বোতল শয়তান – ৩
‘ওদিকে ককুয়ার মাথায় এখন কেবল একটি চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে। সুখী হতে হবে। কিউইকেও সুখী করতে হবে। সমুদ্র তীরে প্রথম দর্শনেই ভাল লেগে গিয়েছিল যুবকটিকে। তখন থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারেনি ওর কথা। এত অল্প সময়ে ওকে এত বেশি ভালবেসে ফেলেছে ককুয়া যে প্রয়োজন পড়লে বাবা-মা, সবাইকে ছেড়ে ওর কাছে চলে যাবে সে। কিন্তু ভাব ভঙ্গিতে এসবের কিছুই সে বুঝতে দেয়নি কিউইকে।
ঘোড়ায় চেপে বাড়ি ফিরে চলল কিউই। সে কী আনন্দ তার। খুশিতে ভরে গেছে মন। সারাটা পথই গান গেয়ে পেরোল সে। বাড়ি যখন ফিরে এল তখনও গান থামেনি। ব্যালকনিতে বসে পেট পুরে খেল কিউই। ওর চীনা কাজের লোকটি ওর ফূর্তির কারণ বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। মালিকের আজ এত কিসের আনন্দ মাথায় আসছে না তার।
সূর্য ডুবে গেল সমুদ্রে। আঁধার নেমে এল। কিউই-র ব্যালকনিতে জ্বলে উঠল প্রদীপ। কিউই ওখানে পায়চারি করল আর গলা ছেড়ে গান গাইল। ওর গান শুনে জাহাজের নাবিকরা পর্যন্ত অবাক বনল। ওরা বলাবলি করল, বড় মিষ্টি গলা লোকটির।
‘পানি গরম কর। গোসল করব,’ কাজের লোকটিকে বলল কিউই।
লোকটি যখন পানি গরম করার জন্যে নিচে নেমে এল তখনও গান গেয়ে চলেছে কিউই। পানি গরম হলে সে মনিবকে ডেকে আনল। বাথরূমে ঢুকে বাথটাবে পানি ভরার সময়ও কিউইকে গান গাইতে শুনল সে।
কিন্তু তার খানিক বাদেই হঠাৎ থেমে গেল গান। বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে চুপ করে অপেক্ষা করল কাজের লোকটি। তারপর চিৎকার করে জানতে চাইল মনিবের কোন অসুবিধে হচ্ছে কিনা।
ভেতর থেকে জবাব এল, ‘সব ঠিক আছে। তুমি যাও।’
কিন্তু আসলে ঠিক নেই। ফলে গান থেমে গেছে ও বাড়িতে। আসল ঘটনা হচ্ছে, গোসল করার জন্যে কাপড় খুলতেই কিউই দেখে তার শরীরে সাদা একটা দাগ। ঠিক যেন ছাতা পড়া ছোট একটা পাথর। আর বুঝতে বাকি রইল না কিউইর, কুষ্ঠ হয়েছে তার।
এই রোগ হওয়া যে-কারও জন্যেই চরম দুর্ভাগ্য। আর যে প্রেমে পড়েছে, শীঘ্রিই বিয়ে করতে যাচ্ছে তার জন্যে তো কথাই নেই। তার মানে প্রেমিকা, এত সুন্দর বাড়ি, বন্ধু-বান্ধব সব ছেড়ে চলে যেতে হবে মলোকাইতে। কুষ্ঠরোগীদের আশ্রমে। কিউই-র মনের সব ইচ্ছেগুলো কাঁচের মত ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
খানিকক্ষণ বাথটাবে চুপ করে বসে রইল কিউই। ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গিয়েছিল সে। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এল বাইরে। নিজেকে প্রশ্ন করল: ‘আমি কি দোষ করেছি যে ঈশ্বর আমাকে এতবড় শাস্তি দিলেন? কেনইবা ককুয়ার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিলেন তিনি। আমি আর কোনদিন বিয়ে করতে পারব না। কোন্ মুখে ওর কাছে যাব আমি? ওর সুন্দর হাতে কখনও হাত রাখতে পারব না। এ দুঃখ আমি রাখি কোথায়?’
সারাটা রাত ব্যালকনিতে হেঁটে বেড়াল কিউই। ঘুম পালিয়েছে চোখ থেকে।
ককুয়াকে বিয়ে করে সারা জীবন সুখে স্বচ্ছন্দে কাটানর কথা ভেবেছিল কিউই। এমন কঠিন অসুখ হবে স্বপ্নেও কি ভাবতে পেরেছিল সে? এখন অন্য কেউ হয়ত বিয়ে করবে ককুয়াকে। কিন্তু সে কি কিউই-র মত ভালবাসবে তাকে? কিউই যে ওকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু এখন আর উপায় কি? ককুয়ার কোন ক্ষতি করতে পারবে না সে। ওকে কিছুতেই বিপদে ফেলতে পারবে না।
রাতে বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগল কিউই। ঘুম আসছে না কিছুতেই। কেটে যাচ্ছে সময়। মাঝরাতের পর বোতলটার কথা হঠাৎ মনে পড়ল ওর। পেছনের বারান্দায় চলে এল সে। ভাবল সেদিনের কথা যেদিন বোতল থেকে উঁকি মেরেছিল শয়তানটা। ভাবনাটা মাথায় আসতেই রক্ত হিম হয়ে গেল ওর।
‘বোতলটা ভয়ঙ্কর,’ ভাবল কিউই, ‘আরও ভয়ঙ্কর, ভেতরের শয়তানটা। কিন্তু রোগমুক্ত হবার আর ককুয়াকে বিয়ে করার অন্য কোন উপায় তো দেখছি না। বোতলটাই এখন একমাত্র ভরসা। ককুয়াকে পাওয়ার জন্যে দরকার হলে আবার শয়তানের খপ্পরে যাব।
পরদিন জাহাজে চাপবে ঠিক করল সে। হনলুলু যাবে। লোপাকাকে খুঁজে বার করতেই হবে। ফিরে পেতে হবে বোতলটা। এছাড়া আর যে কোন উপায় নেই। একদিন যেটা দূর করে দেয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সেটাই এখন আকুলভাবে ফিরে পেতে চাইছে কিউই।
সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারল না সে। কিয়ানোকে চিঠি লিখল। জানাল ক’দিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছে। পরদিন বন্দরে এল সে। জাহাজে চাপবে, অন্যান্য লোকেরাও এসে জড়ো হয়েছে এখানে। হনলুলু যাবে সবাই।
একটা দোকানের সামনে ছাউনির নিচে বসে গল্প-গুজব করছে লোকগুলো। ওদের মাঝখানে মনমরা হয়ে বসে রইল কিউই। আগ্রহ বোধ করছে না কোন কিছুতেই। এসময় হঠাৎ বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। ভিজিয়ে দিচ্ছে সব বাড়ি-ঘর। সমুদ্রের ফেনা সজোরে বাড়ি খাচ্ছে পাথরে। সেদিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল কিউই। এই সাগরের পারেই দেখা হয়েছিল কুয়ার সঙ্গে! ‘দেখা না হওয়াই ভাল ছিল,’ ভাবল সে।
‘কিউই-র মন ভাল নেই,’ বলল একজন। তার কথায় মাথা নাড়ল অন্যেরা। ওদের কথা যেন কানেই যাচ্ছে না ওর। বসে রইল চুপচাপ।
এসময় জাহাজ এল। সবাই গিয়ে উঠল ডেকে। একা এক কোণে গিয়ে চুপটি করে বসে রইল কিউই। তার চোখ চলে গেল ককুয়াদের বাড়ির দিকে। সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাড়িটা। লম্বা পাম গাছগুলো চোখে পড়ছে। ‘তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, ককুয়া,’ সেদিকে চেয়ে থেকে বলল কিউই।
এভাবে সন্ধে নেমে এল। জ্বলে উঠল কেবিনগুলোর বাতি। যাত্রীরা সব গোল হয়ে কয়েকটা জটলা পাকিয়ে তাস খেলতে বসল। প্রায় প্রত্যেকের হাতেই মদের গেলাস। সারা রাতই তাস খেলল ওরা। আর ওদিকে কিউই একাকী পায়চারি করল ডেকে। সারা রাত।
পরদিন সন্ধে বেলা জাহাজ ভিড়ল হনলুলু বন্দরে। জাহাজ থেকে নেমেই কিউই লোপাকার খোঁজ করতে লাগল। একে ওকে জিজ্ঞেস করল, লোপাকাকে তারা কেউ দেখেছে কিনা।
লোকজনের মুখে জানতে পারল লোপাকা স্কনার কিনেছে। ওটা নিয়ে চলে গেছে সমুদ্র অভিযানে। সুতরাং লোপাকার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হল না। মনটা ভেঙে গেল ওর। মাথায় একটাই চিন্তা, ককুয়াকে বোধহয় আর পাওয়া হল না।
কিউই-র হঠাৎ এক উকিলের কথা মনে পড়ল (নাম গোপন রাখছি)। লোপাকার বন্ধু। এ শহরেই থাকেন। তাঁর খোঁজ করতে লোকে জানাল তিনি ইদানীং প্রচুর টাকা কামিয়েছেন। একেবারে আঙুল ফুলে কলাগাছ। প্রাসাদোপম এক বাড়ি বানিয়েছেন। কথাটা শুনে আশান্বিত হয়ে উঠল কিউই। ঠিকানা নিয়ে সেই উকিলের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হল সে। তার অনুমান হয়ত সঠিক হতে পারে।
বাড়িটা সবে তৈরি হয়েছে বোঝা যায়। বাগানের গাছগুলো এখনও ছোট-ছোট।
উকিলের সঙ্গে দেখা করতে তিনি বললেন, ‘আমি কি করতে পারি বলুন।’
‘আমি লোপাকার বন্ধু। ও আমার কাছ থেকে একটা জিনিস কিনেছে। ওটা এখন খুব প্রয়োজন আমার। আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন এ ব্যাপারে?’
উকিলের মুখ সহসা গম্ভীর হয়ে গেল। ‘বুঝতে পারছি আপনি কিসের কথা বলছেন। বোতলটা আমি বেচে দিয়েছি।’
কিউই-র মাথায় হাত উঠে এল। কত আশা নিয়েই না এসেছিল সে। উকিল ওর অবস্থা দেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘চিন্তার কিছু নেই। যার কাছে বেচেছি সে কাছেই থাকে। আমি তার নাম-ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি।’
উকিলকে ধন্যবাদ জানাল কিউই। ঠিকানা নিয়ে চলল সেই লোকের বাড়িতে। গিয়ে শুনল বোতল বেচে দিয়েছে সে-ও। সে যেতে বলল আরেক জায়গায়। এভাবে দিনের পর দিন ঘুরতে লাগল কিউই। তবে যেখানেই যায় সেখানেই চোখে পড়ে প্রাচুর্যের চিহ্ন। সবার নতুন বাড়ি, নতুন ঘোড়ার গাড়ি, পোশাকের চাকচিক্য। সব দেখে কিউই বুঝতে পারল তার অনুসন্ধান ব্যর্থ হবে না।
কিউই ভাবল যারা সুখে আছে, যাদের মুখে হাসি তাদের কাছে গিয়ে লাভ নেই। তারা বোতল শয়তানের কাছ থেকে সব সুযোগ সুবিধা আদায় করে নিয়ে বোতল বেচে দিয়েছে। মুক্তি পেয়েছে। তবে যার মুখে হাসি নেই, সেই বুড়োটার মত মন খারাপ করে বসে রয়েছে সেরকম কারও কাছেই পাওয়া যাবে জিনিসটা।
শেষ পর্যন্ত ঠিকানা নিয়ে বারিতানিয়া স্ট্রীটে এক বাড়িতে গেল সে। এ বাড়িটাও যথারীতি নতুন। ঘরে ঘরে জ্বলছে বৈদ্যুতিক আলো। কিন্তু বাড়ির মালিককে দেখামাত্রই কিউই বুঝতে পারল আসল জায়গায় এসে গেছে সে। ভেতর ভেতর খুশিতে নাচতে লাগল ও। অবশ্য লোকটিকে দেখে ভয়ও পেল। লোকটির বয়স বেশি নয় তবে মড়ার মত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে তাকে। মনে হচ্ছে সর্বদা মৃত্যু চিন্তায় কাতর। চোখের দৃষ্টিতে আতঙ্কের ছাপ। যেন ভয়ঙ্কর কোন কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছে।
‘আর ঘুরতে হবে না,’ মনে মনে বলল কিউই। তারপর লুকোছাপা না করে বলে ফেলল, ‘আমি বোতলটা কিনতে এসেছি।’
কথাটা যেন বিশ্বাসই হয়নি লোকটির। অবাক হয়ে চেয়ে রইল ওর দিকে।
‘বোতল!’ কোনমতে বলতে পারল লোকটি, ‘বোতল কিনতে এসেছেন?’ বুকে জড়িয়ে ধরল সে কিউইকে। খানিক বাদে হাত ধরে টেনে ঘরে নিয়ে গেল। পট থেকে দুটো কাপে কফি ঢালল। একটা এগিয়ে দিল কিউই-র দিকে।
‘ধন্যবাদ,’ বলল কিউই। ‘বোতলটা কিনব আমি। ওটার দাম কত এখন?’ প্রশ্নটা শোনামাত্রই লোকটির হাত থেকে কফির কাপটা মেঝেতে পড়ে গেল। তবে ভ্রূক্ষেপ করল না সে। অপ্রকৃতিস্থের মত চেয়ে রইল কিউই-র দিকে।
‘দাম!’ বলল সে, ‘দাম জানা নেই আপনার?’
‘না। সেটাই জানতে চাইছি,’ জবাব দিল কিউই। ‘আপনি এমন করছেন কেন? দামের ব্যাপারে কোন গোলমাল আছে?’
‘ওটার আর দাম নেই, মিস্টার কিউই,’ বলল লোকটি।
‘আমার কাছে আছে। ওটা চাই আমার। দামটা বলুন দয়া করে। আমি তারচেয়ে কমে কিনে নেব।’
‘আমি ওটা দু’সেন্ট দিয়ে কিনেছি,’ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকটি।
‘কি বললেন?’ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল কিউই। ‘দু’সেন্ট? তারমানে এক সেন্টে কিনতে হবে আমাকে। আর কিনলে—’ কথা শেষ করতে পারল না কিউই। চোখে সর্ষে ফুল দেখতে লাগল। এক সেন্টের চেয়ে কম দামি মুদ্রা আর নেই। ফলে এখন যে বোতলটা কিনবে সে আর বেচতে পারবে না। চিরতরে নরকের আগুনে পুড়ে মরতে হবে তাকে।
হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে কিউই-র পা জড়িয়ে ধরল লোকটি। ‘ঈশ্বরের দোহাই, বোতলটা কিনুন,’ প্রায় কেঁদে ফেলল সে। ‘আমার যা আছে সব নিন আপনি। আমাকে বাঁচান। বাধ্য হয়ে বোতলটা কিনেছিলাম আমি। নইলে দেনার দায়ে জেলে যেতাম। এখন মনে হচ্ছে সেই-ই ভাল ছিল।’
‘আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি,’ কিউই বলল। ‘আপনি ভাববেন না, বোতলটা আমি নেব। এছাড়া আমারও আর কোন উপায় নেই।’
এক সেন্ট দিয়ে বোতলটা কিনে নিল কিউই। ওটা হাতে পেয়েই ফিসফিসিয়ে হুকুম করল, ‘বোতল শয়তান, আমার কুষ্ঠ সারিয়ে দাও।’ যেই না বলা অমনি শরীরে অদ্ভুত এক অনুভূতি হল তার। কিউই বুঝল কাজ হয়ে গেছে।
ওখানে আর দাঁড়াল না সে। বোতল বিক্রেতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে চলল হোটেলে। ঘরে ফিরে প্রথমেই কাপড় খুলে ফেলল সে। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়াল। শরীরের কোথাও কোন দাগ চোখে পড়ল না তার। খুশি হয়ে উঠল কিউই। তবে খুশির ভাবটা রইল না বেশিক্ষণ। মাথায় কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে একটিমাত্র চিন্তা। কারও কাছে বোতল বেচতে পারবে না সে, পুড়ে মরতে হবে নরকের আগুনে। শিউরে উঠল কিউই।
অনেকক্ষণ বাদে খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে এল সে। কিন্তু ঘরে একা বসে থাকতে ভাল লাগছে না। কেমন ভয় ভয় করছে। নিচে হোটেলের বলরূমে নাচ-গান হচ্ছে। ওখানে চলে গেল সে। সমবেত লোকজনকে ফূর্তি করতে দেখে মন অনেকখানি হালকা হল। সে রাতটা বেশ ভালই কাটল ওর।
পরদিন প্রথম জাহাজটাতেই চেপে বসল কিউই। ফিরেই দেখা করল কিয়ানো আর তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। দু’জনের সম্মতিতে ক’দিন পর বিয়ে করল ককুয়াকে। তারপর স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেল নিজের বাড়িতে।
এখন ঘটনা হচ্ছে, ওরা দু’জনে যতক্ষণ এক সঙ্গে থাকে ততক্ষণ সব কিছু ভুলে থাকে কিউই। কিন্তু ও নিজে এক মুহূর্তের জন্যে একা হলেই শয়তান আর নরকের চিন্তা মাথায় ভর করে। কল্পনায় দেখতে পায় অতল এক পিপেতে তার জন্যে তেল গরম করা হচ্ছে। লকলক করছে আগুনের শিখা ওদিকে ককুয়া এসবের কিছুই জানে না। সে মনের আনন্দে হেসে খেলে বেড়ায়। গান গায়। পুরো বাড়িটাকে সে মাথায় করে রেখেছে।
কিউই ওর ফূর্তি দেখে আনন্দ পায়। আবার ভবিষ্যতের চিন্তায় ভয়ে কুঁকড়েও যায়। চুপচাপ এক কোণে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কাঁদে। কিন্তু ককুয়াকে বুঝতে দেয় না কিছু। ফলে ককুয়া জানে না ওকে পাওয়ার জন্যে কী মূল্য দিতে হয়েছে কিউইকে।
কিন্তু এভাবে কি আর বেশিদিন চলে? ককুয়ার উচ্ছলতা কমে গেল ধীরে ধীরে। এখন তার গান আর শোনাই যায় না প্রায়। এতদিন কিউই একা মন খারাপ করে বসে থাকত। এখন স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই মুখ কালো। দু’জনেই দু’জনকে এড়িয়ে চলে। কেউ কারও সঙ্গে বিশেষ কথা বলে না।
কিউই নিজের দুঃখে এত বেশি কাতর যে ককুয়ার এই আমূল পরিবর্তন তার নজর এড়িয়ে গেল। ওদিকে অভিমানের পাহাড় জমেছে ককুয়ার বুকে।
কিউই এতসবের কিছুই জানে না। একদিন হঠাৎ ওর কানে কান্নার শব্দ এল। শব্দটা আসছে ব্যালকনি থেকে। কিউই ছুটে গিয়ে দেখে ককুয়া মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে।
‘তুমি কাঁদছ কেন, ককুয়া? কি হয়েছে তোমার?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল কিউই। ওকে টেনে তুলল মেঝে থেকে। মুছিয়ে দিল চোখের পানি।
‘বিয়ের আগে সবাই তোমাকে সুখী বলে জানত। কিন্তু আমাকে বিয়ে করার পর থেকে তোমার মুখে হাসি নেই, মনে আনন্দ নেই, ‘ ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল ককুয়া। ‘আমি কি তোমাকে কোন কষ্ট দিয়েছি? আমাকে পেয়ে তুমি সুখী নও?’
‘অবশ্যই সুখী। আমার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই। শোন, ককুয়া, ওর হাতটা ধরার চেষ্টা করল কিউই। পারল না। ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিল ককুয়া। ‘ককুয়া, শোন,’ আবার বলল কিউই, ‘তোমার জন্যে আমি সব করতে পারি, করেওছি। সে-সব কথা তোমাকে জানানো দরকার। নইলে তোমার ভুল ভাঙবে না।’
সেই প্রথম থেকে যা যা ঘটেছে সব খুলে বলল কিউই।
‘আমাকে তুমি এত ভালবাস? আমার জন্যে তুমি এত সব করেছ?’ বলল ককুয়া। জড়িয়ে ধরল স্বামীকে।
‘করেছি। তবে নরকের কথা কিছুতেই ভুলতে পারছি না যে, ‘ কিউই বলল।
‘তুমি ভেব না, কিউই। যে আমাকে এত ভালবাসে তার জন্যে সব করতে পারি আমি। দরকার পড়লে নিজের জীবন দিয়ে বাঁচাব তোমাকে, বলল ও।
‘এখন আর সে সুযোগ নেই, প্রিয়তমা, আমার নরকভোগ কেউ ঠেকাতে পারবে না,’ কিউই বলল।
‘তুমি কিচ্ছু জান না,’ ককুয়া বলল। ‘পুরো পৃথিবীটা তো আর আমেরিকা নয়। এক সেন্টের চেয়ে কম দামি মুদ্রা ইংল্যাণ্ডে আছে। ওরা বলে ফার্দিং। আধ সেন্টের সমান।
‘তবে ইংল্যাণ্ডে গিয়ে সুবিধে হবে না। কারণ আধ সেন্ট দিয়ে বোতল কিনে ক্রেতা আর বেচতে পারবে না। তারচেয়ে বরং ফ্রান্সে যার আমরা। ওখানে সেন্টাইম নামে ছোট্ট একটা মুদ্রা আছে। আমাদের এক সেন্টের সমান ওদের, পাঁচ সেন্টাইম। সুতরাং চার সেন্টাইম দিয়ে বোতল কেনার লোকের অভাব হবে না। কি, তোমার চিন্তা দূর হল?’ কথা শেষ করে জানতে চাইল ককুয়া।
কিউই-র মুখে তখন হাসি ধরছে না। মাথা ঝাঁকাল সে।
.
পরদিন তৈরি হয়ে নিল ককুয়া। কিউই-র সিন্দুকটা মালপত্রে ঠাসল সে। বোতলটা রাখল এক কোণে। দামি দামি সব কাপড়-চোপড় দিয়ে ভরে ফেলল সিন্দুকটা। এত কাপড়ের কি দরকার জানতে চাইল কিউই। ককুয়া বলল, ‘লোকজনকে বোঝাতে হবে আমাদের প্রচুর টাকা। আর সব দিয়েছে বোতল শয়তান। নইলে ওরা বোতল কিনতে চাইবে কেন?’
ওর কথায় সায় দিল কিউই। স্ত্রীর ওপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে তার। এতদিনের পুষে রাখা কষ্টটা ককুয়ার কাছে খোলাসা করে দিয়ে অনেকখানি হালকা বোধ করছে এখন সে। নতুন জীবন পেয়েছে যেন। সামনে আশার আলো দেখতে পাচ্ছে।
