন তিনি। ওর বাবা খাতির করছেন দেখে মেয়েটি চাইল কিউই-র দিকে। বুঝল এই সেই লোক। যার চমৎকার একটা বাড়ি রয়েছে কোনা উপকূলে। ও বাড়িটার যে কত প্রশংসা শুনেছে তার ইয়ত্তা নেই।
সেদিন সন্ধেটা চমৎকার কাটল ওদের। ককুয়ার মা-ও এসে জুটলেন ওদের সঙ্গে। চারজনে চুটিয়ে আড্ডা মারল। বাবা-মার সামনে খুব একটা কথা হল না ওদের দু’জনার। তবে যেটুকু হল তাতেই আরও বেশি মুগ্ধ হল কিউই। মেয়েটি চালাক-চতুর, কোন সন্দেহ নেই।
পরদিন আবার ককুয়াদের বাড়িতে গেল কিউই। ওর বাবার সঙ্গে গল্প করল খানিক। তিনি আজ আর বাদ সাধলেন না। ফলে ককুয়ার সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগ পেল কিউই।
‘ককুয়া,’ বলল সে, ‘তুমি চাইলে এখনও আমাকে ফিরিয়ে দিতে পার। আমি কিছু মনে করব না। মনের দুঃখ মনে চেপেই রইব। কাল সাগর পারে তোমাকে আমার পরিচয় দিইনি কারণ আমি বুঝতে চেয়েছিলাম তুমি আমাকে চাও নাকি আমার বাড়ি। এখন তো তুমি সবই জেনে ফেলেছ। আমাকে ফিরিয়ে দেবে?’
‘না,’ গম্ভীর মুখে বলল ককুয়া।
আর কোন প্রশ্ন করার সাহস পেল না কিউই।
ককুয়ার সম্মতি পেয়ে গেল সে। সবকিছু বড় দ্রুত ঘটে গেল।
