বোতল শয়তান – ৪
কদিন সমুদ্র যাত্রার পর ফ্রান্সের তাহিতি দ্বীপে এসে পৌঁছল ওরা।
ককুয়া বলল, ‘লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে ভাল একটা বাড়ি ভাড়া করতে হবে আমাদের। আর প্রচুর টাকা ওড়াতে হবে।’
‘ঠিক বলেছ, বলল কিউই। স্ত্রীর কথামত ঘোড়ার গাড়ি কিনল সে। অনেক টাকা বেরিয়ে গেল তাতে। অবশ্য সেজন্যে কোন মাথাব্যথা নেই ওদের। ককুয়া সাহসী মেয়ে। কিউই-র মত ভীতু নয়। সে বোতল শয়তানকে যখন তখন হুকুম করতে লাগল। ফলে টাকার অভাব হল না।
ককুয়া ঠিকই বলেছিল। খুব দ্রুত লোকের চোখে পড়ে গেল ওরা। লোকে বলাবলি করতে লাগল হাওয়াই থেকে বিরাট বড়লোক এক দম্পতি এসেছে এখানে। ইচ্ছেমত টাকা ওড়াচ্ছে। গাড়িতে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দামি দামি পোশাক পরছে। লোকের তাক লেগে গেল।
প্রথমেই ওরা তাহিতির ভাষা শিখে নিল। খুব একটা কষ্ট হল না ওদের। কেননা ভাষাটা প্রায় হাওয়াইয়ান ভাষার মতই, কেবল কিছু অক্ষর আলাদা। ভাষা শিখে নিয়েই বোতল বেচার কাজে লেগে পড়ল ওরা। তবে কাজটা অত সহজ নয়, বুঝতে পারল অল্পদিনেই। যে বোতলের এত গুণ সেটা ওরা মাত্র চার সেন্টাইমে বেচে দিতে চাইছে বলে কেউই প্রায় বিশ্বাস করল না ওদের কথা। তাছাড়া বোতলের বিপদ সম্পর্কেও জানাতে হয় লোককে। সব শুনে অনেকে বিশ্বাসই করে না, হেসে উড়িয়ে দেয়। অনেকে আবার ভয়ে পিছিয়ে যায়।
অবস্থা এমন দাঁড়াল, ওদের এড়িয়ে চলে সকলে। ছোট ছেলে- মেয়েরা দেখলেই ছুটে পালায়। ওরা কথা বলতে চাইলে বড়রা নানা- অজুহাত দেখায়। সরে পড়ে।
হতাশ হয়ে পড়ল ওরা। প্রতিদিন ছোটাছুটির পর রাতে চুপচাপ বসে থাকে বাড়িতে। ক্লান্ত হয়ে। দু’জনের কেউই কথা বলে না।. বলতে ইচ্ছেও করে না, মাঝে মাঝেই নীরবতা ভাঙে ককুয়ার কান্নার শব্দ। প্রায়ই ওরা একসঙ্গে প্রার্থনা করে। কখনওবা আবার মেঝেতে বোতলটা রেখে ওটার দিকে চেয়ে বসে থাকে। বোতলের ভেতরকার ছায়ার নড়াচড়া দেখে এক দৃষ্টে।
একরাতে ঘুম ভেঙে গেল ককুয়ার। চোখ মেলে দেখে পাশে কিউই নেই। হঠাৎ কান্নার শব্দ কানে এল তার। বাইরে বেরিয়ে দেখে নিচে উঠনে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে কিউই। ব্যথায় মনটা ভরে গেল ককুয়ার। ছুটে কিউই-র কাছে যেতে মন চাইল তার। ওকে সান্ত্বনা দিতে ইচ্ছে করল। কিন্তু নিজেকে সংযত করল সে। স্ত্রীর কাছে সবাই নিজেকে সাহসী পুরুষ হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। এ অবস্থায় কিউইকে সান্ত্বনা দিতে গেলে চরম লজ্জা পাবে ও। তাতে ওর দুঃখ বাড়বে বই কমবে না। ফলে ঘরে ফিরে গেল ককুয়া।
‘সব কিছুর জন্যে আমিই দায়ী। আমাকে ভালবাসে বলেই এত বড় ঝুঁকি নিয়েছে ও। অভিশপ্ত জীবনের পরোয়া করেনি। ওর ভালবাসার প্রতিদান দেব আমি। দরকার হলে চিরতরে পুড়ে মরব নরকের আগুনে,’ ভাবল ককুয়া। কিউইকে বাঁচানর সিদ্ধান্ত নিল সে।
চুপিসারে তক্ষুণি ঘর থেকে বেরিয়ে এল ককুয়া। মুঠোয় তার চারটে সেন্টাইম। রাস্তায় নেমে এসে দেখে কালো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছে চাঁদ। চারদিক নিঝুম। গোটা শহরটাই ঘুমে বিভোর, কোথায় যাবে বুঝতে পারল না সে। ঠিক এসময় কানে এল কাশির শব্দ।
ককুয়া চেয়ে দেখে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বুড়ো মত এক লোক।
‘আপনি এই শীতের মধ্যে কি করছেন?’ বুড়োকে জিজ্ঞেস করল সে।
বুড়ো কাশতে কাশতে যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে: তার কেউ নেই। খুব গরীব সে; এ দ্বীপে বেশিদিন হয়নি এসেছে।
‘আপনি আমার একটা উপকার করবেন? মৃদু কণ্ঠে জানতে চাইল ককুয়া। ‘মনে করুন আপনার মেয়ে অনুরোধ করছে। আমিও তো আপনার মতই নতুন এখানে। হাওয়াই থেকে এসেছি।’
‘ও, তুমিই সেই ডাইনী?’ আঁতকে উঠল বুড়ো। ‘আমার মত বুড়ো মানুষের ক্ষতি করতেও বাধে না তোমার? না, তোমার কোন ব্যাপারে নেই আমি।’
‘আগে আমার কথা শুনুন, বলল ককুয়া, তারপর ভেবে দেখবেন।’
বুড়োকে পুরো ঘটনা খুলে বলল ককুয়া। তারপর বলল, ‘আমি নিজে বোতলটা কিনতে চাইলে কিছুতেই বেচবে না ও। কিন্তু আপনি গেলে খুশি মনে বেচে দেবে। আমি আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি এখানে। আপনি দয়া করে চার সেন্টাইম দিয়ে কিনে আনুন বোতলটা।
খাল আমি আপনার কাছ থেকে ওটা তিন সেন্টাইমে কিনে নেব। বাবা, এটুকু করুন আমার জন্যে।’
‘ঠিক আছে। যাব আমি,’ বলল বুড়ো।
‘আপনার অনেক দয়া, বাবা,’ কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ল ককুয়ার কণ্ঠে।
চার সেন্টাইম নিয়ে বুড়ো চলল কিউই-র কাছে। ওদিকে রাস্তায় একাকী দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপতে লাগল ককুয়া।
খানিক বাদে বোতল হাতে ফিরে এল বুড়ো। ‘তোমার স্বামী বোতল বেচে বাচ্চা ছেলের মত কেঁদেছে। মুক্তির আনন্দে আজ বড় শান্তিতে ঘুমাবে সে,’ ককুয়ার দিকে বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল বুড়ো।
‘কোন সন্দেহ করেনি তো?’ প্রশ্ন করল ককুয়া।
‘আরে না, ও বোতল বেচেই খালাস,’ মৃদু হেসে বলল বুড়ো।
‘ওটা আমাকে দেয়ার আগে,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল কুয়া, ‘শয়তানকে বলুন, আপনার কাশি সারিয়ে দেবে।’
‘তার দরকার নেই। আজ বাদে কাল যাব কবরে। শয়তানের দয়া চাই না আমার। কিন্তু তুমি বোতলটা নিচ্ছ না কেন? ভয় লাগছে?’ বলল বুড়ো।
‘না, তা নয়,’ শান্ত কণ্ঠে বলল ককুয়া। ‘খুব দুর্বল লাগছে। আমাকে একটা মিনিট সময় দিন।’
গভীর মমতায় ওর দিকে চাইল বুড়ো। ‘আমার কোন ভবিষ্যৎ নেই, মা। তোমার আছে। বোতলটা বরং আমিই রেখে দিই,’ নরম কণ্ঠে বলল সে।
‘ওটা দিন,’ দ্রুত বলল ককুয়া। ‘এই নিন পয়সা।’
‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন,’ প্রার্থনা করল বুড়ো।
বুড়োর কাছ থেকে বোতলটা কিনে নিল ককুয়া। তারপর ধন্যবাদ জানিয়ে রওনা দিল। কোথায় চলেছে সে, কোন রাস্তা ধরে চলেছে কিছুই জানা নেই তার। ককুয়ার মনে হচ্ছে সব রাস্তাই নরকে গিয়ে মিশেছে। সব রাস্তাই তার জন্যে সমান এখন। সারা রাত ছোটাছুটি করল ককুয়া। এদিক সেদিক। রাস্তার পাশে শুয়ে কাঁদল।
পরদিন সকাল হলে হুঁশ ফিরল তার। ফিরে এল বাড়িতে। ঘরে ঢুকে দেখতে পেল কিউইকে। বুড়োর কথাই ঠিক। তার স্বামী পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। বড় নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে তাকে। ওর ঘুমন্ত মুখখানার দিকে চেয়ে শান্তি পেল ককুয়া।
‘প্রিয় স্বামী, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। তুমি এখন চিন্তামুক্ত। কিন্তু আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। দুনিয়াটা আমার কাছে মূল্যহীন। চিরতরে অন্ধকার হয়ে গেছে আমার ভবিষ্যৎ,’ ভাবল ককুয়া।
এসব ভেবে স্বামীর পাশে শুয়ে পড়ল সে। সারা রাতের দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তির ফলে বুজে এল দু’চোখ।
পরদিন সকালে ওকে জাগাল কিউই। শুভ সংবাদটা দেয়ার জন্যে। অনবরত বকবক করতে লাগল সে। কিভাবে বোতলমুক্ত হয়েছে সে খবর শোনাল। ককুয়া যে অন্যমনস্ক সেটা খেয়ালই করল না। সকালে কিছুই খেল না ককুয়া। কিউই তবু বুঝতে পারল না কিছু। সে পেট পুরে খেল। দেশে ফেরার পরিকল্পনা করল। ওকে এ শহরে নিয়ে এসে উদ্ধার করার জন্যে ধন্যবাদ জানাল ককুয়াকে। আর বুড়োর বোকামির কথা বলে আনন্দ পেল।
‘বুড়ো বোতল নিয়ে করবেটা কি?’ আপন মনেই প্রশ্ন করল কিউই।
‘নিশ্চয় ভাল কোন উদ্দেশ্য আছে,’ নরম গলায় বলল ককুয়া।
হো হো করে হেসে উঠল কিউই। ‘গাধা বুড়ো কোথাকার। তিন সেন্টাইম দিয়ে ওর কাছ থেকে কে কিনবে বোতল? চার সেন্টাইমে বেচতেই জান বেরিয়ে গেছে আমাদের। ওর পোড়া কপাল, পুড়েই মরতে হবে ওকে,’ হাসতে হাসতে কথাগুলো বলল কিউই।
‘এভাবে বোলো না। ভয় করে। যে বোতল কিনে বাঁচাল তোমাকে তার জন্যে একটুও মায়া হচ্ছে না? ওর জন্যে তো আমাদের প্রার্থনা করা উচিত।’
ককুয়ার মুখে সত্যি কথা শুনে রেগে উঠল কিউই। ‘তোমার যত ইচ্ছে প্রার্থনা কর গিয়ে। আমাকে ভালবাসলে এসব কথা বলতে পারতে না। আমি যে শয়তানের কবল থেকে মুক্ত হলাম সেটা কিছু নয়, না?’
রেগেমেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল কিউই। একাকী বসে রইল ককুয়া। চিন্তিত। হতাশ। দু’সেন্টাইমে বোতল বেচতে হবে। কিন্তু কিনবে কে? তাছাড়া কিউই দেশে ফেরার জন্যে তাড়া লাগাচ্ছে। দেশে ফিরে গেলে এ বোতল আর কোনদিনই বেচা যাবে না। সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছে সে কিউই-র ব্যবহারে। ওকে ভুল বুঝছে সে। তবে কিউই-রও দোষ নেই। ওর তো জানার কথা নয় আসলে কি ঘটেছে।
সিন্দুকের ভেতর থেকে বোতলটা বার করল ককুয়া। ওটার দিকে চাওয়া মাত্রই ভয়ে কাঁপতে লাগল সে। আবার রেখে দিল যথাস্থানে।
খানিক বাদে রাগ পড়লে ফিরে এল কিউই, ওকে নিয়ে ক্যারিজে চেপে বেড়াতে যাবে।
‘শরীরটা ভাল নেই,’ বলল ককুয়া, ‘আজ থাক। অন্য আরেকদিন যাব।
ভয়ানক রেগে গেল কিউই। ‘অকৃতজ্ঞ!’ চিৎকার করে বলল সে, ‘তোমার জন্যে কি না করেছি আমি! ও, তুমি চেয়েছিলে আমি চিরতরে আগুনে পুড়ে মরি, তাই না? বোতল বেচতে পেরেছি বলে দুঃখ হচ্ছে তোমার?’
ঘর থেকে ছুটে বেরোল, কিউই। সারাদিন টো টো করে ঘুরল। তারপর গেল সরাইখানায়। প্রচুর মদ পান করল। এখানে এক বুড়ো মাতালের সঙ্গে পরিচয় হল ওর। নাবিক। দাগী আসামী। বহু বছর জেল খেটেছে। মদ পেলে দুনিয়ার আর কিছু বোঝে না সে। কিউই-র টাকায় গলা পর্যন্ত গিলল বুড়ো। তবু তার তৃপ্তি হল না। গেলাসটা আবার বাড়িয়ে দিল কিউই-র দিকে। কিউই জানাল তার পকেট খালি। তাই শুনে বলল বুড়ো নাবিক, ‘তোমার না বলে অনেক টাকা। রোতল না কি যেন আছে একটা।’
‘এখন আর নেই। তবে অসুবিধে হবে না। তুমি বস, আমি বউয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসছি,’ বলল কিউই।
‘বউয়ের কাছে টাকা রাখ নাকি তুমি? উঁহুঁ, কাজটা ঠিক করছ না। মেয়েমানুষকে মোটেও বিশ্বাস করবে না। আর টাকা-পয়সার ব্যাপারে তো নয়ই। ওরা জানে কেবল ছলনা। বউয়ের ওপর চোখ রাখবে, বুঝেছ?’
বুড়ো নাবিকের কথাগুলো কিউই-র খুব মনে ধরল।
‘বুড়ো ঠিকই বলেছে। বউ আমাকে ভালবাসে না। আমার ভাল চায় না। ওকে আমি আর বিশ্বাস করি না,’ ভাবল কিউই।
বুড়োকে সরাইখানায় বসিয়ে রেখে বাড়ির পথ ধরল সে। রাত হয়ে গেছে ততক্ষণে। ঘরে আলো জ্বলছে। পেছন দরজা দিয়ে চুপিসারে বাড়িতে ঢুকল ও।
শোবার ঘরের দরজা সামান্য ফাঁক করে দেখে ককুয়া মেঝেতে বসে রয়েছে। প্রদীপ জ্বলছে ঘরে। গোল পেট, লম্বা গলার দুধসাদা বোতলটা তার সামনে রাখা।
দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কিউই। তারপর শিউরে উঠল। তার মনে হল বোতলটা আবার ফিরে এসেছে তার কাছে। সেই যে একবার স্যান ফ্র্যানসিসকোতে তার সিন্দুকের ভেতর ফিরে এসেছিল, ঠিক তেমনিভাবে। এবারও নিশ্চয়ই দামের ব্যাপারে কোন
গণ্ডগোল হয়েছে। হাঁটু কাঁপতে লাগল তার। পরক্ষণেই অন্য একটা চিন্তা মাথায় এল। সেটাও কম ভয়ঙ্কর নয়।
‘ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে,’ ভাবল কিউই। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে পিছিয়ে গেল সে। তারপর আবোল-তাবোল বকতে বকতে ঘরের দিকে এগোল। যেন এইমাত্র ফিরেছে। ঘরে ঢুকল হুড়মুড় করে। ততক্ষণে বোতল সরিয়ে ফেলা হয়েছে মেঝে থেকে। ককুয়া বসে ছিল। ওকে ঢুকতে দেখে উঠে দাঁড়াল।
‘পয়সা দাও। মদ খাব,’ জড়ানো গলায় বলল কিউই। ককুয়া ওকে নিষেধ করল না। করলেও শুনবে না তার স্বামী। জানে সে।
সোজা সিন্দুকটার কাছে গেল কিউই। ডালা খুলে বার করল টাকা। চাইল সিন্দুকের কোণে। ওখানেই সে রাখত বোতলটা। ওটা এখন নেই ওখানে। ককুয়া নিশ্চয় কাপড়-চোপড়ের নিচে লুকিয়ে রেখেছে। .
সিন্দুকটা বন্ধ করল কিউই। ককুয়ার মনের অবস্থা এতদিনে বুঝতে পারল সে। কোন সন্দেহ নেই তার। ককুয়াই কিনেছে বোতলটা
‘ককুয়া, আমি রাতে নাও ফিরতে পারি,’
‘বলল কিউই। ‘তুমি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়।’
একথা শুনে ওর দু’হাঁটু জড়িয়ে ধরল ককুয়া। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
‘আমাকে ফেলে যেয়ো না। আমি একা থাকতে পারব না,’ কাঁদতে কাঁদতে বলল ককুয়া।
‘যেতে আমাকে হবেই,’ ককুয়াকে ফেলে রেখেই বেরিয়ে গেল কিউই।
সিন্দুক খুলে পয়সা নেয়ার নাম করে কেবলমাত্র সেন্টাইমগুলো তুলে নিয়েছিল কিউই। মদ খাওয়ার কোন ইচ্ছেই ছিল না তার। ককুয়াকে ও
খামোকা সন্দেহ করেছে সে। এখন রাগ হচ্ছে নিজের ওপর। ওরই জন্যে শয়তানের কবলে পড়েছে ককুয়া। যে করে হোক বাঁচাতেই হবে ওকে। আবার বোতল কিনবে সে। এসব ভাবতে ভাবতে চলল কিউই।
ফিরে গেল সরাইখানায়। ঢুকে দেখে বুড়ো নাবিক অপেক্ষা করছে তার জন্যে।
‘পয়সা পেলাম না। তবে সেজন্যে চিন্তা নেই। বোতল রয়েছে আমার স্ত্রীর ব.ছে। ওটা কিনলেই পয়সা এসে যাবে। যত খুশি মদ গিলতে পারবে তখন,’ বলল কিউই।
‘আমি ওসব বোতল-ফোতলে বিশ্বাস করি না,’ বলল বুড়ো নাবিক।
‘প্রমাণ পাবে এখনই,’ মৃদু হাসল কিউই। ‘এই দু’সেন্টাইম নিয়ে আমার বাড়িতে যাও। আমার স্ত্রীকে বলবে বোতল কিনতে চাও তুমি। ও শোনামাত্রই বেচে দেবে। তারপর তোমার কাছ থেকে বোতলটা কিনে নেব আমি। এক সেন্টাইমে। দেখবে মদের অভাব হবে না। তবে তোমাকে যে আমি পাঠিয়েছি এটা যেন কিছুতেই জানতে না পারে ও,’ বলল কিউই।
‘আজগুবি সব কথা। বিশ্বাস হয় না,’ বলল বুড়ো।
‘সন্দেহ হচ্ছে?’ প্রশ্ন করল কিউই। ‘তবে এক কাজ কর। বোতল কিনে যা খুশি তাই চেয়ো তুমি। টাকা, মদ যা ইচ্ছে। দেখবে বোতলের কেরামতি। তখন বিশ্বাস হবে।’
‘ঠিক আছে, দেখব। তবে আমার কাছে মিথ্যে বলে পার পাবে না তুমি,’ বুড়ো বলল।
বেরিয়ে গেল মাতাল বুড়ো। ওর জন্যে বসে বসে অপেক্ষা করতে লাগল কিউই।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুনতে পেল কে যেন হেঁড়ে গলায় গান গাইতে গাইতে আসছে। গলা শুনে বুঝতে পারল এ সেই বুড়ো নাবিক।
লোকটা ঢোকার আগেই সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এল কিউই। দেখে বুড়ো টলমল করছে। এই পড়ে তো সেই পড়ে। বোঝা যায় প্রচুর মদ গিলেছে। ওর কোটের পকেটে শয়তানের বোতলটার গলা দেখা যাচ্ছে। আর হাতে রয়েছে অন্য আরেকটি বোতল। সেটা থেকে ঢকঢক করে মদ ঢালছে গলায়।
‘পেয়েছ ওটা?’ প্রায় চিৎকার করে উঠল কিউই।
‘বহু কষ্টে। তোমার বউয়ের ধারণা তুমি তাকে উদ্ধারের জন্যে বোতলটা কিনতে চাইছ,’ জড়ানো গলায় বলল বুড়ো।
‘তারপর?’ উত্তেজনায় প্রায় কাঁপছে কিউই।
‘তারপর আর কি। ভালমানুষের মত জিজ্ঞেস করলাম বোতলের দাম এখন কত। যেন জানা নেই আমার। ফলে সন্দেহ করতে পারেনি ও। ব্যস, কিনে নিলাম বোতলটা।’
‘দাও, আমি কিনব ওটা।’
‘ইস্, শখ কত!’ ভেংচি কাটল মাতাল বুড়ো। ‘আমার কাছে ওসব আবদার চলবে না।’
‘কি বলছ তুমি?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল কিউই।
‘বোতলটা পছন্দ হয়েছে আমার। এটা বেচব না আমি। শয়তানটাকে হুকুম করব আর যখন যত খুশি মদ খাব, লাল চোখে ওর দিকে চেয়ে বলল বুড়ো।
‘বেচবে না?’ ঢোক গিলে বলল কিউই।
‘জ্বী না,’ আবার ভেংচি কাটল বুড়ো। ‘তবে চাইলে এক ঢোক মারতে পার।’
‘আগে আমার কথা তো শোন,’ মিনতি করল কিউই। ‘বোতল না বেচলে কি শাস্তি জানা আছে তোমার? সোজা নরকে যাবে।’
‘বোতল বেচলেও যাব,’ পাল্টা বলল বুড়ো। ‘এ বোতল নিয়েই নরকে যেতে চাই আমি। তুমি অন্য আরেকটা জোগাড় করে নাওগে যাও।’
‘বোকামি কোরো না.’ ওকে বোঝাতে চেষ্টা করল কিউই। ‘তোমার : ভালর জন্যেই বলছি। বোতল বেচে দাও আমার কাছে।’
‘উঁহুঁ, তোমার কোন কথাই শুনব না আমি। ভেবেছ মদ খেয়ে জ্ঞানবুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে আমার তাই না? আমি অত বোকা নই। ভাল চাইলে মানে মানে কেটে পড়,’ বলল বুড়ো। কিউই-র কথা শোনার পাত্র নয় সে।
বোতল হাতে নিয়ে রাস্তা ধরে টলতে টলতে এগোল বুড়ো নাবিক। হারিয়ে গেল চোখের আড়ালে।
সেদিকে চেয়ে ছিল কিউই। হঠাৎ সংবিৎ ফিরে পেয়ে বাড়ির দিকে ছুটল সে ঝড়ের বেগে। ককুয়াকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তার। বাড়ি ফিরে জড়িয়ে ধরল স্ত্রীকে। চোখের জলে ভাসল দু’জনে। এরপর ক’দিন বাদে ফিরে গেল দেশে। চমৎকার সেই বাড়িতে সুখে দিন কাটাতে লাগল তারা।
***
