Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ব্যোমকেশ সমগ্র – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প1885 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    শজারুর কাঁটা – কাহিনী

    কাহিনী

    দক্ষিণ কলকাতার ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের নতুন রাস্তার ওপর একটি ছোট দোতলা বাড়ি। বাড়ির চারিদিকে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। খোলা জায়গায় এখানে ওখানে কয়েকটা অনাদৃত ফুলের গাছ।

    বাড়িটি কিন্তু অনাদৃত নয়। বাড়ির বহিরঙ্গ যেমন ফিকে নীল রঙে রঞ্জিত এবং সুশ্রী, ভিতরটিও তেমনি পরিচ্ছন্ন ছিমছাম। নীচের তলায় একটি বসবার ঘর; তার সঙ্গে খাবার ঘর, রান্নাঘর এবং চাকরের ঘর। দোতলায় তেমনি একটি অন্তরঙ্গ বসবার ঘর এবং দু’টি শয়নকক্ষ। বছর চার-পাঁচ আগে যিনি এই বাড়িটি প্রৌঢ় বয়সে তৈরি করিয়েছিলেন তিনি এখন গতাসু, তাঁর একমাত্র পুত্র দেবাশিস এখন সস্ত্রীক এই বাড়িতে বাস করে।

    একদিন চৈত্রের অপরাহ্ণে দোতলার বসবার ঘরে দীপা একলা বসে রেডিও শুনছিল। দীপা দেবাশিসের বউ; মাত্র দু’মাস তাদের বিয়ে হয়েছে। দীপা একটি আরাম-কেদারায় হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে ছিল। ঘরে আসবাব বেশি নেই; একটি নীচু টেবিল ঘিরে কয়েকটি আরাম-কেদারা; দেয়াল ঘেঁষে একটি তক্তপোশ, তার ওপর ফরাশ ও মোটা তাকিয়া। এ ছাড়া ঘরে আছে রেডিওগ্রাম এবং এক কোণে টেলিফোন।

    রেডিওগ্রামের ঢাকনির ভিতর থেকে গানের মৃদু গুঞ্জন আসছিল। ঘরটি ছায়াচ্ছন্ন, দোর জানলা ভেজানো। দীপা চেয়ারের পিঠে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে শুয়ে ছিল। বাড়িতে একলা তার সারা দুপুর এমনিভাবেই কাটে।

    দীপার এই আলস্যশিথিল চেহারাটি দেখতে ভাল লাগে। তার রঙ ফর্সাই বলা যায়, মুখের গড়ন ভাল; কিন্তু ভ্রূর ঋজু রেখা এবং চিবুকের দৃঢ়তা মুখে একটা অপ্রত্যাশিত বলিষ্ঠতা এনে দিয়েছে, মনে হয় এ মেয়ে সহজ নয়, সামান্য নয়।

    দেয়ালের ঘড়িতে ঠুং ঠুং করে পাঁচটা বাজল। দীপার চোখ দু’টি অমনি খুলে গেল; সে ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে রেডিও বন্ধ করে দিল, তারপর উঠে বাইরের দরজার দিকে চলল। দরজা খুলতেই সামনে সিঁড়ি নেমে গেছে। দীপা সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে ডাকল—‘নকুল।’

    নকুল বাড়ির একমাত্র চাকর এবং পাচক, সাবেক কাল থেকে আছে। সে একতলার খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে উঁচু দিকে চেয়ে বলল—‘হ্যাঁ বউদি, দাদাবাবুর জলখাবার তৈরি আছে।’

    দীপা তখন গায়ের শিথিল কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌচেছে এমন সময় কিড়িং কিড়িং শব্দে সদর দরজার ঘন্টি বেজে উঠল।

    দীপা গিয়ে দোর খুলে দিল। কোট-প্যান্ট পরা দেবাশিস প্রবেশ করল। দু’জনে দু’জনের মুখের পানে তাকাল কিন্তু তাদের মুখে হাসি ফুটল না। এদের জীবনে হাসি সুলভ নয়। দীপা নিরুৎসুক সুরে বলল—‘জলখাবার তৈরি আছে।’

    দেবাশিস কণ্ঠস্বরে শিষ্টতার প্রলেপ মাখিয়ে বলল—‘বেশ, বেশ, আমি জামাকাপড় বদলে এখনই আসছি।’

    সে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। দীপা মন্থর পদে খাবার ঘরে গিয়ে টেবিলের এক পাশে বসল।

    লম্বাটে ধরনের খাবার টেবিল; চারজনের মত জায়গা, গাদাগাদি করে ছ’জন বসা চলে। দীপা এক প্রান্তে বসে দেখতে লাগল, নকুল দু’টি প্লেটে খাবার সাজাচ্ছে; লুচিভাজা, আলুর দম, বাড়িতে তৈরি সন্দেশ। নকুল মানুষটি বেঁটে-খাটো, মাথার চুল পেকেছে, কিন্তু শরীর বেশ নিটোল। বেশি কথা কয় না, কিন্তু চোখ দু’টি সতর্ক এবং জিজ্ঞাসু। দীপা তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে লাগল—নকুল নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে। তবু নকুলের সামনে ধোঁকার টাটি খাড়া রাখতে হয়। শুধু নকুল কেন, পৃথিবীসুদ্ধ লোকের সামনে। বিচিত্র তাদের বিবাহিত জীবন।

    ধুতি পাঞ্জাবি পরে দেবাশিস নেমে এল। একহারা দীঘল চেহারা, ফর্সা সুশ্রী মুখ; বয়স সাতাশ কি আটাশ। সে টেবিলের অন্য প্রান্তে এসে বসতেই নকুল খাবারের প্লেট এনে তার সামনে রাখল, দীপার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলল—‘তোমাকেও দেব নাকি বউদি?’

    দীপা মাথা নেড়ে বলল—‘না, আমি পরে খাব।’ দেবাশিসের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া এখনো তার অভ্যাস হয়নি; তার বাপের বাড়িতে অন্য রকম রেওয়াজ, পুরুষদের খাওয়া শেষ হলে তবে মেয়েরা খেতে বসে। দীপা সহজে অভ্যাস ছাড়তে পারে না; তবু রাত্রির আহারটা দু’জনে টেবিলের দু’ প্রান্তে বসে সম্পন্ন করে। নইলে নকুলের চোখেও বড় বিসদৃশ দেখাবে।

    কিছুক্ষণ কোনো কথাবার্তা নেই; দেবাশিস একমনে লুচি, আলুর দম খাচ্ছে; দীপা যা-হোক একটা কোনো কথা বলতে চাইছে কিন্তু কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। পিছন থেকে নকুলের সতর্ক চক্ষু তাদের লক্ষ্য করছে।

    শেষ পর্যন্ত দেবাশিসই প্রথম কথা কইল, সোজা হয়ে বসে দীপার পানে চেয়ে একটু হেসে বলল—‘আজ একটা নতুন ক্রিম তৈরি করেছি।’

    দেবাশিসের কাজকর্ম সম্বন্ধে দীপা কখনো ঔৎসুক্য প্রকাশ করেনি কিন্তু এখন সে আগ্রহ দেখিয়ে বলল—‘তাই নাকি? কিসের ক্রিম?’

    দেবাশিস বলল—‘মুখে মাখার ক্রিম।’

    ‘ও মা, সত্যি? কেমন গন্ধ?’

    ‘তা আমি কি করে বলব। যারা মাখবে তারা বলতে পারবে।’

    ‘তা বাড়িতে একটু যদি আনো, আমি মেখে দেখতে পারি।’

    দেবাশিস হাসিমুখে মাথা নাড়ল—‘তোমার এখন মাখা চলবে না, অন্য লোকের মুখে মাখিয়ে দেখতে হবে মুখে ঘা বেরোয় কিনা। পরীক্ষা না করে বলা যায় না।’

    ‘কার মুখে মাখিয়ে পরীক্ষা করবে?’

    ‘ফ্যাক্টরির দারোয়ান ফৌজদার সিং-এর মুখে মাখিয়ে দেখব। তার গালের চামড়া হাতির চামড়ার মত।’

    দীপার মুখে হাসি ফুটল; সে যে নকুলের সামনে অভিনয় করছে তা ক্ষণকালের জন্যে বিস্মরণ হয়েছিল, দেবাশিসের মুখের হাসি তার মুখে সংক্রামিত হয়েছিল।

    আহার শেষ করে দেবাশিস উঠল। দু’জনে খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির নীচে এসে দাঁড়াল। দেবাশিস হঠাৎ আগ্রহভরে বলল—‘দীপা, আজ উৎপলা সিনেমাতে একটা ভাল ছবি দেখাচ্ছে। দেখতে যাবে?’

    দেবাশিস আগে কখনো দীপাকে সিনেমায় নিয়ে যাবার প্রস্তাব করেনি; দীপার শরীরের ভিতর দিয়ে একটা বৈদ্যুতিক শিহরণ বয়ে গেল। তারপরই তার মন শক্ত হয়ে উঠল। সে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল—‘না, আমি যাব না।’

    দেবাশিসের মুখ ম্লান হয়ে গেল, তারপর গম্ভীর হয়ে উঠল। সে কিছুক্ষণ দীপার পানে চেয়ে থেকে বলল—‘ভয় নেই, সিনেমা-ঘরের অন্ধকারে আমি তোমার গায়ে হাত দেব না।’

    আবার দীপার শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু সে আরো শক্ত হয়ে বলল—‘না, সিনেমা আমার ভাল লাগে না।’ এই বলে সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল। দেবাশিস ওপর দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলল—‘আমি নৃপতিদার বাড়িতে যাচ্ছি, ফিরতে সাড়ে আটটা হবে।’

    সদর দরজা খুলে দেবাশিস বাইরে এল, দোরের সামনে তার ফিয়েট গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে; কাজ থেকে ফিরে এসে সে গাড়িটা দোরের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। ভেবেছিল, সিনেমা দেখতে যাবার প্রস্তাব করলে দীপা অমত করবে না। তার মন সহজে তিক্ত হয় না, আজ কিন্তু তার মন তিক্ত হয়ে উঠল। এতটুকু বিশ্বাস দীপা তাকে করতে পারে না! এই দু’ মাস দীপা তার বাড়িতে আছে, কোনো দিন কোনো ছুতোয় সে দীপার গায়ে হাত দেয়নি, নিজের দাম্পত্য অধিকার জারি করেনি। তবে আজ দীপা তাকে এমনভাবে অপমান করল কেন?

    দেবাশিস গাড়ির চালকের আসনে বসে গাড়িতে স্টার্ট দিল। বাড়ির পিছন দিকে গাড়ি রাখার ঘর, সেখানে গাড়ি রেখে সে পায়ে হেঁটে বেরুল। নৃপতি লাহার বাড়ি পাঁচ মিনিটের রাস্তা। নৃপতির বৈঠকখানায় রোজ সন্ধ্যার পর আড্ডা বসে, দেবাশিস প্রায়ই সেখানে যায়।

    দীপা ওপর এসে আবার আরাম-কেদারায় এলিয়ে পড়ল। তার মনের মধ্যে দশদিক তোলপাড় করে ঝড় বইছে, সারা গায়ে অসহ্য ছট্‌ফটানি। অভ্যাসবশেই সে হাত বাড়িয়ে রেডিওগ্রাম চালিয়ে দিল; কোনো একটি মহিলা ইনিয়ে-বিনিয়ে আধুনিক গান গাইছেন। কিছুক্ষণ শোনার পর সে রেডিও বন্ধ করে দিয়ে চোখ বুজে চুপ করে রইল। কিন্তু বুকের মধ্যে ঝড়ের আফ্‌সানি কমল না। তখন সে উঠে অশান্তভাবে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল, অস্ফুট স্বরে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল—‘এভাবে আর কত দিন চলবে?’

    দীপা যদি হাল্‌কা চরিত্রের মেয়ে হত, তাহলে তার জীবনে বোধ হয় কোনো ঝড়-ঝাপটাই আসত না।

    দীপা বনেদী বংশের মেয়ে। একসময় খুব বোল্‌বোলাও ছিল, তালুক-মুলুক ছিল, এখন অনেক কমে গেছে; তবু মরা হাতি লাখ টাকা। বোল্‌বোলাও কমলেও বংশের মর্যাদাবোধ আর গোঁড়ামি তিলমাত্র কমেনি। দীপার ঠাকুরদা উদয়মাধব মুখুজ্জে এখনো বেঁচে আছেন, তিনিই সংসারের কর্তা। এক সময় একটি বিখ্যাত কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন, হঠাৎ পঙ্গু হয়ে পড়ার ফলে অবসর নিতে হয়েছে। বাড়িতেই থাকেন এবং নিজের শয়নকক্ষ থেকে প্রচণ্ড দাপটে বাড়ি শাসন করেন।

    ঠাকুরদা ছাড়া বাড়িতে আছেন দীপার বাবা-মা এবং দাদা। বাবা নীলমাধব বয়স্ক লোক, কলেজে অধ্যাপনা করেন। মা গোবেচারি ভালমানুষ, কারুর কথায় থাকেন না, নীরবে সংসারের কাজ করে যান। দাদা বিজয়মাধব দীপার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়, সে সংস্কৃত ভাষায় এম-এ পাস করে কলেজে অধ্যাপনার কাজে ঢোকবার চেষ্টা করছে। দীপার বাবা এবং দাদা দু’জনেই তেজস্বী পুরুষ। কিন্তু তাঁরা বাড়িতে উদয়মাধবের হুকুম বেদবাক্য মনে করেন এবং বাইরে বংশ-গৌরবের ধ্বজা তুলে বেড়ান। বংশটা একাধারে সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত এবং প্রাচীনপন্থী।

    এই বংশের একমাত্র মেয়ে দীপা। তাকে মেয়ে-স্কুল থেকে সীনিয়র কেম্‌ব্রিজ পাস করানো হয়েছিল। তারপর তার পড়াশুনো বন্ধ হল; তার জন্যে পালটি ঘরের ভাল পাত্র খোঁজা আরম্ভ হল। কালধর্মে তাকে পর্দার মধ্যে আবদ্ধ রাখা গেল না বটে, কিন্তু একলা বাইরে যাবার হুকুম নেই। বাইরে যেতে হলে বাপ কিংবা ভাই সঙ্গে থাকবে।

    দীপা বাড়িতেই থাকে, গৃহকর্মে রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করে; অবসর সময়ে গল্প উপন্যাস পড়ে, রেডিওতে গান শোনে। কিন্তু মন তার বিদ্রোহে ভরা। তার মনের একটা স্বাধীন সত্তা আছে, নিজস্ব মতামত আছে; সে মুখ বুজে বাড়ির শাসন সহ্য করে বটে, কিন্তু তার মনে সুখ নেই। মেয়ে হয়ে বাংলা দেশে জন্মেছে বলে কি তার কোনো স্বাধীনতা নেই! অন্য দেশের মেয়েদের তো আছে।

    ঠাকুরদা উদয়মাধব, পঙ্গুতার জন্যেই বোধ হয়, বাড়িতে বন্ধুসমাগম পছন্দ করতেন, লোকজনকে খাওয়াতে ভালবাসতেন। একটা কোনো উপলক্ষ পেলেই নিজের প্রবীণ বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করতেন; নীলমাধব এবং বিজয়মাধবের বন্ধুরাও নিমন্ত্রিত হতেন। বৃদ্ধেরা তিনতলায় সমবেত হতেন, প্রৌঢ় অধ্যাপকেরা বসতেন দোতলায় এবং একতলায় বৈঠকখানায় বসে ছেলে-ছোকরার দল গানবাজনা হইহুল্লোড় করত। মাসে দু’মাসে এইরকম অনুষ্ঠান লেগেই থাকত।

    দীপা অতিথিদের সকলের সামনে বেরুত, কোনো বারণ ছিল না। ঠাকুরদার বন্ধুরা নাতনী সম্পর্কে তার সঙ্গে সেকেলে রসিকতা করতেন, বাপের বন্ধুরা তাকে স্নেহ করতেন, আর দাদার বন্ধুরা তাকে নিজেদের সমান মর্যাদা দিত, মেয়ে বলে অবহেলা করত না। সে প্রয়োজন হলে তাদের সঙ্গে দু’টি-চারটি কথাও বলত। তাদের মধ্যে যখন গানবাজনা হত তখন সে দোরের কাছে দাঁড়িয়ে শুনত। এইসব ক্রিয়াকর্মে তার মন ভারি উৎফুল্ল হয়ে উঠত, যদিও বাইরে তার বিকাশ খুব অল্পই চোখে পড়ত। দীপা ভারি চাপা প্রকৃতির মেয়ে।

    এইভাবে চলছিল, তারপর একদিন দীপার মানসলোকে একটি ব্যাপার ঘটল, নবযৌবনের স্বভাবধর্মে সে প্রেমে পড়ল। যার সঙ্গে প্রেমে পড়ল সেও তার অনুরাগী। কিন্তু মাঝখানে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা, প্রেমিকের জাত আলাদা।

    দুপুরবেলা যখন বাড়ি নিষুতি হয়ে যায় তখন দীপা নীচের বসবার ঘরে দোর ভেজিয়ে দিয়ে টেলিফোনের সামনে বসে, চোখে প্রতীক্ষা নিয়ে বসে থাকে। টেলিফোন বাজলেই সে যন্ত্র তুলে নেয়। সাবধানে দু’টি-চারটি কথা হয়, তারপর সে টেলিফোন রেখে দেয়। কেউ জানতে পারে না।

    সন্ধ্যেবেলা দীপা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে; সামনের ফুটপাথ দিয়ে তার প্রেমিক চলে যায়, তার পানে চাইতে চাইতে যায়। এইভাবে তাদের দেখা হয়। কিন্তু কাছে এসে দেখা করার সুযোগ নেই, সকলে জানতে পারবে।

    এদিকে দীপার জন্যে পাত্রের সন্ধান শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু পালটি ঘর যদি পাওয়া যায় তো পাত্র পছন্দ হয় না, পাত্র যদি পছন্দ হয় তো ঠিকুজি কোষ্ঠীর মিল হয় না। বিয়ের কথা মোটেই এগুচ্ছে না।

    পৌষ মাসের শেষের দিকে একদিন দুপুরবেলা দীপা টেলিফোনে তার প্রেমিকের সঙ্গে চুপি চুপি পরামর্শ করল, তারপর কোমরে আঁচল জড়িয়ে তেতলায় ঠাকুরদার সঙ্গে দেখা করতে গেল।

    দীপা সাহসিনী মেয়ে, কিন্তু তার সাহসের সঙ্গে খানিকটা একগুঁয়েমি মেশানো আছে। ঠাকুরদার সঙ্গে তার সম্বন্ধ বড় বিচিত্র; সে ঠাকুরদাকে যত ভালবাসে, বাড়িতে আর কাউকে এত ভালবাসে না। কিন্তু সেই সঙ্গে সে ঠাকুরদাকে ভয়ও করে। তিনি তার কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হবেন এ কথা ভাবতেই সে ভয়ে কাঁটা হয়ে যায়। তাই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তার ঊরু আর হাঁটু অল্প কাঁপতে লাগল।

    উদয়মাধব মুখুজ্জে একদিন বুড়ো বয়সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান, তাঁর মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। এই আঘাতের ফলে তাঁর নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে যায়, চলে ফিরে বেড়াবার ক্ষমতা আর থাকে না। এ ছাড়া তাঁর স্বাস্থ্য বেশ ভালই। দোহারা গড়নের শরীর, মুখের চওড়া চোয়ালে প্রবল ব্যক্তিত্বের ছাপ। সত্তর বছর বয়সেও মানসিক শক্তি বিন্দুমাত্র কমেনি। যে দাপট নিয়ে তিনি কলেজের অধ্যক্ষতা করতেন সেই দাপট পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান আছে। তাঁর চিরদিনের অভ্যাস হুঙ্কার দিয়ে কথা বলা। এখনো তিনি হুঙ্কার দিয়েই কথা বলেন।

    দীপা তেতলায় দাদুর ঘরে ঢুকে দেখল তিনি বিছানায় আধ-শোয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। তিনি প্রত্যহ দু’টি খবরের কাগজ পড়েন; সকালবেলা ইংরেজি কাগজ আর দুপুরে দিবানিদ্রার পর বাংলা।

    দীপাকে দেখে উদয়মাধব কাগজ নামালেন, হুঙ্কার দিয়ে বললেন—‘এই যে দীপঙ্করী। আজকাল তোমাকে দেখতে পাই না কেন? কোথায় থাকো?’

    দীপার নাম শুধুই দীপা, কিন্তু উদয়মাধব তাকে দীপঙ্করী বলেন। ঠাকুরদার চিরপরিচিত সম্ভাষণ শুনে তার ভয় অনেকটা কমল, সে খাটের পায়ের দিকে বসে বলল—‘আজ সকালেই তো দেখেছেন দাদু। আমি আপনার চা আর ওষুধ নিয়ে এলুম না?’

    উদয়মাধব বললেন—‘ওহো, তাই নাকি! আমি লক্ষ্য করিনি। তা এখন কী মতলব?’

    দীপা হঠাৎ উত্তর দিতে পারল না, মাথা হেঁট করে বসে রইল। যে কথা বলতে এসেছে তা সহজে বলা যায় না।

    উদয়মাধব কিছুক্ষণ তার পানে চেয়ে অপেক্ষা করলেন। তারপর স্বভাবসিদ্ধ হুঙ্কার ছাড়লেন—‘কী হয়েছে?’

    দীপা তার মনের সমস্ত সাহস একত্র করে দাদুর দিকে ফিরল, তাঁর চোখে চোখ রেখে ধীরস্বরে বলল—‘দাদু, আমি একজনকে বিয়ে করতে চাই, কিন্তু তার জাত আলাদা। আপনার আপত্তি আছে?’

    উদয়মাধব ক্ষণেকের জন্যে যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন, তারপর ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে হুঙ্কার দিলেন—‘কি বললে, একজনকে বিয়ে করতে চাও! এসব আজকাল হচ্ছে কি? নিজের ইচ্ছেয় বিয়ে করবে! তুমি কি ম্লেচ্ছ বংশের মেয়ে?’

    দীপা নতমুখে চুপ করে বসে রইল। উদয়মাধব হুঙ্কারের পর হুঙ্কার দিয়ে বক্তৃতা চালাতে লাগলেন। একটানা হুঙ্কার শুনে নীচে থেকে দীপার মা আর দাদা বিজয়মাধব ছুটে এল, দু’-একটা ঝি-চাকরও দোরের কাছ থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারতে লাগল। দীপা কাঠ হয়ে বসে রইল।

    আধ ঘণ্টা পরে লেকচার শেষ করে উদয়মাধব বললেন—‘আর যেন কোনো দিন তোমার মুখে এ কথা শুনতে না পাই। তুমি এ বংশের মেয়ে, আমার নাতনী, আমি দেখেশুনে যার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব তাকেই তুমি বিয়ে করবে। যাও।’

    দীপা নীচে নেমে এল; বিজয়ও তার সঙ্গে সঙ্গে এল। দীপা নিজের শোবার ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে, বিজয় কটমট তাকিয়ে কড়া সুরে বলল—‘এই শোন্‌। কাকে বিয়ে করতে চাস্‌?’

    জ্বলজ্বলে চোখে দীপা ফিরে দাঁড়াল, তীব্র চাপা স্বরে বলল—‘বলব না। মরে গেলেও বলব না।’ এই বলে নিজের ঘরে ঢুকে দড়াম করে দোর বন্ধ করে দিল।

    অতঃপর দীপা বাড়িতে প্রায় নজরবন্দী হয়ে রইল। আগে যদি-বা দু’-একবার নিজের সখীদের কাছে যাবার জন্য বাড়ির বাইরে যেতে পেত, এখন আর তাও নয়। সর্বদা বাড়ির সবাই যেন শতচক্ষু হয়ে তার ওপর নজর রেখেছে। কেবল দুপুরবেলা ঘণ্টাখানেকের জন্যে সে দৃষ্টিবন্ধন থেকে মুক্তি পায়। তার মা নিজের ঘরে গিয়ে একটু চোখ বোজেন, তার দাদা বিজয় কাজের তদ্‌বিরে বেরোয়। বাবা নীলমাধব দশটার আগেই কলেজে চলে যান, ঠাকুরদা তেতলায় নিজের ঘরে আবদ্ধ থাকেন। সুতরাং দীপাকে কেউ আগলাতে পারে না। দীপাও বিদ্রোহের কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না।

    বস্তুত বাড়ির লোকের ধারণা হয়েছিল, পিতামহের লেকচার শুনে দীপার দিব্যজ্ঞান হয়েছে, সে আর কোনো গোলমাল করবে না। দুপুরবেলা যে টেলিফোন সক্রিয় হয়ে ওঠে, তা কেউ জানে না।

    তারপর একদিন—

    ঘটনাচক্রে বিজয় দুপুরবেলা সকাল সকাল বাড়ি ফিরছিল। সে আজ যার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তার দেখা পায়নি, তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে সে দেখতে পেল, দীপা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা বালিগঞ্জ রেল স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। বিজয়ের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। একলা দীপা কোথায় যাচ্ছে! দীপার বান্ধবী শুভ্রার বাড়িতে? কিন্তু শুভ্রার বাড়ি তো এদিকে নয়, ঠিক উল্টো দিকে; অন্য কোনো বান্ধবীও এদিকে থাকে না। বিজয় সজোরে পা চালিয়ে দীপাকে ধরবার উদ্দেশ্যে চলল।

    ‘এই, কোথায় যাচ্ছিস?’

    তীরবিদ্ধের মত দীপা ফিরে দাঁড়াল। সামনেই দাদা। বিজয় কড়া সুরে বলল—‘একলা কোথায় যাচ্ছিস?’

    দীপার মুখে কথা নেই; সে একবার ঢোক গিলল। বিজয় গলা আরো চড়িয়ে বলল—‘কার হুকুমে একলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিস? চল, ফিরে চল!’

    এবার দীপার মুখ থেকে কথা বেরল—‘যাব না।’

    রাস্তায় বেশি লোক চলাচল ছিল না, যারা ছিল তারা ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে লাগল। দীপা দাঁড়িয়ে আছে দেখে বিজয় বলল—‘ভাল কথায় যাবি, না চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে যাব?’

    দীপার বুক ফেটে কান্না এল। রাস্তার মাঝখানে এ কি কেলেঙ্কারি! এখনি হয়তো চেনা লোক কেউ দেখতে পাবে। দীপা কোনো মতে দুরন্ত কান্না চেপে বঁড়শির মাছের মত বাড়ির দিকে ফিরে চলল।

    বিজয় বাড়িতে ঢুকে ‘মা মা বলে দু’বার ডাক দিয়ে বসবার ঘরে গিয়ে ঢুকল; দীপা আর দাঁড়াল না, দোতলায় উঠে নিজের ঘরে দোর বন্ধ করল।

    বিজয় বসবার ঘরে ঢুকতেই তার নজরে পড়ল টেলিফোন যন্ত্রের নীচে এক টুকরো সাদা কাগজ চাপা রয়েছে। কাছে গিয়ে কাগজের টুকরোটা তুলে নিয়ে পড়ল, তাতে লেখা রয়েছে—‘আমি যাকে বিয়ে করতে চাই তার সঙ্গে চলে যাচ্ছি। তোমরা আমার খোঁজ করো না। —দীপা।’

    এতটা বিজয়ও ভাবতে পারেনি। সে চিঠি নিয়ে সটান ঠাকুরদার কাছে গেল। বাবা-মাও জানতে পারলেন। কিন্তু ঝি-চাকরের কাছে কথাটা লুকিয়ে রাখতে হল। উদয়মাধব গুম হয়ে রইলেন, হুঙ্কার দিয়ে বক্তৃতা করলেন না। ভিতরে ভিতরে দীপার ওপর পীড়ন চলতে লাগল—যার সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছিল, সে কে? নাম কি? দীপা কিন্তু মুখ টিপে রইল, নাম বলল না।

    নিভৃত পারিবারিক মন্ত্রণায় স্থির হল, সর্বাগ্রে দীপার বিয়ে দেওয়া দরকার; যেখান থেকে হোক পালটি ঘরের সৎ পাত্র চাই। আর দেরি নয়।

    বাড়ির মধ্যে সকলের চেয়ে বিজয়ের দুশ্চিন্তা বেশি। তার স্বভাব একটু তীব্র গোছের। তার বোন কোনো অজানা লোকের সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল এ লজ্জা যেন তারই সবচেয়ে মর্মান্তিক। সে উঠে পড়ে লেগে গেল পাত্র খুঁজতে।

    পাড়ার নৃপতি লাহার বাড়িতে কয়েকটি যুবকের আড্ডা বসত, আগে বলা হয়েছে। বিজয় এই আড্ডায় আসত, এখানে অন্য যারা আসত তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল, নৃপতি লাহার সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল।

    নৃপতি লাহারা সাত পুরুষে বড়মানুষ, কিন্তু বর্তমানে সে ছাড়া বংশে আর কেউ নেই। তার বয়স এখন আন্দাজ পঁয়ত্রিশ বছর, নিঃসন্তান অবস্থায় বিপত্নীক হবার পর আর বিয়ে করেনি। সে উচ্চশিক্ষিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারী, সারা দিন লেখাপড়া নিয়ে থাকে, সন্ধ্যের পর আড্ডা জমায়।

    বিজয়মাধব একদিন বিকেলবেলা নৃপতির কাছে এল। তখনো আড্ডা জমার সময় হয়নি, নৃপতি বাড়ির নীচের তলার বৈঠকখানায় বসে একখানা বই পড়ছিল। এই ঘরটিতেই রোজ আড্ডা বসে।

    ঘরটি প্রকাণ্ড, সভাঘরের মত। সাবেক কালে এই ঘরে বাবুদের নাচগানের মুজ্‌রো বসত, একালে ঘরটি সোফা চেয়ার প্রভৃতি দিয়ে সাজিয়ে ড্রয়িংরুমে পরিণত করা হয়েছে বটে, কিন্তু সেকালের গদি-মোড়া তক্তপোশ এখনো আসর জাঁকিয়ে বসে আছে। তা ছাড়া টেবিল-হারমোনিয়াম আছে, পিয়ানো আছে, রেডিওগ্রাম আছে। আর আছে তাস পাশা ক্যারাম প্রভৃতি খেলার সরঞ্জাম।

    বিজয় ঘরে ঢুকে দেখল নৃপতি একলা আছে, বলল—‘নৃপতিদা, তোমার সঙ্গে আড়ালে একটা পরামর্শ আছে, তাই আগেভাগে এলাম।’

    নৃপতি বই মুড়ে বিজয়কে একটু ভাল করে দেখল, তারপর সোফায় নিজের পাশে হাত চাপড়ে বলল—‘এস, বসো।’

    বিজয় তার পাশে বসে কথা বলতে ইতস্তত করছে দেখে নৃপতি বলল—‘কিসের পরামর্শ?’

    বিজয় তখন বলল—‘নৃপতিদা, দীপার জন্যে পাত্র খোঁজা হচ্ছে কিন্তু মনের মত পাত্র কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি তো অনেক খবর রাখো। একটা ভাল পাত্রের সন্ধান দাও না।’

    নৃপতি হাত বাড়িয়ে নিকটস্থ টেবিল থেকে সিগারেটের টিন নিল, একটি সিগারেট ঠোঁটে ধরে বলল—‘হুঁ। দীপার এখন বয়স কত?’

    ‘সতেরো। আমাদের বংশে—’

    নৃপতি দেশলাই জ্বালাবার উপক্রম করে বলল—‘তোমাদের বংশের কথা জানি। গৌরীদান করতে পারলেই ভাল হয়। তা কি রকম পাত্র চাও? বিদ্বান হবে, পয়সাকড়ি থাকবে, চেহারা ভালো হবে, এই তো?’

    বিজয় বলল—‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আসল কথাটাই বললে না। পালটি ঘর হওয়া চাই।’

    সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নৃপতির ঠোঁটের কোণে একটু ব্যঙ্গহাসি খেলে গেল। সে বলল—‘তাও তো বটে। বংশের ধারা বজায় রাখতে হবে বইকি। তা তোমরা হলে গিয়ে মুখুজ্জে, সুতরাং চাটুজ্জে বাঁড়ুজ্জে গাঙ্গুলি কিংবা ঘোষাল চাই। বারেন্দ্র চলবে না?’

    ‘না, নৃপতিদা, জানোই তো আমরা আজ পর্যন্ত সাবেক চাল বজায় রেখে চলেছি।’

    ‘জানি বইকি। তোমরা হচ্ছ আরশোলা গোষ্ঠীর জীব।’

    ‘আরশোলা গোষ্ঠীর জীব মানে?’

    ‘আরশোলা অতি প্রাচীন জীব, কোটি কোটি বছর আগে জন্মেছিল; তারপর জীবজগতে অনেক বিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু আরশোলা আরশোলাই রয়ে গেছে। তাই আজকাল আর তাদের বেশি কদর নেই।’

    ‘সে যাই বল, বর্ণাশ্রম ধর্ম আমি মেনে চলি। গীতায় শ্রীভগবান বলেছেন, চাতুর্বর্ণ্যং—’

    নৃপতি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল; সিগারেট টানতে টানতে সে বোধ করি মনে মনে উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করছিল। সিগারেট শেষ করে সে বলল—‘একটি ছেলে আছে, কিন্তু তোমাদের পালটি ঘর কিনা খোঁজ নিতে হবে। তুমি আজ বাড়ি যাও, কাল খবর পাবে।’

    ‘আচ্ছা’, বলে বিজয় চলে গেল।

    নৃপতি কব্জির ঘড়িতে দেখল পাঁচটা বেজেছে। সিগারেটের টিন পকেটে নিয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তার গন্তব্যস্থল বেশি দূর নয়, পাঁচ মিনিটের রাস্তা।

    দেবাশিসের সদর দরজার ঘণ্টি টিপতেই নকুল এসে দোর খুলল। নৃপতি বলল—‘দেবাশিসবাবু আছেন?’

    নকুল বলল—‘আজ্ঞে, তিনি এইমাত্র ফেক্টারি থেকে বাড়ি ফিরেছেন—’

    এই সময় দেখা গেল দেবাশিস সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। সে সদর দোরের কাছে এলে নৃপতি একটু হেসে বলল—‘আমাকে আপনি চিনবেন না, আপনার বাবা শুভাশিসবাবুর সঙ্গে আমার সামান্য পরিচয় ছিল। আমার নাম নৃপতি লাহা।’

    দেবাশিসের মুখেও হাসি ফুটল—‘আপনাকে চিনি না বটে, কিন্তু নাম জানি। আপনার বাড়িও দেখেছি। আসুন।’ সে নৃপতিকে বসবার ঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে থমকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলল—‘বসবার ঘরে না গিয়ে চলুন খাবার ঘরে যাই। চায়ের সময় হয়েছে।’

    নৃপতি বলল—‘বেশ তো।’

    দু’জনে খাবার ঘরে গিয়ে টেবিলে বসল। দেবাশিস বলল—‘নকুল, আমাদের চা জলখাবার দাও।’

    নৃপতি বলল—‘আমার চা হলেই চলবে।’

    খেতে খেতে দু’জনের কথা হতে লাগল। বছর ছয়-সাত আগে দেবাশিসের বাবার সঙ্গে নৃপতির পরিচয় হয়েছিল; দেবাশিস তখন কলকাতায় থাকত না, দিল্লীতে পড়াশুনো করতে গিয়েছিল। শুভাশিসবাবু একদিন নৃপতির বাড়ির সামনে ফুটপাথের ওপর পা পিছলে পড়ে যান, নৃপতি তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফার্স্ট এড্‌ দিয়েছিল। তারপর শুভাশিসবাবু তাঁর ফ্যাক্টরিতে তৈরি প্রচুর কেশতৈল সাবান কোল্ড ক্রিম প্রভৃতি তাকে উপহার দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে তার বাড়িতে এসে তত্ত্ব-তল্লাশ নিতেন। বছর দুই পরে তিনি যখন মারা গেলেন তখন নৃপতি খবর পেল না, একেবারে খবর পেল মাস তিনেক পরে। এমনি কলকাতা শহর। শুভাশিসবাবুর মৃত্যু-সংবাদ নৃপতিকে জানাবে এমন লোক কেউ ছিল না।

    দেবাশিস দিল্লীতে তার বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে থেকে কলেজে পড়াশুনো করছিল। বাল্যকালেই তার মা মারা গিয়েছিলেন। বাবার বন্ধুটি ছিলেন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা বিজ্ঞান-অধ্যাপক। দেবাশিস এম. এস-সি. পাস করে দিল্লী থেকে চলে এল। তার মাসখানেক পরেই তার বাবা মারা গেলেন।

    নৃপতি প্রশ্ন করল—‘আপনার বাড়িতে আর কে আছে?’

    দেবাশিস বলল—‘আর কেউ নেই, আমি একা। কিংবা আমি আর নকুল বলতে পারেন। নকুল এ বাড়িতে আমি জন্মাবার আগে থেকে আছে।’

    ‘বিয়ে করেননি?’

    ‘আমি লেখাপড়া শেষ করে ফিরে আসার পরই বাবা মারা গেলেন, তারপর আর হয়ে ওঠেনি।’

    ‘হুঁ। ভাল কথা, আপনার উপাধি যখন ভট্ট তখন নিশ্চয় ব্রাহ্মণ। গোত্র জানা আছে কি?’

    ‘যখন পইতে হয় শুনেছিলাম শাণ্ডিল্য গোত্র। বাঁড়ুজ্জে।’

    ‘বাঃ, বেশ। আচ্ছা, আমি যদি ঘটকালি করি, আপনার আপত্তি হবে কি?’

    দেবাশিস মুখে টিপে একটু হাসল, উত্তর দিল না। নকুল এতক্ষণ ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কথাবার্তা শুনছিল, এখন এগিয়ে এসে বলল—‘হ্যাঁ বাবু, আপনি করুন। ঘরে একটি বউ দরকার। আমি বুড়ো মানুষ আর কত দিন সংসার চালাব।’

    ‘তাই হবে।’ নৃপতি চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল। —‘আজ চলি। আমার বাড়িতে রোজ সন্ধ্যেবেলা আড্ডা বসে, পাড়ার ছেলেরা আসে। আপনিও আসেন না কেন?’

    ‘আচ্ছা, যাব।’

    ‘আজই চলুন না!’

    দেবাশিস একটু ইতস্তত করে বলল—‘আজই? বেশ, চলুন।’

    দু’জনে বেরুল। তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। নৃপতির বাড়ির সামনে এসে তারা শুনতে পেল বৈঠকখানায় কেউ লঘু আঙুলের স্পর্শে পিয়ানো বাজাচ্ছে।

    বৈঠকখানা ঘরে তিনটে উজ্জ্বল আলো জ্বলছে। কেবল একটি মানুষ ঘরে আছে, দেয়াল-ঘেঁষা পিয়ানোর সামনে বসে আপন মনে বাজিয়ে চলেছে।

    নৃপতি দেবাশিসকে নিয়ে ঘরে ঢুকল, বলল—‘ওহে প্রবাল, দ্যাখো, আমাদের আড্ডায় একটি নতুন সভ্য পাওয়া গেছে। এঁর নাম দেবাশিস ভট্ট।’

    প্রবাল নামধারী যুবক পিয়ানো থেকে উঠে এল। নিরুৎসুক স্বরে বলল—‘পরিচয় দেবার দরকার নেই।’

    নৃপতি বলল—‘আগে থাকতেই পরিচয় আছে নাকি?’

    প্রবাল বলল—‘সামান্য। গরীবের সঙ্গে বড়মানুষের যতটুকু পরিচয় থাকা সম্ভব ততটুকুই।’

    প্রবাল আবার পিয়ানোর সামনে গিয়ে বসল। টুং টাং করে একটা সুর বাজাতে লাগল। তার ভাবভঙ্গী দেখে বেশ বোঝা যায় দেবাশিসকে দেখে খুশি হয়নি। সে বয়সে দেবাশিসের চেয়ে দু’এক বছরের বড়, মাঝারি দৈর্ঘ্যের বলিষ্ঠ চেহারা, মুখের গড়নে বৈশিষ্ট্য না থাকলেও জৈব আকর্ষণ আছে; চোখের দৃষ্টি অপ্রসন্ন। কিন্তু তার চেহারা যেমনই হোক সে ইতিমধ্যে গায়ক হিসেবে বেশ নাম করেছে। তার কয়েকটা গ্রামোফোন রেকর্ড খুব জনপ্রিয় হয়েছে; রেডিও থেকেও মাঝে মাঝে ডাক পায়।

    প্রবালের সঙ্গে দেবাশিসের অনেকদিন দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এক সময় তারা একসঙ্গে স্কুলে পড়ত, ভাবসাব ছিল; তারপর দেবাশিস স্কুল থেকে পাস করে দিল্লীতে পড়তে চলে গেল। কয়েক বছর পরে এই প্রথম দেখা। এই কয় বছরের মধ্যে দেবাশিসের বাবা ‘প্রজাপতি প্রসাধন’ নামে শৌখিন টয়লেট দ্রব্যের কারখানা খুলে বড়মানুষ হয়েছেন। আর প্রবালের বাবা হঠাৎ হার্ট ফেল করে মারা যাওয়ার ফলে তাদের সম্পন্ন অবস্থার খুবই অধোগতি হয়েছে। প্রবাল গান গেয়ে কোনো মতে টিকে আছে।

    প্রবালের কথা বলার ভঙ্গীতে দেবাশিস বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল, নৃপতি তাকে ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে সোফায় পাশাপাশি বসে গল্প করতে লাগল। বলল—‘আমার আড্ডায় পাঁচ-ছয়জন আসে। কিন্তু সবাই রোজ আসে না। আজ আরো দু’-তিনজন আসবে।’

    নৃপতি দেবাশিসের সামনে সিগারেটের টিন খুলে ধরল, দেবাশিস মাথা নেড়ে বলল—‘ধন্যবাদ। আমি খাই না।’

    নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে নৃপতি খাটো গলায় বলল—‘প্রবাল গুপ্ত গাইয়ে-বাজিয়ে লোক, একটু বেশি সেন্‌সিটিভ্‌, আপনি কিছু মনে করবেন না। ক্রমে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

    এই সময় বাইরে থেকে একটি যুবক সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সিল্কের লম্বা প্যান্ট ও বুশ্‌-কোট পরা সুগঠিত সুদর্শন চেহারা, ধারালো মুখে আভিজাত্যের ছাপ, বেশ দৃঢ় চরিত্রের ছেলে বলে মনে হয়, বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। তাকে দেখে নৃপতি বলল—‘এই যে কপিল। এস পরিচয় করিয়ে দিই। কপিল বোস—দেবাশিস ভট্ট।’

    নমস্কার প্রতিনমস্কারের পর কপিল বলল—‘নৃপতিদা, তোমার টেলিফোন একবার ব্যবহার করব। রাস্তায় আসতে আসতে একটা জরুরী কথা মনে পড়ে গেল।’

    ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়।’

    কপিল পাশের ঘরে চলে গেলে নৃপতি বলল—‘কপিল ছেলেটা ভাল, বাপ অগাধ বড়মানুষ, কিন্তু ওর কোনো বদ্‌খেয়াল নেই। লেখাপড়া শিখেছে, টেনিস বিলিয়ার্ড খেলে দিন কাটায়, রাত্তিরে দূরবীন লাগিয়ে আকাশের তারা গোনে। কেবল একটি দোষ, বিয়ে করতে চায় না।’

    প্রবাল হঠাৎ পিয়ানো ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নৃপতির দিকে তাকিয়ে বলল—‘আজ চললাম নৃপতিদা।’ দেবাশিসকে সে লক্ষ্যই করল না।

    নৃপতি বলল—‘চললে? এত সকাল সকাল? রেডিওতে গাইতে হবে বুঝি? কাগজে যেন দেখেছিলাম আজ রাত্রে তোমার প্রোগ্রাম আছে।’

    প্রবাল বলল—‘প্রোগ্রাম আছে। কিন্তু গান আগেই রেকর্ড হয়ে গেছে, আমাকে স্টুডিও যেতে হবে না। আমি বাসায় যাচ্ছি।’

    নৃপতি বলল—‘বাসায় যাচ্ছ। তোমার বউ-এর খবর ভাল তো?’

    প্রবাল উদাস স্বরে বলল—‘তোমাদের বলিনি নৃপতিদা, বউ মাসখানেক আগে মারা গেছে। হার্টের রোগ নিয়ে জন্মেছিল; ডাক্তারেরা বলে বারো-চৌদ্দ বছর বয়সের মধ্যে অপারেশন না করালে এ রোগে কেউ একুশ-বাইশ বছরের বেশি বাঁচে না। আমার শ্বশুর রোগ লুকিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। —আচ্ছা, চললাম।’

    নৃপতি ও দেবাশিস স্তব্ধ হয়ে রইল। স্ত্রী মারা গেছে অথচ আড্ডার কাউকে কিছু বলেনি; আপন মনে পিয়ানো বাজায় আর চলে যায়। নৃপতি জানত প্রবালের স্ত্রীর মরণান্তক রোগ, কিন্তু খবর শুনে হঠাৎ তার মুখে কথা যোগালো না।

    এই সময় কপিল পাশের ঘর থেকে ফিরে এসে তাদের কাছে দাঁড়াল। সে প্রবালের কথাগুলো শুনতে পায়নি, তার দিকে তাকিয়ে বলল—‘বেশ তো পিয়ানো বাজাচ্ছিলে, চললে নাকি? একটা গান শোনাও না।’

    প্রবাল তীব্র বিদ্বেষভরা চোখে তার পানে চেয়ে রুদ্ধস্বরে বলল—‘আমার গান বিনা পয়সায় শোনা যায় না। পয়সা খরচ করতে হয়।’

    কপিল এরকম কড়া জবাবের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, সে একটু হক্‌চকিয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে হেসে উঠল। বলল—‘পয়সা খরচ করেই যদি গান শুনতে হয় তাহলে তোমার গান শুনব কেন? তোমার চেয়ে অনেক ভাল গাইয়ে আছে।’

    প্রবাল আর দাঁড়াল না, হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কপিল একটা চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল, নৃপতি অপ্রতিভ মুখে বলল—‘আজ প্রবালের মেজাজটা ভাল নেই।’

    কপিল বলল—‘প্রবালের মেজাজ সর্বদাই সপ্তমে চড়ে থাকে। ধাতুগত বিকার।’

    ‘ওর স্ত্রী মারা গেছে।’

    কপিল চকিত হয়ে বলল—‘তাই নাকি! আমি জানতাম না। ছি ছি, অসভ্যতা করে ফেলেছি।’

    নৃপতি বলল—‘যাক গে। তুমি কেমন আছ বলো। কয়েকদিন তোমাকে দেখিনি।’

    কপিল বলল—‘প্ল্যান করেছিলাম বাঙ্গালোরে বেড়াতে যাব, কিন্তু প্ল্যান ভেস্তে গেল।’

    ‘ভেস্তে গেল কেন?’

    ‘আমার সঙ্গে যার যাবার কথা ছিল সে যেতে পারল না। একলা বেড়িয়ে সুখ নেই।’

    ‘তা বটে। কিন্তু তুমি বিয়ে করছ না কেন? বিয়ে করলে তো একটি চিরস্থায়ী সহযাত্রী পাবে।’

    কপিল হেসে উঠল, থিয়েটারী কায়দায় বাহু প্রসারিত করে বলল—‘কবি বলেছেন, হব না তাপস নিশ্চয় যদি না মেলে তপস্বিনী। আমিও কবির দলে।’

    নৃপতি বলল—‘কিন্তু শুনেছি তোমার বাবা তপস্বিনী জোটাবার ত্রুটি করেননি, গোটা পঞ্চাশেক সুন্দরী তপস্বিনী দেখেছেন। একটিও তোমার পছন্দ হল না?’

    কপিল একটু গম্ভীর হয়ে বলল—‘সুন্দরী মেয়ে অনেক আছে নৃপতিদা, কিন্তু শুধু সুন্দরী হলেই তো চলে না। আমি এমন বউ চাই যার মন হবে আমার মনের সমান্তরাল, অর্থাৎ সমানধর্মা। —কথাটা বুঝেছেন?’

    ‘বুঝেছি। তুমি হুঁশিয়ার লোক। তা নিজে পছন্দ করে বিয়ে কর না কেন? তোমার বাবা নিশ্চয় অমত করবেন না।’

    কপিল হেসে বলল—‘সেই চেষ্টাতেই আছি।’

    তারপর সাধারণভাবে কথা হতে লাগল। দেবাশিস এতক্ষণ কেবল নিশ্চেষ্ট শ্রোতা ছিল, এখন সেও কথাবার্তায় যোগ দিল। দেবাশিসের পূর্ণতর পরিচয় শুনে কপিল বলল—‘আরে তাই নাকি! আপনিই প্রজাপতি প্রসাধন প্রডাক্টস্‌? আমরা যে বাড়িসুদ্ধ আপনার তেল সাবান স্নো ক্রিম ব্যবহার করি। তা অ্যাদ্দিন আপনি ছিলেন কোথায়?’

    দেবাশিস বলল—‘এখানেই ছিলাম, কিন্তু নৃপতিবাবুর সঙ্গে আলাপ ছিল না।’

    আরো খানিকক্ষণ গল্পসল্প হল। চাকর এসে ছোট ছোট পেয়ালায় কফি দিয়ে গেল। ক্রমে আটটা বাজল। নৃপতি বলল—‘আজ বোধ হয় আর কেউ আসবে না।’

    দেবাশিস বলল—‘আজ উঠি।’

    কপিল বলল—‘এরি মধ্যে! আমাদের আড্ডা ন’টা সাড়ে ন’টা পর্যন্ত চলে।’

    দেবাশিস হেসে বলল—‘আবার আসব।’

    নৃপতি জিজ্ঞেস করল—‘কাল আসতে পারবেন?’

    দেবাশিস বলল—‘আচ্ছা, কাল আসব।’—

    পরদিন দেবাশিস একটু দেরি করে এল। ইচ্ছে ছিল সাড়ে আটটা ন’টা পর্যন্ত থেকে গল্পগুজব করবে। বাড়িতে রোজ সন্ধ্যেবেলা একলা বিজ্ঞানের বই আর সাময়িক পত্র পড়ে কাটে, এখানে নতুন লোকের সঙ্গ পাওয়া যাবে। প্রবালের অসামাজিক ব্যবহার সত্ত্বেও নৃপতির আড্ডটি তার ভাল লেগে গিয়েছিল।

    সাড়ে ছ’টার সময় নৃপতির বৈঠকখানায় গিয়ে দেবাশিস দেখল প্রবাল পিয়ানোর সামনে বসে চাবির ওপর আঙুল বুলোচ্ছে, কপিল এবং আর একটি ছেলে তক্তপোশের পাশে বসে পাঞ্জা লড়ছে; নৃপতি এবং অন্য একটি যুবক পাশাপাশি বসে গল্প করছে। নৃপতি তাকে হাত তুলে ডাকল।

    দেবাশিস কাছে গেলে নৃপতি বলল—‘বসুন এখানে। পরিচয় করিয়ে দিই। দেবাশিস ভট্ট—বিজয়মাধব মুখুজ্জে। বিজয় হচ্ছে অধ্যাপক বংশের ছেলে, সম্প্রতি সংস্কৃতে এম.এ. পাস করে অধ্যাপনার কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছে।’ দেবাশিসের পূর্ণ পরিচয় নৃপতি আগেই বিজয়কে দিয়েছিল, আর পুনরাবৃত্তি করল না।

    বিজয় উৎসুক চোখে দেবাশিসকে দেখতে লাগল। নৃপতি তাদের মাঝখান থেকে উঠে পড়ল, বলল—‘তোমরা গল্প কর, আমি আসছি।’

    বিজয় দেবাশিসের দিকে একটু ঘেঁষে বসল। বলল—‘এক পাড়াতে থাকি, অ্যাদ্দিন আলাপ-পরিচয় হয়নি, কি আশ্চর্য বলুন দেখি।’ চেহারা দেখেই দেবাশিসকে তার পছন্দ হয়েছিল; দীপার উপযুক্ত বর।

    যদিও কলকাতা শহরে পাশাপাশি বাস করেও আলাপ-পরিচয় না হওয়াতে আশ্চর্য কিছু নেই, তবু দেবাশিস হাসিমুখে বলল—‘আশ্চর্য বইকি।’

    ওদিকে কপিল আর অন্য ছেলেটির পাঞ্জা লড়া শেষ হয়েছিল, নৃপতি তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল—‘কি হে খড়্গ বাহাদুর, তোমার দেশে যাবার কথা ছিল না?

    খড়্গ বাহাদুর প্রফুল্ল স্বরে বলল—‘কথা তো ছিল নৃপতিদা, কিন্তু যাওয়া হল না।’

    খড়্গ বাহাদুর নেপালী যুবক। তার মা বাঙালী। তাই তার মাতৃভাষা বাংলা। চমৎকার চেহারা, যেমন পীতাভ সোনালী রঙ তেমনি লম্বা ছিপছিপে গড়ন। তার মুখে চোখে মঙ্গোলীয় রক্তের ছাপ এত অল্প যে ধরা যায় না। বর্তমানে সে বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ ফুটবল খেলোয়াড়; পায়ের কাছে বল পেলে সে যাদুকর বনে যায়। কলকাতার সবচেয়ে নামজাদা ফুটবল ক্লাবের সে খেলোয়াড়। তার খেলা দেখবার জন্যে লক্ষ লক্ষ দর্শক মাঠে জমা হয়। কিন্তু তার চরিত্রে বিন্দুমাত্র চালিয়াতি নেই। উচ্চবংশের ছিলে, কিন্তু ভারি বিনয়ী। বয়স তেইশ কি চব্বিশ।

    নৃপতি বলল—‘কেন, যাওয়া হল না কেন?’

    খড়্গ বাহাদুর বলল—‘কাঠমাণ্ডুতে বিয়ের সব ঠিকঠাক হয়েছিল, হঠাৎ তার পেলাম কীসব গণ্ডগোল হয়েছে, বিয়ে পেছিয়ে গেছে।’

    নৃপতি বলল—‘তার মানে এক বছরের ধাক্কা। ফুটবল সীজন এসে পড়ল, এরপর তুমি তো আর নেপালে গিয়ে বসে থাকতে পারবে না।’

    খড়্গ বাহাদুর চোখে কৌতুক এবং মুখে বিষণ্ণতা নিয়ে মাথা নাড়ল।

    চাকর বড় একটি ট্রে’র ওপর কয়েক পেয়ালা কফি নিয়ে এল, সকলেই এক এক পেয়ালা তুলে নিল। এই সময় সদর দরজার কাছ থেকে আওয়াজ এল—‘ওহে, আমিও আছি, আমার জন্যে এক পেয়ালা রেখো।’

    একটি যুবক প্রবেশ করল। রজতগৌর বর্ণ, মুখের ছাঁচ কেষ্টনগরের পুতুলকেও হার মানায়; চোখ দু’টি উজ্জ্বল, ক্ষৌরিত মুখে একটা হাসি লেগে আছে। বয়স সাতাশ-আটাশ।

    নৃপতি বলল—‘এস সুজন।’

    সুজন মিত্র একজন উদীয়মান চিত্রনক্ষত্র; দু’ তিনখানা ছবি করেই বেশ নাম করেছে। যেমন গম্ভীর ভূমিকায় অভিনয় করতে পারে, তেমনি হাস্যরস সৃষ্টির ক্ষমতাও আছে। সবচেয়ে বড় কথা, হঠাৎ খ্যাতি ও অর্থ লাভ করেও তার মেজাজ বিগড়ে যায়নি। নিজের কথা সাত কাহন করে বলতে সে ভালবাসে না। বস্তুত তার সম্বন্ধে কেউ বড় কিছু জানে না। স্ত্রীজাতির প্রতি তার আসক্তির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এমন কি সে বিবাহিত কি অবিবাহিত তাই কেউ জানে না। দক্ষিণ কলকাতার একান্তে একটি ছোট বাড়িতে একলা থাকে, বেশির ভাগ সময়ই হোটেলে খায়। অত্যন্ত অনাড়ম্বর এবং অপ্রকট তার জীবন।

    সুজন ট্রে থেকে টপ্ করে একটা পেয়ালা তুলে নিয়ে বলল—‘ঠিক সময়ে এসেছি, আর একটু হলে ফাঁকি পড়তাম।’

    কফিতে একটি চুমুক দিয়ে সে তার উজ্জ্বল অভিনেতার চোখ দু’টি ঘরের চারিদিকে ফেরাল, তারপর দেবাশিসকে দেখে হ্রস্ব কণ্ঠে বলল—‘নৃপতিদা, নতুন অতিথির সমাগম হয়েছে দেখছি!’

    নৃপতি বলল—‘হ্যাঁ, এস তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। খড়্গ, তুমিও এস।’

    পরিচয় বিনিময়ের পর সুজন মিটিমিটি হেসে বলল—‘দেবাশিসবাবু, এখন বলুন দেখি আপনি ফুটবল খেলা দেখতে ভালবাসেন, না সিনেমা দেখতে ভালবাসেন?’

    দেবাশিস বলল—‘দুই-ই ভালবাসি। খেলার মাঠে এবং রূপালী পর্দায় আপনাদের দু’জনকে অনেকবার দেখেছি।’

    তারপর সকলে মিলে খানিকক্ষণ হাসিগল্প চালাল। প্রবাল কিন্তু তাদের সঙ্গে যোগ দিল না, নিজের মনে টুং টাং করে পিয়ানো বাজিয়ে চলল।

    রাত আন্দাজ ন’টার সময় সভা ভঙ্গ হল। দেবাশিস বেশ প্রফুল্ল মনে বাড়ি ফিরে এল।

    এইভাবে কয়েকদিন কাটাবার পর এক রবিবার সকালবেলা বিজয়, তার বাবা নীলমাধব এবং নৃপতি দেবাশিসের বাড়িতে দেখা করতে এল। দেবাশিস তাদের খাতির করে নীচের তলায় বসবার ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালো এবং নকুলকে চায়ের হুকুম দিল।

    নীলমাধব মুখুজ্জে অতিশয় গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি আগে বিজয়ের মুখে দেবাশিস সম্বন্ধে সব কথা শুনেছিলেন এবং তত্ত্ব-তল্লাশও নিয়েছিলেন। পাত্রটিকে সৎপাত্র মনে হওয়ায় তিনি এখন স্বচক্ষে দেখতে এসেছেন। তিনি দেবাশিসকে উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করলেন এবং নৃপতির দিকে ঘাড় নেড়ে সন্তোষ জ্ঞাপন করলেন।

    ইতিমধ্যে চা এসে পড়েছে। নৃপতি চা খেতে খেতে নিপুণভাবে বিয়ের প্রস্তাব তুলল। নৃপতির ঘটকালির দিকে বিশেষ দক্ষতা আছে।

    আধ ঘন্টার মধ্যে বিয়ের ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল। দেবাশিসের ঠিকুজি কোষ্ঠী ছিল না তাই জ্যোতিষের যোটক বাদ দিতে হল। নৃপতি বলল—‘দেবাশিস, দীপাকে তোমার অপছন্দ হবে না জানি, তবু একবার দেখা দরকার। আজ বিকেলে আমি এসে তোমাকে এঁদের বাড়িতে নিয়ে যাব। কেমন?’

    দেবাশিস সম্মত হল। বলা বাহুল্য, এই ক’দিনে নৃপতি ও দেবাশিসের ঘনিষ্ঠতা ‘তুমি’ ও ‘নৃপতিদার’ পর্যায়ে নেমেছে।

    সেদিন অপরাহ্ণে নৃপতি এসে দেবাশিসকে দীপাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। বৈঠকখানা ঘরে আসর হয়েছিল; আড়ম্বর কিছু নয়, টেবিলের মাঝখানে ফুলদানিতে এক গুচ্ছ ফুল, তক্তপোশের ওপর মখমলের আস্তরণ এবং মোটা তাকিয়া। বিজয় তাদের নিয়ে গিয়ে ঘরে বসালো, তারপর নীলমাধব এসে দেবাশিসকে তেতলার ঘরে নিয়ে গেলেন। উদয়মাধব তার সঙ্গে দু’চারটে কথা বললেন; তাঁর মুখ দেখে বোঝা গেল ভাবী নাতজামাই দেখে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন।

    তারপর নীলমাধব দেবাশিসকে নিয়ে আবার নীচে নেমে এলেন। পাঁচ মিনিট পরে বিজয় গিয়ে দীপাকে নিয়ে এল, দীপা এসে টেবিলের কাছে দাঁড়াল। পরনে আটপৌরে শাড়ি ব্লাউজ, কানে ছোট ছোট দু’টি সোনার আংটি, গলায় সরু হার, হাতে তিনগাছি করে চুড়ি। কনে দেখানো উপলক্ষে তাকে সাজগোজ করানো হয়নি, কিংবা সে নিজেই সাজগোজ করেনি। তার সারা দেহে প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহ। একবার সে পলকের জন্য চোখ তুলে দেবাশিসের দিকে চেয়ে আবার চোখ নীচু করল। ভ্রূর ঋজু রেখার নীচে চোখের দৃষ্টি খর।

    দেবাশিসের কিন্তু দীপাকে খুব ভালো লেগে গেল। স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা শূন্য বললেই হয়, তবু দীপাকে দেখে তার মনে মাধুর্যের সঞ্চার হল, মনে হল একে স্ত্রীরূপে পেলে সে সুখী হবে।

    দু’মিনিট পরে বিজয় বলল—‘দীপা, তুমি এবারে যাও। দেখা হয়েছে।’

    দীপা চলে গেল। তারপর মিষ্টিমুখ করে দেবাশিস সলজ্জ সম্মতি জানাল।

    দু’হপ্তার মধ্যে সব ঠিকঠাক, বিয়ে হয়ে গেল। এই দু’হপ্তার মধ্যে দীপা যে তার প্রেমিকের সঙ্গে চুপিচুপি টেলিফোন মারফত বাক্যালাপ করেছে সতর্ক পাহারা সত্ত্বেও কেউ তা জানতে পারল না।

    বিয়ের রাত্রে কনের বাড়িতে নিমন্ত্রিতদের মধ্যে নৃপতির বাড়ির আড্ডাধারীরাও এল, কারণ তারা বিজয়ের বন্ধু। আবার বউভাতের রাত্রে যারা দেবাশিসের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে এল তাদের মধ্যে প্রজাপতি ফ্যাক্টরির সহাকারীদের সঙ্গে নৃপতির দলও এল, কারণ তারা দেবাশিসের বন্ধু। যাকে বলে, বরের ঘরের মাসি কনের ঘরের পিসি।

    দেবাশিসের বাড়িতে স্ত্রীলোক নেই, দীপার কয়েকটি প্রতিবেশিনী সখী এসে ফুলশয্যা সাজিয়ে দিয়ে গেল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া আমোদ-আহ্লাদ চলল। নৃপতির দলই আসর জমিয়ে রাখল। সুজন শুধুই চিত্রাভিনেতা নয়, সে নানারকম ম্যাজিক দেখাল। প্রবাল আজ আর কোনো অশিষ্টতা করল না, নিজে থেকেই গান গেয়ে শোনাল। সকলেই নববধূকে নানা রকম উপহার দিল। নৃপতি দিল সোনার রিস্টওয়াচ, কপিল দিল দামী একটা ঝরনা কলম, খড়্গ বাহাদুর দিল নেপালে তৈরি ঝকঝকে ধারালো কুক্‌রি ছোরা, প্রবাল দিল তার নিজের গাওয়া কয়েকটা গানের রেকর্ড, সুজন দিল একটি রূপোর সরস্বতী মূর্তি। দেবাশিসের ফ্যাক্টরির বন্ধুরাও যথাযোগ্য উপহার দিলেন।

    বউভাতের উৎসব শেষে অতিথির দল যখন বিদায় নিল তখন রাত বারোটা বেজে গেছে। বাড়ির নীচের তলায় রইল ভৃত্য নকুল, আর দোতলায় দেবাশিস এবং দীপা। প্রথম মিলন রাত্রি।

    শেষ অতিথিকে বিদায় দিয়ে দেবাশিস ওপরতলায় গিয়ে দেখল, সব ঘরে বড় বড় আলো জ্বলছে; বসবার ঘরের একটা চেয়ারে দীপা শক্ত হয়ে বসে আছে। দেবাশিস তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেবাশিসের স্বভাব, যা সম্ভাব্য তাই তার মন স্বীকার করে নেয়, বিলক্ষণতার দিকে সহজে তার দৃষ্টি পড়ে না। সে দীপার দিকে দু’ হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধ হেসে বলল—‘এস।’

    দীপা চকিতে একবার চোখ তুলল; তার চোখে ভয়ের ছায়া। দেবাশিস ভাবল, কুমারী মনের স্বাভাবিক লজ্জা। সে দীপার পাশের চেয়ারে বসে তার হাতের ওপর হাত রাখল, বলল—‘বারোটা বেজে গেছে, আর কতক্ষণ বসে থাকবে। চল, শোবার সময় হল।’

    দীপা হাত সরিয়ে নিল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, তবু যা বলবার তা বলতে হবে, আর দেরি করা চলবে না। সে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল—‘আমি—আমি আলাদা শোব।’

    দেবাশিসের মনে কৌতুকের সঙ্গে একটু বিস্ময় মিশল। কথাগুলো যেন একটু বেসুরো, ঠিক লজ্জার মত নয়। তবু সে হাসিমুখেই বলল—‘তুমি আলাদা শুলে ফুলশয্যা হবে কি করে?’

    দীপার শরীর কেঁপে উঠল; সে শরীরের সমস্ত স্নায়ু পেশী শক্ত করে বলল— ‘না— না— আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি—’

    এবার দেবাশিসের মন থেকে কৌতুকের ভাব একেবারে লুপ্ত হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ স্থির চোখে দীপার পানে চেয়ে থেকে বলল—‘কি কথা বলতে চাও?’

    দীপার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়তে লাগল, সে কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—‘আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমি অন্য একজনকে ভালবাসি।’

    কথাটার ভাবার্থ দেবাশিসের মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে বেশ খানিকক্ষণ সময় লাগল, তারপর তার মনে যে দীপ জ্বলেছিল, তা আস্তে আস্তে নিবে গেল; তার মনে হল, ঘরের উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলোটাও যেন কমে কমে পিদ্দিমির চেয়েও নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। সে দীপার পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শুষ্ক প্রশ্ন করল—‘তবে আমাকে বিয়ে করলে কেন?’

    দীপা ঘাড় গুঁজে বসে রইল, কেবল তার অন্তরের ব্যাকুলতা কণ্ঠস্বরে ব্যক্ত হল—‘আমি দোষ করেছি, কিন্তু আমার উপায় ছিল না। বাড়ির লোক জোর করে আমার বিয়ে দিয়েছে।’

    ‘যাকে ভালবাস তাকে বিয়ে করলেই পারতে!’

    ‘জাত আলাদা, তাই—’

    ‘জাত!’ একটা কঠিন হাসি দেবাশিসের মনের মধ্যে হিল্লোলিত হয়ে স্থির হল—‘তা এখন কি করা যেতে পারে?’

    দীপা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ব্যর্থ মিনতির কণ্ঠে বলল—‘আমাকে আপনার বাড়িতে থাকতে দিন, আমি আপনাকে বিরক্ত করব না, আপনার সামনে আসব না—’ তার গলা কান্নায় বুজে এল।

    ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে দেবাশিস নিজের চুলের মধ্যে আঙুল চালাল, বলল—‘এর জন্যে প্রস্তুত ছিলাম না। সব কথা ভেবে দেখতে হবে। তুমি যাও, শোও গিয়ে।’ সে ফুল দিয়ে সাজানো শয়নঘরের দিকে আঙুল দেখাল—‘আমি অন্য কোথাও শোব।’

    দীপা আর দাঁড়াল না, দ্রুত ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। তার চুলে তখনো ফুলের মালা জড়ানো, গলায় হাতে ফুলের গয়না। সেই অবস্থাতেই সে ফুল-ঢাকা বিছানার ওপর আছড়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এত সহজে পরিত্রাণ পাবে তা সে আশা করেনি।

    দোতলায় আর একটি শয়নকক্ষ ছিল, দেবাশিসের বাবা যে ঘরে শুতেন; নকুল সে ঘরও পরিষ্কার করেছিল, খাটের ওপর বিছানা পেতে সুজ্‌নি ঢাকা দিয়ে রেখেছিল। বিয়ের শুভদিনে বাড়িতে কোথাও সে অপরিচ্ছন্নতা রাখেনি। দেবাশিস দীর্ঘকাল অব্যবহৃত এই ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ খাটের পাশে বসে রইল। মাথাটা গরম হয়ে উঠেছে, সে কক্ষসংলগ্ন বাথরুমে গিয়ে কল খুলে মাথাটা কলের তলায় রাখল। তারপর ভিজে মাথায় ফিরে এসে আলো নিভিয়ে বিছানার সুজ্‌নির ওপরেই শুয়ে পড়ল।

    রেল গাড়ি প্রচণ্ড বেগে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ যখন লাইনের বাইরে লাফিয়ে পড়ে তখন কাউকে নোটিস দেয় না; দেবাশিসের জীবনে তেমনি আজ এই মহাদুর্যোগ এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে; দু’ মিনিট আগেও এই দুর্যোগের কোনো আভাস সে পায়নি। কিন্তু আত্মহারা হয়ে বিপথে কুপথে ছুটোছুটি করলে চলবে না, মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভেবে-চিন্তে সুবুদ্ধির পথ বেছে নিতে হবে।

    দেবাশিস জটিল চিন্তার মধ্যে ডুবে গেল। সে শান্ত ধীর প্রকৃতির মানুষ, অন্য কেউ হলে আজ রাত্রেই একটা কাণ্ড করে বসত।

    দীপা অন্য একজনকে ভালবাসে, এইটেই হচ্ছে মূল কথা। দীপা কাকে ভালবাসে, সে লোকটা কে, তা জানবার আগ্রহ দেবাশিসের নেই; সে যেই হোক না কেন, দীপা তাকে ভালবাসে। তবু দীপা পারিবারিক চাপে পড়ে দেবাশিসকে বিয়ে করেছে। কিন্তু এই বিয়েকে সে স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্কে পরিণত করতে চায় না।…প্রেমাস্পদের সঙ্গে দীপার ঘনিষ্ঠতা কত দূর অগ্রসর হয়েছিল? জল্পনা নিষ্ফল।

    দীপার বাড়ির সকলেই অবশ্য দীপার অসবর্ণ প্রণয়ের কথা জানে, বিজয়মাধব জানে। জেনে-শুনে তারা এই কাজ করেছে। হয়তো ভেবেছে, বিয়ের পর দীপা ক্রমে তার প্রণয়ীকে ভুলে যাবে। কিন্তু দীপা ভুলবে বলে মনে হয় না, প্রণয়ীর প্রতি তার একনিষ্ঠা আছে।…নৃপতি কি জানে? বোধ হয় জানে না, জানলে দেবাশিসের এমন অনিষ্ট করত না; নৃপতিকে সজ্জন বলেই মনে হয়। …কিন্তু যা হবার তা তো হয়েছে, এখন এই জট ছাড়াবার উপায় কি? ডিভোর্স?

    একটা বেজে গেল, দুটো বেজে গেল। এতক্ষণ পরে দেবাশিস লক্ষ্য করল, বসবার ঘরে তীব্র শক্তির আলোটা জ্বলেই চলেছে। সে উঠে আলোটা নেবাতে গেল। দীপার ঘরের দরজা বন্ধ; দরজার পাশ দিয়ে যাবার সময় সে একটু থেমে কান পেতে শুনল, কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে কোনো শব্দ এল না; দীপা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। সে বসবার ঘরের আলো নিবিয়ে ফিরে এসে আবার শুয়ে পড়ল।

    ঝাঁ ঝাঁ রাত্রি। কলকাতা শহর নিঝুম হয়ে আছে। দূরে একটা রেলের ইঞ্জিন একটানা বাঁশী বাজাতে বাজাতে আরো দুরে গিয়ে মিলিয়ে গেল। দেবাশিস অন্ধকারে চোখ মেলে শুধু ভাবছে—

    তিনটে বেজে গেল। দেবাশিসের মনে হল, নীরন্ধ্র অন্ধকারের মধ্যে এক বিন্দু জোনাকি-আলো জ্বলছে আর নিবছে…একটা অর্ধ-পরিণত সংকল্প…তার বেশি আজ রাত্রে আর কিছু সম্ভব নয়…

    দেবাশিস আবার বাথরুমে গিয়ে মাথায় জল ঢালল, তারপর ফিরে এসে বিছানায় শোবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।

    কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুমোতে পারল না, শরীরের ক্লান্তি কেটে যাবার পর ভোরের আলো ফুটতে-না-ফুটতেই তার ঘুম ভেঙে গেল। সে মুখ ধুয়ে নীচে নেমে গেল। নকুল তখনো ওঠেনি, কাল রাত্রের খাটাখাটুনির পর আজ বোধ হয় একটু বেশি ঘুমিয়ে পড়েছে। দেবাশিস নিঃশব্দে সদর দরজা খুলে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল। শুকনো বাগানে ফুল নেই, কিন্তু ভোরের বাতাসটি বেশ মিঠে। সে সদর দরজা থেকে ফটক পর্যন্ত পায়চারি করতে লাগল।

    একটু একটু করে দিনের আলো ফুটছে, কিন্তু এ রাস্তায় এখনো লোক চলাচল আরম্ভ হয়নি। দেবাশিস পায়চারি করতে করতে এক সময় ফটকের কাছে এসে দাঁড়াল। বন্ধ ফটকের উপর কনুই রেখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল, বাঁ দিক থেকে একজন লোক হন্‌হন্‌ করে আসছে। কাছে এলে সে চিনতে পারল—বিজয়মাধব।

    বিজয়মাধবের সঙ্গে এই কয় দিনে দেবাশিসের বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল, উপরন্তু সে এখন তার শ্যালক। কিন্তু বিজয়কে আসতে দেখে তার মনটা গরম হয়ে উঠল। তাই বিজয় যখন মুখে হাসি ফুটিয়ে ফটকের ওপারে এসে দাঁড়াল তখন দেবাশিসের মুখে সে হাসির প্রতিবিম্ব পড়ল না, সে গম্ভীর চোখে বিজয়ের পানে চেয়ে বলল—‘আবার কি জন্যে এসেছেন? কর্তব্যকর্ম কি এখনো শেষ হয়নি?’

    বিজয়ের হাসি মিলিয়ে গেল, সে থতমত খেয়ে বলে উঠল—‘দীপা কিছু বলেছে নাকি?’

    দেবাশিস নীরস কণ্ঠে বল—‘সবই বলেছে। সে অন্তত আমায় ঠকায়নি।’

    বিজয় কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মত চেয়ে থেকে হঠাৎ ফটক খুলে ভিতরে এল, তারপর দেবাশিসের হাত চেপে ধরে ব্যগ্র মিনতির স্বরে বলল—‘ভাই দেবাশিস, তুমি দীপার স্বামী, তুমি আমার পরমাত্মীয়, আমার ছোট ভাইয়ের সমান। আমি একটা কথা বলব, শুনবে?’

    ‘কি বলবেন বলুন।’

    ‘দীপা একেবারে ছেলেমানুষ, সবে সতেরো পেরিয়ে আঠারোয় পা দিয়েছে, ওর মনে কল্পনা-বিলাস ছাড়া আর কিছু নেই। ওইটুকু মেয়ের বুদ্ধিই বা কতখানি? তুমি ভাই ওর কথায় কান দিও না। দু’চার দিন ঘর করলেই আগের কথা সব ভুলে যাবে। কম বয়সের একটা খেয়াল বই তো নয়?’

    ‘ওর কথা শুনে তা তো মনে হয় না।’

    ‘মেয়েমানুষের কথার কি কোনো দাম আছে? ওরা আধুনিক কায়দায় বড় বড় কথা বলে, ভিতরে কিন্তু ফক্কিকার। দীপা স্কুলে পড়েছে, স্কুলের মেয়েদের সঙ্গে মিশে পাকামি শিখেছে। ওর মনটা ভাবপ্রবণ; সিনেমা-থিয়েটার নাচগানের দিকে টান আছে, যদিও আমরা তাকে কোনোদিন আশকারা দিইনি। আমি জোর গলায় বলছি, আমাদের বংশের মেয়ে কখনো বিপথে কুপথে যাবে না।’

    দেবাশিস শান্ত গলায় বলল—‘আপনার ভয় নেই, এ নিয়ে আমি ঝোঁকের মাথায় কোনো কেলেঙ্কারি কাণ্ড করব না, যা করবার ভেবে-চিন্তে করব। এ কথা বাড়ির বাইরে আর কেউ জানে?’

    ‘না।’ বিজয় আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাড়ির দোরের কাছে নকুলকে দেখা গেল। নকুল এগিয়ে এসে বলল—‘দাদাবাবু, চা তৈরি হয়েছে।’

    বিজয় খাটো গলায় তাড়াতাড়ি বলল—‘আচ্ছা ভাই, আজ আমি যাই। শীগ্‌গির আবার আসব।’ বলে সে দ্রুতপদে চলে গেল।

    দেবাশিস বাড়ির দিকে ফিরে যেতে যেতে বলল—‘নকুল, তুই আমাদের চা ওপরের ঘরে দিয়ে আয়।’

    নকুল মুচকি হেসে বলল—‘তাই দিয়েছি দাদাবাবু!’

    দেবাশিস দোতলায় উঠে গেল। দেখল, বসবার ঘরে নীচু টেবিলের ওপর চায়ের সরঞ্জাম সাজানো রয়েছে আর দীপা তক্তপোশের পাশে চুপটি করে বসে আছে—কাল রাত্রে যেমন বসে ছিল। অবশ্য কাল রাত্রের বাসি জামাকাপড়, ফুলের গয়না আর নেই, তার বদলে পাট-ভাঙ্গা শাড়ি ব্লাউজ। দেবাশিস আসতেই দীপা একটু আড়ষ্টভাবে উঠে দাঁড়াল।

    দেবাশিস দোর বন্ধ করে দিয়ে দোরের সামনে ফিরে দাঁড়িয়ে দীপার পানে তাকাল। খোলা জানালা দিয়ে সকালের নরম আলো দীপার ওপর পড়েছে। বিজয় যা বলেছিল তা মিথ্যে নয়, দীপার ছিপছিপে শরীরে কৌমার্যের কোমলতা এখনো লেগে আছে, ভারি ছেলেমানুষ মনে হয়। কিন্তু তার মুখে পরিণত মনের দৃঢ়তা, মুখের লাবণ্য যেন দৃঢ়তার উপাদানে তৈরি।

    দেবাশিস কাছে এসে চায়ের সরঞ্জামের দিকে দৃষ্টি নামালো; টি-পটে চা, দু’টি পেয়ালা, গরম দুধ, চিনির কিউব্‌, প্লেটে স্তূপীকৃত টোস্ট, মাখনের পাত্রে মাখন, অন্য একটি পাত্রে মার্‌মালেড্‌ এবং চারটি সিদ্ধ ডিম। নকুল দু’জনের জন্য প্রচুর প্রাতরাশ করেছে, একলা দেবাশিসের জন্য এত করে না।

    দেবাশিস দীপার দিকে চোখ তুলে সহজ গলায় বলল—‘তুমি চা ঢালবে?’

    দীপাদের বাড়িতে সাবেক রেওয়াজ, পেয়ালায় চা ঢালা হয়ে সকলের কাছে যায়; প্রাতরাশ খাওয়ার কোনো বিধিবদ্ধ রীতি নেই। সে একটু ইতস্তত করল। তাই দেখে দেবাশিস বলল—‘আচ্ছা, আমিই চা ঢালছি।’

    দু’টি পেয়ালায় চা ঢেলে সে একটি পেয়ালা দীপার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—‘বসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে, চা খেতে খেতে কথা হবে।’

    দীপা সঙ্কুচিতভাবে চেয়ারে বসল। তার সঙ্কোচ মনের জড়ত্ব নয়, অপরিচিত এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্কোচ। তার জীবনে অভাবনীয় ওলটপালট আরম্ভ হয়েছে।

    দেবাশিস নিজের চায়ে একটি ছোট চুমুক দিয়ে পেয়ালা নামিয়ে রাখল, বলল—‘তোমার দাদা বিজয়মাধব আজ ভোর হতে না হতে এসেছিল।’

    দীপা চকিত চোখ তুলে আবার চোখ নত করল। দেবাশিস এক টুকরো টোস্টে মাখন লাগাতে লাগাতে বলল—‘তার কথা শুনে মনে হল তোমার গুপ্তকথা বাড়ির সবাই জানে। বাইরের কেউ জানে নাকি?’

    দীপা মাথায় একটা ঝাঁকনি দিয়ে বলল—‘না—না—।’ আর কোনো কথা তার শুকনো গলা দিয়ে বেরুল না।

    দেবাশিস বলল—‘তা সে যাই হোক, সব কথা বিবেচনা করা দরকার। একটা ব্যাপার ঘটেছে, আমার জীবনে হঠাৎ একটা বেয়াড়া সমস্যা এসে হাজির হয়েছে। যথাসাধ্য কেলেঙ্কারি বাঁচিয়ে তার নিষ্পত্তি করতে হবে। আমার কথা বুঝতে পারছ?’

    দীপা ঘাড় নাড়ল, অস্ফুট স্বরে বলল—‘পারছি।’ সে কিন্তু দেবাশিসের ধরনধারন কিছুই বুঝতে পারছে না। এরকম অবস্থায় মানুষ কি এমনিভাবে কথা বলে?’

    দেবাশিস টোস্টে কামড় দিয়ে বলল—‘তোমার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

    দীপা তাড়াতাড়ি চায়ের পেয়ালা হাতে তুলে নিল, কিন্তু হাতের পেয়ালা হাতেই রইল, ঠোঁট পর্যন্ত উঠল না।

    দেবাশিস শান্তভাবে বলল—‘সমস্যার সোজাসুজি নিষ্পত্তি আছে—ডিভোর্স।’

    দীপার হাতের পেয়ালা কেঁপে উঠল। আর একটু হলেই পড়ে যেত। সে সামলে নিয়ে রুদ্ধস্বরে বলল—‘না।’

    দেবাশিস ভুরু তুলে বলল—‘না কেন? তোমার বাড়ির লোক ভালবাসার পাত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে না দিয়ে অন্যায় করেছেন, সে অন্যায় সংশোধন করা উচিত।’

    দীপা নত চোখে বলল—‘আমার দাদু—তিনি তাহলে বাঁচবেন না।’

    দেবাশিস কিছুক্ষণ কথা কইল না, কতকটা যেন অন্যমনস্কভাবে দীপার পানে চেয়ে রইল। তারপর নিজের ঈষদুষ্ণ পেয়ালাটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে নিঃশেষ করে আবার রেখে দিল।

    উদয়মাধবকে দেবাশিসকে দেখেছে, বৃদ্ধের চারিত্রিক প্রবলতা অনুভব করেছে, নাতনী ডিভোর্স-কোর্টে গিয়েছে শুনলে তিনি হয়তো আত্মহত্যা করবেন না, কিন্তু নাতনীকে খুন করতে পারেন।

    ‘ডিভোর্স যদি সম্ভব না হয় তাহলে দ্বিতীয় উপায় হচ্ছে—তুমি বাপের বাড়ি ফিরে যাও, সেখানে যেমন ছিলে তেমনি থাকো।’

    ‘না, ওরা আবার আমায় ফেরত পাঠিয়ে দেবে। মাঝ থেকে জানাজানি হবে।’

    ‘তাহলে তৃতীয় পন্থা হচ্ছে এখানেই থাকা। আলাদাই থাকবে, আমি তোমার কাছে যাব না। কিন্তু আমারও তো লোকলজ্জা আছে। বাইরের লোকের কাছে ভণ্ডামি করতে হবে। তুমি পারবে?’

    দীপা ঘাড় নেড়ে জানাল, সে পারবে।

    দেবাশিস বলল—‘বাড়ির চাকরও বাইরের লোক। তার সামনেও ধোঁকার টাটি খাড়া রাখতে হবে।’

    দীপা আবার ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

    দেবাশিস নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল—‘বেশ। কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে?’

    দীপা চুপ করে রইল, এ প্রশ্নের উত্তর সে নিজেই জানে না। দেবাশিস আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে চলে গেল। স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা খুবই অল্প; কিন্তু তার মনে হল, এরা বড় স্বার্থপর, নিজের স্বার্থই বোঝে, আর কারুর কথা ভাবে না।

    কাল দেবাশিস ভেবেছিল, এখন দু’তিন দিন সে ফ্যাক্টরিতে যাবে না, সারা দিন বাড়িতে থেকে বউয়ের সঙ্গে ভাব করবে। কিন্তু সব ভণ্ডুল হয়ে গেল। সে খানিকক্ষণ বিমনাভাবে ঘুরে বেড়ালো, কাল রাত্রে যে বিছানায় শুয়েছিল সেটা ঝেড়েঝুড়ে ঠিক করে রাখল, নকুল না সন্দেহ করে যে, তারা আলাদা শুয়েছে। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে বলল—‘নকুল, আমার খাবার তৈরি কর, আমি ন’টার সময় ফ্যাক্টরি যাব।’

    স্নান করতে গিয়ে দেবাশিসের একটা কথা মনে এল। সে দেখল, দীপা তখনো বসবার ঘরে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে, সে তার কাছে গিয়ে বলল—‘নকুলের চোখে যদি ধুলো দিতে হয় তাহলে তোমার ঘরের লাগোয়া বাথরুমে আমাকে স্নান করতে হবে। অন্য বাথরুমে আমার ভিজে কাপড় দেখলে নকুলের মনে সন্দেহ হবে। আমি তোমার বাথরুমে স্নান করতে পারি?’

    দীপার মনে হল দেবাশিস তাকে ব্যঙ্গ করছে। সে চোখ তুলে চাইল, কিন্তু দেবাশিসের মুখে ব্যঙ্গবিদ্রূপের চিহ্নমাত্র দেখতে পেল না। সে তখন একটু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

    দেবাশিস স্নানাহার করে ন’টার সময় কাজে চলে গেল।

    অতঃপর সংসারের সব ভার পড়ল নকুলের ওপর। নতুন বউকে বাড়ির কাজকর্ম শেখাতে হবে, বউয়ের খাওয়া-দাওয়ার ওপর নজর রাখতে হবে। বাড়িতে দ্বিতীয় স্ত্রীলোক নেই; সাময়িকভাবে নকুল হয়ে উঠল বাড়ির গিন্নী।

    দুপুরবেলা দীপাকে ভাত খাইয়ে নকুল ওপরে পাঠিয়ে দিল, বলল—‘যাও, একটু ঘুমিয়ে নাও গিয়ে।’

    কিন্তু দীপার দিনের বেলা ঘুমোনো অভ্যেস নেই। সে ঘুরে ঘুরে ওপরতলাটা দেখতে লাগল…এই ঘরে কাল রাত্রে দেবাশিস শুয়েছিল…নকুল যেন জানতে না পারে, সে ওপরে আসবার আগেই রোজ বিছানা ঝেড়ে ঠিকঠাক করে রাখতে হবে…বাড়ির পাশের ব্যাল্‌কনি থেকে বাগানটা দেখা যায়। বাগানের ছিরি নেই, যেন কত কাল কেউ বাগানের দিকে তাকায়নি। দেবাশিসের বাগানের শখ নেই। দীপার খুব বাগানের শখ আছে। সে বাপের বাড়ির খোলা ছাদে টবের বাগান করেছিল।

    ঘণ্টাখানেক ঘুরে ফিরে সে বসবার ঘরে এল। রেডিওগ্রামের ওপর নজর পড়ল। দীপা রেডিও শুনতে ভালবাসে…বাপের বাড়িতে তার একটি ট্রান্‌জিস্টার ছিল, সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে গান শুনত, ফুটবলের কমেন্টারি শুনত, নাট্যাভিনয় শুনত। ট্রান্‌জিস্টারটা আনা হয়নি। তার অনেক নিজস্ব জিনিস বাপের বাড়িতে পড়ে আছে।

    দীপা রেডিওগ্রামের কপাট সরিয়ে কলকব্জা নাড়াচাড়া করতে করতে গানের সুর বেজে উঠল। দুপুরবেলার শান্ত ত্বরাহীন প্রোগ্রাম। সে রেডিওর পাশে একটা গদি-মোড়া আরাম-চেয়ারে বসে শুনতে লাগল।

    কাল রাত্রে দীপা অল্পই ঘুমিয়েছে, যেটুকু ঘুমিয়েছে তাও যেন আড়ষ্ট হয়ে। এখন রেডিওর মৃদু গুঞ্জন শুনতে শুনতে তার চোখ বুজে এল।

    হঠাৎ তার চমক ভাঙল টেলিফোনের শব্দে। সে চোখ মেলে দেখল, ঘরের কোণে ছোট টেবিলের ওপর টেলিফোন বাজছে। দীপা রেডিও বন্ধ করে দিল। নিশ্চয় দেবাশিসের টেলিফোন। একটু ইতস্তত করে সে উঠে গিয়ে ফোন তুলে নিল।

    ‘হ্যালো।’

    অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ এল—‘দীপা, আমার গলা চিনতে পারছ?’

    দীপার বুক ধড়ফড় করে উঠল, সে অবরুদ্ধ স্বরে বলল—‘পারছি।’

    ‘ঘরে কেউ আছে?’

    ‘না, আমি একা।’

    ‘বেশ। তোমার স্বামীকে বলেছ?’

    ‘বলেছি।’

    ‘তারপর?’

    ‘তারপর আর কিছু না।’

    ‘রাত্রে তোমাকে বিরক্ত করেনি?’

    ‘না।’

    ‘তুমি একলা শুয়েছিলে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘বেশ। এইভাবে চালিয়ে যাও।’

    ‘কত দিন?’

    ‘একটু সময় লাগবে। তুমি ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। শপথ মনে আছে তো?’

    ‘শপথ!’

    ‘শপথ করেছ, আমার নাম কাউকে বলবে না। মা কালীর নামে শপথ করেছ, মনে আছে?’

    ‘আছে।’

    ‘তোমার স্বামী হয়তো নাম জানবার জন্যে পীড়ন করতে পারে।’

    ‘নাম জানতে চাননি। চাইলেও আমি বলব না।’

    ‘বেশ। আমি মাঝে মাঝে তোমাকে ফোন করব। দুপুরবেলা তোমার স্বামী যখন বাড়িতে থাকবে না তখন ফোন করব।’

    ‘আচ্ছা।’

    সে ফোন রেখে দিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসল। মনে হল তার শরীরের সমস্ত জোর ফুরিয়ে গেছে।

    বিকেল পাঁচটার সময় দেবাশিস ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এল। নকুল দোর খুলে দিল। দীপা ওপর থেকে ঘণ্টির আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল, সে উৎকর্ণ হয়ে রইল।

    দেবাশিস ওপরে উঠে এসে দেখল, দীপা নীরব রেডিওগ্রামের সামনে বসে আছে। সে ঢুকতেই দীপা চকিতে একবার তার দিকে চেয়ে উঠে দাঁড়াল। দেবাশিস দ্বিধামন্থর পায়ে তার সামনে এল। কারুর মুখে কথা নেই। কিন্তু শুধু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা কতক্ষণ চলে। শেষে দেবাশিস বলল—‘নকুল তোমার দেখাশুনো করেছিল তো?’

    দীপা ঘাড় নেড়ে বলল—‘হ্যাঁ।’

    দেবাশিস প্রশ্ন করল—‘চা খেয়েছ?’

    দীপা মাথা নাড়ল—‘না।’

    অতঃপর আর কি বলা যেতে পারে, দেবাশিস ভেবে পেল না। ওদিকে দীপা প্রাণপণে চেষ্টা করছে সহজভাবে যা হোক একটা কিছু বলতে। কিন্তু কী বলবে? বক্তব্য কী আছে? শেষ পর্যন্ত একটা কথা মনে এল, সে ঘাড় তুলে বলল—‘আপনি দুপুরবেলা কোথায় খাওয়া-দাওয়া করেন?’

    দেবাশিস বলল—‘আমার ফ্যাক্টরিতে খাওয়ার ভাল ব্যবস্থা আছে। ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে সকলেই দুপুরবেলা ক্যান্‌টিনে খায়। আমিও খাই।’

    দীপা শুধু বলল—‘ও।’

    দেবাশিস বলল—‘আচ্ছা, আমি কাপড়-চোপড় বদলে নিই, তারপর নীচে গিয়ে চা খাওয়া যাবে।’

    সংশয়স্খলিত স্বরে দীপা বলল—‘আচ্ছা।’

    দেবাশিস দীপার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল—‘আমি তাহলে তোমার বাথরুমই ব্যবহার করছি।’

    দোর পর্যন্ত গিয়ে দেবাশিস থমকে দাঁড়াল, তারপর আস্তে আস্তে দীপার সামনে ফিরে এসে গলা খাটো করে বলল—‘একটা কথা। তুমি আমাকে ‘আপনি’ বললে ভাল শোনায় না। অবশ্য আড়ালে তা বলতে পার, কিন্তু নকুল কিংবা অন্য কারুর সামনে ‘তুমি’ বলাই স্বাভাবিক। নইলে ওদের খট্‌কা লাগতে পারে।’

    দীপা মুখ নীচু করে নীরব রইল।

    দেবাশিস প্রশ্ন করল—‘কি বলো?’

    দীপা অনিচ্ছাভরা ক্ষীণ স্বরে বলল—‘আচ্ছা।’

    দেবাশিস বাথরুমে চলে গেল। দীপা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, প্রকাশ্যে ‘তুমি’ বলা এবং আড়ালে ‘আপনি’ বলা কি খুব সহজ কাজ? রঙ্গালয়ের নটনটীরা বোধহয় পারে। তার মনে হল সে আস্তে আস্তে অতলস্পর্শ চোরাবালির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে।

    দশ মিনিট পরে দেবাশিস পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে এল, বলল—‘চল, নীচে যাই।’

    দেবাশিসের পিছু পিছু দীপা নীচে নেমে গেল, দু’জনে টেবিলের দু’প্রান্তে বসল। নকুল তাদের সামনে রেকাবি-ভরা লুচি তরকারি রাখল। দেবাশিস খেতে আরম্ভ করল কিন্তু দীপা হাত গুটিয়ে বসে রইল।

    নকুল জিজ্ঞেস করল—‘দাদাবাবু, ডিম ভেজে দেব?’

    দেবাশিস দীপার পানে চাইল। দীপা একটু মাথা নাড়ল; বাপের বাড়িতে তার ডিম খাওয়া বারণ ছিল। আইবুড়ো মেয়েদের ডিম খেতে নেই।

    দেবাশিস বলল—‘থাক, দরকার নেই।’

    চায়ের পেয়ালা টেবিলে রাখতে এসে নকুল বলল—‘ও কি বউদি, তুমি খাচ্ছ না?’

    দীপা মাথা হেঁট করল, তারপর কাতর দৃষ্টিতে দেবাশিসের পানে তাকাল। দেবাশিস বুঝতে পারল দীপার সংকোচের কারণ কি। সে একটু হেসে বলল—‘নকুল, ওর বোধহয় পুরুষের সামনে খাওয়া অভ্যেস নেই।’

    দেবাশিস তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল। সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর নকুল দীপার কাছে এসে বলল—‘বউদি, এ সংসারে মেয়ে-পুরুষ সবাই একসঙ্গে খায়, কর্তাবাবুর আমল থেকে এই রেওয়াজ দেখে আসছি। তুমি যখন এ বাড়ির বউ হয়ে এসেছ তখন তোমাকেও তো এ বাড়ির রেওয়াজ মেনে চলতে হবে। ভাবনা নেই, আস্তে আস্তে অভ্যেস হয়ে যাবে। নাও, খেতে আরম্ভ কর। তোমার বাপের বাড়িতে কি ডিমের চলন নেই?’

    দীপা বলল—‘পুরুষেরা হাঁসের ডিম খান। মুরগির ডিমের চলন নেই।’

    নকুল বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বলল—‘হাঁসের ডিমও যা মুরগির ডিমও তাই, সব ডিমই সমান।’

    দীপা নকুলের তদারকিতে চা-জলখাবার খেয়ে ঘরের বাইরে এসে দেখল, দেবাশিস সিঁড়ির হাতলের ওপর কনুই রেখে দাঁড়িয়ে আছে। দীপাকে দেখে সে বলল—‘বেড়াতে যাবে? সারা দিন তো বাড়িতে বন্ধ আছ, চল না মোটরে খানিক বেড়িয়ে আসবে।’

    অভিনয় চলছে চলুক, কিন্তু কোথাও একটা সীমারেখা টানা দরকার। দীপা সোজা দৃষ্টিতে দেবাশিসের পানে চেয়ে দৃঢ় স্বরে বলল—‘না।’

    দেবাশিসের মুখ দেখে মনে হল না যে সে মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে, সে সহজভাবে বলল—‘আচ্ছা, আমি তাহলে একটু ঘুরে আসি। বেশিদূর নয়, নৃপতিদার আড্ডা পর্যন্ত।’

    সে বেরিয়ে পড়ল। অর্ধেক পথ গিয়েছে, দেখল কপিল বোস পায়ে হেঁটে তার দিকেই আসছে। কপিলের একটি ছোট মোটর আছে, বেশির ভাগ তাতেই সে ঘুরে বেড়ায়। মুখোমুখি হলে দেবাশিস বলল—‘এদিকে কোথায় চলেছেন?’

    কপিল একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়ল—‘আপনার দিকেই যাচ্ছিলাম।’

    মনে মনে বিস্মিত হলেও দেবাশিস মুখে বলল—‘আমার দিকে? তা—চলুন, ফেরা যাক।’

    কপিল তাড়াতাড়ি বলল—‘না না, তার দরকার নেই। আপনি আড্ডায় যাচ্ছেন তো? চলুন, আমারও শেষ গন্তব্যস্থান সেখানেই। আপনার কাছে যাচ্ছিলাম একটা জিনিসের খোঁজে।’

    দু’জনে নৃপতির বাড়ির দিকে চলল। দেবাশিস জিজ্ঞেস করল—‘কিসের খোঁজে?’

    কপিল দ্বিধাভরে বলল—‘আমার সিগারেট-কেস্‌টা আজ সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। যতদূর মনে পড়ে কাল বিকেল পর্যন্ত ছিল; তারপর আপনার বাড়িতে গিয়ে আপনার সিগারেটই খেয়েছি, আমার পকেটে সিগারেট-কেস্‌ আছে কিনা খেয়াল করিনি। আজ সকালবেলা দেখি নেই। বাড়িতে খুঁজলাম, পাওয়া গেল না। তা ভাবলাম, খোঁজ নিয়ে আসি আপনার বাড়িতেই পকেট থেকে পড়ে গেছে কিনা।’

    দেবাশিস বলল—‘আমার বাড়িতে যদি পড়ে থাকে এবং কেউ তুলে না নিয়ে থাকে তাহলে নকুল নিশ্চয় সরিয়ে রেখেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করব। কিসের সিগারেট-কেস্‌—সোনার?’

    কপিল তাড়াতাড়ি বলল—‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি ভাববেন না, আমি প্রায়ই জিনিস হারিয়ে ফেলি, তবে বেশির ভাগ সময়েই পাওয়া যায়। হয়তো বাড়িতেই আছে, কিংবা নৃপতিদার আড্ডায়।’

    নৃপতির আড্ডাঘরে তখন আলো জ্বলছে; ঘরে কেবল নৃপতি আর প্রবাল বসে গল্প করছে। এরা ঘরে ঢুকলে নৃপতি সমাদরের সুরে বলে উঠল—‘আরে, এস এস।’

    দু’জনে নৃপতির কাছে বসল। নৃপতি দেবাশিসকে নিবিষ্ট চোখে দেখতে দেখতে চাপা কৌতুকের সুরে বলল—‘আমি তো ভেবেছিলাম, এখন কিছু দিন তুমি বাড়ি থেকে বেরুবেই না। যাহোক, দাম্পত্য-জীবন কেমন লাগছে?’

    প্রশ্নের জন্যে দেবাশিস তৈরি ছিল না, একটু দম নিয়ে মুখে সলজ্জ হাসি এনে বলল—‘মন্দ কি, ভালই লাগছে।’

    প্রবালের গলার মধ্যে হাসির মত একটা শব্দ হল, সে বলল—‘প্রথম প্রথম ভালই লাগে। তারপর—’ সে উঠে গিয়ে পিয়ানোর সামনে বসল, টুং টাং শব্দে একটা বিষাদের সুর বাজতে লাগল।

    কপিল ভ্রূকুটি করে কিছুক্ষণ তার পানে চেয়ে রইল, তারপর বিস্বাদসূচক মুখভঙ্গী করে দেবাশিসকে বলল—‘এক জাতের লোক আছে তারা শুধু চাঁদের কলঙ্কই দেখে, চাঁদ দেখতে পায় না। নৃপতিদা, একটা সিগারেট দিন, আমার সিগারেট-কেস্‌টা হারিয়ে ফেলেছি।’

    কপিল সিগারেট ধরিয়েছে এমন সময় চিত্রনক্ষত্র সুজন মিত্র প্রবেশ করল। বোধহয় সোজা ফিল্ম স্টুডিও থেকে আসছে, পরনে করডুরয়ের লম্বা প্যান্ট এবং টক্‌টকে লাল রঙের সিল্কের শার্ট। দেবাশিসকে দেখে চোখ বড় করে কৌতুকের ভঙ্গীতে হাসল, তারপর বলল—‘নৃপতিদা, আজ কাগজে খবর দেখেছেন?’

    সকলেই উৎসুক চোখে তার পানে চাইল, প্রবালের পিয়ানো বন্ধ হল। নৃপতি বলল—‘কি খবর? কাগজ অবশ্য পড়েছি, কিন্তু গুরুতর কোনো খবর দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।’

    সুজন পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলল—‘গুরুতর খবর না হতে পারে কিন্তু ঘরোয়া খবর। আমাদের পাড়ার খবর। খবরের কাগজের এক কোণে ছোট্ট একটি খবর। গোল পার্কের কাছে কাল ভোরবেলা একজন ভিখিরি মারা গেছে।’ এই বলে সুজন নাটকীয় ভঙ্গীতে চুপ করল। সবাই অবাক হয়ে তার মুখের পানে চেয়ে রইল।

    সুজন তখন আবার আরম্ভ করল—‘ভাবছেন, একটা ভিখিরির মৃত্যু এমন কী চাঞ্চল্যকর খবর। কিন্তু ভিখিরির মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, কোনো অজ্ঞাত ঘাতক তাকে খুন করেছে। এবং তার চেয়েও বিস্ময়কর খবর, অজ্ঞাত আততায়ী ভিখিরির পিঠের দিক থেকে তার বুকের মধ্যে একটা শজারুর কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে বধ করেছে।’

    সুজনের বক্তৃতার মাঝখানে প্রবালও পিয়ানো থেকে উঠে কাছে এসে বসেছিল। শ্রোতারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শেষে নৃপতি বলল—‘ছোট খবর বলেই বোধহয় চোখে পড়েনি। তোমরা কেউ পড়েছ?’

    কেউ পড়েনি। দেবাশিস এবং প্রবাল খবরের কাগজ পড়ে না। নতুন খবরের প্রতি তাদের আসক্তি নেই। কপিল কেবল খেলাধুলোর পাতাটা পড়ে।

    প্রবাল বলল—‘শজারুর কাঁটা কি মানুষের শরীরে বিধিয়ে দেওয়া যায়—ভেঙে যাবে না?’

    নৃপতি পণ্ডিত ব্যক্তি, সে বলল—‘না, ভাঙবে না। নরম কাঁটা হলে দুমড়ে যেতে পারে কিন্তু ভাঙবে না। শক্ত কাঁটা লোহার শলার মত সটান মাংসের মধ্যে ঢুকে যাবে।’

    প্রবাল জিজ্ঞেস করল—‘শজারুর কাঁটা কোথায় পাওয়া যায়? বাজারে বিক্রি হয় নাকি?’

    নৃপতি বলল—‘সব জায়গায় পাওয়া যায় না। শুনেছি নিউ মার্কেটে দু’একটা দোকানে পাওয়া যায়। তাছাড়া বেদেরা গড়ের মাঠে বিক্রি করতে আসে।’

    দেবাশিস বলল—‘কিন্তু ছোরাছুরি থাকতে শজারুর কাঁটা দিয়ে মানুষ খুন করবার মানে কি?’

    কেউ সদুত্তর দিতে পারল না। কপিল নতুন প্রশ্ন করল—‘কিন্তু ভিখিরিকে কে খুন করবে? কেন খুন করবে?’

    নৃপতি একটু ভেবে বলল—‘ভিখিরিদের মধ্যেও কৃপণ ও সঞ্চয়ী লোক থাকে। এমন শোনা গেছে, ভিখিরি মারা যাবার পর তার কাঁথা-কানির ভেতর থেকে দু’শো চারশো টাকা বেরিয়েছে। এই লোকটিও হয়তো সঞ্চয়ী ছিল, তার টাকার লোভে কেউ তাকে খুন করেছে।’

    কপিল বলল—‘আমার মনে হয় এ একটা উন্মাদ পাগলের কাজ। নইলে শজারুর কাঁটার কোনো মানে হয় না।’

    সুজন বলল—‘তা বটে, প্রকৃতিস্থ মানুষ শজারুর কাঁটা দিয়ে খুন করবে কেন? প্রবাল, তোমার কি মনে হয়?’

    প্রবাল অবহেলাভরে বলল—‘যে-ই খুন করুক সে সাধু ব্যক্তি, ভিখিরি মেরে সমাজের উপকার করেছে। যারা কাজ করে না তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই।’ সে উঠে গিয়ে আবার পিয়ানোর সামনে বসল।

    তারপর খড়্গ বাহাদুর এল। তার আজ মাঠে খেলা ছিল; সে খেলার কথা তুলল, আলোচনার প্রসঙ্গ বিষয়ান্তরে সঞ্চারিত হল। কিছুক্ষণ পরে কফি এল। কফি খেয়ে আরো কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পর দেবাশিস বাড়ি ফিরল।

    দেবাশিসের জীবনযাত্রা বিয়ের আগে যেমন ছিল বিয়ের পরেও প্রায় তেমনি রয়ে গেল। বাড়িতে একজন লোক বেড়েছে এই যা। কেবল নকুল এবং বাইরের অন্যান্যদের সামনে ভণ্ডামি করতে হয়। দেবাশিসের ভাল লাগে না।

    আড়ালে দীপার সঙ্গে দেবাশিসের সম্পর্ক বড় বিচিত্র। ঘনিষ্ঠতা না করে যতটা সহজভাবে একসঙ্গে বাস করা যায় দু’জনে সেই চেষ্টা করছে। কিন্তু কাজটি সহজ নয়। দীপার মনের নিভৃত আতঙ্ক তার চোখের চাউনিতে হঠাৎ প্রকাশ হয়ে পড়ে। দেবাশিসের মন অশান্ত; সে জানে দীপা অন্যকে ভালবাসে, তবু দীপা তার মনকে দুর্নিবার বেগে আকর্ষণ করছে। বিজয় বলেছিল, দীপা ছেলেমানুষ, দু’চার দিন স্বামীর ঘর করলেই আগের কথা ভুলে যাবে। কিন্তু দীপার ভাবভঙ্গী দেখে তা মনে হয় না। দীপা আর যাই হোক, তার মন চঞ্চল নয়।

    এইরকম শঙ্কা-দ্বিধার মধ্য দিয়ে কিছুদিন কেটে যায়। একদিন বিকেলবেলা ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে দেবাশিস দীপাকে বলল—‘একটা কথা আছে। ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে তাদের ইচ্ছে, তুমি একদিন ফ্যাক্টরিতে যাও, ওরা তোমাকে পার্টি দিতে চায়। যাবে?’

    দীপার মন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল, এ আবার কি নতুন ঝাঞ্ঝাট? সে একটু চুপ করে থেকে বলল—‘না গেলেই কি নয়?’

    দেবাশিস বলল—‘তুমি যদি না যেতে চাও আমি জোর করতে পারি না। তবে না গেলে খারাপ দেখায়।’

    শুক্‌নো মুখে দীপা বলল—‘তাহলে যাব।’

    দু’তিন দিন পরে দেবাশিস একটু সকাল সকাল বাড়ি ফিরল, তারপর কোট প্যান্ট ছেড়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরে দীপাকে নিয়ে ফ্যাক্টরিতে ফিরে গেল।

    প্রজাপতি প্রসাধন ফ্যাক্টরির কারখানাটি ব্যারাকের মত লম্বা, তাতে অসংখ্য ঘর, দু’ পাশে চওড়া বারান্দা। বাড়ির চার ধারে অনেকখানি খোলা জমিও আছে। কেমিস্ট এবং কর্মী মিলিয়ে আন্দাজ ষাটজন লোক এখানে কাজ করে। ফ্যাক্টরি হিসাবে বড় প্রতিষ্ঠান বলা যায় না; কিন্তু এখান থেকে যে শিল্পদ্রব্য তৈরি হয়ে বেরোয় তার চাহিদা সর্বত্র।

    আজ ফ্যাক্টরির পুরোভূমিতে একটি ছোট মণ্ডপ তৈরি হয়েছে। দেবাশিসের মোটর মণ্ডপের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ফ্যাক্টরির প্রবীণ কেমিস্ট ডক্টর রামপ্রসাদ দত্ত এসে দীপাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিলেন। ডক্টর দত্তর পিছনে আরো কয়েকজন কর্মী ছিল, সকলে হাসিমুখে দীপাকে অভ্যর্থনা করল।

    ডক্টর দত্ত দীপাকে বললেন—‘চল, আগে তোমাকে তোমার ফ্যাক্টরি দেখাই।’

    ডক্টর দত্ত বয়সে দীপার পিতৃতুল্য, তাঁর সস্নেহ ঘনিষ্ঠ সম্বোধনে দীপার মনের আড়ষ্টতা অনেকটা কেটে গেল। দেবাশিস তাদের সঙ্গে গেল না; সে জানতো, সে সঙ্গে না থাকলে দীপা বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করবে।

    ফ্যাক্টরির কাজের বেলা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, তবু কয়েকটা ঘরে কয়েকজন লোক তখনো কাজ করছে। কোথাও সারি সারি জালার মত কাচের পাত্রে কেশতৈল রাখা রয়েছে, কোনো ঘরে স্নো ক্রিম, কোনো ঘরে ল্যাভেন্ডার অডিকলোন প্রভৃতি নানা জাতের তরল গন্ধদ্রব্য। সব মিশিয়ে একটি চমৎকার সুগন্ধে বাড়ি ম-ম করছে।

    ডক্টর দত্ত ঘুরে ঘুরে দেখাতে লাগলেন। দেখতে দেখতে নিজের অজ্ঞাতসারেই দীপার মন প্রফুল্ল হয়ে উঠল। এটা কি, ওটা কেমন করে তৈরি হয়, ক্রিম স্নো ইত্যাদিতে কি কি উপকরণ লাগে এইসব প্রশ্নের উত্তর শুনতে শুনতে সে যেন একটা নতুন রাজ্যে প্রবেশ করল। নতুন তথ্য আবিষ্কারের একটা উত্তেজনা আছে, কৌতূহলী মন সহজেই মেতে ওঠে।

    ফ্যাক্টরি পরিদর্শন শেষ করে ডক্টর দত্ত দীপাকে মণ্ডপে নিয়ে গেলেন। মণ্ডপের একপাশে অনুচ্চ মঞ্চ, তার ওপর কয়েকটি চেয়ার; মঞ্চের সামনে দর্শকদের চেয়ারের সারি। ফ্যাক্টরিতে যারা কাজ করে সকলেই মণ্ডপে উপস্থিত। ডক্টর দত্ত দীপাকে মঞ্চের ওপর একটি চেয়ারে বসালেন, দেবাশিস তার পাশে বসল। ফাংশন আরম্ভ হল।

    ফ্যাক্টরির কর্মীরা শুধু কাজই করে না, তাদের মধ্যে শিল্পী রসিক গুণিজনও আছে। একটি কোট-প্যান্ট পরা ছোকরা প্রেক্ষাভূমি থেকে উঠে এসে রবীন্দ্রনাথের গান ধরল—তোমরা সবাই ভাল, আমাদের এই আঁধার ঘরে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালো। ছোকরার গলা ভাল; গান শুনতে শুনতে শ্রোতাদের দন্ত বিকশিত হয়ে রইল। দীপার মুখেও একটি অরুণাভ হাসি আনাগোনা করতে লাগল। সে একবার আড়চোখে দেবাশিসের পানে তাকাল; দেখল, তার ঠোঁটে লোক-দেখানো নকল হাসি। দীপা এখন দেবাশিসের হাসি দেখে বুঝতে পারে আসল হাসি কি নকল হাসি। তার মন হোঁচট খেয়ে শক্ত হয়ে বসল।

    গানের পালা শেষ হলে আর একটি যুবক এসে গম্ভীর মুখে একটি হাসির গল্প শোনাল। সকলে খুব খানিকটা হাসল। তারপর ডক্টর দত্ত উঠে ছোট্ট একটি বক্তৃতা দিলেন। চা কেক্‌ দিয়ে সভা শেষ হল।

    দেবাশিস দীপাকে নিয়ে নিজের মোটরের কাছে এসে দেখল, মোটরের পিছনের সীট একরাশ গোলাপফুল এবং আরো অনেক উপহারদ্রব্যে ভরা। দেবাশিস স্নিগ্ধকণ্ঠে সকলকে ধন্যবাদ দিল, তারপর দীপাকে পাশে বসিয়ে মোটর চালিয়ে চলে গেল। সন্ধ্যে তখন উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

    সাবধানে গাড়ি চালাতে চালাতে দেবাশিস বলল—‘কেমন লাগল?’

    পাশের আলো-আঁধারি থেকে দীপা বলল—‘ভাল।’

    গাড়ির দু’পাশের ফুটপাথ দিয়ে স্রোতের মত লোক চলেছে, তারা যেন অন্য জগতের মানুষ। গাড়ি চলতে চলতে কখনো চৌমাথার সামনে থামছে, আবার চলছে; এদিক ওদিক মোড় ঘুরে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে।

    ‘ডক্টর দত্তকে কেমন মনে হল?’

    এবার দীপার মনে একটু আলো ফুটল—‘খুব ভালো লোক, এত চমৎকার কথা বলেন। উনি কি অনেক দিন এখানে, মানে ফ্যাক্টরিতে আছেন?’

    দেবাশিস বলল—‘বাবা যখন ফ্যাক্টরি পত্তন করেন তখন থেকে উনি আছেন। আমি ফ্যাক্টরির মালিক বটে, কিন্তু উনিই কর্তা।’

    গাড়ির অভ্যন্তর গোলাপের গন্ধে পূর্ণ হয়ে আছে। দীপা দীর্ঘ আঘ্রাণ নিয়ে বলল—‘ফ্যাক্টরির অন্য সব লোকেরাও ভাল।’

    দেবাশিস মনে মনে ভাবল, ফ্যাক্টরির সবাই ভাল, কেবল মালিক ছাড়া। মুখে বলল—‘ওরা সবাই আমাকে ভালবাসে।’ একটু থেমে বলল—‘ফ্যাক্টরি থেকে বার্ষিক যে লাভ হয় তার থেকে আমি নিজের জন্যে বারো হাজার টাকা রেখে বাকি সব টাকা কর্মীদের মধ্যে মাইনের অনুপাতে ভাগ করে দিই।’

    ‘ও—’ দীপার মনে একটা কৌতূহল উঁকি মারল, সে একবার একটু দ্বিধা করে শেষে প্রশ্ন করল—‘ফ্যাক্টরি থেকে কত লাভ হয়?’

    দেবাশিস উৎসুকভাবে একবার দীপার পানে চাইল, তারপর বলল—‘খরচ-খরচা বাদ দিয়ে ইন্‌কাম ট্যাক্স শোধ করে এ বছর আন্দাজ দেড় লাখ টাকা বেঁচেছে। আশা হচ্ছে, আসছে বছর আরো বেশি লাভ হবে।’

    আর কোনো কথা হবার আগেই মোটর বাড়ির ফটকে প্রবেশ করল। বাড়ির সদরে মোটর দাঁড় করিয়ে দেবাশিস বলল—‘গোলাপফুলগুলোর একটা ব্যবস্থা করা দরকার।’

    দীপা বলল—‘আমি করছি।’

    নকুল এসে দাঁড়িয়েছিল, দীপা তাকে প্রশ্ন করল—‘নকুল, বাড়িতে ফুলদানি আছে?’

    নকুল বলল—‘আছে বইকি বউদি, ওপরের বসবার ঘরে দেয়াল-আলমারিতে আছে। চাবি তো তোমারই কাছে।’

    ‘আচ্ছা। আমি ওপরে যাচ্ছি, তুমি গাড়ি থেকে ফুল আর যা যা আছে নিয়ে এস।’ দীপা ওপরে চলে গেল।

    ওপরের বসবার ঘরে কাবার্ডে অনেক শৌখিন বাসন-কোসন ছিল, তার মধ্যে কয়েকটা রূপোর ফুলদানি। কিন্তু বহুকাল অব্যবহারে রূপোর গায়ে কলঙ্ক ধরেছে। দীপা ফুলদানিগুলোকে বের করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর নকুল এক বোঝা গোলাপ নিয়ে উপস্থিত হলে তাকে প্রশ্ন করল—‘নকুল, ব্রাসো আছে?’

    নকুল বলল—‘বাসন পরিষ্কার করার মলম? না বউদি, ছিল, শেষ হয়ে গেছে। কে আর রূপোর বাসন মাজাঘষা করছে! আমি তেঁতুল দিয়েই কাজ চালিয়ে নিই।’

    দীপা বলল—‘তেঁতুল হলেও চলবে। এখন চল, ফুলগুলোকে বাথরুমের টবে রেখে ফুলদানি পরিষ্কার করতে হবে।’

    দীপার শয়নঘরের সংলগ্ন বাথরুমে জলভরা টবে লম্বা ডাঁটিসুদ্ধ গোলাপ ফুলগুলোকে আপাতত রেখে দীপা তেঁতুল দিয়ে ফুলদানি সাফ করতে বসল। এতদিন পরে সে একটা কাজ পেয়েছে যাতে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যেও ভুলে থাকা যায়।

    দেবাশিস একবার নিঃশব্দে ওপরে এসে দেখল, দীপা ভারি ব্যস্ত। আঁচলটা গাছ-কোমর করে জড়িয়েছে, মাথার চুল একটু এলোমলো হয়েছে; ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। দেবাশিস দোরের কাছে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট চোখে দেখল, কিন্তু দীপা তাকে লক্ষ্যই করল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেবাশিস আস্তে আস্তে নীচে নামল, তারপর নৃপতির বাড়িতে চলে গেল।

    কিন্তু আজ আর তার আড্ডায় মন বসল না। ঘণ্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে সে বাড়ি ফিরে এল। ওপরের বসবার ঘরে দীপা রেডিও চালিয়ে বসে ছিল, দেবাশিসকে দেখে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে রেডিও নিবিয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল—‘ফুলগুলোকে ফুলদানিতে সাজিয়ে ঘরে ঘরে রেখেছি। দেখবে?’

    দেবাশিসের মনের ভিতর দিয়ে বিস্ময়ানন্দের বিদ্যুৎ খেলে গেল। দীপা এতদিন তাকে প্রকাশ্যে ‘তুমি’ এবং জনান্তিকে ‘আপনি’ বলেছে, আজ হঠাৎ নিজের অজান্তে জনান্তিকেও ‘তুমি’ বলে ফেলেছে।

    দেবাশিস মুচকি হেসে বলল—‘চল, দেখি।’

    দীপা তার হাসি লক্ষ্য করল; হাসিটা যেন গোপন অর্থবহ। সে কিছু বুঝতে পারল না, বলল—‘এস।’

    নিজের শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে আলো জ্বেলে দীপা দেবাশিসের মুখের পানে চাইল; দেবাশিস দেখল, ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে ঝক্‌ঝকে রূপপার ফুলদানিতে দীর্ঘবৃন্ত একগুচ্ছ গোলাপ শোভা পাচ্ছে। লাল, গোলাপী এবং সাদা, তিন রঙের গোলাপ, তার সঙ্গে মেডেন হেয়ার ফার্নের জালিদার পাতা।

    ফুলদানিতে ফুল সাজানোর কলাকৌশল আছে, যেমন-তেমন করে সাজালেই হয় না। দেবাশিস খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলে উঠল—‘বাঃ, ভারি চমৎকার সাজিয়েছ! মনে হচ্ছে যেন ফুলের ফোয়ারা।’

    ঘর থেকে বেরিয়ে বসবার ঘরে এসে দেবাশিসের নজর পড়ল রেডিওগ্রামের ওপরে একটা ফুলদানিতে গোলাপ সাজানো রয়েছে। এর সাজ অন্য রকম; চরকি ফুলঝুরির মত ফুলগুলি গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে দেবাশিস বলল—‘এটাও ভারি সুন্দর। আগে চোখে পড়েনি।’

    এই সময় নকুল নীচে থেকে হাঁক দিল—‘বউদিদি, তোমরা এস। ভাত বেড়েছি।’

    দু’জনে নীচে নেমে গেল। রান্নাঘরের টেবিলেও গোলাপগুচ্ছ। দেবাশিস দীপার পানে প্রশংসাপূর্ণ চোখে চেয়ে একটু হাসল।

    সে-রাত্রে নিজের ঘরে শুতে গিয়ে দেবাশিস দেখল, তার ড্রেসিং টেবিলের ওপরেও গোলাপের ফোয়ারা। দীপা তার ঘরে ফুল রাখতে ভোলেনি। দেবাশিসের মন মাধুর্যপূর্ণ হয়ে উঠল।

    দীপা নিজের ঘরে গিয়ে নৈশদীপ জ্বেলে শুয়েছিল। কিন্তু ঘুম সহজে এল না। মনের মধ্যে একটি আলোর চারপাশে বাদলা পোকার মত অনেকগুলো ছোট ছোট চিন্তার টুকরো ঘুরে বেড়াচ্ছে। আলোটি স্নিগ্ধ তৃপ্তির আলো। আজকের দিনটা যেন গোলাপ-জলের ছড়া দিয়ে এসেছিল…ফ্যাক্টরিতে অনুষ্ঠান…ডক্টর দত্ত…সভামণ্ডপে গান…তোমরা সবাই ভাল…ফ্যাক্টরির সবাই যেন প্রাণপণে চেষ্টা করেছে তাকে খুশি করতে…রাশি রাশি গোলাপফুল…ঘরে সাজিয়ে রাখতে কী ভালই লাগে…দেবাশিসের ভাল লেগেছে…সে অমন মুখ টিপে হাসল কেন?…যেন হাসির আড়ালে কিছু মানে ছিল—ওঃ!

    শুয়ে শুয়ে দীপার মুখ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। সে মনের ভুলে দেবাশিসকে আড়ালে ‘তুমি’ বলে ফেলেছিল, তখন বুঝতে পারেনি। দেবাশিস তাই শুনে হেসেছিল।

    দীপা বিছানা থেকে উঠে খোলা জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সামনে দিয়ে ডাইনে বাঁয়ে রাস্তা চলে গেছে; রাস্তার ওপারের তিন চারটে বাড়ির সদর এই জানলা থেকে দেখা যায়। বাড়িগুলির আলো নিবে গেছে। রাস্তায় দু’সারি আলো নিষ্পলক জ্বলছে। রাস্তা দিয়ে দু’একটি লোক কদাচিৎ চলে যাচ্ছে, পঁচিশ গজ দূর থেকে তাদের জুতোর খট্‌খট্‌ শব্দ শোনা যাচ্ছে। আধ-ঘুমন্ত রাত্রি।

    ভণ্ডামি করা, মিথ্যে অভিনয় করে মানুষকে ঠকানো, এসব দীপার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। তবু ঘটনাচক্রে সে দেবাশিসের সঙ্গে লোক ঠকানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে খানিকটা মানসিক ঘনিষ্ঠতা অনিবার্য। সেজন্য দেবাশিসের কোনো দোষ নেই; সে স্বভাব-ভদ্রলোক, তার প্রকৃতি মধুর। কিন্তু সান্নিধ্য যতই ঘনিষ্ঠ হোক, দীপা তাকে ভালবাসে না, অন্য একজনকে ভালবাসে। কতকগুলো অভাবনীয় ঘটনা-সমাবেশের ফলে দীপা আর দেবাশিস একত্র নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এ অবস্থায় দীপা যদি দেবাশিসের সঙ্গে সহজ সম্বন্ধে বাস করে তাতে দোষ কি? তাকে আড়ালে ‘তুমি বললে অন্যায় হবে কেন? কাউকে ‘তুমি বললেই কি তার সঙ্গে ভালবাসার সম্বন্ধ বোঝায়?

    মনের অস্বস্তি অনেকটা কমলো। সে আবার গিয়ে বিছানায় শুল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। সে লক্ষ্য করেনি যে, যতক্ষণ সে জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল ততক্ষণ একটি লোক রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে ঠেস দয়ে একদৃষ্টে তার পানে তাকিয়ে ছিল। লক্ষ্য করলে এত সহজে ঘুম আসত না।

    পরদিন সকালবেলা ওপরের বসবার ঘরে চা খেতে খেতে দেবাশিস বলল—‘তুমি সারাদিন একলা থাকো, সময় কাটে কি করে?’

    দীপা চুপ করে রইল। সময় কাটবার তাই কাটে, সময়ের যদি দাঁড়িয়ে পড়বার উপায় থাকত তাহলে বোধহয় দীপার সময় দাঁড়িয়েই পড়ত।

    দেবাশিস বলল—‘তোমার বই পড়ার শখ নেই; বাড়িতে কিছু বই আছে কিন্তু সেগুলো বিজ্ঞানের বই। তুমি যদি চাও বইয়ের দোকান থেকে গল্প-উপন্যাসের বই এনে দিতে পারি। মাসিক সাপ্তাহিক কাগজের গ্রাহক হওয়া যায়।’

    দীপা এবারও চুপ করে রইল। বই পড়তে সে ভালবাসে, ভাল লেখকের ভাল গল্প-উপন্যাস পেলে পড়ে, কিন্তু বই মুখে দিয়ে তো সারা দিন-রাত কাটে না।

    ‘কিংবা তোমাকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যেতে পারি, তুমি নিজের পছন্দ মত বই কিনো।’

    দীপা সংশয় জড়িত স্বরে বলল—‘আচ্ছা।’

    দেবাশিস বুঝল, বই সম্বন্ধে দীপার বেশি আগ্রহ নেই। তখন সে বলল—‘তোমার বান্ধবীদের বাড়িতে ডাকো না কেন? তাদের সঙ্গে গল্প করেও দু’দণ্ড সময় কাটবে।’

    দীপা বলল—‘আচ্ছা, ডাকব।’

    চা শেষ করে দেবাশিস জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নীচে অনাদৃত বাগানের পানে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ঘরের দিকে ফিরে বলল—‘তুমি ফুল ভালবাস। বাগান করার শখ আছে কি?’

    ‘আছে।’ দীপা সাগ্রহে উঠে দাঁড়াল, এক পা এক পা করে দেবাশিসের কাছে এসে বলল—‘বাপের বাড়িতে ছাদের ওপর বাগান করেছিলুম, টবের বাগান।’

    দেবাশিস হেসে বলল—‘ব্যস্‌, তবে আর কি, এখানে মাটিতে বাগান কর। বাবা মারা যাবার পর বাগানের যত্ন নেওয়া হয়নি। আমি আজই ব্যবস্থা করছি। আগে একটা মালী দরকার, তুমি একলা পারবে না।’

    পরদিন মালী এল, গাড়ি গাড়ি সার এল, কোদাল খন্তা খুরপি গাছকাটা কাঁচি এল, নার্সারি থেকে মৌসুমী ফুলের বীজ, গোলাপের কলম, বারোমেসে গাছের চারা এল, ছোট ছোট সুপুরিগাছ এল। মহা আড়ম্বরে দীপার জীবনের উদ্যান পর্ব আরম্ভ হয়ে গেল।

    তারপর কয়েকদিন প্রবল উত্তেজনার মধ্যে কাটল। প্রৌঢ় মালী পদ্মলোচন অতিশয় বিজ্ঞ ব্যক্তি, তার সঙ্গে পরামর্শ করে কোথায় মৌসুমী ফুলের বীজ পোঁতা হবে, কোথায় গোলাপের কলম বসবে, কীভাবে সুপুরি আর ঝাউ-এর সারি বসিয়ে বীথিপথ তৈরি হবে, দীপা তারই প্ল্যান করছে। ঘুমে জাগরণে বাগান ছাড়া তার অন্য চিন্তা নেই।

    দেবাশিস নির্লিপ্তভাবে সব লক্ষ্য করে, কিন্তু দীপার কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করে না, এমন কি তাকে বাগান সম্বন্ধে পরামর্শ দিতেও যায় না। দীপা যা করছে করুক, তার যাতে মন ভাল থাকে তাই ভাল।

    দিন কাটছে।

    একদিন দুপুরবেলা দীপা রেডিওর মৃদু গুঞ্জন শুনতে শুনতে ভাবছিল, অরোকোরিয়া পাইন-এর চারাটি বাগানের কোন জায়গায় বসালে ভাল হয়, এমন সময় ঘরের কোণে টেলিফোন বেজে উঠল। দীপা চকিতে সেই দিকে চাইল, তারপরে উঠে গিয়ে ফোন তুলে নিল—‘হ্যালো’।

    টেলিফোনে আওয়াজ এল—‘আমি। গলা চিনতে পারছ?’

    দীপার বুকের মধ্যে দু’বার ধক্‌ ধক্‌ করে উঠল। সে যেন ধাক্কা খেয়ে স্বপ্নলোক থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এল। একটু দম নিয়ে একটু হাঁপিয়ে বলল—‘হ্যাঁ।’

    ‘খবর সব ভাল?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘কোনো গোলমাল হয়নি?’

    ‘না।’

    ‘তোমার স্বামী মানুষটা কেমন?’

    ‘মন্দ মানুষ নয়!’

    ‘তোমার ওপর জোর-জুলুম করছে না?’

    ‘না।’

    ‘একেবারেই না?’

    ‘না।’

    ‘হুঁ। আরো কিছুদিন এইভাবে চালাতে হবে।’

    ‘আর কত দিন?’

    ‘সময়ে জানতে পারবে। আচ্ছা।’

    ফোন রেখে দিয়ে দীপা আবার আরাম-চেয়ারে এসে বসল, পিছনে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইল। রেডিওর মৃদু গুঞ্জন চলছে। দু’মিনিট আগে দীপা বাগানের কথা ভাবছিল, এখন মনে হল বাগানটা বহু দূরে চলে গেছে।

    বিকেলবেলা আন্দাজ সাড়ে তিনটের সময় নীচে সদর দোরের ঘন্টি বেজে উঠল। দীপা চোখ খুলে উঠে বসল। কেউ এসেছে। দেবাশিস কি আজ তাড়াতাড়ি ফিরে এল? কিন্তু আজ তো শনিবার নয়—

    দীপা উঠে গিয়ে সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াল। নকুল দোর খুলছে। তারপরই মেয়েলি গলা শোনা গেল—‘আমি দীপার বন্ধু, সে বাড়িতে আছে তো?’

    নকুল উত্তর দেবার আগেই দীপা ওপর থেকে ডাকল—‘শুভ্রা, আয়, ওপরে চলে আয়।’

    শুভ্রা ওপরে এসে সিঁড়ির মাথায় দীপাকে জড়িয়ে ধরল, বলল—‘সেই ফুলশয্যের রাত্রে তোকে সাজিয়ে দিয়ে গিয়েছিলুম। তারপর আসিনি, তোকে হনিমুন করবার সময় দিলুম। আজ ভাবলুম, দীপা আর কনে-বউ নেই, এত দিনে পাকা গিন্নী হয়েছে, যাই দেখে আসি। হ্যাঁ ভাই, তোর বর বাড়িতে নেই তো?’

    ‘না। আয়, ঘরে আয়।’

    শুভ্রা মেয়েটি দীপার চেয়ে বছর দেড়েকের বড়, বছরখানেক আগে বিয়ে হয়েছে। তার চেহারা গোলগাল, প্রকৃতি রঙ্গপ্রিয়, গান গাইতে পারে। প্রকৃতি বিপরীত বলেই হয়তো দীপার সঙ্গে তার মনের সান্নিধ্য বেশি।

    বসবার ঘরে গিয়ে তারা পশ্চিমের খোলা জানলার সামনে দাঁড়াল। শুভ্রা দীপাকে ভাল করে দেখে নিয়ে মৃদু হাসল, বলল—‘বিয়ের জল গায়ে লাগেনি, বিয়ের আগে যেমন ছিলি এখনো তেমনি আছিস। কিন্তু গায়ে গয়না নেই কেন? হাতে দু’গাছি চুড়ি, কানে ফুল আর গলায় সরু হার; কনে-বউকে কি এতে মানায়।’

    দীপা চোখ নামাল, তারপর আবার চোখ তুলে বলল—‘তুই তো এখনই বললি আমি আর কনে-বউ নই।’

    শুভ্রা বলল—‘গয়না পরার জন্য তুই এখনও কনে-বউ। কিন্তু আসল কথাটা কী? ‘আভরণ সৌতিনি মান’?’

    ‘সে আবার কি!’

    ‘তা জানিস না! কবি গোবিন্দদাস বলেছেন, সময়বিশেষে গয়না সতীন হয়ে দাঁড়ায়।’ এই বলে দীপার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে গাইল—

    ‘সখি, কি ফল বেশ বনান
    কানু পরশমণি পরশক বাধন
    আভরণ সৌতিনি মান।’

    দীপার মুখের ওপর যেন এক মুঠো আবির ছড়িয়ে পড়ল। সে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল—‘যাঃ, তুই বড় ফাজিল।’

    শুভ্রা খিলখিল করে হেসে বলল—‘তুইও এবার ফাজিল হয়ে যাবি, আর গাম্ভীর্য চলবে না। বিয়ে হলেই মেয়েরা ফাজিল হয়ে যায়।’

    দীপা কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। কিন্তু যেমন করে লোক সত্যি কথা লুকিয়ে রাখতে হবে, মিথ্যে কথা বলে শুভ্রার চোখে ধুলো দিতে হবে। শুভ্রা যেন জানতে না পারে।

    দীপা আকাশ-পাতাল ভাবছে শুভ্রার ঠাট্টার কি উত্তর দেবে, এমন সময় দোরের কাছে থেকে নকুলের গলা এল—‘বউদি, চা জলখাবার আনি?’

    দীপা যেন বেঁচে গেল। বলল—‘হ্যাঁ নকুল, নিয়ে এস।’

    নকুল নেমে গেল। দীপা বলল—‘আয় ভাই, বসি। তারপর হিমানী সুপ্রিয়া কেমন আছে বল। মনে হচ্ছে যেন কতদিন তাদের দেখিনি!’

    শুভ্রা চেয়ারে বসে বলল—‘হিমানী সুপ্রিয়ার কথা পরে বলব, আগে তুই নিজের কথা বল। বরের সঙ্গে কেমন ভাব হল?’

    দীপা ঘাড় হেঁট করে অর্ধস্ফুট স্বরে বলল—‘ভাল।’

    শুভ্রা বলল—‘তোর বরটি ভাই দেখতে বেশ। কিন্তু দেখতে ভাল হলেই মানুষ ভাল হয় না। মানুষটি কেমন?’

    দীপা বলল—‘ভাল।’

    শুভ্রা বিরক্ত হয়ে বলল—‘ভাল আর ভাল, কেবল এক কথা! তুই কি কোনো দিন মন খুলে কিছু বলবি না?’

    ‘বললুম তো, আর কি বলব?’

    ‘এইটুকু বললেই বলা হল? আমার যখন বিয়ে হয়েছিল আমি ছুটে ছুটে আসতুম তোর কাছে, সব কথা না বললে প্রাণ ঠাণ্ডা হত না। আর তুই মুখ সেলাই করে বসে আছিস। গা জ্বলে যায়।’

    দীপা তার হাত ধরে মিনতির স্বরে বলল—‘রাগ করিসনি ভাই! জানিস তো, আমি কথা বলতে গেলেই গলায় কথা আটকে যায়। মনে মনে বুঝে নে না। সবই তো জানিস।’

    শুভ্রা বলল—‘সবায়ের কি এক রকম হয়? তাই জানতে ইচ্ছে করে। যাক গে, তুই যখন বলবি না তখন মনে মনেই বুঝে নেব। আচ্ছা, আজ উঠি, তোর বিয়ে পুরনো হোক তখন আবার একদিন আসব।’

    দীপা কিন্তু শক্ত করে তার হাত ধরে রইল, বলল—‘না, তুই রাগ করে চলে যেতে পাবি না।’

    শুভ্রার রাগ অমনি পড়ে গেল, সে হেসে বলল—‘তুই হদ্দ করলি। বরের কাছেও যদি এমনি মুখ বুজে থাকিস বর ভুল বুঝবে। ওরা ভুল-বোঝা মানুষ।’

    নকল চায়ের ট্রে নিয়ে এল, সঙ্গে স্তূপাকৃতি প্যাসট্রি। দীপা চা ঢেলে শুভ্রাকে দিল, নিজে নিল; দু’জনে চা আর প্যাসট্রি খেতে খেতে সাধারণভাবে গল্প করতে লাগল। শাড়ি ব্লাউজ, গয়নার নতুন ফ্যাশন, সেন্ট স্নো পাউডার-এর দুর্মূল্যতা, এই সব নিয়ে গল্প। শুভ্রাই বেশি কথা বলল, দীপা সায় উত্তর দিল।

    আধ ঘণ্টা পরে চা খাওয়া শেষ হলে নকুল এসে ট্রে তুলে নিয়ে গেল, দীপা তখন বলল—‘শুভ্রা, তুই এবার একটা গান গা, অনেক দিন তোর গান শুনিনি।’

    শুভ্রা বলল—‘কেন, এই তো কানে কানে গান শুনলি। আর কী শুনবি? মম যৌবননিকুঞ্জে গাহে পাখি, সখি জাগো?’

    ‘না না, ওসব নয়। আধুনিক গান।’

    ‘আধুনিক গানের কথায় মনে পড়ল, পরশু গ্রামোফোনের দোকানে গিয়েছিলুম, প্রবাল গুপ্তর একটা নতুন রেকর্ড শুনলাম। ভারি সুন্দর গেয়েছে। রেকর্ডখানা কিনেছি। তুই শুনেছিস?’

    দীপা অলসভাবে বলল—‘শুনেছি। রেডিওতে প্রায়ই বাজায়। সিনেমার গানের কোনো নতুন রেকর্ড বেরিয়েছে নাকি?’

    শুভ্রা বলল—‘শুনিনি। কিন্তু একটা নতুন ছবি বেরিয়েছে, ‘দীপ্তি’ সিনেমায় দেখাচ্ছে; ছবিটা নাকি খুব ভাল হয়েছে। সুজন হিরো, জোনাকি রায় হিরোইন।’

    দীপা একটু নড়েচড়ে বসল, কিছু বলল না। শুভ্রা বলল—‘দীপা, ঘরে বসে কি করবি, চল ছবি দেখে আসি। আমার সঙ্গে যদি ছবি দেখতে যাস, তোর বর নিশ্চয় রাগ করবে না।’ কব্জির ঘড়ি দেখে বলল—‘সওয়া চারটে বেজেছে। তোর বর কাজ থেকে ফেরে কখন?’

    ‘পাঁচটার সময়।’

    ‘তবে তো ঠিকই হয়েছে। তুই সেজেগুজে তৈরি হতে হতে তোর বর এসে পড়বে, তখন তাকে জানিয়ে আমরা ছবি দেখতে চলে যাব। আর তোর বর যদি সঙ্গে যেতে চায় তাহলে তো আরো ভাল।’

    দীপার ইচ্ছে হল শুভ্রার সঙ্গে ছবি দেখতে যায়। দেবাশিস কোনো আপত্তি তুলবে না তাও সে জানে। তবু তার মনের একটা অংশ তার ইচ্ছাকে পিছন থেকে টেনে ধরে রইল, তাকে যেতে দেবে না। সে কাঁচুমাচু হয়ে বলল—‘আজ থাক ভাই, আর একদিন যাব।’

    শুভ্রা আরো কিছুক্ষণ পীড়াপীড়ি করল, কিন্তু দীপা রাজী হল না। শুভ্রা তখন বলল—‘বুঝেছি, তুই বর-হ্যাংলা হয়েছিস, বরকে ছেড়ে নড়তে পারিস না। বিয়ের পর কিছু দিন আমারও হয়েছিল।’ সে নিজের বর-হ্যাংলামির গল্প বলতে লাগল। তারপর হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল—‘পাঁচটা বাজে, আমি পালাই, এখনই তোর বর এসে পড়বে। আমি থাকলে তোদের অসুবিধে হবে। আবার একদিন আসব।’ শুভ্রা হাসতে হাসতে চলে গেল।

    তাকে সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে দীপা ভাবতে লাগল, কি আশ্চর্য, মনের কথা মুখ ফুটে না বললে কি কেউ বুঝতে পারে না! সবাই ভাবে, যা গতানুগতিক তাই সত্যি!

    তারপর দিন কাটছে।

    একদিন বেশ গরম পড়েছে! গুমোট গরম, বাতাস নেই; তাই মনে হয় শীগ্‌গিরই ঝড়-বৃষ্টি নামবে। দেবাশিস বিকেলবেলা ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে দেখল, দীপা আর পদ্মলোচন দড়ি ধরে বাগান মাপজোক করছে। দেবাশিসকে দেখে দীপা দড়ি ফেলে তাড়াতাড়ি তার গাড়ির কাছে এল, বেশ উত্তেজিতভাবে বলল—‘ঈস্টার লিলিতে কুঁড়ি ধরেছে। দেখবে?’

    দেবাশিস গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল—‘তাই নাকি! কোথায় ঈস্টার লিলি?’

    ‘এস, দেখাচ্ছি।’

    বাগানের এক ধারে দীপা আঙুল দেখাল। দেবাশিস দেখল, ভূমিলগ্ন ঝাড়ের মাঝখান থেকে ধ্বজার মত ডাঁটি বেরিয়েছে, তার মাথায় তিন-চারটি কুঁড়ির পতাকা। স্নিগ্ধ হেসে দেবাশিস দীপার পানে চাইল—‘তোমার বাগানের প্রথম ফুল।’

    হাসতে গিয়ে দীপা থেমে গেল। ‘তোমার বাগানের—’, বাগান কি দীপার? হঠাৎ তার মনটা বিকল হয়ে গেল, প্রথম মুকুলোদগম দেখে যে আনন্দ হয়েছিল তা নিবে গেল।

    সন্ধ্যের পর নৃপতির আড্ডায় গিয়ে দেবাশিস দেখল আড্ডাধারীরা প্রায় সকলেই উপস্থিত, বেশ উত্তেজিতভাবে আলোচনা চলছে। তাকে দেখে সকলে কলরব করে উঠল—‘ওহে, শুনেছ?’

    সুজন থিয়েটারী পোজ দিয়ে বলল—‘আবার শজারুর কাঁটা!’

    নৃপতি বলল—‘এস, বলছি। তুমি কাগজ পড় না, তাই জান না। মাসখানেক আগে একটা ভিখিরিকে কেউ শজারুর কাঁটা ফুটিয়ে মেরেছিল মনে আছে?’

    দেবাশিস বলল—‘হ্যাঁ, মনে আছে।’

    ‘পরশু রাত্রে একটা মজুর লেকের ধারে বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল, তার হৃদ্‌যন্ত্রে শজারুর কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়ে কেউ তাকে খুন করেছে।’

    দেবাশিস বলল—‘কে খুন করেছে, জানা যায়নি?’

    নৃপতি একটু হেসে বলল—‘না, পুলিস তদন্ত করছে।’

    কপিল বলল—‘পুলিস অনন্তকাল ধরে তদন্ত করলেও আসামী ধরা পড়বে না। অবশ্য স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, ভিখিরি এবং মজুরের হত্যাকারী একই লোক। এ ছাড়া আর কেউ কিছু বুঝতে পেরেছ কি?’

    খড়্গ বাহাদুর বলল—‘দুটো খুনই আমাদের পাড়ায় হয়েছে, সুতরাং অনুমান করা যেতে পারে যে হত্যাকারী আমাদের পাড়ার লোক।’

    নৃপতি বলল—‘তা নাও হতে পারে। হত্যাকারী হয়তো টালার লোক।’

    এই সময় কফি এল। প্রবাল এতক্ষণ পিয়ানোর সামনে মুখ গোমড়া করে বসে ছিল, আলোচনার হল্লায় বাজাতে পারছিল না; এখন উঠে এসে এক পেয়ালা কফি তুলে নিল। কপিল তাকে প্রশ্ন করল—‘কি হে মিঞা তানসেন, তোমার কি মনে হয়?’

    প্রবাল কফির পেয়ালায় একবার ঠোঁট ঠেকিয়ে বলল—‘আমার মনে হয় হত্যাকারী উন্মাদ এবং তোমরাও বদ্ধ পাগল।’

    সবাই হইচই করে উঠল—‘আমরা পাগল কেন?’

    প্রবাল বলল—‘তোমরা হয় পাগল নয় ভণ্ড। একটা কুলিকে যদি কেউ খুন করে থাকে। তোমাদের এত মাথাব্যথা কিসের? কুলির শোকে তোমাদের বুক ফেটে যাচ্ছে এই কথা বোঝাতে চাও?’

    অতঃপর তর্ক উদ্দাম এবং উত্তাল হয়ে উঠল।

    দেবাশিস তর্কাতর্কি বাগযুদ্ধ ভালবাসে না। সে কফি শেষ করে চুপিচুপি পালাবার চেষ্টায় ছিল, নৃপতি তা লক্ষ্য করে বলল—‘কি হে দেবাশিস, চললে নাকি?’

    দেবাশিস বলল—‘হ্যাঁ, আজ যাই নৃপতিদা।’

    ‘নৃপতি বলল—‘আচ্ছা, এস। সাবধানে পথ চলবে। দক্ষিণ কলকাতার পথেঘাটে এখন দলে দলে পাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

    এক ধমক হাসির উচ্ছ্বাসের সঙ্গে দেবাশিস বেরিয়ে এল। সে দু’চার পা চলেছে, এমন সময় শুনতে পেল দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে গোঁ গোঁ মড়্‌মড়্‌ আওয়াজ আসছে। চকিতে আকাশের দিকে চোখ তুলে সে দেখল মেঘ ছুটে আসছে; গুমোট ফেটে ঝড় বেরিয়ে এসেছে। দেখতে দেখতে একঝাঁক জেট বিমানের মত ঝড় এসে পড়ল; বাতাসের প্রচণ্ড দাপটে চারদিক এলোমেলো হয়ে গেল।

    দেবাশিস হাওয়ার ধাক্কায় টাল খেতে খেতে একবার ভাবল, ফিরে যাই, নৃপতিদার বাড়ি বরং কাছে; তারপর ভাবল, ঝড় যখন উঠেছে তখন নিশ্চয় বৃষ্টি নামবে, কতক্ষণ ঝড়-বৃষ্টি চলবে ঠিক নেই; সুতরাং বাড়ির দিকে যাওয়াই ভাল, হয়তো বৃষ্টি নামার আগেই বাড়ি পৌঁছে যাব।

    দেবাশিস ঝড়ের প্রতিকূলে মাথা ঝুঁকিয়ে চলতে লাগল। কিন্তু বেশি দূর চলতে হল না, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল; বরফের মত ঠাণ্ডা জলের ঝাপ্‌টা তার সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিল।

    বাড়িতে ফিরে দেবাশিস সটান ওপরে চলে গেল। দীপা নিজের ঘরে ছিল, বন্ধ জানলার কাচের ভিতর দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল; দেবাশিস জোরে টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকতেই সে ফিরে দাঁড়িয়ে দেবাশিসের সিক্ত মূর্তি দেখে সশঙ্ক নিশ্বাস টেনে চক্ষু বিস্ফারিত করল। দেবাশিস লজ্জিতভাবে ‘ভিজে গেছি’ বলে বাথরুমে ঢুকে পড়ল।

    দশ মিনিট পরে শুকনো জামাকাপড় পরে সে বেরিয়ে এল, তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে দেখল, দীপা যেমন ছিল তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। সে বলল-‘নৃপতিবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছি আর ঝড়-বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল। চল, খাবার সময় হয়েছে।’

    পরদিন সকালে গায়ে দারুণ ব্যথা নিয়ে দেবাশিস ঘুম থেকে উঠল। বৃষ্টিতে ভেজার ফল, সন্দেহ নেই; হয়তো ইনফ্লুয়েঞ্জায় দাঁড়াবে। দেবাশিস ভাবল আজ আর কাজে যাবে না। কিন্তু সারা দিন বাড়িতে থাকলে বার বার দীপার সংস্পর্শে আসতে হবে, নিরর্থক কথা বলতে হবে; সে লক্ষ্য করেছে রবিবারে দীপা যেন শঙ্কিত আড়ষ্ট হয়ে থাকে। কী দরকার? সে গায়ের ব্যথার কথা কাউকে বলল না, যথারীতি খাওয়া-দাওয়া করে ফ্যাক্টরি চলে গেল।

    বিকেলবেলা সে গায়ে জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরল। জলখাবার খেতে বসে সে নকুলকে বলল—‘নকুল, আমার একটু ঠাণ্ডা লেগেছে, রাত্তিরে ভাত খাবো না।’

    নকুল বলল—‘কাল রাত্তিরে যা ভেজাটা ভিজেছ, ঠাণ্ডা তো লাগবেই। তা ডাক্তারবাবুকে খবর দেব?’

    দেবাশিস বলল—‘আরে না না, তেমন কিছু নয়। গোটা দুই অ্যাসপিরিন্‌ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’

    রাত্রে সে খেতে নামল না। খাবার সময় হলে দীপা নীচে গিয়ে নকুলকে বলল—‘নকুল, ওর খাবার তৈরি হয়ে থাকে তো আমাকে দাও, আমি নিয়ে যাই।’

    নকুল একটা ট্রে-র উপর সুপের বাটি, টোস্ট এবং স্যালাড সাজিয়ে রাখছিল, বলল—‘সে কি বউদি, তুমি দাদাবাবুর খাবার নিয়ে যাবে! আমি তাহলে রয়েছি কি কত্তে? নাও, চল।’

    ট্রে নিয়ে নকুল আগে আগে চলল, তার পিছনে দীপা। দীপার মন ধুকপুক করছে। ওপরে উঠে নকুল যখন দীপার ঘরের দিকে চলল, সে তখন ক্ষীণ কুণ্ঠিত স্বরে বলল—‘ওদিকে নয় নকুল, এই ঘরে।’

    নকুল ফিরে দাঁড়িয়ে দীপার পানে তীক্ষ্ণ চোখে চাইল, তারপর অন্য ঘরে গিয়ে দেখল দেবাশিস বিছানায় শুয়ে বই পড়ছে। নকুল খাটের পাশে গিয়ে সন্দেহভরা গলায় বলল—‘তুমি এ ঘরে শুয়েছ যে, দাদাবাবু!’

    দেবাশিস কৈফিয়ত তৈরি করে রেখেছিল, বিছানায় উঠে বসে বলল—‘কি জানি, হয়তো ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরেছে তাই আলাদা শুয়েছি। ছোঁয়াচে রোগ, শেষে দীপাকেও ধরবে।’

    সন্তোষজনক কৈফিয়ত। দীপা নিশ্বাস ফেলে বাঁচল। নকুলও আর কিছু বলল না, কিন্তু তার চোখ সন্দিগ্ধ হয়ে রইল। সে যেন বুঝেছে, যেমনটি হওয়া উচিত ঠিক তেমনটি হচ্ছে না, কোথাও একটু গলদ রয়েছে।

    ঘণ্টা তিনেক পরে দীপা নিজের ঘরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল, দোরে ঠুক্‌ঠুক্‌ শব্দ শুনে তার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম-চোখে উঠে দোর খুলেই সে প্রায় আঁতকে উঠল। দেবাশিস বিছানার চাদর গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার শরীর ঠক্‌ঠক্ করে কাঁপছে। সে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল—‘বুকে দারুণ ব্যথা, জ্বরও বেড়েছে…ডাক্তারকে খবর দিতে হবে।’ এই বলে সে টলতে টলতে নিজের ঘরে ফিরে গেল।

    আকস্মিক বিপৎপাত মানুষের মন ক্ষণকালের জন্য অসাড় হয়ে যায়। তারপর সংবিৎ ফিরে আসে। দীপা স্বস্থ হয়ে ভাবল, ডাক্তার ডাকতে হবে; কিন্তু এ বাড়ির বাঁধা ডাক্তার কে তা সে জানে না, তাঁকে ডাকতে হলে নকুলকে পাঠাতে হবে; তাতে অনেক দেরি হবে। তার চেয়ে যদি সেনকাকাকে ডাকা যায়—

    দীপা ডাক্তার সুহৃৎ সেনকে টেলিফোন করল। ডাক্তার সেন দীপার বাপের বাড়ির পারিবারিক ডাক্তার।

    একটি নিদ্রালু স্বর শোনা গেল—‘হ্যালো।’

    দীপা বলল—‘সেনকাকা! আমি দীপা।’

    ‘দীপা! কী ব্যাপার?’

    ‘আমি—আমার—’ দীপা ঢোক গিলল—‘আমার স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এখনই ডাক্তার চাই। আমি জানি না এঁদের ডাক্তার কে, তাই আপনাকে ডাকছি। আপনি এক্ষুনি আসুন সেনকাকা।’

    ‘এক্ষুনি যাচ্ছি। কিন্তু অসুখের লক্ষণ কি?’

    ‘বৃষ্টিতে ভিজে ঠাণ্ডা লেগেছিল—তারপর—’

    ‘আচ্ছা, আমি আসছি।’

    ‘বাড়ি চিনে আসতে পারবেন তো?’

    ‘খুব পারব! এই তো সেদিন তোমার বউভাতের নেমন্তন্ন খেয়েছি।’

    মিনিট কুড়ির মধ্যে ডাক্তার সেন এলেন, ওপরে গিয়ে দেবাশিসের পরীক্ষা শুরু করলেন। দীপা দোরের চৌকাঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।

    প্রথমে কয়েকটা প্রশ্ন করে ডাক্তার রোগীর নাড়ি দেখলেন, টেম্পারেচার নিলেন, তারপর স্টেথস্কোপ কানে লাগিয়ে বুক পরীক্ষা করতে লাগলেন। পরীক্ষা করতে করতে তাঁর চোখ হঠাৎ বিস্ফারিত হল, তিনি বলে উঠলেন—‘এ কি!’

    দেবাশিস ক্লিষ্ট স্বরে বলল—‘হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, আমার সবই উল্টো।’

    দীপা সচকিত হয়ে উঠল, কিন্তু দেবাশিস আর কিছু বলল না। ডাক্তার কেবল ঘাড় নাড়লেন।

    পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার বললেন—‘বুকে বেশ সর্দি জমেছে। আমি ইঞ্জেকশন দিচ্ছি, তাতেই কাজ হবে। আবার কাল সকালে আমি আসব, যদি দরকার মনে হয় তখন রীতিমত চিকিৎসা আরম্ভ করা যাবে।’

    ইঞ্জেকশন দিয়ে দেবাশিসের মাথায় হাত বুলিয়ে ডাক্তার সস্নেহে বললেন—‘ভয়ের কিছু নেই, দু’ চার দিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। আচ্ছা, আজ ঘুমিয়ে পড় বাবাজি, কাল ন’টার সময় আবার আমি আসব। তোমার বাড়ির ডাক্তারকেও খবর দিও।’

    ডাক্তার ঘর থেকে বেরুলেন, দীপা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে গেল। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে ডাক্তার সেন দীপাকে বললেন—‘একটা বড় আশ্চর্য ব্যাপার দেখলাম—’

    ‘কি দেখলেন?’

    ডাক্তার যা দেখেছেন দীপাকে বললেন।

    দিন দশেকের মধ্যে দেবাশিস আবার চাঙ্গা হয়ে উঠল। এই দশটা দিন অসুখের সময় হলেও দেবাশিসের পক্ষে বড় সুখের সময়। দীপা ঘুরে ফিরে তার কাছে আসে, খাটের কিনারায় বসে তার সঙ্গে কথা বলে; তার খাবার সময় হলে নীচে গিয়ে নিজের হাতে খাবার নিয়ে আসে, নকুলকে আনতে দেয় না। রাত্রে ঘুম থেকে উঠে চুপিচুপি এসে তাকে দেখে যায়; আধ-জাগা আধ-ঘুমন্ত অবস্থায় দেবাশিস জানতে পারে।

    একদিন, দেবাশিস তখন বেশ সেরে উঠেছে, বিকেলবেলা পিঠের নীচে বালিশ দিয়ে বিছানায় আধ-বসা হয়ে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে, দীপা দুধ-কোকোর পেয়ালা নিয়ে ঘরে ঢুকল। দেবাশিস হেসে তার হাত থেকে পেয়ালা নিল, দীপা খাটের পায়ের দিকে গিয়ে বসল। বলল—‘দাদা ফোন করেছিল, সন্ধ্যের পর আসবে।’

    দেবাশিস উত্তর দিল না, কোকোর কাপে ছোট ছোট চুমুক দিতে দিতে দীপার পানে চেয়ে রইল। বলা বাহুল্য, গত দশ দিনে দীপার বাপের বাড়ি থেকে রোজই কেউ না কেউ এসে তত্ত্ব-তল্লাশ নিয়ে গেছে। দীপার মা গোড়ার দিকে দু’ রাত্রি এসে এখানে ছিলেন। কিন্তু দীপা তার মা’র এখানে থাকা মনে মনে পছন্দ করেনি।

    দেবাশিস কাপে চুমুক দিচ্ছে আর চেয়ে আছে, দীপা একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। একটা কিছু বলবার জন্যে সে বলল—‘বাগানে বোধ হয় আরো কিছু ক্রোটন দরকার হবে।’

    এবারও দেবাশিস তার কথায় কান দিল না। খিন্ন-মধুর স্বরে বলল—‘দীপা, তুমি আমাকে ভালবাস না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।’

    নির্মেঘ আকাশ থেকে বজ্রপাতের মত অপ্রত্যাশিত কথা। দীপার মুখ রাঙা হয়ে উঠল, তারপরই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে দোরের দিকে পা বাড়িয়ে স্খলিত স্বরে বলল—‘বোধ হয় মালী এসেছে, যাই, দেখি সে কি করছে।’

    পিছন থেকে দেবাশিস ডাকল—‘দীপা, শোনো।’

    দীপা দুরুদুরু বুকে ফিরে এসে দাঁড়াল। দেবাশিসের মুখের সেই খিন্ন-করুণ ভাব আর নেই, সে খালি পেয়ালা দীপাকে দিয়ে সহজ সুরে বল—‘আমার কয়েকজন বন্ধুকে চায়ের নেমন্তন্ন করতে চাই। চার-পাঁচ জনের বেশি নয়।’

    দীপা মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বলল—‘কবে?’

    ‘তাড়া নেই। আজ রবিবার, ধরো আসছে রবিবারে যদি করা যায়?’

    ‘আচ্ছা।’

    ‘বাজারের খাবার কিন্তু একটুও থাকবে না। সব খাবার তুমি আর নকুল তৈরি করবে।’

    ‘আচ্ছা।’

    তারপর দিন কাটছে। দেবাশিস আবার ফ্যাক্টরি যেতে আরম্ভ করল। শনিবার সন্ধ্যায় নৃপতির আড্ডায় গেল। অনেক দিন পরে তাকে দেখে সবাই খুশি। এমন কি প্রবাল পিয়ানোয় বসে একটা হাল্কা হাসির গৎ বাজাতে লাগল। নৃপতি বলল—‘একটু রোগা হয়ে গেছ।’

    খড়্গ বাহাদুর বলল—‘ভাই দেবু, ঠেসে শিককাবাব খাও, দু’ দিনে ইয়া লাশ হয়ে যাবে?’

    কপিল বলল—‘খড়্গ, তুই খাম! তুই তো দিনে দেড় কিলো শিককাবাব খাস, তবে গায়ে গত্তি লাগে না কেন?’

    খড়্গ বলল—‘আমি যে ফুটবল খেলি, যারা ফুটবল খেলে তারা কখনো মোটা হয় না। মোটা ফুটবল খেলোয়াড় দেখেছিস?’

    সুজন বলল—‘কুস্তিগীর পালোয়ানেরা কিন্তু মোটা হয়। শুনেছি তারা হরদম পেস্তা আর বেদানার রস খায়।’

    এই সময় বিজয়মাধব এল। দেবাশিসকে দেখে তার কাছে এসে বলল—‘অসুখের পর এই প্রথম এলে, না?’

    দেবাশিস বলল—‘হ্যাঁ।’

    ‘এখন তাহলে একেবারে ঠিক হয়ে গেছে?’

    ‘হ্যাঁ।’

    দেবাশিসের কাছে কথা বলার বিশেষ উৎসাহ না পেয়ে বিজয় বিরস মুখে তক্তপোশের ধারে গিয়ে বসল। দেবাশিস তখন সকলের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল—‘তোমাদের চায়ের নেমন্তন্ন করতে এসেছি। কাল রবিবার সাড়ে পাঁচটার পর যখন ইচ্ছে আসবে। কেমন, কারুর অসুবিধে নেই তো?’

    কারুর অসুবিধে নেই। সবাই সানন্দে রাজী। কেবল খড়্গ বাহাদুর বলল—‘কাল আমার খেলা আছে। তবু আমি যত শীগ্‌গির পারি যাব। চায়ের সঙ্গে শিককাবাব খাওয়াবে তো?’

    কপিল বলল—‘তুই জ্বালালি। চায়ের সঙ্গে কেউ শিককাবাব খায়? শিককাবাবের অনুপান হচ্ছে বোতল।’

    দেবাশিস প্রবালের দিকে চেয়ে বলল—‘তুমি আসবে তো?’

    প্রবাল বলল—‘যাব। বড়মানুষের বাড়িতে নেমন্তন্ন আমি কখনো উপেক্ষা করি না। কিন্তু উপলক্ষটা কি? রোগমুক্তির উৎসব?’

    দেবাশিস বলল—‘আমার বউয়ের হাতের তৈরি খাবার তোমাদের খাওয়াব। বিজয়, তুমিও এস।’

    ‘যাব।’

    পরদিন সন্ধ্যেবেলা দেবাশিসের বাড়িতে অতিথিরা একে একে এসে উপস্থিত হল। এমন কি খড়্গ বাহাদুরও ঠিক সময়ে এল, বলল—‘খেলা হল না, ওয়াক্‌ওভার পেয়ে গেলাম।’

    নীচের তলার বসবার ঘরে আড্ডা জমল। সকলে উপস্থিত হলে দেবাশিস এক ফাঁকে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, দীপা খাবারের প্লেট সাজাচ্ছে আর নকুল দুটো বড় বড় টি-পটে চা তৈরি করছে। দেবাশিস দীপাকে বলল—‘ওরা সবাই এসে গেছে। দশ মিনিট পরে চা জলখাবার নিয়ে তুমি আর নকুল যেও।’

    ‘আচ্ছা।’ দীপা জানত না কারা নিমন্ত্রিত হয়েছে, তার মনে কোনো ঔৎসুক্য ছিল না। অস্পষ্টভাবে ভেবেছিল, হয়তো ফ্যাক্টরির সহকর্মী বন্ধু।

    বসবার ঘরে আলোচনা শুরু হয়েছে, আজকের কাগজে নতুন শজারুর কাঁটা হত্যার খবর বেরিয়েছে তাই নিয়ে। এবার শিকার হয়েছে এক দোকানদার, গুণময় দাস। এবারও অকুস্থল দক্ষিণ কলকাতা।

    আলোচনায় নতুনত্ব বিশেষ নেই। হত্যাকারী হয় পাগল, নয় পাকিস্তানী, নয় চীনেম্যান। সুজন বলল—‘একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ? প্রথমে ভিখিরি, তারপর মজুর, তারপর দোকানদার। হত্যাকারী স্তরে স্তরে উঁচু দিকে উঠছে। এর পরের বারে কে শিকার হবে ভাবতে পার?’

    প্রবাল গলার মধ্যে অবজ্ঞাসূচক শব্দ করল। কপিল বলল—‘সম্ভবত নামজাদা ফুটবল খেলোয়াড়।’

    খড়্গ বাহাদুর বলল—‘কিংবা নামজাদা সিনেমা অ্যাক্টর।’

    সুজন বলল—‘কিংবা নাম-করা গাইয়ে।’

    প্রবাল বলল—‘নাম-করা লোককেই মারবে এমন কী কথা আছে? পয়সাওয়ালা লোককেও মারতে পারে। যেমন নৃপতিদা কিংবা কপিল কিংবা—’

    এই সময় দীপা খাবারের ট্রে হাতে দোরের সামনে এসে দাঁড়াল। প্রবালের কথা শেষ হল না, সবাই হাসিমুখে উঠে দীপাকে মহিলার সম্মান দেখাল। দীপা একবার ত্রাস-বিস্ফারিত চোখ সকলের দিকে ফেরাল, তার মুখ সাদা হয়ে গেল। প্রবল চেষ্টায় সে নিজের দেহটাকে সামনে চালিত করে টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে রাখল।

    কপিল মৃদু ঠাট্টার সুরে বলল—‘নমস্কার, মিসেস ভট্ট।’

    দীপা বোধ হয় শুনতে পেল না, সে ট্রে রেখেই পিছু ফিরল। তার পিছনে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে নকুল ছিল, তাকে পাশ কাটিয়ে দীপা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

    দেবাশিস অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে আশা করেছিল, দীপা সকলকে চা ঢেলে দেবে, সকলেই বিয়ের আগে থেকে পরিচিত, তাদের সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলবে, তাদের খাওয়ার তদারক করবে। কিন্তু দীপা কিছুই করল না। দেবাশিস নিজেই সকলকে চা ঢেলে দিল। ট্রে’র ওপর থেকে খাবারের প্লেট নামিয়ে তাদের সামনে রাখল। দীপা আজ নকুলের সাহায্যে অনেক রকম খাবার তৈরি করেছিল: চিংড়ি মাছের কাটলেট, হিঙের কচুরি, ডালের ঝালবড়া, রাঙালুর পুলি, জমাট ক্ষীরের বরফি ইত্যাদি। অতিথিরা খেতে খেতে আবার তর্কবিতর্কে মশগুল হয়ে উঠল। দীপার ব্যবহারে সামান্য অস্বাভাবিকতা কেউ লক্ষ্যও করল কিনা বলা যায় না।

    আলোচনা যখন বেশ জমে উঠেছে তখন দেবাশিস অতিথিদের দৃষ্টি এড়িয়ে রান্নাঘরে গেল। দেখল, দীপা টেবিলের ওপর কনুই রেখে আঙুল দিয়ে দুই রগ টিপে বসে আছে। দেবাশিস তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই সে হতাশ চোখ তুলে বলল—‘বড্ড মাথা ধরেছে।’

    দেবাশিসের মন মুহূর্তমধ্যে হাল্কা হয়ে গেল। সে সহানুভূতির সুরে বলল—‘ও—আগুনের তাতে মাথা ধরেছে। তুমি আর এখানে থেকো না, নিজের ঘরে চলে যাও, মাথায় অডিকলোন দিয়ে শুয়ে থাকো গিয়ে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাথাধরা সেরে যাবে।’

    দীপা উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষীণস্বরে বলল—‘আচ্ছা।’

    দেবাশিস বসবার ঘরে ফিরে গিয়ে বলল—‘দীপার খুব মাথা ধরেছে। আমি তাকে মাথায় অডিকোলন দিয়ে শুয়ে থাকতে বলেছি। আজ সারা দুপুর উনুনের সামনে বসে খাবার তৈরি করেছে।’

    সকলেই সহানুভূতিসূচক শব্দ উচ্চারণ করল। বিজয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল—‘আমি যাই, দীপাকে একবার দেখে আসি।’

    দেবাশিস বলল—‘যাও-না, সোজা ওপরে চলে যাও।’

    বিজয় দোতলায় গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দীপার শোবার ঘরের দোরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দীপা চোখ বুজে শুয়ে ছিল, সাড়া পেয়ে ঘাড় তুলে বিজয়কে দেখল, তারপর আবার বালিশে মাথা রেখে চোখ বুজল।

    বিজয় খাটের পাশে এসে দাঁড়াল, কটমট করে দীপার পানে চেয়ে থেকে চাপা তর্জনে বলল—‘আমার সঙ্গে চালাকি করিসনে, তোর মাথাধরার কারণ আমি বুঝেছি।’

    দীপা উত্তর দিল না, চোখ বুজে পড়ে রইল।

    বিজয় তর্জনী তুলে বলল—‘আজ যারা এসেছে তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে তোর ইয়ে—।’

    দীপার কাছ থেকে সাড়াশব্দ নেই।

    ‘তার নাম কি, বল।’

    দীপার মুখে কথা নেই, সে যেন কালা হয়ে গেছে।

    ‘বলবি না?’

    এইবার দীপা ঝাঁকানি দিয়ে উঠে বসল, তীব্র দৃষ্টিতে বিজয়ের পানে চেয়ে বলল—‘না, বলব না।’ এই বলে সে বিজয়ের দিকে পিছন ফিরে আবার শুয়ে পড়ল।

    দাঁতে দাঁত চেপে বিজয় বলল—‘বলবিনে! আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। যেদিন ধরব তাকে, চৌ-রাস্তার ওপর টেনে এনে জুতোপেটা করব।’

    বিজয় নীচে নেমে গেল। ভাই-বোনের ঝগড়ার মূলে যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল কিন্তু ব্যাপারটা কেমন যেন হাস্যকর হয়ে দাঁড়াল—

    তারপর আবার দিন কাটছে।

    প্রত্যেক মানুষের দুটো চরিত্র থাকে; একটা তার দিনের বেলার চরিত্র, অন্যটা রাত্রির। বেরালের চোখের মত: দিনে একরকম, রাত্রে অন্যরকম।

    এই কাহিনীতে যে ক’টি চরিত্র আছে তাদের মধ্যে পাঁচজনের নৈশ জীবন সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা যেতে পারে। হয়তো অপ্রত্যাশিত নতুন তথ্য জানা যাবে।

    একটি রাত্রির কথা:

    সাড়ে দশটা বেজে গেছে। নৃপতি নৈশাহার শেষ করে নিজের শোবার ঘরে বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। জোড়া-খাটের ওপর চওড়া বিছানা; তার বিবাহিত জীবনের খাট-বিছানা। এখন সে একাই শোয়। শুয়ে বই পড়ে, বই পড়তে পড়তে ঘুম এলে বই বন্ধ করে আলো নিবিয়ে দেয়।

    আজ কিন্তু বই পড়তে পড়তে তার মন ছটফট করছে, পড়ায় মন বসছে না। প্রায় আধ ঘণ্টা বইয়ে মন বসাবার বৃথা চেষ্টা করে সে উঠে পড়ল, আলো নিবিয়ে জানলার নীচে আরাম-চেয়ারে এসে বসল। আকাশে চাঁদ আছে, বাইরে জ্যোৎস্নার প্লাবন। সে সিগারেট ধরাল।

    আজ কোন্ তিথি? পূর্ণিমা নাকি? হপ্তা দুই আগে নৃপতি যখন গভীর রাত্রে বেরিয়েছিল তখন কৃষ্ণপক্ষ ছিল, বোধ হয় অমাবস্যা। মানুষের মনের সঙ্গে তিথির কি কোনো সম্পর্ক আছে? একাদশী অমাবস্যা পূর্ণিমাতে বাতের ব্যথা বাড়ে, একথা আধুনিক ডাক্তারেরাও স্বীকার করেন। নৃপতি গলার মধ্যে মৃদু হাসল। বাতের ব্যথাই বটে।

    ‘বাবু!’

    নৃপতির খাস চাকর দীননাথ তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। নৃপতি পাশের দিকে ঘাড় ফেরাল। দিনু বলল—‘আপনার ঘুম আসছে না, এক কাপ ওভালটিন তৈরি করে দেব?’

    নৃপতি একটু ভেবে বলল—‘না, থাক। আমি বেরুব, তুই শেষ রাত্রে দোর খুলে রাখিস।’

    ‘আচ্ছা, বাবু।’

    দিনু প্রভুভক্ত চাকর; সে জানে নৃপতি মাঝে মাঝে নিশাভিসারে বেরোয়, কিন্তু কাউকে বলে না। বাড়ির অন্য চাকর-বাকর ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে না।

    দিনু চলে যাবার পর নৃপতি উঠে আলো জ্বালল, ওয়ার্ডরোব থেকে এক সেট ধূসর রঙের বিলিতি পোশাক বের করে পরল, পায়ে রবার-সোল জুতো পরল; স্টিলের কাবার্ড থেকে একটা চশমার খাপের মত লম্বাটে পার্স নিয়ে বুকপকেটের ভিতর দিকে রাখল। তারপর ছ’ফুট লম্বা আয়নায় নিজের চেহারা একবার দেখে নিয়ে আলো নিবিয়ে দিল। বাড়ির পিছন দিকে চাকরদের যাতায়াতের জন্যে ঘোরানো লোহার সিঁড়ি, সেই সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে নীচে নেমে গেল।

    নৃপতি কোথায় যায়? সে বিপত্নীক, তার কি কোনো গুপ্ত প্রণয়িনী আছে?

    আর একটি রাত্রির কথা:

    গোল পার্ক থেকে যে ক’টা সরু রাস্তা বেরিয়েছে তারই একটা দিয়ে কিছুদূর এ গেলে একটা পুরনো দোতলা বাড়ি চোখে পড়ে; এই বাড়ির একতলায় গোটা তিনেক ঘর নিয়ে প্রবাল গুপ্ত থাকে। পুরনো বাড়ির পুরনো ভাড়াটে; ভাড়া কম দিতে হয়।

    বাসাটি মন্দ নয়। কিন্তু প্রবালের প্রকৃতি একটু অগোছালো, তাই তার স্ত্রী মারা যাবার পর বাসাটি শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। সদরের বসবার ঘরে মেঝের ওপর শতরঞ্জি পাতা। দেয়াল ঘেঁষে এক জোড়া বাঁয়াতবলা, হারমোনিয়াম এবং তাল রাখার একটা ছোট যন্ত্র। প্রবাল যে সঙ্গীতশিল্পী, বাসায় এ ছাড়া তার অন্য কোনো নিদর্শন নেই।

    রাত্রি সাড়ে আটটার সময় প্রবাল সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছিল। আজ সে নৃপতির আড্ডায় যায়নি। একটা গানে সুর লাগিয়ে তৈরি করছিল, আসছে হপ্তায় দমদমে গিয়ে সেটা রেকর্ড করতে হবে। সে নিজেই গানে সুর দেয়; আজ গানটাকে ঠিক রেকর্ডের মাপে তৈরি করছিল। তিন মিনিট কুড়ি সেকেণ্ডের মধ্যে গান গেয়ে শেষ করতে হবে।

    তালের যন্ত্রটাতে দম দিয়ে সে চালু করে দিল, যন্ত্রটা ঘড়ির দোলকের মত কট্‌কট্‌ শব্দ করে দুলতে লাগল। প্রবাল পকেট থেকে স্টপ্‌-ওয়াচ বের করে হারমোনিয়ামের ওপর রাখল, তারপর স্টপ্‌-ওয়াচের মাথা টিপে চালিয়ে দিয়ে মৃদুকণ্ঠে গাইতে আরম্ভ করল, তার আঙুল খুব লঘু স্পর্শে হারমোনিয়ামের চাবির ওপর খেলে বেড়াতে লাগল।

    গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সে স্টপ্‌-ওয়াচ বন্ধ করল, দেখল তিন মিনিট একত্রিশ সেকেন্ড হয়েছে। সে তখন তালের যন্ত্রটাকে চাবি ঘুরিয়ে একটু দ্রুত করে দিয়ে আবার স্টপ্‌-ওয়াচ ধরে গাইতে শুরু করল।

    এইভাবে প্রায় আধ ঘণ্টা চলল। নিঃসঙ্গ গায়ক আপন মনে গেয়ে চলেছে।

    দোরে খট্‌খট্‌ করে টোকা পড়ল। প্রবাল উঠে গিয়ে দোর খুলে দিল; একটা চাকর এক থালা অন্ন-ব্যঞ্জন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রবালের বাসায় রান্নাবান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই; কাছেই একটা হোটেল আছে, সেখান থেকে দু’ বেলা তার খাবার দিয়ে যায়।

    চাকরটা শতরঞ্জির এক কোণে থালা রেখে চলে গেল। প্রবাল দোর বন্ধ করে সেখানেই খেতে বসল। এমনিভাবে সে যেন দিনগত পাপক্ষয় করে চলেছে। হয়তো দূর ভবিষ্যতের ওপর দৃষ্টি রেখে সে চলেছে, তাই বর্তমান সম্বন্ধে তার মন সম্পূর্ণ উদাসীন।

    নৈশাহার শেষ করে প্রবাল বাসায় তালা লাগিয়ে বেরুল। মোড়ের মাথায় একটা পানের দোকান আছে, সেখানে গিয়ে পান কিনে মুখে দিল, একটা গোল্ড ফ্লেক সিগারেট ধরাল। প্রবাল নিজের কাছে সিগারেট রাখে না, পাছে বেশি খাওয়া হয়ে যায়; প্রত্যহ রাত্রে দোকান থেকে একটি সিগারেট কিনে খায়। যারা পেশাদার গাইয়ে, গলা সম্বন্ধে তাদের সতর্কতার অন্ত নেই। বেশি ধূমপান করলে নাকি গলা খারাপ হয়ে যায়।

    পানের দোকানে একটি ছোট্ট ট্রান্‌জিস্টার গুনগুন করে গান গেয়ে চলেছে। প্রবাল শুনল, তারই গাওয়া একটি গানের রেকর্ড বাজছে। সে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ নিজের গাওয়া গান শুনল, তারপর সিগারেট টানতে টানতে এগিয়ে চলল।

    সাদার্ন অ্যাভেনু তখন জনবিরল হয়ে এসেছে। প্রবাল রবীন্দ্র সরোবরের রেলিং-এর ধার দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলল। তার মগজের মধ্যে কখনও গানের কলি গুঞ্জন তুলছে…প্রেমের সাগর দুলে দুলে ওঠে সখি…। কখনও একটা ক্রুদ্ধ ভোমরা ঝঙ্কার দিয়ে উঠছে…দুনিয়ায় যার টাকা নেই। সে কিসের লোভে বেঁচে থাকে?…

    রবীন্দ্র সরোবরের রেলিং অনেক দূর এসে যেখানে পুব দিকে মোড় ঘুরেছে তার কাছাকাছি একটা খিড়কির ফটক আছে। প্রবাল সেই ফটক দিয়ে লেকের বেষ্টনীর মধ্যে প্রবেশ করল।

    ঝিলিমিলি আবছা আলোয় কিছুদূর যাবার পর একটা গাছের তলায় শুন্য বেঞ্চি চোখে পড়ল। প্রবাল বেঞ্চিতে গিয়ে বসল, তরাপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। তার গলার মধ্যে অবরুদ্ধ হাসির মত শব্দ হল।…

    সেরাত্রে প্রবাল যখন বাসায় ফিরল তখন বারোটা বাজতে বেশি দেরি নেই। কলকাতা শহরের চোখ তন্দ্রায় ঢুলুঢুলু।

    আর একটি রাত্রির কথা:

    খড়্গ বাহাদুর আজ আড্ডায় যায়নি; তার কারণ তার বাড়িতেই আজ আড্ডা বসবে। অবশ্য অন্যরকম আড্ডা; অতিথিরাও অন্য। এইরকম আড্ডা মাসে দু’ তিন বার বসে।

    খড়্গ বাহাদুর একটি ছোট ফ্ল্যাটে থাকে। ছোট হলেও ফ্ল্যাটটি তার পক্ষে যথেষ্ট। সে একলা থাকে, সঙ্গী একমাত্র স্বদেশী সেবক রতন সিং। রতন সিং একাধারে তার ভৃত্য এবং পাচক, ভাল শিককাবাব তৈরি করতে পারে।

    সামনের ঘরটি পরিপাটিভাবে সাজানো, দেখলেই বোঝা যায় অবস্থাপন্ন লোকের বাড়ি। মাঝখানে একটি তাস খেলার টেবিল ঘিরে গোটা চারেক গদি-মোড়া চেয়ার, মাথার ওপর একশো ওয়াটের দুটো বাল্‌ব জ্বলছে। এই টেবিলের সামনে একলা বসে খড়্গ বাহাদুর এক প্যাক্ তাস নিয়ে ভাঁজছিল। আরো দুটো নতুন তাসের সীল-করা প্যাক্‌ পাশে রাখা রয়েছে। খড়্গ বাহাদুর অলসভাবে তাস ভাঁজছিল, কিন্তু তার মুখের ভাব কড়া এবং রুক্ষ। নৃপতির আড্ডায় তার যেমন হাসিখুশি মিশুক ভাব দেখা যায়, বাড়িতে ঠিক তেমন নয়। বাড়িতে সে প্রভু। মধ্যযুগীয় প্রভু।

    পৌনে আটটা বাজলে খড়্গ বাহাদুর ডাকল—‘রতন সিং!’

    রতন সিং রান্নাঘরে ছিল, বেরিয়ে এসে প্রভুর সামনে দাঁড়াল। বেঁটেখাটো মানুষ, খাঁটি নেপালী চেহারা; ভাবলেশহীন তির্যক চোখে চেয়ে বলল—‘জি।’

    খড়্গ বাহাদুর বলল—‘আটটার পরেই অতিথিরা আসবে। শিককাবাব কত দূর?’

    রতন সিং বলল—‘জি, আধা তৈরি হয়েছে, আধা তৈরি হচ্ছে।’

    খড়্গ বলল—‘তিনজন অতিথি আসবে। তারা সকলে এলে প্রথম দফা শিককাবাব দিয়ে যাবে, এক ঘণ্টা পরে দ্বিতীয় দফা দেবে। যাও।’

    রতন সিং-এর মুখ দেখে নিঃসংশয়ে কিছু বোঝা যায় না; তবু সন্দেহ হয়, মালিকের অতিথিদের সে পছন্দ করে না। সে রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে আবার শিককাবাব রচনায় মন দিল। মালিক যা করেন তাই অভ্রান্ত বলে মেনে নিতে হয়, কিন্তু জুয়া খেলে টাকা ওড়ানো ভাল কাজ নয়। দেশ থেকে প্রতিমাসে এক হাজার টাকা আসে, অথচ মাসের শেষে এক পয়সাও বাঁচে না।

    বাইরের ঘরে তাস ভাঁজতে ভাঁজতে খড়্গ বাহাদুর ভাবছিল—আজ যদি হেরে যাই, রক্তদর্শন করব।

    গত কয়েকবার সে ক্রমাগত হেরে আসছে।

    আটটার সময় একে একে তিনটি অতিথি এল। তিনজনেই যুবক, সাজপোশাক দেখে বোঝা যায়, তিনজনেই বড়মানুষের ছেলে। একজন সিন্ধী, দ্বিতীয়টি পাঞ্জাবী, তৃতীয়টি পার্সী।

    সংক্ষিপ্ত সম্ভাষণের পর সকলে টেবিল ঘিরে বসল। রতন সিং চারটি প্লেটে প্রায় সেরখানেক শিককাবাব এনে রাখল; সঙ্গে রাই-বাটা এবং ছুরি-কাঁটা।

    কথাবার্তা বেশি হল না, চারজন প্লেট টেনে নিয়ে ছুরি-কাঁটার সাহায্যে খেতে আরম্ভ করল। রতন সিং-এর শিককাবাব অতি উপাদেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই চারটি প্লেট শূন্য হয়ে গেল। সকলে রুমালে মুখ মুছে সিগারেট ধরাল। পার্সী যুবকও সিগারেট খায়, আধুনিক যুবকেরা ধর্মের নিষেধ মানে না।

    তারপর সাড়ে আটটার সময় তাসের নতুন প্যাক্ খুলে খেলা আরম্ভ হল। তিন তাসের খেলা, জোকার নেই। নিম্নতম বাজি পাঁচ টাকা, ঊর্ধ্বতম বাজি কুড়ি টাকা।

    চারজনই পাকা খেলোয়াড়। কিন্তু রানিং ফ্লাশ্‌ খেলায় ক্রীড়ানৈপুণ্যের বিশেষ অবকাশ নেই, ভাগ্যই বলবান। কদাচিৎ ব্লাফ্‌ দিয়ে দু’এক দান জেতা যায়। আসলে হাতের জোরের ওপরেই খেলার হার-জিত।

    সাড়ে দশটার সময় আর এক দফা শিককাবাব এল। এবার মাত্রা কিছু কম। সঙ্গে কফি। পনেরো মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করে আবার নতুন তাসের প্যাক্‌ খুলে খেলা আরম্ভ হল।

    খেলা শেষ হল রাত্রি সাড়ে বারোটার সময়। হিসেবনিকেশ করে দেখা গেল, অতিথিরা তিনজনেই জিতেছে, খড়্গ বাহাদুর হেরেছে প্রায় সাত শো টাকা!

    অতিথিরা হাসিমুখে সহানুভূতি জানিয়ে চলে গেল। খড়্গ বাহাদুর অন্ধকার মুখে অনেকক্ষণ একলা টেবিলের সামনে বসে রইল, তারপর হঠাৎ উঠে শোবার ঘরে গেল। বেশ পরিবর্তন করে মাথায় একটা কাউ-বয় টুপি পরে বেরিয়ে এল। রতন সিংকে বলল—‘আমি বেরুচ্ছি। যতক্ষণ না ফিরি, তুমি দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে জেগে থাকবে।’

    রতন সিং বলল—‘জি।’

    খড়্গ বাহাদুর বেরিয়ে গেল। রতন সিং-এর মঙ্গোলীয় মুখ নির্বিকার রইল বটে, কিন্তু তার ছোট ছোট চোখ দু’টি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। মালিক আজও হেরেছেন। তাস খেলায় হেরে মালিক কোথায় যান? ফিরে আসেন সেই শেষ রাত্রে। কখনও আটটার আগেই বেরিয়ে যান, ফিরতে রাত হয়। কোথায় থাকেন? রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান? কিংবা—

    আর একটি রাত্রির কথা:

    কপিলের বাড়িতে নৈশ আহার শেষ হয়েছিল। কর্তা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন, কপিলের ছোট দুই ভাইবোনও নিজের নিজের ঘরে চলে গিয়েছিল। ড্রয়িংরুমে এসে বসেছিল কপিল, তার দাদা আর বউদিদি এবং তার দিদি ও জামাইবাবু। কর্তা বিপত্নীক, পুত্রবধূই বাড়ির গিন্নি। মেয়ে-জামাই দার্জিলিঙে থাকে, জামাইয়ের চায়ের বাগান আছে; আজ সকালে কয়েক দিনের জন্যে তারা কলকাতায় এসেছে।

    কপিলদের বাড়িটা তিনতলা। নীচের তলায় একটা বড় ব্যাঙ্কের শাখা, উপরের দু’টি তলায় কপিলেরা থাকে। সবার উপরে প্রশস্ত খোলা ছাদ।

    ড্রয়িংরুমে যাঁরা সমবেত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে কপিলের দাদা গৌতমদেব বয়সে বড়। পৈতৃক সলিসিটার অফিসের তিনি এখন কর্তা। অত্যন্ত নির্লিপ্ত প্রকৃতির লোক; বাড়িতে কারুর সাতে-পাঁচে থাকেন না। তাঁর স্ত্রী রমলার প্রকৃতি কিন্তু অন্যরকম। তার বয়স ত্রিশের বেশি নয়, কিন্তু সে বুদ্ধিমতী, গৃহকর্মে নিপুণা, সংসারের কোনো ব্যাপারেই নির্লিপ্ত নয়। উপরন্তু তার বুদ্ধিতে একটু অম্লরস মেশানো আছে, যার ফলে সকলেই তার কাছে একটু সতর্ক হয়ে থাকে।

    কপিলের দিদি অশোকার বয়সও আন্দাজ ত্রিশ। তার সাত বছরের একটিমাত্র ছেলে স্কুলের বোর্ডি-এ থাকে। অশোকার চরিত্র সম্বন্ধে এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, সে বড়মানুষের মেয়ে, বড়মানুষের বউ। পৃথিবীর অধিকাংশ জীবকেই সে করুণার চক্ষে দেখে, কারুর সঙ্গে বেশি কথাবার্তা বলে না। তার স্বামী শৈলেনবাবু কিন্তু মজলিসী লোক; আসর জমিয়ে গল্প করতে ভালবাসেন, তর্ক করার দিকে ঝোঁক আছে এবং সুযোগ পেলে অযাচিত উপদেশও দিয়ে থাকেন।

    তিনি প্রকাণ্ড জিজ্ঞাসা-চিহ্নের মত একটি পাইপের মুণ্ড মুঠিতে ধরে ধূমপান করছেন। গৌতমদেব একটি মোটা সিগারেট ধরিয়েছেন। কপিলের নাকে তামাকের সুগন্ধ ধোঁয়া আসছে; কিন্তু সে গুরুজনদের সামনে ধূমপান করে না, তাই নীরবে বসে উস্‌খুস্‌ করছে। বাড়ির নিয়ম, নৈশাহারের পর সকলে অন্তত পনেরো মিনিটের জন্যে একত্র হবে। আগে কর্তাও এসে বসতেন; এখন তাঁর বয়স বেড়েছে, খাওয়ার পরই শুয়ে পড়েন। বাড়ির অন্য সকলের জন্য কিন্তু নিয়ম জারি আছে।

    জামাই শৈলেনবাবু পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে কপিলকে নিরীক্ষণ করছিলেন, গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করলেন—‘কপিল, তুমি কি নাম-মাহাত্ম্যে সাধু-সন্নিসি হয়ে যাবার মতলব করেছ?’

    কপিল সমান গাম্ভীর্যের সঙ্গে উত্তর দিল—‘আপাতত সে রকম কোনো মতলব নেই।’

    শৈলেনবাবু বললেন—‘তবে বিয়ে করছ না কেন? সংসার-ধর্ম করতে গেলে বিয়ে করা দরকার। তোমার বিয়ে করার উপযোগী বুদ্ধি না থাকতে পারে কিন্তু বয়স তো হয়েছে।’

    কপিল ভ্রূ একটু তুলে বলল—‘বিয়ে করার জন্যে কি খুব বেশি বুদ্ধি দরকার?’

    রমলা হেসে উঠল। কপিল ও শৈলেনবাবুর মধ্যে গাম্ভীর্য-ঢাকা গূঢ় পরিহাসের সঙ্গে বাড়ির সকলেই পরিচিত। রমলা বলল—‘বিয়ে করার জন্যে যদি বেশি বুদ্ধির দরকার হত তাহলে বাংলাদেশে কারুর বিয়ে হত না। আসলে ঠিক উল্‌টো। ঠাকুরপোর বড্ড বেশি বুদ্ধি, তাই বিয়ে হচ্ছে না।’

    ‘তাই নাকি!’ শৈলেনবাবু অবিশ্বাস-ভরা চক্ষু বিস্ফারিত করে কপিলের পানে চাইলেন—‘এত বুদ্ধি কপিলের! কিন্তু আর একটু পরিষ্কার করে না বললে কথাটা হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে না।’

    রমলা বলল—‘ওকেই জিজ্ঞেস করুন না। আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই, তবু ও বিয়ে করে না। কেন?’

    শৈলেনবাবু প্রতিধ্বনি করলেন—‘কেন?’

    কপিল পকেটে হাত দিল, সিগারেটের কেস হাতে ঠেকল, কেসটা অজ্ঞাতসারে বার করে আবার সে পকেটে রেখে দিল।

    গৌতমদেব উঠে পড়লেন—‘আমি উঠলাম, কাল ভোরেই আবার আমাকে—’ কথা অসমাপ্ত রেখে তিনি প্রস্থান করলেন। নিজের উপস্থিতি দ্বারা কারুর অসুবিধা ঘটাতে তিনি চান না।

    কপিল জামাইবাবুকে লক্ষ্য করে বলল—‘বিয়ে করা একটা সিরিয়াস কাজ এ কথা আপনি মানেন?’

    শৈলেনবাবু নিজের গৃহিণীর প্রতি অপাঙ্গ দৃষ্টিপাত করে বললেন—‘মানি বইকি। খুব সিরিয়াস কাজ।’

    অশোকা সূক্ষ্ম হাস্যরস বোঝে না, কিন্তু খোঁচা দিয়ে কথা বললে যত সূক্ষ্ম খোঁচাই হোক ঠিক বুঝতে পারে। সে স্বামীর দিকে বিরক্তিসূচক কটাক্ষ হেনে বলল—“আমি শুতে চললুম। বাজে কথার কচকচি শুনতে ভাল লাগে না।’

    অশোকা চলে যাবার পর কপিল পকেট থেকে সিগারেট বার করে রমলাকে বলল—‘বউদি, সিগারেট খেতে পারি!’

    রমলা বলল—‘আহা, ন্যাকামি দেখে বাঁচি না। আমার সামনে যেন সিগারেট খাও না!’

    কপিল বলল—‘খাই, কিন্তু অনুমতি নিয়ে খাই।’

    রমলা বলল—‘আচ্ছা, অনুমতি দিলুম, খাও।’

    কপিল সিগারেট ধরাল। তারপর শালা-ভগিনীপতির তর্ক আবার আরম্ভ হয়ে গেল। রমলা ঠোঁটের কোণে কৌতুক-হাসি নিয়ে শুনতে লাগল।

    কপিল বলল—‘বিয়ে করা যখন সিরিয়াস ব্যাপার তখন খুব বিবেচনা করে বিয়ে করা উচিত।’

    শৈলেনবাবু বললেন—‘অবশ্য, অবশ্য। কিন্তু কী বিবেচনা করবে?’

    ‘বিবেচনা করতে হবে, আমি কি চাই!’

    ‘কী চাও তুমি? রূপ? গুণ? বিদ্যা? বুদ্ধি?’

    ‘রূপ গুণ বিদ্যা বুদ্ধি থাকে ভাল, না থাকলেও আপত্তি নেই। আসলে চাই—মনের মিল।’

    ‘হুঁ, মনের মিল। কিন্তু বিয়ে না হলে বুঝবে কি করে মনের মিল হবে কিনা।’

    ‘ওইখানেই তো সমস্যা। তবে আজকাল স্ত্রী-স্বাধীনতার যুগে মেয়েদের মন বুঝতে বেশি দেরি হয় না।’

    রমলা বলল—‘তুমি তাহলে মেয়েদের মন বুঝে নিয়েছ?’

    কপিল বলল—‘তা বুঝে নিয়েছি। কিন্তু বুঝলেই যে পছন্দ হবে তার কোনো মানে নেই।’

    রমলা বলল—‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’

    শৈলেনবাবু বললেন—‘তাহলে যতদিন মনের মত মন না পাওয়া যাচ্ছে ততদিন অনুসন্ধান। চলবে?’

    কপিল মুচকি হাসল, উত্তর দিল না।

    শৈলেনবাবু সন্দিগ্ধস্বরে বললেন—‘আসল কথাটা কি? ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ না তো?’

    ‘তার মানে?’

    ‘মানে কোনো সধবা কিংবা বিধবা যুবতীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়নি তো?’

    কপিল চকিত চোখে চাইল, তারপর উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠল, বলল—‘বউদি, জামাইবাবুর মাথা গরম হয়েছে। ঠাণ্ডা দেশ থেকে গরম দেশে এসেছেন, হবারই কথা। তুমি ওঁর জন্যে আইস্‌-ব্যাগের ব্যবস্থা কর, আমি শুতে চললাম।’

    হাসি-মস্করার মধ্যে রাত্রির মত সভা ভঙ্গ হল। কপিল নিজের ঘরে গিয়ে দোর বন্ধ করল।

    কপিলের ঘরটি বেশ বড়, লম্বাটে ধরনের। এক পাশে খাট-বিছানা, অন্য পাশে টেবিল-চেয়ার। কাচে ঢাকা টেবিলের ওপর কাচের নীচে আকাশের একটি মানচিত্র; নীল জমির ওপর সাদা নক্ষত্রপুঞ্জ ফুটে আছে। কপিল রাত্রিবাস পরল, ঢিলা পা-জামা আর হাতকাটা ফতুয়া। তারপর একটা বই নিয়ে টেবিলের সামনে পড়তে বসল।

    ইংরেজি গণিত জ্যোতিষের বই, লেখকের নাম ফ্রেড্‌ হয়েল। পড়তে পড়তে কপিল ঘড়ি দেখছে, আবার পড়ছে। বিশ্ব-রহস্য উদ্‌ঘাটক জ্যোতিষগ্রন্থের প্রতি তার গভীর অনুরাগ; কিন্তু আজ তার মন ঠিক বইয়ের মধ্যে নেই, যেন সে সময় কাটাবার জন্যেই বই পড়ছে।

    কব্জির ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বাজল। কপিল বই বন্ধ করে উঠল, দেয়ালের একটা আলমারির কপাট খুলে একটি দূরবীন যন্ত্র বার করল। যন্ত্রটি আকারে দীর্ঘ নয়, কিন্তু তিন পায়ার ওপর ক্যামেরার মত দাঁড় করানো যায়, আবার ইচ্ছামত পায়া গুটিয়ে নেওয়া যায়। কপিল দূরবীনটি বগলে নিয়ে ঘরের আলো নেবালো, তারপর সন্তর্পণে বাইরে এল।

    ঘর থেকে বেরিয়ে কয়েক পা গেলেই ছাদে ওঠবার সিঁড়ি। কপিল পা টিপে টিপে সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত গিয়েছে এমন সময় সামনের একটা দরজা খুলে রমলা বেরিয়ে এল। তার মুখে খরশান ব্যঙ্গের হাসি। কপিল তাকে দেখে থতমত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। রমলা বলল—‘কী ঠাকুরপো, এত রাত্রে দূরবীন নিয়ে কোথায় চলেছ?’

    কপিল চাপা গলায় বলল—‘আস্তে বউদি, বাবার ঘুম ভেঙে যাবে।’

    রমলা গলা নীচু করল—‘তোমার মতলব ভাল ঠেকছে না ঠাকুরপো।’

    কপিল বলল—‘কি মুশকিল। আমি তো প্রায়ই আকাশের তারা দেখবার জন্যে ছাদে উঠি। তুমি জান না?’

    রমলা বলল—‘জানি। কিন্তু সে তো সন্ধ্যের পর। আজ রাত দুপুরে কোন্ তারা দেখবে বলে ছাদে উঠছ?’

    কপিল বলল—‘আজ রাত্রি পৌনে বারোটার সময় মঙ্গলগ্রহ ঠিক মাথার ওপর উঠবে। মঙ্গলগ্রহ এখন পৃথিবীর খুব কাছে এসেছে, তাই তাকে ভাল করে দেখবার জন্যে ছাদে যাচ্ছি।’

    রমলা মুখ গম্ভীর করে বলল—‘হুঁ, মঙ্গলগ্রহ। কোন্ গ্রহ-তারা তোমার ঘাড়ে চেপেছে তুমিই জান। কিন্তু একটা কথা বলে দিচ্ছি, আমাদের বাড়ির চার পাশে যাদের বাড়ি তারা গরমের সময় জানলা খুলে শুয়েছে, তুমি যেন তাদের জানলা দিয়ে গ্রহ-তারা দেখতে যেও না।’

    কপিল মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে হাসল, বলল—‘বউদি, তোমার মনটা ভারি সন্দিগ্ধ। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তুমি এত রাত্রি পর্যন্ত ঘুমোওনি কেন?’

    রমলা বলল—‘তোমার দাদা বিছানায় শুয়ে আইনের বই পড়ছেন, হঠাৎ তাঁর কফি খাবার শখ হল। তাই কফি তৈরি করতে চলেছি। তুমি খাবে?’

    ‘আমার সময় নেই।’ কপিল চুপি চুপি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল।

    হয়তো মঙ্গলগ্রহই দেখবে।

    আর একটি রাত্রির কথা:

    সিনেমার শিল্পক্ষেত্রে যারা কাজ করে তারা সাধারণত দল বেঁধে থাকে, নিজেদের শিল্পীগোষ্ঠী নিয়ে একটা সমাজ তৈরি করে নিয়েছে, বাইরের লোকের সঙ্গে বড় একটা সম্পর্ক রাখে না। সুজন মিত্র কিন্তু দলে থেকেও ঠিক দলের পাখি নয়। যতক্ষণ সে স্টুডিওর সীমানার মধ্যে থাকে ততক্ষণ সকল শ্রেণীর সহকর্মী ও সহকর্মিণীর সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করে। তরুণী অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেই এই সুদর্শন নবোদিত অভিনেতাটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল, কিন্তু সুজন কারুর কাছে ধরা দেয়নি। পাঁকাল মাছের মত হাত পিছলে বেরিয়ে যাবার কৌশল তার জানা ছিল।

    সিনেমার গণ্ডীর বাইরে তার প্রধান বন্ধুগোষ্ঠী ছিল নৃপতির আড্ডার ছেলেরা; এখানে এসে সে যেন সমভূমিতে পদার্পণ করত। তার বংশপরিচয় কেউ জানে না, তার জ্ঞাতিগোষ্ঠী কেউ আছে কিনা সে পরিচয়ও কেউ কোনো দিন পায়নি, কিন্তু তার বন্ধু-নির্বাচন থেকে অনুমান করা যায় যে তার বংশপরিচয় যেমনই হোক, সে নিজে উচ্চ-মধ্যম শ্রেণীর শিক্ষিত মার্জিত চরিত্রের মানুষ।

    একদিন স্টুডিওতে তার শুটিং ছিল, কাজ শেষ হতে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেল। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে মুখের রঙ পরিষ্কার করে বেরুতে আরো ঘণ্টাখানেক কাটল। সুজনের একটি ছোট মোটর আছে, তাইতে চড়ে সে যখন স্টুডিও থেকে বেরুল তখন রাত্রি হয়ে গেছে।

    মাইল দেড়েক চলবার পর মোটর একটি হোটেলের সামনে এসে থামল। সুজন হোটেলেই খায়। তার বাসায় রান্নার আয়োজন নেই। কিন্তু রোজ একই হোটেলে খায় না। যখন যা খাবার ইচ্ছে হয় তখন সেই রকম হোটেলে যায়, কখনো বা মিষ্টান্নের দোকানে গিয়ে দই-সন্দেশ খেয়ে পেট ভরায়। যেদিন শুটিং থাকে সেদিন দুপুরে স্টুডিওর ক্যান্টিনে খায়।

    হোটেলের পাশে গাড়ি পার্ক করে সে যখন হোটেলে ঢুকল তখন তার নাকের নীচে একজোড়া শৌখিন গোঁফ শোভা পাচ্ছে। গোঁফ জোড়া অকৃত্রিম নয়, সুজন কোনো প্রকাশ্য স্থানে গেলেই মুখে গোঁফ লাগিয়ে ছদ্মবেশ পরিধান করে। তার মুখখানা সিনেমার প্রসাদে জনসাধারণের খুবই পরিচিত, তাকে সশরীরে দেখলে সিনেমা-পাগল লোকেরা বিরক্ত করবে এই আশঙ্কাতেই হয়তো সে গোঁফের আড়ালে স্বরূপ লুকিয়ে রাখে।

    হোটেলে আহার শেষ করে সুজন মোটর চালিয়ে নিজের বাসার দিকে চলল। বাসাটি পাড়ার এক প্রান্তে একটি সরু রাস্তার ওপর; ঘোট বাড়ি কিন্তু গাড়ি রাখার আস্তাবল আছে।

    গ্যারাজে গাড়ি রেখে সুজন চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকল, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে গিয়ে আলো জ্বালল। একসঙ্গে গোটা তিনেক দ্যুতিমান বাল্‌ব জ্বলে উঠল।

    চৌকশ ঘরটি বেশ বড়। তাতে খাট-বিছানা আছে, টেবিল-চেয়ার আলমারি আছে, এমন কি স্টোভ, চায়ের সরঞ্জাম প্রভৃতিও আছে। মনে হয়, সুজন এই একটি ঘরের মধ্যে তার একক জীবনযাত্রার সমস্ত উপকরণ সঞ্চয় করে রেখেছে।

    একটি লম্বা আরাম-কেদারায় অঙ্গ ছড়িয়ে দিয়ে সে পকেট থেকে সিগারেট বার করল, সিগারেট ধরিয়ে পিছনে মাথা হেলিয়ে দিয়ে উজ্জ্বল একটা বাল্‌বের দিকে দৃষ্টি রেখে মৃদ-মন্দ টান দিতে লাগল। এখন আর তার মুখে গোঁফ নেই, নগ্ন মুখখানা ছুরির মত ধারাল।

    সিগারেট শেষ করে সুজন কব্জির ঘড়ি দেখল—ন’টা বেজে কুড়ি মিনিট। সে উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল; সাড়ে ছ’ফুট উঁচু আয়নায় তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নিজের দেহ মুখ পরীক্ষা করল; একবার হাসল, একবার ভ্রূকুটি করল, তারপর আড়মোড়া ভেঙে আলমারির কাছে গেল।

    আলমারি থেকে সে দু’টি জিনিস বার করল; একটি হুইস্কির বোতল এবং বড় চৌকো আকারের একটি পুরু লাল কাগজের খাম। প্রথমে সে গেলাসে ছোট পেগ মাপের হুইস্কি ঢেলে তাতে জল মেশালো, তারপর গেলাস আর খাম নিয়ে আবার চেয়ারে এসে বসল। গেলাসে ছোট একটি চুমুক দিয়ে চেয়ারের হাতার ওপর রেখে আগ্‌ফা’র খাম থেকে একটি ফটো বার করল।

    ক্যাবিনেট আয়তনের ফটো, একটি যুবতীর আ-কটি প্রতিকৃতি, যুবতী হাসি-হাসি মুখে দর্শকের পানে চেয়ে আছে। মনে হয়, সে সিনেমার অভিনেত্রী নয়, মুখে বা দেহভঙ্গীতে কৃত্রিমতা নেই। কিন্তু সে কুমারী কি বিবাহিতা, ফটো থেকে বোঝা যায় না।

    সুজন থেকে থেকে গেলাসে চুমুক দিতে দিতে ছবিটি দেখতে লাগল। চোখে তার প্রগাঢ় তন্ময়তা, পলকের তরেও ছবি থেকে চোখ সরাতে পারছে না। এক ঘণ্টা কেটে গেল, গেলাসের পানীয় নিঃশেষ হল; কিন্তু সুজনের চিত্ৰদৰ্শন-পিপাসা মিটল না। সে ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে আবার সিগারেট ধরাল। তার ঠোঁট নড়তে লাগল, যেন চুপি চুপি ছবির সঙ্গে কথা কইছে। তারপর ছবিটি নিজের গালের ওপর চেপে ধরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

    পৌনে এগারোটার সময় সে ছবিটি আবার খামে পুরে আলমারিতে তুলে রাখল, আয়নার সামনে কিছুক্ষণ শুন্য দৃষ্টিতে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর আলো নিবিয়ে আবার বাড়ি থেকে বেরুল। মোটর নিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা দক্ষিণ কলকাতার নগরগুঞ্জনক্ষান্ত পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে শেষে রবীন্দ্র সরোবরের ঘেরার মধ্যে রাস্তার পাশে ঘাসের ওপর গাড়ি দাঁড় করাল। গাড়ি থেকে যখন নামল, দেখা গেল নকল গোঁফ তার নাকের নীচে ফিরে এসেছে। গাড়ি লক করে সে লেক থেকে বেরুল, বড় রাস্তা পার হয়ে একটা সরু রাস্তা দিয়ে চলতে লাগল।

    রাস্তার দু’ পাশে বাড়ির আলো নিবে গেছে। সুজন একটি ল্যাম্প-পোস্টের নীচে এসে দাঁড়াল। রাস্তার ওপারে একটা বাড়ি, তার দোতলার একটা জানলা দিয়ে নৈশদীপের অস্ফুট আলো আসছে। সুজন সেই দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ল্যাম্প-পোস্টের তলায় দাঁড়িয়ে রইল। ল্যাম্প-পোস্টের নীচে দাঁড়ালে মাথার ওপর আলো পড়ে, মানুষটাকে দেখা যায় বটে, কিন্তু মুখ চেনা যায় না।

    কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও জানলায় কাউকে দেখা গেল না। সুজন যাকে চোখের দেখা দেখতে চায় সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে কিংবা অন্য একজনের বাহুবন্ধনের মধ্যে শুয়ে জেগে আছে।

    স্ক্রিয়াশ্চরিত্রম্‌। সুজন আগুনের হলকার মত তপ্ত নিশ্বাস ফেলল, তারপর ফিরে চলল।

    আর একটি রাত্রির কথা:

    দেবাশিস আর দীপা একসঙ্গে টেবিলে বসে রাত্রির আহার সম্পন্ন করল। নকুলকে শুনিয়ে দীপা বাগানের কথা বলল; মালী পদ্মলোচন বুগেন্‌ভিলিয়া লতাকে বাইগনবিল্লি বলে শুনে দেবাশিস খানিকটা হাসল, তারপর ফ্যাক্টরির একটা মজার ঘটনা বলল। বাইরের ঠাট বজায় রইল। খাওয়া শেষ হলে দু’জনে ওপরে গিয়ে নিজের নিজের ঘরে ঢুকল। তৃতীয় ব্যক্তির সামনে স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে তারা বেশ অভ্যস্ত হয়েছে; কিন্তু যখন তৃতীয় ব্যক্তি কেউ থাকে না, যখন অভিনয় করার দরকার নেই, তখনই বিপদ।

    দীপা ঘরে গিয়ে নৈশদীপ জ্বেলে খানিকক্ষণ খোলা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। আজ বাইরে হাওয়া নেই, গ্রীষ্মের রাত্রি যেন নিশ্বাস রোধ করে আছে। দীপা পাখা চালিয়ে দিয়ে ব্লাউজ খুলে শুয়ে পড়ল। ঘুম কখন আসবে তার ঠিক নেই কিন্তু যথাসময়ে বিছানায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর তো কোনো কাজও নেই। শুয়ে শুয়ে সে মাথার মধ্যে দেবাশিসের একটা কথা প্রতিধ্বনির মত শুনতে লাগল—দীপা, তুমি আমাকে ভালবাস না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি।

    দেবাশিস নিজের ঘরে খাটের পাশে পড়ার আলো জ্বেলে একখানা ইংরেজি বিজ্ঞানের বই নিয়ে শুয়েছিল। তার গায়ে জামা নেই, পাখাটা ছাদ থেকে বনবন করে ঘুরছে। দেবাশিস বইয়ে মন বসাতে পারছিল না, মনটা যেন তপ্ত বাষ্প হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। মাথায় ঠাণ্ডা জল থাবড়ে দিয়েও অবস্থার বিশেষ উন্নতি হল না। আধ ঘণ্টা পরে সে বই রেখে আলো নিবিয়ে দিল। উজ্জ্বল আলোটাই যেন ঘরের বাতাসকে আরো গরম করে তুলেছে।

    অন্ধকার ঘরে দেবাশিস চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে আছে। পাখার হাওয়া সত্ত্বেও বিছানাটা যেন রুটি-সেঁকা তাওয়ার মত তপ্ত। এপাশ ওপাশ করেও নিষ্কৃতি নেই, বালিশের ওপর মাথাটা গরম হয়ে উঠছে।

    সঙ্গে সঙ্গে মনও গরম হচ্ছে, কিন্তু সেটা অগোচরে। শেষে হঠাৎ গভীর রাত্রে এই মানসিক উষ্মা মাটি খুঁড়ে আগ্নেয়গিরির মত উৎসারিত হল। দেবাশিস ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে চাপা গর্জনে বলল—‘God damn it, she is my wife!’

    অন্ধকারে দেবাশিস কিছুক্ষণ স্নায়ুপেশী শক্ত করে বসে রইল, তারপর বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বেরুল। বসবার ঘরের আলো জ্বালতেই সুইচে কটাস করে শব্দ হল, মনে হল ঘরটা যেন চমকে উঠল। দেবাশিসও একটু চমকালো, হঠাৎ জ্বলে-ওঠা আলোর দীপ্তি চোখে আঘাত করল। সে একটু থমকে দাঁড়িয়ে দীপার বন্ধ দোরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

    দরজায় খিল দেওয়া কি শুধুই ভেজানো, বাইরে থেকে বোঝা যায় না। হয়তো একটু ঠেললেই খুলে যাবে। দীপা নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছে। দেবাশিস কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দরজায় টোকা দেবার জন্যে হাত তুলল, ঘুমন্ত দীপার ঘরে অনাহূত দোর ঠেলে প্রবেশ করতে পারল না। তারপর টোকা দিতেও পারল না, তার উদ্যত হাত নেমে পড়ল। ‘কাপুরুষ!’ মনের গভীরে নিজেকে কঠোর ধিক্কার দিয়ে সে নিজের ঘরে ফিরে গেল।

    দীপা তখনো ঘুমোয়নি, জেগেই ছিল। কিন্তু সে কিছু জানতে পারল না।

    দেবাশিস আর দীপার বিয়ের পর দু’মাস কেটে গেল। যেদিনের ঘটনা নিয়ে কাহিনী আরম্ভ হয়েছিল, সেই যেদিন দেবাশিস ফ্যাক্টরি থেকে ফিরে এসে দীপাকে সিনেমায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু দীপা যায়নি, দীর্ঘ পশ্চাদ্দৃষ্টির পর আমরা সেইখানে ফিরে এলাম।

    দেবাশিস পায়ে হেঁটে নৃপতির বাড়ির দিকে যেতে যেতে মাঝ রাস্তায় থমকে দাঁড়াল। তার মনটা তিক্ত হয়েই ছিল, এখন নৃপতির বাড়িতে গিয়ে হালকা ঠাট্টা-তামাশা উদ্দেশ্যহীন গল্পগুজব করতে হবে, প্রবালের পিয়ানো বাজনা শুনতে হবে ভাবতেই তার মন বিমুখ হয়ে উঠল। অনেক দিন পড়াশুনো করা হয়নি, অথচ তার যে কাজ তাতে রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা সম্বন্ধে পৃথিবীর কোথায় কি কাজ হচ্ছে সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকতে হয়। তার কাছে কয়েকটা বিলিতি বিজ্ঞান-পত্রিকা নিয়মিত আসে, কিন্তু গত দু’মাস তাদের মোড়ক পর্যন্ত ভোলা হয়নি। দেবাশিস আবার বাড়ি ফিরে চলল। আজ আর আড্ডা নয়, আগের মত সন্ধ্যেটা পড়াশুনো করেই কাটাবে।

    দীপা রেডিও চালিয়ে দিয়ে চোখ বুজে আরাম-চেয়ারে বসে ছিল, দেবাশিসকে ফিরে আসতে দেখে রেডিও বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল, উদ্বিগ্ন প্রশ্নভরা চোখে তার পানে চাইল। দেবাশিস যথাসম্ভব সহজ গলায় বলল—‘ফিরে এলাম। অনেক দিন পড়াশুনো হয়নি, আজ একটু পড়ব।’

    টেলিফোন টেবিলের নীচের থাকে বিলিতি পত্রিকাগুলো জমা হয়েছিল দেবাশিস সেগুলো নিয়ে পত্রিকার মোড়ক খুলে তারিখ অনুযায়ী সাজাল, তারপর বিছানায় শুয়ে পিঠের নীচে বালিশ দিয়ে পড়তে আরম্ভ করল।

    ওঘরে দীপা আস্তে আস্তে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা দ্রুত নিবিড় হয়ে আসছে। পদ্মলোচন বাগানে জল দিচ্ছে। আজ দীপা বাগানে যায়নি। বিকেলবেলা সে সিনেমায় যাবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর দেবাশিস আহত লাঞ্ছিত মুখে চলে গেল, দীপার মনটাও কেমন একরকম হয়ে গেল। যত দিন যাচ্ছে তার জীবনটা এমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে যে, মনে হয় কোনো দিনই এ জট ছাড়ানো যাবে না। মনের মধ্যে একটা নতুন সমস্যা জন্ম নিয়েছে, তার কোনো সমাধান নেই।

    বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে, পদ্মলোচন বাগানের কাজ শেষ করে চলে গেল। দীপা তখন জানলা থেকে ফিরে নিঃশব্দে দেবাশিসের ঘরের দিকে গেল। দেবাশিস তখন আলো জ্বেলেছে, বিছানায় বালিশ ঠেসান দিয়ে পড়ায় নিমগ্ন। দীপা কিছুক্ষণ দোরের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকল; কিন্তু দেবাশিস তাকে দেখতে পেল না। দীপা তখন একেবারে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দেবাশিস চমকে চোখ তুলল।

    দীপা বলল—‘চা খাবে?’

    দেবাশিস একটু হাসল। দীপা বিকেলবেলার রূঢ়তার জন্যে অনুতপ্ত হয়েছে। সে বলল—‘তুমি যদি খাও আমিও খাব।’

    ‘এক্ষুনি আনছি।’ দীপা হরিণীর মত ছুটে চলে গেল। দেবাশিস কিছুক্ষণ দোরের দিকে চেয়ে থেকে আবার পড়ায় মন দিল।

    দীপা রান্নাঘরে গিয়ে দেখল, নকুল রান্না চড়িয়েছে। সে বলল—‘নকুল, তুমি সরো, আমি চা তৈরি করব।

    নকুল বলল—‘চা তৈরি করবে? দাদাবাবু খাবেন বুঝি? তা তুমি কেন করবে বউদি, আমি করে দিচ্ছি।’

    ‘না, আমি করব। তুমি সরো।’

    নকুল মনে মনে খুশি হল—‘আচ্ছা বউদি, তুমিই কর।’

    নকুলের ছায়াচ্ছন্ন মন অনেকটা পরিষ্কার হল। এই দু’মাস দেখেশুনে তার ধারণা জন্মেছিল, গোড়াতে কোনো কারণে এদের মনের মিল হয়নি, এখন আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে আসছে। ঘি আর আগুন একসঙ্গে কত দিন ঠাণ্ডা থাকবে!

    দীপা চা তৈরি করে ট্রে-র ওপর টি-পট, দু’টি পেয়ালা প্রভৃতি বসিয়ে ওপরে উঠে গেল, বসবার ঘরে ট্রে রেখে দেবাশিসের দোরের কাছে এসে বলল—‘চা এনেছি।’

    দেবাশিস তৎক্ষণাৎ উঠে এসে চায়ের টেবিলে বসল। দীপা চা পেয়ালায় ঢেলে একটি পেয়ালা দেবাশিসের দিকে এগিয়ে দিল, নিজের পেয়ালাটি হাতে তুলতে গিয়ে খানিকটা চা চলকে পিরিচে পড়ল।

    আজ দেবাশিস হঠাৎ ফিরে আসার পর দীপার শরীরটাও যেন শাসনের বাইরে চলে গেছে। থেকে থেকে বুকের মধ্যে আনচান করে উঠছে, মাথার মধ্যে যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, কান্নায় গলা বুজে আসছে। সে কাঁদুনে মেয়ে নয়, এত দিনের দীর্ঘ পরীক্ষায় সে পরম দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে আজ তার এ কী হল?

    এক চুমুক চা খেয়ে দেবাশিস বলল—‘আঃ! খাসা চা হয়েছে। কে করল—নকুল?’

    ‘না—আমি।’ দীপার গলাটা কেঁপে গেল, মনে হল শরীরের অস্থিমাংস নরম হয়ে গেছে। সে আস্তে আস্তে বসে পড়ল।

    দেবাশিস আর কিছু বলল না, কেবল একটু প্রশংসাসূচক হাসল। দীপা দু’ চুমুক চা খেয়ে নিজেকে একটু চাঙ্গা করে নিল, তারপর যেন গুনে গুনে কথা বলছে এমনিভাবে বলল—‘কাল তুমি আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে?’

    দেবাশিস চকিত চোখে তার পানে চাইল, ক্ষণেক নীরব থেকে বলল—‘তোমার যদি ইচ্ছে না থাকে, আমার মন রাখার জন্যে সিনেমা দেখার দরকার নেই।’

    ‘না, আমি দেখতে চাই।’

    চায়ের পেয়ালা শেষ করে দেবাশিস উঠে দাঁড়াল—‘বেশ, তাহলে নিয়ে যাব।’

    দেবাশিস নিজের ঘরে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছে এমন সময় ঘরের কোণে টেলিফোন বাজল।

    দীপার বুক আশঙ্কায় ধক্‌ধক্‌ করে উঠল। কার টেলিফোন!

    দেবাশিস গিয়ে টেলিফোন ধরল—‘হ্যালো।’

    অন্য দিক থেকে কে কথা বলছে, কী কথা বলছে, দীপা শুনতে পেল না, কেবল দেবাশিসের কথা একাগ্র হয়ে শুনতে লাগল, ‘ও…কী খবর?…না, আজ বাড়িতেই আছি…না, শরীর ভাল আছে…এখন?…ও বুঝেছি, আচ্ছা, আমি যাচ্ছি…না না, কষ্ট কিসের…আচ্ছা—’

    টেলিফোন নামিয়ে রেখে দেবাশিস কব্জির ঘড়ির দিকে তাকালো, আটটা বেজে গেছে। ‘আমাকে একবার বেরুতে হবে। হেঁটেই যাব। আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব।’

    সে বেরিয়ে গেল। দীপা কোনো প্রশ্ন করল না; সে জানতে পারল না, দেবাশিস কোথায় যাচ্ছে। একলা বসে বসে ভাবতে লাগল, কে দেবাশিসকে টেলিফোন করেছিল?

    দেবাশিস আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরল না। তারপর আরো কিছুক্ষণ কেটে গেল। নকুল নীচে থেকে এসে বলল—‘হ্যাঁ বউদি, দাদাবাবু কোথায় গেল? কখন ফিরবে?’

    দীপা বলল—‘তা তো জানি না নকুল। কোথায় গেছেন বলে যাননি, শুধু বললেন আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরবেন।’

    নকুল বলল—‘আধ ঘণ্টা তো কখন কেটে গেছে। খাবার সময় হল। কখনো তো এমন দেরি করে না।’ নকুল চিন্তিতভাবে বিজ্‌বিজ্‌ করতে করতে নীচে নেমে গেল।

    একজনের উদ্বেগ অন্যের মনে সঞ্চারিত হয়। দীপার মনও উৎকণ্ঠায় ভরে উঠল; নানারকম বাস্তব-অবাস্তব সম্ভাবনা তার মাথার মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল।

    ন’টা বেজে পাঁচ মিনিটে টেলিফোন বেজে উঠতেই দীপা চমকে উঠে দাঁড়াল, ভয়ে ভয়ে গিয়ে টেলিফোন তুলে কানে ধরল, ক্ষীণস্বরে বলল—‘হ্যালো।’

    অপর প্রান্ত থেকে স্বর এল—‘আমি। গলা শুনে চিনতে পারছ?’

    দীপার গলার আওয়াজ আরো ক্ষীণ হয়ে গেল—‘হ্যাঁ।’

    ‘তোমার স্বামী বাড়িতে আছে?’

    ‘না।’

    ‘খবর সব ভাল?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘তোমার স্বামী কোনো গোলমাল করেনি?’

    ‘না।’

    ‘তুমি যেমন ছিলে তেমনি আছ?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আমার নাম কাউকে বলনি?’

    ‘না।’

    ‘মা কালীর নামে দিব্যি করেছ, মনে আছে?’

    ‘আছে।’

    ‘আচ্ছা, আজ এই পর্যন্ত। সাবধানে থেকো। আবার টেলিফোন করব।’

    দীপার মুখ দিয়ে আর কথা বেরুল না, সে টেলিফোন রেখে আবার এসে বসল; মনে হল, তার দেহের সমস্ত প্রাণশক্তি ফুরিয়ে গেছে। দু’হাতে মুখ ঢোকে সে চেয়ারে পড়ে রইল।

    সাড়ে ন’টার সময় নকুল আবার এসে বলল—‘বউদি, দাদাবাবু এখনো এল না, আমার ভাল ঠেকছে না—’

    এই সময় তৃতীয় বার টেলিফোন বাজল। দীপার মুখ সাদা হয়ে গেল; সে সমস্ত শরীর শক্ত করে উঠে গিয়ে ফোন ধরল। মেয়েলী গলার আওয়াজ শুনল—‘হ্যালো, এটা কি দেবাশিস ভট্টের বাড়ি?’

    দীপার বুক ধড়ফড় করে উঠল, সে কোনো মতে উচ্চারণ করল—‘হ্যাঁ।’

    ‘আপনি কি তাঁর স্ত্রী?’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘দেখুন, আমি হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনি একবার আসতে পারবেন?’

    ‘কেন? কী হয়েছে?’

    ‘ইয়ে—আপনার স্বামীর একটা অ্যাক্‌সিডেন্ট হয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। আপনি চট্‌ করে আসুন।’

    দীপার মুখ থেকে বুক-ফাটা প্রশ্ন বেরিয়ে এল—‘বেঁচে আছেন?’

    ‘হ্যাঁ। এই কিছুক্ষণ আগে জ্ঞান হয়েছে।’

    ‘আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। কোন্‌ হাসপাতাল?’

    ‘রাসবিহারী হাসপাতাল, এমারজেন্সি ওয়ার্ড।’

    ফোন রেখে দিয়ে দীপা ফিরল; দেখল, নকুল তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। নকুল ব্যাকুল চোখে চেয়ে বলল—‘বউদি?’

    নকুলের শঙ্কা-বিবশ মুখ দেখে দীপা হঠাৎ নিজের হৃদয়টাও দেখতে পেল। আজকের দীপা আর দু’ মাস আগের দীপা নেই, সব ওলট-পালট হয়ে গেছে। তার মাথাটা একবার ঘুরে উঠল। তারপর সে দৃঢ়ভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—‘তোমার দাদাবাবুর অ্যাক্‌সিডেন্ট হয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।’

    নকুল আস্তে আস্তে মেঝের ওপর বসে পড়ল। দীপা বলল—‘না নকুল, এ সময় ভেঙে পড়লে চলবে না। চল, এক্ষুনি হাসপাতালে যেতে হবে।’

    দীপা নকুলকে হাতে ধরে টেনে দাঁড় করালো।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58 59 60 61 62 63 64 65 66 67 68 69 70 71 72 73 74 75 76 77 78 79 80 81 82 83 84 85 86 87 88 89 90 91 92 93 94 95 96 97 98 99 100 101 102 103 104 105 106 107 108 109 110 111 112 113 114 115 116 117 118 119 120 121 122 123 124 125 126 127 128 129 130 131 132 133 134 135 136 137 138 139 140 141 142 143 144 145 146 147 148 149 150 151 152 153 154 155 156 157 158 159 160 161 162 163 164 165
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঐতিহাসিক কাহিনী সমগ্র – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article ব্যোমকেশের গল্প – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    কবিতাসংগ্রহ – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 22, 2025
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    দাদার কীর্তি – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 22, 2025
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিষের ধোঁয়া – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 22, 2025
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    ঝিন্দের বন্দী – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 22, 2025
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    রিমঝিম – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 22, 2025
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    ছায়াপথিক – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

    November 22, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }